জেরুজালেমের নাবলুস স্ট্রিট থেকে একটি ট্যাক্সি নিয়ে আমি আর আমার এক বন্ধু রওনা হলাম ওয়েস্ট ব্যাংকের আরেক ঐতিহাসিক শহর নাবলুসের উদ্দেশ্যে। জেরুজালেম শহর পেছনে ফেলে গাড়ি এগিয়ে চলল রামাল্লার দিক ধরে। মসৃণ মহাসড়ক, পাহাড়ি পথ আর চারপাশের বিস্তীর্ণ ভূদৃশ্য দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, আমরা শুধু একটি শহরের দিকে যাচ্ছি না, বরং ইতিহাসের বুক চিড়ে এগিয়ে চলেছি।
পথের দুপাশে কখনও খাড়া পাথুরে পাহাড়, কখনও সবুজে ঢাকা ঢাল, আবার কোথাও গভীর উপত্যকা। পাহাড়ের গায়ে গায়ে ছড়িয়ে আছে বসতি। দূরে কোথাও জলপাইগাছের সারি, কোথাও পাথুরে জমির ফাঁকে ছোটো ছোটো ঘর। দেখে মনে হলো এই ভূখণ্ডের প্রকৃতিও যেন এখানকার মানুষের মতো— কঠিন, নির্ভীক, অথচ গভীরে কোথাও অসম্ভব কোমল।
পথে কয়েকটি ইসরাইলি চেকপয়েন্ট পড়ল। কোথাও গাড়ির গতি কমে গেল, কোথাও পাসপোর্ট পরীক্ষা, কোথাও নিরাপত্তাকর্মীদের উপস্থিতি। কয়েক মুহূর্তের বিরতির পর আবার গাড়ি ছুটতে শুরু করল। জানালার বাইরে তাকিয়ে এসব দৃশ্য দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, এই পথের প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি পাহাড়, প্রতিটি উপত্যকার সঙ্গে যেন জড়িয়ে আছে বহু দশকের রক্ত আর ইতিহাস।
আমাদের গন্তব্য নাবলুস। প্রাচীন ইতিহাসে যার নাম শেকেম, আরব-ইসলামি ইতিহাসে যার রয়েছে দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পিএলও শাসিত ওয়েস্ট ব্যাংকের পাহাড়বেষ্টিত এই শহরটি শুধু তার প্রাচীন স্থাপত্য, বাজার কিংবা ঐতিহাসিক স্থানের জন্য নয়, এ শহর বহু কবি, চিন্তক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের জন্ম দিয়েছে।
কিন্তু সেদিন নাবলুসে যাওয়ার সময়ে আমার মাথায় এসবের কোনও নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল না। শহরটি পরিদর্শন করবো, মানুষের জীবন দেখব, এই ছিল উদ্দেশ্য।
ফিলিস্তিনের বিখ্যাত কবি ফাদওয়া তুকানের কথা তখন মোটেও আমার মনে হয়নি। তাঁর নামের সঙ্গে পরিচয় দীর্ঘদিনের। অনেক বছর আগে তাঁর কিছু কবিতা পড়েছিলাম। কিন্তু নাবলুস যে তাঁর জন্মশহর, এই শহরের সঙ্গে তাঁর জীবন ও কবিতার যে এত গভীর সম্পর্ক, সে সম্পর্কে আমি জ্ঞাত ছিলাম না। হঠাৎ আমাদের ড্রাইভার বললেন— “আপনারা জানেন, ফাদওয়া তুকান এই শহরেরই মানুষ।”
আমি যেন মুহূর্তের জন্য থমকে গেলাম। কিছু কিছু নাম আছে, যেগুলো আমরা বহু বছর ভুলে থাকি, কিন্তু হঠাৎ কোনও একটি শব্দ, কোনও একটি স্থান, কোনও একটি মুহূর্ত সেই নামটিকে স্মৃতির গভীর থেকে তুলে আনে। ফাদওয়া তুকানের নামটিও সেদিন ঠিক তেমন করেই ফিরে এলো।
আমি বিস্ময়ে বললাম— কবি ফাদওয়া তুকান?
সে বলল— ‘হ্যাঁ।’
তৎক্ষণাৎ আমার মনে পড়ে গেল অনেক আগে পড়া তাঁর একটি কবিতা— ‘The Deluge and the Tree’— ‘বন্যা ও বৃক্ষ’।
কবিতায় কবির প্রশ্ন ছিল—
‘Had the Tree really fallen?
Never!’
অর্থাৎ—
বৃক্ষটি কি সত্যিই পড়ে গেছে?
না, কখনওই নয়।
আর কবিতার শেষপ্রান্তে তাঁর সেই আশাবাদী উচ্চারণ—
‘the birds shall return.’
পাখিরা ফিরে আসবে।
সেদিন নাবলুসের পথে যেতে যেতে এই কয়েকটি শব্দ যেন নতুন অর্থ নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়াল। মনে হলো, এটি শুধু একটি বৃক্ষের কবিতা নয়। এটি যেন ধ্বংসের মধ্যেও টিকে থাকার, হারিয়ে যাওয়ার পরও ফিরে আসার এবং অন্ধকারের মধ্যেও ভবিষ্যতের প্রতি বিশ্বাস রাখার কবিতা। বন্যা আসতে পারে। বৃক্ষ উপড়ে পড়েছে বলেও মনে হতে পারে। কিন্তু শিকড় যদি মাটির গভীরে থাকে, তবে সেই বৃক্ষের গল্প শেষ হয় না।
আর পাখিরা?
পাখিরা ফিরে আসবে।
বেশ আগে আমি এই বহুল পঠিত কবিতাটি নিজের জন্য ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করার চেষ্টা করেছিলাম, তাই যাত্রাপথে ফোন থেকে খুঁজে বের করে পুরো কবিতাটি পড়লাম।
কবিতার শিরোনাম— প্লাবন ও বৃক্ষ।
“যখন ঘূর্ণিঝড় উন্মত্ত হয়ে
কালো অশুভের প্লাবন ছড়িয়ে দিল
সবুজ-সুন্দর এই পবিত্র ভূমির বুকে,
তারা উল্লাসে মেতে উঠল।
পশ্চিমের আকাশ প্রতিধ্বনিত হলো”
আনন্দময় ঘোষণা—
“বৃক্ষটি পড়ে গেছে!
মহীরুহের কাণ্ড ভেঙে চুরমার!
ঝড় বৃক্ষটির জীবনের সব চিহ্ন মুছে দিয়েছে!”
সত্যিই কি বৃক্ষটি পড়ে গেছে?
কখনওই নয়!
যতদিন আমাদের রক্তধারা
চিরকাল বয়ে চলে,
যতদিন আমাদের কাঁটাময় শাখার মদির রস
তৃষ্ণার্ত শিকড়গুলোকে সঞ্জীবিত করে,
যতদিন আরবের শিকড়
গভীর থেকে আরও গভীরে
মাটির বুকের ভেতর ছড়িয়ে যায়—
ততদিন বৃক্ষ বেঁচে থাকবে।
যেদিন বৃক্ষ আবার মাথা তুলে দাঁড়াবে,
তার শাখাগুলো রোদে
নতুন সবুজে, সতেজতায় ভরে উঠবে,
সূর্যের নিচে
বৃক্ষের হাসি ছড়িয়ে পড়বে
চারদিকে।
আর পাখিরা ফিরে আসবে।
নিশ্চয়ই, পাখিরা ফিরে আসবে।
পাখিরা ফিরে আসবেই।”
ফাদওয়া তুকানের নাম আর তাঁর কবিতার এই আশাবাদ আমাকে সেদিন নাবলুসে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে আরও প্রবল করে দিল। মনে হলো, আমি শুধু একটি শহরে যাচ্ছি না, আমি যাচ্ছি এমন একজন কিংবদন্তি কবির শহরে, যিনি তাঁর কবিতার মাধ্যমে মাটি, মানুষ, দেশ এবং ভবিষ্যতের সঙ্গে কথা বলেছেন।
কোথাও একবার পড়েছিলাম, ইসরায়েলি সেনাপ্রধান মোশে দায়ান ফাদওয়া তুকানের একটি কবিতা পড়ার অভিজ্ঞতাকে বিশজন শত্রু কমান্ডোর মুখোমুখি হওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। কথাটির সত্যতা একাধিক সূত্রে প্রমাণিত।
একজন কবির কবিতা, আর তার শক্তিকে একজন সামরিক কমান্ডার বিশজন কমান্ডোর শক্তির সঙ্গে তুলনা করছেন!
কথাটি তখন আমার মনে গভীর দাগ কেটেছিল।
কিন্তু আশ্চর্য, নাবলুসের পথে বের হওয়ার সময় সেই স্মৃতিটি আমার মনে একবারও আসেনি।
দুপুর প্রায় বারোটার দিকে আমরা নাবলুসে পৌঁছালাম। মাথার ঠিক উপর তখন এক টুকরো নির্মল নীল আকাশ। পাহাড়ঘেরা শহরের ওপর রোদের ঝলকানি। দূর থেকে নাবলুসকে যতটা শান্ত মনে হয়েছিল, শহরের ভেতরে ঢুকতেই তার সম্পূর্ণ অন্য একটি রূপ চোখের সামনে খুলে গেল।
মানুষের কোলাহল। গাড়ির হর্ন। দোকানিদের হাঁকডাক। পথচারীদের ব্যস্ত চলাচল। ছোটো ছোটো দোকান, বাজারের ভিড়, রাস্তার দুপাশে নানা পণ্যের সমারোহ, সব মিলিয়ে নাবলুস যেন এক জীবন্ত শহর, যে শহর প্রতিদিনের জীবনকে তার নিজস্ব ছন্দে বয়ে নিয়ে চলছে।
এখানে এসে খুব কাছ থেকে দেখলাম ওয়েস্ট ব্যাংকের এই এলাকার মানুষের জীবন। বাইরে থেকে যাদের জীবনকে আমরা কেবল সংবাদ, ছবি কিংবা রাজনৈতিক প্রতিবেদনের মধ্য দিয়ে দেখি, তাদের খুব স্বাভাবিক দৈনন্দিন জীবন যেন সেদিন আমার চোখের সামনে খুলে গেল।
অদ্ভুতভাবে লক্ষ করলাম, এত দুঃখ, এত বেদনা, এত অনিশ্চয়তার ইতিহাস বুকে নিয়ে চলা এইসব মানুষের মুখে আমি কোনও গভীর হতাশা কিংবা দুশ্চিন্তার ছাপ খুঁজে পেলাম না। মানুষ স্বাভাবিকভাবেই হাঁটছে। কেউ বন্ধুর সঙ্গে দাঁড়িয়ে গল্প করছে। কেউ দোকানে কেনাকাটা করছে। কেউ ব্যস্ত হয়ে নিজের কাজে ছুটছে।
আমাদের মতো অপরিচিত, ভিনদেশি মানুষকে দেখেও অনেকের মুখে ফুটে উঠল আন্তরিক হাসি। কেউ সালাম করলেন, কেউ মৃদু হেসে বললেন— ‘আহলান সাহলান।’
‘মারহাবা।’
মনে হলো এই কয়েকটি শব্দের মধ্যে যেন কতটা আপন করে নেওয়ার উষ্ণতা!
রাস্তার পাশে মহিলারা সন্তানদের নিয়ে হাঁটছেন। কোথাও মায়েরা ছোট্ট শিশুর হাত ধরে এগিয়ে যাচ্ছেন। কোথাও বৃদ্ধরা বসে গল্প করছেন। কারও হাতে চায়ের কাপ, কারও মুখে হাসি। শিশুরা নিজেদের মতো ছুটে বেড়াচ্ছে। দোকানিরা ক্রেতাদের ডাকছেন। গাড়ির হর্ন, মানুষের কণ্ঠস্বর, বাজারের ব্যস্ততা, সব মিলিয়ে এক অনিন্দ্য, প্রাণময় পরিবেশ।
মনে হলো, জীবনের ওপর যত চাপই থাকুক, মানুষ এখানে জীবনকে থামতে দেয়নি। দুঃখ আছে, কিন্তু তার পাশে হাসিও আছে। কষ্ট আছে, কিন্তু তার পাশেই আছে স্বাভাবিক জীবন। ইতিহাসের ভার আছে, কিন্তু মানুষ তার মধ্যেও প্রতিদিনের সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা তৈরি করে নিচ্ছে।
নাবলুসের এই দৃশ্য আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। কিন্তু এই সবকিছুর মাঝেও আমার মন যেন অন্য কোথাও ঘুরে বেড়াচ্ছিল। আমি আমার মাথা থেকে কোনওভাবেই ফাদওয়া তুকানকে সরাতে পারছিলাম না।
শহরের যে রাস্তা দিয়ে হাঁটছি, মনে হচ্ছিল, হয়তো কোনও একদিন এই পথ দিয়েই ফাদওয়া হেঁটেছেন। যে বাজারের ভিড় দেখছি, হয়তো তাঁরও কোনওদিন এই ভিড়ের মধ্য দিয়ে যাওয়া হয়েছে। যে পাহাড়গুলো শহরটিকে ঘিরে রেখেছে, সেই পাহাড়ের দিকে তাকিয়েই হয়তো কোনও এক বিকেলে তিনি কবিতার কোনও পঙ্ক্তি ভেবেছেন।
কোনও একটি পুরোনো বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মনে হচ্ছিল, হয়তো এমন কোনও জানালার পাশে বসেই তিনি লিখেছেন। কোনও পথচারী নারীকে দেখে মনে হচ্ছিল, এই শহরের নারীদের জীবন, তাদের হাসি-কান্না, তাদের স্বপ্ন ও বেদনার কতটুকু তিনি তাঁর কবিতায় ধারণ করেছিলেন!
নাবলুস তখন আমার কাছে আর শুধু একটি ঐতিহাসিক শহর মনে হলো না। এটি আমার কাছে হয়ে উঠল কবি ফাদওয়া তুকানের শহর। কবি ও কবিতার জনপদ।
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আমি আমার অনূদিত তাঁর আরেকটি কবিতার কিছু পঙ্ক্তি মনে মনে পড়ি।
কবিতাটির নাম, আমার জীবন—
‘আমার জীবন, আমার এই সম্পূর্ণ বিষাদময় জীবন,
যদি আগামীকাল তার ছায়াটুকুও হারিয়ে যায়,
তবু পৃথিবীর বুকে রয়ে যাবে এক প্রতিধ্বনি—
আমার কণ্ঠ বার বার বলে যাবে,
আমার জীবন অশ্রু,
আর এক স্নেহময় হৃদয়,
এক আকুল আকাঙ্ক্ষা,
একখানি কবিতার বই আর একটি বীণা।
আমার নিঃসঙ্গ হৃদয়ের
তালের সঙ্গে মিলিয়ে বীণার তারে আঙুল চালাই,
স্পন্দিত তারের সুরে গলে যায় আমার দুঃখ।
সুর আর কবিতাকে সঙ্গী করে
আমি লড়াই করি
এক যন্ত্রণাময় জীবনের বেদনার সঙ্গে।’
শহরের অলিগলি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, তিনি হয়তো এই পথেই কোনওদিন হেঁটেছেন। এই আকাশের নিচেই দাঁড়িয়েছেন। এই পাহাড়ের দিকে তাকিয়েছেন। এই শহরের মানুষের হাসি, কান্না, ব্যস্ততা, সংগ্রাম, সবকিছুই হয়তো কোনও না কোনওভাবে তাঁর কবিতার ভেতর জায়গা করে নিয়েছে।
নাবলুসের পুরোনো শহরের সরু গলিপথ, প্রাচীন পাথরের দেয়াল, পুরোনো বাজার আর মানুষের প্রতিদিনের ব্যস্ততা, সবকিছুর মধ্যেই যেন অতীত ও বর্তমান পাশাপাশি হাঁটে। কোথাও শত বছরের পুরোনো স্থাপত্য, কোথাও আধুনিক দোকান, কোথাও ইতিহাসের নিঃশব্দ ছাপ, আবার তার পাশেই মানুষের প্রাণচঞ্চল জীবন।
এই শহরকে দেখে আমার মনে হলো, ইতিহাস শুধু জাদুঘরে বন্দি হয়ে থাকে না। ইতিহাস মানুষের হাঁটাচলায়, বাজারের কোলাহলে, পুরোনো দেয়ালের ছায়ায় এবং একটি শহরের মানুষের প্রতিদিনের জীবনেও বেঁচে থাকে।
আর সেই ইতিহাসের মধ্যেই একজন কবি কখনও কখনও অদৃশ্যভাবে হেঁটে বেড়ান।
নাবলুসের পুরোনো শহরের একটি রেস্টুরেন্টে বসে দুপুরের খাবার খেতে খেতে কয়েকজন মধ্যবয়েসি মানুষের সঙ্গে আলাপ হলো। কথায় কথায় তাঁদের জীবনযাপন, শহরের পরিবর্তন, অতীতের স্মৃতি, শোষণ, শাসন, নির্যাতন, সবকিছুই উঠে আসছিল। ঘুরেফিরে একসময়ে কথার বিষয় হয়ে উঠলেন ফাদওয়া তুকান।
ফাদওয়ার নাম উচ্চারিত হতেই তাঁদের কণ্ঠে যেন অন্যরকম আবেগ নেমে এলো।
তাঁরা বললেন— কবি ফাদওয়া দেখেছেন তাঁর প্রিয় নাবলুস দখলদারিত্বের কঠিন বাস্তবতার মধ্যে পড়ে যেতে। দেখেছেন তাঁদের বাগানের প্রিয় কমলাগাছগুলো ধ্বংস হয়ে যেতে। দেখেছেন মূল্যবান জলপাইগাছ কেটে ফেলা হচ্ছে, যে জলপাইগাছ শুধু একটি গাছ নয়, এই মাটির মানুষের জীবন, স্মৃতি ও অস্তিত্বেরই অংশ।
কিন্তু প্রতিটি আঘাত তাঁকে ভেঙে দেয়নি।
প্রতিটি বেদনার ঢেউ পেরিয়ে তিনি যেন আরও দৃঢ় হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর কলম থামেনি। তিনি লিখেছেন— বার বার লিখে গেছেন। লিখেছেন তাঁর মানুষের দুঃখের কথা, বঞ্চনার কথা, হারিয়ে যাওয়া ঘরবাড়ির কথা, ধ্বংস হয়ে যাওয়া স্বপ্নের কথা। তাঁর কবিতার মধ্য দিয়ে নাবলুসের বেদনা, ফিলিস্তিনের মানুষের কান্না পৌঁছে গেছে বিশ্বের মানুষের কাছে।
লোকগুলোর কথায় মনে হচ্ছিল, ফাদওয়া শুধু কবিতা লেখেননি, তিনি তাঁর কবিতার মধ্যে একটি জাতির স্মৃতি বহন করেছেন।
তারা বললেন—
এমনকী জীবনের শেষপর্বে অসুস্থতার কারণে যখন তাঁর দৃষ্টিশক্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, তখনও তিনি পড়া ও লেখা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি। চোখের আলো কমে এসেছিল, কিন্তু তাঁর ভেতরের আলো নিভে যায়নি।
কলমের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক যেন ছিল শ্বাস নেওয়ার মতোই স্বাভাবিক।
আর এভাবেই এক দীর্ঘ জীবন পেরিয়ে ২০০৩ সালের ১২ ডিসেম্বর ছিয়াশি বছর বয়েসে কিংবদন্তি কবি ফাদওয়া তুকান নাবলুসে মৃত্যুবরণ করেন। যে ঘরে তাঁর জীবনের একসময়ে প্রায় বন্দিজীবনের মতো কেটেছিল, শেষপর্যন্ত সেই স্থান থেকেই তিনি বেরিয়ে গেলেন, তবে এবার কোনও বন্দি হিসেবে নয়। এবার তাঁর বিদায় ছিল ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও মানুষের আবেগে ঘেরা।
তারা বললেন—
যে নারী একসময়ে নিজের জীবনের দেয়ালের মধ্যে বন্দি ছিলেন, তিনিই পরবর্তীকালে তাঁর কবিতার শক্তিতে সেই দেয়াল অতিক্রম করে হয়ে উঠেছিলেন অসংখ্য মানুষের কণ্ঠস্বর।
তাঁর প্রতিবাদ ছিল কলমে, তাঁর প্রতিরোধ ছিল কবিতায়, আর তাঁর অস্ত্র ছিল শব্দ। প্রতিবাদ ও নিরন্তর সৃষ্টিশীলতার মধ্য দিয়েই ফাদওয়া তুকান হয়ে উঠেছিলেন ফিলিস্তিনি কবিতার এক অনন্য প্রতীক, অনেকের কাছে ‘ফিলিস্তিনের জননী’।
‘তাঁর শেষযাত্রায় আমরাও ছিলাম’— কথাটি বলতে বলতে একজন বৃদ্ধ চোখ মুছলেন। মুহূর্তের জন্য যেন রেস্টুরেন্টের কোলাহল থেমে গেল। তাঁর চোখের জলে শুধু একজন কবির মৃত্যুর স্মৃতি নয়, মিশে ছিল নাবলুসের এক দীর্ঘ ইতিহাস, ভালোবাসা আর বেদনা।
ফাদওয়া তুকান জন্মেছিলেন ১৯১৭ সালে নাবলুসে। তিনি ছিলেন ফিলিস্তিনি ও আরবি সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি। তাঁর কবিতায় ব্যক্তিগত বেদনা যেমন এসেছে, তেমনই এসেছে নারীজীবনের অভিজ্ঞতা, নিঃসঙ্গতা, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং পরবর্তীকালে ফিলিস্তিনি জাতির ইতিহাস ও সংগ্রাম।
শৈশবে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বেশিদিন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু এখানেই তাঁর জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন তাঁর বড়ো ভাই ইব্রাহিম তুকান।
ইব্রাহিম শুধু তাঁর ভাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন তাঁর শিক্ষক, সাহিত্যগুরু এবং কবিতার পথে প্রথম বড়ো অনুপ্রেরণা। তিনি ফাদওয়াকে কবিতা পড়াতেন, সাহিত্যচর্চায় উৎসাহ দিতেন, বই পড়তে দিতেন এবং তাঁর লেখার প্রতিভাকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ঘরের ভেতরেই যেন ফাদওয়ার জন্য খুলে গিয়েছিল সাহিত্যের এক নতুন পৃথিবী।
এই ভাই-বোনের সম্পর্কটি ফিলিস্তিনি সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। কারণ ইব্রাহিম তুকান নিজেও ছিলেন ফিলিস্তিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি।
ইব্রাহিম তুকান জন্মেছিলেন ১৯০৫ সালে নাবলুসে। জেরুজালেম ও বৈরুতে পড়াশোনা করেন এবং পরবর্তীকালে শিক্ষকতা ও সাহিত্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আরবি সাহিত্য ও কবিতায় তাঁর ছিল গভীর দখল। তাঁর কবিতার সবচেয়ে পরিচিত নামগুলোর একটি ‘মাওতিনি’ যার অর্থ ‘আমার জন্মভূমি’।
১৯৩৪ সালে লেখা এই কবিতাটি পরবর্তীকালে ফিলিস্তিনি ও আরব বিশ্বের মানুষের কাছে গভীর দেশপ্রেমের প্রতীক হয়ে ওঠে। কবিতাটি সুরারোপের পর আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
‘মাওতিনি’-র বাংলায় ভাবানুবাদটি এমন—
‘আমার জন্মভূমি, আমার জন্মভূমি,
তোমার ভালোবাসাই আমার হৃদয়ের ঠিকানা,
তোমার মাটি, তোমার আকাশ,
তোমার নামেই জেগে থাকে আমার প্রাণ।’
একজন ভাই তাঁর কবিতায় জন্মভূমির প্রতি ভালোবাসার কথা লিখছেন, আর তাঁরই ছোটো বোন পরবর্তীকালে সেই জন্মভূমির মাটি, মানুষ ও ইতিহাসকে নিজের কবিতার গভীরে ধারণ করছেন, এই সম্পর্কটি ভাবলেই বিস্ময় জাগে।
ইব্রাহিম তুকান দীর্ঘদিন শারীরিক অসুস্থতায় ভুগেছিলেন। ১৯৪১ সালে অসুস্থতা গুরুতর হলে তাঁকে জেরুজালেমে নেওয়া হয়। ২ মে ১৯৪১ সালে জেরুজালেমে তাঁর মৃত্যু হয়। পরে তাঁকে তাঁর জন্মশহর নাবলুসে সমাহিত করা হয়।
অন্যদিকে ফাদওয়া তুকান দীর্ঘ জীবন কাটিয়ে ২০০৩ সালের ১২ ডিসেম্বর নাবলুসেই মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকেও সমাহিত করা হয় এই শহরের মাটিতে।
একই শহর, একই মাটি। দুই কবি। এক ভাই, এক বোন। একজনের কবিতা আরব-বিশ্বের মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে, অন্যজন তাঁর কবিতায় ফিলিস্তিনি নারীর অভিজ্ঞতা, মাতৃভূমির বেদনা ও মানুষের অদম্য আকাঙ্ক্ষাকে বিশ্বসাহিত্যের সামনে তুলে ধরেছেন।
ফাদওয়া তুকানের কবিতায় বার বার ফিরে এসেছে মাটি। নিজের দেশের মাটি। সেই মাটির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল কেবল একজন নাগরিকের সম্পর্ক নয়, এ যেন একজন কবির অস্তিত্বের সঙ্গে তাঁর জন্মভূমির সম্পর্ক।
তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘ঊহড়ঁময ভড়ৎ গব’-তে তিনি মৃত্যুর পরও নিজের দেশের মাটিতে মিশে থাকার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল— নিজের দেশেই যেন তাঁর মৃত্যু হয়, সেই মাটিতেই যেন তাঁর কবর হয়, তারপর তিনি যেন সেই মাটির সঙ্গে মিশে গিয়ে ঘাস হয়ে জন্ম নেন, ফুল হয়ে ফুটে ওঠেন, আর সেই ফুল যেন তুলে নেয় তাঁর দেশের কোনও শিশু।
কবিতাটির একটি সংক্ষিপ্ত ভাবানুবাদ করলে এরকম হয়—
‘আমার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট
আমি যেন আমার দেশের মাটিতেই মৃত্যুবরণ করি,
সেই মাটিতেই যেন আমাকে কবর দেওয়া হয়।
তার মাটির নিচে মিশে যাই, বিলীন হয়ে যাই,
আর একদিন সেই মাটিতেই
ঘাস হয়ে, ফুল হয়ে ফিরে আসি—
আমার দেশের কোনও শিশুর হাতে।’
এই কবিতার পঙ্ক্তিগুলোই তাঁর সমাধিফলকে খোদাই করা আছে, যেন মৃত্যুর পরও তাঁর শেষ ইচ্ছাটি তাঁর জন্মভূমির মাটির সঙ্গে কথা বলে যাচ্ছে।
নাবলুসে সেদিন ঘুরতে ঘুরতে খুব ইচ্ছে হয়েছিল ফাদওয়া তুকানের সমাধিতে যাব। সঙ্গে করে নিয়ে যাব কয়েকটি সফেদ ফুলের পাপড়ি। একজন দূরদেশের বাঙালি কবির পক্ষ থেকে একজন ফিলিস্তিনি কবিকে ভালোবাসার অর্ঘ্য দেবো।
কিন্তু ভ্রমণের সময় ছিল সীমিত। নাবলুসে আমাদের আরও কিছু জায়গা দেখার ছিল। নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সময়ের হিসাবও ছিল। সন্ধ্যার আগেই আবার জেরুজালেমে ফিরতে হবে। ফলে শেষ পর্যন্ত ফাদওয়া তুকানের সমাধির কাছে গিয়ে সেই ফুলের পাপড়ি রেখে আসা সম্ভব হলো না। একটু খারাপ লেগেছিল।
মনে হলো, এত দূর এসে যাঁর শহরে পৌঁছেছি, যাঁর কবিতা এত বছর আগে পড়েছিলাম, যাঁর নাম হঠাৎ এই শহরের পথে আমার স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলল, তাঁর সমাধিতে গিয়ে অন্তত কয়েকটি ফুলও রেখে যেতে পারলাম না! কিন্তু পরে মনে হলো, কবির প্রতি ভালোবাসা তো শুধু ফুলে প্রকাশ পায় না। কখনও একটি কবিতা ফুল হয়ে ওঠে। কখনও একটি স্মৃতি শ্রদ্ধার্ঘ্য হয়ে থাকে। কখনও দূরদেশের কোনও এক পাঠকের হৃদয়ে বেঁচে থাকাই একজন কবির জন্য সবচেয়ে বড়ো ফুল।
নাবলুস থেকে ফিরে আসার সময়ে বার বার মনে পড়ছিল সেই কবিতার কথা—
'Had the Tree really fallen?
Never!'
না, বৃক্ষটি সত্যিই পড়ে যায়নি।
আর সেই সঙ্গে মনে হচ্ছিল—
'the
birds shall return.'
পাখিরা ফিরে আসবে।
হয়তো এটাই ফাদওয়া তুকানের কবিতার সবচেয়ে বড়ো শক্তি, তিনি ধ্বংস দেখেও শেষ কথা হিসেবে ধ্বংসকে মেনে নেননি। তাঁর কবিতায় ছিল ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা, মাটির সঙ্গে সম্পর্ক, মানুষের প্রতি বিশ্বাস এবং ভবিষ্যতের প্রতি এক গভীর আশাবাদ।
আজ নাবলুসের সেই পথের কথা মনে হলে মনে হয়, সেদিনের যাত্রাটি হয়তো কেবল একটি শহর ভ্রমণ ছিল না। আমি জানতাম না ফাদওয়া তুকান আমার জন্য সেখানে অপেক্ষা করছেন, কোনও মানুষের মতো নয়, কোনও দরজা খুলে নয়, বরং তাঁর কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি হয়ে।
আমি তাঁর সমাধিতে ফুল রেখে আসতে পারিনি, কিন্তু আমার মনের ভেতর জমে থাকা ভালোবাসাটুকুই হয়তো একদিন সাদা ফুলের পাপড়ি হয়ে আকাশে উড়ে গিয়ে নাবলুসের পাহাড় পেরিয়ে, তাঁর সমাধির ওপর গিয়ে পড়বে।
ফেরার সময় ট্যাক্সির জানালা দিয়ে নাবলুসের পাহাড়গুলো ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাচ্ছিল। সন্ধ্যার আলো ফিকে হয়ে আসছিল। আমি চুপ করে বসে রইলাম। মনে হচ্ছিল, আজ আমি শুধু একটি শহর দেখে ফিরছি না। সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছি একজন কবির স্মৃতি, তাঁর নিঃসঙ্গতা, তাঁর সংগ্রাম, তাঁর ভালোবাসা আর তাঁর মাটির প্রতি গভীর টান। তাই ফেরার পথে মনে মনে কবিকে বললাম—
আমার সকল ভালোবাসা ভরে
সফেদ রঙের খামে,
সুনীল আকাশে উড়িয়ে দিলাম—
ফাদওয়া, তোমার নামে।

বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ অক্টোবর ২০২৬
জেরুজালেমের নাবলুস স্ট্রিট থেকে একটি ট্যাক্সি নিয়ে আমি আর আমার এক বন্ধু রওনা হলাম ওয়েস্ট ব্যাংকের আরেক ঐতিহাসিক শহর নাবলুসের উদ্দেশ্যে। জেরুজালেম শহর পেছনে ফেলে গাড়ি এগিয়ে চলল রামাল্লার দিক ধরে। মসৃণ মহাসড়ক, পাহাড়ি পথ আর চারপাশের বিস্তীর্ণ ভূদৃশ্য দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, আমরা শুধু একটি শহরের দিকে যাচ্ছি না, বরং ইতিহাসের বুক চিড়ে এগিয়ে চলেছি।
পথের দুপাশে কখনও খাড়া পাথুরে পাহাড়, কখনও সবুজে ঢাকা ঢাল, আবার কোথাও গভীর উপত্যকা। পাহাড়ের গায়ে গায়ে ছড়িয়ে আছে বসতি। দূরে কোথাও জলপাইগাছের সারি, কোথাও পাথুরে জমির ফাঁকে ছোটো ছোটো ঘর। দেখে মনে হলো এই ভূখণ্ডের প্রকৃতিও যেন এখানকার মানুষের মতো— কঠিন, নির্ভীক, অথচ গভীরে কোথাও অসম্ভব কোমল।
পথে কয়েকটি ইসরাইলি চেকপয়েন্ট পড়ল। কোথাও গাড়ির গতি কমে গেল, কোথাও পাসপোর্ট পরীক্ষা, কোথাও নিরাপত্তাকর্মীদের উপস্থিতি। কয়েক মুহূর্তের বিরতির পর আবার গাড়ি ছুটতে শুরু করল। জানালার বাইরে তাকিয়ে এসব দৃশ্য দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, এই পথের প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি পাহাড়, প্রতিটি উপত্যকার সঙ্গে যেন জড়িয়ে আছে বহু দশকের রক্ত আর ইতিহাস।
আমাদের গন্তব্য নাবলুস। প্রাচীন ইতিহাসে যার নাম শেকেম, আরব-ইসলামি ইতিহাসে যার রয়েছে দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পিএলও শাসিত ওয়েস্ট ব্যাংকের পাহাড়বেষ্টিত এই শহরটি শুধু তার প্রাচীন স্থাপত্য, বাজার কিংবা ঐতিহাসিক স্থানের জন্য নয়, এ শহর বহু কবি, চিন্তক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের জন্ম দিয়েছে।
কিন্তু সেদিন নাবলুসে যাওয়ার সময়ে আমার মাথায় এসবের কোনও নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল না। শহরটি পরিদর্শন করবো, মানুষের জীবন দেখব, এই ছিল উদ্দেশ্য।
ফিলিস্তিনের বিখ্যাত কবি ফাদওয়া তুকানের কথা তখন মোটেও আমার মনে হয়নি। তাঁর নামের সঙ্গে পরিচয় দীর্ঘদিনের। অনেক বছর আগে তাঁর কিছু কবিতা পড়েছিলাম। কিন্তু নাবলুস যে তাঁর জন্মশহর, এই শহরের সঙ্গে তাঁর জীবন ও কবিতার যে এত গভীর সম্পর্ক, সে সম্পর্কে আমি জ্ঞাত ছিলাম না। হঠাৎ আমাদের ড্রাইভার বললেন— “আপনারা জানেন, ফাদওয়া তুকান এই শহরেরই মানুষ।”
আমি যেন মুহূর্তের জন্য থমকে গেলাম। কিছু কিছু নাম আছে, যেগুলো আমরা বহু বছর ভুলে থাকি, কিন্তু হঠাৎ কোনও একটি শব্দ, কোনও একটি স্থান, কোনও একটি মুহূর্ত সেই নামটিকে স্মৃতির গভীর থেকে তুলে আনে। ফাদওয়া তুকানের নামটিও সেদিন ঠিক তেমন করেই ফিরে এলো।
আমি বিস্ময়ে বললাম— কবি ফাদওয়া তুকান?
সে বলল— ‘হ্যাঁ।’
তৎক্ষণাৎ আমার মনে পড়ে গেল অনেক আগে পড়া তাঁর একটি কবিতা— ‘The Deluge and the Tree’— ‘বন্যা ও বৃক্ষ’।
কবিতায় কবির প্রশ্ন ছিল—
‘Had the Tree really fallen?
Never!’
অর্থাৎ—
বৃক্ষটি কি সত্যিই পড়ে গেছে?
না, কখনওই নয়।
আর কবিতার শেষপ্রান্তে তাঁর সেই আশাবাদী উচ্চারণ—
‘the birds shall return.’
পাখিরা ফিরে আসবে।
সেদিন নাবলুসের পথে যেতে যেতে এই কয়েকটি শব্দ যেন নতুন অর্থ নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়াল। মনে হলো, এটি শুধু একটি বৃক্ষের কবিতা নয়। এটি যেন ধ্বংসের মধ্যেও টিকে থাকার, হারিয়ে যাওয়ার পরও ফিরে আসার এবং অন্ধকারের মধ্যেও ভবিষ্যতের প্রতি বিশ্বাস রাখার কবিতা। বন্যা আসতে পারে। বৃক্ষ উপড়ে পড়েছে বলেও মনে হতে পারে। কিন্তু শিকড় যদি মাটির গভীরে থাকে, তবে সেই বৃক্ষের গল্প শেষ হয় না।
আর পাখিরা?
পাখিরা ফিরে আসবে।
বেশ আগে আমি এই বহুল পঠিত কবিতাটি নিজের জন্য ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করার চেষ্টা করেছিলাম, তাই যাত্রাপথে ফোন থেকে খুঁজে বের করে পুরো কবিতাটি পড়লাম।
কবিতার শিরোনাম— প্লাবন ও বৃক্ষ।
“যখন ঘূর্ণিঝড় উন্মত্ত হয়ে
কালো অশুভের প্লাবন ছড়িয়ে দিল
সবুজ-সুন্দর এই পবিত্র ভূমির বুকে,
তারা উল্লাসে মেতে উঠল।
পশ্চিমের আকাশ প্রতিধ্বনিত হলো”
আনন্দময় ঘোষণা—
“বৃক্ষটি পড়ে গেছে!
মহীরুহের কাণ্ড ভেঙে চুরমার!
ঝড় বৃক্ষটির জীবনের সব চিহ্ন মুছে দিয়েছে!”
সত্যিই কি বৃক্ষটি পড়ে গেছে?
কখনওই নয়!
যতদিন আমাদের রক্তধারা
চিরকাল বয়ে চলে,
যতদিন আমাদের কাঁটাময় শাখার মদির রস
তৃষ্ণার্ত শিকড়গুলোকে সঞ্জীবিত করে,
যতদিন আরবের শিকড়
গভীর থেকে আরও গভীরে
মাটির বুকের ভেতর ছড়িয়ে যায়—
ততদিন বৃক্ষ বেঁচে থাকবে।
যেদিন বৃক্ষ আবার মাথা তুলে দাঁড়াবে,
তার শাখাগুলো রোদে
নতুন সবুজে, সতেজতায় ভরে উঠবে,
সূর্যের নিচে
বৃক্ষের হাসি ছড়িয়ে পড়বে
চারদিকে।
আর পাখিরা ফিরে আসবে।
নিশ্চয়ই, পাখিরা ফিরে আসবে।
পাখিরা ফিরে আসবেই।”
ফাদওয়া তুকানের নাম আর তাঁর কবিতার এই আশাবাদ আমাকে সেদিন নাবলুসে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে আরও প্রবল করে দিল। মনে হলো, আমি শুধু একটি শহরে যাচ্ছি না, আমি যাচ্ছি এমন একজন কিংবদন্তি কবির শহরে, যিনি তাঁর কবিতার মাধ্যমে মাটি, মানুষ, দেশ এবং ভবিষ্যতের সঙ্গে কথা বলেছেন।
কোথাও একবার পড়েছিলাম, ইসরায়েলি সেনাপ্রধান মোশে দায়ান ফাদওয়া তুকানের একটি কবিতা পড়ার অভিজ্ঞতাকে বিশজন শত্রু কমান্ডোর মুখোমুখি হওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। কথাটির সত্যতা একাধিক সূত্রে প্রমাণিত।
একজন কবির কবিতা, আর তার শক্তিকে একজন সামরিক কমান্ডার বিশজন কমান্ডোর শক্তির সঙ্গে তুলনা করছেন!
কথাটি তখন আমার মনে গভীর দাগ কেটেছিল।
কিন্তু আশ্চর্য, নাবলুসের পথে বের হওয়ার সময় সেই স্মৃতিটি আমার মনে একবারও আসেনি।
দুপুর প্রায় বারোটার দিকে আমরা নাবলুসে পৌঁছালাম। মাথার ঠিক উপর তখন এক টুকরো নির্মল নীল আকাশ। পাহাড়ঘেরা শহরের ওপর রোদের ঝলকানি। দূর থেকে নাবলুসকে যতটা শান্ত মনে হয়েছিল, শহরের ভেতরে ঢুকতেই তার সম্পূর্ণ অন্য একটি রূপ চোখের সামনে খুলে গেল।
মানুষের কোলাহল। গাড়ির হর্ন। দোকানিদের হাঁকডাক। পথচারীদের ব্যস্ত চলাচল। ছোটো ছোটো দোকান, বাজারের ভিড়, রাস্তার দুপাশে নানা পণ্যের সমারোহ, সব মিলিয়ে নাবলুস যেন এক জীবন্ত শহর, যে শহর প্রতিদিনের জীবনকে তার নিজস্ব ছন্দে বয়ে নিয়ে চলছে।
এখানে এসে খুব কাছ থেকে দেখলাম ওয়েস্ট ব্যাংকের এই এলাকার মানুষের জীবন। বাইরে থেকে যাদের জীবনকে আমরা কেবল সংবাদ, ছবি কিংবা রাজনৈতিক প্রতিবেদনের মধ্য দিয়ে দেখি, তাদের খুব স্বাভাবিক দৈনন্দিন জীবন যেন সেদিন আমার চোখের সামনে খুলে গেল।
অদ্ভুতভাবে লক্ষ করলাম, এত দুঃখ, এত বেদনা, এত অনিশ্চয়তার ইতিহাস বুকে নিয়ে চলা এইসব মানুষের মুখে আমি কোনও গভীর হতাশা কিংবা দুশ্চিন্তার ছাপ খুঁজে পেলাম না। মানুষ স্বাভাবিকভাবেই হাঁটছে। কেউ বন্ধুর সঙ্গে দাঁড়িয়ে গল্প করছে। কেউ দোকানে কেনাকাটা করছে। কেউ ব্যস্ত হয়ে নিজের কাজে ছুটছে।
আমাদের মতো অপরিচিত, ভিনদেশি মানুষকে দেখেও অনেকের মুখে ফুটে উঠল আন্তরিক হাসি। কেউ সালাম করলেন, কেউ মৃদু হেসে বললেন— ‘আহলান সাহলান।’
‘মারহাবা।’
মনে হলো এই কয়েকটি শব্দের মধ্যে যেন কতটা আপন করে নেওয়ার উষ্ণতা!
রাস্তার পাশে মহিলারা সন্তানদের নিয়ে হাঁটছেন। কোথাও মায়েরা ছোট্ট শিশুর হাত ধরে এগিয়ে যাচ্ছেন। কোথাও বৃদ্ধরা বসে গল্প করছেন। কারও হাতে চায়ের কাপ, কারও মুখে হাসি। শিশুরা নিজেদের মতো ছুটে বেড়াচ্ছে। দোকানিরা ক্রেতাদের ডাকছেন। গাড়ির হর্ন, মানুষের কণ্ঠস্বর, বাজারের ব্যস্ততা, সব মিলিয়ে এক অনিন্দ্য, প্রাণময় পরিবেশ।
মনে হলো, জীবনের ওপর যত চাপই থাকুক, মানুষ এখানে জীবনকে থামতে দেয়নি। দুঃখ আছে, কিন্তু তার পাশে হাসিও আছে। কষ্ট আছে, কিন্তু তার পাশেই আছে স্বাভাবিক জীবন। ইতিহাসের ভার আছে, কিন্তু মানুষ তার মধ্যেও প্রতিদিনের সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা তৈরি করে নিচ্ছে।
নাবলুসের এই দৃশ্য আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। কিন্তু এই সবকিছুর মাঝেও আমার মন যেন অন্য কোথাও ঘুরে বেড়াচ্ছিল। আমি আমার মাথা থেকে কোনওভাবেই ফাদওয়া তুকানকে সরাতে পারছিলাম না।
শহরের যে রাস্তা দিয়ে হাঁটছি, মনে হচ্ছিল, হয়তো কোনও একদিন এই পথ দিয়েই ফাদওয়া হেঁটেছেন। যে বাজারের ভিড় দেখছি, হয়তো তাঁরও কোনওদিন এই ভিড়ের মধ্য দিয়ে যাওয়া হয়েছে। যে পাহাড়গুলো শহরটিকে ঘিরে রেখেছে, সেই পাহাড়ের দিকে তাকিয়েই হয়তো কোনও এক বিকেলে তিনি কবিতার কোনও পঙ্ক্তি ভেবেছেন।
কোনও একটি পুরোনো বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মনে হচ্ছিল, হয়তো এমন কোনও জানালার পাশে বসেই তিনি লিখেছেন। কোনও পথচারী নারীকে দেখে মনে হচ্ছিল, এই শহরের নারীদের জীবন, তাদের হাসি-কান্না, তাদের স্বপ্ন ও বেদনার কতটুকু তিনি তাঁর কবিতায় ধারণ করেছিলেন!
নাবলুস তখন আমার কাছে আর শুধু একটি ঐতিহাসিক শহর মনে হলো না। এটি আমার কাছে হয়ে উঠল কবি ফাদওয়া তুকানের শহর। কবি ও কবিতার জনপদ।
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আমি আমার অনূদিত তাঁর আরেকটি কবিতার কিছু পঙ্ক্তি মনে মনে পড়ি।
কবিতাটির নাম, আমার জীবন—
‘আমার জীবন, আমার এই সম্পূর্ণ বিষাদময় জীবন,
যদি আগামীকাল তার ছায়াটুকুও হারিয়ে যায়,
তবু পৃথিবীর বুকে রয়ে যাবে এক প্রতিধ্বনি—
আমার কণ্ঠ বার বার বলে যাবে,
আমার জীবন অশ্রু,
আর এক স্নেহময় হৃদয়,
এক আকুল আকাঙ্ক্ষা,
একখানি কবিতার বই আর একটি বীণা।
আমার নিঃসঙ্গ হৃদয়ের
তালের সঙ্গে মিলিয়ে বীণার তারে আঙুল চালাই,
স্পন্দিত তারের সুরে গলে যায় আমার দুঃখ।
সুর আর কবিতাকে সঙ্গী করে
আমি লড়াই করি
এক যন্ত্রণাময় জীবনের বেদনার সঙ্গে।’
শহরের অলিগলি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, তিনি হয়তো এই পথেই কোনওদিন হেঁটেছেন। এই আকাশের নিচেই দাঁড়িয়েছেন। এই পাহাড়ের দিকে তাকিয়েছেন। এই শহরের মানুষের হাসি, কান্না, ব্যস্ততা, সংগ্রাম, সবকিছুই হয়তো কোনও না কোনওভাবে তাঁর কবিতার ভেতর জায়গা করে নিয়েছে।
নাবলুসের পুরোনো শহরের সরু গলিপথ, প্রাচীন পাথরের দেয়াল, পুরোনো বাজার আর মানুষের প্রতিদিনের ব্যস্ততা, সবকিছুর মধ্যেই যেন অতীত ও বর্তমান পাশাপাশি হাঁটে। কোথাও শত বছরের পুরোনো স্থাপত্য, কোথাও আধুনিক দোকান, কোথাও ইতিহাসের নিঃশব্দ ছাপ, আবার তার পাশেই মানুষের প্রাণচঞ্চল জীবন।
এই শহরকে দেখে আমার মনে হলো, ইতিহাস শুধু জাদুঘরে বন্দি হয়ে থাকে না। ইতিহাস মানুষের হাঁটাচলায়, বাজারের কোলাহলে, পুরোনো দেয়ালের ছায়ায় এবং একটি শহরের মানুষের প্রতিদিনের জীবনেও বেঁচে থাকে।
আর সেই ইতিহাসের মধ্যেই একজন কবি কখনও কখনও অদৃশ্যভাবে হেঁটে বেড়ান।
নাবলুসের পুরোনো শহরের একটি রেস্টুরেন্টে বসে দুপুরের খাবার খেতে খেতে কয়েকজন মধ্যবয়েসি মানুষের সঙ্গে আলাপ হলো। কথায় কথায় তাঁদের জীবনযাপন, শহরের পরিবর্তন, অতীতের স্মৃতি, শোষণ, শাসন, নির্যাতন, সবকিছুই উঠে আসছিল। ঘুরেফিরে একসময়ে কথার বিষয় হয়ে উঠলেন ফাদওয়া তুকান।
ফাদওয়ার নাম উচ্চারিত হতেই তাঁদের কণ্ঠে যেন অন্যরকম আবেগ নেমে এলো।
তাঁরা বললেন— কবি ফাদওয়া দেখেছেন তাঁর প্রিয় নাবলুস দখলদারিত্বের কঠিন বাস্তবতার মধ্যে পড়ে যেতে। দেখেছেন তাঁদের বাগানের প্রিয় কমলাগাছগুলো ধ্বংস হয়ে যেতে। দেখেছেন মূল্যবান জলপাইগাছ কেটে ফেলা হচ্ছে, যে জলপাইগাছ শুধু একটি গাছ নয়, এই মাটির মানুষের জীবন, স্মৃতি ও অস্তিত্বেরই অংশ।
কিন্তু প্রতিটি আঘাত তাঁকে ভেঙে দেয়নি।
প্রতিটি বেদনার ঢেউ পেরিয়ে তিনি যেন আরও দৃঢ় হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর কলম থামেনি। তিনি লিখেছেন— বার বার লিখে গেছেন। লিখেছেন তাঁর মানুষের দুঃখের কথা, বঞ্চনার কথা, হারিয়ে যাওয়া ঘরবাড়ির কথা, ধ্বংস হয়ে যাওয়া স্বপ্নের কথা। তাঁর কবিতার মধ্য দিয়ে নাবলুসের বেদনা, ফিলিস্তিনের মানুষের কান্না পৌঁছে গেছে বিশ্বের মানুষের কাছে।
লোকগুলোর কথায় মনে হচ্ছিল, ফাদওয়া শুধু কবিতা লেখেননি, তিনি তাঁর কবিতার মধ্যে একটি জাতির স্মৃতি বহন করেছেন।
তারা বললেন—
এমনকী জীবনের শেষপর্বে অসুস্থতার কারণে যখন তাঁর দৃষ্টিশক্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, তখনও তিনি পড়া ও লেখা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি। চোখের আলো কমে এসেছিল, কিন্তু তাঁর ভেতরের আলো নিভে যায়নি।
কলমের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক যেন ছিল শ্বাস নেওয়ার মতোই স্বাভাবিক।
আর এভাবেই এক দীর্ঘ জীবন পেরিয়ে ২০০৩ সালের ১২ ডিসেম্বর ছিয়াশি বছর বয়েসে কিংবদন্তি কবি ফাদওয়া তুকান নাবলুসে মৃত্যুবরণ করেন। যে ঘরে তাঁর জীবনের একসময়ে প্রায় বন্দিজীবনের মতো কেটেছিল, শেষপর্যন্ত সেই স্থান থেকেই তিনি বেরিয়ে গেলেন, তবে এবার কোনও বন্দি হিসেবে নয়। এবার তাঁর বিদায় ছিল ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও মানুষের আবেগে ঘেরা।
তারা বললেন—
যে নারী একসময়ে নিজের জীবনের দেয়ালের মধ্যে বন্দি ছিলেন, তিনিই পরবর্তীকালে তাঁর কবিতার শক্তিতে সেই দেয়াল অতিক্রম করে হয়ে উঠেছিলেন অসংখ্য মানুষের কণ্ঠস্বর।
তাঁর প্রতিবাদ ছিল কলমে, তাঁর প্রতিরোধ ছিল কবিতায়, আর তাঁর অস্ত্র ছিল শব্দ। প্রতিবাদ ও নিরন্তর সৃষ্টিশীলতার মধ্য দিয়েই ফাদওয়া তুকান হয়ে উঠেছিলেন ফিলিস্তিনি কবিতার এক অনন্য প্রতীক, অনেকের কাছে ‘ফিলিস্তিনের জননী’।
‘তাঁর শেষযাত্রায় আমরাও ছিলাম’— কথাটি বলতে বলতে একজন বৃদ্ধ চোখ মুছলেন। মুহূর্তের জন্য যেন রেস্টুরেন্টের কোলাহল থেমে গেল। তাঁর চোখের জলে শুধু একজন কবির মৃত্যুর স্মৃতি নয়, মিশে ছিল নাবলুসের এক দীর্ঘ ইতিহাস, ভালোবাসা আর বেদনা।
ফাদওয়া তুকান জন্মেছিলেন ১৯১৭ সালে নাবলুসে। তিনি ছিলেন ফিলিস্তিনি ও আরবি সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি। তাঁর কবিতায় ব্যক্তিগত বেদনা যেমন এসেছে, তেমনই এসেছে নারীজীবনের অভিজ্ঞতা, নিঃসঙ্গতা, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং পরবর্তীকালে ফিলিস্তিনি জাতির ইতিহাস ও সংগ্রাম।
শৈশবে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বেশিদিন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু এখানেই তাঁর জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন তাঁর বড়ো ভাই ইব্রাহিম তুকান।
ইব্রাহিম শুধু তাঁর ভাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন তাঁর শিক্ষক, সাহিত্যগুরু এবং কবিতার পথে প্রথম বড়ো অনুপ্রেরণা। তিনি ফাদওয়াকে কবিতা পড়াতেন, সাহিত্যচর্চায় উৎসাহ দিতেন, বই পড়তে দিতেন এবং তাঁর লেখার প্রতিভাকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ঘরের ভেতরেই যেন ফাদওয়ার জন্য খুলে গিয়েছিল সাহিত্যের এক নতুন পৃথিবী।
এই ভাই-বোনের সম্পর্কটি ফিলিস্তিনি সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। কারণ ইব্রাহিম তুকান নিজেও ছিলেন ফিলিস্তিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি।
ইব্রাহিম তুকান জন্মেছিলেন ১৯০৫ সালে নাবলুসে। জেরুজালেম ও বৈরুতে পড়াশোনা করেন এবং পরবর্তীকালে শিক্ষকতা ও সাহিত্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আরবি সাহিত্য ও কবিতায় তাঁর ছিল গভীর দখল। তাঁর কবিতার সবচেয়ে পরিচিত নামগুলোর একটি ‘মাওতিনি’ যার অর্থ ‘আমার জন্মভূমি’।
১৯৩৪ সালে লেখা এই কবিতাটি পরবর্তীকালে ফিলিস্তিনি ও আরব বিশ্বের মানুষের কাছে গভীর দেশপ্রেমের প্রতীক হয়ে ওঠে। কবিতাটি সুরারোপের পর আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
‘মাওতিনি’-র বাংলায় ভাবানুবাদটি এমন—
‘আমার জন্মভূমি, আমার জন্মভূমি,
তোমার ভালোবাসাই আমার হৃদয়ের ঠিকানা,
তোমার মাটি, তোমার আকাশ,
তোমার নামেই জেগে থাকে আমার প্রাণ।’
একজন ভাই তাঁর কবিতায় জন্মভূমির প্রতি ভালোবাসার কথা লিখছেন, আর তাঁরই ছোটো বোন পরবর্তীকালে সেই জন্মভূমির মাটি, মানুষ ও ইতিহাসকে নিজের কবিতার গভীরে ধারণ করছেন, এই সম্পর্কটি ভাবলেই বিস্ময় জাগে।
ইব্রাহিম তুকান দীর্ঘদিন শারীরিক অসুস্থতায় ভুগেছিলেন। ১৯৪১ সালে অসুস্থতা গুরুতর হলে তাঁকে জেরুজালেমে নেওয়া হয়। ২ মে ১৯৪১ সালে জেরুজালেমে তাঁর মৃত্যু হয়। পরে তাঁকে তাঁর জন্মশহর নাবলুসে সমাহিত করা হয়।
অন্যদিকে ফাদওয়া তুকান দীর্ঘ জীবন কাটিয়ে ২০০৩ সালের ১২ ডিসেম্বর নাবলুসেই মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকেও সমাহিত করা হয় এই শহরের মাটিতে।
একই শহর, একই মাটি। দুই কবি। এক ভাই, এক বোন। একজনের কবিতা আরব-বিশ্বের মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে, অন্যজন তাঁর কবিতায় ফিলিস্তিনি নারীর অভিজ্ঞতা, মাতৃভূমির বেদনা ও মানুষের অদম্য আকাঙ্ক্ষাকে বিশ্বসাহিত্যের সামনে তুলে ধরেছেন।
ফাদওয়া তুকানের কবিতায় বার বার ফিরে এসেছে মাটি। নিজের দেশের মাটি। সেই মাটির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল কেবল একজন নাগরিকের সম্পর্ক নয়, এ যেন একজন কবির অস্তিত্বের সঙ্গে তাঁর জন্মভূমির সম্পর্ক।
তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘ঊহড়ঁময ভড়ৎ গব’-তে তিনি মৃত্যুর পরও নিজের দেশের মাটিতে মিশে থাকার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল— নিজের দেশেই যেন তাঁর মৃত্যু হয়, সেই মাটিতেই যেন তাঁর কবর হয়, তারপর তিনি যেন সেই মাটির সঙ্গে মিশে গিয়ে ঘাস হয়ে জন্ম নেন, ফুল হয়ে ফুটে ওঠেন, আর সেই ফুল যেন তুলে নেয় তাঁর দেশের কোনও শিশু।
কবিতাটির একটি সংক্ষিপ্ত ভাবানুবাদ করলে এরকম হয়—
‘আমার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট
আমি যেন আমার দেশের মাটিতেই মৃত্যুবরণ করি,
সেই মাটিতেই যেন আমাকে কবর দেওয়া হয়।
তার মাটির নিচে মিশে যাই, বিলীন হয়ে যাই,
আর একদিন সেই মাটিতেই
ঘাস হয়ে, ফুল হয়ে ফিরে আসি—
আমার দেশের কোনও শিশুর হাতে।’
এই কবিতার পঙ্ক্তিগুলোই তাঁর সমাধিফলকে খোদাই করা আছে, যেন মৃত্যুর পরও তাঁর শেষ ইচ্ছাটি তাঁর জন্মভূমির মাটির সঙ্গে কথা বলে যাচ্ছে।
নাবলুসে সেদিন ঘুরতে ঘুরতে খুব ইচ্ছে হয়েছিল ফাদওয়া তুকানের সমাধিতে যাব। সঙ্গে করে নিয়ে যাব কয়েকটি সফেদ ফুলের পাপড়ি। একজন দূরদেশের বাঙালি কবির পক্ষ থেকে একজন ফিলিস্তিনি কবিকে ভালোবাসার অর্ঘ্য দেবো।
কিন্তু ভ্রমণের সময় ছিল সীমিত। নাবলুসে আমাদের আরও কিছু জায়গা দেখার ছিল। নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সময়ের হিসাবও ছিল। সন্ধ্যার আগেই আবার জেরুজালেমে ফিরতে হবে। ফলে শেষ পর্যন্ত ফাদওয়া তুকানের সমাধির কাছে গিয়ে সেই ফুলের পাপড়ি রেখে আসা সম্ভব হলো না। একটু খারাপ লেগেছিল।
মনে হলো, এত দূর এসে যাঁর শহরে পৌঁছেছি, যাঁর কবিতা এত বছর আগে পড়েছিলাম, যাঁর নাম হঠাৎ এই শহরের পথে আমার স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলল, তাঁর সমাধিতে গিয়ে অন্তত কয়েকটি ফুলও রেখে যেতে পারলাম না! কিন্তু পরে মনে হলো, কবির প্রতি ভালোবাসা তো শুধু ফুলে প্রকাশ পায় না। কখনও একটি কবিতা ফুল হয়ে ওঠে। কখনও একটি স্মৃতি শ্রদ্ধার্ঘ্য হয়ে থাকে। কখনও দূরদেশের কোনও এক পাঠকের হৃদয়ে বেঁচে থাকাই একজন কবির জন্য সবচেয়ে বড়ো ফুল।
নাবলুস থেকে ফিরে আসার সময়ে বার বার মনে পড়ছিল সেই কবিতার কথা—
'Had the Tree really fallen?
Never!'
না, বৃক্ষটি সত্যিই পড়ে যায়নি।
আর সেই সঙ্গে মনে হচ্ছিল—
'the
birds shall return.'
পাখিরা ফিরে আসবে।
হয়তো এটাই ফাদওয়া তুকানের কবিতার সবচেয়ে বড়ো শক্তি, তিনি ধ্বংস দেখেও শেষ কথা হিসেবে ধ্বংসকে মেনে নেননি। তাঁর কবিতায় ছিল ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা, মাটির সঙ্গে সম্পর্ক, মানুষের প্রতি বিশ্বাস এবং ভবিষ্যতের প্রতি এক গভীর আশাবাদ।
আজ নাবলুসের সেই পথের কথা মনে হলে মনে হয়, সেদিনের যাত্রাটি হয়তো কেবল একটি শহর ভ্রমণ ছিল না। আমি জানতাম না ফাদওয়া তুকান আমার জন্য সেখানে অপেক্ষা করছেন, কোনও মানুষের মতো নয়, কোনও দরজা খুলে নয়, বরং তাঁর কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি হয়ে।
আমি তাঁর সমাধিতে ফুল রেখে আসতে পারিনি, কিন্তু আমার মনের ভেতর জমে থাকা ভালোবাসাটুকুই হয়তো একদিন সাদা ফুলের পাপড়ি হয়ে আকাশে উড়ে গিয়ে নাবলুসের পাহাড় পেরিয়ে, তাঁর সমাধির ওপর গিয়ে পড়বে।
ফেরার সময় ট্যাক্সির জানালা দিয়ে নাবলুসের পাহাড়গুলো ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাচ্ছিল। সন্ধ্যার আলো ফিকে হয়ে আসছিল। আমি চুপ করে বসে রইলাম। মনে হচ্ছিল, আজ আমি শুধু একটি শহর দেখে ফিরছি না। সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছি একজন কবির স্মৃতি, তাঁর নিঃসঙ্গতা, তাঁর সংগ্রাম, তাঁর ভালোবাসা আর তাঁর মাটির প্রতি গভীর টান। তাই ফেরার পথে মনে মনে কবিকে বললাম—
আমার সকল ভালোবাসা ভরে
সফেদ রঙের খামে,
সুনীল আকাশে উড়িয়ে দিলাম—
ফাদওয়া, তোমার নামে।

আপনার মতামত লিখুন