সংবাদ

ছোটগল্প

মায়া


সৈয়দ নূরুল আলম
সৈয়দ নূরুল আলম
প্রকাশ: ১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪৩ এএম

মায়া
শিল্পী : সঞ্জয় দে রিপন


মতিন সাহেবের বয়স সত্তরের ওপরে। লাঠি ছাড়া চলাফেরা করতে পারেন না। দুই ছেলে, এক মেয়ে। ছেলেমেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। যার যার সংসার নিয়ে আলাদা থাকে। এখন বাসায় দু’জন মানুষ, বুড়ো আর বুড়ি। নিচ তলার দুটো রুম ভাড়া আর পেনশনের সামান্য কিছু টাকা এই দিয়ে মতিন সাহেবের সংসার কোনো রকম চলে। ভাগ্যিস বাড়িটা নিজের। চাকরি করে দুই কাঠার জমির ওপর এই সামান্য সম্পত্তিটুকু করেছিল, শেষ জীবনে কাজে লাগছে। শেষ পর্যন্ত বাড়িটা থাকলে হয়। বড় ছেলে মাঝেমধ্যে এসে বলে, ‘বাবা, এই ভাঙাচোরা বাড়িতে আর কত? এবার মত দাও, ডেভেলপারকে দিয়ে দিই, ছয়তলা একটা আধুনিক ফ্ল্যাট বানাক। আমারা তিনটে পাবো, দুই ভাই আর তোমাদের দিব্যি চলে যাবে।’

মতিন সাহেব মুখে কিছু বলেন না। ভেতরে ভেতরে রাগে গজগজ করতে থাকেন।

ছোট ছেলে, মা হাসনা বেগমের উপর সেই যে রাগ করে গেছে, আর এমুখো হয় না।

হাসনা বেগম বলেছিলেন, ‘ভালো চাকরি করিস, এ সংসারে তো কিছু খরচাপাতি দিতে পারিস। আগে একা ছিলি, এখন বিয়ে করেছিস, আল্লায় একটা সন্তানও দিয়েছে। এখন সংসার বড় হয়েছে, তোর বাবার পক্ষে কি সম্ভব, সংসারের ঘানি টানা?’

ছোট ছেলে রুবেলের সোজাসাপটা জবাব, ‘বাবার সংসারে খরচ দিয়ে এই শেওলা ওঠা ভাঙাচোরা রাড়িতে থাকব ক্যান? গুলশানে আমার অফিসের  কাছে বাসা ভাড়া করে চলে যাব। মিরপুর থেকে অফিসে যাওয়া আসার হাঙ্গামা করতে হবে না।’ যে কথা, সেই কাজ। চলে গেছে বাসা ছেড়ে।

বয়স হলে যা হয়, মতিন সাহেবের এটা-সেটা অসুখ লেগেই থাকে। একদিন ঘুম থেকে উঠে বলে, আলোর মা, বাথরুম করার সময় পেটের বাম পাশে চিনচিন করে প্রায়ই ব্যথা করে। তোমাকে বলিনি,  ভেবেছিলাম এমনি এমনি সেরে যাবে কিন্তু যাচ্ছে না।’

আলো মতিন সাহেবের মেয়ে। বড় সন্তান। থাকে কানাডা। বিয়ের পর স্বামীর সাথে পাড়ি দিয়েছে বিদেশে। দূরে থাকলেও মতিন সাহেব বউকে আলোর মা বলেই ডাকে। বিয়ের পর যতদিন আলো হয়নি, ততদিন এই-এই বলে ডেকেছে, কখনও নাম ধরে ডাকেনি।

হাসনা বেগম প্রথম প্রথম মুচকি হেসে বলেছে, ‘আপনি এই এই কি বলেন, আমার একটা নাম আছে না?’

মতিন সাহেব একই ভাবে হেসে বলছে, ‘আমাদের মেয়ের আগাম একটা নাম, যেমন ধরো, আলো, রেখে নিই। আর সবার অগোচরে তোমাকে আলোর মা বলে ডাকব।’ পরবর্তীতে ওদের ঠিকই মেয়ে হয় এবং নাম রাখে আলো।

‘কতদিন থেকে ব্যথা, আমাকে বলেননি কেন, ব্যথা কি জিইয়ে রাখতে হয়?  কালই আপনাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব।’

ছেলেমেয়েদের ওপর মতিন সাহেব অখুশি না। কতদিন আর মায়ার বাঁধনে বেঁধে রাখা যায়? সবাই চায় স্বাধীনতা ভোগ করতে, একটু প্রাইভেসি জীবন। বড় ছেলে অফিস থেকে মতিঝিল সরকারি কোয়ার্টার পেয়েছে, সেই বাসায় যেয়ে উঠেছে। যাওয়ার পেছনে যুক্তি ছিল, মতিন সাহেব না করতে পারেননি। তখন মা নীরবে কেঁদেছে, অন্য কেউ না বুঝলেও মতিন সাহেব ঠিকই বুঝতে পেরেছেন। বড় ছেলের প্রতি মায়ের মমতা সব সময় একটু বেশি থাকে।

ছোট ছেলের সময় বুবলিটা খুব কান্নাকাটি করেছে, দাদা দাদিকে ছেড়ে কিছুতেই যাবে না। কিন্তু একরোখা ছেলেকে কে বোঝাবে? বরাবরই ও একটু এরকম।

মেয়েটা কানাডা চলে যাওয়ার সময় অবশ্য বাবা মা কেউ মন খাবার করেনি। বরং খুশি হয়েছে। তাছাড়া বিয়ের সময়ই ছেলেদের পক্ষ থেকে বলে রেখেছিল, মেয়েকে বিদেশে নিয়ে যাবে। তখন মতিন সাহেব বউকে ঠাট্টা করে বলেছিল— তোমারও বিদেশ যাওয়ার পথ খুলে গেল। মেয়ে যাওয়া মানে মেয়ের মার এক পা চলে যাওয়া, বাকি পা, সময়ের ব্যাপার।

মতিন সাহেবের কথা শুনে বউ বলেছিল, ‘আপনাকে ছাড়া আমি যাব?’

দুজনই অপেক্ষায় আছে,  অন্য সময় না হলেও, নিশ্চয় বাচ্চা হওয়ার সময় ওদের ডাক পড়বে।

কিন্তু যতই সময় যাচ্ছে, বউয়ের মুখে চিন্তার ছাপ— ৬ বছর হতে চলল, ওদের বাচ্চা হচ্ছে না কেন, না, ইচ্ছে করে নিচ্ছে না?

মতিন সাহেবকে প্রথমে মহল্লার একজন ডাক্তারকে দেখানো হয়, ডাক্তার শরিফুল সব শুনে একটা মলম লিখে দিয়ে বলেন, ‘এটা তিন দিন সকাল বিকেল  লাগাবেন। না কমলে একজন ওনকোলজিস্ট দেখাবেন, ব্যথা তো অনেক দিন হলো, চেক করানো ভালো।’

ওনকোলোজিস্টের কথা শুনে মতিন সাহেব ভয় পেয়ে যান। ডাক্তারের কাছে যেতে চান না। আজ না কাল, কাল না পরশু, এই বলে সময় পার করতে থাকেন। অবশেষে বউ প্রায় জোর করে পপুলারে ডা. রবিন চন্দ্র দেবনাথ এর কাছে নিয়ে যান। তিনি সব দেখে বলেন, ‘তেমন কিছু মনে হচ্ছে না। সব ঠিক আছে তবু বয়স হয়েছে তো একটা কোলনোসকপি পরীক্ষা করায় নিয়া ভালো।’ ডাক্তার বললে তো না করায়ে পারা যায় না। হাসনা বেগম দেরি না করে পরের দিন টেষ্ট করায়ে রিপোর্ট দেখাতে এসেছেন। দুজন পেসেন্টের পরেই ওদের ডাক পড়ে। ডাক্টার নেড়েচেড়ে রিপোর্ট দেখে বলেন, না। সব ঠিক আছে। দুটো ওষুধ দিখে দিলাম। একটা খাওয়ার এবং একটা মলম ওখানে লাগানোর।’

একটু থেমে, প্যাডটা কলমটা যত্ন করে টেবিলের এক পাশে সরিয়ে রাখতে রাখতে ডাক্টর বলেন, ‘মতিন সাহেব আপনি একটু বাইরে বসেন, আমি ওনার সাথে একটু কথা বলি।’ এটুকু শুনেই মতিন সাহেব যা বোঝার বুঝে যান।  ধরে নেন তার কোলন ক্যান্সার হয়েছে। আর এ কথা মতিন সাহেবের সামনে বলতে পারেননি, তাই তাকে বাইরে পাঠিয়ে হাসনা বেগমকে বলছেন।

বাইরে বেঞ্চে বসে মতিন সাহেব ঘামতে থাকেন। পাঁচ মিনিট, দশ মিনিট, পনের মিনিট, হাসনা বেগম চেম্বার থেকে বের হন না। মতিন সাহেবের পানির পিপাসা পায়, সাথে করে পানির বোতল এনেছিল, সেটা হাসনা বেগমের ব্যাগে। মতিন সাহেবের সারা শরীর দিয়ে দরদর করে ঘাম বের হতে থাকে। পাক্কা ত্রিশ মিনিট পরে হাসনা বেগম ডাক্তারের চেম্বার থেকে বের হয়ে আসে।

‘পানির বোতলটা দাও। পানি খাব।’ মতিন সাহেব তার হাতটা বউয়ের দিকে বাড়িয়ে দেয়।

‘তুমি এত ঘামছো কেন? শরীর খারাপ লাগছে? পেসার মাপাবা, ডাক্তারকে বলব?’

‘না। চলো। বাইরে গেলে ঠিক হয়ে যাবে।’

মতিন সাহেব ওষুধ ঠিকমত খান না। কখনও খান। কখনও হাসনা বেগমের অগোচরে ফেলে দেন। ভাবেন, ওষুধ খেয়ে কী হবে।  একমাস, দুমাস, বেশিজোড় ছ’মাস। এ রোগে মানুষ এর চেয়ে বেশিদিন বাঁচে?

ডাক্তার নিশ্চয় হাসনা বেগমকে সবটা খুলে বলেছেন কিন্তু বউতো মুখই খুলছে না। ও বিষয়ে কোনো কথাই বলতে নারাজ। বলবেই-বা কী করে! হাসনা বেগম স্বামীকে অনেক ভালোবাসে। এই বয়সেও পান থেকে চুন খসতে দেন না। সেই যে এবাড়িতে নতুন বউ হয়ে আসার পর থেকে কোনো দিন, কোনো বেলা স্বামীর আগে নিজে খায়নি, স্বামী দূরে গেলে, না খেয়ে স্বামীর জন্য অপেক্ষা করত। এই বয়সে, আজও সে নিয়ম ধরে রেখেছেন।

এত বড় একটা দুঃসংবাদ জানার পর, কীভাবে হাসনা বেগম নিজেকে শক্ত করে রেখেছে, ভাবতেই মতিন সাহেব অবাক হন, কষ্টও পান।

‘পান নেন। আপনি তো আগে মাঝেমধ্যে পান খেতেন। এখনও খেতে পারেন। পান খাওয়া দোষের না, দোষ পানের সাথে জর্দা খাওয়া।’ রাতে শোয়ার আগে, কথাগুলো বলতে বলতে এক খিলি পান হাসনা বেগম স্বামীর দিকে এগিয়ে দেন। মতিন সাহেবও  উপরে উপরে হাসিহাসি মুখ নিয়ে হাতটা বাড়িয়ে দেন কিন্তু মনে মনে বলেন, ‘হাসনা, তোমার এতএত ভালোবাসা-আদর যত্ন ছেড়ে ওপারে আমি কীভাবে থাকব?’

মতিন সাহেব ও হাসনা বেগম ফজরের নামাজ পড়ে বারান্দায় এসে বসেছেন। চারিদিক তখনও অন্ধকার।

হাসনা বেগম চেয়ারটা মতিন সাহেবের আরেকটু কাছে টেনে গা ঘেঁষে বসে বলেন, ‘আপনি জানতে চেয়েছিলেন না? ওই দিন আপনাকে বাইরে পাঠিয়ে ডাক্তার সাহেব আমাকে কী বললেন? হাসির কথা তাই আপনাকে বলিনি। আপনি বের হয়ে আসার পর উনি আমাকে বলেন— ‘প্রেমলতা, তুমি কেমন আছো?’ প্রেমলতা নামটা শুনে আমি কেঁপে ওঠি। এত এত বছর পরে, এই নামে আমাকে কেউ ডাকবে, ভাবতে পারা যায়? আমি তখন বরিশাল বিএম কলেজে সাইন্স নিয়ে ইন্টারমিডিয়েট পড়ি। নববর্ষে ক্লাসের বন্ধুরা আমাকে প্রেমলতা খেতাব দেয়। সেই থেকে কলেজে অনেকেই আমাকে ওই নামে ডাকতো। এদের মধ্যে যে আজকের ডাক্তার একজন ছিলেন তা কি আমি জানতাম? শুধু তাই না, তিনি মনে মনে আমাকে ভালোও বেসেছিলেন কিন্তু উনি হিন্দু এবং আমি মুসলমান, এই ভেবে সেদিন কথাটা আমাকে বলেননি। আজ বললেন। এ-ও বললেন, কথাটা বলে নাকি তিনি ভারমুক্ত হলেন।

হাসনা বেগম একটু থামেন, মুখে তার মৃদু হাসি, হেসে হেসে বলেন, ‘এটা কি আপনাকে বলার মতো কোনো বিষয় হলো?’

মতিন সাহেব কিছু না বলে হাসনা বেগমের একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে আঁকড়িয়ে ধরেন।

মৃত্যুর কথাটা মাথা থেকে চলে যায়। অযথা কত কি না ভেবেছেন।

চারিদিকে তখন আর অন্ধকার নেই। সকালের একটা নরম আলো ফুটে উঠেছে। 

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬


মায়া

প্রকাশের তারিখ : ০১ অক্টোবর ২০২৬

featured Image


মতিন সাহেবের বয়স সত্তরের ওপরে। লাঠি ছাড়া চলাফেরা করতে পারেন না। দুই ছেলে, এক মেয়ে। ছেলেমেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। যার যার সংসার নিয়ে আলাদা থাকে। এখন বাসায় দু’জন মানুষ, বুড়ো আর বুড়ি। নিচ তলার দুটো রুম ভাড়া আর পেনশনের সামান্য কিছু টাকা এই দিয়ে মতিন সাহেবের সংসার কোনো রকম চলে। ভাগ্যিস বাড়িটা নিজের। চাকরি করে দুই কাঠার জমির ওপর এই সামান্য সম্পত্তিটুকু করেছিল, শেষ জীবনে কাজে লাগছে। শেষ পর্যন্ত বাড়িটা থাকলে হয়। বড় ছেলে মাঝেমধ্যে এসে বলে, ‘বাবা, এই ভাঙাচোরা বাড়িতে আর কত? এবার মত দাও, ডেভেলপারকে দিয়ে দিই, ছয়তলা একটা আধুনিক ফ্ল্যাট বানাক। আমারা তিনটে পাবো, দুই ভাই আর তোমাদের দিব্যি চলে যাবে।’

মতিন সাহেব মুখে কিছু বলেন না। ভেতরে ভেতরে রাগে গজগজ করতে থাকেন।

ছোট ছেলে, মা হাসনা বেগমের উপর সেই যে রাগ করে গেছে, আর এমুখো হয় না।

হাসনা বেগম বলেছিলেন, ‘ভালো চাকরি করিস, এ সংসারে তো কিছু খরচাপাতি দিতে পারিস। আগে একা ছিলি, এখন বিয়ে করেছিস, আল্লায় একটা সন্তানও দিয়েছে। এখন সংসার বড় হয়েছে, তোর বাবার পক্ষে কি সম্ভব, সংসারের ঘানি টানা?’

ছোট ছেলে রুবেলের সোজাসাপটা জবাব, ‘বাবার সংসারে খরচ দিয়ে এই শেওলা ওঠা ভাঙাচোরা রাড়িতে থাকব ক্যান? গুলশানে আমার অফিসের  কাছে বাসা ভাড়া করে চলে যাব। মিরপুর থেকে অফিসে যাওয়া আসার হাঙ্গামা করতে হবে না।’ যে কথা, সেই কাজ। চলে গেছে বাসা ছেড়ে।

বয়স হলে যা হয়, মতিন সাহেবের এটা-সেটা অসুখ লেগেই থাকে। একদিন ঘুম থেকে উঠে বলে, আলোর মা, বাথরুম করার সময় পেটের বাম পাশে চিনচিন করে প্রায়ই ব্যথা করে। তোমাকে বলিনি,  ভেবেছিলাম এমনি এমনি সেরে যাবে কিন্তু যাচ্ছে না।’

আলো মতিন সাহেবের মেয়ে। বড় সন্তান। থাকে কানাডা। বিয়ের পর স্বামীর সাথে পাড়ি দিয়েছে বিদেশে। দূরে থাকলেও মতিন সাহেব বউকে আলোর মা বলেই ডাকে। বিয়ের পর যতদিন আলো হয়নি, ততদিন এই-এই বলে ডেকেছে, কখনও নাম ধরে ডাকেনি।

হাসনা বেগম প্রথম প্রথম মুচকি হেসে বলেছে, ‘আপনি এই এই কি বলেন, আমার একটা নাম আছে না?’

মতিন সাহেব একই ভাবে হেসে বলছে, ‘আমাদের মেয়ের আগাম একটা নাম, যেমন ধরো, আলো, রেখে নিই। আর সবার অগোচরে তোমাকে আলোর মা বলে ডাকব।’ পরবর্তীতে ওদের ঠিকই মেয়ে হয় এবং নাম রাখে আলো।

‘কতদিন থেকে ব্যথা, আমাকে বলেননি কেন, ব্যথা কি জিইয়ে রাখতে হয়?  কালই আপনাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব।’

ছেলেমেয়েদের ওপর মতিন সাহেব অখুশি না। কতদিন আর মায়ার বাঁধনে বেঁধে রাখা যায়? সবাই চায় স্বাধীনতা ভোগ করতে, একটু প্রাইভেসি জীবন। বড় ছেলে অফিস থেকে মতিঝিল সরকারি কোয়ার্টার পেয়েছে, সেই বাসায় যেয়ে উঠেছে। যাওয়ার পেছনে যুক্তি ছিল, মতিন সাহেব না করতে পারেননি। তখন মা নীরবে কেঁদেছে, অন্য কেউ না বুঝলেও মতিন সাহেব ঠিকই বুঝতে পেরেছেন। বড় ছেলের প্রতি মায়ের মমতা সব সময় একটু বেশি থাকে।

ছোট ছেলের সময় বুবলিটা খুব কান্নাকাটি করেছে, দাদা দাদিকে ছেড়ে কিছুতেই যাবে না। কিন্তু একরোখা ছেলেকে কে বোঝাবে? বরাবরই ও একটু এরকম।

মেয়েটা কানাডা চলে যাওয়ার সময় অবশ্য বাবা মা কেউ মন খাবার করেনি। বরং খুশি হয়েছে। তাছাড়া বিয়ের সময়ই ছেলেদের পক্ষ থেকে বলে রেখেছিল, মেয়েকে বিদেশে নিয়ে যাবে। তখন মতিন সাহেব বউকে ঠাট্টা করে বলেছিল— তোমারও বিদেশ যাওয়ার পথ খুলে গেল। মেয়ে যাওয়া মানে মেয়ের মার এক পা চলে যাওয়া, বাকি পা, সময়ের ব্যাপার।

মতিন সাহেবের কথা শুনে বউ বলেছিল, ‘আপনাকে ছাড়া আমি যাব?’

দুজনই অপেক্ষায় আছে,  অন্য সময় না হলেও, নিশ্চয় বাচ্চা হওয়ার সময় ওদের ডাক পড়বে।

কিন্তু যতই সময় যাচ্ছে, বউয়ের মুখে চিন্তার ছাপ— ৬ বছর হতে চলল, ওদের বাচ্চা হচ্ছে না কেন, না, ইচ্ছে করে নিচ্ছে না?

মতিন সাহেবকে প্রথমে মহল্লার একজন ডাক্তারকে দেখানো হয়, ডাক্তার শরিফুল সব শুনে একটা মলম লিখে দিয়ে বলেন, ‘এটা তিন দিন সকাল বিকেল  লাগাবেন। না কমলে একজন ওনকোলজিস্ট দেখাবেন, ব্যথা তো অনেক দিন হলো, চেক করানো ভালো।’

ওনকোলোজিস্টের কথা শুনে মতিন সাহেব ভয় পেয়ে যান। ডাক্তারের কাছে যেতে চান না। আজ না কাল, কাল না পরশু, এই বলে সময় পার করতে থাকেন। অবশেষে বউ প্রায় জোর করে পপুলারে ডা. রবিন চন্দ্র দেবনাথ এর কাছে নিয়ে যান। তিনি সব দেখে বলেন, ‘তেমন কিছু মনে হচ্ছে না। সব ঠিক আছে তবু বয়স হয়েছে তো একটা কোলনোসকপি পরীক্ষা করায় নিয়া ভালো।’ ডাক্তার বললে তো না করায়ে পারা যায় না। হাসনা বেগম দেরি না করে পরের দিন টেষ্ট করায়ে রিপোর্ট দেখাতে এসেছেন। দুজন পেসেন্টের পরেই ওদের ডাক পড়ে। ডাক্টার নেড়েচেড়ে রিপোর্ট দেখে বলেন, না। সব ঠিক আছে। দুটো ওষুধ দিখে দিলাম। একটা খাওয়ার এবং একটা মলম ওখানে লাগানোর।’

একটু থেমে, প্যাডটা কলমটা যত্ন করে টেবিলের এক পাশে সরিয়ে রাখতে রাখতে ডাক্টর বলেন, ‘মতিন সাহেব আপনি একটু বাইরে বসেন, আমি ওনার সাথে একটু কথা বলি।’ এটুকু শুনেই মতিন সাহেব যা বোঝার বুঝে যান।  ধরে নেন তার কোলন ক্যান্সার হয়েছে। আর এ কথা মতিন সাহেবের সামনে বলতে পারেননি, তাই তাকে বাইরে পাঠিয়ে হাসনা বেগমকে বলছেন।

বাইরে বেঞ্চে বসে মতিন সাহেব ঘামতে থাকেন। পাঁচ মিনিট, দশ মিনিট, পনের মিনিট, হাসনা বেগম চেম্বার থেকে বের হন না। মতিন সাহেবের পানির পিপাসা পায়, সাথে করে পানির বোতল এনেছিল, সেটা হাসনা বেগমের ব্যাগে। মতিন সাহেবের সারা শরীর দিয়ে দরদর করে ঘাম বের হতে থাকে। পাক্কা ত্রিশ মিনিট পরে হাসনা বেগম ডাক্তারের চেম্বার থেকে বের হয়ে আসে।

‘পানির বোতলটা দাও। পানি খাব।’ মতিন সাহেব তার হাতটা বউয়ের দিকে বাড়িয়ে দেয়।

‘তুমি এত ঘামছো কেন? শরীর খারাপ লাগছে? পেসার মাপাবা, ডাক্তারকে বলব?’

‘না। চলো। বাইরে গেলে ঠিক হয়ে যাবে।’

মতিন সাহেব ওষুধ ঠিকমত খান না। কখনও খান। কখনও হাসনা বেগমের অগোচরে ফেলে দেন। ভাবেন, ওষুধ খেয়ে কী হবে।  একমাস, দুমাস, বেশিজোড় ছ’মাস। এ রোগে মানুষ এর চেয়ে বেশিদিন বাঁচে?

ডাক্তার নিশ্চয় হাসনা বেগমকে সবটা খুলে বলেছেন কিন্তু বউতো মুখই খুলছে না। ও বিষয়ে কোনো কথাই বলতে নারাজ। বলবেই-বা কী করে! হাসনা বেগম স্বামীকে অনেক ভালোবাসে। এই বয়সেও পান থেকে চুন খসতে দেন না। সেই যে এবাড়িতে নতুন বউ হয়ে আসার পর থেকে কোনো দিন, কোনো বেলা স্বামীর আগে নিজে খায়নি, স্বামী দূরে গেলে, না খেয়ে স্বামীর জন্য অপেক্ষা করত। এই বয়সে, আজও সে নিয়ম ধরে রেখেছেন।

এত বড় একটা দুঃসংবাদ জানার পর, কীভাবে হাসনা বেগম নিজেকে শক্ত করে রেখেছে, ভাবতেই মতিন সাহেব অবাক হন, কষ্টও পান।

‘পান নেন। আপনি তো আগে মাঝেমধ্যে পান খেতেন। এখনও খেতে পারেন। পান খাওয়া দোষের না, দোষ পানের সাথে জর্দা খাওয়া।’ রাতে শোয়ার আগে, কথাগুলো বলতে বলতে এক খিলি পান হাসনা বেগম স্বামীর দিকে এগিয়ে দেন। মতিন সাহেবও  উপরে উপরে হাসিহাসি মুখ নিয়ে হাতটা বাড়িয়ে দেন কিন্তু মনে মনে বলেন, ‘হাসনা, তোমার এতএত ভালোবাসা-আদর যত্ন ছেড়ে ওপারে আমি কীভাবে থাকব?’

মতিন সাহেব ও হাসনা বেগম ফজরের নামাজ পড়ে বারান্দায় এসে বসেছেন। চারিদিক তখনও অন্ধকার।

হাসনা বেগম চেয়ারটা মতিন সাহেবের আরেকটু কাছে টেনে গা ঘেঁষে বসে বলেন, ‘আপনি জানতে চেয়েছিলেন না? ওই দিন আপনাকে বাইরে পাঠিয়ে ডাক্তার সাহেব আমাকে কী বললেন? হাসির কথা তাই আপনাকে বলিনি। আপনি বের হয়ে আসার পর উনি আমাকে বলেন— ‘প্রেমলতা, তুমি কেমন আছো?’ প্রেমলতা নামটা শুনে আমি কেঁপে ওঠি। এত এত বছর পরে, এই নামে আমাকে কেউ ডাকবে, ভাবতে পারা যায়? আমি তখন বরিশাল বিএম কলেজে সাইন্স নিয়ে ইন্টারমিডিয়েট পড়ি। নববর্ষে ক্লাসের বন্ধুরা আমাকে প্রেমলতা খেতাব দেয়। সেই থেকে কলেজে অনেকেই আমাকে ওই নামে ডাকতো। এদের মধ্যে যে আজকের ডাক্তার একজন ছিলেন তা কি আমি জানতাম? শুধু তাই না, তিনি মনে মনে আমাকে ভালোও বেসেছিলেন কিন্তু উনি হিন্দু এবং আমি মুসলমান, এই ভেবে সেদিন কথাটা আমাকে বলেননি। আজ বললেন। এ-ও বললেন, কথাটা বলে নাকি তিনি ভারমুক্ত হলেন।

হাসনা বেগম একটু থামেন, মুখে তার মৃদু হাসি, হেসে হেসে বলেন, ‘এটা কি আপনাকে বলার মতো কোনো বিষয় হলো?’

মতিন সাহেব কিছু না বলে হাসনা বেগমের একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে আঁকড়িয়ে ধরেন।

মৃত্যুর কথাটা মাথা থেকে চলে যায়। অযথা কত কি না ভেবেছেন।

চারিদিকে তখন আর অন্ধকার নেই। সকালের একটা নরম আলো ফুটে উঠেছে। 


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত