সংবাদ

অপরাধ কমাতে সামাজিক উদ্যোগও জরুরি


সাঈদ চৌধুরী
সাঈদ চৌধুরী
প্রকাশ: ৩ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫৬ এএম

অপরাধ কমাতে সামাজিক উদ্যোগও জরুরি
কিশোর বয়সের অপরাধ বন্ধে শুধু আইন কি যথেষ্ট?

দিন দিন অপরাধের ধরন পাল্টাচ্ছে। শুধু তাই নয়, সামনে আসছে এমন কিছু অপরাধ, যা আগে কখনো দেখা যায়নি বা কল্পনাও করা যায়নি। শিশু হত্যা থেকে শুরু করে নারী নির্যাতন পর্যন্ত নানা ধরনের অপরাধের শিকার হচ্ছে মানুষ। এর পেছনে সামাজিকীকরণ ব্যবস্থার দুর্বলতাও কম দায়ী নয়।

মানুষের অস্থিরতা ও অপরাধের প্রবণতা অনেক ক্ষেত্রেই একই সরল রেখায় চলে। অস্থিরতা থেকে অপরাধ বাড়ার পেছনে বড় একটি কারণ হলো অসহিষ্ণু আচরণ। অনেকের মধ্যেই স্বস্তি বা ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার প্রবণতা কমে যাচ্ছে। ভালো কথা বললেও সামাজিকভাবে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে।

বিশেষ করে কিশোর বয়সে এ প্রবণতা বেশি দেখা যায়। এ সময়ে মস্তিষ্কের চাঞ্চল্য ও ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি থাকে। ফলে কেউ কেউ খারাপ কাজকেও একসময় অ্যাডভেঞ্চার হিসেবে দেখতে শুরু করে। কোনো বড় ধরনের ভুল বা দুর্ঘটনা ঘটানোর পরও তারা বিষয়টিকে গুরুতর বলে মনে নাও করতে পারে। এর ফলে সামাজিক অস্থিরতা বাড়ার পাশাপাশি আচরণগত ও নৈতিক ক্ষেত্রেও নেতিবাচক পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে।

সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধির আরেকটি কারণ হলো অপরাধসংক্রান্ত সংবাদ ও তথ্য কীভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে, সে বিষয়ে যথেষ্ট সতর্ক না থাকা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেকোনো ঘটনা দ্রুত প্রকাশের পর নানা ধরনের মন্তব্য আসতে থাকে। এসব মন্তব্যের মধ্যে এমন কিছু প্রতিক্রিয়াও থাকে, যা অপরাধের প্রতি আগ্রহ বা উৎসাহ তৈরি করতে পারে। কোনো কোনো ব্যক্তি সেখান থেকে অপরাধের ধরন বা কৌশল সম্পর্কে ধারণা নিয়ে তা নিজের জীবনে প্রয়োগের চেষ্টা করতে পারে।

অপরাধভিত্তিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানও এ ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। ‘সিআইডি’র মতো অনুষ্ঠানে অনেক সময় অপরাধ সংঘটনের বিভিন্ন কৌশল এবং অপরাধের পর নিজেকে আড়াল করার বিষয় দেখানো হয়। বিভিন্ন ধরনের গেমের মাধ্যমেও সহিংসতা বা ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের প্রতি কিশোরদের আগ্রহ তৈরি হতে পারে। তাই এসব বিষয় উপস্থাপনের ক্ষেত্রে নির্মাতা ও গণমাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।

কিশোর বয়সের অপরাধ বন্ধে শুধু আইন কি যথেষ্ট? প্রশ্নটি গভীরভাবে ভাবার বিষয়। কারণ একজন কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পর কোথায় আশ্রয় পায়, কারা তাকে প্রশ্রয় দেয়—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। যে ব্যক্তি তাকে আশ্রয় বা প্রশ্রয় দেয় এবং যে পরিবার সন্তানের প্রতি যথেষ্ট নজর রাখে না, উভয়েরই সামাজিক দায় রয়েছে। কিন্তু এই দায় অনেক সময় সমাজে দৃশ্যমান হয় না। এর ফলাফল ঠিকই সমাজকে ভোগ করতে হয়। নতুন নতুন অপরাধের ভারে সমাজে তৈরি হয় মানবিক সংকট। কখনো রাজনৈতিক পরিচয়ে, আবার কখনো গ্যাংয়ের সদস্য হিসেবে কিশোররা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই অপরাধ কমানো যাবে কীভাবে? এর জন্য সামাজিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন প্রয়োজন। যেসব বাবা-মা সন্তানের খোঁজখবর রাখেন না, তাদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। এ ক্ষেত্রে সামাজিক কাউন্সেলিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অভিভাবকদের নিয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক সভা বা কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। একসময় গণশিক্ষার কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছিল। তেমনি গণসচেতনতা বাড়ানো ছাড়া সামাজিক অপরাধের প্রবণতা কমানো কঠিন।

ধরা যাক, একটি পরিবারের একজন সন্তান মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। বাবা-মা বিষয়টি সম্পর্কে কোনো খোঁজ রাখছেন না। এমনকি সন্তান যে ধীরে ধীরে বিপথে যাচ্ছে, তার লক্ষণও তারা বুঝতে পারছেন না। এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন করতে সামাজিক উদ্যোগ প্রয়োজন। একটি এলাকার অভিভাবকেরা নিয়মিত একসঙ্গে বসতে পারেন। সেখানে সন্তানদের প্রতি তাদের দায়িত্ব, কিশোরদের আচরণগত পরিবর্তনের লক্ষণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে আলোচনা হতে পারে। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি এ ধরনের সামাজিক জাগরণ তৈরি করা গেলে মাদক ও কিশোর অপরাধ কমানোর পথ তৈরি হতে পারে। তবে এটি অবশ্যই একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। তারপরও উদ্যোগটি নেওয়া জরুরি।

যে বয়সে কিশোরদের জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও মননশীলতা দিয়ে সমাজ ও দেশের জন্য কাজ করার কথা, সেই বয়সে তাদের একটি অংশ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এটি আমাদের জন্য উদ্বেগের বিষয়। তাই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি অপরাধের ধরন ও কারণ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা, অপরাধবিষয়ক সংবাদ দায়িত্বশীলভাবে উপস্থাপন করা এবং সামাজিক কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা জরুরি।

এসব উদ্যোগ এখন রাষ্ট্রীয়ভাবেও গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। ভালো চিন্তা, মূল্যবোধ ও শিক্ষা কীভাবে মানুষের মধ্যে আরও কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়া যায়, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সমাজ—সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সরকার ও নীতিনির্ধারকেরা এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন—এটাই প্রত্যাশা।

(লেখকের নিজস্ব মত)

লেখক: রসায়নবিদ

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬


অপরাধ কমাতে সামাজিক উদ্যোগও জরুরি

প্রকাশের তারিখ : ০৩ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

দিন দিন অপরাধের ধরন পাল্টাচ্ছে। শুধু তাই নয়, সামনে আসছে এমন কিছু অপরাধ, যা আগে কখনো দেখা যায়নি বা কল্পনাও করা যায়নি। শিশু হত্যা থেকে শুরু করে নারী নির্যাতন পর্যন্ত নানা ধরনের অপরাধের শিকার হচ্ছে মানুষ। এর পেছনে সামাজিকীকরণ ব্যবস্থার দুর্বলতাও কম দায়ী নয়।

মানুষের অস্থিরতা ও অপরাধের প্রবণতা অনেক ক্ষেত্রেই একই সরল রেখায় চলে। অস্থিরতা থেকে অপরাধ বাড়ার পেছনে বড় একটি কারণ হলো অসহিষ্ণু আচরণ। অনেকের মধ্যেই স্বস্তি বা ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার প্রবণতা কমে যাচ্ছে। ভালো কথা বললেও সামাজিকভাবে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে।

বিশেষ করে কিশোর বয়সে এ প্রবণতা বেশি দেখা যায়। এ সময়ে মস্তিষ্কের চাঞ্চল্য ও ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি থাকে। ফলে কেউ কেউ খারাপ কাজকেও একসময় অ্যাডভেঞ্চার হিসেবে দেখতে শুরু করে। কোনো বড় ধরনের ভুল বা দুর্ঘটনা ঘটানোর পরও তারা বিষয়টিকে গুরুতর বলে মনে নাও করতে পারে। এর ফলে সামাজিক অস্থিরতা বাড়ার পাশাপাশি আচরণগত ও নৈতিক ক্ষেত্রেও নেতিবাচক পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে।

সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধির আরেকটি কারণ হলো অপরাধসংক্রান্ত সংবাদ ও তথ্য কীভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে, সে বিষয়ে যথেষ্ট সতর্ক না থাকা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেকোনো ঘটনা দ্রুত প্রকাশের পর নানা ধরনের মন্তব্য আসতে থাকে। এসব মন্তব্যের মধ্যে এমন কিছু প্রতিক্রিয়াও থাকে, যা অপরাধের প্রতি আগ্রহ বা উৎসাহ তৈরি করতে পারে। কোনো কোনো ব্যক্তি সেখান থেকে অপরাধের ধরন বা কৌশল সম্পর্কে ধারণা নিয়ে তা নিজের জীবনে প্রয়োগের চেষ্টা করতে পারে।

অপরাধভিত্তিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানও এ ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। ‘সিআইডি’র মতো অনুষ্ঠানে অনেক সময় অপরাধ সংঘটনের বিভিন্ন কৌশল এবং অপরাধের পর নিজেকে আড়াল করার বিষয় দেখানো হয়। বিভিন্ন ধরনের গেমের মাধ্যমেও সহিংসতা বা ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের প্রতি কিশোরদের আগ্রহ তৈরি হতে পারে। তাই এসব বিষয় উপস্থাপনের ক্ষেত্রে নির্মাতা ও গণমাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।

কিশোর বয়সের অপরাধ বন্ধে শুধু আইন কি যথেষ্ট? প্রশ্নটি গভীরভাবে ভাবার বিষয়। কারণ একজন কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পর কোথায় আশ্রয় পায়, কারা তাকে প্রশ্রয় দেয়—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। যে ব্যক্তি তাকে আশ্রয় বা প্রশ্রয় দেয় এবং যে পরিবার সন্তানের প্রতি যথেষ্ট নজর রাখে না, উভয়েরই সামাজিক দায় রয়েছে। কিন্তু এই দায় অনেক সময় সমাজে দৃশ্যমান হয় না। এর ফলাফল ঠিকই সমাজকে ভোগ করতে হয়। নতুন নতুন অপরাধের ভারে সমাজে তৈরি হয় মানবিক সংকট। কখনো রাজনৈতিক পরিচয়ে, আবার কখনো গ্যাংয়ের সদস্য হিসেবে কিশোররা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই অপরাধ কমানো যাবে কীভাবে? এর জন্য সামাজিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন প্রয়োজন। যেসব বাবা-মা সন্তানের খোঁজখবর রাখেন না, তাদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। এ ক্ষেত্রে সামাজিক কাউন্সেলিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অভিভাবকদের নিয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক সভা বা কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। একসময় গণশিক্ষার কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছিল। তেমনি গণসচেতনতা বাড়ানো ছাড়া সামাজিক অপরাধের প্রবণতা কমানো কঠিন।

ধরা যাক, একটি পরিবারের একজন সন্তান মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। বাবা-মা বিষয়টি সম্পর্কে কোনো খোঁজ রাখছেন না। এমনকি সন্তান যে ধীরে ধীরে বিপথে যাচ্ছে, তার লক্ষণও তারা বুঝতে পারছেন না। এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন করতে সামাজিক উদ্যোগ প্রয়োজন। একটি এলাকার অভিভাবকেরা নিয়মিত একসঙ্গে বসতে পারেন। সেখানে সন্তানদের প্রতি তাদের দায়িত্ব, কিশোরদের আচরণগত পরিবর্তনের লক্ষণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে আলোচনা হতে পারে। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি এ ধরনের সামাজিক জাগরণ তৈরি করা গেলে মাদক ও কিশোর অপরাধ কমানোর পথ তৈরি হতে পারে। তবে এটি অবশ্যই একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। তারপরও উদ্যোগটি নেওয়া জরুরি।

যে বয়সে কিশোরদের জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও মননশীলতা দিয়ে সমাজ ও দেশের জন্য কাজ করার কথা, সেই বয়সে তাদের একটি অংশ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এটি আমাদের জন্য উদ্বেগের বিষয়। তাই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি অপরাধের ধরন ও কারণ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা, অপরাধবিষয়ক সংবাদ দায়িত্বশীলভাবে উপস্থাপন করা এবং সামাজিক কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা জরুরি।

এসব উদ্যোগ এখন রাষ্ট্রীয়ভাবেও গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। ভালো চিন্তা, মূল্যবোধ ও শিক্ষা কীভাবে মানুষের মধ্যে আরও কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়া যায়, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সমাজ—সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সরকার ও নীতিনির্ধারকেরা এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন—এটাই প্রত্যাশা।

(লেখকের নিজস্ব মত)

লেখক: রসায়নবিদ


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত