ঢাকার কোনো ব্যস্ত ফুটপাতে দাঁড়ালে একই সঙ্গে দুটি ছবি দেখা যায়। একদিকে পথচারীর ভিড়, যানজট, ফুটপাত দিয়ে হাঁটার অসুবিধা। অন্যদিকে সারি সারি ছোট দোকান, ভ্যান, ঠেলাগাড়ি, চা-নাশতার দোকান, কাপড়, জুতা, ফল, খেলনা কিংবা নানা রকম পণ্যের পসরা। একজনের কাছে এটি চলাচলের পথ, আরেকজনের কাছে সেটিই তার দোকান, সংসারের আয় এবং বেঁচে থাকার অবলম্বন।
এই দুই বাস্তবতার মধ্যে দ্বন্দ্ব নতুন নয়। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ফুটপাতের সমস্যাটি শুধু নগর ব্যবস্থাপনার সমস্যা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান, গ্রাম থেকে শহরে মানুষের আসা, রাজনৈতিক প্রভাব, স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামো এবং চাঁদাবাজি।
আসল প্রশ্ন হলো, এই দুই বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় হবে কীভাবে? এখন এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বাংলাদেশে রাষ্ট্র, সরকার, রাজনৈতিক দল ও সমাজ—এই চারটির সম্পর্কও বুঝতে হয়।
আইনের দৃষ্টিতে ফুটপাত সাধারণ মানুষের চলাচলের জায়গা। সেখানে স্থায়ীভাবে দোকান বসানোর অধিকার কারও নেই। কিন্তু বাস্তব জীবনে ফুটপাত অনেক দিন ধরেই শহরের অর্থনীতির একটি অংশ।
কারণ, বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য ছোট ব্যবসা ও হকারি হচ্ছে জীবিকার পথ। দোকান ভাড়া নেওয়া, অগ্রিম টাকা দেওয়া, বিদ্যুৎ-পানি ও অন্যান্য খরচ বহন করা অনেকের পক্ষে সম্ভব নয়। ফুটপাত তাই তাদের কাছে সবচেয়ে সহজ প্রবেশের জায়গা।
পার্থক্য হলো, অনেক দেশে এই অর্থনীতিকে নিয়মের মধ্যে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। কোথায় দোকান বসবে, কতক্ষণ বসবে, কতটুকু জায়গা ব্যবহার করা যাবে—এসব নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে সেই ব্যবস্থাটি এখনো দুর্বল। ফলে ফুটপাত একই সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পত্তি এবং সমাজের বাস্তব অর্থনৈতিক পরিসর হয়ে আছে।
সমস্যাটা তখনই বড় হয়, যখন এর মধ্যে ঢুকে পড়ে রাজনীতি।হকারি নিজে অপরাধ নয়। ছোট ব্যবসা করাও অপরাধ নয়। কিন্তু যখন একজন হকারকে ফুটপাতে বসার জন্য স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা বা প্রভাবশালী ব্যক্তিকে নিয়মিত টাকা দিতে হয়, তখন বিষয়টি আর শুধু অর্থনীতির থাকে না। তখন তৈরি হয় একটি আলাদা ব্যবস্থা।কোথায় কে বসবে, কার কাছ থেকে কত টাকা নেওয়া হবে, কে কাকে ‘রক্ষা’ করবে—এসবের নিয়ন্ত্রণ চলে যেতে পারে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের হাতে।
‘পাতি নেতা’ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশের স্থানীয় সমাজের একটি বৈশিষ্ট্য হলো—অনেক বিরোধ বা প্রয়োজনের সমাধান আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের বাইরে স্থানীয় মানুষ ও নেতাদের মাধ্যমে হয়। বাড়িওয়ালা-ভাড়াটিয়া বিরোধ, বাজারের ব্যবসায়ীদের ঝামেলা, স্থানীয় প্রভাবশালীদের সঙ্গে বিরোধ—অনেক ক্ষেত্রেই কোনো না কোনো স্থানীয় নেতা বা মধ্যস্থতাকারী সেখানে উপস্থিত থাকেন।
এই কারণে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা শুধু দলের কর্মী নন। অনেক সময় তিনি এলাকার ক্ষমতার মধ্যস্থতাকারীও। এই ব্যবস্থার ভালো ও খারাপ—দুই দিকই আছে। কোনো বিরোধ বড় সংঘাতে যাওয়ার আগে একজন স্থানীয় নেতা তা থামিয়ে দিতে পারেন। আবার সেই ক্ষমতাই ব্যবহার করে তিনি চাঁদা তুলতে পারেন, জায়গা দখল করতে পারেন বা নিজের অনুসারীদের সুবিধা দিতে পারেন।
অর্থাৎ একই ব্যক্তি একদিকে বিরোধ ঠেকাতে পারেন, অন্যদিকে সেই ক্ষমতার ওপর নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থও তৈরি করতে পারেন। এটাই বাংলাদেশের স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামোর একটি বড় বৈশিষ্ট্য।
সরকার আর দল এক নয়
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যটি হলো সরকার ও রাজনৈতিক দলের মধ্যে। সরকারের দায়িত্ব নাগরিকদের জন্য নিয়ম তৈরি করা এবং তা সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা। রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব জনগণের প্রতিনিধিত্ব করা এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা।
দুই পক্ষের এই সম্পর্কের মধ্যে সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ। কারণ ফুটপাত তখন আর পুরোপুরি পথচারীর থাকে না। প্রশ্ন আসে, উচ্ছেদ করলেই কি সমস্যা মিটবে? এক কথায় উত্তর হচ্ছে, না। কারণ হকারকে সরিয়ে দিলে তার জীবিকার প্রশ্নটি থেকে যায়।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কারওয়ানবাজারের রহিমা বেওয়ার মতো বয়স্ক নারী যদি ফুটপাতে ছোট দোকান করে সংসার চালান, তার দোকান ভেঙে দিলে শুধু একটি অবৈধ স্থাপনা সরানো হয় না; তার পরিবারের আয়ও বন্ধ হয়ে যায়।অন্যদিকে হকারের জন্য ফুটপাত ছেড়ে দিলে পথচারীর চলাচলের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাহলে সমাধান কোথায়? সমাধান হলো, দুটো সমস্যাকেই একই সঙ্গে স্বীকার করা। হকারের জীবিকা যেমন বাস্তব, পথচারীর চলাচলের অধিকারও তেমনই বাস্তব।
বিশ্বের শহরগুলো কী করেছে?
অনেক শহর এই সমস্যাকে উচ্ছেদ দিয়ে নয়, ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মোকাবিলা করেছে। ব্যাংককের উদাহরণ এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে রাস্তার খাবার ও ছোট ব্যবসা শহরের জীবন ও পর্যটনের অংশ হয়ে উঠেছে। তবে সব জায়গায় সব সময় দোকান বসানোর অনুমতি নেই। কোথায় বসা যাবে, কখন বসা যাবে—এসব নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নিয়ম করা হয়েছে।
প্রথম কাজ হতে পারে ঢাকার সব গুরুত্বপূর্ণ ফুটপাতের একটি পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র তৈরি করা। কোথায় কতটুকু ফুটপাত আছে, কোথায় মানুষের চলাচল বেশি, কোথায় স্কুল, হাসপাতাল, বাজার, মেট্রো স্টেশন বা বাসস্ট্যান্ড—সব তথ্য এক জায়গায় থাকতে হবে। তারপর ঠিক করা যেতে পারে, কোন ফুটপাত পুরোপুরি পথচারীর জন্য থাকবে এবং কোথায় সীমিত পরিসরে হকার বসতে পারবেন। কিছু এলাকায় সময়ও ভাগ করে দেওয়া যেতে পারে।
ধরা যাক, দিনের কর্মঘণ্টায় ফুটপাত পুরোপুরি পথচারীর জন্য থাকবে। বিকেলের পর নির্দিষ্ট অংশে হকার বসতে পারবেন। রাত শেষে আবার সেই জায়গা খালি করতে হবে। এতে একই জায়গা দিনের এক সময়ে চলাচলের জন্য এবং অন্য সময়ে ছোট ব্যবসার জন্য ব্যবহার করা সম্ভব।
স্থায়ী দোকান নয়, চলমান কার্ট
আরেকটি ব্যবস্থা হতে পারে স্থায়ী দোকানের বদলে চলমান ঠেলাগাড়ি বা ছোট কার্ট। হকারের নিবন্ধন থাকবে। পরিচয়পত্র থাকবে। কোন এলাকায় তিনি ব্যবসা করতে পারবেন, সেটিও নির্ধারিত থাকবে। দিন শেষে কার্ট রাখার জন্য এলাকায় সরকারি বা বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় নির্দিষ্ট জায়গা থাকতে পারে। তাহলে ফুটপাত স্থায়ীভাবে দখল হয়ে থাকবে না।
আসল সংস্কার রাজনৈতিক
তবে এখানেই সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি আসে। হকারের জন্য পরিচয়পত্র দিলেই কি চাঁদাবাজি বন্ধ হবে? হবে না। কারণ চাঁদাবাজির যে স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, সেটি ভাঙা না গেলে হকারের ওপর পুরোনো চাপ ফিরে আসবে।
একজন হকার তখন বলতে পারবেন—‘আমার সরকারি পরিচয়পত্র আছে।’ কিন্তু স্থানীয় নেতা যদি বলেন, ‘আমার টাকা না দিলে এখানে বসতে পারবে না’, তাহলে সেই পরিচয়পত্রের মূল্য খুব বেশি থাকবে না। তাই ফুটপাত ব্যবস্থাপনার সংস্কারকে শুধু সিটি করপোরেশনের কাজ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি রাজনৈতিক সংস্কারেরও প্রশ্ন।
বাংলাদেশের জন্য ভিন্ন রাষ্ট্রচিন্তা
বাংলাদেশের রাষ্ট্রকে শুধু উচ্ছেদকারী রাষ্ট্র হিসেবে দেখলে চলবে না। রাষ্ট্রের একটি কাজ হলো আইন প্রয়োগ করা। কিন্তু আরেকটি কাজ হলো সমাজের বাস্তবতাকে বুঝে সেই বাস্তবতার জন্য নিয়ম তৈরি করা। হকার আছে—এই বাস্তবতা অস্বীকার করে তাকে সরিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু তাতে হকারি বন্ধ হবে না। অন্য কোথাও গিয়ে আবার ফুটপাত দখল হবে।
ফুটপাত বাংলাদেশের আয়না কীভাবে
ঢাকার ফুটপাতের দিকে তাকালে বাংলাদেশের সমাজের একটি বড় ছবি দেখা যায়। এখানে দরিদ্র মানুষের জীবিকার প্রয়োজন আছে। আছে নাগরিকের চলাচলের অধিকার। আছে অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি। আছে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা। আছে প্রশাসনের দুর্বলতা। আছে স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামো।
সবকিছু মিলেই ফুটপাত। তাই ফুটপাতের সমস্যার সমাধান শুধু ফুটপাত থেকে মানুষ সরিয়ে দেওয়া নয়। প্রশ্ন হলো, যে সমাজে কোটি মানুষের জীবিকা অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল, সেই সমাজকে আমরা কীভাবে নিয়মের মধ্যে আনব—তাদের জীবিকা নষ্ট না করে? এর উত্তর হয়তো উচ্ছেদে নয়, ব্যবস্থাপনায়।
চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে, হকারি নয়
ফুটপাত পথচারীর জন্য রাখতে হবে, কিন্তু হকারকে শত্রু বানিয়ে নয়। রাজনৈতিক দলকে সংগঠিত হতে দিতে হবে, কিন্তু অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক হতে নয়। আর রাষ্ট্রকে শুধু আইন প্রয়োগকারী হিসেবে নয়, সমাজের বিভিন্ন বাস্তবতার মধ্যে ন্যায়সংগত সমন্বয় তৈরির প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়াতে হবে।

মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকার কোনো ব্যস্ত ফুটপাতে দাঁড়ালে একই সঙ্গে দুটি ছবি দেখা যায়। একদিকে পথচারীর ভিড়, যানজট, ফুটপাত দিয়ে হাঁটার অসুবিধা। অন্যদিকে সারি সারি ছোট দোকান, ভ্যান, ঠেলাগাড়ি, চা-নাশতার দোকান, কাপড়, জুতা, ফল, খেলনা কিংবা নানা রকম পণ্যের পসরা। একজনের কাছে এটি চলাচলের পথ, আরেকজনের কাছে সেটিই তার দোকান, সংসারের আয় এবং বেঁচে থাকার অবলম্বন।
এই দুই বাস্তবতার মধ্যে দ্বন্দ্ব নতুন নয়। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ফুটপাতের সমস্যাটি শুধু নগর ব্যবস্থাপনার সমস্যা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান, গ্রাম থেকে শহরে মানুষের আসা, রাজনৈতিক প্রভাব, স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামো এবং চাঁদাবাজি।
আসল প্রশ্ন হলো, এই দুই বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় হবে কীভাবে? এখন এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বাংলাদেশে রাষ্ট্র, সরকার, রাজনৈতিক দল ও সমাজ—এই চারটির সম্পর্কও বুঝতে হয়।
আইনের দৃষ্টিতে ফুটপাত সাধারণ মানুষের চলাচলের জায়গা। সেখানে স্থায়ীভাবে দোকান বসানোর অধিকার কারও নেই। কিন্তু বাস্তব জীবনে ফুটপাত অনেক দিন ধরেই শহরের অর্থনীতির একটি অংশ।
কারণ, বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য ছোট ব্যবসা ও হকারি হচ্ছে জীবিকার পথ। দোকান ভাড়া নেওয়া, অগ্রিম টাকা দেওয়া, বিদ্যুৎ-পানি ও অন্যান্য খরচ বহন করা অনেকের পক্ষে সম্ভব নয়। ফুটপাত তাই তাদের কাছে সবচেয়ে সহজ প্রবেশের জায়গা।
পার্থক্য হলো, অনেক দেশে এই অর্থনীতিকে নিয়মের মধ্যে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। কোথায় দোকান বসবে, কতক্ষণ বসবে, কতটুকু জায়গা ব্যবহার করা যাবে—এসব নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে সেই ব্যবস্থাটি এখনো দুর্বল। ফলে ফুটপাত একই সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পত্তি এবং সমাজের বাস্তব অর্থনৈতিক পরিসর হয়ে আছে।
সমস্যাটা তখনই বড় হয়, যখন এর মধ্যে ঢুকে পড়ে রাজনীতি।হকারি নিজে অপরাধ নয়। ছোট ব্যবসা করাও অপরাধ নয়। কিন্তু যখন একজন হকারকে ফুটপাতে বসার জন্য স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা বা প্রভাবশালী ব্যক্তিকে নিয়মিত টাকা দিতে হয়, তখন বিষয়টি আর শুধু অর্থনীতির থাকে না। তখন তৈরি হয় একটি আলাদা ব্যবস্থা।কোথায় কে বসবে, কার কাছ থেকে কত টাকা নেওয়া হবে, কে কাকে ‘রক্ষা’ করবে—এসবের নিয়ন্ত্রণ চলে যেতে পারে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের হাতে।
‘পাতি নেতা’ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশের স্থানীয় সমাজের একটি বৈশিষ্ট্য হলো—অনেক বিরোধ বা প্রয়োজনের সমাধান আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের বাইরে স্থানীয় মানুষ ও নেতাদের মাধ্যমে হয়। বাড়িওয়ালা-ভাড়াটিয়া বিরোধ, বাজারের ব্যবসায়ীদের ঝামেলা, স্থানীয় প্রভাবশালীদের সঙ্গে বিরোধ—অনেক ক্ষেত্রেই কোনো না কোনো স্থানীয় নেতা বা মধ্যস্থতাকারী সেখানে উপস্থিত থাকেন।
এই কারণে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা শুধু দলের কর্মী নন। অনেক সময় তিনি এলাকার ক্ষমতার মধ্যস্থতাকারীও। এই ব্যবস্থার ভালো ও খারাপ—দুই দিকই আছে। কোনো বিরোধ বড় সংঘাতে যাওয়ার আগে একজন স্থানীয় নেতা তা থামিয়ে দিতে পারেন। আবার সেই ক্ষমতাই ব্যবহার করে তিনি চাঁদা তুলতে পারেন, জায়গা দখল করতে পারেন বা নিজের অনুসারীদের সুবিধা দিতে পারেন।
অর্থাৎ একই ব্যক্তি একদিকে বিরোধ ঠেকাতে পারেন, অন্যদিকে সেই ক্ষমতার ওপর নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থও তৈরি করতে পারেন। এটাই বাংলাদেশের স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামোর একটি বড় বৈশিষ্ট্য।
সরকার আর দল এক নয়
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যটি হলো সরকার ও রাজনৈতিক দলের মধ্যে। সরকারের দায়িত্ব নাগরিকদের জন্য নিয়ম তৈরি করা এবং তা সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা। রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব জনগণের প্রতিনিধিত্ব করা এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা।
দুই পক্ষের এই সম্পর্কের মধ্যে সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ। কারণ ফুটপাত তখন আর পুরোপুরি পথচারীর থাকে না। প্রশ্ন আসে, উচ্ছেদ করলেই কি সমস্যা মিটবে? এক কথায় উত্তর হচ্ছে, না। কারণ হকারকে সরিয়ে দিলে তার জীবিকার প্রশ্নটি থেকে যায়।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কারওয়ানবাজারের রহিমা বেওয়ার মতো বয়স্ক নারী যদি ফুটপাতে ছোট দোকান করে সংসার চালান, তার দোকান ভেঙে দিলে শুধু একটি অবৈধ স্থাপনা সরানো হয় না; তার পরিবারের আয়ও বন্ধ হয়ে যায়।অন্যদিকে হকারের জন্য ফুটপাত ছেড়ে দিলে পথচারীর চলাচলের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাহলে সমাধান কোথায়? সমাধান হলো, দুটো সমস্যাকেই একই সঙ্গে স্বীকার করা। হকারের জীবিকা যেমন বাস্তব, পথচারীর চলাচলের অধিকারও তেমনই বাস্তব।
বিশ্বের শহরগুলো কী করেছে?
অনেক শহর এই সমস্যাকে উচ্ছেদ দিয়ে নয়, ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মোকাবিলা করেছে। ব্যাংককের উদাহরণ এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে রাস্তার খাবার ও ছোট ব্যবসা শহরের জীবন ও পর্যটনের অংশ হয়ে উঠেছে। তবে সব জায়গায় সব সময় দোকান বসানোর অনুমতি নেই। কোথায় বসা যাবে, কখন বসা যাবে—এসব নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নিয়ম করা হয়েছে।
প্রথম কাজ হতে পারে ঢাকার সব গুরুত্বপূর্ণ ফুটপাতের একটি পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র তৈরি করা। কোথায় কতটুকু ফুটপাত আছে, কোথায় মানুষের চলাচল বেশি, কোথায় স্কুল, হাসপাতাল, বাজার, মেট্রো স্টেশন বা বাসস্ট্যান্ড—সব তথ্য এক জায়গায় থাকতে হবে। তারপর ঠিক করা যেতে পারে, কোন ফুটপাত পুরোপুরি পথচারীর জন্য থাকবে এবং কোথায় সীমিত পরিসরে হকার বসতে পারবেন। কিছু এলাকায় সময়ও ভাগ করে দেওয়া যেতে পারে।
ধরা যাক, দিনের কর্মঘণ্টায় ফুটপাত পুরোপুরি পথচারীর জন্য থাকবে। বিকেলের পর নির্দিষ্ট অংশে হকার বসতে পারবেন। রাত শেষে আবার সেই জায়গা খালি করতে হবে। এতে একই জায়গা দিনের এক সময়ে চলাচলের জন্য এবং অন্য সময়ে ছোট ব্যবসার জন্য ব্যবহার করা সম্ভব।
স্থায়ী দোকান নয়, চলমান কার্ট
আরেকটি ব্যবস্থা হতে পারে স্থায়ী দোকানের বদলে চলমান ঠেলাগাড়ি বা ছোট কার্ট। হকারের নিবন্ধন থাকবে। পরিচয়পত্র থাকবে। কোন এলাকায় তিনি ব্যবসা করতে পারবেন, সেটিও নির্ধারিত থাকবে। দিন শেষে কার্ট রাখার জন্য এলাকায় সরকারি বা বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় নির্দিষ্ট জায়গা থাকতে পারে। তাহলে ফুটপাত স্থায়ীভাবে দখল হয়ে থাকবে না।
আসল সংস্কার রাজনৈতিক
তবে এখানেই সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি আসে। হকারের জন্য পরিচয়পত্র দিলেই কি চাঁদাবাজি বন্ধ হবে? হবে না। কারণ চাঁদাবাজির যে স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, সেটি ভাঙা না গেলে হকারের ওপর পুরোনো চাপ ফিরে আসবে।
একজন হকার তখন বলতে পারবেন—‘আমার সরকারি পরিচয়পত্র আছে।’ কিন্তু স্থানীয় নেতা যদি বলেন, ‘আমার টাকা না দিলে এখানে বসতে পারবে না’, তাহলে সেই পরিচয়পত্রের মূল্য খুব বেশি থাকবে না। তাই ফুটপাত ব্যবস্থাপনার সংস্কারকে শুধু সিটি করপোরেশনের কাজ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি রাজনৈতিক সংস্কারেরও প্রশ্ন।
বাংলাদেশের জন্য ভিন্ন রাষ্ট্রচিন্তা
বাংলাদেশের রাষ্ট্রকে শুধু উচ্ছেদকারী রাষ্ট্র হিসেবে দেখলে চলবে না। রাষ্ট্রের একটি কাজ হলো আইন প্রয়োগ করা। কিন্তু আরেকটি কাজ হলো সমাজের বাস্তবতাকে বুঝে সেই বাস্তবতার জন্য নিয়ম তৈরি করা। হকার আছে—এই বাস্তবতা অস্বীকার করে তাকে সরিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু তাতে হকারি বন্ধ হবে না। অন্য কোথাও গিয়ে আবার ফুটপাত দখল হবে।
ফুটপাত বাংলাদেশের আয়না কীভাবে
ঢাকার ফুটপাতের দিকে তাকালে বাংলাদেশের সমাজের একটি বড় ছবি দেখা যায়। এখানে দরিদ্র মানুষের জীবিকার প্রয়োজন আছে। আছে নাগরিকের চলাচলের অধিকার। আছে অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি। আছে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা। আছে প্রশাসনের দুর্বলতা। আছে স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামো।
সবকিছু মিলেই ফুটপাত। তাই ফুটপাতের সমস্যার সমাধান শুধু ফুটপাত থেকে মানুষ সরিয়ে দেওয়া নয়। প্রশ্ন হলো, যে সমাজে কোটি মানুষের জীবিকা অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল, সেই সমাজকে আমরা কীভাবে নিয়মের মধ্যে আনব—তাদের জীবিকা নষ্ট না করে? এর উত্তর হয়তো উচ্ছেদে নয়, ব্যবস্থাপনায়।
চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে, হকারি নয়
ফুটপাত পথচারীর জন্য রাখতে হবে, কিন্তু হকারকে শত্রু বানিয়ে নয়। রাজনৈতিক দলকে সংগঠিত হতে দিতে হবে, কিন্তু অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক হতে নয়। আর রাষ্ট্রকে শুধু আইন প্রয়োগকারী হিসেবে নয়, সমাজের বিভিন্ন বাস্তবতার মধ্যে ন্যায়সংগত সমন্বয় তৈরির প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়াতে হবে।

আপনার মতামত লিখুন