সংবাদ

যখন মধ্যবিত্তের আশা ফুরিয়ে যায়


মতিউর রহমান
মতিউর রহমান
প্রকাশ: ৩ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫৮ এএম

যখন মধ্যবিত্তের আশা ফুরিয়ে যায়
ছবি: সংগৃহীত

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি একটি সহজ সামাজিক চুক্তির ওপর গভীর আস্থা রেখে এসেছে—মন দিয়ে পড়াশোনা করো, সততার সঙ্গে কাজ করো, তবেই জীবনে স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা আসবে। ধরে নেওয়া হতো, একটি নির্দিষ্ট ও নিয়মিত আয়ই নিশ্চিত করবে পরিবারের মা॥থা গোঁজার ভালো জায়গা, সন্তানের মানসম্মত শিক্ষা, সুচিকিৎসা, পরিমিত সঞ্চয় এবং জীবনের শেষভাগে এসে একটি শান্তিময় অবসর। কিন্তু আজ সেই চিরচেনা বিশ্বাসের ভিতটি যেন ধসে পড়ছে। জীবনযাত্রার অনিয়ন্ত্রিত ব্যয় বৃদ্ধি সাধারণ বেতনভোগী পরিবারগুলোকে আজ এক কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে—তাদের দীর্ঘদিনের হাড়ভাঙা খাটুনি ও অপরিসীম ত্যাগ আদৌ কি সেই উন্নত ভবিষ্যতের সন্ধান দেবে, যার প্রতিশ্রুতি তাদের দেওয়া হয়েছিল?

এই ক্ষয়ক্ষতি কেবল পারিবারিক বাজেটের হিসাব-নিকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পরিবারগুলো যখন সর্বোচ্চ কঠোর পরিশ্রম করেও তাদের ন॥্যূনতম জীবনযাত্রার মান ধরে রাখতে হিমশিম খায়, তখন দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর তাদের আস্থা দিন দিন ফিকে হতে শুরু করে। কষ্টের সঞ্চয় উবে যায়, জীবনের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা সংকুচিত হয়ে আসে এবং তরুণ প্রজন্ম নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক চরম অনিশ্চয়তার সাগরে তলিয়ে যায়। এভাবেই স্রেফ কেনাকাটা বা ক্রয়ক্ষমতার একটি অর্থনৈতিক সংকট ধীরে ধীরে সামাজিক বিশ্বাসের এক সুদূরপ্রসারী জাতীয় সংকটে রূপ নেয়।

অবিরাম মুদ্রাস্ফীতি এই সমস্যার ব্যাপকতা তুলে ধরে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মুদ্রাস্ফীতি ছিল ৮.৩৬ শতাংশ, যা আগস্টের ৮.২৯ শতাংশ থেকে বেশি। যদিও আগের সর্বোচ্চ স্তর ॥েথকে দাম কিছুটা কমেছে, বছরের পর বছর ধরে ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধি ক্রয়ক্ষমতাকে ক্রমাগত ক্ষুণ্ন করেছে, অন্যদিকে মজুরি তার সাথে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে, যার ফলে অনেক বেতনভোগী কর্মীর প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে।

মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এটি সবচেয়ে তীব্রভাবে অনুভব করে, কারণ তারা উল্লেখযোগ্য সম্পদ বা আয়ের বিভিন্ন উৎসের পরিবর্তে নিয়মিত বেতনের ওপর নির্ভরশীল। যখন খাদ্য, পরিবহন, বিদ্যুৎ, বাড়ি ভাড়া এবং টিউশন ফি—সবকিছু একসা॥েথ ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে, তখন সামান্য বেতন বৃদ্ধিও খুব একটা স্বস্তি এনে দেয় না। যে পরিবারগুলো একসময় প্রতি মাসে সঞ্চয় করত, তারা এখন তাদের সমস্ত আয় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের পেছনে খরচ করে ফেলে।

সঞ্চয়ের বিলুপ্তিই হয়তো সবচেয়ে গুরুতর পরিণতি। সঞ্চয় পরিবারগুলোকে চাকরি হারানো, অসুস্থতা এবং অপ্রত্যাশিত খরচের হাত থেকে রক্ষা করে এবং এর মাধ্যমেই বাড়ি কেনা, সন্তানদের উচ্চশিক্ষার খরচ জোগানো এবং বার্ধক্যের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হয়। এই সঞ্চয় ফুরিয়ে গেলে পরিবারগুলো ঋণ নেয়, সম্পদ বিক্রি করে অথবা গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ স্থগিত করে। তখন নিরাপত্তাহীনতা একটি সাময়িক সমস্যা না থেকে স্থায়ী অবস্থায় পরিণত হয়।

আবাসন সংকট দিন দিন গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ঢাকা সহ বড় শহরগুলোতে আকাশচুম্বী বাড়িভাড়া ও ক্রমবর্ধমান ফ্ল্যাট-জমির দাম সাধারণ বেতনভোগী পরিবারগুলোর নাগালের বাইরে চলে গেছে। আবাসন খরচ সামলাতে অনেক পরিবারই শহরের দ॥ূরবর্তী এলাকাগুলোতে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে; তবে এর ফলে তাদের যাতায়াত খরচ যেমন বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে, তেমনই প্রতিদিন পোহাতে হচ্ছে মারাত্মক ক্লান্তিকর ও দীর্ঘ যাত্রার দুর্ভোগ। নিজের একটি স্বপ্নের মা॥থার ওপর ছাদ বা বাড়ির মালিকানা, যা একসময় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পেশাজীবীদের জন্য একটি বাস্তবসম্মত লক্ষ্য ছিল—তা আজ সাধারণ আয়ের তুলনায় সম্পত্তির দাম কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় ক্রমেই অধরা স্বপ্নে পরিণত হচ্ছে।

শিক্ষা, যা দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক উন্নতির সবচেয়ে নিশ্চিত পথ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে, তা নিজেই একটি বোঝায় পরিণত হচ্ছে। বাবা-মায়েরা স্কুলের বেতন, প্রাইভেট কোচিং, পরিবহন, বই এবং ডিজিটাল শিক্ষার জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন, কারণ তারা আশা করেন যে শিক্ষা তাদের সন্তানদের জন্য আরও ভালো সুযোগ তৈরি করবে। কিন্তু ব্যয়বহুল শিক্ষা এবং অনিশ্চিত চাকরির সম্ভাবনা এই দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক প্রতিশ্রতির প্রতি বিশ্বাসকে ক্ষয় করে দিচ্ছে।

তরুণ স্নাতকরা বিশেষভাবে কঠিন পরিস্থিতিতে রয়েছে। ডিগ্রি এখন আর নিরাপদ চাকরি, ভালো বেতন বা একটি সুস্পষ্ট কর্মজীবনের নিশ্চয়তা দেয় না। তাই অনেকেই দেশান্তরের ক॥থা ভাবেন, বিয়ে পিছিয়ে দেন বা স্বাধীনভাবে সংসার শুরু করতে দেরি করেন, আবার অন্যরা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে তাদের বাবা-মায়ের ওপর নির্ভরশীল থাকেন। এই ধরনের পরিস্থিতি তরুণদের শিক্ষা এবং পেশাগত সাফল্যের ম॥ূল্যের ওপর বিশ্বাসকে ক্ষয় করে দিতে পারে।

স্বাস্থ্যসেবার অতিরিক্ত ব্যয় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে স্বাস্থ্য খাতের মোট খরচের ৭৯.৩ শতাংশই নাগরিকদের নিজস্ব পকেট থেকে বহন করতে হয়। ফলে বিপুল এই ব্যয়ের চাপ সামলাতে না পেরে ২০২৪ সালে প্রায় ৬৫ শতাংশ স্বাস্থ্য চাহিদা বা চিকিৎসাসেবা অপ॥ূর্ণই ॥েথকে গেছে। এই পরিসংখ্যানগুলো স্পষ্ট করে দেয় যে, পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে কতটা কঠিন আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হতে হয়।

একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য, একটি গুরুতর অসুস্থতাই বছরের পর বছরের সঞ্চয় নিঃশেষ করে দিতে পারে। পর্যাপ্ত বীমা বা সাশ্রয়ী সরকারি চিকিৎসার অভাবে পরিবারগুলো ঋণ করে, চিকিৎসা বিলম্বিত করে অ॥থবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় কমিয়ে দেয়। একটিমাত্র জরুরি চিকিৎসা পরিস্থিতি কয়েক মাসের মধ্যেই বছরের পর বছরের আর্থিক অগ্রগতিকে নষ্ট করে দিতে পারে।

এই দীর্ঘস্থায়ী আ॥ির্থক চাপ মানুষের পারিবারিক সম্পর্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সন্তানের স্কুলের বেতন, ক্রমবর্ধমান বাড়িভাড়া এবং অবসরকালীন ভবিষ্যৎ চিন্তায় প্রতিনিয়ত জর্জরিত ॥থাকেন বাবা-মায়েরা। অন্যদিকে, তরুণ পেশাজীবীরা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেন—তাদের অর্জিত যোগ্যতা ও কঠোর পরিশ্রম শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত আ॥ির্থক স্বাধীনতা এনে দিতে পারবে কি না। এই ক্রমাগত অনিশ্চয়তা ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাকে থমকে দেয় এবং নিজের ব্যক্তিগত উন্নতির প্রতি আত্মবিশ্বাসকে চরমভাবে ক্ষুণ্ন করে।

এর পরিণতি শুধু ব্যক্তিগত পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ভোগ, উদ্যোক্তা, পেশাগত পরিষেবা, কর এবং মানব সম্পদে বিনিয়োগের মাধ্যমে মধ্যবিত্ত শ্রেণিই বাংলাদেশের অ॥র্থনীতিকে চালিত করে। পরিবারগুলো যখন খরচ কমিয়ে দেয়, তখন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল চাহিদার সম্মুখীন হয়। যখন তরুণরা দেশের অভ্যন্তরীণ সুযোগের ওপর আস্থা হারায়, তখন দেশ দক্ষ কর্মী ও ভবিষ্যৎ উদ্যোক্তাদের হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে।

মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নিরাপত্তাহীনতা বিদ্যমান বৈষম্যকেও আরও বাড়িয়ে তোলে। ধনী পরিবারগুলো সম্পত্তি, বিনিয়োগ এবং বহুমুখী আয়ের মাধ্যমে নিজেদের সুরক্ষিত রাখে, অন্যদিকে দরিদ্র পরিবারগুলো নির্দিষ্ট সহায়তার জন্য যোগ্য হতে পারে। অনেক নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার এই দুইয়ের মাঝামাঝি অবস্থানে ॥থাকে। তাদের আয় সরকারি সহায়তার নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করতে পারে, কিন্তু তাদের সঞ্চয় বেকারত্ব, অসুস্থতা বা দীর্ঘস্থায়ী মুদ্রাস্ফীতির সংকট মোকাবিলা করতে পারে না।

এই বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও সুদ॥ূরপ্রসারী অ॥র্থনৈতিক রূপরেখা। ম॥ূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অবশ্যই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে; তবে স্রেফ পণ্যের দাম স্থিতিশীল রেখেই মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের প্রকৃত সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জীবনযাত্রার ব্যয়ের সা॥েথ সামঞ্জস্য রেখে প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধি, সাশ্রয়ী আবাসন ব্যবস্থা এবং সবার জন্য সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি। এছাড়া, বাজারে কার্যকর তদারকি এবং সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ গড়ে তুলতে পারলে সাধারণ ভোক্তাদের সিন্ডিকেট বা কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধির শোষণের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

শিক্ষাব্যবস্থাকেও শ্রমবাজারের চাহিদার সা॥েথ আরও ভালোভাবে সামঞ্জস্যপ॥ূর্ণ করে তুলতে হবে। কারিগরি প্রশিক্ষণ, পেশাগত দক্ষতা এবং শিল্প-সংশ্লিষ্ট শিক্ষার ক্ষেত্রে অধিক বিনিয়োগ স্নাতকদের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বাড়াতে পারে। একইভাবে, সাশ্রয়ী সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা হলে স্বল্প আয়ের বেতনভুক্ত পরিবারগুলোর আর্থিক ঝুঁকি কমে আসবে।

নিয়োগকর্তা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোরও এক্ষেত্রে দায়িত্ব রয়েছে। উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান, ন্যায্য মজুরি এবং পেশাগত উন্নতির সুযোগ পরিবারের আয় বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। দায়িত্বশীল সঞ্চয় ও ঋণ সুবিধা পরিবারগুলোকে অতিরিক্ত ঋণের ভারে না জড়িয়েও আর্থিক ধাক্কা সামলে উঠতে সাহায্য করতে পারে।

তাই নীতিনির্ধারকদের উচিত মধ্যবিত্তের এই নিরাপত্তাহীনতাকে কেবল ব্যক্তিবিশেষের দুর্ভাগ্যের গল্প হিসেবে না দেখে, একে একটি বড় জাতীয় অ॥র্থনৈতিক সংকট হিসেবে বিবেচনা করা। দেশের মানুষের প্রকৃত আয় ও মজুরি, আবাসন ব্যয় এবং পারিবারিক ঋণের মাত্রার ওপর নিয়মিত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে ঠিক কোন কোন খাতে চাপ সবচেয়ে বেশি—তা সহজেই চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। সময়োপযোগী, বাস্তবসম্মত ও কার্যকর সামাজিক-অর্থনৈতিক নীতিমালার মাধ্যমেই কেবল সাধারণ পরিবারগুলোর মনে এই বিশ্বাস ও আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব যে, তাদের অমানুষিক শ্রম ও প্রচেষ্টা একেবারে বৃথা যাচ্ছে না।

মধ্যবিত্ত শ্রেণি কখনোই অসাধারণ কোনো ধন-সম্পদ বা বিলাসী জীবনের স্বপ্ন দেখে না। তাদের প্রত্যাশাগুলো অত্যন্ত সাদামাটা ও স্পষ্ট: একটি সম্মানজনক কর্মসংস্থান, সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, সন্তানের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, সহনীয় ও সহজলভ্য চিকিৎসা ব্যবস্থা, মাথার ওপর নিরাপদ একটি ছাদ এবং জীবনপ্রাহ্ণে মর্যাদাপ॥ূর্ণ অবসরের জন্য সামান্য কিছু সঞ্চয়। এগুলো কোনো বিলাসিতা নয়; বরং সমাজে আত্মমর্যাদা ও ন্যূনতম মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার অপরিহার্য শর্ত।

যখন কঠোর পরিশ্রম ও সর্বোচ্চ ত্যাগের পরও এই মৌলিক নিশ্চয়তাগুলো অর্জিত হয় না, তখন তার ক্ষতিকর প্রভাব কেবল সাধারণ মানুষের কেনাকাটা বা ভোগব্যয় কমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর ফলে সমাজ ও ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা হারিয়ে যায়, সুন্দর ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষাগুলো ম্লান হয়ে পড়ে এবং রাষ্ট্রের ম॥ূল প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি বিশ্বাস টলে যেতে শুরু করে। তাই মধ্যবিত্তের সামাজিক ও আ॥ির্থক নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা কেবল একটি শুষ্ক অ॥র্থনৈতিক লক্ষ্য নয়; বরং সামাজিক গতিশীলতা রক্ষা, একটি উৎপাদনশীল নাগরিক সমাজ গঠন এবং বাংলাদেশের সুন্দর ভবিষ্যতের ওপর জনগণের আস্থা টিকিয়ে রাখার জন্যও এটি অত্যন্ত জরুরি।

[লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী।]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬


যখন মধ্যবিত্তের আশা ফুরিয়ে যায়

প্রকাশের তারিখ : ০৩ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি একটি সহজ সামাজিক চুক্তির ওপর গভীর আস্থা রেখে এসেছে—মন দিয়ে পড়াশোনা করো, সততার সঙ্গে কাজ করো, তবেই জীবনে স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা আসবে। ধরে নেওয়া হতো, একটি নির্দিষ্ট ও নিয়মিত আয়ই নিশ্চিত করবে পরিবারের মা॥থা গোঁজার ভালো জায়গা, সন্তানের মানসম্মত শিক্ষা, সুচিকিৎসা, পরিমিত সঞ্চয় এবং জীবনের শেষভাগে এসে একটি শান্তিময় অবসর। কিন্তু আজ সেই চিরচেনা বিশ্বাসের ভিতটি যেন ধসে পড়ছে। জীবনযাত্রার অনিয়ন্ত্রিত ব্যয় বৃদ্ধি সাধারণ বেতনভোগী পরিবারগুলোকে আজ এক কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে—তাদের দীর্ঘদিনের হাড়ভাঙা খাটুনি ও অপরিসীম ত্যাগ আদৌ কি সেই উন্নত ভবিষ্যতের সন্ধান দেবে, যার প্রতিশ্রুতি তাদের দেওয়া হয়েছিল?


এই ক্ষয়ক্ষতি কেবল পারিবারিক বাজেটের হিসাব-নিকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পরিবারগুলো যখন সর্বোচ্চ কঠোর পরিশ্রম করেও তাদের ন॥্যূনতম জীবনযাত্রার মান ধরে রাখতে হিমশিম খায়, তখন দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর তাদের আস্থা দিন দিন ফিকে হতে শুরু করে। কষ্টের সঞ্চয় উবে যায়, জীবনের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা সংকুচিত হয়ে আসে এবং তরুণ প্রজন্ম নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক চরম অনিশ্চয়তার সাগরে তলিয়ে যায়। এভাবেই স্রেফ কেনাকাটা বা ক্রয়ক্ষমতার একটি অর্থনৈতিক সংকট ধীরে ধীরে সামাজিক বিশ্বাসের এক সুদূরপ্রসারী জাতীয় সংকটে রূপ নেয়।


অবিরাম মুদ্রাস্ফীতি এই সমস্যার ব্যাপকতা তুলে ধরে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মুদ্রাস্ফীতি ছিল ৮.৩৬ শতাংশ, যা আগস্টের ৮.২৯ শতাংশ থেকে বেশি। যদিও আগের সর্বোচ্চ স্তর ॥েথকে দাম কিছুটা কমেছে, বছরের পর বছর ধরে ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধি ক্রয়ক্ষমতাকে ক্রমাগত ক্ষুণ্ন করেছে, অন্যদিকে মজুরি তার সাথে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে, যার ফলে অনেক বেতনভোগী কর্মীর প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে।


মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এটি সবচেয়ে তীব্রভাবে অনুভব করে, কারণ তারা উল্লেখযোগ্য সম্পদ বা আয়ের বিভিন্ন উৎসের পরিবর্তে নিয়মিত বেতনের ওপর নির্ভরশীল। যখন খাদ্য, পরিবহন, বিদ্যুৎ, বাড়ি ভাড়া এবং টিউশন ফি—সবকিছু একসা॥েথ ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে, তখন সামান্য বেতন বৃদ্ধিও খুব একটা স্বস্তি এনে দেয় না। যে পরিবারগুলো একসময় প্রতি মাসে সঞ্চয় করত, তারা এখন তাদের সমস্ত আয় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের পেছনে খরচ করে ফেলে।


সঞ্চয়ের বিলুপ্তিই হয়তো সবচেয়ে গুরুতর পরিণতি। সঞ্চয় পরিবারগুলোকে চাকরি হারানো, অসুস্থতা এবং অপ্রত্যাশিত খরচের হাত থেকে রক্ষা করে এবং এর মাধ্যমেই বাড়ি কেনা, সন্তানদের উচ্চশিক্ষার খরচ জোগানো এবং বার্ধক্যের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হয়। এই সঞ্চয় ফুরিয়ে গেলে পরিবারগুলো ঋণ নেয়, সম্পদ বিক্রি করে অথবা গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ স্থগিত করে। তখন নিরাপত্তাহীনতা একটি সাময়িক সমস্যা না থেকে স্থায়ী অবস্থায় পরিণত হয়।


আবাসন সংকট দিন দিন গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ঢাকা সহ বড় শহরগুলোতে আকাশচুম্বী বাড়িভাড়া ও ক্রমবর্ধমান ফ্ল্যাট-জমির দাম সাধারণ বেতনভোগী পরিবারগুলোর নাগালের বাইরে চলে গেছে। আবাসন খরচ সামলাতে অনেক পরিবারই শহরের দ॥ূরবর্তী এলাকাগুলোতে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে; তবে এর ফলে তাদের যাতায়াত খরচ যেমন বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে, তেমনই প্রতিদিন পোহাতে হচ্ছে মারাত্মক ক্লান্তিকর ও দীর্ঘ যাত্রার দুর্ভোগ। নিজের একটি স্বপ্নের মা॥থার ওপর ছাদ বা বাড়ির মালিকানা, যা একসময় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পেশাজীবীদের জন্য একটি বাস্তবসম্মত লক্ষ্য ছিল—তা আজ সাধারণ আয়ের তুলনায় সম্পত্তির দাম কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় ক্রমেই অধরা স্বপ্নে পরিণত হচ্ছে।


শিক্ষা, যা দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক উন্নতির সবচেয়ে নিশ্চিত পথ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে, তা নিজেই একটি বোঝায় পরিণত হচ্ছে। বাবা-মায়েরা স্কুলের বেতন, প্রাইভেট কোচিং, পরিবহন, বই এবং ডিজিটাল শিক্ষার জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন, কারণ তারা আশা করেন যে শিক্ষা তাদের সন্তানদের জন্য আরও ভালো সুযোগ তৈরি করবে। কিন্তু ব্যয়বহুল শিক্ষা এবং অনিশ্চিত চাকরির সম্ভাবনা এই দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক প্রতিশ্রতির প্রতি বিশ্বাসকে ক্ষয় করে দিচ্ছে।


তরুণ স্নাতকরা বিশেষভাবে কঠিন পরিস্থিতিতে রয়েছে। ডিগ্রি এখন আর নিরাপদ চাকরি, ভালো বেতন বা একটি সুস্পষ্ট কর্মজীবনের নিশ্চয়তা দেয় না। তাই অনেকেই দেশান্তরের ক॥থা ভাবেন, বিয়ে পিছিয়ে দেন বা স্বাধীনভাবে সংসার শুরু করতে দেরি করেন, আবার অন্যরা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে তাদের বাবা-মায়ের ওপর নির্ভরশীল থাকেন। এই ধরনের পরিস্থিতি তরুণদের শিক্ষা এবং পেশাগত সাফল্যের ম॥ূল্যের ওপর বিশ্বাসকে ক্ষয় করে দিতে পারে।


স্বাস্থ্যসেবার অতিরিক্ত ব্যয় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে স্বাস্থ্য খাতের মোট খরচের ৭৯.৩ শতাংশই নাগরিকদের নিজস্ব পকেট থেকে বহন করতে হয়। ফলে বিপুল এই ব্যয়ের চাপ সামলাতে না পেরে ২০২৪ সালে প্রায় ৬৫ শতাংশ স্বাস্থ্য চাহিদা বা চিকিৎসাসেবা অপ॥ূর্ণই ॥েথকে গেছে। এই পরিসংখ্যানগুলো স্পষ্ট করে দেয় যে, পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে কতটা কঠিন আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হতে হয়।


একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য, একটি গুরুতর অসুস্থতাই বছরের পর বছরের সঞ্চয় নিঃশেষ করে দিতে পারে। পর্যাপ্ত বীমা বা সাশ্রয়ী সরকারি চিকিৎসার অভাবে পরিবারগুলো ঋণ করে, চিকিৎসা বিলম্বিত করে অ॥থবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় কমিয়ে দেয়। একটিমাত্র জরুরি চিকিৎসা পরিস্থিতি কয়েক মাসের মধ্যেই বছরের পর বছরের আর্থিক অগ্রগতিকে নষ্ট করে দিতে পারে।


এই দীর্ঘস্থায়ী আ॥ির্থক চাপ মানুষের পারিবারিক সম্পর্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সন্তানের স্কুলের বেতন, ক্রমবর্ধমান বাড়িভাড়া এবং অবসরকালীন ভবিষ্যৎ চিন্তায় প্রতিনিয়ত জর্জরিত ॥থাকেন বাবা-মায়েরা। অন্যদিকে, তরুণ পেশাজীবীরা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেন—তাদের অর্জিত যোগ্যতা ও কঠোর পরিশ্রম শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত আ॥ির্থক স্বাধীনতা এনে দিতে পারবে কি না। এই ক্রমাগত অনিশ্চয়তা ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাকে থমকে দেয় এবং নিজের ব্যক্তিগত উন্নতির প্রতি আত্মবিশ্বাসকে চরমভাবে ক্ষুণ্ন করে।


এর পরিণতি শুধু ব্যক্তিগত পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ভোগ, উদ্যোক্তা, পেশাগত পরিষেবা, কর এবং মানব সম্পদে বিনিয়োগের মাধ্যমে মধ্যবিত্ত শ্রেণিই বাংলাদেশের অ॥র্থনীতিকে চালিত করে। পরিবারগুলো যখন খরচ কমিয়ে দেয়, তখন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল চাহিদার সম্মুখীন হয়। যখন তরুণরা দেশের অভ্যন্তরীণ সুযোগের ওপর আস্থা হারায়, তখন দেশ দক্ষ কর্মী ও ভবিষ্যৎ উদ্যোক্তাদের হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে।


মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নিরাপত্তাহীনতা বিদ্যমান বৈষম্যকেও আরও বাড়িয়ে তোলে। ধনী পরিবারগুলো সম্পত্তি, বিনিয়োগ এবং বহুমুখী আয়ের মাধ্যমে নিজেদের সুরক্ষিত রাখে, অন্যদিকে দরিদ্র পরিবারগুলো নির্দিষ্ট সহায়তার জন্য যোগ্য হতে পারে। অনেক নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার এই দুইয়ের মাঝামাঝি অবস্থানে ॥থাকে। তাদের আয় সরকারি সহায়তার নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করতে পারে, কিন্তু তাদের সঞ্চয় বেকারত্ব, অসুস্থতা বা দীর্ঘস্থায়ী মুদ্রাস্ফীতির সংকট মোকাবিলা করতে পারে না।


এই বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও সুদ॥ূরপ্রসারী অ॥র্থনৈতিক রূপরেখা। ম॥ূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অবশ্যই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে; তবে স্রেফ পণ্যের দাম স্থিতিশীল রেখেই মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের প্রকৃত সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জীবনযাত্রার ব্যয়ের সা॥েথ সামঞ্জস্য রেখে প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধি, সাশ্রয়ী আবাসন ব্যবস্থা এবং সবার জন্য সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি। এছাড়া, বাজারে কার্যকর তদারকি এবং সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ গড়ে তুলতে পারলে সাধারণ ভোক্তাদের সিন্ডিকেট বা কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধির শোষণের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।


শিক্ষাব্যবস্থাকেও শ্রমবাজারের চাহিদার সা॥েথ আরও ভালোভাবে সামঞ্জস্যপ॥ূর্ণ করে তুলতে হবে। কারিগরি প্রশিক্ষণ, পেশাগত দক্ষতা এবং শিল্প-সংশ্লিষ্ট শিক্ষার ক্ষেত্রে অধিক বিনিয়োগ স্নাতকদের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বাড়াতে পারে। একইভাবে, সাশ্রয়ী সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা হলে স্বল্প আয়ের বেতনভুক্ত পরিবারগুলোর আর্থিক ঝুঁকি কমে আসবে।


নিয়োগকর্তা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোরও এক্ষেত্রে দায়িত্ব রয়েছে। উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান, ন্যায্য মজুরি এবং পেশাগত উন্নতির সুযোগ পরিবারের আয় বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। দায়িত্বশীল সঞ্চয় ও ঋণ সুবিধা পরিবারগুলোকে অতিরিক্ত ঋণের ভারে না জড়িয়েও আর্থিক ধাক্কা সামলে উঠতে সাহায্য করতে পারে।


তাই নীতিনির্ধারকদের উচিত মধ্যবিত্তের এই নিরাপত্তাহীনতাকে কেবল ব্যক্তিবিশেষের দুর্ভাগ্যের গল্প হিসেবে না দেখে, একে একটি বড় জাতীয় অ॥র্থনৈতিক সংকট হিসেবে বিবেচনা করা। দেশের মানুষের প্রকৃত আয় ও মজুরি, আবাসন ব্যয় এবং পারিবারিক ঋণের মাত্রার ওপর নিয়মিত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে ঠিক কোন কোন খাতে চাপ সবচেয়ে বেশি—তা সহজেই চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। সময়োপযোগী, বাস্তবসম্মত ও কার্যকর সামাজিক-অর্থনৈতিক নীতিমালার মাধ্যমেই কেবল সাধারণ পরিবারগুলোর মনে এই বিশ্বাস ও আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব যে, তাদের অমানুষিক শ্রম ও প্রচেষ্টা একেবারে বৃথা যাচ্ছে না।


মধ্যবিত্ত শ্রেণি কখনোই অসাধারণ কোনো ধন-সম্পদ বা বিলাসী জীবনের স্বপ্ন দেখে না। তাদের প্রত্যাশাগুলো অত্যন্ত সাদামাটা ও স্পষ্ট: একটি সম্মানজনক কর্মসংস্থান, সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, সন্তানের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, সহনীয় ও সহজলভ্য চিকিৎসা ব্যবস্থা, মাথার ওপর নিরাপদ একটি ছাদ এবং জীবনপ্রাহ্ণে মর্যাদাপ॥ূর্ণ অবসরের জন্য সামান্য কিছু সঞ্চয়। এগুলো কোনো বিলাসিতা নয়; বরং সমাজে আত্মমর্যাদা ও ন্যূনতম মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার অপরিহার্য শর্ত।


যখন কঠোর পরিশ্রম ও সর্বোচ্চ ত্যাগের পরও এই মৌলিক নিশ্চয়তাগুলো অর্জিত হয় না, তখন তার ক্ষতিকর প্রভাব কেবল সাধারণ মানুষের কেনাকাটা বা ভোগব্যয় কমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর ফলে সমাজ ও ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা হারিয়ে যায়, সুন্দর ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষাগুলো ম্লান হয়ে পড়ে এবং রাষ্ট্রের ম॥ূল প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি বিশ্বাস টলে যেতে শুরু করে। তাই মধ্যবিত্তের সামাজিক ও আ॥ির্থক নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা কেবল একটি শুষ্ক অ॥র্থনৈতিক লক্ষ্য নয়; বরং সামাজিক গতিশীলতা রক্ষা, একটি উৎপাদনশীল নাগরিক সমাজ গঠন এবং বাংলাদেশের সুন্দর ভবিষ্যতের ওপর জনগণের আস্থা টিকিয়ে রাখার জন্যও এটি অত্যন্ত জরুরি।


[লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী।]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত