সংবাদ

কৃষির রূপান্তর শুরু হোক মানসম্পন্ন বীজ থেকে


মোজাফফর হোসেন
মোজাফফর হোসেন
প্রকাশ: ২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩৯ পিএম

কৃষির রূপান্তর শুরু হোক মানসম্পন্ন বীজ থেকে

কৃষির সাফল্যের শুরু কোথায়? উত্তরটি খুব সহজ—বীজে। কৃষক যত ভালো সার, সেচ, শ্রম ও আধুনিক প্রযুক্তিই ব্যবহার করুন না কেন, শুরুতেই যদি বীজের মান ভালো না হয়, তাহলে পরবর্তী বিনিয়োগের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন। একটি ভালো বীজ শুধু একটি বীজ নয়। এর মধ্যে থাকে উন্নত জাতের জেনেটিক সম্ভাবনা, ভালো অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা, প্রাণশক্তি, জাতের বিশুদ্ধতা ও রোগমুক্ততার নিশ্চয়তা। তাই বীজকে কৃষি উৎপাদনের প্রথম বিনিয়োগ এবং খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি বলা যায়।

বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু আবাদি জমি কমে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ক্রমবর্ধমান খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদার কারণে ভবিষ্যতে একই জমি থেকে আরও বেশি উৎপাদন করতে হবে। এই বাস্তবতায় মানসম্পন্ন ও পরীক্ষিত বীজের ব্যবহার বাড়ানো উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির অন্যতম কার্যকর পথ হতে পারে।

১০০ শতাংশ নয়, ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ হোক বাস্তবসম্মত লক্ষ্য। দেশের প্রতিটি জমিতে স্বল্প সময়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সরবরাহ করা মানসম্পন্ন বীজ নিশ্চিত করা বাস্তবসম্মত নয়। তাই বাস্তবতার আলোকে একটি মধ্যমেয়াদি জাতীয় লক্ষ্য হতে পারে—অন্তত ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ আবাদি জমিতে পরীক্ষিত, মানসম্পন্ন ও অঞ্চল-উপযোগী বীজের ব্যবহার নিশ্চিত করা। এটি কেবল বীজ সরবরাহের লক্ষ্য নয়; এটি হতে পারে কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির একটি জাতীয় কর্মসূচি। তবে তার আগে জানতে হবে—দেশে আসলে কত বীজ প্রয়োজন?

২০২২-২০২৩ সালের প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, বিভিন্ন ফসলের তাত্ত্বিক বীজ চাহিদা ছিল প্রায় ১২ লাখ ১০ হাজার ৩৫১ মেট্রিক টন। এর ৮০ শতাংশের পরিমাণ প্রায় ৯ লাখ ৬৮ হাজার মেট্রিক টন। একই সময়ে বিভিন্ন উৎস থেকে বীজ উৎপাদন ও আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ লাখ ৬১ হাজার ২৬৪ মেট্রিক টন।

তবে এই দুই সংখ্যার পার্থক্যকে সরাসরি ‘মানসম্পন্ন বীজের ঘাটতি’ বলা যাবে না। কারণ কৃষকের নিজস্ব সংরক্ষিত বীজসহ বিভিন্ন উৎসের বীজ মোট সরবরাহের হিসাবের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে এবং সব বীজ একই মানের নয়। তাছাড়া ২০২২-২০২৩ সালের হিসাবকে ২০২৬ সালের বর্তমান চাহিদা হিসেবে ব্যবহার করাও যুক্তিসংগত নয়। অতএব প্রয়োজন সর্বশেষ তথ্যের ভিত্তিতে ফসলভিত্তিক জাতীয় বীজ চাহিদা ও সরবরাহের নতুন হিসাব।

বীজের চাহিদা ফসলভেদে ভিন্ন। ধান, গম, ভুট্টা, পাট, ডাল, তেলবীজ, আলু, সবজি ও মসলার বীজহার এক নয়। অঞ্চলভেদেও চাহিদার পার্থক্য রয়েছে। তাই ‘দেশে মোট কত বীজ প্রয়োজন’—এ প্রশ্নের উত্তর একটি মাত্র সংখ্যায় দেওয়া যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি জাতীয় ফসলভিত্তিক বীজ চাহিদার ছক। সেখানে থাকবে আবাদি এলাকা, ফসলভিত্তিক বীজহার, মোট চাহিদা, ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা, সরকারি ও বেসরকারি সরবরাহ, আমদানি, কৃষকের নিজস্ব বীজ এবং প্রকৃত ঘাটতির হিসাব। এই হিসাব ছাড়া জাতীয় বীজ উৎপাদন পরিকল্পনা অনেকটাই অনুমাননির্ভর থেকে যাবে।

ভালো বীজে ফলন কতটা বাড়তে পারে?

মানসম্পন্ন বীজ ব্যবহারে ফলন বৃদ্ধির যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। বিএডিসির বিভিন্ন নথিতে মানসম্পন্ন বীজ ও সুষম উপকরণ ব্যবহারে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই হার সব ফসল ও সব অঞ্চলের জন্য একই নয়। জাত, বীজের মান, মাটি, আবহাওয়া, সার, সেচ, রোগ-পোকা ব্যবস্থাপনা ও চাষপদ্ধতির ওপর ফলন বৃদ্ধির মাত্রা নির্ভর করে। তাই ৮০ শতাংশ জমিতে ভালো বীজ ব্যবহার করলেই জাতীয় উৎপাদন ২০ শতাংশ বেড়ে যাবে—এমন দাবি বৈজ্ঞানিক হবে না।

তবে সম্ভাব্য প্রভাব বোঝাতে একটি সরল হিসাব করা যায়। যদি ৮০ শতাংশ জমিতে ভালো বীজ ব্যবহারের ফলে ওই জমির ফলন গড়ে ৫ শতাংশ বাড়ে, তাহলে মোট উৎপাদনে তাত্ত্বিক প্রভাব হতে পারে প্রায় ৪ শতাংশ। ফলন ১০ শতাংশ বাড়লে প্রভাব হতে পারে প্রায় ৮ শতাংশ। ১৫ শতাংশ বাড়লে প্রায় ১২ শতাংশ এবং ২০ শতাংশ বাড়লে প্রায় ১৬ শতাংশ।

অর্থাৎ অন্য সবকিছু অপরিবর্তিত থাকলে ৮০ শতাংশ জমিতে মানসম্পন্ন বীজের কারণে সংশ্লিষ্ট জমির ফলন ৫ থেকে ২০ শতাংশ বাড়ার ক্ষেত্রে জাতীয় মোট উৎপাদনে তাত্ত্বিকভাবে প্রায় ৪ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত প্রভাব তৈরি হতে পারে। এটি জাতীয় উৎপাদনের কোনো পূর্বাভাস নয়; সম্ভাব্য প্রভাব বোঝানোর একটি সরল হিসাবমাত্র।

কৃষকের মাঠেই ভালো বীজের প্রমাণ

ভালো বীজ ও উপযোগী জাতের সুফল কেবল গবেষণাগারে নয়, কৃষকের মাঠেও দেখা যায়। খাগড়াছড়ির কৃষক উচিমং মারমার জমিতে আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইআরআরআই) সমর্থনে পরিচালিত মাঠপর্যায়ের পরীক্ষায় বিভিন্ন উন্নত ধানের জাত স্থানীয় চাষপদ্ধতির তুলনায় উল্লেখযোগ্য ফলন দিয়েছে। পরে তিনি উন্নত জাতের ধান চাষে আগ্রহী হন এবং আশপাশের কৃষকদেরও উৎসাহিত করেন।

হাওর এলাকার কৃষক কামরুল ইসলামের অভিজ্ঞতাও তাৎপর্যপূর্ণ। আগাম পরিপক্ব জাতের ধান তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ হাওরে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি রয়েছে। তিনি নিজে বীজ সংরক্ষণ করার পাশাপাশি অন্য কৃষকদেরও বীজ সরবরাহ করেছেন।

আবার সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষক মো. আরাফাত লবণাক্ততা সহনশীল ব্রি ধান৯৯ চাষ করে আগের জাতগুলোর তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি ফলনের কথা জানিয়েছেন। এসব অভিজ্ঞতা দেখায়, শুধু ‘ভালো বীজ’ নয়, সঠিক অঞ্চল ও পরিবেশের জন্য সঠিক জাত নির্বাচনও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে পরিচালিত পুরোনো একাধিক মাঠপর্যায়ের পরীক্ষাতেও পরিচ্ছন্ন বীজ ব্যবহারে কৃষকের প্রচলিত বীজের তুলনায় ধানের ফলন বৃদ্ধির প্রমাণ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ বীজের স্বাস্থ্য ও মানের উন্নয়ন সরাসরি উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত।

বীজ খারাপ হলে অন্য বিনিয়োগও ঝুঁকিতে

কৃষক উন্নত সার কিনলেন, সেচ দিলেন, রোগ-পোকা দমনে অর্থ ব্যয় করলেন। কিন্তু জমিতে যদি নিম্নমানের, মিশ্রিত বা দুর্বল বীজ ব্যবহার করা হয়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত গাছের সংখ্যা ও সমতা নাও পাওয়া যেতে পারে। ফলে সার, সেচ, শ্রম ও অন্যান্য উপকরণে কৃষকের বিনিয়োগের একটি অংশ কাঙ্ক্ষিত উৎপাদনে রূপান্তরিত হয় না। ভালো বীজ তাই শুধু ফলন বাড়ায় না; কৃষকের অন্যান্য বিনিয়োগের দক্ষতাও বাড়াতে সাহায্য করে।

শুধু কত টন নয়, কত টন মানসম্পন্ন বীজ

জাতীয় বীজ ব্যবস্থাপনায় এখন একটি মৌলিক প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন—‘কত টন বীজ উৎপাদন হয়েছে?’ এর পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ‘কত টন মানসম্পন্ন বীজ সঠিক সময়ে কৃষকের হাতে পৌঁছেছে?’

এক টন বীজ উৎপাদন এবং এক টন মানসম্পন্ন বীজ কৃষকের হাতে পৌঁছানো এক বিষয় নয়। অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা, জাতের বিশুদ্ধতা, আর্দ্রতা, রোগমুক্ততা, প্রাণশক্তি, সংরক্ষণক্ষমতা এবং সঠিক পরিচিতি—সবকিছুর নিশ্চয়তা থাকতে হবে। নিম্নমানের বা ভেজাল বীজ কৃষকের ক্ষতির পাশাপাশি জাতীয় কৃষি উৎপাদনেরও অপচয় ঘটায়।

কৃষকের নিজস্ব বীজ ব্যবস্থাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশে কৃষকের নিজস্ব বীজ সংরক্ষণ ব্যবস্থা রাতারাতি বন্ধ করা সম্ভবও নয়। বরং এই ব্যবস্থাকে আরও বৈজ্ঞানিক করতে হবে। কৃষককে জানতে হবে—কোন গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করবেন, কীভাবে বীজ শুকাবেন, কীভাবে রোগমুক্ত বীজ নির্বাচন করবেন, কীভাবে সংরক্ষণ করবেন এবং কখন বীজ পরিবর্তন করবেন। অর্থাৎ জাতীয় বীজ ব্যবস্থায় প্রাতিষ্ঠানিক মানসম্পন্ন বীজ এবং কৃষকের নিজস্ব ভালো বীজ—দুই ব্যবস্থাকেই সমন্বিতভাবে দেখতে হবে।

দরকার জাতীয় ৮০ শতাংশ মানসম্পন্ন বীজ কর্মসূচি

বাংলাদেশের বাস্তবতায় ‘জাতীয় ৮০ শতাংশ মানসম্পন্ন বীজ ব্যবহার কর্মসূচি’ গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রথমে সর্বশেষ তথ্যের ভিত্তিতে ফসলভিত্তিক বীজের চাহিদা নির্ধারণ করতে হবে। এরপর ৮০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সরকারি-বেসরকারি উৎপাদন সক্ষমতা, আমদানি, কৃষকের নিজস্ব বীজ এবং প্রকৃত ঘাটতি চিহ্নিত করতে হবে।

তারপর বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, মান পরীক্ষা, সংরক্ষণ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও কৃষকের ব্যবহার—এই পুরো শৃঙ্খলকে শক্তিশালী করতে হবে। এ কাজে বিএডিসি, কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বীজ প্রত্যয়ন সংস্থা, বেসরকারি বীজ কোম্পানি ও কৃষক সংগঠনগুলোর সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।

কৃষির রূপান্তর শুরু হোক বীজ থেকে

বাংলাদেশের কৃষি অনেক দূর এগিয়েছে। কিন্তু আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ আরও কঠিন—কম জমিতে বেশি উৎপাদন, জলবায়ু সহনশীল কৃষি, নিরাপদ খাদ্য, পুষ্টি, কৃষকের আয় এবং খাদ্যনিরাপত্তা। এই প্রতিটি লক্ষ্যেই বীজের ভূমিকা রয়েছে।

১০০ শতাংশ মানসম্পন্ন বীজ ব্যবহারের লক্ষ্য হয়তো এখনই বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ একটি পরিমাপযোগ্য ও ধাপে ধাপে অর্জনযোগ্য লক্ষ্য হতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন স্লোগান নয়, সঠিক হিসাব। জানতে হবে—দেশে কত বীজ প্রয়োজন, কোন ফসলে কত প্রয়োজন, কত মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদিত হচ্ছে, কত আমদানি হচ্ছে, কৃষকের নিজস্ব বীজের কত অংশ মানসম্মত এবং প্রকৃত ঘাটতি কত।

এই হিসাবের ভিত্তিতে যদি ৮০ শতাংশ মানসম্পন্ন বীজ ব্যবহারের লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে বাংলাদেশের কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির একটি বড় সুযোগ তৈরি হবে। কারণ কৃষির রূপান্তর শুরু হয় একটি বীজ থেকে। মানসম্পন্ন কোটি কোটি বীজই পারে বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার ভিতকে আরও শক্তিশালী করতে। বীজ নিরাপদ হলে কৃষি নিরাপদ; কৃষি শক্তিশালী হলে শক্তিশালী হয় খাদ্যনিরাপত্তা।

[লেখক: ব্যবস্থাপক (উদ্যান), বিএডিসি]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬


কৃষির রূপান্তর শুরু হোক মানসম্পন্ন বীজ থেকে

প্রকাশের তারিখ : ০২ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

কৃষির সাফল্যের শুরু কোথায়? উত্তরটি খুব সহজ—বীজে। কৃষক যত ভালো সার, সেচ, শ্রম ও আধুনিক প্রযুক্তিই ব্যবহার করুন না কেন, শুরুতেই যদি বীজের মান ভালো না হয়, তাহলে পরবর্তী বিনিয়োগের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন। একটি ভালো বীজ শুধু একটি বীজ নয়। এর মধ্যে থাকে উন্নত জাতের জেনেটিক সম্ভাবনা, ভালো অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা, প্রাণশক্তি, জাতের বিশুদ্ধতা ও রোগমুক্ততার নিশ্চয়তা। তাই বীজকে কৃষি উৎপাদনের প্রথম বিনিয়োগ এবং খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি বলা যায়।

বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু আবাদি জমি কমে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ক্রমবর্ধমান খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদার কারণে ভবিষ্যতে একই জমি থেকে আরও বেশি উৎপাদন করতে হবে। এই বাস্তবতায় মানসম্পন্ন ও পরীক্ষিত বীজের ব্যবহার বাড়ানো উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির অন্যতম কার্যকর পথ হতে পারে।

১০০ শতাংশ নয়, ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ হোক বাস্তবসম্মত লক্ষ্য। দেশের প্রতিটি জমিতে স্বল্প সময়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সরবরাহ করা মানসম্পন্ন বীজ নিশ্চিত করা বাস্তবসম্মত নয়। তাই বাস্তবতার আলোকে একটি মধ্যমেয়াদি জাতীয় লক্ষ্য হতে পারে—অন্তত ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ আবাদি জমিতে পরীক্ষিত, মানসম্পন্ন ও অঞ্চল-উপযোগী বীজের ব্যবহার নিশ্চিত করা। এটি কেবল বীজ সরবরাহের লক্ষ্য নয়; এটি হতে পারে কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির একটি জাতীয় কর্মসূচি। তবে তার আগে জানতে হবে—দেশে আসলে কত বীজ প্রয়োজন?

২০২২-২০২৩ সালের প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, বিভিন্ন ফসলের তাত্ত্বিক বীজ চাহিদা ছিল প্রায় ১২ লাখ ১০ হাজার ৩৫১ মেট্রিক টন। এর ৮০ শতাংশের পরিমাণ প্রায় ৯ লাখ ৬৮ হাজার মেট্রিক টন। একই সময়ে বিভিন্ন উৎস থেকে বীজ উৎপাদন ও আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ লাখ ৬১ হাজার ২৬৪ মেট্রিক টন।

তবে এই দুই সংখ্যার পার্থক্যকে সরাসরি ‘মানসম্পন্ন বীজের ঘাটতি’ বলা যাবে না। কারণ কৃষকের নিজস্ব সংরক্ষিত বীজসহ বিভিন্ন উৎসের বীজ মোট সরবরাহের হিসাবের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে এবং সব বীজ একই মানের নয়। তাছাড়া ২০২২-২০২৩ সালের হিসাবকে ২০২৬ সালের বর্তমান চাহিদা হিসেবে ব্যবহার করাও যুক্তিসংগত নয়। অতএব প্রয়োজন সর্বশেষ তথ্যের ভিত্তিতে ফসলভিত্তিক জাতীয় বীজ চাহিদা ও সরবরাহের নতুন হিসাব।

বীজের চাহিদা ফসলভেদে ভিন্ন। ধান, গম, ভুট্টা, পাট, ডাল, তেলবীজ, আলু, সবজি ও মসলার বীজহার এক নয়। অঞ্চলভেদেও চাহিদার পার্থক্য রয়েছে। তাই ‘দেশে মোট কত বীজ প্রয়োজন’—এ প্রশ্নের উত্তর একটি মাত্র সংখ্যায় দেওয়া যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি জাতীয় ফসলভিত্তিক বীজ চাহিদার ছক। সেখানে থাকবে আবাদি এলাকা, ফসলভিত্তিক বীজহার, মোট চাহিদা, ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা, সরকারি ও বেসরকারি সরবরাহ, আমদানি, কৃষকের নিজস্ব বীজ এবং প্রকৃত ঘাটতির হিসাব। এই হিসাব ছাড়া জাতীয় বীজ উৎপাদন পরিকল্পনা অনেকটাই অনুমাননির্ভর থেকে যাবে।

ভালো বীজে ফলন কতটা বাড়তে পারে?

মানসম্পন্ন বীজ ব্যবহারে ফলন বৃদ্ধির যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। বিএডিসির বিভিন্ন নথিতে মানসম্পন্ন বীজ ও সুষম উপকরণ ব্যবহারে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই হার সব ফসল ও সব অঞ্চলের জন্য একই নয়। জাত, বীজের মান, মাটি, আবহাওয়া, সার, সেচ, রোগ-পোকা ব্যবস্থাপনা ও চাষপদ্ধতির ওপর ফলন বৃদ্ধির মাত্রা নির্ভর করে। তাই ৮০ শতাংশ জমিতে ভালো বীজ ব্যবহার করলেই জাতীয় উৎপাদন ২০ শতাংশ বেড়ে যাবে—এমন দাবি বৈজ্ঞানিক হবে না।

তবে সম্ভাব্য প্রভাব বোঝাতে একটি সরল হিসাব করা যায়। যদি ৮০ শতাংশ জমিতে ভালো বীজ ব্যবহারের ফলে ওই জমির ফলন গড়ে ৫ শতাংশ বাড়ে, তাহলে মোট উৎপাদনে তাত্ত্বিক প্রভাব হতে পারে প্রায় ৪ শতাংশ। ফলন ১০ শতাংশ বাড়লে প্রভাব হতে পারে প্রায় ৮ শতাংশ। ১৫ শতাংশ বাড়লে প্রায় ১২ শতাংশ এবং ২০ শতাংশ বাড়লে প্রায় ১৬ শতাংশ।

অর্থাৎ অন্য সবকিছু অপরিবর্তিত থাকলে ৮০ শতাংশ জমিতে মানসম্পন্ন বীজের কারণে সংশ্লিষ্ট জমির ফলন ৫ থেকে ২০ শতাংশ বাড়ার ক্ষেত্রে জাতীয় মোট উৎপাদনে তাত্ত্বিকভাবে প্রায় ৪ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত প্রভাব তৈরি হতে পারে। এটি জাতীয় উৎপাদনের কোনো পূর্বাভাস নয়; সম্ভাব্য প্রভাব বোঝানোর একটি সরল হিসাবমাত্র।

কৃষকের মাঠেই ভালো বীজের প্রমাণ

ভালো বীজ ও উপযোগী জাতের সুফল কেবল গবেষণাগারে নয়, কৃষকের মাঠেও দেখা যায়। খাগড়াছড়ির কৃষক উচিমং মারমার জমিতে আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইআরআরআই) সমর্থনে পরিচালিত মাঠপর্যায়ের পরীক্ষায় বিভিন্ন উন্নত ধানের জাত স্থানীয় চাষপদ্ধতির তুলনায় উল্লেখযোগ্য ফলন দিয়েছে। পরে তিনি উন্নত জাতের ধান চাষে আগ্রহী হন এবং আশপাশের কৃষকদেরও উৎসাহিত করেন।

হাওর এলাকার কৃষক কামরুল ইসলামের অভিজ্ঞতাও তাৎপর্যপূর্ণ। আগাম পরিপক্ব জাতের ধান তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ হাওরে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি রয়েছে। তিনি নিজে বীজ সংরক্ষণ করার পাশাপাশি অন্য কৃষকদেরও বীজ সরবরাহ করেছেন।

আবার সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষক মো. আরাফাত লবণাক্ততা সহনশীল ব্রি ধান৯৯ চাষ করে আগের জাতগুলোর তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি ফলনের কথা জানিয়েছেন। এসব অভিজ্ঞতা দেখায়, শুধু ‘ভালো বীজ’ নয়, সঠিক অঞ্চল ও পরিবেশের জন্য সঠিক জাত নির্বাচনও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে পরিচালিত পুরোনো একাধিক মাঠপর্যায়ের পরীক্ষাতেও পরিচ্ছন্ন বীজ ব্যবহারে কৃষকের প্রচলিত বীজের তুলনায় ধানের ফলন বৃদ্ধির প্রমাণ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ বীজের স্বাস্থ্য ও মানের উন্নয়ন সরাসরি উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত।

বীজ খারাপ হলে অন্য বিনিয়োগও ঝুঁকিতে

কৃষক উন্নত সার কিনলেন, সেচ দিলেন, রোগ-পোকা দমনে অর্থ ব্যয় করলেন। কিন্তু জমিতে যদি নিম্নমানের, মিশ্রিত বা দুর্বল বীজ ব্যবহার করা হয়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত গাছের সংখ্যা ও সমতা নাও পাওয়া যেতে পারে। ফলে সার, সেচ, শ্রম ও অন্যান্য উপকরণে কৃষকের বিনিয়োগের একটি অংশ কাঙ্ক্ষিত উৎপাদনে রূপান্তরিত হয় না। ভালো বীজ তাই শুধু ফলন বাড়ায় না; কৃষকের অন্যান্য বিনিয়োগের দক্ষতাও বাড়াতে সাহায্য করে।

শুধু কত টন নয়, কত টন মানসম্পন্ন বীজ

জাতীয় বীজ ব্যবস্থাপনায় এখন একটি মৌলিক প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন—‘কত টন বীজ উৎপাদন হয়েছে?’ এর পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ‘কত টন মানসম্পন্ন বীজ সঠিক সময়ে কৃষকের হাতে পৌঁছেছে?’

এক টন বীজ উৎপাদন এবং এক টন মানসম্পন্ন বীজ কৃষকের হাতে পৌঁছানো এক বিষয় নয়। অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা, জাতের বিশুদ্ধতা, আর্দ্রতা, রোগমুক্ততা, প্রাণশক্তি, সংরক্ষণক্ষমতা এবং সঠিক পরিচিতি—সবকিছুর নিশ্চয়তা থাকতে হবে। নিম্নমানের বা ভেজাল বীজ কৃষকের ক্ষতির পাশাপাশি জাতীয় কৃষি উৎপাদনেরও অপচয় ঘটায়।

কৃষকের নিজস্ব বীজ ব্যবস্থাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশে কৃষকের নিজস্ব বীজ সংরক্ষণ ব্যবস্থা রাতারাতি বন্ধ করা সম্ভবও নয়। বরং এই ব্যবস্থাকে আরও বৈজ্ঞানিক করতে হবে। কৃষককে জানতে হবে—কোন গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করবেন, কীভাবে বীজ শুকাবেন, কীভাবে রোগমুক্ত বীজ নির্বাচন করবেন, কীভাবে সংরক্ষণ করবেন এবং কখন বীজ পরিবর্তন করবেন। অর্থাৎ জাতীয় বীজ ব্যবস্থায় প্রাতিষ্ঠানিক মানসম্পন্ন বীজ এবং কৃষকের নিজস্ব ভালো বীজ—দুই ব্যবস্থাকেই সমন্বিতভাবে দেখতে হবে।

দরকার জাতীয় ৮০ শতাংশ মানসম্পন্ন বীজ কর্মসূচি

বাংলাদেশের বাস্তবতায় ‘জাতীয় ৮০ শতাংশ মানসম্পন্ন বীজ ব্যবহার কর্মসূচি’ গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রথমে সর্বশেষ তথ্যের ভিত্তিতে ফসলভিত্তিক বীজের চাহিদা নির্ধারণ করতে হবে। এরপর ৮০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সরকারি-বেসরকারি উৎপাদন সক্ষমতা, আমদানি, কৃষকের নিজস্ব বীজ এবং প্রকৃত ঘাটতি চিহ্নিত করতে হবে।

তারপর বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, মান পরীক্ষা, সংরক্ষণ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও কৃষকের ব্যবহার—এই পুরো শৃঙ্খলকে শক্তিশালী করতে হবে। এ কাজে বিএডিসি, কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বীজ প্রত্যয়ন সংস্থা, বেসরকারি বীজ কোম্পানি ও কৃষক সংগঠনগুলোর সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।

কৃষির রূপান্তর শুরু হোক বীজ থেকে

বাংলাদেশের কৃষি অনেক দূর এগিয়েছে। কিন্তু আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ আরও কঠিন—কম জমিতে বেশি উৎপাদন, জলবায়ু সহনশীল কৃষি, নিরাপদ খাদ্য, পুষ্টি, কৃষকের আয় এবং খাদ্যনিরাপত্তা। এই প্রতিটি লক্ষ্যেই বীজের ভূমিকা রয়েছে।

১০০ শতাংশ মানসম্পন্ন বীজ ব্যবহারের লক্ষ্য হয়তো এখনই বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ একটি পরিমাপযোগ্য ও ধাপে ধাপে অর্জনযোগ্য লক্ষ্য হতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন স্লোগান নয়, সঠিক হিসাব। জানতে হবে—দেশে কত বীজ প্রয়োজন, কোন ফসলে কত প্রয়োজন, কত মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদিত হচ্ছে, কত আমদানি হচ্ছে, কৃষকের নিজস্ব বীজের কত অংশ মানসম্মত এবং প্রকৃত ঘাটতি কত।

এই হিসাবের ভিত্তিতে যদি ৮০ শতাংশ মানসম্পন্ন বীজ ব্যবহারের লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে বাংলাদেশের কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির একটি বড় সুযোগ তৈরি হবে। কারণ কৃষির রূপান্তর শুরু হয় একটি বীজ থেকে। মানসম্পন্ন কোটি কোটি বীজই পারে বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার ভিতকে আরও শক্তিশালী করতে। বীজ নিরাপদ হলে কৃষি নিরাপদ; কৃষি শক্তিশালী হলে শক্তিশালী হয় খাদ্যনিরাপত্তা।

[লেখক: ব্যবস্থাপক (উদ্যান), বিএডিসি]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত