সংবাদ

সৌরবিদ্যুতের বড় লক্ষ্য, বাস্তবায়নে কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?


জাহেদ সেলিম
জাহেদ সেলিম
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৫০ পিএম

সৌরবিদ্যুতের বড় লক্ষ্য, বাস্তবায়নে কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?

বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সৌরবিদ্যুৎ এখন আর কেবল বিকল্প কোনো উৎস নয়, ভবিষ্যতের বিদ্যুৎব্যবস্থায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

বাড়ির ছাদ থেকে শিল্পকারখানা, সরকারি ভবন থেকে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র - বিভিন্ন ক্ষেত্রে সূর্যের আলো কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। সরকারও ২০৩০ সালের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

কিন্তু বড় লক্ষ্য নির্ধারণ আর তা বাস্তবায়ন করা এক বিষয় নয়। সৌর প্যানেল স্থাপনের খরচ কে বহন করবে, উৎপাদিত বিদ্যুতের ন্যায্য দাম পাওয়া যাবে কি না, ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ মিলবে কি না - এসব প্রশ্নের সমাধান ছাড়া পরিকল্পনাটি কতটা এগোবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। বাংলাদেশের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ শুধু সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো নয়, বরং এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে সাধারণ গ্রাহক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিনিয়োগে উৎসাহিত হবে, উৎপাদিত বিদ্যুৎ কার্যকরভাবে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে এবং বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাওয়ার বাস্তবসম্মত সুযোগ থাকবে।

লক্ষ্যমাত্রা বড়, বাস্তবায়নের পথ কতটা মসৃণ?

২০৩০ সালের মধ্যে দেশে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎব্যবস্থা থেকে এবং ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট ভূমিভিত্তিক প্রকল্প থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া বায়ুবিদ্যুৎ, বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎস থেকেও অতিরিক্ত সক্ষমতা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়বে। আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি দিনের বেলায় জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমাতেও সৌরবিদ্যুৎ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে যেসব শিল্পকারখানায় দিনের বেলায় বিদ্যুতের ব্যবহার বেশি, সেখানে নিজস্ব সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বিদ্যুৎ ব্যয় কমানোর কার্যকর উপায় হতে পারে।

তবে লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে বর্তমান সক্ষমতা ও বাস্তব অগ্রগতির ব্যবধান বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। নতুন প্রকল্প ঘোষণা, সৌর প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ এবং বাস্তবে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়া বিদ্যুতের পরিমাণ এক নয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লক্ষ্য অর্জন করতে হলে প্রতিবছর কতটা নতুন সক্ষমতা যুক্ত করতে হবে, বিনিয়োগ কোথা থেকে আসবে এবং কোন বাধাগুলো দূর করতে হবে, তার সুস্পষ্ট হিসাব প্রয়োজন।

শুধু পরিকল্পনায় সক্ষমতার পরিমাণ উল্লেখ করে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। প্রয়োজন বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা, কার্যকর তদারকি এবং নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনা। পাশাপাশি বর্তমানে কত মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা চালু রয়েছে, কতটি প্রকল্প নির্মাণাধীন এবং নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নে কী ধরনের অগ্রগতি হচ্ছে - এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন।

ছাদে সৌর প্যানেল, কিন্তু বিনিয়োগের আগ্রহ কতটা?

ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুযোগ। শহরের আবাসিক ভবন, সরকারি স্থাপনা, বিপণিবিতান ও শিল্পকারখানার ছাদ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। এতে নতুন করে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন কমে এবং উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি বড় অংশ সরাসরি ব্যবহার করা যায়।

তবে সব ছাদ সৌর প্যানেল স্থাপনের জন্য সমান উপযোগী নয়। ছাদের আয়তন, নকশা, ছায়া, ভবনের কাঠামোগত সক্ষমতা, স্থাপনের নিরাপত্তা এবং বিদ্যুতের প্রকৃত চাহিদা বিবেচনায় নিতে হয়। এসব বিষয় যাচাই না করে বিনিয়োগ করলে প্রত্যাশিত উৎপাদন ও আর্থিক সুবিধা পাওয়া কঠিন হতে পারে।

ঢাকার বহুতল আবাসিক ভবনগুলোতে বিষয়টি আরও জটিল। একটি ভবনে একাধিক ফ্ল্যাটমালিক থাকেন। ছাদ যৌথ ব্যবহারের জায়গা হলেও সেখানে সৌর প্যানেল স্থাপন, বিনিয়োগের অর্থ ভাগাভাগি এবং উৎপাদিত বিদ্যুতের সুবিধা বণ্টন নিয়ে মতভেদ তৈরি হতে পারে। একজন বিনিয়োগ করলেন, অথচ অন্যরাও সুবিধা পেলেন - এমন পরিস্থিতিতে ন্যায্য হিসাবের ব্যবস্থা না থাকলে উদ্যোগটি টেকসই হবে না।

এ কারণে আবাসিক ভবনের ক্ষেত্রে শুধু প্যানেল স্থাপনে প্রণোদনা দিলেই চলবে না। যৌথ বিনিয়োগের নিয়ম, বিদ্যুতের ব্যবহার ও ব্যয়ের হিসাব ভাগাভাগি এবং জাতীয় গ্রিডে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। একই সঙ্গে ভবনমালিক ও ফ্ল্যাটমালিকদের অধিকার ও দায়িত্ব স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

সাড়ে ১০ টাকায় বিদ্যুৎ বিক্রি: লাভের হিসাব কী বলছে?

ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। নির্ধারিত শর্তে ব্যাটারিসহ সৌরবিদ্যুৎব্যবস্থা স্থাপন করে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭-এর মধ্যে জাতীয় গ্রিডে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করলে প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ সুবিধা ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০৩০ পর্যন্ত কার্যকর থাকার কথা। তবে এ প্রণোদনা পেতে সংশ্লিষ্ট নীতিমালা ও কারিগরি শর্ত পূরণ করতে হবে।

উদ্যোগটি গ্রাহকদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে পারে। তবে বিদ্যুৎ বিক্রির মূল্য ও সুবিধার শর্তের পাশাপাশি উৎপাদনের মোট খরচ এবং বিনিয়োগ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনাও বিবেচনা করতে হবে।

সৌর প্যানেল, ইনভার্টার, বৈদ্যুতিক সংযোগ, স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ - সবকিছুর পেছনে বিনিয়োগ প্রয়োজন। ব্যাটারি যুক্ত করলে ব্যয় আরও বাড়ে। ঋণ নিয়ে প্রকল্প স্থাপন করলে সুদের খরচও যুক্ত হয়। ফলে শুধু বিদ্যুৎ বিক্রির মূল্য বিবেচনা করে প্রকল্পের লাভজনকতা নির্ধারণ করা যায় না।

প্রচলিত বাজারদরের একটি আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, তিন কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎব্যবস্থা স্থাপনে দেড় লাখ থেকে এক লাখ ৬৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লাগতে পারে। ব্যাটারি যুক্ত করলে মোট বিনিয়োগ প্রায় পৌনে তিন লাখ থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তবে সরঞ্জামের মান, ব্যাটারির ধরন ও সক্ষমতা, স্থাপনের শর্ত এবং প্রকল্পের কাঠামোর ওপর প্রকৃত ব্যয় নির্ভর করবে। এ হিসাবকে তাই নির্দিষ্ট বাজারদর নয়, আনুমানিক ব্যয় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

এখন প্রশ্ন হলো, এই বিনিয়োগ থেকে কত দিনে অর্থ ফেরত আসবে? উৎপাদিত বিদ্যুতের কতটা নিজে ব্যবহার করা যাবে, কতটা গ্রিডে বিক্রি করা সম্ভব হবে এবং বিক্রির অর্থ কতটা নিয়মিত পাওয়া যাবে - এসব হিসাবের ওপর বিনিয়োগের লাভজনকতা নির্ভর করে।

বিশেষ করে ছোট গ্রাহকদের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট ব্যয় বেশি হলে এবং উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের বিক্রির পরিমাণ কম হলে প্রত্যাশিত আর্থিক সুবিধা পাওয়া কঠিন হতে পারে। তাই শুধু একটি নির্দিষ্ট ক্রয়মূল্য ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়। বিনিয়োগের ব্যয়, ঋণের সুদ, নিজস্ব ব্যবহারের মাধ্যমে সাশ্রয় এবং প্রকল্পের আয়ুষ্কাল বিবেচনায় নিয়ে এমন ব্যবস্থা প্রয়োজন, যাতে গ্রাহক নিজের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ বিক্রি করেও যুক্তিসংগত আর্থিক সুবিধা পান।

শিল্পকারখানায় সম্ভাবনা বেশি, অর্থায়ন বড় বাধা

বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একদিকে বিদ্যুতের ব্যয় কমানোর প্রয়োজন, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের শর্ত - দুই কারণে কারখানার মালিকদের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের আগ্রহ বাড়ছে।

অনেক কারখানার বিশাল ছাদ রয়েছে। সেখানে সৌর প্যানেল স্থাপন করে দিনের বেলায় বিদ্যুতের একটি অংশ নিজস্বভাবে উৎপাদন করা সম্ভব। এতে জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ কেনার প্রয়োজন কমতে পারে এবং উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হতে পারে। পাশাপাশি কারখানার কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য পূরণেও এটি সহায়ক হতে পারে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ২০ আগস্ট ২০২৬-এ প্রকাশিত এক সমীক্ষায় বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোর ছাদে প্রায় ১ হাজার ৭৬৮ মেগাওয়াট-পিক (MWp) সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। এ হিসাব কারখানাগুলোর ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা নির্দেশ করে। বাস্তবে উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ সূর্যালোক, আবহাওয়া ও ব্যবস্থার কার্যকারিতার ওপর নির্ভর করবে।

এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু কারখানার মালিকদের আগ্রহ থাকলেও সব ক্ষেত্রে অর্থায়নের নিশ্চয়তা নেই। বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনে এককালীন বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। ব্যাংকঋণের সুদ বেশি হলে বা ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়া দীর্ঘ হলে বিনিয়োগের পরিকল্পনা পিছিয়ে যেতে পারে।

এ ক্ষেত্রে সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, প্রকল্পের শুরুতেই অর্থায়নের নিশ্চয়তা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানাগুলোর জন্য সহজলভ্য সবুজ অর্থায়নের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। যেসব প্রতিষ্ঠান সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে আগ্রহী, তাদের জন্য ঋণ ও বিনিয়োগের ব্যবস্থা সহজ করা গেলে শিল্প খাতের সম্ভাবনাকে বাস্তব উৎপাদনে রূপ দেওয়া সম্ভব হবে।

একই সঙ্গে সরকারি ভবন ও বড় বাণিজ্যিক স্থাপনাগুলোতেও ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। এসব ভবনে পরিকল্পিতভাবে সৌর প্যানেল স্থাপন করা গেলে জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা সম্ভব। সরকারি স্থাপনাগুলোতে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরন ও ছাদের উপযোগিতা যাচাই করে অগ্রাধিকারভিত্তিতে প্রকল্প নেওয়া যেতে পারে।

বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য জমি কোথায়?

ছাদভিত্তিক উৎপাদনের পাশাপাশি বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনও জরুরি। তবে এসব প্রকল্পের জন্য পর্যাপ্ত জমি পাওয়া বাংলাদেশের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, আবাসন ও শিল্পায়নের চাপে কৃষিজমির ওপর ক্রমাগত চাপ তৈরি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য কৃষিজমি ব্যবহার করলে খাদ্য উৎপাদন ও স্থানীয় মানুষের জীবিকার ওপর প্রভাব পড়তে পারে।

তাই জমি নির্বাচনের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। পতিত বা অনুপযোগী জমি, উপযুক্ত সরকারি জমি এবং অন্যান্য বিকল্প স্থান চিহ্নিত করে সেগুলোর সম্ভাব্যতা যাচাই করা যেতে পারে। জমির মালিকানা, পরিবেশগত প্রভাব এবং স্থানীয় মানুষের স্বার্থ বিবেচনায় না নিলে প্রকল্প বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

এ ছাড়া বড় প্রকল্পের জন্য জমি পাওয়া গেলেও বিদ্যুৎ সঞ্চালনের উপযুক্ত ব্যবস্থা থাকতে হবে। উৎপাদনকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় সঞ্চালন লাইন ও উপকেন্দ্র না থাকলে উৎপাদন বাড়িয়েও পুরো সুবিধা পাওয়া যাবে না। ফলে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনার সঙ্গে সঞ্চালন অবকাঠামোর উন্নয়নও সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে।

গ্রিডের সক্ষমতা না বাড়লে উৎপাদনের সুফল মিলবে কীভাবে?

সৌরবিদ্যুতের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এর উৎপাদন সূর্যের আলো ও আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। দিনের বেলায় উৎপাদন বেশি হলেও সন্ধ্যার পর তা কমে যায়। ফলে জাতীয় বিদ্যুৎব্যবস্থার সঙ্গে সৌরবিদ্যুতের সমন্বয় করতে উন্নত গ্রিড ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।

একই সময়ে অনেক এলাকায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়ে গেলে গ্রিডকে সেই বিদ্যুৎ গ্রহণ, সঞ্চালন ও বিতরণ করতে সক্ষম হতে হবে। প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও সঞ্চালন অবকাঠামো দুর্বল হলে উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে স্মার্ট গ্রিড, উন্নত উৎপাদন পূর্বাভাস এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুৎ সংরক্ষণের প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ব্যাটারিতে বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করে পরবর্তী সময়ে ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও এর জন্য বাড়তি বিনিয়োগ প্রয়োজন। তাই সব প্রকল্পে একই ধরনের প্রযুক্তি প্রয়োগ না করে প্রকল্পের আকার, অবস্থান, উৎপাদনের ধরন ও বিদ্যুতের চাহিদা অনুযায়ী সমাধান নির্ধারণ করতে হবে।

সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডের সক্ষমতা ও নমনীয়তা বাড়ানো জরুরি। উৎপাদিত বিদ্যুৎ কীভাবে গ্রহণ, ব্যবস্থাপনা ও বিতরণ করা হবে, তার বাস্তব পরিকল্পনা ছাড়া শুধু উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া সম্ভব নয়।

বিদেশি বিনিয়োগের জন্য আস্থা ফেরানো জরুরি

প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলতে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। দেশীয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কোনো প্রকল্পে অর্থ দেওয়ার আগে নীতিমালার স্থিতিশীলতা, অনুমোদন প্রক্রিয়া, বিদ্যুৎ কেনার নিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা যাচাই করেন। এসব বিষয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাতে অতীতে অনুমোদিত কিছু প্রকল্প বাতিলের অভিজ্ঞতা নিয়েও বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রশ্ন সামনে এসেছে। ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার বিশেষ আইনের আওতায় অনুমোদিত একাধিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের উদ্যোগ নেয়। তবে এ সিদ্ধান্তের ফলে নতুন বিনিয়োগ কতটা প্রভাবিত হয়েছে, তা নির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

সাধারণভাবে বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতিগত ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং চুক্তির নির্ভরযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারকে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে প্রকল্প অনুমোদনের নিয়ম স্পষ্ট থাকবে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অযথা বিলম্ব হবে না এবং বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারবেন।

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পাশাপাশি দেশীয় শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি। সৌর প্যানেল স্থাপন, বৈদ্যুতিক প্রকৌশল, রক্ষণাবেক্ষণ ও গ্রিড ব্যবস্থাপনায় দক্ষ জনবল তৈরি করা না গেলে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনায় সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও স্থানীয় সক্ষমতা উন্নয়নেও গুরুত্ব দিতে হবে।

লক্ষ্যে পৌঁছাতে এখন কী করা দরকার?

২০৩০ সালের সৌরবিদ্যুৎ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য বিচ্ছিন্ন কিছু উদ্যোগের পরিবর্তে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি পদক্ষেপ বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।

প্রথমত, সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। আবাসিক গ্রাহক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য স্বল্প সুদের ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। ঋণের পরিমাণ, পরিশোধের সময়সীমা ও অন্যান্য শর্ত এমন হওয়া প্রয়োজন, যাতে প্রকল্পের আর্থিক সাশ্রয় ও আয় দিয়ে বিনিয়োগের ব্যয় মেটানো সম্ভব হয়।

দ্বিতীয়ত, সৌর সরঞ্জামের ব্যয় কমাতে হবে। সৌর প্যানেল, ইনভার্টার ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জামের আমদানি এবং স্থানীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে হবে। শুল্ক ও করের কাঠামো এমনভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যাতে প্রকল্পের ব্যয় অযথা না বাড়ে। একই সঙ্গে সরঞ্জামের মান নিশ্চিত করা এবং নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি।

তৃতীয়ত, উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ কেনার ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে। বিদ্যুতের ক্রয়মূল্য ও শর্ত নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিনিয়োগের প্রকৃত ব্যয়, প্রকল্পের আকার এবং গ্রাহকের বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরন বিবেচনায় নিতে হবে। পাশাপাশি গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ, মিটারিং ও বিল পরিশোধের প্রক্রিয়া সহজ, স্বচ্ছ ও সময়োপযোগী করতে হবে।

চতুর্থত, জাতীয় গ্রিডের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সঞ্চালন লাইন, উপকেন্দ্র, স্মার্ট গ্রিড এবং প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের সঙ্গে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

পঞ্চমত, জমির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কৃষিজমি রক্ষা করে উপযুক্ত স্থানে বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন এবং ভবনের ছাদকে উৎপাদনের কাজে লাগানোর জন্য কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রকল্পের পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব বিবেচনায় নিতে হবে।

ষষ্ঠত, বিনিয়োগ ও নীতিগত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্প অনুমোদন, বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি, অর্থায়ন এবং বাস্তবায়নের নিয়ম স্পষ্ট ও পূর্বানুমানযোগ্য হওয়া জরুরি। এতে দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা সহজ হবে।

সবশেষে, লক্ষ্যমাত্রার অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। কত মেগাওয়াট সক্ষমতা বাস্তবে যুক্ত হয়েছে, কতটি প্রকল্প নির্মাণাধীন এবং কোন বাধায় কাজ আটকে আছে - এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি নির্ধারিত লক্ষ্যের বিপরীতে বাস্তব অগ্রগতির তুলনামূলক হিসাব প্রকাশ করতে হবে। এতে পরিকল্পনার দুর্বলতা চিহ্নিত করা সহজ হবে এবং সরকারি ও বেসরকারি খাতের দায়িত্বও স্পষ্ট করা যাবে।

সৌরবিদ্যুতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে বাস্তব পদক্ষেপের ওপর

বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। শিল্পকারখানা, সরকারি স্থাপনা ও আবাসিক ভবনের ছাদ ব্যবহার এবং উপযুক্ত জমিতে বড় প্রকল্প গড়ে তোলার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে বিনিয়োগের সুযোগ, ন্যায্য বিদ্যুৎ মূল্য, উন্নত গ্রিডব্যবস্থা এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে।

২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা তাই শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি সংখ্যা নয়, এটি দেশের জ্বালানি পরিকল্পনা, বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত সক্ষমতারও পরীক্ষা। নির্ধারিত সময়ে লক্ষ্য অর্জিত হবে কি না, তা নির্ভর করবে ঘোষিত পরিকল্পনার কতটা বাস্তবে রূপ নেয় তার ওপর।বাংলাদেশের হাতে সূর্যের আলোকে বিদ্যুতে রূপান্তরের প্রযুক্তি রয়েছে। এখন প্রয়োজন সেই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর বাস্তবসম্মত উদ্যোগ, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন এবং কার্যকর বাস্তবায়ন। সম্ভাবনাকে অর্জনে রূপ দিতে পারলে সৌরবিদ্যুৎ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আর অর্থায়ন, অবকাঠামো ও নীতিগত বাধা অমীমাংসিত থাকলে বড় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।

বিশেষ প্রতিনিধি, মাছরাঙা টেলিভিশন

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬


সৌরবিদ্যুতের বড় লক্ষ্য, বাস্তবায়নে কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?

প্রকাশের তারিখ : ১৩ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সৌরবিদ্যুৎ এখন আর কেবল বিকল্প কোনো উৎস নয়, ভবিষ্যতের বিদ্যুৎব্যবস্থায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

বাড়ির ছাদ থেকে শিল্পকারখানা, সরকারি ভবন থেকে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র - বিভিন্ন ক্ষেত্রে সূর্যের আলো কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। সরকারও ২০৩০ সালের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

কিন্তু বড় লক্ষ্য নির্ধারণ আর তা বাস্তবায়ন করা এক বিষয় নয়। সৌর প্যানেল স্থাপনের খরচ কে বহন করবে, উৎপাদিত বিদ্যুতের ন্যায্য দাম পাওয়া যাবে কি না, ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ মিলবে কি না - এসব প্রশ্নের সমাধান ছাড়া পরিকল্পনাটি কতটা এগোবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। বাংলাদেশের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ শুধু সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো নয়, বরং এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে সাধারণ গ্রাহক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিনিয়োগে উৎসাহিত হবে, উৎপাদিত বিদ্যুৎ কার্যকরভাবে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে এবং বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাওয়ার বাস্তবসম্মত সুযোগ থাকবে।

লক্ষ্যমাত্রা বড়, বাস্তবায়নের পথ কতটা মসৃণ?

২০৩০ সালের মধ্যে দেশে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎব্যবস্থা থেকে এবং ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট ভূমিভিত্তিক প্রকল্প থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া বায়ুবিদ্যুৎ, বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎস থেকেও অতিরিক্ত সক্ষমতা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়বে। আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি দিনের বেলায় জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমাতেও সৌরবিদ্যুৎ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে যেসব শিল্পকারখানায় দিনের বেলায় বিদ্যুতের ব্যবহার বেশি, সেখানে নিজস্ব সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বিদ্যুৎ ব্যয় কমানোর কার্যকর উপায় হতে পারে।

তবে লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে বর্তমান সক্ষমতা ও বাস্তব অগ্রগতির ব্যবধান বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। নতুন প্রকল্প ঘোষণা, সৌর প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ এবং বাস্তবে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়া বিদ্যুতের পরিমাণ এক নয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লক্ষ্য অর্জন করতে হলে প্রতিবছর কতটা নতুন সক্ষমতা যুক্ত করতে হবে, বিনিয়োগ কোথা থেকে আসবে এবং কোন বাধাগুলো দূর করতে হবে, তার সুস্পষ্ট হিসাব প্রয়োজন।

শুধু পরিকল্পনায় সক্ষমতার পরিমাণ উল্লেখ করে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। প্রয়োজন বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা, কার্যকর তদারকি এবং নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনা। পাশাপাশি বর্তমানে কত মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা চালু রয়েছে, কতটি প্রকল্প নির্মাণাধীন এবং নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নে কী ধরনের অগ্রগতি হচ্ছে - এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন।

ছাদে সৌর প্যানেল, কিন্তু বিনিয়োগের আগ্রহ কতটা?

ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুযোগ। শহরের আবাসিক ভবন, সরকারি স্থাপনা, বিপণিবিতান ও শিল্পকারখানার ছাদ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। এতে নতুন করে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন কমে এবং উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি বড় অংশ সরাসরি ব্যবহার করা যায়।

তবে সব ছাদ সৌর প্যানেল স্থাপনের জন্য সমান উপযোগী নয়। ছাদের আয়তন, নকশা, ছায়া, ভবনের কাঠামোগত সক্ষমতা, স্থাপনের নিরাপত্তা এবং বিদ্যুতের প্রকৃত চাহিদা বিবেচনায় নিতে হয়। এসব বিষয় যাচাই না করে বিনিয়োগ করলে প্রত্যাশিত উৎপাদন ও আর্থিক সুবিধা পাওয়া কঠিন হতে পারে।

ঢাকার বহুতল আবাসিক ভবনগুলোতে বিষয়টি আরও জটিল। একটি ভবনে একাধিক ফ্ল্যাটমালিক থাকেন। ছাদ যৌথ ব্যবহারের জায়গা হলেও সেখানে সৌর প্যানেল স্থাপন, বিনিয়োগের অর্থ ভাগাভাগি এবং উৎপাদিত বিদ্যুতের সুবিধা বণ্টন নিয়ে মতভেদ তৈরি হতে পারে। একজন বিনিয়োগ করলেন, অথচ অন্যরাও সুবিধা পেলেন - এমন পরিস্থিতিতে ন্যায্য হিসাবের ব্যবস্থা না থাকলে উদ্যোগটি টেকসই হবে না।

এ কারণে আবাসিক ভবনের ক্ষেত্রে শুধু প্যানেল স্থাপনে প্রণোদনা দিলেই চলবে না। যৌথ বিনিয়োগের নিয়ম, বিদ্যুতের ব্যবহার ও ব্যয়ের হিসাব ভাগাভাগি এবং জাতীয় গ্রিডে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। একই সঙ্গে ভবনমালিক ও ফ্ল্যাটমালিকদের অধিকার ও দায়িত্ব স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

সাড়ে ১০ টাকায় বিদ্যুৎ বিক্রি: লাভের হিসাব কী বলছে?

ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। নির্ধারিত শর্তে ব্যাটারিসহ সৌরবিদ্যুৎব্যবস্থা স্থাপন করে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭-এর মধ্যে জাতীয় গ্রিডে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করলে প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ সুবিধা ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০৩০ পর্যন্ত কার্যকর থাকার কথা। তবে এ প্রণোদনা পেতে সংশ্লিষ্ট নীতিমালা ও কারিগরি শর্ত পূরণ করতে হবে।

উদ্যোগটি গ্রাহকদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে পারে। তবে বিদ্যুৎ বিক্রির মূল্য ও সুবিধার শর্তের পাশাপাশি উৎপাদনের মোট খরচ এবং বিনিয়োগ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনাও বিবেচনা করতে হবে।

সৌর প্যানেল, ইনভার্টার, বৈদ্যুতিক সংযোগ, স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ - সবকিছুর পেছনে বিনিয়োগ প্রয়োজন। ব্যাটারি যুক্ত করলে ব্যয় আরও বাড়ে। ঋণ নিয়ে প্রকল্প স্থাপন করলে সুদের খরচও যুক্ত হয়। ফলে শুধু বিদ্যুৎ বিক্রির মূল্য বিবেচনা করে প্রকল্পের লাভজনকতা নির্ধারণ করা যায় না।

প্রচলিত বাজারদরের একটি আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, তিন কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎব্যবস্থা স্থাপনে দেড় লাখ থেকে এক লাখ ৬৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লাগতে পারে। ব্যাটারি যুক্ত করলে মোট বিনিয়োগ প্রায় পৌনে তিন লাখ থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তবে সরঞ্জামের মান, ব্যাটারির ধরন ও সক্ষমতা, স্থাপনের শর্ত এবং প্রকল্পের কাঠামোর ওপর প্রকৃত ব্যয় নির্ভর করবে। এ হিসাবকে তাই নির্দিষ্ট বাজারদর নয়, আনুমানিক ব্যয় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

এখন প্রশ্ন হলো, এই বিনিয়োগ থেকে কত দিনে অর্থ ফেরত আসবে? উৎপাদিত বিদ্যুতের কতটা নিজে ব্যবহার করা যাবে, কতটা গ্রিডে বিক্রি করা সম্ভব হবে এবং বিক্রির অর্থ কতটা নিয়মিত পাওয়া যাবে - এসব হিসাবের ওপর বিনিয়োগের লাভজনকতা নির্ভর করে।

বিশেষ করে ছোট গ্রাহকদের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট ব্যয় বেশি হলে এবং উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের বিক্রির পরিমাণ কম হলে প্রত্যাশিত আর্থিক সুবিধা পাওয়া কঠিন হতে পারে। তাই শুধু একটি নির্দিষ্ট ক্রয়মূল্য ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়। বিনিয়োগের ব্যয়, ঋণের সুদ, নিজস্ব ব্যবহারের মাধ্যমে সাশ্রয় এবং প্রকল্পের আয়ুষ্কাল বিবেচনায় নিয়ে এমন ব্যবস্থা প্রয়োজন, যাতে গ্রাহক নিজের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ বিক্রি করেও যুক্তিসংগত আর্থিক সুবিধা পান।

শিল্পকারখানায় সম্ভাবনা বেশি, অর্থায়ন বড় বাধা

বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একদিকে বিদ্যুতের ব্যয় কমানোর প্রয়োজন, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের শর্ত - দুই কারণে কারখানার মালিকদের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের আগ্রহ বাড়ছে।

অনেক কারখানার বিশাল ছাদ রয়েছে। সেখানে সৌর প্যানেল স্থাপন করে দিনের বেলায় বিদ্যুতের একটি অংশ নিজস্বভাবে উৎপাদন করা সম্ভব। এতে জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ কেনার প্রয়োজন কমতে পারে এবং উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হতে পারে। পাশাপাশি কারখানার কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য পূরণেও এটি সহায়ক হতে পারে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ২০ আগস্ট ২০২৬-এ প্রকাশিত এক সমীক্ষায় বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোর ছাদে প্রায় ১ হাজার ৭৬৮ মেগাওয়াট-পিক (MWp) সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। এ হিসাব কারখানাগুলোর ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা নির্দেশ করে। বাস্তবে উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ সূর্যালোক, আবহাওয়া ও ব্যবস্থার কার্যকারিতার ওপর নির্ভর করবে।

এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু কারখানার মালিকদের আগ্রহ থাকলেও সব ক্ষেত্রে অর্থায়নের নিশ্চয়তা নেই। বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনে এককালীন বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। ব্যাংকঋণের সুদ বেশি হলে বা ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়া দীর্ঘ হলে বিনিয়োগের পরিকল্পনা পিছিয়ে যেতে পারে।

এ ক্ষেত্রে সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, প্রকল্পের শুরুতেই অর্থায়নের নিশ্চয়তা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানাগুলোর জন্য সহজলভ্য সবুজ অর্থায়নের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। যেসব প্রতিষ্ঠান সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে আগ্রহী, তাদের জন্য ঋণ ও বিনিয়োগের ব্যবস্থা সহজ করা গেলে শিল্প খাতের সম্ভাবনাকে বাস্তব উৎপাদনে রূপ দেওয়া সম্ভব হবে।

একই সঙ্গে সরকারি ভবন ও বড় বাণিজ্যিক স্থাপনাগুলোতেও ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। এসব ভবনে পরিকল্পিতভাবে সৌর প্যানেল স্থাপন করা গেলে জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা সম্ভব। সরকারি স্থাপনাগুলোতে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরন ও ছাদের উপযোগিতা যাচাই করে অগ্রাধিকারভিত্তিতে প্রকল্প নেওয়া যেতে পারে।

বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য জমি কোথায়?

ছাদভিত্তিক উৎপাদনের পাশাপাশি বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনও জরুরি। তবে এসব প্রকল্পের জন্য পর্যাপ্ত জমি পাওয়া বাংলাদেশের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, আবাসন ও শিল্পায়নের চাপে কৃষিজমির ওপর ক্রমাগত চাপ তৈরি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য কৃষিজমি ব্যবহার করলে খাদ্য উৎপাদন ও স্থানীয় মানুষের জীবিকার ওপর প্রভাব পড়তে পারে।

তাই জমি নির্বাচনের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। পতিত বা অনুপযোগী জমি, উপযুক্ত সরকারি জমি এবং অন্যান্য বিকল্প স্থান চিহ্নিত করে সেগুলোর সম্ভাব্যতা যাচাই করা যেতে পারে। জমির মালিকানা, পরিবেশগত প্রভাব এবং স্থানীয় মানুষের স্বার্থ বিবেচনায় না নিলে প্রকল্প বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

এ ছাড়া বড় প্রকল্পের জন্য জমি পাওয়া গেলেও বিদ্যুৎ সঞ্চালনের উপযুক্ত ব্যবস্থা থাকতে হবে। উৎপাদনকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় সঞ্চালন লাইন ও উপকেন্দ্র না থাকলে উৎপাদন বাড়িয়েও পুরো সুবিধা পাওয়া যাবে না। ফলে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনার সঙ্গে সঞ্চালন অবকাঠামোর উন্নয়নও সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে।

গ্রিডের সক্ষমতা না বাড়লে উৎপাদনের সুফল মিলবে কীভাবে?

সৌরবিদ্যুতের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এর উৎপাদন সূর্যের আলো ও আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। দিনের বেলায় উৎপাদন বেশি হলেও সন্ধ্যার পর তা কমে যায়। ফলে জাতীয় বিদ্যুৎব্যবস্থার সঙ্গে সৌরবিদ্যুতের সমন্বয় করতে উন্নত গ্রিড ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।

একই সময়ে অনেক এলাকায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়ে গেলে গ্রিডকে সেই বিদ্যুৎ গ্রহণ, সঞ্চালন ও বিতরণ করতে সক্ষম হতে হবে। প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও সঞ্চালন অবকাঠামো দুর্বল হলে উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে স্মার্ট গ্রিড, উন্নত উৎপাদন পূর্বাভাস এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুৎ সংরক্ষণের প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ব্যাটারিতে বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করে পরবর্তী সময়ে ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও এর জন্য বাড়তি বিনিয়োগ প্রয়োজন। তাই সব প্রকল্পে একই ধরনের প্রযুক্তি প্রয়োগ না করে প্রকল্পের আকার, অবস্থান, উৎপাদনের ধরন ও বিদ্যুতের চাহিদা অনুযায়ী সমাধান নির্ধারণ করতে হবে।

সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডের সক্ষমতা ও নমনীয়তা বাড়ানো জরুরি। উৎপাদিত বিদ্যুৎ কীভাবে গ্রহণ, ব্যবস্থাপনা ও বিতরণ করা হবে, তার বাস্তব পরিকল্পনা ছাড়া শুধু উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া সম্ভব নয়।

বিদেশি বিনিয়োগের জন্য আস্থা ফেরানো জরুরি

প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলতে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। দেশীয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কোনো প্রকল্পে অর্থ দেওয়ার আগে নীতিমালার স্থিতিশীলতা, অনুমোদন প্রক্রিয়া, বিদ্যুৎ কেনার নিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা যাচাই করেন। এসব বিষয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাতে অতীতে অনুমোদিত কিছু প্রকল্প বাতিলের অভিজ্ঞতা নিয়েও বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রশ্ন সামনে এসেছে। ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার বিশেষ আইনের আওতায় অনুমোদিত একাধিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের উদ্যোগ নেয়। তবে এ সিদ্ধান্তের ফলে নতুন বিনিয়োগ কতটা প্রভাবিত হয়েছে, তা নির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

সাধারণভাবে বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতিগত ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং চুক্তির নির্ভরযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারকে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে প্রকল্প অনুমোদনের নিয়ম স্পষ্ট থাকবে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অযথা বিলম্ব হবে না এবং বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারবেন।

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পাশাপাশি দেশীয় শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি। সৌর প্যানেল স্থাপন, বৈদ্যুতিক প্রকৌশল, রক্ষণাবেক্ষণ ও গ্রিড ব্যবস্থাপনায় দক্ষ জনবল তৈরি করা না গেলে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনায় সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও স্থানীয় সক্ষমতা উন্নয়নেও গুরুত্ব দিতে হবে।

লক্ষ্যে পৌঁছাতে এখন কী করা দরকার?

২০৩০ সালের সৌরবিদ্যুৎ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য বিচ্ছিন্ন কিছু উদ্যোগের পরিবর্তে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি পদক্ষেপ বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।

প্রথমত, সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। আবাসিক গ্রাহক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য স্বল্প সুদের ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। ঋণের পরিমাণ, পরিশোধের সময়সীমা ও অন্যান্য শর্ত এমন হওয়া প্রয়োজন, যাতে প্রকল্পের আর্থিক সাশ্রয় ও আয় দিয়ে বিনিয়োগের ব্যয় মেটানো সম্ভব হয়।

দ্বিতীয়ত, সৌর সরঞ্জামের ব্যয় কমাতে হবে। সৌর প্যানেল, ইনভার্টার ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জামের আমদানি এবং স্থানীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে হবে। শুল্ক ও করের কাঠামো এমনভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যাতে প্রকল্পের ব্যয় অযথা না বাড়ে। একই সঙ্গে সরঞ্জামের মান নিশ্চিত করা এবং নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি।

তৃতীয়ত, উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ কেনার ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে। বিদ্যুতের ক্রয়মূল্য ও শর্ত নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিনিয়োগের প্রকৃত ব্যয়, প্রকল্পের আকার এবং গ্রাহকের বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরন বিবেচনায় নিতে হবে। পাশাপাশি গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ, মিটারিং ও বিল পরিশোধের প্রক্রিয়া সহজ, স্বচ্ছ ও সময়োপযোগী করতে হবে।

চতুর্থত, জাতীয় গ্রিডের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সঞ্চালন লাইন, উপকেন্দ্র, স্মার্ট গ্রিড এবং প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের সঙ্গে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

পঞ্চমত, জমির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কৃষিজমি রক্ষা করে উপযুক্ত স্থানে বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন এবং ভবনের ছাদকে উৎপাদনের কাজে লাগানোর জন্য কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রকল্পের পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব বিবেচনায় নিতে হবে।

ষষ্ঠত, বিনিয়োগ ও নীতিগত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্প অনুমোদন, বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি, অর্থায়ন এবং বাস্তবায়নের নিয়ম স্পষ্ট ও পূর্বানুমানযোগ্য হওয়া জরুরি। এতে দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা সহজ হবে।

সবশেষে, লক্ষ্যমাত্রার অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। কত মেগাওয়াট সক্ষমতা বাস্তবে যুক্ত হয়েছে, কতটি প্রকল্প নির্মাণাধীন এবং কোন বাধায় কাজ আটকে আছে - এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি নির্ধারিত লক্ষ্যের বিপরীতে বাস্তব অগ্রগতির তুলনামূলক হিসাব প্রকাশ করতে হবে। এতে পরিকল্পনার দুর্বলতা চিহ্নিত করা সহজ হবে এবং সরকারি ও বেসরকারি খাতের দায়িত্বও স্পষ্ট করা যাবে।

সৌরবিদ্যুতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে বাস্তব পদক্ষেপের ওপর

বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। শিল্পকারখানা, সরকারি স্থাপনা ও আবাসিক ভবনের ছাদ ব্যবহার এবং উপযুক্ত জমিতে বড় প্রকল্প গড়ে তোলার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে বিনিয়োগের সুযোগ, ন্যায্য বিদ্যুৎ মূল্য, উন্নত গ্রিডব্যবস্থা এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে।

২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা তাই শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি সংখ্যা নয়, এটি দেশের জ্বালানি পরিকল্পনা, বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত সক্ষমতারও পরীক্ষা। নির্ধারিত সময়ে লক্ষ্য অর্জিত হবে কি না, তা নির্ভর করবে ঘোষিত পরিকল্পনার কতটা বাস্তবে রূপ নেয় তার ওপর।বাংলাদেশের হাতে সূর্যের আলোকে বিদ্যুতে রূপান্তরের প্রযুক্তি রয়েছে। এখন প্রয়োজন সেই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর বাস্তবসম্মত উদ্যোগ, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন এবং কার্যকর বাস্তবায়ন। সম্ভাবনাকে অর্জনে রূপ দিতে পারলে সৌরবিদ্যুৎ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আর অর্থায়ন, অবকাঠামো ও নীতিগত বাধা অমীমাংসিত থাকলে বড় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।

বিশেষ প্রতিনিধি, মাছরাঙা টেলিভিশন


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত