জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনে যোগদানের আগে সাংবাদিকদের এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, ‘আমাদের সরকারের অবস্থান হলো, আমরা মানবাধিকার রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। বিরোধী দল আওয়ামী লীগ বা অন্য যে কোনো দলই হোক না কেন, বর্তমান সরকার অবশ্যই নিশ্চিত করবে যে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে কেউ যেন কারাগারে বা অন্যায়ভাবে আটক না থাকে।’ শামা ওবায়েদ জোর দিয়ে বলেন যে বর্তমান সরকার মানবাধিকার রক্ষা এবং জনগণের কাছে জবাবদিহির নীতিতে বিশ্বাসী। তাই অতীত আমলের মতো পাইকারি বা গায়েবি মামলার সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি হতে দেওয়া হবে না।
বিদেশ সফরে গেলে মন্ত্রীদের হরহামেশাই মানবাধিকার সংস্থাগুলোর, বিশেষত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সংস্থা, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার মুখোমুখি হতে হয়। কূটনৈতিক পর্যায়েও নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। তাই বিদেশ সফরের আগে, বিশেষত জাতিসংঘ অধিবেশনের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্বশীল ফোরামে যোগদানের আগে ও অধিবেশন চলাকালে মন্ত্রী-উপদেষ্টারা এসব বক্তব্য দিয়ে থাকেন। ফিরে আসার পথে এসব কথা ভুলে যান। এটাই নিয়ম, এভাবেই চলছে। তা না হলে গায়েবি মামলাগুলো এবং বহুল আলোচিত প্রতিহিংসাবশত দায়ের করা অসংখ্য খুনের মামলা প্রত্যাহার হতে সময় লাগবে কেন? তাই তো প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্ক থেকে ফিরতি বিমানে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পাল্টা ঘোষণা দিলেন, আওয়ামী লীগার ধরতে পারলেই পুরস্কৃত করা হবে।
অথচ সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর ‘সব পরিকল্পনা’ ব্যর্থ হয়ে পড়ছে দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতিতে। শিশু হত্যা, শিশু ধর্ষণ থেকে শুরু করে হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব—এমন কোনো অপরাধ নেই, যা প্রতিদিনই খবরের শিরোনাম হচ্ছে না। কিশোরী ছাত্রীর লাশ পড়ে থাকছে ধানখেতে, পাটখেতে বা বনজঙ্গলে। থানা নোটিস জারি করছে, কোনো পুলিশ সদস্য যেন একা বাইরে বের না হন। কী ভয়াবহ পরিস্থিতি! নিজ দলের লোকজনকেও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। সরকারের সবচেয়ে স্মার্ট মন্ত্রী—স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী—কয়েক মাসেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে লেজেগোবরে অবস্থা সৃষ্টি করেছেন।
‘রাজবন্দী: একসময়ের সহযোদ্ধারা কি চেয়ে চেয়ে দেখবে?’—উপসম্পাদকীয়টি পত্রিকায় ছাপা হওয়ার পর আমার মনে হলো, সেই ১৯৮২ সালে সামরিক শাসনবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সূচনাপর্বে যে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়েছিল, তার দুই প্রতিষ্ঠাতা সদস্য কারাগারে। অন্য যে কোনো রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর চেয়ে তারা তো অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তাদের নিয়েই সবার আগে লেখা আমার জন্য জরুরি। অবশ্য মাস দুয়েক আগে ডাকসুর প্রাক্তন সহসভাপতি আখতারুজ্জামান গ্রেপ্তার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিবাদ জানিয়ে এক দফা লিখেছি। তাতে কী? আজ অবধি জামিন মেলেনি। জামিন শুনানির জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আদালতে আসে না! ’৮২-র ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অপর একজন দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে একাধিক খুনের মামলায় আটক আছেন। তিনি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দীন।
জালাল ভাই পুরান ঢাকার বাসিন্দা। তার পারিবারিক পরিচিতি আমার জানা নেই। তবে পুরান ঢাকা ঘিরেই তার বিচরণ। সেন্ট গ্রেগরিজ থেকে স্কুলজীবন সমাপ্ত করে পুরান ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকেই উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। জগন্নাথ কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেন। এরপর মুক্তিযুদ্ধে যোগদান এবং স্বাধীন দেশে চিকিৎসাশাস্ত্রে পাস করেন একেবারে তার বাড়ির পাশের ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে।
সামরিক শাসনবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠনের সময় তিনি ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দের মধ্যে তিনি এবং ছাত্রলীগের অপর অংশের সভাপতি, বর্তমানে বিএনপি নেতা ফজলুর রহমান, বয়োজ্যেষ্ঠ ছিলেন। ১৯৮৩ সালেই তারা ছাত্র আন্দোলন থেকে বিদায় নেন। হাজি সেলিম আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার পর থেকে পুরান ঢাকার রাজনীতিতে জালাল ভাই বিশেষ প্রভাব বিস্তার করতে পারছিলেন না। জালাল ভাইয়ের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও হাজি সেলিমের সঙ্গে টক্কর দেওয়ার উপযোগী নয়। তবে জালাল ভাই বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। অবশ্য সেই সময়ে বিএমএর মতো ঐতিহ্যবাহী পেশাজীবী সংগঠনকে পুরোপুরি দলীয় সংগঠনে পরিণত করার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে আছে। ভিন্নমতের পেশাজীবীদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সৌহার্দ্য দেখালেও বিএমএকে কার্যত আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন ‘স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের’ অনুগত সংগঠন হিসেবে পরিণত করা হয়েছিল। তবে শুধু এই বিষয়ে সীমাবদ্ধ থেকে জালাল ভাইকে সামগ্রিকভাবে বিচার করা সমীচীন হবে না।
প্রয়াত তোফায়েল আহমেদ, নূরে আলম সিদ্দিকী থেকে শুরু করে মাঝখানে শেখ শহীদুল ইসলাম ও মনিরুল হক চৌধুরী ছাড়া ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত যারাই ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন, সবার সঙ্গে কমবেশি পরিচয় ও কথাবার্তা ছিল। সবার থেকে জালাল ভাই অন্য রকম। চোস্ত নেতা-ভাব ছিল না। একেবারেই সাদামাটা মনে হতো। গভীর রাজনৈতিক বিতর্কে অধিকাংশ সময় চুপচাপ থাকতেন। তার শারীরিক ভাষায়, বিশেষত হাসিতেই, বিনয় প্রস্ফুটিত হয়ে উঠত। আর পুরান ঢাকার কথার মধ্যে একটা প্রাণবন্ত টান থাকায় আলাপচারিতার সময় বা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দের সভাসমূহে তার বক্তব্য এমনিতেই একটা মিষ্টি পরিবেশ সৃষ্টি করত। ওই সময়ের ডাকসু ভিপি আখতারুজ্জামান জগন্নাথ কলেজে তার অনুজ ছিলেন এবং একটা সময়ে কলেজে তারা একই ছাত্র সংগঠনে থাকায় দুজনের মধ্যে একটা গভীর আত্মীয়তাবোধ কাজ করত। জালাল ভাই দীর্ঘ সভা পছন্দ করতেন না। সভা লম্বা হয়ে গেলে বলে উঠতেন, ‘আখতার অজাইরা প্যাঁচাল বাদ দাও, কামের কথা থাকলে কও, নইলে কাডি!’ জাসদ ছাত্রলীগ নেতা ডা. মুশতাক ঢাকা মেডিকেল কলেজে তার অনুজ ছিলেন। তার সঙ্গেও বিশেষ সখ্য ছিল। তাকে মধুর ক্যান্টিনে দেখলে বলতেন, ‘কী মুশতাক, চুপচাপ ক্যালা? সারাক্ষণ ঢাকা বিসবিল্যা রাখলে চলবো, ম্যাডিক্যালেও একটু টাইম-টেম দেও।’
মোস্তফা জালাল মহিউদ্দীনের সঙ্গে অবশ্য ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠনের আগে থেকেই সখ্য গড়ে ওঠে বকশীবাজারে। ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ছিল বকশীবাজারে। বাড়ির মালিক ছিলেন স্থানীয় কাউন্সিলর এবং আওয়ামী লীগের নেতা আবদুল আজিজ। সবাই ডাকতেন লাজিজ ভাই বলে। আমাদের অফিসের পাশেই ছিল তার বৈঠকখানা। সেখানে প্রায়ই জালাল ভাই আসতেন। আমিও মাঝে মাঝে তাদের আড্ডায় শরিক হতাম। লাজিজ ভাই প্রয়াত হয়েছেন বেশ কিছু কাল আগে। স্থানীয় আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। সত্তর ও আশির দশকজুড়েই ছাত্র ইউনিয়ন আর যুব ইউনিয়নের সঙ্গে তার সম্পর্কটা অনেক গভীর ছিল।
এত কথা বলার কারণ, জালাল ভাইকে শুধু ক্যাম্পাসে নয়, ক্যাম্পাসের বাইরেও দেখেছি। আওয়ামী লীগের অন্দরমহলে তো দেখার সুযোগ হয়নি। তবে জালাল ভাই খুন-হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন, এটা আমি কেন, তার সঙ্গে পরিচিত কেউই বিশ্বাস করবে না। অথচ জুলাই আন্দোলনের সময় নিউমার্কেট এলাকায় ব্যবসায়ী আবদুল ওয়াদুদ নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা এক হত্যা মামলায় তার নাম ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। মিরপুর থানার একটি হত্যা মামলাতেও তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিএনপি কর্মী মকবুল হোসেন নিহত হওয়ার ঘটনায় পল্টন থানার মামলাতেও তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে তার বিরুদ্ধে মামলা যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, তা আদালতে সরকারি কৌঁসুলির বক্তব্য থেকে স্পষ্ট। সরকারি কৌঁসুলি বলেছেন, মোস্তফা জালাল মহিউদ্দীন শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং গুলি চালানোর নির্দেশ দিতে শেখ হাসিনাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন। তথ্য-প্রমাণ ছাড়া এ ধরনের ঢালাও অভিযোগ আর পাইকারি মামলায় জালাল ভাইয়ের মতো সারা দেশে রয়েছেন অসংখ্য রাজবন্দী।
প্রসঙ্গত, দুজন রাজনীতিকের কথা তুলে ধরছি। এ বছর ফেব্রুয়ারিতে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের তার নির্বাচনী সভায় আওয়ামী লীগের সাবেক রেলমন্ত্রী মুজিবুল হককে ফ্যাসিস্ট আখ্যায়িত না করে ‘ভাই’ সম্বোধন করে বলেন, ‘এবার তো মুজিব ভাই নেই। আপনাদের আগের অনুভূতিতে তো দুই নম্বরে আমি আছি। তাহলে ইনশাআল্লাহ, এবার আপনারা আমাকে ভোট দেবেন।’ তিনি স্থানীয় আওয়ামী লীগ সভাপতি সালাউদ্দিন আহমেদ মজুমদারকে তার নির্বাচনী সভায় উপস্থিত করার ব্যবস্থা করেন এবং তাকে তার জন্য দোয়া করতে বলেন। দোয়া প্রার্থনার পর আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের আবার মাইকে এসে বলেন, ‘সালাউদ্দিন কী বলতে চেয়েছে, আপনারা বুঝেছেন তো? কোথায় ভোট দেওয়ার কথা বলেছে, আপনারা বুঝে নিয়েন।’ ‘ফ্যাসিবাদীদের’ ভোটের জন্য সেদিন কী জামায়াতি আকুতি!
বিএনপির প্রাক্তন মহাসচিব, বর্তমান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার নির্বাচনী সমাবেশে বলেছিলেন, দেশে শুধু দুটোই প্রতীক—নৌকা আর ধানের শীষ। নৌকা এখন নেই, তাহলে ভোট দেবেন ধানের শীষে। দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের দল স্বাধীনতাবিরোধীদের দল। তিনিও ফ্যাসিস্ট সম্বোধন না করে বলেছিলেন, ‘আমাদের হাসিনা আপা চলে গেছেন ভারতে। তিনি ভারতে গেছেন, ভালো করেছেন। কিন্তু এলাকার সমর্থক-কর্মীদের বিপদে ফেলে গেছেন কেন? আমরা আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের জানাতে চাই, আপনারা বিপদে পড়বেন না। আমরা আছি, আপনাদের পাশে।’
আওয়ামী লীগের পাশে আওয়ামী লীগই থাকুক। বিএনপি বা জামায়াত-এনসিপির থাকার দরকার নেই। বরং সরকারের যে দায়িত্ব, সেটাই সরকার পালন করুক। শামা ওবায়েদের কথা অনুযায়ী, ‘বিরোধী দল, আওয়ামী লীগ বা অন্য যে কোনো দলই হোক না কেন, বর্তমান সরকার অবশ্যই নিশ্চিত করবে যে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে কেউ যেন কারাগারে বা অন্যায়ভাবে আটক না থাকে’—সরকার তার এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করুক। দেশে ন্যূনতম আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক।
পরপর কয়েকটি লেখায় শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ, ইনু, মেনন ইত্যাদি প্রসঙ্গ এসে যাওয়ায় আমার কয়েকজন শুভানুধ্যায়ী আমাকে সতর্ক করে বলেছেন, লেখায় নাকি ‘দোসরদের’ প্রতি পক্ষপাতিত্ব হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বিষয়টি শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ বা কথিত ‘দোসর’ কিংবা জয় বাংলা, ইনকিলাব ইস্যু নয়। ইস্যু হচ্ছে আইনের শাসন ও সুবিচার। আইনের শাসন ও বিচারহীনতার অভাবে আজ আওয়ামী লীগ সমর্থকেরা হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। তবে আওয়ামী লীগ আইনের শাসন নিয়ে চিন্তিত বলে মনে হয় না। তারা তাদের শাসনামলে আইনের শাসন, বাক্স্বাধীনতা, সুবিচারের তোয়াক্কা করেনি। এখনো এসব নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। পত্রপত্রিকায় কী লেখা হচ্ছে, তাও আমলে নেন বলে মনে হয় না। তারা হয়তো তাদের বিষয় তাদের মতো করেই ফয়সালা করবেন।
কিন্তু দেশের সাধারণ নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষ, নাগরিক সমাজ, শিল্পী, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী এবং অবশ্যই দেশের ছোট-মাঝারি গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য আইনের শাসন, বাক্স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচার জরুরি। এর ব্যত্যয় হলে সবাইকেই ভুগতে হবে। আইনের শাসনের বিপরীতে যদি প্রশাসন আর বিচার বিভাগে প্রতিহিংসা আর প্রতিশোধ জায়গা করে নেয়, তবে তা মব-সংস্কৃতিরই আরেক রূপে আবির্ভাব ছাড়া ভিন্ন কিছু নয়। আর আইনের শাসন তো খণ্ডিতভাবে হয় না, সার্বজনীনভাবেই তার প্রয়োগ হতে হয়।
মোস্তফা জালাল মহিউদ্দীনের কথায় ফিরে যাই। ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের এক উত্তাল মুহূর্তে ডা. শামসুল আলম খান মিলন গুলিবিদ্ধ হওয়ার সময় তার সঙ্গে একই রিকশায় ছিলেন ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দীন। সেদিন তিনিও নিহত হতে পারতেন। তিনি আটক থাকা অবস্থায় তার সহধর্মিণী প্রয়াত হয়েছেন। তিনিও অসুস্থ। তার বিরুদ্ধে আনা একটি অভিযোগেরও তথ্য-প্রমাণ নেই। তাকে মুক্তি দিন। মিথ্যা হত্যা মামলা ছাড়া তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ভিন্ন কোনো অভিযোগ যদি থেকে থাকে, তা প্রকাশ করা হোক এবং বিচার চলুক। কিন্তু জামিনের অধিকার থেকে তিনি যেন বঞ্চিত না হন।
একই পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন ডাকসুর প্রাক্তন ভিপি, প্রাক্তন ছাত্রলীগ নেতা সুলতান মোহাম্মদ মনসুর। ২০১৮ সালে গণফোরামে যোগ দিয়ে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে পরবর্তীতে আবার গণফোরাম ত্যাগ করে ও একই সাথে বিএনপির সাথে দূরত্ব সৃষ্টি করে আওয়ামী লীগের সাথে সান্নিধ্য পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগে ফিরতে পারেননি। জুলাই আন্দোলনের সময়ও তিনি দেশে ছিলেন না। কিন্তু দেশে ফিরে আসার দিন আক্রোশবশত তাকে বিমানবন্দর থেকেই গ্রেপ্তার করা হয় এবং ২০২২ সালের এক খুনের মামলায় ফাসিয়ে দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পরে উচ্চ আদালত থেকে তিনি জামিন লাভ করলে আটক রাখার উদ্দেশ্যে তার বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি হত্যা মামলা দায়ের করে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। সুলতান মনসুর ২০১৮ সালে ও তারপরে নিঃসন্দেহে চরম রাজনৈতিক সুবিধাবাদীতার পরিচয় রেখেছিলেন। আর সে কারণে তার বিরুদ্ধে আক্রোশ ও প্রতিহিংসাবশত একটার পর একটা খুনের মামলা দায়ের করা হয়েছে। তাহলে সরকারের যে ঘোষণা ‘বর্তমান সরকার অবশ্যই নিশ্চিত করবে যে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে কেউ যেন কারাগারে বা অন্যায়ভাবে আটক না থাকে’ — এ কথার মুল্য রইলো কই?
সৃষ্টিকর্তা তার অন্যতম সেরা উপহার হিসেবে মানুষকে দিয়েছেন কথা বলার ক্ষমতা—যা আর কোনো প্রাণীর নেই। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কথা ‘বাত কি বাত’ হয়ে গেলে শুধু তার কথার সৌন্দর্যই হারিয়ে যাবে না, বিশ্বাস বা প্রতিশ্রুতিরও ভঙ্গ হবে। আর বিশ্বাস কিন্তু কথায় নয়, কাজে গড়ে ওঠে। তাই কথা রাখতে না পারলে কথা না বলাই শ্রেয়। মানুষের বিশ্বাস একবার ভেঙে গেলে সব ‘পরিকল্পনা’ কিন্তু বরবাদ হয়ে যাবে!
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ অক্টোবর ২০২৬
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনে যোগদানের আগে সাংবাদিকদের এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, ‘আমাদের সরকারের অবস্থান হলো, আমরা মানবাধিকার রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। বিরোধী দল আওয়ামী লীগ বা অন্য যে কোনো দলই হোক না কেন, বর্তমান সরকার অবশ্যই নিশ্চিত করবে যে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে কেউ যেন কারাগারে বা অন্যায়ভাবে আটক না থাকে।’ শামা ওবায়েদ জোর দিয়ে বলেন যে বর্তমান সরকার মানবাধিকার রক্ষা এবং জনগণের কাছে জবাবদিহির নীতিতে বিশ্বাসী। তাই অতীত আমলের মতো পাইকারি বা গায়েবি মামলার সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি হতে দেওয়া হবে না।
বিদেশ সফরে গেলে মন্ত্রীদের হরহামেশাই মানবাধিকার সংস্থাগুলোর, বিশেষত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সংস্থা, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার মুখোমুখি হতে হয়। কূটনৈতিক পর্যায়েও নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। তাই বিদেশ সফরের আগে, বিশেষত জাতিসংঘ অধিবেশনের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্বশীল ফোরামে যোগদানের আগে ও অধিবেশন চলাকালে মন্ত্রী-উপদেষ্টারা এসব বক্তব্য দিয়ে থাকেন। ফিরে আসার পথে এসব কথা ভুলে যান। এটাই নিয়ম, এভাবেই চলছে। তা না হলে গায়েবি মামলাগুলো এবং বহুল আলোচিত প্রতিহিংসাবশত দায়ের করা অসংখ্য খুনের মামলা প্রত্যাহার হতে সময় লাগবে কেন? তাই তো প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্ক থেকে ফিরতি বিমানে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পাল্টা ঘোষণা দিলেন, আওয়ামী লীগার ধরতে পারলেই পুরস্কৃত করা হবে।
অথচ সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর ‘সব পরিকল্পনা’ ব্যর্থ হয়ে পড়ছে দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতিতে। শিশু হত্যা, শিশু ধর্ষণ থেকে শুরু করে হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব—এমন কোনো অপরাধ নেই, যা প্রতিদিনই খবরের শিরোনাম হচ্ছে না। কিশোরী ছাত্রীর লাশ পড়ে থাকছে ধানখেতে, পাটখেতে বা বনজঙ্গলে। থানা নোটিস জারি করছে, কোনো পুলিশ সদস্য যেন একা বাইরে বের না হন। কী ভয়াবহ পরিস্থিতি! নিজ দলের লোকজনকেও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। সরকারের সবচেয়ে স্মার্ট মন্ত্রী—স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী—কয়েক মাসেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে লেজেগোবরে অবস্থা সৃষ্টি করেছেন।
‘রাজবন্দী: একসময়ের সহযোদ্ধারা কি চেয়ে চেয়ে দেখবে?’—উপসম্পাদকীয়টি পত্রিকায় ছাপা হওয়ার পর আমার মনে হলো, সেই ১৯৮২ সালে সামরিক শাসনবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সূচনাপর্বে যে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়েছিল, তার দুই প্রতিষ্ঠাতা সদস্য কারাগারে। অন্য যে কোনো রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর চেয়ে তারা তো অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তাদের নিয়েই সবার আগে লেখা আমার জন্য জরুরি। অবশ্য মাস দুয়েক আগে ডাকসুর প্রাক্তন সহসভাপতি আখতারুজ্জামান গ্রেপ্তার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিবাদ জানিয়ে এক দফা লিখেছি। তাতে কী? আজ অবধি জামিন মেলেনি। জামিন শুনানির জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আদালতে আসে না! ’৮২-র ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অপর একজন দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে একাধিক খুনের মামলায় আটক আছেন। তিনি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দীন।
জালাল ভাই পুরান ঢাকার বাসিন্দা। তার পারিবারিক পরিচিতি আমার জানা নেই। তবে পুরান ঢাকা ঘিরেই তার বিচরণ। সেন্ট গ্রেগরিজ থেকে স্কুলজীবন সমাপ্ত করে পুরান ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকেই উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। জগন্নাথ কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেন। এরপর মুক্তিযুদ্ধে যোগদান এবং স্বাধীন দেশে চিকিৎসাশাস্ত্রে পাস করেন একেবারে তার বাড়ির পাশের ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে।
সামরিক শাসনবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠনের সময় তিনি ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দের মধ্যে তিনি এবং ছাত্রলীগের অপর অংশের সভাপতি, বর্তমানে বিএনপি নেতা ফজলুর রহমান, বয়োজ্যেষ্ঠ ছিলেন। ১৯৮৩ সালেই তারা ছাত্র আন্দোলন থেকে বিদায় নেন। হাজি সেলিম আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার পর থেকে পুরান ঢাকার রাজনীতিতে জালাল ভাই বিশেষ প্রভাব বিস্তার করতে পারছিলেন না। জালাল ভাইয়ের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও হাজি সেলিমের সঙ্গে টক্কর দেওয়ার উপযোগী নয়। তবে জালাল ভাই বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। অবশ্য সেই সময়ে বিএমএর মতো ঐতিহ্যবাহী পেশাজীবী সংগঠনকে পুরোপুরি দলীয় সংগঠনে পরিণত করার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে আছে। ভিন্নমতের পেশাজীবীদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সৌহার্দ্য দেখালেও বিএমএকে কার্যত আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন ‘স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের’ অনুগত সংগঠন হিসেবে পরিণত করা হয়েছিল। তবে শুধু এই বিষয়ে সীমাবদ্ধ থেকে জালাল ভাইকে সামগ্রিকভাবে বিচার করা সমীচীন হবে না।
প্রয়াত তোফায়েল আহমেদ, নূরে আলম সিদ্দিকী থেকে শুরু করে মাঝখানে শেখ শহীদুল ইসলাম ও মনিরুল হক চৌধুরী ছাড়া ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত যারাই ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন, সবার সঙ্গে কমবেশি পরিচয় ও কথাবার্তা ছিল। সবার থেকে জালাল ভাই অন্য রকম। চোস্ত নেতা-ভাব ছিল না। একেবারেই সাদামাটা মনে হতো। গভীর রাজনৈতিক বিতর্কে অধিকাংশ সময় চুপচাপ থাকতেন। তার শারীরিক ভাষায়, বিশেষত হাসিতেই, বিনয় প্রস্ফুটিত হয়ে উঠত। আর পুরান ঢাকার কথার মধ্যে একটা প্রাণবন্ত টান থাকায় আলাপচারিতার সময় বা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দের সভাসমূহে তার বক্তব্য এমনিতেই একটা মিষ্টি পরিবেশ সৃষ্টি করত। ওই সময়ের ডাকসু ভিপি আখতারুজ্জামান জগন্নাথ কলেজে তার অনুজ ছিলেন এবং একটা সময়ে কলেজে তারা একই ছাত্র সংগঠনে থাকায় দুজনের মধ্যে একটা গভীর আত্মীয়তাবোধ কাজ করত। জালাল ভাই দীর্ঘ সভা পছন্দ করতেন না। সভা লম্বা হয়ে গেলে বলে উঠতেন, ‘আখতার অজাইরা প্যাঁচাল বাদ দাও, কামের কথা থাকলে কও, নইলে কাডি!’ জাসদ ছাত্রলীগ নেতা ডা. মুশতাক ঢাকা মেডিকেল কলেজে তার অনুজ ছিলেন। তার সঙ্গেও বিশেষ সখ্য ছিল। তাকে মধুর ক্যান্টিনে দেখলে বলতেন, ‘কী মুশতাক, চুপচাপ ক্যালা? সারাক্ষণ ঢাকা বিসবিল্যা রাখলে চলবো, ম্যাডিক্যালেও একটু টাইম-টেম দেও।’
মোস্তফা জালাল মহিউদ্দীনের সঙ্গে অবশ্য ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠনের আগে থেকেই সখ্য গড়ে ওঠে বকশীবাজারে। ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ছিল বকশীবাজারে। বাড়ির মালিক ছিলেন স্থানীয় কাউন্সিলর এবং আওয়ামী লীগের নেতা আবদুল আজিজ। সবাই ডাকতেন লাজিজ ভাই বলে। আমাদের অফিসের পাশেই ছিল তার বৈঠকখানা। সেখানে প্রায়ই জালাল ভাই আসতেন। আমিও মাঝে মাঝে তাদের আড্ডায় শরিক হতাম। লাজিজ ভাই প্রয়াত হয়েছেন বেশ কিছু কাল আগে। স্থানীয় আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। সত্তর ও আশির দশকজুড়েই ছাত্র ইউনিয়ন আর যুব ইউনিয়নের সঙ্গে তার সম্পর্কটা অনেক গভীর ছিল।
এত কথা বলার কারণ, জালাল ভাইকে শুধু ক্যাম্পাসে নয়, ক্যাম্পাসের বাইরেও দেখেছি। আওয়ামী লীগের অন্দরমহলে তো দেখার সুযোগ হয়নি। তবে জালাল ভাই খুন-হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন, এটা আমি কেন, তার সঙ্গে পরিচিত কেউই বিশ্বাস করবে না। অথচ জুলাই আন্দোলনের সময় নিউমার্কেট এলাকায় ব্যবসায়ী আবদুল ওয়াদুদ নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা এক হত্যা মামলায় তার নাম ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। মিরপুর থানার একটি হত্যা মামলাতেও তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিএনপি কর্মী মকবুল হোসেন নিহত হওয়ার ঘটনায় পল্টন থানার মামলাতেও তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে তার বিরুদ্ধে মামলা যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, তা আদালতে সরকারি কৌঁসুলির বক্তব্য থেকে স্পষ্ট। সরকারি কৌঁসুলি বলেছেন, মোস্তফা জালাল মহিউদ্দীন শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং গুলি চালানোর নির্দেশ দিতে শেখ হাসিনাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন। তথ্য-প্রমাণ ছাড়া এ ধরনের ঢালাও অভিযোগ আর পাইকারি মামলায় জালাল ভাইয়ের মতো সারা দেশে রয়েছেন অসংখ্য রাজবন্দী।
প্রসঙ্গত, দুজন রাজনীতিকের কথা তুলে ধরছি। এ বছর ফেব্রুয়ারিতে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের তার নির্বাচনী সভায় আওয়ামী লীগের সাবেক রেলমন্ত্রী মুজিবুল হককে ফ্যাসিস্ট আখ্যায়িত না করে ‘ভাই’ সম্বোধন করে বলেন, ‘এবার তো মুজিব ভাই নেই। আপনাদের আগের অনুভূতিতে তো দুই নম্বরে আমি আছি। তাহলে ইনশাআল্লাহ, এবার আপনারা আমাকে ভোট দেবেন।’ তিনি স্থানীয় আওয়ামী লীগ সভাপতি সালাউদ্দিন আহমেদ মজুমদারকে তার নির্বাচনী সভায় উপস্থিত করার ব্যবস্থা করেন এবং তাকে তার জন্য দোয়া করতে বলেন। দোয়া প্রার্থনার পর আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের আবার মাইকে এসে বলেন, ‘সালাউদ্দিন কী বলতে চেয়েছে, আপনারা বুঝেছেন তো? কোথায় ভোট দেওয়ার কথা বলেছে, আপনারা বুঝে নিয়েন।’ ‘ফ্যাসিবাদীদের’ ভোটের জন্য সেদিন কী জামায়াতি আকুতি!
বিএনপির প্রাক্তন মহাসচিব, বর্তমান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার নির্বাচনী সমাবেশে বলেছিলেন, দেশে শুধু দুটোই প্রতীক—নৌকা আর ধানের শীষ। নৌকা এখন নেই, তাহলে ভোট দেবেন ধানের শীষে। দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের দল স্বাধীনতাবিরোধীদের দল। তিনিও ফ্যাসিস্ট সম্বোধন না করে বলেছিলেন, ‘আমাদের হাসিনা আপা চলে গেছেন ভারতে। তিনি ভারতে গেছেন, ভালো করেছেন। কিন্তু এলাকার সমর্থক-কর্মীদের বিপদে ফেলে গেছেন কেন? আমরা আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের জানাতে চাই, আপনারা বিপদে পড়বেন না। আমরা আছি, আপনাদের পাশে।’
আওয়ামী লীগের পাশে আওয়ামী লীগই থাকুক। বিএনপি বা জামায়াত-এনসিপির থাকার দরকার নেই। বরং সরকারের যে দায়িত্ব, সেটাই সরকার পালন করুক। শামা ওবায়েদের কথা অনুযায়ী, ‘বিরোধী দল, আওয়ামী লীগ বা অন্য যে কোনো দলই হোক না কেন, বর্তমান সরকার অবশ্যই নিশ্চিত করবে যে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে কেউ যেন কারাগারে বা অন্যায়ভাবে আটক না থাকে’—সরকার তার এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করুক। দেশে ন্যূনতম আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক।
পরপর কয়েকটি লেখায় শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ, ইনু, মেনন ইত্যাদি প্রসঙ্গ এসে যাওয়ায় আমার কয়েকজন শুভানুধ্যায়ী আমাকে সতর্ক করে বলেছেন, লেখায় নাকি ‘দোসরদের’ প্রতি পক্ষপাতিত্ব হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বিষয়টি শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ বা কথিত ‘দোসর’ কিংবা জয় বাংলা, ইনকিলাব ইস্যু নয়। ইস্যু হচ্ছে আইনের শাসন ও সুবিচার। আইনের শাসন ও বিচারহীনতার অভাবে আজ আওয়ামী লীগ সমর্থকেরা হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। তবে আওয়ামী লীগ আইনের শাসন নিয়ে চিন্তিত বলে মনে হয় না। তারা তাদের শাসনামলে আইনের শাসন, বাক্স্বাধীনতা, সুবিচারের তোয়াক্কা করেনি। এখনো এসব নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। পত্রপত্রিকায় কী লেখা হচ্ছে, তাও আমলে নেন বলে মনে হয় না। তারা হয়তো তাদের বিষয় তাদের মতো করেই ফয়সালা করবেন।
কিন্তু দেশের সাধারণ নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষ, নাগরিক সমাজ, শিল্পী, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী এবং অবশ্যই দেশের ছোট-মাঝারি গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য আইনের শাসন, বাক্স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচার জরুরি। এর ব্যত্যয় হলে সবাইকেই ভুগতে হবে। আইনের শাসনের বিপরীতে যদি প্রশাসন আর বিচার বিভাগে প্রতিহিংসা আর প্রতিশোধ জায়গা করে নেয়, তবে তা মব-সংস্কৃতিরই আরেক রূপে আবির্ভাব ছাড়া ভিন্ন কিছু নয়। আর আইনের শাসন তো খণ্ডিতভাবে হয় না, সার্বজনীনভাবেই তার প্রয়োগ হতে হয়।
মোস্তফা জালাল মহিউদ্দীনের কথায় ফিরে যাই। ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের এক উত্তাল মুহূর্তে ডা. শামসুল আলম খান মিলন গুলিবিদ্ধ হওয়ার সময় তার সঙ্গে একই রিকশায় ছিলেন ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দীন। সেদিন তিনিও নিহত হতে পারতেন। তিনি আটক থাকা অবস্থায় তার সহধর্মিণী প্রয়াত হয়েছেন। তিনিও অসুস্থ। তার বিরুদ্ধে আনা একটি অভিযোগেরও তথ্য-প্রমাণ নেই। তাকে মুক্তি দিন। মিথ্যা হত্যা মামলা ছাড়া তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ভিন্ন কোনো অভিযোগ যদি থেকে থাকে, তা প্রকাশ করা হোক এবং বিচার চলুক। কিন্তু জামিনের অধিকার থেকে তিনি যেন বঞ্চিত না হন।
একই পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন ডাকসুর প্রাক্তন ভিপি, প্রাক্তন ছাত্রলীগ নেতা সুলতান মোহাম্মদ মনসুর। ২০১৮ সালে গণফোরামে যোগ দিয়ে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে পরবর্তীতে আবার গণফোরাম ত্যাগ করে ও একই সাথে বিএনপির সাথে দূরত্ব সৃষ্টি করে আওয়ামী লীগের সাথে সান্নিধ্য পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগে ফিরতে পারেননি। জুলাই আন্দোলনের সময়ও তিনি দেশে ছিলেন না। কিন্তু দেশে ফিরে আসার দিন আক্রোশবশত তাকে বিমানবন্দর থেকেই গ্রেপ্তার করা হয় এবং ২০২২ সালের এক খুনের মামলায় ফাসিয়ে দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পরে উচ্চ আদালত থেকে তিনি জামিন লাভ করলে আটক রাখার উদ্দেশ্যে তার বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি হত্যা মামলা দায়ের করে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। সুলতান মনসুর ২০১৮ সালে ও তারপরে নিঃসন্দেহে চরম রাজনৈতিক সুবিধাবাদীতার পরিচয় রেখেছিলেন। আর সে কারণে তার বিরুদ্ধে আক্রোশ ও প্রতিহিংসাবশত একটার পর একটা খুনের মামলা দায়ের করা হয়েছে। তাহলে সরকারের যে ঘোষণা ‘বর্তমান সরকার অবশ্যই নিশ্চিত করবে যে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে কেউ যেন কারাগারে বা অন্যায়ভাবে আটক না থাকে’ — এ কথার মুল্য রইলো কই?
সৃষ্টিকর্তা তার অন্যতম সেরা উপহার হিসেবে মানুষকে দিয়েছেন কথা বলার ক্ষমতা—যা আর কোনো প্রাণীর নেই। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কথা ‘বাত কি বাত’ হয়ে গেলে শুধু তার কথার সৌন্দর্যই হারিয়ে যাবে না, বিশ্বাস বা প্রতিশ্রুতিরও ভঙ্গ হবে। আর বিশ্বাস কিন্তু কথায় নয়, কাজে গড়ে ওঠে। তাই কথা রাখতে না পারলে কথা না বলাই শ্রেয়। মানুষের বিশ্বাস একবার ভেঙে গেলে সব ‘পরিকল্পনা’ কিন্তু বরবাদ হয়ে যাবে!
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

আপনার মতামত লিখুন