সংবাদ

‘এআই’ উত্তর জানে, কিন্তু শিক্ষার্থীকে কে জানবে?


সৈয়দা বদরুন নেসা
সৈয়দা বদরুন নেসা
প্রকাশ: ৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:২১ পিএম

‘এআই’ উত্তর জানে, কিন্তু শিক্ষার্থীকে কে জানবে?

এখন আর কোনো শিক্ষার্থীকে একটি সংজ্ঞা জানার জন্য পরদিনের ক্লাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় না। কয়েকটি শব্দ লিখলেই কয়েক সেকেন্ডে উত্তর এসে যায়। অঙ্কের সমাধান, প্রবন্ধের খসড়া, ইতিহাসের সারাংশ, এমনকি পরীক্ষার সম্ভাব্য প্রশ্নও প্রযুক্তি সাজিয়ে দিতে পারে।

তাহলে কি এমন এক সময় আসছে, যখন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক আর অপরিহার্য থাকবেন না? প্রশ্নটি প্রযুক্তির। কিন্তু উত্তরটি সম্ভবত মানুষের।কারণ শিক্ষা কি শুধু উত্তর জানার নাম? নিশ্চিতভাবেই না। শিক্ষা হলো কোন প্রশ্নটি করা উচিত তা বুঝতে শেখা, সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করতে শেখা, ভুল থেকে উঠে দাঁড়াতে শেখা, অন্য মানুষের কথা শুনতে শেখা এবং জ্ঞানকে দায়িত্বের সঙ্গে ব্যবহার করতে শেখা। এই জায়গাগুলোতে একজন শিক্ষক এখনও অনন্য।

আজ আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষাব্যবস্থাকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। ইউনেস্কোর ২০২৬ সালের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের আলোচনাতেও ডিজিটাল প্রযুক্তিকে শিক্ষকতার নতুন বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংস্থাটি স্পষ্টভাবে বলছে ভবিষ্যতের শিক্ষায় শিক্ষককে কেন্দ্রেই রাখতে হবে। তাদের সাম্প্রতিক প্রচারণার কথাটিও খুব অর্থবহ: “Teachers cannot be coded.” অর্থাৎ শিক্ষকের মানবিক ভূমিকাকে কোনো কোডে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা যায় না।একজন শিক্ষক হিসেবে বিষয়টি আমার কাছেও গভীরভাবে ভাববার।

একটি শ্রেণিকক্ষে সব শিক্ষার্থী কখনো একরকম থাকে না। কেউ প্রশ্ন করতে ভালোবাসে, কেউ চুপচাপ শোনে। কেউ একটি বিষয় একবার বললেই বুঝে ফেলে, আর কারও কাছে একই বিষয় তিনবার অন্যভাবে বলতে হয়। আবার এমনও শিক্ষার্থী থাকে, যে পড়াটি না বোঝার কারণে নয়, হয়তো বাড়ির কোনো দুশ্চিন্তার কারণে সেদিন মনোযোগ দিতে পারছে না।

একটি ‘এআই’ তার ভুল উত্তর ধরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু শিক্ষার্থীর মুখ দেখে সবসময় বুঝতে পারবে না আজ তার চোখ দুটি এত নিস্তেজ কেন। এইখানেই শিক্ষক। শিক্ষকের কাজ আসলে কখনোই শুধু তথ্য সরবরাহ করা ছিল না। কিন্তু দীর্ঘদিন আমরা শিক্ষকের ভূমিকাকে অনেকটাই তথ্য দেওয়ার সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছি। শিক্ষক বলবেন, শিক্ষার্থী লিখবে। শিক্ষক প্রশ্ন করবেন, শিক্ষার্থী উত্তর দেবে। এখন সেই ব্যবস্থাই সবচেয়ে বেশি প্রশ্নের মুখে।কারণ তথ্যের ওপর শিক্ষকের একচেটিয়া অধিকার আর নেই।

আজকের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ক্লাস নেওয়ার আগেই একটি বিষয় সম্পর্কে পড়ে আসতে পারে। সে ভিডিও দেখতে পারে, ডিজিটাল বই পড়তে পারে, এআই-কে প্রশ্ন করতে পারে। তাই ভবিষ্যতের শিক্ষক যদি শুধু বইয়ের কথাই পুনরাবৃত্তি করেন, শিক্ষার্থীর কাছে তার প্রয়োজন স্বাভাবিকভাবেই কমবে। কিন্তু এখানেই শিক্ষকের ভূমিকা যে শেষ, তা মনে করলে ভুল হবে বরং শিক্ষকের ভুমিকা নতুনভাবে শুরু।

ভবিষ্যতের শিক্ষক সম্ভবত আর শুধুই “জ্ঞানদাতা” নন। তিনি হবেন জ্ঞানের পথপ্রদর্শক। তিনি বলবেন না শুধু “উত্তরটি এই”; বরং জিজ্ঞেস করবেন “তুমি এই উত্তরকে সত্য মনে করলে কেন?”এই একটি পরিবর্তনই শিক্ষাকে বদলে দিতে পারে।কারণ ‘এআই’ খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল তথ্যও দিতে পারে। একটি সুন্দর ভাষায় লেখা উত্তর সবসময় সঠিক উত্তর নয়। একটি সূত্র উল্লেখ করা মানেই সূত্রটি নির্ভরযোগ্য নয়। ফলে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাগত দক্ষতাগুলোর একটি হবে যাচাই করার ক্ষমতা।

কোন উৎস বিশ্বাসযোগ্য? কোন তথ্যের পেছনে প্রমাণ আছে? কোথায় পক্ষপাত কাজ করছে? কোথায় যুক্তির ফাঁক?এই বিচারবোধ তৈরি না হলে প্রযুক্তির যুগে একজন শিক্ষার্থী তথ্যসমৃদ্ধ হতে পারে, কিন্তু জ্ঞানী নাও হতে পারে।

আর এখানেই একজন শিক্ষকের দায়িত্ব আরও বড়।

ইউনেস্কোর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দক্ষতা কাঠামোতেও শিক্ষককে শুধু ‘এআই’ ব্যবহারকারী হিসেবে দেখা হয়নি বরং প্রযুক্তিকে কীভাবে মানবকেন্দ্রিক, নৈতিক ও দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে হবে, সেই দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ‘এআই’ জানা যথেষ্ট নয় কিন্তু ‘এআই’ কোথায় ব্যবহার করতে হবে এবং কোথায় থামতে হবে, সেটিও জানতে হবে।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এই প্রশ্নটি খুব দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।আমাদের শিক্ষার্থীরা ইতিমধ্যেই ‘এআই’ ব্যবহার করছে। কেউ অ্যাসাইনমেন্ট লিখছে, কেউ অনুবাদ করছে, কেউ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু আমরা কি তাদের শেখাচ্ছি কীভাবে এটি ব্যবহার করতে হবে?

একজন শিক্ষার্থী যদি পুরো অ্যাসাইনমেন্ট ‘এআই’ দিয়ে লিখিয়ে জমা দেয়, তাহলে হয়তো সে সুন্দর একটি লেখা জমা দিল। কিন্তু সে কী শিখল?আবার বিপরীতভাবে ‘এআই’ নিষিদ্ধ করে দিলেই কি সমস্যার সমাধান হবে?সম্ভবত না।

ক্যালকুলেটর আসার পরে গণিত বন্ধ হয়নি। ইন্টারনেট আসার পরে বই অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়নি। একইভাবে ‘এআই’-কেও শিক্ষকের শত্রু  হওয়ার প্রয়োজন নেই। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি শিক্ষকের সহকারী হতে পারে।

একজন শিক্ষক ‘এআই’ ব্যবহার করে একই বিষয়ের বিভিন্ন স্তরের পাঠ তৈরি করতে পারেন। দুর্বল শিক্ষার্থীর জন্য সহজ ব্যাখ্যা, অগ্রসর শিক্ষার্থীর জন্য কঠিন সমস্যা, ক্লাসের জন্য প্রশ্ন, উদাহরণ বা শেখানোর নতুন কৌশল বের করতে পারেন। ইউনেস্কোর শিক্ষক ও ‘এআই’-সংক্রান্ত আলোচনাতেও বলা হয়েছে, ‘এআই’ শিক্ষকদের সক্ষমতা বাড়াতে পারে তবে মানবিক বিচারবোধ ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের জায়গা নিতে পারে না।

তাই আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত নয় “এআই কি শিক্ষককে সরিয়ে দেবে?”বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত “এআই ব্যবহার করে একজন শিক্ষক কীভাবে আরও ভালো শিক্ষক হতে পারেন?”এ জন্য প্রথম প্রয়োজন শিক্ষক প্রশিক্ষণ।

আমরা শিক্ষার্থীদের নতুন প্রযুক্তির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে পারি না এমন শিক্ষকদের হাতে, যারা সেই প্রযুক্তির সুযোগ ও ঝুঁকি সম্পর্কে জানার সুযোগই পাননি। শিক্ষককে শুধু একটি সফটওয়্যার চালানো শেখালেই হবে না। তাকে বুঝতে হবে তথ্যের গোপনীয়তা, কপিরাইট, পক্ষপাত, ভুল তথ্য, একাডেমিক সততা এবং শিক্ষার্থীর অতিনির্ভরতার ঝুঁকি।

আরেকটি বিষয় আরও গুরুত্বপূর্ণ। ‘এআই’-এর কারণে শিক্ষকের মানবিক দায়িত্ব কমবে না, বাড়বে। কারণ প্রযুক্তি যত শক্তিশালী হবে, শিশুর সামনে পৃথিবী তত দ্রুত খুলে যাবে। সে এমন বিষয় দেখবে, পড়বে, জানবে যা আগের প্রজন্ম অনেক পরে জানত। কিন্তু সে কি মানসিকভাবে সেই তথ্যের জন্য প্রস্তুত?তার সঙ্গে কে কথা বলবে?

একজন ছাত্র পরীক্ষায় খারাপ করলে ‘এআই’ তাকে “কীভাবে ভালো ফল করতে হবে” তার দশটি পরামর্শ দিতে পারে। কিন্তু সে যখন মনে করে, “আমি আর পারব না” তখন তার পাশে একজন মানুষ দরকার।

একজন শিক্ষক কখনও শুধু তো একটি বিষয়ের শিক্ষক নন। শিক্ষার্থীর জীবনের একটি সময়ে তিনি একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ, যাকে সে বিশ্বাস করতে শেখে।সেই সম্পর্কের মূল্য কোনো প্রযুক্তির মাপে ধরা কঠিন।

আজ পৃথিবীতে শিক্ষকের প্রয়োজনও কমছে না। ইউনেস্কোর হিসাবে, ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বজনীন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে বিশ্বে আরও প্রায় ৪৪ মিলিয়ন শিক্ষক প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষককে প্রশিক্ষিত, সমর্থিত এবং মর্যাদাবান রাখাকেও মানসম্মত শিক্ষার অন্যতম শর্ত বলা হচ্ছে। এ তথ্য আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য মনে করিয়ে দেয়।প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, পৃথিবী এখনো শিক্ষক খুঁজছে।তবে সেই শিক্ষককে বদলাতে হবে।

আগামী দিনের শিক্ষককে সব উত্তর জানা মানুষ হতে হবে না। এমন দাবি এখন অবাস্তবও। তার চেয়ে বরং তাকে এমন একজন মানুষ হতে হবে, যিনি জানেন কোথায় উত্তর খুঁজতে হয়, কীভাবে তা যাচাই করতে হয় এবং কীভাবে শিক্ষার্থীকে নিজের উত্তর খুঁজে নিতে শেখাতে হয়।তাকে বলতে হবে “আমি জানি না, চল আমরা খুঁজে দেখি।”

আর এই বাক্যটি হয়তো ভবিষ্যতের শিক্ষকতার অন্যতম সুন্দর বাক্য।কারণ একজন শিক্ষক যখন স্বীকার করেন যে শেখা কখনো শেষ হয় না, তখন তিনি শিক্ষার্থীকেও শেখান জ্ঞান মানে সব জানা নয়।জ্ঞান মানে শেখার সাহস রাখা। ‘এআই’ হয়তো একদিন আরও দ্রুত হবে। আরও নিখুঁত হবে। আমাদের ভাষা, অভ্যাস ও প্রয়োজন আরও ভালোভাবে বুঝবে।

তবু একটি প্রশ্ন থেকে যাবে। কে একজন শিক্ষার্থীকে শেখাবে সততা? কে তাকে বলবে জ্ঞানকে অন্যের ক্ষতির জন্য ব্যবহার করা উচিত নয়? কে বুঝিয়ে দেবে সফলতা শুধু নম্বর নয়? কে তার ব্যর্থতার দিনে তাকে মনে করিয়ে দেবে তার মূল্য একটি পরীক্ষার ফলের চেয়ে অনেক বড়?এসব প্রশ্নের উত্তর কোনো অ্যালগরিদমের মধ্যে পুরোপুরি ধরা যায় না। কারণ শিক্ষা শেষ পর্যন্ত মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক।

তাই ‘এআই’-এর যুগে শিক্ষককে বাঁচাতে প্রযুক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে না। বরং শিক্ষককে প্রযুক্তির ওপরে তার সবচেয়ে বড় শক্তিটি ফিরে পেতে হবে মানুষকে বোঝার শক্তি।এবারের বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তাই শুধু শিক্ষককে শুভেচ্ছা জানানোই যথেষ্ট নয়। আমাদের ভাবতে হবে, দ্রুত বদলে যাওয়া প্রযুক্তির যুগে শিক্ষককে কীভাবে আরও দক্ষ, আরও স্বাধীন এবং আরও মানবিক ভূমিকার জন্য প্রস্তুত করা যায়।

কারণ ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থায় ‘এআই’ থাকবে, প্রযুক্তি থাকবে, অসংখ্য ডিজিটাল সহায়তা থাকবে তবু শিক্ষার্থীর পাশে এমন একজন মানুষ প্রয়োজন হবে, যিনি শুধু তার উত্তর নয়, তার মানুষ হয়ে ওঠার পথটিও দেখবেন। ‘এআই’ উত্তর জানবে। কিন্তু শিক্ষার্থীর ভয়, স্বপ্ন, দ্বিধা, সম্ভাবনা আর নীরবতার ভাষা বুঝতে পাশে একজন মানুষই লাগবে। সেই মানুষটির নাম শিক্ষক।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, কৃষিশিক্ষা, বরেন্দ্র কলেজ, রাজশাহী

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬


‘এআই’ উত্তর জানে, কিন্তু শিক্ষার্থীকে কে জানবে?

প্রকাশের তারিখ : ০৪ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

এখন আর কোনো শিক্ষার্থীকে একটি সংজ্ঞা জানার জন্য পরদিনের ক্লাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় না। কয়েকটি শব্দ লিখলেই কয়েক সেকেন্ডে উত্তর এসে যায়। অঙ্কের সমাধান, প্রবন্ধের খসড়া, ইতিহাসের সারাংশ, এমনকি পরীক্ষার সম্ভাব্য প্রশ্নও প্রযুক্তি সাজিয়ে দিতে পারে।

তাহলে কি এমন এক সময় আসছে, যখন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক আর অপরিহার্য থাকবেন না? প্রশ্নটি প্রযুক্তির। কিন্তু উত্তরটি সম্ভবত মানুষের।কারণ শিক্ষা কি শুধু উত্তর জানার নাম? নিশ্চিতভাবেই না। শিক্ষা হলো কোন প্রশ্নটি করা উচিত তা বুঝতে শেখা, সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করতে শেখা, ভুল থেকে উঠে দাঁড়াতে শেখা, অন্য মানুষের কথা শুনতে শেখা এবং জ্ঞানকে দায়িত্বের সঙ্গে ব্যবহার করতে শেখা। এই জায়গাগুলোতে একজন শিক্ষক এখনও অনন্য।

আজ আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষাব্যবস্থাকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। ইউনেস্কোর ২০২৬ সালের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের আলোচনাতেও ডিজিটাল প্রযুক্তিকে শিক্ষকতার নতুন বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংস্থাটি স্পষ্টভাবে বলছে ভবিষ্যতের শিক্ষায় শিক্ষককে কেন্দ্রেই রাখতে হবে। তাদের সাম্প্রতিক প্রচারণার কথাটিও খুব অর্থবহ: “Teachers cannot be coded.” অর্থাৎ শিক্ষকের মানবিক ভূমিকাকে কোনো কোডে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা যায় না।একজন শিক্ষক হিসেবে বিষয়টি আমার কাছেও গভীরভাবে ভাববার।

একটি শ্রেণিকক্ষে সব শিক্ষার্থী কখনো একরকম থাকে না। কেউ প্রশ্ন করতে ভালোবাসে, কেউ চুপচাপ শোনে। কেউ একটি বিষয় একবার বললেই বুঝে ফেলে, আর কারও কাছে একই বিষয় তিনবার অন্যভাবে বলতে হয়। আবার এমনও শিক্ষার্থী থাকে, যে পড়াটি না বোঝার কারণে নয়, হয়তো বাড়ির কোনো দুশ্চিন্তার কারণে সেদিন মনোযোগ দিতে পারছে না।

একটি ‘এআই’ তার ভুল উত্তর ধরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু শিক্ষার্থীর মুখ দেখে সবসময় বুঝতে পারবে না আজ তার চোখ দুটি এত নিস্তেজ কেন। এইখানেই শিক্ষক। শিক্ষকের কাজ আসলে কখনোই শুধু তথ্য সরবরাহ করা ছিল না। কিন্তু দীর্ঘদিন আমরা শিক্ষকের ভূমিকাকে অনেকটাই তথ্য দেওয়ার সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছি। শিক্ষক বলবেন, শিক্ষার্থী লিখবে। শিক্ষক প্রশ্ন করবেন, শিক্ষার্থী উত্তর দেবে। এখন সেই ব্যবস্থাই সবচেয়ে বেশি প্রশ্নের মুখে।কারণ তথ্যের ওপর শিক্ষকের একচেটিয়া অধিকার আর নেই।

আজকের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ক্লাস নেওয়ার আগেই একটি বিষয় সম্পর্কে পড়ে আসতে পারে। সে ভিডিও দেখতে পারে, ডিজিটাল বই পড়তে পারে, এআই-কে প্রশ্ন করতে পারে। তাই ভবিষ্যতের শিক্ষক যদি শুধু বইয়ের কথাই পুনরাবৃত্তি করেন, শিক্ষার্থীর কাছে তার প্রয়োজন স্বাভাবিকভাবেই কমবে। কিন্তু এখানেই শিক্ষকের ভূমিকা যে শেষ, তা মনে করলে ভুল হবে বরং শিক্ষকের ভুমিকা নতুনভাবে শুরু।

ভবিষ্যতের শিক্ষক সম্ভবত আর শুধুই “জ্ঞানদাতা” নন। তিনি হবেন জ্ঞানের পথপ্রদর্শক। তিনি বলবেন না শুধু “উত্তরটি এই”; বরং জিজ্ঞেস করবেন “তুমি এই উত্তরকে সত্য মনে করলে কেন?”এই একটি পরিবর্তনই শিক্ষাকে বদলে দিতে পারে।কারণ ‘এআই’ খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল তথ্যও দিতে পারে। একটি সুন্দর ভাষায় লেখা উত্তর সবসময় সঠিক উত্তর নয়। একটি সূত্র উল্লেখ করা মানেই সূত্রটি নির্ভরযোগ্য নয়। ফলে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাগত দক্ষতাগুলোর একটি হবে যাচাই করার ক্ষমতা।

কোন উৎস বিশ্বাসযোগ্য? কোন তথ্যের পেছনে প্রমাণ আছে? কোথায় পক্ষপাত কাজ করছে? কোথায় যুক্তির ফাঁক?এই বিচারবোধ তৈরি না হলে প্রযুক্তির যুগে একজন শিক্ষার্থী তথ্যসমৃদ্ধ হতে পারে, কিন্তু জ্ঞানী নাও হতে পারে।

আর এখানেই একজন শিক্ষকের দায়িত্ব আরও বড়।

ইউনেস্কোর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দক্ষতা কাঠামোতেও শিক্ষককে শুধু ‘এআই’ ব্যবহারকারী হিসেবে দেখা হয়নি বরং প্রযুক্তিকে কীভাবে মানবকেন্দ্রিক, নৈতিক ও দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে হবে, সেই দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ‘এআই’ জানা যথেষ্ট নয় কিন্তু ‘এআই’ কোথায় ব্যবহার করতে হবে এবং কোথায় থামতে হবে, সেটিও জানতে হবে।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এই প্রশ্নটি খুব দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।আমাদের শিক্ষার্থীরা ইতিমধ্যেই ‘এআই’ ব্যবহার করছে। কেউ অ্যাসাইনমেন্ট লিখছে, কেউ অনুবাদ করছে, কেউ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু আমরা কি তাদের শেখাচ্ছি কীভাবে এটি ব্যবহার করতে হবে?

একজন শিক্ষার্থী যদি পুরো অ্যাসাইনমেন্ট ‘এআই’ দিয়ে লিখিয়ে জমা দেয়, তাহলে হয়তো সে সুন্দর একটি লেখা জমা দিল। কিন্তু সে কী শিখল?আবার বিপরীতভাবে ‘এআই’ নিষিদ্ধ করে দিলেই কি সমস্যার সমাধান হবে?সম্ভবত না।

ক্যালকুলেটর আসার পরে গণিত বন্ধ হয়নি। ইন্টারনেট আসার পরে বই অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়নি। একইভাবে ‘এআই’-কেও শিক্ষকের শত্রু  হওয়ার প্রয়োজন নেই। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি শিক্ষকের সহকারী হতে পারে।

একজন শিক্ষক ‘এআই’ ব্যবহার করে একই বিষয়ের বিভিন্ন স্তরের পাঠ তৈরি করতে পারেন। দুর্বল শিক্ষার্থীর জন্য সহজ ব্যাখ্যা, অগ্রসর শিক্ষার্থীর জন্য কঠিন সমস্যা, ক্লাসের জন্য প্রশ্ন, উদাহরণ বা শেখানোর নতুন কৌশল বের করতে পারেন। ইউনেস্কোর শিক্ষক ও ‘এআই’-সংক্রান্ত আলোচনাতেও বলা হয়েছে, ‘এআই’ শিক্ষকদের সক্ষমতা বাড়াতে পারে তবে মানবিক বিচারবোধ ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের জায়গা নিতে পারে না।

তাই আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত নয় “এআই কি শিক্ষককে সরিয়ে দেবে?”বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত “এআই ব্যবহার করে একজন শিক্ষক কীভাবে আরও ভালো শিক্ষক হতে পারেন?”এ জন্য প্রথম প্রয়োজন শিক্ষক প্রশিক্ষণ।

আমরা শিক্ষার্থীদের নতুন প্রযুক্তির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে পারি না এমন শিক্ষকদের হাতে, যারা সেই প্রযুক্তির সুযোগ ও ঝুঁকি সম্পর্কে জানার সুযোগই পাননি। শিক্ষককে শুধু একটি সফটওয়্যার চালানো শেখালেই হবে না। তাকে বুঝতে হবে তথ্যের গোপনীয়তা, কপিরাইট, পক্ষপাত, ভুল তথ্য, একাডেমিক সততা এবং শিক্ষার্থীর অতিনির্ভরতার ঝুঁকি।

আরেকটি বিষয় আরও গুরুত্বপূর্ণ। ‘এআই’-এর কারণে শিক্ষকের মানবিক দায়িত্ব কমবে না, বাড়বে। কারণ প্রযুক্তি যত শক্তিশালী হবে, শিশুর সামনে পৃথিবী তত দ্রুত খুলে যাবে। সে এমন বিষয় দেখবে, পড়বে, জানবে যা আগের প্রজন্ম অনেক পরে জানত। কিন্তু সে কি মানসিকভাবে সেই তথ্যের জন্য প্রস্তুত?তার সঙ্গে কে কথা বলবে?

একজন ছাত্র পরীক্ষায় খারাপ করলে ‘এআই’ তাকে “কীভাবে ভালো ফল করতে হবে” তার দশটি পরামর্শ দিতে পারে। কিন্তু সে যখন মনে করে, “আমি আর পারব না” তখন তার পাশে একজন মানুষ দরকার।

একজন শিক্ষক কখনও শুধু তো একটি বিষয়ের শিক্ষক নন। শিক্ষার্থীর জীবনের একটি সময়ে তিনি একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ, যাকে সে বিশ্বাস করতে শেখে।সেই সম্পর্কের মূল্য কোনো প্রযুক্তির মাপে ধরা কঠিন।

আজ পৃথিবীতে শিক্ষকের প্রয়োজনও কমছে না। ইউনেস্কোর হিসাবে, ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বজনীন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে বিশ্বে আরও প্রায় ৪৪ মিলিয়ন শিক্ষক প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষককে প্রশিক্ষিত, সমর্থিত এবং মর্যাদাবান রাখাকেও মানসম্মত শিক্ষার অন্যতম শর্ত বলা হচ্ছে। এ তথ্য আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য মনে করিয়ে দেয়।প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, পৃথিবী এখনো শিক্ষক খুঁজছে।তবে সেই শিক্ষককে বদলাতে হবে।

আগামী দিনের শিক্ষককে সব উত্তর জানা মানুষ হতে হবে না। এমন দাবি এখন অবাস্তবও। তার চেয়ে বরং তাকে এমন একজন মানুষ হতে হবে, যিনি জানেন কোথায় উত্তর খুঁজতে হয়, কীভাবে তা যাচাই করতে হয় এবং কীভাবে শিক্ষার্থীকে নিজের উত্তর খুঁজে নিতে শেখাতে হয়।তাকে বলতে হবে “আমি জানি না, চল আমরা খুঁজে দেখি।”

আর এই বাক্যটি হয়তো ভবিষ্যতের শিক্ষকতার অন্যতম সুন্দর বাক্য।কারণ একজন শিক্ষক যখন স্বীকার করেন যে শেখা কখনো শেষ হয় না, তখন তিনি শিক্ষার্থীকেও শেখান জ্ঞান মানে সব জানা নয়।জ্ঞান মানে শেখার সাহস রাখা। ‘এআই’ হয়তো একদিন আরও দ্রুত হবে। আরও নিখুঁত হবে। আমাদের ভাষা, অভ্যাস ও প্রয়োজন আরও ভালোভাবে বুঝবে।

তবু একটি প্রশ্ন থেকে যাবে। কে একজন শিক্ষার্থীকে শেখাবে সততা? কে তাকে বলবে জ্ঞানকে অন্যের ক্ষতির জন্য ব্যবহার করা উচিত নয়? কে বুঝিয়ে দেবে সফলতা শুধু নম্বর নয়? কে তার ব্যর্থতার দিনে তাকে মনে করিয়ে দেবে তার মূল্য একটি পরীক্ষার ফলের চেয়ে অনেক বড়?এসব প্রশ্নের উত্তর কোনো অ্যালগরিদমের মধ্যে পুরোপুরি ধরা যায় না। কারণ শিক্ষা শেষ পর্যন্ত মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক।

তাই ‘এআই’-এর যুগে শিক্ষককে বাঁচাতে প্রযুক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে না। বরং শিক্ষককে প্রযুক্তির ওপরে তার সবচেয়ে বড় শক্তিটি ফিরে পেতে হবে মানুষকে বোঝার শক্তি।এবারের বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তাই শুধু শিক্ষককে শুভেচ্ছা জানানোই যথেষ্ট নয়। আমাদের ভাবতে হবে, দ্রুত বদলে যাওয়া প্রযুক্তির যুগে শিক্ষককে কীভাবে আরও দক্ষ, আরও স্বাধীন এবং আরও মানবিক ভূমিকার জন্য প্রস্তুত করা যায়।

কারণ ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থায় ‘এআই’ থাকবে, প্রযুক্তি থাকবে, অসংখ্য ডিজিটাল সহায়তা থাকবে তবু শিক্ষার্থীর পাশে এমন একজন মানুষ প্রয়োজন হবে, যিনি শুধু তার উত্তর নয়, তার মানুষ হয়ে ওঠার পথটিও দেখবেন। ‘এআই’ উত্তর জানবে। কিন্তু শিক্ষার্থীর ভয়, স্বপ্ন, দ্বিধা, সম্ভাবনা আর নীরবতার ভাষা বুঝতে পাশে একজন মানুষই লাগবে। সেই মানুষটির নাম শিক্ষক।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, কৃষিশিক্ষা, বরেন্দ্র কলেজ, রাজশাহী


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত