সংবাদ

স্বাদ, স্বাস্থ্য আর পানীয়ের নতুন দিনের গল্প


শহীদুল ইসলাম
শহীদুল ইসলাম
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৫ এএম

স্বাদ, স্বাস্থ্য আর পানীয়ের নতুন দিনের গল্প

বাংলাদেশে পানীয়ের বাজার বললে একসময় আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠত কোমল পানীয়, ফলের রস, লাচ্ছি, শরবত, চা, কফি কিংবা বোতলজাত পানি। কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের পানীয়ের বাজারেও ধীরে ধীরে বড় পরিবর্তন আসছে। ২০২৭ সালে এই পরিবর্তন আরও দৃশ্যমান হতে পারে। ভবিষ্যতের পানীয় শুধু তৃষ্ণা মেটাবে—এমন নয়; ভোক্তারা ক্রমেই এমন পানীয় চাইবেন, যা একই সঙ্গে সুস্বাদু, সুবিধাজনক এবং তাঁদের জীবনযাপন বা পুষ্টির কোনো নির্দিষ্ট প্রয়োজনের সঙ্গে মানানসই।

বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া পানীয়ের চাহিদাকে স্বাভাবিকভাবেই বাড়ায়। নগরায়ণ, মানুষের আয় ও ব্যয়ের ধরনে পরিবর্তন, সুপারমার্কেট ও অনলাইন বিক্রির প্রসার এবং তরুণ জনগোষ্ঠীর নতুন পণ্য গ্রহণের আগ্রহ—সব মিলিয়ে পানীয়শিল্পে নতুন পণ্য তৈরির সুযোগ বাড়ছে। বাজারবিষয়ক সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বাংলাদেশের ভোক্তাদের মধ্যে কম চিনি, প্রাকৃতিক উপাদান এবং কার্যকরী পানীয়ের প্রতি আগ্রহের কথা বলা হচ্ছে।

এখন তাই প্রশ্নটি শুধু ‘কোন স্বাদের পানীয় তৈরি করব’ নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে—পানীয়টি কেন মানুষ কিনবে এবং এটি তাঁদের কোন প্রয়োজন পূরণ করবে? এখানেই ২০২৭ সালের পানীয়শিল্পের বড় পরিবর্তন।

বাংলাদেশে আগামী দিনের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রগুলোর একটি হতে পারে কার্যকরী পানীয়। এ ধরনের পানীয়ের উদ্দেশ্য শুধু তৃষ্ণা মেটানো নয়; বরং নির্দিষ্ট পুষ্টিগত বা জীবনযাপনভিত্তিক প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে পণ্য তৈরি করা। যেমন শরীরচর্চার পর শরীরে পানির ঘাটতি পূরণে ইলেকট্রোলাইটযুক্ত পানীয়, খাদ্য-আঁশসমৃদ্ধ পানীয়, প্রোটিন ও পুষ্টিসমৃদ্ধ পানীয় কিংবা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তৈরি কম ক্যাফেইন বা ক্যাফেইনবিহীন পানীয়।

বাংলাদেশে কার্যকরী পানীয়ের ধারণা ইতিমধ্যেই বাজার গবেষণায় আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে। শক্তিবর্ধক পানীয়ের পাশাপাশি খেলাধুলার উপযোগী পানীয়, প্রোটিন ও পুষ্টিসমৃদ্ধ পানীয়, কার্যকরী পানি এবং উপকারী অণুজীব বা সুস্থতাকেন্দ্রিক পানীয়ের মতো বিভাগ নিয়ে বাজার বিশ্লেষণ হচ্ছে।

তবে আগামী দিনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পরিবর্তন সম্ভবত শক্তিবর্ধক পানীয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।

বর্তমানে বাজারে ‘শক্তিবর্ধক’ বলতে আমরা অনেক ক্ষেত্রেই ক্যাফেইন ও চিনিনির্ভর পানীয় বুঝি। ভবিষ্যতে এই ধারণা আরও বিস্তৃত হতে পারে। কেউ চাইবেন ব্যায়ামের পর শরীরের পুনরুদ্ধারে সহায়ক পানীয়, কেউ চাইবেন দুপুরে হালকা পুষ্টি, কেউ চাইবেন গরমের দিনে ইলেকট্রোলাইট, আবার কেউ হয়তো চাইবেন সন্ধ্যার জন্য ক্যাফেইনবিহীন একটি সতেজ পানীয়। ফলে ভবিষ্যতের বাজারে ‘একটি পানীয় সবার জন্য’ ধারণার পরিবর্তে ‘একটি নির্দিষ্ট প্রয়োজনের জন্য একটি পানীয়’ ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রগুলোর একটি হতে পারে খাদ্য-আঁশসমৃদ্ধ পানীয়। কয়েক বছর ধরে বিশ্বব্যাপী প্রোটিন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। উচ্চ প্রোটিনযুক্ত খাবার ও পানীয় এখন প্রতিষ্ঠিত বাজার। কিন্তু প্রোটিনের পাশাপাশি খাদ্য-আঁশও এখন নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে।

আমাদের প্রচলিত খাদ্যে শাকসবজি, ডাল, ফল এবং পূর্ণ শস্য খাদ্য-আঁশের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু আধুনিক খাদ্যপ্রযুক্তিতে এমন অনেক দ্রবণীয় আঁশ রয়েছে, যা পানীয়তে ব্যবহার করা সম্ভব। আংশিক হাইড্রোলাইজড গুয়ার গাম, অ্যাকাসিয়া আঁশ, প্রতিরোধী ডেক্সট্রিনসহ বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করে স্বচ্ছ কিংবা হালকা ঘন পানীয় তৈরি করা যায়।

বাংলাদেশের পানীয় কোম্পানিগুলো এখান থেকে নতুন বাজার তৈরি করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে লেবু-লাইম স্বাদের গ্যাসযুক্ত খাদ্য-আঁশসমৃদ্ধ পানীয়, আম বা পেয়ারা স্বাদের আঁশসমৃদ্ধ পানীয় কিংবা গুঁড়ার ছোট প্যাকেটে দৈনিক খাদ্য-আঁশের পানীয় তৈরি করা যেতে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অন্ত্রের সুস্থতা। বিশ্বব্যাপী প্রিবায়োটিক, প্রোবায়োটিক ও গাঁজন করা খাদ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। বাংলাদেশেও ভবিষ্যতে দইভিত্তিক পানীয়ের বাইরে আঁশসমৃদ্ধ ও অন্যান্য হজম-সহায়ক পানীয়ের বাজার তৈরি হতে পারে।

তবে এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো পানীয়তে সামান্য আঁশ যোগ করলেই সেটিকে ইচ্ছেমতো ‘অন্ত্রের সুস্থতার পানীয়’ বলা উচিত নয়। কোন উপাদান কতটুকু রয়েছে, তার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি কী এবং আইন অনুযায়ী কী ধরনের পুষ্টি বা স্বাস্থ্যবিষয়ক দাবি করা যাবে—এসব বিষয় অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে।

আরেকটি বড় সম্ভাবনা হচ্ছে শরীরে পানির ঘাটতি পূরণের পানীয়। বাংলাদেশের আবহাওয়ার কথা বিবেচনা করলে এই বাজারটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। গরমের দিনে ঘাম, বাইরে কাজ, খেলাধুলা, দীর্ঘ যাতায়াত এবং শারীরিক পরিশ্রমের কারণে শরীরের পানি ও ইলেকট্রোলাইটের প্রয়োজন বাড়তে পারে।

আমাদের দেশে খাবার স্যালাইনের অসাধারণ জনস্বাস্থ্যগত ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু চিকিৎসার প্রয়োজনে ব্যবহৃত খাবার স্যালাইন এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনের জন্য তৈরি শরীরে পানির ঘাটতি পূরণের পানীয় এক বিষয় নয়। এখানেই শিল্পের নতুন সুযোগ রয়েছে।

পানি, উপযুক্ত ইলেকট্রোলাইট, কম চিনি এবং ভালো স্বাদের সমন্বয়ে দৈনন্দিন পানীয় তৈরি করা যেতে পারে। এগুলো বোতল, ক্যান, গুঁড়ার ছোট প্যাকেট বা পানিতে গুলে খাওয়ার বড়ির আকারে বাজারজাত করা সম্ভব।

বাংলাদেশের মতো দেশে ছোট প্যাকেট বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একটি বড় বোতল কেনার পরিবর্তে কেউ যদি কম দামে একটি প্যাকেট কিনে ৫০০ মিলিলিটার পানিতে মিশিয়ে পান করতে পারেন, তাহলে পণ্যটি অনেক বড় জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়।

২০২৭ সালের আরেকটি বড় বিষয় হবে কম চিনি। এখানে বাংলাদেশের সামনে একই সঙ্গে ব্যবসায়িক সুযোগ এবং জনস্বাস্থ্যের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বাংলাদেশের পরিবারগুলোর মধ্যে কোমল পানীয় গ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে—২০২২ সালের গৃহস্থালি আয়-ব্যয় জরিপের তথ্য ব্যবহার করা একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় কোমল পানীয় গ্রহণকারী পরিবারের অনুপাত ২০১৬ সালের প্রায় ১৩ শতাংশ থেকে ২০২২ সালে প্রায় ৩৭ শতাংশে পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছে।

অতএব, আমাদের ভবিষ্যৎ পানীয়শিল্প শুধু আরও বেশি পানীয় বিক্রির কথা চিন্তা করলে চলবে না; কী ধরনের পানীয় বিক্রি হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কম চিনিযুক্ত বা চিনিবিহীন পানীয়ের বড় বাজার তৈরি হতে পারে। কিন্তু খাদ্যবিজ্ঞানীদের জন্য এটি সহজ কাজ নয়। চিনি শুধু মিষ্টতা দেয় না; এটি পানীয়ের ঘনত্ব, মুখে অনুভূত স্বাদ ও গঠন এবং ফলের স্বাদের ভারসাম্য তৈরিতেও ভূমিকা রাখে। তাই চিনি কমিয়ে শুধু উচ্চমাত্রার কোনো মিষ্টিকারক যোগ করলেই ভালো পানীয় তৈরি হয় না। মিষ্টতা, অম্লতা, স্বাদ, মুখে অনুভূত গঠন এবং পান করার পর থেকে যাওয়া স্বাদ—সবকিছুর ভারসাম্য দরকার।

বাংলাদেশের কোম্পানিগুলোর জন্য আরেকটি আকর্ষণীয় সুযোগ হতে পারে প্রোটিন পানীয়। প্রোটিনের গুঁড়াকে আমরা সাধারণত শরীরচর্চা বা ব্যায়ামাগারের সঙ্গে যুক্ত করি। কিন্তু ভবিষ্যতের প্রোটিন পানীয় শুধু শরীর গঠনে আগ্রহীদের জন্য থাকবে না। সকালের নাশতার সঙ্গে, অফিসে বিকেলের ক্ষুধায় কিংবা ব্যায়ামের পর সাধারণ ভোক্তার জন্য ছোট আকারের পুষ্টিকর পানীয় তৈরি হতে পারে।

দুধের প্রোটিনের পাশাপাশি মটরশুঁটি, সয়া কিংবা অন্যান্য উদ্ভিদভিত্তিক প্রোটিন ব্যবহার করেও নতুন পণ্য তৈরি করা সম্ভব। কোকো, কফি, ভ্যানিলা, কলা কিংবা পরিচিত দেশীয় স্বাদের সঙ্গে প্রোটিন মিলিয়ে নতুন ধরনের পানীয় তৈরি হতে পারে।

তবে শুধু প্রোটিনের পরিমাণ বাড়ালেই ভালো পণ্য হয় না। প্রোটিনের স্বাদ, তিক্ততা, মুখে শুকনো অনুভূতি, তলানি এবং তাপ প্রয়োগে স্থিতিশীলতা—সবই গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত বিষয়।

আরেকটি নতুন ধারণা হচ্ছে সময়ভিত্তিক পানীয়। সকালে আমরা চা বা কফি খাই। দুপুরে হয়তো ঠান্ডা পানীয় চাই। বিকেলে আবার চা। রাতে অনেকেই ক্যাফেইন এড়িয়ে চলতে চান। পানীয় কোম্পানিগুলো যদি এই স্বাভাবিক আচরণকে কেন্দ্র করে পণ্য তৈরি করে?

সকালের জন্য হালকা ক্যাফেইন ও পুষ্টিসমৃদ্ধ পানীয়, দুপুরে প্রোটিন বা আঁশযুক্ত পানীয়, বিকেলে কম চিনির সতেজ পানীয় এবং রাতে ক্যাফেইনবিহীন ক্যামোমাইল বা অন্যান্য উপযুক্ত উদ্ভিজ্জ উপাদানভিত্তিক পানীয়—এ ধরনের ধারণা ভবিষ্যতে বাজার তৈরি করতে পারে।

তবে ‘শিথিলতা’, ‘ঘুম’, ‘মানসিক চাপ কমানো’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ও খাদ্য আইনের সীমাবদ্ধতা বুঝতে হবে। পানীয় কোনো রোগের চিকিৎসা নয়।

স্বাদের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের সামনে বিশাল সুযোগ রয়েছে। আমাদের নিজেদের ফলের বৈচিত্র্যই একটি বড় সম্পদ। আম, কাঁচা আম, পেয়ারা, লেবু, বাতাবি লেবু, আনারস, তেঁতুল, জাম, বরই, বেল, ডাব—এসব পরিচিত স্বাদকে আধুনিক পানীয়ের সঙ্গে নতুনভাবে যুক্ত করা যায়।

বিশ্বে পুরোনো দিনের পরিচিত স্বাদকে নতুনভাবে ফিরিয়ে আনার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেটি হতে পারে আরও আকর্ষণীয়। বেলের শরবত, আমপোড়া শরবত, তেঁতুল, লেবু-পুদিনা কিংবা বোরহানির পরিচিত স্বাদ আধুনিক প্রযুক্তি ও নতুন উপস্থাপনায় তরুণ ভোক্তার কাছে নতুন অভিজ্ঞতা হিসেবে ফিরে আসতে পারে।

কল্পনা করুন—গ্যাসযুক্ত আমপোড়া পানীয়, কম চিনির তেঁতুল-মরিচ পানীয়, লেবু-পুদিনা ইলেকট্রোলাইট পানীয় কিংবা বেল ও আঁশের সমন্বয়ে তৈরি আধুনিক পানীয়। এখানেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। আমাদের ভবিষ্যৎ পানীয়শিল্পকে সব সময় বিদেশি স্বাদ নকল করতে হবে না। দেশীয় স্বাদকে আধুনিক খাদ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করাই হতে পারে আমাদের নিজস্ব উদ্ভাবন।

দাম অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। বাংলাদেশের ভোক্তারা মূল্য-সংবেদনশীল। কোমল পানীয় নিয়ে বাংলাদেশের তথ্য বিশ্লেষণেও দামের পরিবর্তনের সঙ্গে চাহিদার উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তাই শুধু ২৫০ বা ৩০০ টাকার উচ্চমূল্যের পানীয় তৈরি করলে কার্যকরী পানীয়ের বাজার বড় হবে না। ২০, ৩০, ৫০ কিংবা ১০০ টাকার মধ্যে কীভাবে বিভিন্ন স্তরের পণ্য তৈরি করা যায়, সেটিও শিল্পকে ভাবতে হবে। ছোট বোতল, ছোট ক্যান, ছোট প্যাকেট এবং গুঁড়ার প্যাকেট এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশের শক্তিবর্ধক পানীয়ের বাজারও ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য। ২০২৬ সালের একটি বাজার পূর্বাভাসে এই বাজারের মূল্য ২০২৬ সালে প্রায় ১৪ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার হিসেবে অনুমান করা হয়েছে এবং ২০৩১ সাল নাগাদ প্রায় ২২ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। একই বিশ্লেষণে ২০২৬–৩১ সময়ে বার্ষিক গড় বৃদ্ধির হার প্রায় ৮.২ শতাংশ ধরা হয়েছে। এগুলো অবশ্য বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাস, সরকারি পরিসংখ্যান নয়।

এই বাজারের ভবিষ্যৎ শুধু বেশি ক্যাফেইন ও বেশি মিষ্টতার মধ্যে আটকে থাকার প্রয়োজন নেই। কম চিনি, ইলেকট্রোলাইট, ভিটামিন, শরীরে পানির ঘাটতি পূরণ এবং অন্যান্য কার্যকরী ধারণা ব্যবহার করে নতুন প্রজন্মের পণ্য তৈরি করা সম্ভব। সব মিলিয়ে ২০২৭ সালের বাংলাদেশের পানীয়শিল্পের জন্য একটি সহজ সূত্র হতে পারে—স্বাস্থ্য + কার্যকারিতা + দেশীয় স্বাদ + সুবিধা + সাশ্রয়ী মূল্য।

বাংলাদেশের খাদ্য ও পানীয় কোম্পানিগুলো যদি এখন থেকেই গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ করে, তাহলে কয়েকটি ক্ষেত্র বিশেষভাবে সম্ভাবনাময়—খাদ্য-আঁশ ও অন্ত্রের সুস্থতাকেন্দ্রিক পানীয়, কম চিনির কার্যকরী পানীয়, ইলেকট্রোলাইট ও শরীরে পানির ঘাটতি পূরণের পানীয়, প্রোটিন ও পুষ্টিসমৃদ্ধ পানীয়, সময়ভিত্তিক পানীয় এবং আধুনিক রূপে দেশীয় স্বাদের পানীয়।

কিন্তু শুধু নতুন উপাদান যোগ করলেই উদ্ভাবন হয় না। একটি ভালো পানীয়কে একই সঙ্গে নিরাপদ, স্থিতিশীল, সুস্বাদু, সাশ্রয়ী এবং আইনসম্মত হতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের গরম আবহাওয়ায় পণ্যের অণুজীবগত নিরাপত্তা, মোড়ক, আলো ও অক্সিজেনের প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণকালীন স্থিতিশীলতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আগামী দিনের সফল পানীয় হয়তো সেই পানীয় নয়, যার বোতলে সবচেয়ে বেশি উপাদানের নাম লেখা থাকবে। বরং সফল হবে সেই পণ্য, যার প্রয়োজনীয়তা একজন সাধারণ ভোক্তা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বুঝতে পারবেন।

একসময় আমরা দোকানে গিয়ে বলতাম—‘একটা ঠান্ডা পানীয় দিন।’ ভবিষ্যতে হয়তো একজন ভোক্তা বলবেন—‘কম চিনি, একটু আঁশ আর ভালো স্বাদের একটা পানীয় দিন।’ অথবা—‘গরমে শরীরটা সতেজ রাখবে, এমন একটা পানীয় দিন।’

এই পরিবর্তন যদি সত্যিই আসে, তাহলে ২০২৭ সাল বাংলাদেশের পানীয়শিল্পের জন্য শুধু নতুন স্বাদের বছর হবে না; এটি হতে পারে নতুন চিন্তার পানীয়ের বছর।

[লেখক: খাদ্যবিজ্ঞানী, উদ্ভাবন ব্যবস্থাপক, সালুটিভিয়া, যুক্তরাজ্য]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬


স্বাদ, স্বাস্থ্য আর পানীয়ের নতুন দিনের গল্প

প্রকাশের তারিখ : ২৬ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশে পানীয়ের বাজার বললে একসময় আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠত কোমল পানীয়, ফলের রস, লাচ্ছি, শরবত, চা, কফি কিংবা বোতলজাত পানি। কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের পানীয়ের বাজারেও ধীরে ধীরে বড় পরিবর্তন আসছে। ২০২৭ সালে এই পরিবর্তন আরও দৃশ্যমান হতে পারে। ভবিষ্যতের পানীয় শুধু তৃষ্ণা মেটাবে—এমন নয়; ভোক্তারা ক্রমেই এমন পানীয় চাইবেন, যা একই সঙ্গে সুস্বাদু, সুবিধাজনক এবং তাঁদের জীবনযাপন বা পুষ্টির কোনো নির্দিষ্ট প্রয়োজনের সঙ্গে মানানসই।

বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া পানীয়ের চাহিদাকে স্বাভাবিকভাবেই বাড়ায়। নগরায়ণ, মানুষের আয় ও ব্যয়ের ধরনে পরিবর্তন, সুপারমার্কেট ও অনলাইন বিক্রির প্রসার এবং তরুণ জনগোষ্ঠীর নতুন পণ্য গ্রহণের আগ্রহ—সব মিলিয়ে পানীয়শিল্পে নতুন পণ্য তৈরির সুযোগ বাড়ছে। বাজারবিষয়ক সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বাংলাদেশের ভোক্তাদের মধ্যে কম চিনি, প্রাকৃতিক উপাদান এবং কার্যকরী পানীয়ের প্রতি আগ্রহের কথা বলা হচ্ছে।

এখন তাই প্রশ্নটি শুধু ‘কোন স্বাদের পানীয় তৈরি করব’ নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে—পানীয়টি কেন মানুষ কিনবে এবং এটি তাঁদের কোন প্রয়োজন পূরণ করবে? এখানেই ২০২৭ সালের পানীয়শিল্পের বড় পরিবর্তন।

বাংলাদেশে আগামী দিনের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রগুলোর একটি হতে পারে কার্যকরী পানীয়। এ ধরনের পানীয়ের উদ্দেশ্য শুধু তৃষ্ণা মেটানো নয়; বরং নির্দিষ্ট পুষ্টিগত বা জীবনযাপনভিত্তিক প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে পণ্য তৈরি করা। যেমন শরীরচর্চার পর শরীরে পানির ঘাটতি পূরণে ইলেকট্রোলাইটযুক্ত পানীয়, খাদ্য-আঁশসমৃদ্ধ পানীয়, প্রোটিন ও পুষ্টিসমৃদ্ধ পানীয় কিংবা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তৈরি কম ক্যাফেইন বা ক্যাফেইনবিহীন পানীয়।

বাংলাদেশে কার্যকরী পানীয়ের ধারণা ইতিমধ্যেই বাজার গবেষণায় আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে। শক্তিবর্ধক পানীয়ের পাশাপাশি খেলাধুলার উপযোগী পানীয়, প্রোটিন ও পুষ্টিসমৃদ্ধ পানীয়, কার্যকরী পানি এবং উপকারী অণুজীব বা সুস্থতাকেন্দ্রিক পানীয়ের মতো বিভাগ নিয়ে বাজার বিশ্লেষণ হচ্ছে।

তবে আগামী দিনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পরিবর্তন সম্ভবত শক্তিবর্ধক পানীয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।

বর্তমানে বাজারে ‘শক্তিবর্ধক’ বলতে আমরা অনেক ক্ষেত্রেই ক্যাফেইন ও চিনিনির্ভর পানীয় বুঝি। ভবিষ্যতে এই ধারণা আরও বিস্তৃত হতে পারে। কেউ চাইবেন ব্যায়ামের পর শরীরের পুনরুদ্ধারে সহায়ক পানীয়, কেউ চাইবেন দুপুরে হালকা পুষ্টি, কেউ চাইবেন গরমের দিনে ইলেকট্রোলাইট, আবার কেউ হয়তো চাইবেন সন্ধ্যার জন্য ক্যাফেইনবিহীন একটি সতেজ পানীয়। ফলে ভবিষ্যতের বাজারে ‘একটি পানীয় সবার জন্য’ ধারণার পরিবর্তে ‘একটি নির্দিষ্ট প্রয়োজনের জন্য একটি পানীয়’ ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রগুলোর একটি হতে পারে খাদ্য-আঁশসমৃদ্ধ পানীয়। কয়েক বছর ধরে বিশ্বব্যাপী প্রোটিন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। উচ্চ প্রোটিনযুক্ত খাবার ও পানীয় এখন প্রতিষ্ঠিত বাজার। কিন্তু প্রোটিনের পাশাপাশি খাদ্য-আঁশও এখন নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে।

আমাদের প্রচলিত খাদ্যে শাকসবজি, ডাল, ফল এবং পূর্ণ শস্য খাদ্য-আঁশের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু আধুনিক খাদ্যপ্রযুক্তিতে এমন অনেক দ্রবণীয় আঁশ রয়েছে, যা পানীয়তে ব্যবহার করা সম্ভব। আংশিক হাইড্রোলাইজড গুয়ার গাম, অ্যাকাসিয়া আঁশ, প্রতিরোধী ডেক্সট্রিনসহ বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করে স্বচ্ছ কিংবা হালকা ঘন পানীয় তৈরি করা যায়।

বাংলাদেশের পানীয় কোম্পানিগুলো এখান থেকে নতুন বাজার তৈরি করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে লেবু-লাইম স্বাদের গ্যাসযুক্ত খাদ্য-আঁশসমৃদ্ধ পানীয়, আম বা পেয়ারা স্বাদের আঁশসমৃদ্ধ পানীয় কিংবা গুঁড়ার ছোট প্যাকেটে দৈনিক খাদ্য-আঁশের পানীয় তৈরি করা যেতে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অন্ত্রের সুস্থতা। বিশ্বব্যাপী প্রিবায়োটিক, প্রোবায়োটিক ও গাঁজন করা খাদ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। বাংলাদেশেও ভবিষ্যতে দইভিত্তিক পানীয়ের বাইরে আঁশসমৃদ্ধ ও অন্যান্য হজম-সহায়ক পানীয়ের বাজার তৈরি হতে পারে।

তবে এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো পানীয়তে সামান্য আঁশ যোগ করলেই সেটিকে ইচ্ছেমতো ‘অন্ত্রের সুস্থতার পানীয়’ বলা উচিত নয়। কোন উপাদান কতটুকু রয়েছে, তার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি কী এবং আইন অনুযায়ী কী ধরনের পুষ্টি বা স্বাস্থ্যবিষয়ক দাবি করা যাবে—এসব বিষয় অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে।

আরেকটি বড় সম্ভাবনা হচ্ছে শরীরে পানির ঘাটতি পূরণের পানীয়। বাংলাদেশের আবহাওয়ার কথা বিবেচনা করলে এই বাজারটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। গরমের দিনে ঘাম, বাইরে কাজ, খেলাধুলা, দীর্ঘ যাতায়াত এবং শারীরিক পরিশ্রমের কারণে শরীরের পানি ও ইলেকট্রোলাইটের প্রয়োজন বাড়তে পারে।

আমাদের দেশে খাবার স্যালাইনের অসাধারণ জনস্বাস্থ্যগত ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু চিকিৎসার প্রয়োজনে ব্যবহৃত খাবার স্যালাইন এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনের জন্য তৈরি শরীরে পানির ঘাটতি পূরণের পানীয় এক বিষয় নয়। এখানেই শিল্পের নতুন সুযোগ রয়েছে।

পানি, উপযুক্ত ইলেকট্রোলাইট, কম চিনি এবং ভালো স্বাদের সমন্বয়ে দৈনন্দিন পানীয় তৈরি করা যেতে পারে। এগুলো বোতল, ক্যান, গুঁড়ার ছোট প্যাকেট বা পানিতে গুলে খাওয়ার বড়ির আকারে বাজারজাত করা সম্ভব।

বাংলাদেশের মতো দেশে ছোট প্যাকেট বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একটি বড় বোতল কেনার পরিবর্তে কেউ যদি কম দামে একটি প্যাকেট কিনে ৫০০ মিলিলিটার পানিতে মিশিয়ে পান করতে পারেন, তাহলে পণ্যটি অনেক বড় জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়।

২০২৭ সালের আরেকটি বড় বিষয় হবে কম চিনি। এখানে বাংলাদেশের সামনে একই সঙ্গে ব্যবসায়িক সুযোগ এবং জনস্বাস্থ্যের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বাংলাদেশের পরিবারগুলোর মধ্যে কোমল পানীয় গ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে—২০২২ সালের গৃহস্থালি আয়-ব্যয় জরিপের তথ্য ব্যবহার করা একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় কোমল পানীয় গ্রহণকারী পরিবারের অনুপাত ২০১৬ সালের প্রায় ১৩ শতাংশ থেকে ২০২২ সালে প্রায় ৩৭ শতাংশে পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছে।

অতএব, আমাদের ভবিষ্যৎ পানীয়শিল্প শুধু আরও বেশি পানীয় বিক্রির কথা চিন্তা করলে চলবে না; কী ধরনের পানীয় বিক্রি হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কম চিনিযুক্ত বা চিনিবিহীন পানীয়ের বড় বাজার তৈরি হতে পারে। কিন্তু খাদ্যবিজ্ঞানীদের জন্য এটি সহজ কাজ নয়। চিনি শুধু মিষ্টতা দেয় না; এটি পানীয়ের ঘনত্ব, মুখে অনুভূত স্বাদ ও গঠন এবং ফলের স্বাদের ভারসাম্য তৈরিতেও ভূমিকা রাখে। তাই চিনি কমিয়ে শুধু উচ্চমাত্রার কোনো মিষ্টিকারক যোগ করলেই ভালো পানীয় তৈরি হয় না। মিষ্টতা, অম্লতা, স্বাদ, মুখে অনুভূত গঠন এবং পান করার পর থেকে যাওয়া স্বাদ—সবকিছুর ভারসাম্য দরকার।

বাংলাদেশের কোম্পানিগুলোর জন্য আরেকটি আকর্ষণীয় সুযোগ হতে পারে প্রোটিন পানীয়। প্রোটিনের গুঁড়াকে আমরা সাধারণত শরীরচর্চা বা ব্যায়ামাগারের সঙ্গে যুক্ত করি। কিন্তু ভবিষ্যতের প্রোটিন পানীয় শুধু শরীর গঠনে আগ্রহীদের জন্য থাকবে না। সকালের নাশতার সঙ্গে, অফিসে বিকেলের ক্ষুধায় কিংবা ব্যায়ামের পর সাধারণ ভোক্তার জন্য ছোট আকারের পুষ্টিকর পানীয় তৈরি হতে পারে।

দুধের প্রোটিনের পাশাপাশি মটরশুঁটি, সয়া কিংবা অন্যান্য উদ্ভিদভিত্তিক প্রোটিন ব্যবহার করেও নতুন পণ্য তৈরি করা সম্ভব। কোকো, কফি, ভ্যানিলা, কলা কিংবা পরিচিত দেশীয় স্বাদের সঙ্গে প্রোটিন মিলিয়ে নতুন ধরনের পানীয় তৈরি হতে পারে।

তবে শুধু প্রোটিনের পরিমাণ বাড়ালেই ভালো পণ্য হয় না। প্রোটিনের স্বাদ, তিক্ততা, মুখে শুকনো অনুভূতি, তলানি এবং তাপ প্রয়োগে স্থিতিশীলতা—সবই গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত বিষয়।

আরেকটি নতুন ধারণা হচ্ছে সময়ভিত্তিক পানীয়। সকালে আমরা চা বা কফি খাই। দুপুরে হয়তো ঠান্ডা পানীয় চাই। বিকেলে আবার চা। রাতে অনেকেই ক্যাফেইন এড়িয়ে চলতে চান। পানীয় কোম্পানিগুলো যদি এই স্বাভাবিক আচরণকে কেন্দ্র করে পণ্য তৈরি করে?

সকালের জন্য হালকা ক্যাফেইন ও পুষ্টিসমৃদ্ধ পানীয়, দুপুরে প্রোটিন বা আঁশযুক্ত পানীয়, বিকেলে কম চিনির সতেজ পানীয় এবং রাতে ক্যাফেইনবিহীন ক্যামোমাইল বা অন্যান্য উপযুক্ত উদ্ভিজ্জ উপাদানভিত্তিক পানীয়—এ ধরনের ধারণা ভবিষ্যতে বাজার তৈরি করতে পারে।

তবে ‘শিথিলতা’, ‘ঘুম’, ‘মানসিক চাপ কমানো’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ও খাদ্য আইনের সীমাবদ্ধতা বুঝতে হবে। পানীয় কোনো রোগের চিকিৎসা নয়।

স্বাদের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের সামনে বিশাল সুযোগ রয়েছে। আমাদের নিজেদের ফলের বৈচিত্র্যই একটি বড় সম্পদ। আম, কাঁচা আম, পেয়ারা, লেবু, বাতাবি লেবু, আনারস, তেঁতুল, জাম, বরই, বেল, ডাব—এসব পরিচিত স্বাদকে আধুনিক পানীয়ের সঙ্গে নতুনভাবে যুক্ত করা যায়।

বিশ্বে পুরোনো দিনের পরিচিত স্বাদকে নতুনভাবে ফিরিয়ে আনার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেটি হতে পারে আরও আকর্ষণীয়। বেলের শরবত, আমপোড়া শরবত, তেঁতুল, লেবু-পুদিনা কিংবা বোরহানির পরিচিত স্বাদ আধুনিক প্রযুক্তি ও নতুন উপস্থাপনায় তরুণ ভোক্তার কাছে নতুন অভিজ্ঞতা হিসেবে ফিরে আসতে পারে।

কল্পনা করুন—গ্যাসযুক্ত আমপোড়া পানীয়, কম চিনির তেঁতুল-মরিচ পানীয়, লেবু-পুদিনা ইলেকট্রোলাইট পানীয় কিংবা বেল ও আঁশের সমন্বয়ে তৈরি আধুনিক পানীয়। এখানেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। আমাদের ভবিষ্যৎ পানীয়শিল্পকে সব সময় বিদেশি স্বাদ নকল করতে হবে না। দেশীয় স্বাদকে আধুনিক খাদ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করাই হতে পারে আমাদের নিজস্ব উদ্ভাবন।

দাম অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। বাংলাদেশের ভোক্তারা মূল্য-সংবেদনশীল। কোমল পানীয় নিয়ে বাংলাদেশের তথ্য বিশ্লেষণেও দামের পরিবর্তনের সঙ্গে চাহিদার উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তাই শুধু ২৫০ বা ৩০০ টাকার উচ্চমূল্যের পানীয় তৈরি করলে কার্যকরী পানীয়ের বাজার বড় হবে না। ২০, ৩০, ৫০ কিংবা ১০০ টাকার মধ্যে কীভাবে বিভিন্ন স্তরের পণ্য তৈরি করা যায়, সেটিও শিল্পকে ভাবতে হবে। ছোট বোতল, ছোট ক্যান, ছোট প্যাকেট এবং গুঁড়ার প্যাকেট এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশের শক্তিবর্ধক পানীয়ের বাজারও ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য। ২০২৬ সালের একটি বাজার পূর্বাভাসে এই বাজারের মূল্য ২০২৬ সালে প্রায় ১৪ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার হিসেবে অনুমান করা হয়েছে এবং ২০৩১ সাল নাগাদ প্রায় ২২ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। একই বিশ্লেষণে ২০২৬–৩১ সময়ে বার্ষিক গড় বৃদ্ধির হার প্রায় ৮.২ শতাংশ ধরা হয়েছে। এগুলো অবশ্য বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাস, সরকারি পরিসংখ্যান নয়।

এই বাজারের ভবিষ্যৎ শুধু বেশি ক্যাফেইন ও বেশি মিষ্টতার মধ্যে আটকে থাকার প্রয়োজন নেই। কম চিনি, ইলেকট্রোলাইট, ভিটামিন, শরীরে পানির ঘাটতি পূরণ এবং অন্যান্য কার্যকরী ধারণা ব্যবহার করে নতুন প্রজন্মের পণ্য তৈরি করা সম্ভব। সব মিলিয়ে ২০২৭ সালের বাংলাদেশের পানীয়শিল্পের জন্য একটি সহজ সূত্র হতে পারে—স্বাস্থ্য + কার্যকারিতা + দেশীয় স্বাদ + সুবিধা + সাশ্রয়ী মূল্য।

বাংলাদেশের খাদ্য ও পানীয় কোম্পানিগুলো যদি এখন থেকেই গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ করে, তাহলে কয়েকটি ক্ষেত্র বিশেষভাবে সম্ভাবনাময়—খাদ্য-আঁশ ও অন্ত্রের সুস্থতাকেন্দ্রিক পানীয়, কম চিনির কার্যকরী পানীয়, ইলেকট্রোলাইট ও শরীরে পানির ঘাটতি পূরণের পানীয়, প্রোটিন ও পুষ্টিসমৃদ্ধ পানীয়, সময়ভিত্তিক পানীয় এবং আধুনিক রূপে দেশীয় স্বাদের পানীয়।

কিন্তু শুধু নতুন উপাদান যোগ করলেই উদ্ভাবন হয় না। একটি ভালো পানীয়কে একই সঙ্গে নিরাপদ, স্থিতিশীল, সুস্বাদু, সাশ্রয়ী এবং আইনসম্মত হতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের গরম আবহাওয়ায় পণ্যের অণুজীবগত নিরাপত্তা, মোড়ক, আলো ও অক্সিজেনের প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণকালীন স্থিতিশীলতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আগামী দিনের সফল পানীয় হয়তো সেই পানীয় নয়, যার বোতলে সবচেয়ে বেশি উপাদানের নাম লেখা থাকবে। বরং সফল হবে সেই পণ্য, যার প্রয়োজনীয়তা একজন সাধারণ ভোক্তা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বুঝতে পারবেন।

একসময় আমরা দোকানে গিয়ে বলতাম—‘একটা ঠান্ডা পানীয় দিন।’ ভবিষ্যতে হয়তো একজন ভোক্তা বলবেন—‘কম চিনি, একটু আঁশ আর ভালো স্বাদের একটা পানীয় দিন।’ অথবা—‘গরমে শরীরটা সতেজ রাখবে, এমন একটা পানীয় দিন।’

এই পরিবর্তন যদি সত্যিই আসে, তাহলে ২০২৭ সাল বাংলাদেশের পানীয়শিল্পের জন্য শুধু নতুন স্বাদের বছর হবে না; এটি হতে পারে নতুন চিন্তার পানীয়ের বছর।

[লেখক: খাদ্যবিজ্ঞানী, উদ্ভাবন ব্যবস্থাপক, সালুটিভিয়া, যুক্তরাজ্য]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত