প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। ধর্ম যার যার, নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সবার।’ ২০২৬ সালের ১৬ অক্টোবর শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে তিনি সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এর আগে ৩০ এপ্রিল বুদ্ধ পূর্ণিমা উপলক্ষেও তিনি ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় বার্তা। তবে বাংলাদেশের ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের কাছে এর গুরুত্ব শুধু শুভেচ্ছাবাণী কিংবা রাজনৈতিক আশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তারা দেখতে চান, এই ঘোষণা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়; তাদের জীবন, সম্পদ, ধর্মীয় উপাসনালয়, ভূমি, সংস্কৃতি ও মর্যাদা কতটা সুরক্ষিত থাকে। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিচয় শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অধিকার রক্ষার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় না; বরং প্রান্তিক, অসহায় ও ঝুঁকিতে থাকা মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রের মানবিক চরিত্রের পরিচয় পাওয়া যায়।
বাংলাদেশ বহু ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিসত্তার মানুষের দেশ। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের পাশাপাশি সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালী, মুণ্ডা, কোল, কোডা, কোড়া, রাজোয়াড়, তুরী, সিং, গারো, হাজং, চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ এ দেশের ইতিহাস, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও সমাজ গঠনে অবদান রেখে চলেছেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছে, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা কোনো একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের একক সম্পদ ছিল না। ধর্ম ও পরিচয়ের ভিন্নতা সত্ত্বেও মানুষ একটি স্বাধীন, মর্যাদাপূর্ণ ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিল। সেই স্বপ্নের বাংলাদেশে কোনো নাগরিককে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রীয়ভাবে সমান অধিকারের ঘোষণা থাকলেও সমাজের সব মানুষ সমানভাবে নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার পান কি না, সেই প্রশ্ন আজও গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় উৎসবের আগে নিরাপত্তার আশ্বাস দেওয়া প্রয়োজন। তবে উৎসব শেষ হওয়ার পরও সেই নিরাপত্তা অটুট রাখা আরও জরুরি। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ যেন নিজের বাড়িতে, কর্মস্থলে, গ্রামে কিংবা উপাসনালয়ে যাওয়ার পথে নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগেন, তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। শুধু আশ্বাস নয়, তাদের দৈনন্দিন জীবনেও নিরাপত্তার বাস্তব অভিজ্ঞতা তৈরি করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কেউ যেন নিজেদের সংখ্যালঘু মনে না করেন। এই বক্তব্যের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হলো, রাষ্ট্রের চোখে প্রত্যেক নাগরিক সমান মর্যাদার অধিকারী। কিন্তু কাউকে সংখ্যালঘু মনে না করতে বললেই তার নিরাপত্তাহীনতা দূর হয় না। বরং কেন কোনো নাগরিক নিজেকে অনিরাপদ বা অসহায় মনে করছেন, রাষ্ট্রকে সেই কারণগুলো চিহ্নিত করে সমাধান করতে হবে। কোনো সংখ্যালঘু পরিবারের জমি দখলের চেষ্টা হলে, কোনো উপাসনালয়ে হামলা হলে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ তুলে কারও বিরুদ্ধে উত্তেজনা ছড়ানো হলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা এবং ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কোনো অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যেমন অন্যায়, তেমনি ধর্মীয় অনুভূতির অজুহাতে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়। অভিযোগের বিচার হবে আইনের মাধ্যমে, জনতার প্রতিশোধের মাধ্যমে নয়। এখানেই রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা ও আইনের শাসনের পরীক্ষা। অপরাধী সংখ্যাগরিষ্ঠ কিংবা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের যে-ই হোন না কেন, তার পরিচয় নয়, অপরাধের প্রমাণ ও আইন অনুযায়ী বিচারই হবে চূড়ান্ত বিবেচ্য।
বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টি আরও বিস্তৃত। তাদের জন্য নিরাপত্তা মানে শুধু শারীরিক হামলা থেকে রক্ষা পাওয়া নয়; নিজেদের ভূমিতে বসবাস, নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা, ধর্মীয় ও ঐতিহ্যগত আচার পালন এবং বৈষম্য ছাড়া শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ লাভও নিরাপত্তার অংশ। সাঁওতালদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা, সামাজিক কাঠামো, উৎসব, ঐতিহ্য ও ইতিহাস। তাদের সোহরাই ও বাহা উৎসব কেবল আনন্দের উপলক্ষ নয়; এগুলো সাংস্কৃতিক পরিচয় ও সামষ্টিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একইভাবে অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীরও নিজস্ব ঐতিহ্য ও জীবনদর্শন রয়েছে। কিন্তু ভূমির অধিকার, সামাজিক বৈষম্য, প্রশাসনিক অবহেলা এবং পরিচয়ের স্বীকৃতি নিয়ে তাদের উদ্বেগ উপেক্ষা করা হলে শুধু ধর্মীয় নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন—সব আদিবাসী একই ধর্মের অনুসারী নন। কেউ খ্রিষ্টান, কেউ সনাতন ধর্মাবলম্বী, কেউ ক্রামা, সারনা, সানামাহী বা নিজস্ব ঐতিহ্যগত বিশ্বাস অনুসরণ করেন, আবার কেউ অন্য ধর্মের অনুসারী। তাদের ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু নাগরিক অধিকার ও মানবিক মর্যাদার প্রশ্নে তারা সমান। একজন সাঁওতাল খ্রিষ্টান, একজন সাঁওতাল সারনাপন্থী কিংবা একজন হিন্দু আদিবাসী—প্রত্যেকেরই নিজস্ব বিশ্বাস অনুযায়ী জীবনযাপনের অধিকার রয়েছে। ধর্ম পরিবর্তন করলেও কারও মানবিক মর্যাদা, নাগরিক অধিকার কিংবা নিরাপত্তার অধিকার কমে যায় না।
বাংলাদেশে দুর্গাপূজা, বুদ্ধ পূর্ণিমা, শুভ বড়দিন ও ঈদসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব দেশের বহুমাত্রিক সমাজজীবনের অংশ। এসব উৎসব নিরাপদে উদ্যাপনের পরিবেশ তৈরি করা সরকারের পাশাপাশি সমাজেরও দায়িত্ব। তবে উৎসবকেন্দ্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। সারা বছর মন্দির, গির্জা, বৌদ্ধবিহার, মসজিদ এবং অন্যান্য ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্থানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো উপাসনালয়ে হামলা হলে দ্রুত তদন্ত করে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে গুজব ছড়িয়ে সহিংসতা উসকে দেওয়ার প্রবণতা প্রতিরোধেও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো কোনো অভিযোগ যাচাই না করে প্রচার করা কিংবা উত্তেজিত জনতাকে উসকে দেওয়া ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে ধর্মীয় নেতাদেরও সম্প্রীতি ও সহনশীলতার শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে হবে। কোনো ধর্মের অনুসারীদের সম্মিলিতভাবে দায়ী না করে ব্যক্তির অপরাধকে ব্যক্তির অপরাধ হিসেবেই দেখতে হবে।
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কয়েকটি ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, জমি দখল ও বৈষম্যের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। মামলা গ্রহণ থেকে শুরু করে বিচারপ্রক্রিয়া পর্যন্ত ভুক্তভোগীরা যেন হয়রানি বা বাধার মুখে না পড়েন, তা নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, যেসব এলাকায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, সেখানে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। হামলার আশঙ্কা সম্পর্কে আগাম তথ্য পাওয়ার পরও ব্যবস্থা নেওয়া না হলে তার কারণ অনুসন্ধান করতে হবে।
তৃতীয়ত, আদিবাসীদের ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ, উচ্ছেদ, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে বৈষম্য এবং সাংস্কৃতিক অধিকারসংক্রান্ত সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর নীতি গ্রহণ করতে হবে। তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তাদের বাদ দিয়ে নয়।
চতুর্থত, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপের ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু উৎসব উপলক্ষে শুভেচ্ছা বিনিময় নয়, তাদের বাস্তব সমস্যাগুলো শোনা এবং সমাধানের অগ্রগতি পর্যালোচনা করাও জরুরি।
পঞ্চমত, বিদ্যালয় থেকে শুরু করে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মানবিক মর্যাদা এবং বৈচিত্র্যরে প্রতি সম্মানবোধ গড়ে তুলতে হবে। ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা কঠিন।
গণতান্ত্রিক সরকার যদি সত্যিই এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চায়, যেখানে ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে প্রত্যেকে নিরাপদে বসবাস করবেন, তাহলে সংখ্যালঘুদের উদ্বেগকে অবিশ্বাসের চোখে না দেখে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। তাদের কণ্ঠস্বরকে রাষ্ট্রবিরোধী কিংবা অযৌক্তিক অভিযোগ হিসেবে চিহ্নিত না করে সমস্যার প্রকৃতি বুঝতে হবে। ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার—নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সবার’—এই বক্তব্য বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শন হতে পারে। যেদিন একজন সাঁওতাল নিশ্চিন্তে নিজের জমিতে চাষ করতে পারবেন, একজন খ্রিষ্টান নির্ভয়ে গির্জায় যেতে পারবেন, একজন হিন্দু নিরাপদে দুর্গাপূজা উদ্যাপন করতে পারবেন, একজন বৌদ্ধ নির্বিঘ্নে বুদ্ধ পূর্ণিমা পালন করতে পারবেন এবং প্রত্যেক মুসলমানও নিজের ধর্মীয় অধিকার ভোগ করতে পারবেন, সেদিনই এই বক্তব্যের পূর্ণ তাৎপর্য প্রতিষ্ঠিত হবে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত দর্শন যেন শুধু বাণী ও বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রতিটি নাগরিকের জন্য ন্যায়বিচার, সমান মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে এই অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হোক।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: কলামিস্ট]

সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ অক্টোবর ২০২৬
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। ধর্ম যার যার, নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সবার।’ ২০২৬ সালের ১৬ অক্টোবর শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে তিনি সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এর আগে ৩০ এপ্রিল বুদ্ধ পূর্ণিমা উপলক্ষেও তিনি ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় বার্তা। তবে বাংলাদেশের ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের কাছে এর গুরুত্ব শুধু শুভেচ্ছাবাণী কিংবা রাজনৈতিক আশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তারা দেখতে চান, এই ঘোষণা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়; তাদের জীবন, সম্পদ, ধর্মীয় উপাসনালয়, ভূমি, সংস্কৃতি ও মর্যাদা কতটা সুরক্ষিত থাকে। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিচয় শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অধিকার রক্ষার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় না; বরং প্রান্তিক, অসহায় ও ঝুঁকিতে থাকা মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রের মানবিক চরিত্রের পরিচয় পাওয়া যায়।
বাংলাদেশ বহু ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিসত্তার মানুষের দেশ। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের পাশাপাশি সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালী, মুণ্ডা, কোল, কোডা, কোড়া, রাজোয়াড়, তুরী, সিং, গারো, হাজং, চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ এ দেশের ইতিহাস, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও সমাজ গঠনে অবদান রেখে চলেছেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছে, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা কোনো একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের একক সম্পদ ছিল না। ধর্ম ও পরিচয়ের ভিন্নতা সত্ত্বেও মানুষ একটি স্বাধীন, মর্যাদাপূর্ণ ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিল। সেই স্বপ্নের বাংলাদেশে কোনো নাগরিককে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রীয়ভাবে সমান অধিকারের ঘোষণা থাকলেও সমাজের সব মানুষ সমানভাবে নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার পান কি না, সেই প্রশ্ন আজও গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় উৎসবের আগে নিরাপত্তার আশ্বাস দেওয়া প্রয়োজন। তবে উৎসব শেষ হওয়ার পরও সেই নিরাপত্তা অটুট রাখা আরও জরুরি। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ যেন নিজের বাড়িতে, কর্মস্থলে, গ্রামে কিংবা উপাসনালয়ে যাওয়ার পথে নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগেন, তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। শুধু আশ্বাস নয়, তাদের দৈনন্দিন জীবনেও নিরাপত্তার বাস্তব অভিজ্ঞতা তৈরি করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কেউ যেন নিজেদের সংখ্যালঘু মনে না করেন। এই বক্তব্যের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হলো, রাষ্ট্রের চোখে প্রত্যেক নাগরিক সমান মর্যাদার অধিকারী। কিন্তু কাউকে সংখ্যালঘু মনে না করতে বললেই তার নিরাপত্তাহীনতা দূর হয় না। বরং কেন কোনো নাগরিক নিজেকে অনিরাপদ বা অসহায় মনে করছেন, রাষ্ট্রকে সেই কারণগুলো চিহ্নিত করে সমাধান করতে হবে। কোনো সংখ্যালঘু পরিবারের জমি দখলের চেষ্টা হলে, কোনো উপাসনালয়ে হামলা হলে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ তুলে কারও বিরুদ্ধে উত্তেজনা ছড়ানো হলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা এবং ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কোনো অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যেমন অন্যায়, তেমনি ধর্মীয় অনুভূতির অজুহাতে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়। অভিযোগের বিচার হবে আইনের মাধ্যমে, জনতার প্রতিশোধের মাধ্যমে নয়। এখানেই রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা ও আইনের শাসনের পরীক্ষা। অপরাধী সংখ্যাগরিষ্ঠ কিংবা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের যে-ই হোন না কেন, তার পরিচয় নয়, অপরাধের প্রমাণ ও আইন অনুযায়ী বিচারই হবে চূড়ান্ত বিবেচ্য।
বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টি আরও বিস্তৃত। তাদের জন্য নিরাপত্তা মানে শুধু শারীরিক হামলা থেকে রক্ষা পাওয়া নয়; নিজেদের ভূমিতে বসবাস, নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা, ধর্মীয় ও ঐতিহ্যগত আচার পালন এবং বৈষম্য ছাড়া শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ লাভও নিরাপত্তার অংশ। সাঁওতালদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা, সামাজিক কাঠামো, উৎসব, ঐতিহ্য ও ইতিহাস। তাদের সোহরাই ও বাহা উৎসব কেবল আনন্দের উপলক্ষ নয়; এগুলো সাংস্কৃতিক পরিচয় ও সামষ্টিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একইভাবে অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীরও নিজস্ব ঐতিহ্য ও জীবনদর্শন রয়েছে। কিন্তু ভূমির অধিকার, সামাজিক বৈষম্য, প্রশাসনিক অবহেলা এবং পরিচয়ের স্বীকৃতি নিয়ে তাদের উদ্বেগ উপেক্ষা করা হলে শুধু ধর্মীয় নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন—সব আদিবাসী একই ধর্মের অনুসারী নন। কেউ খ্রিষ্টান, কেউ সনাতন ধর্মাবলম্বী, কেউ ক্রামা, সারনা, সানামাহী বা নিজস্ব ঐতিহ্যগত বিশ্বাস অনুসরণ করেন, আবার কেউ অন্য ধর্মের অনুসারী। তাদের ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু নাগরিক অধিকার ও মানবিক মর্যাদার প্রশ্নে তারা সমান। একজন সাঁওতাল খ্রিষ্টান, একজন সাঁওতাল সারনাপন্থী কিংবা একজন হিন্দু আদিবাসী—প্রত্যেকেরই নিজস্ব বিশ্বাস অনুযায়ী জীবনযাপনের অধিকার রয়েছে। ধর্ম পরিবর্তন করলেও কারও মানবিক মর্যাদা, নাগরিক অধিকার কিংবা নিরাপত্তার অধিকার কমে যায় না।
বাংলাদেশে দুর্গাপূজা, বুদ্ধ পূর্ণিমা, শুভ বড়দিন ও ঈদসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব দেশের বহুমাত্রিক সমাজজীবনের অংশ। এসব উৎসব নিরাপদে উদ্যাপনের পরিবেশ তৈরি করা সরকারের পাশাপাশি সমাজেরও দায়িত্ব। তবে উৎসবকেন্দ্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। সারা বছর মন্দির, গির্জা, বৌদ্ধবিহার, মসজিদ এবং অন্যান্য ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্থানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো উপাসনালয়ে হামলা হলে দ্রুত তদন্ত করে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে গুজব ছড়িয়ে সহিংসতা উসকে দেওয়ার প্রবণতা প্রতিরোধেও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো কোনো অভিযোগ যাচাই না করে প্রচার করা কিংবা উত্তেজিত জনতাকে উসকে দেওয়া ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে ধর্মীয় নেতাদেরও সম্প্রীতি ও সহনশীলতার শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে হবে। কোনো ধর্মের অনুসারীদের সম্মিলিতভাবে দায়ী না করে ব্যক্তির অপরাধকে ব্যক্তির অপরাধ হিসেবেই দেখতে হবে।
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কয়েকটি ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, জমি দখল ও বৈষম্যের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। মামলা গ্রহণ থেকে শুরু করে বিচারপ্রক্রিয়া পর্যন্ত ভুক্তভোগীরা যেন হয়রানি বা বাধার মুখে না পড়েন, তা নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, যেসব এলাকায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, সেখানে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। হামলার আশঙ্কা সম্পর্কে আগাম তথ্য পাওয়ার পরও ব্যবস্থা নেওয়া না হলে তার কারণ অনুসন্ধান করতে হবে।
তৃতীয়ত, আদিবাসীদের ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ, উচ্ছেদ, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে বৈষম্য এবং সাংস্কৃতিক অধিকারসংক্রান্ত সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর নীতি গ্রহণ করতে হবে। তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তাদের বাদ দিয়ে নয়।
চতুর্থত, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপের ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু উৎসব উপলক্ষে শুভেচ্ছা বিনিময় নয়, তাদের বাস্তব সমস্যাগুলো শোনা এবং সমাধানের অগ্রগতি পর্যালোচনা করাও জরুরি।
পঞ্চমত, বিদ্যালয় থেকে শুরু করে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মানবিক মর্যাদা এবং বৈচিত্র্যরে প্রতি সম্মানবোধ গড়ে তুলতে হবে। ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা কঠিন।
গণতান্ত্রিক সরকার যদি সত্যিই এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চায়, যেখানে ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে প্রত্যেকে নিরাপদে বসবাস করবেন, তাহলে সংখ্যালঘুদের উদ্বেগকে অবিশ্বাসের চোখে না দেখে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। তাদের কণ্ঠস্বরকে রাষ্ট্রবিরোধী কিংবা অযৌক্তিক অভিযোগ হিসেবে চিহ্নিত না করে সমস্যার প্রকৃতি বুঝতে হবে। ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার—নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সবার’—এই বক্তব্য বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শন হতে পারে। যেদিন একজন সাঁওতাল নিশ্চিন্তে নিজের জমিতে চাষ করতে পারবেন, একজন খ্রিষ্টান নির্ভয়ে গির্জায় যেতে পারবেন, একজন হিন্দু নিরাপদে দুর্গাপূজা উদ্যাপন করতে পারবেন, একজন বৌদ্ধ নির্বিঘ্নে বুদ্ধ পূর্ণিমা পালন করতে পারবেন এবং প্রত্যেক মুসলমানও নিজের ধর্মীয় অধিকার ভোগ করতে পারবেন, সেদিনই এই বক্তব্যের পূর্ণ তাৎপর্য প্রতিষ্ঠিত হবে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত দর্শন যেন শুধু বাণী ও বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রতিটি নাগরিকের জন্য ন্যায়বিচার, সমান মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে এই অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হোক।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: কলামিস্ট]

আপনার মতামত লিখুন