সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতা, গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান আর সাংবাদিকদের অধিকার আদায়।এই তিন পরিচয়ে স্মরণীয় গিয়াস কামাল চৌধুরী। পেশাগত জীবনে নানা প্রতিকূলতার মুখেও নিজের অবস্থানে ছিলেন অবিচল। বাংলাদেশের বরেণ্য সাংবাদিক গিয়াস কামাল চৌধুরীর জীবন ফিরে দেখলে অনেক প্রশ্ন সামনে আসে।
দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে তিনি যেমন পরিচিতি পেয়েছেন ভয়েস অব আমেরিকার ঢাকা সংবাদদাতা হিসেবে, তেমনি সাংবাদিকদের সংগঠনে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোতেও সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।
২০১৩ সালের ২৬ অক্টোবর মারা যান গিয়াস কামাল চৌধুরী। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে ১৩টি বছর। ২০২৬ সালের ২৬ অক্টোবর তাঁর ১৩তম মৃত্যুবার্ষিকী। এ উপলক্ষে তাঁকে স্মরণ করছে সাংবাদিক সমাজ।
জাতীয় প্রেসক্লাবে তাঁকে স্মরণে আয়োজিত হয়েছে দোয়া মাহফিল। সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বক্তব্য দিয়েছেন। তাদের স্মরণ ও বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আবারও সামনে এসেছে এই সাংবাদিকের জীবন, কর্ম ও রাজনৈতিক সময়ের নানা অধ্যায়।
যে সংবাদকণ্ঠের পরিচিতি ছড়িয়ে পড়েছিল দেশজুড়ে
১৯৩৯ সালের ২১ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন গিয়াস কামাল চৌধুরী। তাঁর পৈতৃক নিবাস ফেনী সদর উপজেলার শর্শদী গ্রামে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন তিনি। ১৯৬৪ সালে ইত্তেফাক গ্রুপ থেকে প্রকাশিত ইংরেজি দৈনিক ‘ঢাকা টাইমস’ এর মাধ্যমে তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের সূচনা। পরে কাজ করেন ইংরেজি দৈনিক ‘মর্নিং নিউজ’ এ। স্বাধীনতার পর যুক্ত হন বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় (বাসস)। পরবর্তী সময়ে দৈনিক ‘খবরপত্র’ এর সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন।
তবে দেশের মানুষের কাছে তাঁর পরিচিতি বিশেষভাবে ছড়িয়ে পড়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রচারমাধ্যম ভয়েস অব আমেরিকার ঢাকা সংবাদদাতা হিসেবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা ঘটনাপ্রবাহের সংবাদ ও বিশ্লেষণ তুলে ধরতেন তিনি। রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্দোলন কিংবা গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ঘটনার সময়ে তাঁর প্রতিবেদন অনেক শ্রোতার কাছে ছিল তথ্য জানার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
একটি সময় ছিল, যখন সংবাদ জানার জন্য মানুষের প্রধান ভরসা ছিল সংবাদপত্র ও বেতার। সে সময়ে আন্তর্জাতিক বেতারের সংবাদ পরিবেশনার মাধ্যমে দেশের নানা প্রান্তের মানুষের কাছে পৌঁছানো ছিল গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। গিয়াস কামাল চৌধুরী সেই দায়িত্ব পালন করেছেন দীর্ঘদিন। সংবাদ সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং ঘটনাপ্রবাহের নির্ভরযোগ্য বিবরণ তুলে ধরার মধ্য দিয়ে তিনি বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় নিজস্ব পরিচিতি গড়ে তোলেন।
সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ে নেতৃত্ব
গিয়াস কামাল চৌধুরীর জীবন কেবল সংবাদমাধ্যমে কাজ করার ইতিহাসেই সীমাবদ্ধ ছিলনা। সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার, মর্যাদা ও সাংগঠনিক শক্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
তিনি একাধিকবার ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে), বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) এবং জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এসব সংগঠনের নেতৃত্বে থেকে সাংবাদিকদের পেশাগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে ভূমিকা রাখেন।
সাংবাদিকতা এমন একটি পেশা, যেখানে সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্যের নির্ভুলতা এবং পেশাগত নিরাপত্তা একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। একজন সাংবাদিকের ব্যক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি পেশার সম্মিলিত শক্তিও যে গুরুত্বপূর্ণ, গিয়াস কামাল চৌধুরীর সাংগঠনিক ভূমিকা সেই বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দেয়।
দীর্ঘ কর্মজীবনে সাংবাদিকতা, সংবাদ বিশ্লেষণ ও সম্পাদকীয় দায়িত্ব পালনের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯২ সালে তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন। এই রাষ্ট্রীয় সম্মাননা তাঁর পেশাগত অবদানের গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। এ ছাড়া তিনি লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনেও দায়িত্ব পালন করেন।
যে ইতিহাসের কথা বললেন অধ্যাপক আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী
গিয়াস কামাল চৌধুরীর জীবন ও কর্মের আরেকটি দিক উঠে এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরীর স্মৃতিচারণে। তার বক্তব্যে উঠে এসেছে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময়কার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি, শিক্ষকদের সংগঠিত উদ্যোগ এবং জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের সঙ্গে গিয়াস কামাল চৌধুরীর সম্পৃক্ততার কথা।
অধ্যাপক আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরীর বর্ণনা অনুযায়ী, এরশাদবিরোধী আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। সে সময় শিক্ষকদের একটি অংশকে নিয়ে গঠিত হয় ‘সাদা দল’। এই উদ্যোগে অধ্যাপক এস এম চৌধুরী, অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিঞা, অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ, অধ্যাপক ইয়াজউদ্দীন আহম্মেদসহ আরও কয়েকজন শিক্ষক যুক্ত ছিলেন।
অধ্যাপক চৌধুরী বলেন, শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে তাঁর নির্বাচিত হওয়ার পেছনে গিয়াস কামাল চৌধুরীর সরাসরি কোনো ভূমিকা না থাকলেও তিনি নৈতিক সমর্থন দিয়েছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গিয়াস কামাল চৌধুরী ও আরও কয়েকজন সাংবাদিক বন্ধু এবং আইনজীবী তাঁদের উদ্যোগের সঙ্গে পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন।
পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবন্ধিত স্নাতকদের প্রতিনিধিত্বকারী সিনেট সদস্য নির্বাচনের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন অধ্যাপক আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী। তার স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, ওই নির্বাচনে গিয়াস কামাল চৌধুরী নেতৃত্ব দেন। ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, মির্জা গোলাম হাফিজসহ অন্যদের নিয়ে গঠিত তাঁদের সমর্থিত প্যানেল ৩৫টি আসনের মধ্যে ২৭টিতে জয়ী হয়েছিল বলে তিনি জানান।
অধ্যাপক চৌধুরীর বক্তব্যে এই ঘটনাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তির সংগঠিত উত্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব হিসেবে তুলে ধরা হয়। তার স্মৃতিচারণে গিয়াস কামাল চৌধুরীকে শুধু সংবাদমাধ্যমের একজন পরিচিত ব্যক্তি হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও সক্রিয় একজন মানুষ হিসেবে দেখা যায়।
বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ এবং নির্বাচনী প্রস্তুতির স্মৃতি
অধ্যাপক আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরীর স্মৃতিচারণের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অংশগুলোর একটি হলো সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে গিয়াস কামাল চৌধুরীর যোগাযোগের বিবরণ।
অধ্যাপক চৌধুরী জানান, এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় গিয়াস কামাল চৌধুরী একদিন তাঁকে বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে নিয়ে যান। তখন আসন্ন জাতীয় নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়। নির্বাচনে জয়লাভের সম্ভাবনা, প্রচারণার প্রস্তুতি এবং অর্থসংস্থানের বিষয়ও আলোচনায় আসে বলে তিনি স্মরণ করেন।
অধ্যাপক চৌধুরীর বর্ণনা অনুযায়ী, ওই আলোচনায় নির্বাচনী ব্যয় নিয়ে উদ্বেগের প্রসঙ্গ উঠলে গিয়াস কামাল চৌধুরী তাঁকে সঙ্গে নিয়ে ফেনীর ব্যবসায়ী হায়দার চৌধুরীর কাছে যান। সেখানে নির্বাচনী প্রস্তুতির জন্য অর্থসহায়তা চাওয়া হয়। পরদিন তাঁরা আবার গেলে একটি কাপড়ের থলেতে অর্থ দেওয়া হয়। অধ্যাপক আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী জানান, গিয়াস কামাল চৌধুরীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি সেই থলে বেগম খালেদা জিয়ার হাতে পৌঁছে দেন।
এই ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে অধ্যাপক চৌধুরী তাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতির কথা তুলে ধরেন। তার বর্ণনায়, গিয়াস কামাল চৌধুরী শুধু পরিচয় করিয়ে দেওয়া বা যোগাযোগ স্থাপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বরং নির্বাচনী প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে সক্রিয়ভাবে পাশে ছিলেন।
অধ্যাপক চৌধুরীর স্মৃতিচারণে উঠে আসা এই ঘটনা গিয়াস কামাল চৌধুরীর জীবনের তুলনামূলক কম আলোচিত একটি দিক সামনে আনে। তবে এটি তাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতির ভিত্তিতে বলা বিবরণ। ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ ঐতিহাসিক মূল্যায়নের জন্য সমসাময়িক দলিল, সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য সূত্রও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সাংবাদিকতা, রাজনীতি ও সময়ের সাক্ষ্য
গিয়াস কামাল চৌধুরীর জীবনকে একটিমাত্র পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা কঠিন। তিনি ছিলেন সাংবাদিক, সংবাদ বিশ্লেষক, সম্পাদক এবং সাংবাদিক সংগঠনের নেতা। একই সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর যোগাযোগ ও ভূমিকার কথা সহকর্মী ও সমসাময়িক ব্যক্তিদের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোতে সাংবাদিকদের অনেকেই সংবাদ সংগ্রহের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাগত উদ্যোগে যুক্ত ছিলেন। গিয়াস কামাল চৌধুরীর জীবনও সেই বৃহত্তর বাস্তবতার অংশ। তবে তাঁর রাজনৈতিক যোগাযোগ ও সাংগঠনিক ভূমিকা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ, যাচাইযোগ্য ঐতিহাসিক তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যকে আলাদা করে দেখা জরুরি।
সাংবাদিকতায় তাঁর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, ভয়েস অব আমেরিকায় দীর্ঘদিনের দায়িত্ব এবং সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃত্বের তথ্য বিভিন্ন জীবনী ও সংবাদ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়। এসব তথ্য তাঁর পেশাগত জীবনের বিস্তৃতি বোঝায়। অন্যদিকে অধ্যাপক আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরীর স্মৃতিচারণ তাঁর জীবন ও সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিমণ্ডল সম্পর্কে নতুন কিছু প্রশ্ন ও আলোচনার সুযোগ তৈরি করে।
শেষ জীবনের অসুস্থতা ও বিদায়
দীর্ঘ কর্মজীবনের পর জীবনের শেষ পর্যায়ে গুরুতর অসুস্থতায় ভুগতে থাকেন গিয়াস কামাল চৌধুরী। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে তাঁর দীর্ঘদিনের অসুস্থতা এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনে প্রতিবন্ধকতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৩ সালের ২৬ অক্টোবর রাজধানীর আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭৪ বছর বয়সে মারা যান তিনি।
তাঁর মৃত্যুর খবরে সাংবাদিকতা অঙ্গনে শোক নেমে আসে। জাতীয় প্রেসক্লাবে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সহকর্মী, সাংবাদিক, রাজনীতিক ও শুভানুধ্যায়ীরা তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। মৃত্যুর পরও তাঁর কর্মজীবন ও সাংবাদিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা বিভিন্ন সময়ে স্মরণ করা হয়েছে।
এবারের মৃত্যুবার্ষিকীতে জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত দোয়া মাহফিল এবং সেখানে অধ্যাপক ড. আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর বক্তব্য সেই স্মৃতিকে নতুন করে সামনে এনেছে। তাদের বক্তব্যের বিস্তারিত বিষয়বস্তু যথাযথভাবে যুক্ত করা গেলে গিয়াস কামাল চৌধুরীর ব্যক্তিত্ব, কাজ ও সমসাময়িকদের মূল্যায়ন আরও স্পষ্টভাবে উঠে আসবে।
নতুন প্রজন্মের কাছে যে শিক্ষা
আজকের সাংবাদিকতা প্রযুক্তিনির্ভর, দ্রুতগতির এবং বহুমাধ্যমকেন্দ্রিক। মুহূর্তেই সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে লাখো মানুষের কাছে। কিন্তু দ্রুততার সঙ্গে তথ্য যাচাই, নির্ভুলতা, দায়িত্বশীলতা এবং পেশাগত মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
গিয়াস কামাল চৌধুরীর দীর্ঘ কর্মজীবন সেই মৌলিক বিষয়গুলোকে সামনে আনে। সংবাদমাধ্যমে কাজ করার পাশাপাশি সাংবাদিকদের সংগঠনে নেতৃত্ব দেওয়া, সংবাদ বিশ্লেষণ এবং পেশাগত দায়িত্ব পালন সব মিলিয়ে তাঁর জীবন বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করার তাৎপর্য তাঁর কাজ, নেতৃত্ব এবং সময়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার নানা দিক পর্যালোচনা করাও এর অংশ। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্য তাঁর জীবন হতে পারে পেশাগত নিষ্ঠা, সংগঠিত উদ্যোগ এবং সাংবাদিকতার দায়িত্ব নিয়ে ভাবার একটি উপলক্ষ।
গিয়াস কামাল চৌধুরী আজ আর নেই। কিন্তু তাঁর কর্মজীবনের নথি, সহকর্মীদের স্মৃতি এবং সমসাময়িকদের বর্ণনায় রয়ে গেছে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা অধ্যায়। সেই অধ্যায়গুলো যত বেশি তথ্যনিষ্ঠভাবে সামনে আসবে, ততই স্পষ্ট হবে একজন সাংবাদিকের জীবন কখনো কখনো তাঁর প্রকাশিত সংবাদগুলোর বাইরেও বৃহত্তর সময়ের গল্প বলে।

সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ অক্টোবর ২০২৬
সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতা, গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান আর সাংবাদিকদের অধিকার আদায়।এই তিন পরিচয়ে স্মরণীয় গিয়াস কামাল চৌধুরী। পেশাগত জীবনে নানা প্রতিকূলতার মুখেও নিজের অবস্থানে ছিলেন অবিচল। বাংলাদেশের বরেণ্য সাংবাদিক গিয়াস কামাল চৌধুরীর জীবন ফিরে দেখলে অনেক প্রশ্ন সামনে আসে।
দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে তিনি যেমন পরিচিতি পেয়েছেন ভয়েস অব আমেরিকার ঢাকা সংবাদদাতা হিসেবে, তেমনি সাংবাদিকদের সংগঠনে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোতেও সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।
২০১৩ সালের ২৬ অক্টোবর মারা যান গিয়াস কামাল চৌধুরী। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে ১৩টি বছর। ২০২৬ সালের ২৬ অক্টোবর তাঁর ১৩তম মৃত্যুবার্ষিকী। এ উপলক্ষে তাঁকে স্মরণ করছে সাংবাদিক সমাজ।
জাতীয় প্রেসক্লাবে তাঁকে স্মরণে আয়োজিত হয়েছে দোয়া মাহফিল। সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বক্তব্য দিয়েছেন। তাদের স্মরণ ও বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আবারও সামনে এসেছে এই সাংবাদিকের জীবন, কর্ম ও রাজনৈতিক সময়ের নানা অধ্যায়।
যে সংবাদকণ্ঠের পরিচিতি ছড়িয়ে পড়েছিল দেশজুড়ে
১৯৩৯ সালের ২১ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন গিয়াস কামাল চৌধুরী। তাঁর পৈতৃক নিবাস ফেনী সদর উপজেলার শর্শদী গ্রামে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন তিনি। ১৯৬৪ সালে ইত্তেফাক গ্রুপ থেকে প্রকাশিত ইংরেজি দৈনিক ‘ঢাকা টাইমস’ এর মাধ্যমে তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের সূচনা। পরে কাজ করেন ইংরেজি দৈনিক ‘মর্নিং নিউজ’ এ। স্বাধীনতার পর যুক্ত হন বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় (বাসস)। পরবর্তী সময়ে দৈনিক ‘খবরপত্র’ এর সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন।
তবে দেশের মানুষের কাছে তাঁর পরিচিতি বিশেষভাবে ছড়িয়ে পড়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রচারমাধ্যম ভয়েস অব আমেরিকার ঢাকা সংবাদদাতা হিসেবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা ঘটনাপ্রবাহের সংবাদ ও বিশ্লেষণ তুলে ধরতেন তিনি। রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্দোলন কিংবা গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ঘটনার সময়ে তাঁর প্রতিবেদন অনেক শ্রোতার কাছে ছিল তথ্য জানার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
একটি সময় ছিল, যখন সংবাদ জানার জন্য মানুষের প্রধান ভরসা ছিল সংবাদপত্র ও বেতার। সে সময়ে আন্তর্জাতিক বেতারের সংবাদ পরিবেশনার মাধ্যমে দেশের নানা প্রান্তের মানুষের কাছে পৌঁছানো ছিল গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। গিয়াস কামাল চৌধুরী সেই দায়িত্ব পালন করেছেন দীর্ঘদিন। সংবাদ সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং ঘটনাপ্রবাহের নির্ভরযোগ্য বিবরণ তুলে ধরার মধ্য দিয়ে তিনি বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় নিজস্ব পরিচিতি গড়ে তোলেন।
সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ে নেতৃত্ব
গিয়াস কামাল চৌধুরীর জীবন কেবল সংবাদমাধ্যমে কাজ করার ইতিহাসেই সীমাবদ্ধ ছিলনা। সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার, মর্যাদা ও সাংগঠনিক শক্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
তিনি একাধিকবার ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে), বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) এবং জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এসব সংগঠনের নেতৃত্বে থেকে সাংবাদিকদের পেশাগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে ভূমিকা রাখেন।
সাংবাদিকতা এমন একটি পেশা, যেখানে সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্যের নির্ভুলতা এবং পেশাগত নিরাপত্তা একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। একজন সাংবাদিকের ব্যক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি পেশার সম্মিলিত শক্তিও যে গুরুত্বপূর্ণ, গিয়াস কামাল চৌধুরীর সাংগঠনিক ভূমিকা সেই বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দেয়।
দীর্ঘ কর্মজীবনে সাংবাদিকতা, সংবাদ বিশ্লেষণ ও সম্পাদকীয় দায়িত্ব পালনের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯২ সালে তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন। এই রাষ্ট্রীয় সম্মাননা তাঁর পেশাগত অবদানের গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। এ ছাড়া তিনি লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনেও দায়িত্ব পালন করেন।
যে ইতিহাসের কথা বললেন অধ্যাপক আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী
গিয়াস কামাল চৌধুরীর জীবন ও কর্মের আরেকটি দিক উঠে এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরীর স্মৃতিচারণে। তার বক্তব্যে উঠে এসেছে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময়কার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি, শিক্ষকদের সংগঠিত উদ্যোগ এবং জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের সঙ্গে গিয়াস কামাল চৌধুরীর সম্পৃক্ততার কথা।
অধ্যাপক আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরীর বর্ণনা অনুযায়ী, এরশাদবিরোধী আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। সে সময় শিক্ষকদের একটি অংশকে নিয়ে গঠিত হয় ‘সাদা দল’। এই উদ্যোগে অধ্যাপক এস এম চৌধুরী, অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিঞা, অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ, অধ্যাপক ইয়াজউদ্দীন আহম্মেদসহ আরও কয়েকজন শিক্ষক যুক্ত ছিলেন।
অধ্যাপক চৌধুরী বলেন, শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে তাঁর নির্বাচিত হওয়ার পেছনে গিয়াস কামাল চৌধুরীর সরাসরি কোনো ভূমিকা না থাকলেও তিনি নৈতিক সমর্থন দিয়েছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গিয়াস কামাল চৌধুরী ও আরও কয়েকজন সাংবাদিক বন্ধু এবং আইনজীবী তাঁদের উদ্যোগের সঙ্গে পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন।
পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবন্ধিত স্নাতকদের প্রতিনিধিত্বকারী সিনেট সদস্য নির্বাচনের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন অধ্যাপক আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী। তার স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, ওই নির্বাচনে গিয়াস কামাল চৌধুরী নেতৃত্ব দেন। ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, মির্জা গোলাম হাফিজসহ অন্যদের নিয়ে গঠিত তাঁদের সমর্থিত প্যানেল ৩৫টি আসনের মধ্যে ২৭টিতে জয়ী হয়েছিল বলে তিনি জানান।
অধ্যাপক চৌধুরীর বক্তব্যে এই ঘটনাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তির সংগঠিত উত্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব হিসেবে তুলে ধরা হয়। তার স্মৃতিচারণে গিয়াস কামাল চৌধুরীকে শুধু সংবাদমাধ্যমের একজন পরিচিত ব্যক্তি হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও সক্রিয় একজন মানুষ হিসেবে দেখা যায়।
বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ এবং নির্বাচনী প্রস্তুতির স্মৃতি
অধ্যাপক আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরীর স্মৃতিচারণের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অংশগুলোর একটি হলো সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে গিয়াস কামাল চৌধুরীর যোগাযোগের বিবরণ।
অধ্যাপক চৌধুরী জানান, এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় গিয়াস কামাল চৌধুরী একদিন তাঁকে বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে নিয়ে যান। তখন আসন্ন জাতীয় নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়। নির্বাচনে জয়লাভের সম্ভাবনা, প্রচারণার প্রস্তুতি এবং অর্থসংস্থানের বিষয়ও আলোচনায় আসে বলে তিনি স্মরণ করেন।
অধ্যাপক চৌধুরীর বর্ণনা অনুযায়ী, ওই আলোচনায় নির্বাচনী ব্যয় নিয়ে উদ্বেগের প্রসঙ্গ উঠলে গিয়াস কামাল চৌধুরী তাঁকে সঙ্গে নিয়ে ফেনীর ব্যবসায়ী হায়দার চৌধুরীর কাছে যান। সেখানে নির্বাচনী প্রস্তুতির জন্য অর্থসহায়তা চাওয়া হয়। পরদিন তাঁরা আবার গেলে একটি কাপড়ের থলেতে অর্থ দেওয়া হয়। অধ্যাপক আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী জানান, গিয়াস কামাল চৌধুরীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি সেই থলে বেগম খালেদা জিয়ার হাতে পৌঁছে দেন।
এই ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে অধ্যাপক চৌধুরী তাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতির কথা তুলে ধরেন। তার বর্ণনায়, গিয়াস কামাল চৌধুরী শুধু পরিচয় করিয়ে দেওয়া বা যোগাযোগ স্থাপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বরং নির্বাচনী প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে সক্রিয়ভাবে পাশে ছিলেন।
অধ্যাপক চৌধুরীর স্মৃতিচারণে উঠে আসা এই ঘটনা গিয়াস কামাল চৌধুরীর জীবনের তুলনামূলক কম আলোচিত একটি দিক সামনে আনে। তবে এটি তাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতির ভিত্তিতে বলা বিবরণ। ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ ঐতিহাসিক মূল্যায়নের জন্য সমসাময়িক দলিল, সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য সূত্রও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সাংবাদিকতা, রাজনীতি ও সময়ের সাক্ষ্য
গিয়াস কামাল চৌধুরীর জীবনকে একটিমাত্র পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা কঠিন। তিনি ছিলেন সাংবাদিক, সংবাদ বিশ্লেষক, সম্পাদক এবং সাংবাদিক সংগঠনের নেতা। একই সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর যোগাযোগ ও ভূমিকার কথা সহকর্মী ও সমসাময়িক ব্যক্তিদের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোতে সাংবাদিকদের অনেকেই সংবাদ সংগ্রহের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাগত উদ্যোগে যুক্ত ছিলেন। গিয়াস কামাল চৌধুরীর জীবনও সেই বৃহত্তর বাস্তবতার অংশ। তবে তাঁর রাজনৈতিক যোগাযোগ ও সাংগঠনিক ভূমিকা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ, যাচাইযোগ্য ঐতিহাসিক তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যকে আলাদা করে দেখা জরুরি।
সাংবাদিকতায় তাঁর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, ভয়েস অব আমেরিকায় দীর্ঘদিনের দায়িত্ব এবং সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃত্বের তথ্য বিভিন্ন জীবনী ও সংবাদ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়। এসব তথ্য তাঁর পেশাগত জীবনের বিস্তৃতি বোঝায়। অন্যদিকে অধ্যাপক আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরীর স্মৃতিচারণ তাঁর জীবন ও সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিমণ্ডল সম্পর্কে নতুন কিছু প্রশ্ন ও আলোচনার সুযোগ তৈরি করে।
শেষ জীবনের অসুস্থতা ও বিদায়
দীর্ঘ কর্মজীবনের পর জীবনের শেষ পর্যায়ে গুরুতর অসুস্থতায় ভুগতে থাকেন গিয়াস কামাল চৌধুরী। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে তাঁর দীর্ঘদিনের অসুস্থতা এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনে প্রতিবন্ধকতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৩ সালের ২৬ অক্টোবর রাজধানীর আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭৪ বছর বয়সে মারা যান তিনি।
তাঁর মৃত্যুর খবরে সাংবাদিকতা অঙ্গনে শোক নেমে আসে। জাতীয় প্রেসক্লাবে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সহকর্মী, সাংবাদিক, রাজনীতিক ও শুভানুধ্যায়ীরা তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। মৃত্যুর পরও তাঁর কর্মজীবন ও সাংবাদিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা বিভিন্ন সময়ে স্মরণ করা হয়েছে।
এবারের মৃত্যুবার্ষিকীতে জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত দোয়া মাহফিল এবং সেখানে অধ্যাপক ড. আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর বক্তব্য সেই স্মৃতিকে নতুন করে সামনে এনেছে। তাদের বক্তব্যের বিস্তারিত বিষয়বস্তু যথাযথভাবে যুক্ত করা গেলে গিয়াস কামাল চৌধুরীর ব্যক্তিত্ব, কাজ ও সমসাময়িকদের মূল্যায়ন আরও স্পষ্টভাবে উঠে আসবে।
নতুন প্রজন্মের কাছে যে শিক্ষা
আজকের সাংবাদিকতা প্রযুক্তিনির্ভর, দ্রুতগতির এবং বহুমাধ্যমকেন্দ্রিক। মুহূর্তেই সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে লাখো মানুষের কাছে। কিন্তু দ্রুততার সঙ্গে তথ্য যাচাই, নির্ভুলতা, দায়িত্বশীলতা এবং পেশাগত মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
গিয়াস কামাল চৌধুরীর দীর্ঘ কর্মজীবন সেই মৌলিক বিষয়গুলোকে সামনে আনে। সংবাদমাধ্যমে কাজ করার পাশাপাশি সাংবাদিকদের সংগঠনে নেতৃত্ব দেওয়া, সংবাদ বিশ্লেষণ এবং পেশাগত দায়িত্ব পালন সব মিলিয়ে তাঁর জীবন বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করার তাৎপর্য তাঁর কাজ, নেতৃত্ব এবং সময়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার নানা দিক পর্যালোচনা করাও এর অংশ। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্য তাঁর জীবন হতে পারে পেশাগত নিষ্ঠা, সংগঠিত উদ্যোগ এবং সাংবাদিকতার দায়িত্ব নিয়ে ভাবার একটি উপলক্ষ।
গিয়াস কামাল চৌধুরী আজ আর নেই। কিন্তু তাঁর কর্মজীবনের নথি, সহকর্মীদের স্মৃতি এবং সমসাময়িকদের বর্ণনায় রয়ে গেছে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা অধ্যায়। সেই অধ্যায়গুলো যত বেশি তথ্যনিষ্ঠভাবে সামনে আসবে, ততই স্পষ্ট হবে একজন সাংবাদিকের জীবন কখনো কখনো তাঁর প্রকাশিত সংবাদগুলোর বাইরেও বৃহত্তর সময়ের গল্প বলে।

আপনার মতামত লিখুন