নওগাঁয় ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) প্রযুক্তির ব্যবহারে বদলে যাচ্ছে গরুর খামার পরিচালনার প্রচলিত পদ্ধতি। একটি স্মার্টফোনের মাধ্যমেই খামারের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে; প্রয়োজনে দূর থেকেই চালু বা বন্ধ করা যাচ্ছে ফ্যান, ব্লোয়ার, লাইট ও স্প্রিংকলার। প্রায় ৬০ হাজার টাকার এ প্রযুক্তিতে মাসে ২০ হাজার টাকা সাশ্রয় হচ্ছে।
নওগাঁ সদর উপজেলার হাপানিয়া ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামের খামারি নুর এ আলমের খামারে চালু হয়েছে এমনই এক আধুনিক ব্যবস্থা। প্রযুক্তিটি স্থাপনের আগে খামারের দৈনন্দিন কার্যক্রম, গরুর স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ ও পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে মাসে ব্যয় হতো প্রায় দেড় লাখ টাকা। এখন একই খাতে ব্যয় হচ্ছে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা; অর্থাৎ মাসে সাশ্রয় হচ্ছে ২০ হাজার টাকা। বছরে এ সাশ্রয়ের পরিমাণ ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা।পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) অর্থায়নে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা মৌসুমী এ খামারে আইওটি প্রযুক্তি স্থাপন করেছে। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬০ হাজার টাকা। এর মধ্যে মৌসুমী ও পিকেএসএফের আর্থিক সহায়তা ছিল ৫০ হাজার টাকা; বাকি ১০ হাজার টাকা দিয়েছেন খামারি নুর এ আলম। সংশ্লিষ্টদের মতে, স্বল্প বিনিয়োগে প্রযুক্তিনির্ভর এ ব্যবস্থা খামার পরিচালনায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
গরুর খামারে তাপমাত্রার তারতম্য, অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের অভাবে নানা সমস্যা দেখা দেয়। বিশেষ করে গরমের সময় হিট স্ট্রেসের কারণে গরুর খাবার গ্রহণ ও স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে; দুধ উৎপাদনেও এর প্রভাব পড়ে। এসব পরিস্থিতি সামাল দিতে খামারিদের নিয়মিত পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করতে হয়। তবে শ্রমিক সংকট ও বাড়তি পরিচালন ব্যয়ের কারণে অনেক সময় তা কঠিন হয়ে পড়ে।
নুর এ আলমের খামারে স্থাপিত আইওটি প্রযুক্তিতে তাপমাত্রা পরিমাপের জন্য রয়েছে বিশেষ সেন্সর। এসব সেন্সরের মাধ্যমে খামারের তাপমাত্রার তথ্য সংগ্রহ করা হয়; মোবাইল অ্যাপ বা মনিটরিং ড্যাশবোর্ডে দেখা যায় সেই তথ্য। তাপমাত্রা নির্দিষ্ট মাত্রার বেশি হলে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ফ্যান কিংবা স্প্রিংকলার চালু করা যায়; চাইলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। এ ছাড়া দূর থেকেই নিয়ন্ত্রণ করা যায় ব্লোয়ার, লাইট ও এক্সহস্ট ফ্যান।
প্রযুক্তি স্থাপনের আগে খামারের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা, গরুর স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ, খাবার ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে তুলনামূলক বেশি শ্রম ও সময় ব্যয় হতো। এখন অনেক কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে। এতে শ্রমিকের কাজের চাপ কমার পাশাপাশি খামারির সময়ও বাঁচছে। আগে খামারের পরিবেশ ঠিক রাখতে সার্বক্ষণিক নজরদারি করতে হতো; কখন ফ্যান চালাতে হবে, কখন পানি ছিটাতে হবে কিংবা বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে—এসব বিষয়ে শ্রমিকদের নির্দেশনা দিতে হতো। এখন মোবাইল ফোনেই খামারের পরিস্থিতি জানা যাচ্ছে; ফলে খামারে সরাসরি উপস্থিত না থেকেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
আইওটি প্রযুক্তির ব্যবহারে খামারের পরিচালন ব্যয়ে যে পরিবর্তন এসেছে, তার একটি তুলনামূলক হিসাব দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। প্রযুক্তি স্থাপনের আগে খামারের মাসিক শ্রমিক খরচ ছিল প্রায় ১ লাখ টাকা; বর্তমানে তা কমে হয়েছে ৮০ হাজার টাকা। তবে বিদ্যুৎ বিল আগের মতোই ৩০ হাজার টাকা এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় ২০ হাজার টাকা রয়েছে। অর্থাৎ প্রযুক্তি স্থাপনের আগে মাসিক মোট ব্যয় ছিল দেড় লাখ টাকা; বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকায়। শ্রমিক খাতে মাসে ২০ হাজার টাকা সাশ্রয় হচ্ছে; বছরে এ সাশ্রয়ের পরিমাণ ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা। ৬০ হাজার টাকার প্রাথমিক বিনিয়োগের তুলনায় সাশ্রয়ের এ হিসাব প্রযুক্তিটির অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে সামনে এনেছে।
হাসিন হাসিব ডেইরি ফার্মের ম্যানেজার ময়ফুল ইসলাম বলেন, ‘মোবাইল ফোনের মাধ্যমে দূর থেকেই ফ্যান, ব্লোয়ার, লাইট ও স্প্রিংকলার নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এতে শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা কমে, সময় ও পরিচালন ব্যয় সাশ্রয় হয়। গবাদিপশুর জন্য অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করাও সহজ হয়।’ তবে পরিচালন ব্যয় কমলেও বিদ্যুৎ বিল আগের মতোই রয়েছে; কারণ ফ্যান, ব্লোয়ার ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ব্যবহার এখনো প্রয়োজন অনুযায়ী করতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, পরিবেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় যন্ত্র ব্যবহারে আরও দক্ষতা আনা গেলে ভবিষ্যতে ব্যয় ব্যবস্থাপনায় বাড়তি সুফল পাওয়া সম্ভব হবে।
গবাদিপশুর স্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতার সঙ্গে খামারের পরিবেশের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। অতিরিক্ত গরম, আর্দ্রতা ও বায়ু চলাচলের ঘাটতি গরুর ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। আইওটি প্রযুক্তির মাধ্যমে এসব পরিবেশগত বিষয় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা গেলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। মৌসুমীর প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. নূর হোসেন বলেন, ‘ইন্টারনেট অব থিংস বা আইওটি প্রযুক্তির মাধ্যমে গরুর খামারের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও পরিবেশের বিভিন্ন তথ্য পর্যবেক্ষণ করা যায়। কোনো পরিবর্তন হলে খামারি দ্রুত জানতে পারেন। এতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হয় এবং গবাদিপশুর পরিচর্যার মান উন্নত করা সম্ভব হয়।’
প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে গরুর স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ ও পরিচর্যার সুযোগ বাড়লেও এখন পর্যন্ত দুধ উৎপাদন কিংবা গরুর ওজন বৃদ্ধির হার নিয়ে তুলনামূলক তথ্য সংরক্ষণ করা হয়নি। ফলে উৎপাদন বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। তবে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, উন্নত পরিবেশ ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে গবাদিপশুর উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব হবে।
নওগাঁ সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আইওটি প্রযুক্তির মাধ্যমে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে পরিকল্পিত ও বিজ্ঞানসম্মতভাবে খামার পরিচালনা করা যায়। নওগাঁয় একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এ উদ্যোগ নিয়েছে। ভবিষ্যতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে মাঠপর্যায়ে এ ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।’
প্রযুক্তির ব্যবহার সহজ হলেও প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যন্ত্রপাতি পরিচালনা, ইন্টারনেট সংযোগ, সেন্সরের কার্যকারিতা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষতার অভাব বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার খামারে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে স্থানীয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কিংবা প্রচলিত ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে খামারের কার্যক্রম চালু রাখার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। একইভাবে বিদ্যুৎ চলে গেলে আইপিএস বা জেনারেটরের মতো বিকল্প ব্যবস্থা কাজে আসতে পারে। পাশাপাশি খামারি ও শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত কারিগরি সহযোগিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
নওগাঁ কৃষিনির্ভর জেলা। এখানে গবাদিপশু পালন অনেক পরিবারের আয়ের অন্যতম উৎস। কিন্তু প্রচলিত পদ্ধতিতে খামার পরিচালনা করতে গিয়ে শ্রমিক সংকট, বাড়তি ব্যয় ও পরিবেশ নিয়ন্ত্রণের মতো সমস্যায় পড়তে হয় খামারিদের। এ অবস্থায় প্রযুক্তিনির্ভর পশুপালন ব্যবস্থা ছড়িয়ে দেওয়া গেলে খাতটিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। মৌসুমী কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গোবিন্দপুরের খামারে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা ও সুফল পর্যবেক্ষণের পর জেলার অন্য খামারিদেরও এ বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করা হবে। ভবিষ্যতে সংস্থাটির পরিকল্পনা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে নওগাঁর আরও পাঁচটি খামারে আইওটি প্রযুক্তি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
একটি খামারে ৬০ হাজার টাকার বিনিয়োগে মাসে ২০ হাজার টাকা সাশ্রয়ের হিসাব নিঃসন্দেহে খামারিদের আগ্রহী করে তুলতে পারে। তবে প্রযুক্তিটির দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং উৎপাদনের ওপর প্রভাব নিয়মিত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কারণ, শুধু প্রযুক্তি স্থাপন নয়, এর সঠিক ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণই নিশ্চিত করবে প্রকৃত সুফল। গোবিন্দপুরের খামারে স্মার্টফোনের পর্দায় তাপমাত্রার ওঠানামা দেখে এখন ফ্যান বা স্প্রিংকলার চালু করেন খামারি। প্রচলিত খামার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে প্রযুক্তির এ সংযোগ নওগাঁর পশুপালন খাতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। এখন দেখার বিষয়, একটি খামারে শুরু হওয়া এ উদ্যোগ কতটা সফলভাবে ছড়িয়ে পড়ে জেলার অন্য খামারগুলোতে।

রোববার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ নভেম্বর ২০২৬
নওগাঁয় ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) প্রযুক্তির ব্যবহারে বদলে যাচ্ছে গরুর খামার পরিচালনার প্রচলিত পদ্ধতি। একটি স্মার্টফোনের মাধ্যমেই খামারের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে; প্রয়োজনে দূর থেকেই চালু বা বন্ধ করা যাচ্ছে ফ্যান, ব্লোয়ার, লাইট ও স্প্রিংকলার। প্রায় ৬০ হাজার টাকার এ প্রযুক্তিতে মাসে ২০ হাজার টাকা সাশ্রয় হচ্ছে।
নওগাঁ সদর উপজেলার হাপানিয়া ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামের খামারি নুর এ আলমের খামারে চালু হয়েছে এমনই এক আধুনিক ব্যবস্থা। প্রযুক্তিটি স্থাপনের আগে খামারের দৈনন্দিন কার্যক্রম, গরুর স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ ও পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে মাসে ব্যয় হতো প্রায় দেড় লাখ টাকা। এখন একই খাতে ব্যয় হচ্ছে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা; অর্থাৎ মাসে সাশ্রয় হচ্ছে ২০ হাজার টাকা। বছরে এ সাশ্রয়ের পরিমাণ ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা।পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) অর্থায়নে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা মৌসুমী এ খামারে আইওটি প্রযুক্তি স্থাপন করেছে। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬০ হাজার টাকা। এর মধ্যে মৌসুমী ও পিকেএসএফের আর্থিক সহায়তা ছিল ৫০ হাজার টাকা; বাকি ১০ হাজার টাকা দিয়েছেন খামারি নুর এ আলম। সংশ্লিষ্টদের মতে, স্বল্প বিনিয়োগে প্রযুক্তিনির্ভর এ ব্যবস্থা খামার পরিচালনায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
গরুর খামারে তাপমাত্রার তারতম্য, অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের অভাবে নানা সমস্যা দেখা দেয়। বিশেষ করে গরমের সময় হিট স্ট্রেসের কারণে গরুর খাবার গ্রহণ ও স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে; দুধ উৎপাদনেও এর প্রভাব পড়ে। এসব পরিস্থিতি সামাল দিতে খামারিদের নিয়মিত পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করতে হয়। তবে শ্রমিক সংকট ও বাড়তি পরিচালন ব্যয়ের কারণে অনেক সময় তা কঠিন হয়ে পড়ে।
নুর এ আলমের খামারে স্থাপিত আইওটি প্রযুক্তিতে তাপমাত্রা পরিমাপের জন্য রয়েছে বিশেষ সেন্সর। এসব সেন্সরের মাধ্যমে খামারের তাপমাত্রার তথ্য সংগ্রহ করা হয়; মোবাইল অ্যাপ বা মনিটরিং ড্যাশবোর্ডে দেখা যায় সেই তথ্য। তাপমাত্রা নির্দিষ্ট মাত্রার বেশি হলে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ফ্যান কিংবা স্প্রিংকলার চালু করা যায়; চাইলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। এ ছাড়া দূর থেকেই নিয়ন্ত্রণ করা যায় ব্লোয়ার, লাইট ও এক্সহস্ট ফ্যান।
প্রযুক্তি স্থাপনের আগে খামারের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা, গরুর স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ, খাবার ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে তুলনামূলক বেশি শ্রম ও সময় ব্যয় হতো। এখন অনেক কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে। এতে শ্রমিকের কাজের চাপ কমার পাশাপাশি খামারির সময়ও বাঁচছে। আগে খামারের পরিবেশ ঠিক রাখতে সার্বক্ষণিক নজরদারি করতে হতো; কখন ফ্যান চালাতে হবে, কখন পানি ছিটাতে হবে কিংবা বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে—এসব বিষয়ে শ্রমিকদের নির্দেশনা দিতে হতো। এখন মোবাইল ফোনেই খামারের পরিস্থিতি জানা যাচ্ছে; ফলে খামারে সরাসরি উপস্থিত না থেকেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
আইওটি প্রযুক্তির ব্যবহারে খামারের পরিচালন ব্যয়ে যে পরিবর্তন এসেছে, তার একটি তুলনামূলক হিসাব দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। প্রযুক্তি স্থাপনের আগে খামারের মাসিক শ্রমিক খরচ ছিল প্রায় ১ লাখ টাকা; বর্তমানে তা কমে হয়েছে ৮০ হাজার টাকা। তবে বিদ্যুৎ বিল আগের মতোই ৩০ হাজার টাকা এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় ২০ হাজার টাকা রয়েছে। অর্থাৎ প্রযুক্তি স্থাপনের আগে মাসিক মোট ব্যয় ছিল দেড় লাখ টাকা; বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকায়। শ্রমিক খাতে মাসে ২০ হাজার টাকা সাশ্রয় হচ্ছে; বছরে এ সাশ্রয়ের পরিমাণ ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা। ৬০ হাজার টাকার প্রাথমিক বিনিয়োগের তুলনায় সাশ্রয়ের এ হিসাব প্রযুক্তিটির অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে সামনে এনেছে।
হাসিন হাসিব ডেইরি ফার্মের ম্যানেজার ময়ফুল ইসলাম বলেন, ‘মোবাইল ফোনের মাধ্যমে দূর থেকেই ফ্যান, ব্লোয়ার, লাইট ও স্প্রিংকলার নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এতে শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা কমে, সময় ও পরিচালন ব্যয় সাশ্রয় হয়। গবাদিপশুর জন্য অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করাও সহজ হয়।’ তবে পরিচালন ব্যয় কমলেও বিদ্যুৎ বিল আগের মতোই রয়েছে; কারণ ফ্যান, ব্লোয়ার ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ব্যবহার এখনো প্রয়োজন অনুযায়ী করতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, পরিবেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় যন্ত্র ব্যবহারে আরও দক্ষতা আনা গেলে ভবিষ্যতে ব্যয় ব্যবস্থাপনায় বাড়তি সুফল পাওয়া সম্ভব হবে।
গবাদিপশুর স্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতার সঙ্গে খামারের পরিবেশের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। অতিরিক্ত গরম, আর্দ্রতা ও বায়ু চলাচলের ঘাটতি গরুর ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। আইওটি প্রযুক্তির মাধ্যমে এসব পরিবেশগত বিষয় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা গেলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। মৌসুমীর প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. নূর হোসেন বলেন, ‘ইন্টারনেট অব থিংস বা আইওটি প্রযুক্তির মাধ্যমে গরুর খামারের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও পরিবেশের বিভিন্ন তথ্য পর্যবেক্ষণ করা যায়। কোনো পরিবর্তন হলে খামারি দ্রুত জানতে পারেন। এতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হয় এবং গবাদিপশুর পরিচর্যার মান উন্নত করা সম্ভব হয়।’
প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে গরুর স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ ও পরিচর্যার সুযোগ বাড়লেও এখন পর্যন্ত দুধ উৎপাদন কিংবা গরুর ওজন বৃদ্ধির হার নিয়ে তুলনামূলক তথ্য সংরক্ষণ করা হয়নি। ফলে উৎপাদন বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। তবে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, উন্নত পরিবেশ ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে গবাদিপশুর উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব হবে।
নওগাঁ সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আইওটি প্রযুক্তির মাধ্যমে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে পরিকল্পিত ও বিজ্ঞানসম্মতভাবে খামার পরিচালনা করা যায়। নওগাঁয় একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এ উদ্যোগ নিয়েছে। ভবিষ্যতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে মাঠপর্যায়ে এ ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।’
প্রযুক্তির ব্যবহার সহজ হলেও প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যন্ত্রপাতি পরিচালনা, ইন্টারনেট সংযোগ, সেন্সরের কার্যকারিতা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষতার অভাব বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার খামারে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে স্থানীয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কিংবা প্রচলিত ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে খামারের কার্যক্রম চালু রাখার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। একইভাবে বিদ্যুৎ চলে গেলে আইপিএস বা জেনারেটরের মতো বিকল্প ব্যবস্থা কাজে আসতে পারে। পাশাপাশি খামারি ও শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত কারিগরি সহযোগিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
নওগাঁ কৃষিনির্ভর জেলা। এখানে গবাদিপশু পালন অনেক পরিবারের আয়ের অন্যতম উৎস। কিন্তু প্রচলিত পদ্ধতিতে খামার পরিচালনা করতে গিয়ে শ্রমিক সংকট, বাড়তি ব্যয় ও পরিবেশ নিয়ন্ত্রণের মতো সমস্যায় পড়তে হয় খামারিদের। এ অবস্থায় প্রযুক্তিনির্ভর পশুপালন ব্যবস্থা ছড়িয়ে দেওয়া গেলে খাতটিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। মৌসুমী কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গোবিন্দপুরের খামারে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা ও সুফল পর্যবেক্ষণের পর জেলার অন্য খামারিদেরও এ বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করা হবে। ভবিষ্যতে সংস্থাটির পরিকল্পনা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে নওগাঁর আরও পাঁচটি খামারে আইওটি প্রযুক্তি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
একটি খামারে ৬০ হাজার টাকার বিনিয়োগে মাসে ২০ হাজার টাকা সাশ্রয়ের হিসাব নিঃসন্দেহে খামারিদের আগ্রহী করে তুলতে পারে। তবে প্রযুক্তিটির দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং উৎপাদনের ওপর প্রভাব নিয়মিত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কারণ, শুধু প্রযুক্তি স্থাপন নয়, এর সঠিক ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণই নিশ্চিত করবে প্রকৃত সুফল। গোবিন্দপুরের খামারে স্মার্টফোনের পর্দায় তাপমাত্রার ওঠানামা দেখে এখন ফ্যান বা স্প্রিংকলার চালু করেন খামারি। প্রচলিত খামার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে প্রযুক্তির এ সংযোগ নওগাঁর পশুপালন খাতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। এখন দেখার বিষয়, একটি খামারে শুরু হওয়া এ উদ্যোগ কতটা সফলভাবে ছড়িয়ে পড়ে জেলার অন্য খামারগুলোতে।

আপনার মতামত লিখুন