সংবাদ

শ্রীমঙ্গলে অবৈধ বালু উত্তোলন থামছেই না


প্রতিনিধি, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার)
প্রতিনিধি, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার)
প্রকাশ: ৮ নভেম্বর ২০২৬, ১১:১৮ এএম

শ্রীমঙ্গলে অবৈধ বালু উত্তোলন থামছেই না
ছবি : সংবাদ

দেশের অন্যতম পর্যটন নগরী ও চায়ের স্বর্গরাজ্য শ্রীমঙ্গলে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে নানা আলোচনা ও অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযান, জরিমানা ও বালু জব্দের পরও থামছে না অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও পরিবহন।

উপজেলার বিভিন্ন ছড়া ও নদীসংলগ্ন এলাকায় এ তৎপরতা পরিবেশের জন্য উদ্বেগ তৈরি করছে। অন্যদিকে বালুবাহী ট্রাকের কারণে ঘটছে দুর্ঘটনা, ঝরছে প্রাণ।

উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, শ্রীমঙ্গলে বালুমহাল ও কোয়ারির সংখ্যা ২৮টি। এর মধ্যে গোপলা ছড়া ও শিয়াল ছড়া-এই দুটি সাধারণ বালুমহাল ইজারা দেওয়া হয়েছে। বাকি ২৬টি সিলিকা বালুর কোয়ারি আইনি জটিলতার কারণে ইজারার বাইরে রয়েছে। ফলে এসব এলাকায় বালু উত্তোলন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬ সালের আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইনে ১৬টি অভিযান পরিচালনা করা হয়। এসব অভিযানে ১ লাখ ২০০ টাকা জরিমানা আদায়, পাঁচজনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা এবং জব্দ করা বালু নিলামে বিক্রি করে ২ লাখ ৭০ হাজার ২৫০ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়। এরপর ৩১ অক্টোবর ও ২ নভেম্বর মির্জাপুর ইউনিয়নে আরও দুটি অভিযান চালানো হয়। এ নিয়ে অভিযানের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৮। দুই অভিযানে প্রায় ২৬ হাজার ঘনফুট বালু জব্দ করা হয়। ৩১ অক্টোবর রায়পোরান পশ্চিমপাড়া মসজিদের কাছ থেকে প্রায় ১৬ হাজার ঘনফুট এবং ২ নভেম্বর মুরাছড়া ও বাউলছড়া ভাঙা সেতুর কাছ থেকে প্রায় ১০ হাজার ঘনফুট বালু জব্দ করা হয়। অভিযানে নেতৃত্ব দেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মিনহাজুল ইসলাম। জব্দ করা বালু স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের জিম্মায় রাখা হয়েছে।

এর আগে সিন্দুরখান, ভুনবীর, মিরতিঙ্গা ও কালাপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে বালু উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত এক্সকাভেটর ও অন্যান্য সরঞ্জাম জব্দ কিংবা ধ্বংস করা হয়। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, অভিযান শেষ হওয়ার কিছুদিন পরই কোনো কোনো এলাকায় আবার বালু উত্তোলন শুরু হয়।

শ্রীমঙ্গল উপজেলার নোয়াগাঁও এলাকায় জাগছড়াকে ঘিরে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। এলাকাটির পূর্ব পাশে রয়েছে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান হেলদি চয়েজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেড। এর কাছাকাছি শিল্পপতি সিরাজুল ইসলাম হারুনের সম্পত্তিও রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, জাগছড়ার এই অংশ থেকে প্রভাবশালী একটি চক্র বালু উত্তোলন করে বিভিন্ন ব্যক্তির জমির ওপর দিয়ে ট্রাকে পরিবহন করে।

বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে এ তৎপরতা বেড়ে যায়। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় আলোচনা থাকলেও ভয়ে অনেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম প্রকাশ করতে চান না। একই জাগছড়ার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পশ্চিম পাশেও বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। ছড়াটি প্রয়াত সাবেক শিক্ষক প্রীতি রঞ্জন চক্রবর্তীর জমির পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী ছড়া থেকে বালু তুলে ওই শিক্ষকের জমির পতিত অংশে স্তূপ করে রাখে এবং রাতের বেলায় তা সরিয়ে নেয়। এ কাজে স্থানীয় এক নারী জনপ্রতিনিধির পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও রয়েছে।

শ্রীমঙ্গলে বালু উত্তোলন ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ের আলোচনার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নানা বক্তব্য সামনে এসেছে। স্থানীয় সাংবাদিক মো. সাইফুল ইসলাম তার ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে বালু উত্তোলনসংক্রান্ত তৎপরতায় একজন প্রভাবশালী সাংবাদিকের সম্পৃক্ততা এবং এ বিষয়ে তদবিরের অভিযোগ তোলেন। পোস্টটি ঘিরে স্থানীয় সাংবাদিক মহলসহ বিভিন্ন মহলে আলোচনা তৈরি হয়।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিও রেকর্ডিং নিয়েও আলোচনা চলছে। অডিওতে এক বালু ব্যবসায়ীকে একজন সাংবাদিকের সঙ্গে কথোপকথনের সময় তাকে অর্থ দেওয়ার কথা বলতে শোনা যায় বলে দাবি করা হচ্ছে। এ অডিওকে কেন্দ্র করে বালু উত্তোলন ঘিরে ব্যবসায়ী, প্রভাবশালী মহল ও সাংবাদিকদের সম্ভাব্য যোগাযোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত থাকলেও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের ভূমিকা খতিয়ে দেখা এবং অভিযোগগুলোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

শ্রীমঙ্গল উপজেলার বিভিন্ন পাহাড়ি ছড়া থেকে পানি নেমে গিয়ে মিশেছে হাইল হাওরে। বর্মাছড়া, উদনাছড়া, হরিণছড়া, পুটিয়াছড়া, বিলাশছড়া, ফুলছড়া, কাকিয়াছড়া, আমরাইলছড়া, ইছামতী, ভুরভুরিয়া, জাগছড়া, সুনাছড়া, নারায়ণছড়া, বাউলছড়া, গিলাছড়া, শিয়ালছড়া ও খাইছড়াসহ বেশ কয়েকটি ছড়া এ অঞ্চলের পানি নিষ্কাশন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

পরিবেশকর্মী তাপস দাস বলেন, অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করা হলে ছড়ার তলদেশ ও পানির স্বাভাবিক প্রবাহে পরিবর্তন আসতে পারে। এতে ছড়ার দুই পাশের মাটি ভাঙন, কৃষিজমির ক্ষতি, সড়ক ও সেতুর ঝুঁকি এবং বসতবাড়ির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই ছড়া ও নদী থেকে বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রে পরিবেশগত বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

শ্রীমঙ্গল ও আশপাশের এলাকায় বালুবাহী ট্রাকের কারণে একাধিক প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটেছে। ২০২৩ সালের ১৪ মার্চ ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের শাহজিবাজার এলাকায় বালুবাহী ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষে আবদুল কাদির (৬৫) নিহত হন। ২০২৪ সালের ১ জুলাই ভুনবীর ইউনিয়নের পাত্রিকুল এলাকায় শ্রীমঙ্গল-মির্জাপুর সড়কে বালুবাহী ট্রাকের ধাক্কায় এক নারী ও সাত বছর বয়সী এক শিশু প্রাণ হারায়। একই বছরের ২১ অক্টোবর শ্রীমঙ্গল-ভানুগাছ সড়কে বালুবাহী ট্রাকের ধাক্কায় গুরুতর আহত হন নেদারল্যান্ডসের পর্যটক তোসকা মারিয়ান। ২০২৫ সালের ১ জুন সাতগাঁও এলাকায় বালুবাহী ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে পিকআপের যাত্রী ঝুনু বৈদ্য নিহত হন। ২০২৬ সালের ১ জুন ভুনবীর চৌমুহনায় বালুবাহী ট্রাক, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইকের ত্রিমুখী সংঘর্ষে শিপন ও রাসেলসহ ছয়জন গুরুতর আহত হন।

একই বছরের ৩ সেপ্টেম্বর শ্রীমঙ্গল শহরের হবিগঞ্জ সড়কের সুরমা ভ্যালি এলাকায় বালুবাহী ডাম্প ট্রাকের ধাক্কায় ইজিবাইকের চালক আবদুল মান্নান (৪০) নিহত হন।

সম্প্রতি মির্জাপুর এলাকায় বালুবাহী ডাইনা ট্রাকের ধাক্কায় অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত টমটমের যাত্রীরা আহত হন। এ ঘটনায় ছয়জন আহত হওয়ার পর ক্ষুব্ধ লোকজন ট্রাকটিতে আগুন ধরিয়ে দেন। প্রায় চার ঘণ্টা শ্রীমঙ্গল-মির্জাপুর সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সংসদ সদস্য, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, র‍্যাব, পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। এ সময় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে।

অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের মাধ্যমে পরিবেশের ক্ষতিসাধনের অভিযোগে ২০২৬ সালের ২ মে ভুনবীর ও মির্জাপুর এলাকায় ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। ভুনবীর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা হিমেল পাল বাদী হয়ে মামলাটি করেন। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শুধু অভিযান পরিচালনা নয়, অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং উত্তোলন বন্ধে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে বালুবাহী যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে সড়কে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব হবে।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। শ্রীমঙ্গলের পাহাড়ি ছড়া, পরিবেশ ও জননিরাপত্তা রক্ষায় অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি। প্রশাসনের অভিযান আরও জোরদার করার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের সচেতনতা ও সহযোগিতাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬


শ্রীমঙ্গলে অবৈধ বালু উত্তোলন থামছেই না

প্রকাশের তারিখ : ০৮ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

দেশের অন্যতম পর্যটন নগরী ও চায়ের স্বর্গরাজ্য শ্রীমঙ্গলে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে নানা আলোচনা ও অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযান, জরিমানা ও বালু জব্দের পরও থামছে না অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও পরিবহন।

উপজেলার বিভিন্ন ছড়া ও নদীসংলগ্ন এলাকায় এ তৎপরতা পরিবেশের জন্য উদ্বেগ তৈরি করছে। অন্যদিকে বালুবাহী ট্রাকের কারণে ঘটছে দুর্ঘটনা, ঝরছে প্রাণ।

উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, শ্রীমঙ্গলে বালুমহাল ও কোয়ারির সংখ্যা ২৮টি। এর মধ্যে গোপলা ছড়া ও শিয়াল ছড়া-এই দুটি সাধারণ বালুমহাল ইজারা দেওয়া হয়েছে। বাকি ২৬টি সিলিকা বালুর কোয়ারি আইনি জটিলতার কারণে ইজারার বাইরে রয়েছে। ফলে এসব এলাকায় বালু উত্তোলন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬ সালের আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইনে ১৬টি অভিযান পরিচালনা করা হয়। এসব অভিযানে ১ লাখ ২০০ টাকা জরিমানা আদায়, পাঁচজনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা এবং জব্দ করা বালু নিলামে বিক্রি করে ২ লাখ ৭০ হাজার ২৫০ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়। এরপর ৩১ অক্টোবর ও ২ নভেম্বর মির্জাপুর ইউনিয়নে আরও দুটি অভিযান চালানো হয়। এ নিয়ে অভিযানের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৮। দুই অভিযানে প্রায় ২৬ হাজার ঘনফুট বালু জব্দ করা হয়। ৩১ অক্টোবর রায়পোরান পশ্চিমপাড়া মসজিদের কাছ থেকে প্রায় ১৬ হাজার ঘনফুট এবং ২ নভেম্বর মুরাছড়া ও বাউলছড়া ভাঙা সেতুর কাছ থেকে প্রায় ১০ হাজার ঘনফুট বালু জব্দ করা হয়। অভিযানে নেতৃত্ব দেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মিনহাজুল ইসলাম। জব্দ করা বালু স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের জিম্মায় রাখা হয়েছে।

এর আগে সিন্দুরখান, ভুনবীর, মিরতিঙ্গা ও কালাপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে বালু উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত এক্সকাভেটর ও অন্যান্য সরঞ্জাম জব্দ কিংবা ধ্বংস করা হয়। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, অভিযান শেষ হওয়ার কিছুদিন পরই কোনো কোনো এলাকায় আবার বালু উত্তোলন শুরু হয়।

শ্রীমঙ্গল উপজেলার নোয়াগাঁও এলাকায় জাগছড়াকে ঘিরে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। এলাকাটির পূর্ব পাশে রয়েছে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান হেলদি চয়েজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেড। এর কাছাকাছি শিল্পপতি সিরাজুল ইসলাম হারুনের সম্পত্তিও রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, জাগছড়ার এই অংশ থেকে প্রভাবশালী একটি চক্র বালু উত্তোলন করে বিভিন্ন ব্যক্তির জমির ওপর দিয়ে ট্রাকে পরিবহন করে।

বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে এ তৎপরতা বেড়ে যায়। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় আলোচনা থাকলেও ভয়ে অনেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম প্রকাশ করতে চান না। একই জাগছড়ার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পশ্চিম পাশেও বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। ছড়াটি প্রয়াত সাবেক শিক্ষক প্রীতি রঞ্জন চক্রবর্তীর জমির পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী ছড়া থেকে বালু তুলে ওই শিক্ষকের জমির পতিত অংশে স্তূপ করে রাখে এবং রাতের বেলায় তা সরিয়ে নেয়। এ কাজে স্থানীয় এক নারী জনপ্রতিনিধির পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও রয়েছে।

শ্রীমঙ্গলে বালু উত্তোলন ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ের আলোচনার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নানা বক্তব্য সামনে এসেছে। স্থানীয় সাংবাদিক মো. সাইফুল ইসলাম তার ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে বালু উত্তোলনসংক্রান্ত তৎপরতায় একজন প্রভাবশালী সাংবাদিকের সম্পৃক্ততা এবং এ বিষয়ে তদবিরের অভিযোগ তোলেন। পোস্টটি ঘিরে স্থানীয় সাংবাদিক মহলসহ বিভিন্ন মহলে আলোচনা তৈরি হয়।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিও রেকর্ডিং নিয়েও আলোচনা চলছে। অডিওতে এক বালু ব্যবসায়ীকে একজন সাংবাদিকের সঙ্গে কথোপকথনের সময় তাকে অর্থ দেওয়ার কথা বলতে শোনা যায় বলে দাবি করা হচ্ছে। এ অডিওকে কেন্দ্র করে বালু উত্তোলন ঘিরে ব্যবসায়ী, প্রভাবশালী মহল ও সাংবাদিকদের সম্ভাব্য যোগাযোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত থাকলেও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের ভূমিকা খতিয়ে দেখা এবং অভিযোগগুলোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

শ্রীমঙ্গল উপজেলার বিভিন্ন পাহাড়ি ছড়া থেকে পানি নেমে গিয়ে মিশেছে হাইল হাওরে। বর্মাছড়া, উদনাছড়া, হরিণছড়া, পুটিয়াছড়া, বিলাশছড়া, ফুলছড়া, কাকিয়াছড়া, আমরাইলছড়া, ইছামতী, ভুরভুরিয়া, জাগছড়া, সুনাছড়া, নারায়ণছড়া, বাউলছড়া, গিলাছড়া, শিয়ালছড়া ও খাইছড়াসহ বেশ কয়েকটি ছড়া এ অঞ্চলের পানি নিষ্কাশন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

পরিবেশকর্মী তাপস দাস বলেন, অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করা হলে ছড়ার তলদেশ ও পানির স্বাভাবিক প্রবাহে পরিবর্তন আসতে পারে। এতে ছড়ার দুই পাশের মাটি ভাঙন, কৃষিজমির ক্ষতি, সড়ক ও সেতুর ঝুঁকি এবং বসতবাড়ির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই ছড়া ও নদী থেকে বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রে পরিবেশগত বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

শ্রীমঙ্গল ও আশপাশের এলাকায় বালুবাহী ট্রাকের কারণে একাধিক প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটেছে। ২০২৩ সালের ১৪ মার্চ ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের শাহজিবাজার এলাকায় বালুবাহী ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষে আবদুল কাদির (৬৫) নিহত হন। ২০২৪ সালের ১ জুলাই ভুনবীর ইউনিয়নের পাত্রিকুল এলাকায় শ্রীমঙ্গল-মির্জাপুর সড়কে বালুবাহী ট্রাকের ধাক্কায় এক নারী ও সাত বছর বয়সী এক শিশু প্রাণ হারায়। একই বছরের ২১ অক্টোবর শ্রীমঙ্গল-ভানুগাছ সড়কে বালুবাহী ট্রাকের ধাক্কায় গুরুতর আহত হন নেদারল্যান্ডসের পর্যটক তোসকা মারিয়ান। ২০২৫ সালের ১ জুন সাতগাঁও এলাকায় বালুবাহী ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে পিকআপের যাত্রী ঝুনু বৈদ্য নিহত হন। ২০২৬ সালের ১ জুন ভুনবীর চৌমুহনায় বালুবাহী ট্রাক, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইকের ত্রিমুখী সংঘর্ষে শিপন ও রাসেলসহ ছয়জন গুরুতর আহত হন।

একই বছরের ৩ সেপ্টেম্বর শ্রীমঙ্গল শহরের হবিগঞ্জ সড়কের সুরমা ভ্যালি এলাকায় বালুবাহী ডাম্প ট্রাকের ধাক্কায় ইজিবাইকের চালক আবদুল মান্নান (৪০) নিহত হন।

সম্প্রতি মির্জাপুর এলাকায় বালুবাহী ডাইনা ট্রাকের ধাক্কায় অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত টমটমের যাত্রীরা আহত হন। এ ঘটনায় ছয়জন আহত হওয়ার পর ক্ষুব্ধ লোকজন ট্রাকটিতে আগুন ধরিয়ে দেন। প্রায় চার ঘণ্টা শ্রীমঙ্গল-মির্জাপুর সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সংসদ সদস্য, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, র‍্যাব, পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। এ সময় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে।

অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের মাধ্যমে পরিবেশের ক্ষতিসাধনের অভিযোগে ২০২৬ সালের ২ মে ভুনবীর ও মির্জাপুর এলাকায় ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। ভুনবীর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা হিমেল পাল বাদী হয়ে মামলাটি করেন। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শুধু অভিযান পরিচালনা নয়, অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং উত্তোলন বন্ধে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে বালুবাহী যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে সড়কে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব হবে।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। শ্রীমঙ্গলের পাহাড়ি ছড়া, পরিবেশ ও জননিরাপত্তা রক্ষায় অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি। প্রশাসনের অভিযান আরও জোরদার করার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের সচেতনতা ও সহযোগিতাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত