নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার অদূরে, মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে উত্তরগ্রাম ইউনিয়নের শিবগঞ্জ বাজারসংলগ্ন এলাকায় একটি বাড়ির ভেতর কারখানা। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ করেন মহিলা শ্রমিকরা। রাতের আঁধারে বাজারজাত করা হয় নকল পণ্য। বছরের পর বছর ধরে চলছে এসব অবৈধ কারবার। মাঝে মাঝে অভিযান চালায় প্রশাসন; কিন্তু বন্ধ হয় না নকল পণ্য উৎপাদন। এবার সেখানেই অভিযান চালান জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), এসআরবি, উপজেলা প্রশাসন ও মহাদেবপুর থানা পুলিশ।
নকল সার ও ভেজাল কীটনাশক তৈরির দায়ে সিলগালা করা হয় সেখানকার ‘এসএডি এগ্রোভেট’ নামের কারখানাটি। সেই সঙ্গে এক মালিককে এক মাসের কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানা এবং অপরজনের এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। জব্দ করা হয় ভেজাল সার ও কীটনাশক তৈরির বিপুল পরিমাণ সামগ্রী।
শনিবার (৭ নভেম্বর) বেলা ১১টায় অভিযানটি পরিচালনা করার সময় কারখানাটির মালিক কার্যক্রম চালাচ্ছিলেন শাহীনুর আলম পলাশ। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে শাহীনুর ক্ষমতার অপব্যবহার করে নকল পণ্য তৈরি করে সাধারণ চাষিদের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছে। নকল পণ্য বাজারজাত করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন তিনি। শাহীনুরের পিতা মোতাহের হোসেনের মৃত্যুর পর কারখানাটি শাহীনুর ও তার ছোট ভাই দেলোয়ার হোসেন পরিচালনা করে আসছে।
অভিযান পরিচালনাকারী মহাদেবপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট জান্নাতুন নাইম বিনতে আজিজ বলেন, নকল সার ও কীটনাশক উৎপাদনের অভিযোগে এসএডি এগ্রোভেটের মালিক শাহীনুরের অনুপস্থিতিতে তার স্ত্রী হাসনাত জাহান পাপিয়ার বিরুদ্ধে বালাইনাশক আইনে এক লাখ টাকা জরিমানা, একই নামে আরেকটি কারখানা চালানোর জন্য শাহীনুরের ভাই দেলোয়ার হোসেনকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও ১৫ দিনের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়।
অভিযানে অংশ নেওয়া মহাদেবপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেন, সেখানে থেকে হরমোন প্লাস ৬৫ কনটেইনার, অক্সাড কারেট ব্যাকটেরিয়া ১১৫০ প্যাকেট, ব্লুয়ানা ক্লাস ১ কেজি, দীন জীব সার ৪০ কেজি, খোলা ছোঁয়া, খোলা গোবর, বিভিন্ন চাকার গুঁড়া, মিশ্রণ মেশিন জব্দ করা হয়েছে। এখানে ছোঁয়া, গোবর, তামাকের গুঁড়া মিশিয়ে জীব সারের মিশ্রণের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অবৈধ। এর নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। ল্যাবে টেস্টে পাঠানো হবে। জীব সারের নিবন্ধন বাতিলের সুপারিশ করা হবে।
বালাইনাশক চাকার গুঁড়া বানাচ্ছে তেলাপোকা মারার জন্য; সেখানে তারা সাইপার মেথিন মেশাচ্ছে, যা অবৈধ। চাকার গুঁড়া পিবিপি রেজিস্ট্রেশনে রাখে, কিন্তু সাইপার মেথিন একটি কীটনাশক; এটা ইমপোর্ট করার অনুমতি নেই। বাড়ির মধ্যে এ ধরনের কীটনাশকের কারখানায় যারা কাজ করছে, তাদের চামড়া স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অচিরেই বড় রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। এই কারখানাটি পরিবেশের এবং ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র কীভাবে পেল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এসআরবি-৫-এর কর্মকর্তা বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এখানে অবৈধভাবে নকল সার ও কীটনাশক তৈরি করে আশপাশের জেলাগুলোতে সরবরাহ করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে। কৃষক ফসলের ফলন বাড়ানোর জন্য এসব প্রয়োগ করছেন; কিন্তু ফলন বাড়ানোর পরিবর্তে ফসলের ক্ষতি হচ্ছে। এই কৃষিপ্রধান দেশে আমরা যদি কৃষকদের প্রতারণা করি, তাহলে আমরা নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হব। এখানে উৎপাদিত সারের গায়ে যে সব সামগ্রীর নাম লেখা আছে, তার বিন্দুমাত্র বস্তার ভিতরে নেই। এটা দেশের জন্য, রাষ্ট্রের জন্য ভয়াবহ অবস্থা।
উল্লেখ্য, গত ২০২০ সালের ৪ জুন এই কারখানায় একই অভিযোগে ব্রাহ্মণবাড়িয়া আদালতের অভিযান পরিচালনা করেন নওগাঁ জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অনিক চৌধুরী। এ সময় র্যাবের কোম্পানি কমান্ডার মহাইমেনুর রশীদসহ সিপিসি-৩, র্যাব-৫ জয়পুরহাটের সদস্যরা অংশগ্রহণ করেন। ‘অক্সাড’ ব্র্যান্ডের কীটনাশক ও ভেজাল উৎপাদনের অনুমতি থাকলেও তারা সিরিয়াস, ম্যাজিক, কারেন্ট, দ্বীন গোল্ড হরমোন প্লাস, অল-ক্লিয়ার ইত্যাদি অননুমোদিত নকল ব্র্যান্ডের পাউডার ও কীটনাশক উৎপাদন করছিল। অভিযানে শাহীনুর আলমের ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছিল।

রোববার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ নভেম্বর ২০২৬
নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার অদূরে, মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে উত্তরগ্রাম ইউনিয়নের শিবগঞ্জ বাজারসংলগ্ন এলাকায় একটি বাড়ির ভেতর কারখানা। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ করেন মহিলা শ্রমিকরা। রাতের আঁধারে বাজারজাত করা হয় নকল পণ্য। বছরের পর বছর ধরে চলছে এসব অবৈধ কারবার। মাঝে মাঝে অভিযান চালায় প্রশাসন; কিন্তু বন্ধ হয় না নকল পণ্য উৎপাদন। এবার সেখানেই অভিযান চালান জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), এসআরবি, উপজেলা প্রশাসন ও মহাদেবপুর থানা পুলিশ।
নকল সার ও ভেজাল কীটনাশক তৈরির দায়ে সিলগালা করা হয় সেখানকার ‘এসএডি এগ্রোভেট’ নামের কারখানাটি। সেই সঙ্গে এক মালিককে এক মাসের কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানা এবং অপরজনের এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। জব্দ করা হয় ভেজাল সার ও কীটনাশক তৈরির বিপুল পরিমাণ সামগ্রী।
শনিবার (৭ নভেম্বর) বেলা ১১টায় অভিযানটি পরিচালনা করার সময় কারখানাটির মালিক কার্যক্রম চালাচ্ছিলেন শাহীনুর আলম পলাশ। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে শাহীনুর ক্ষমতার অপব্যবহার করে নকল পণ্য তৈরি করে সাধারণ চাষিদের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছে। নকল পণ্য বাজারজাত করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন তিনি। শাহীনুরের পিতা মোতাহের হোসেনের মৃত্যুর পর কারখানাটি শাহীনুর ও তার ছোট ভাই দেলোয়ার হোসেন পরিচালনা করে আসছে।
অভিযান পরিচালনাকারী মহাদেবপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট জান্নাতুন নাইম বিনতে আজিজ বলেন, নকল সার ও কীটনাশক উৎপাদনের অভিযোগে এসএডি এগ্রোভেটের মালিক শাহীনুরের অনুপস্থিতিতে তার স্ত্রী হাসনাত জাহান পাপিয়ার বিরুদ্ধে বালাইনাশক আইনে এক লাখ টাকা জরিমানা, একই নামে আরেকটি কারখানা চালানোর জন্য শাহীনুরের ভাই দেলোয়ার হোসেনকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও ১৫ দিনের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়।
অভিযানে অংশ নেওয়া মহাদেবপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেন, সেখানে থেকে হরমোন প্লাস ৬৫ কনটেইনার, অক্সাড কারেট ব্যাকটেরিয়া ১১৫০ প্যাকেট, ব্লুয়ানা ক্লাস ১ কেজি, দীন জীব সার ৪০ কেজি, খোলা ছোঁয়া, খোলা গোবর, বিভিন্ন চাকার গুঁড়া, মিশ্রণ মেশিন জব্দ করা হয়েছে। এখানে ছোঁয়া, গোবর, তামাকের গুঁড়া মিশিয়ে জীব সারের মিশ্রণের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অবৈধ। এর নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। ল্যাবে টেস্টে পাঠানো হবে। জীব সারের নিবন্ধন বাতিলের সুপারিশ করা হবে।
বালাইনাশক চাকার গুঁড়া বানাচ্ছে তেলাপোকা মারার জন্য; সেখানে তারা সাইপার মেথিন মেশাচ্ছে, যা অবৈধ। চাকার গুঁড়া পিবিপি রেজিস্ট্রেশনে রাখে, কিন্তু সাইপার মেথিন একটি কীটনাশক; এটা ইমপোর্ট করার অনুমতি নেই। বাড়ির মধ্যে এ ধরনের কীটনাশকের কারখানায় যারা কাজ করছে, তাদের চামড়া স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অচিরেই বড় রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। এই কারখানাটি পরিবেশের এবং ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র কীভাবে পেল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এসআরবি-৫-এর কর্মকর্তা বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এখানে অবৈধভাবে নকল সার ও কীটনাশক তৈরি করে আশপাশের জেলাগুলোতে সরবরাহ করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে। কৃষক ফসলের ফলন বাড়ানোর জন্য এসব প্রয়োগ করছেন; কিন্তু ফলন বাড়ানোর পরিবর্তে ফসলের ক্ষতি হচ্ছে। এই কৃষিপ্রধান দেশে আমরা যদি কৃষকদের প্রতারণা করি, তাহলে আমরা নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হব। এখানে উৎপাদিত সারের গায়ে যে সব সামগ্রীর নাম লেখা আছে, তার বিন্দুমাত্র বস্তার ভিতরে নেই। এটা দেশের জন্য, রাষ্ট্রের জন্য ভয়াবহ অবস্থা।
উল্লেখ্য, গত ২০২০ সালের ৪ জুন এই কারখানায় একই অভিযোগে ব্রাহ্মণবাড়িয়া আদালতের অভিযান পরিচালনা করেন নওগাঁ জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অনিক চৌধুরী। এ সময় র্যাবের কোম্পানি কমান্ডার মহাইমেনুর রশীদসহ সিপিসি-৩, র্যাব-৫ জয়পুরহাটের সদস্যরা অংশগ্রহণ করেন। ‘অক্সাড’ ব্র্যান্ডের কীটনাশক ও ভেজাল উৎপাদনের অনুমতি থাকলেও তারা সিরিয়াস, ম্যাজিক, কারেন্ট, দ্বীন গোল্ড হরমোন প্লাস, অল-ক্লিয়ার ইত্যাদি অননুমোদিত নকল ব্র্যান্ডের পাউডার ও কীটনাশক উৎপাদন করছিল। অভিযানে শাহীনুর আলমের ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছিল।

আপনার মতামত লিখুন