বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাস্কর্য কিংবা ম্যুরাল পাকিস্তান ছাড়া পৃথিবীর বহু রাষ্ট্রেই রয়েছে। পাকিস্তানে নেই, কারণ পাকিস্তান ১৯৬৭ সালে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গানসহ সমস্ত সৃষ্টিকর্ম আইন করে নিষিদ্ধ করেছিল। আজ বহু বছর পর বাংলাদেশে পাকিস্তান-প্রেমীরা নানা প্রোপাগান্ডা ও মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে রবীন্দ্রনাথের গায়ে সাম্প্রদায়িকতার কালি লেপন করে দেশে অশান্তি সৃষ্টি করতে চাইছে।
ঢাকার পর এবার খুলনায় রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে কালি লেপন করা হয়েছে। পাশে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা’ শিরোনামে দুটি লিফলেট লাগিয়ে দিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। যেখানে লেখা ছিল, ‘তিতুমীরের বাংলায়, মুসলিম ও পূর্ব বাংলা বিদ্বেষী রঠার ঠাঁই নাই/ভারত বন্দনার ঠাঁই নাই’।
এসব ভাস্কর্য তাদের বিশুদ্ধ সংস্কৃতিচর্চার অংশ আর বিশ্বকবির প্রতি সম্মান। এমনকি অনেক রাষ্ট্রের ডাকটিকিটেও রবীন্দ্রনাথের ছবি রয়েছে। তারা ভুল করে রবীন্দ্রনাথের ভাস্কর্য স্থাপন করেনি।
আমরা যদি হাজার বছর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে স্মরণ না করি, তাহলে রবীন্দ্রনাথের কিছুই আসবে-যাবে না। বরং স্মরণ না করলে আমাদেরই ক্ষতি হবে। কারণ তিনি বিশ্বনন্দিত। আর বিশ্বনন্দিত হওয়ার অন্তরালে যে বিষয়গুলো কাজ করেছে, তার প্রধান দিকটি ছিল তার অসাম্প্রদায়িকতা।
কবিগুরু তার রাজনৈতিক উপন্যাস ‘গোরা’-তে বলেছেন, ‘দেখুন পরেশবাবু, কাল রাত্রে আমি বিধাতার কাছে প্রার্থনা করেছিলুম যে, আজ প্রাতঃকালে আমি যেন নূতন জীবন লাভ করি। আজ আমি এমন শুচি হয়ে উঠেছি যে, চণ্ডালের ঘরেও আমার আর অপবিত্রতার ভয় রইল না। পরেশবাবু, আজ প্রাতঃকালে সম্পূর্ণ অনাবৃত চিত্তখানি নিয়ে একেবারে আমি ভারতবর্ষের কোলের উপরে ভূমিষ্ঠ হয়েছি—মাতৃক্রোড় যে কাকে বলে এতদিন পরে তা আমি পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছি।’
উপন্যাসের শেষাংশে তিনি লিখেছেন, ‘আমি হিন্দু নই। আজ আমি মুক্ত পরেশবাবু। আমি যে পতিত হব, ব্রত হব, সে ভয় আর আমার নেই, আমাকে আর পদে পদে মাটির দিকে চেয়ে শুচিতা বাঁচিয়ে চলতে হবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘পরেশবাবু আপনি আজ আমাকে সেই দেবতার মন্ত্রে দীক্ষা দিন যিনি হিন্দু, মুসলমান, খ্রীষ্টান, ব্রাহ্ম সকলেরই। যার মন্দিরের দ্বার কোন জাতীর কাছে, কোন ব্যক্তির কাছে কোন দিন অবরুদ্ধ হয় না, যিনি কেবলই হিন্দুর দেবতা নয়, গোটা ভারতবর্ষের দেবতা।’
আসলে কবি কোনো ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাসী ছিলেন না, তা কবি জসীম উদদীনের আলোচনা থেকে একটু অনুমান করা যায়। পল্লী কবি লিখেছেন, ‘আমি তখন এমএ পড়তে কলিকাতা এমসি এ হোস্টেলে ছিলাম। সেই সময়ে আমি প্রায়ই কবির সঙ্গে দেখা করতে যেতাম; আমাকে দেখলেই কবি সাম্প্রদায়িক ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করতেন। তিনি বলতেন, “কেন যে মানুষ একের অপরাধের জন্য অপরকে মারে! ও দেশের মুসলমানেরা হিন্দুদের মারল, তাই এ দেশের হিন্দুরা মুসলমানদের মেরে তার প্রতিবাদ করবে, এই বর্বর মনোবৃত্তির হাত থেকে দেশ কীভাবে উদ্ধার পাবে বলতে পার? দেখ, কী সামান্য ব্যাপার নিয়ে কলহ হয়। গরু কোরবানি নিয়ে মসজিদের সামনে বাজনা নিয়ে, একটা পশুকে রক্ষা করতে কত মানুষকে মানুষ হত্যা করছে।”’
আজ থেকে শত বছর পূর্বে এমন এক পরিস্থিতিভেদে তিনি লিখেছিলেন, ‘বাবা, আমার ধর্ম নেই, আমি যাকে ভালোবাসি সেই ভাগ্যবানই আমার ধর্ম। … তোমার মেজো ছেলে করিম, তাকে আমি মনের মধ্যে গ্রহণ করেছি—আমার ধর্মকর্ম ওরই সঙ্গে বাঁধা পড়েছে। তুমি মুসলমান করে নাও আমাকে, তাতে আমার আপত্তি হবে না—আমার না হয় দুই ধর্মই থাকল।’ এখানে ধর্ম ও সম্প্রদায়কে বিবেচনা না করে মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখেছেন রবীন্দ্রনাথ।
সকল মানুষের জন্য রবীন্দ্রনাথ ক্ষমা প্রার্থনা করে বলেছেন, ‘তোমরা কেউবা পূর্বাচলের যাত্রী সূর্যোদয়ের দিকেই তোমাদের মুখ, সেই দিকে যিনি তোমাদের অভ্যুদয়ের পথে আহবান করছেন তাকে তোমরা পূর্বমুখ করেই প্রণাম করো। আমরা পশ্চিম অস্তাচলের দিকে জোড়হাত করে উপাসনা করি, সেই দিক থেকে আমাদের আহবান আসছে, সেই আহবান ও সুন্দর গুরুগম্ভীর এবং শান্তিময় আনন্দরসে পরিপূর্ণ। কাউকে পরিত্যাগ করে থাকতে পারেন না।’ বিধায় তিনি অসাম্প্রদায়িক।
আর কবিগুরু আমাদের শিক্ষাবিরোধী ছিলেন, এমন ধারণা মোটেও সঠিক নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনেক আগে ১৯০৫ সালে পতিসরে এমনই স্কুল স্থাপন করে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার প্রসার ঘটিয়েছেন। ‘বিদ্যালয় স্থাপন করাই শেষ নয়, বরং হাতে-কলমে শিক্ষায় প্রবৃত্ত হন।’ পাশাপাশি তার কালীগ্রাম পরগণার গ্রামে গ্রামে অবৈতনিক পাঠশালা চালু করেন। ১৯০৫ সালে কৃষি সমবায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে গরিব প্রজাদের সহজ শর্তে ঋণ দিয়েছিলেন, তা বিরল ঘটনা। তাই একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, কবিগুরু গ্রামাঞ্চলের মানুষের প্রাথমিক শিক্ষার কাজ হাতে নিয়েছিলেন।
লেখক: রবীন্দ্রস্মৃতি সংগ্রাহক ও গবেষক

রোববার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ নভেম্বর ২০২৬
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাস্কর্য কিংবা ম্যুরাল পাকিস্তান ছাড়া পৃথিবীর বহু রাষ্ট্রেই রয়েছে। পাকিস্তানে নেই, কারণ পাকিস্তান ১৯৬৭ সালে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গানসহ সমস্ত সৃষ্টিকর্ম আইন করে নিষিদ্ধ করেছিল। আজ বহু বছর পর বাংলাদেশে পাকিস্তান-প্রেমীরা নানা প্রোপাগান্ডা ও মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে রবীন্দ্রনাথের গায়ে সাম্প্রদায়িকতার কালি লেপন করে দেশে অশান্তি সৃষ্টি করতে চাইছে।
ঢাকার পর এবার খুলনায় রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে কালি লেপন করা হয়েছে। পাশে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা’ শিরোনামে দুটি লিফলেট লাগিয়ে দিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। যেখানে লেখা ছিল, ‘তিতুমীরের বাংলায়, মুসলিম ও পূর্ব বাংলা বিদ্বেষী রঠার ঠাঁই নাই/ভারত বন্দনার ঠাঁই নাই’।
এসব ভাস্কর্য তাদের বিশুদ্ধ সংস্কৃতিচর্চার অংশ আর বিশ্বকবির প্রতি সম্মান। এমনকি অনেক রাষ্ট্রের ডাকটিকিটেও রবীন্দ্রনাথের ছবি রয়েছে। তারা ভুল করে রবীন্দ্রনাথের ভাস্কর্য স্থাপন করেনি।
আমরা যদি হাজার বছর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে স্মরণ না করি, তাহলে রবীন্দ্রনাথের কিছুই আসবে-যাবে না। বরং স্মরণ না করলে আমাদেরই ক্ষতি হবে। কারণ তিনি বিশ্বনন্দিত। আর বিশ্বনন্দিত হওয়ার অন্তরালে যে বিষয়গুলো কাজ করেছে, তার প্রধান দিকটি ছিল তার অসাম্প্রদায়িকতা।
কবিগুরু তার রাজনৈতিক উপন্যাস ‘গোরা’-তে বলেছেন, ‘দেখুন পরেশবাবু, কাল রাত্রে আমি বিধাতার কাছে প্রার্থনা করেছিলুম যে, আজ প্রাতঃকালে আমি যেন নূতন জীবন লাভ করি। আজ আমি এমন শুচি হয়ে উঠেছি যে, চণ্ডালের ঘরেও আমার আর অপবিত্রতার ভয় রইল না। পরেশবাবু, আজ প্রাতঃকালে সম্পূর্ণ অনাবৃত চিত্তখানি নিয়ে একেবারে আমি ভারতবর্ষের কোলের উপরে ভূমিষ্ঠ হয়েছি—মাতৃক্রোড় যে কাকে বলে এতদিন পরে তা আমি পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছি।’
উপন্যাসের শেষাংশে তিনি লিখেছেন, ‘আমি হিন্দু নই। আজ আমি মুক্ত পরেশবাবু। আমি যে পতিত হব, ব্রত হব, সে ভয় আর আমার নেই, আমাকে আর পদে পদে মাটির দিকে চেয়ে শুচিতা বাঁচিয়ে চলতে হবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘পরেশবাবু আপনি আজ আমাকে সেই দেবতার মন্ত্রে দীক্ষা দিন যিনি হিন্দু, মুসলমান, খ্রীষ্টান, ব্রাহ্ম সকলেরই। যার মন্দিরের দ্বার কোন জাতীর কাছে, কোন ব্যক্তির কাছে কোন দিন অবরুদ্ধ হয় না, যিনি কেবলই হিন্দুর দেবতা নয়, গোটা ভারতবর্ষের দেবতা।’
আসলে কবি কোনো ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাসী ছিলেন না, তা কবি জসীম উদদীনের আলোচনা থেকে একটু অনুমান করা যায়। পল্লী কবি লিখেছেন, ‘আমি তখন এমএ পড়তে কলিকাতা এমসি এ হোস্টেলে ছিলাম। সেই সময়ে আমি প্রায়ই কবির সঙ্গে দেখা করতে যেতাম; আমাকে দেখলেই কবি সাম্প্রদায়িক ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করতেন। তিনি বলতেন, “কেন যে মানুষ একের অপরাধের জন্য অপরকে মারে! ও দেশের মুসলমানেরা হিন্দুদের মারল, তাই এ দেশের হিন্দুরা মুসলমানদের মেরে তার প্রতিবাদ করবে, এই বর্বর মনোবৃত্তির হাত থেকে দেশ কীভাবে উদ্ধার পাবে বলতে পার? দেখ, কী সামান্য ব্যাপার নিয়ে কলহ হয়। গরু কোরবানি নিয়ে মসজিদের সামনে বাজনা নিয়ে, একটা পশুকে রক্ষা করতে কত মানুষকে মানুষ হত্যা করছে।”’
আজ থেকে শত বছর পূর্বে এমন এক পরিস্থিতিভেদে তিনি লিখেছিলেন, ‘বাবা, আমার ধর্ম নেই, আমি যাকে ভালোবাসি সেই ভাগ্যবানই আমার ধর্ম। … তোমার মেজো ছেলে করিম, তাকে আমি মনের মধ্যে গ্রহণ করেছি—আমার ধর্মকর্ম ওরই সঙ্গে বাঁধা পড়েছে। তুমি মুসলমান করে নাও আমাকে, তাতে আমার আপত্তি হবে না—আমার না হয় দুই ধর্মই থাকল।’ এখানে ধর্ম ও সম্প্রদায়কে বিবেচনা না করে মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখেছেন রবীন্দ্রনাথ।
সকল মানুষের জন্য রবীন্দ্রনাথ ক্ষমা প্রার্থনা করে বলেছেন, ‘তোমরা কেউবা পূর্বাচলের যাত্রী সূর্যোদয়ের দিকেই তোমাদের মুখ, সেই দিকে যিনি তোমাদের অভ্যুদয়ের পথে আহবান করছেন তাকে তোমরা পূর্বমুখ করেই প্রণাম করো। আমরা পশ্চিম অস্তাচলের দিকে জোড়হাত করে উপাসনা করি, সেই দিক থেকে আমাদের আহবান আসছে, সেই আহবান ও সুন্দর গুরুগম্ভীর এবং শান্তিময় আনন্দরসে পরিপূর্ণ। কাউকে পরিত্যাগ করে থাকতে পারেন না।’ বিধায় তিনি অসাম্প্রদায়িক।
আর কবিগুরু আমাদের শিক্ষাবিরোধী ছিলেন, এমন ধারণা মোটেও সঠিক নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনেক আগে ১৯০৫ সালে পতিসরে এমনই স্কুল স্থাপন করে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার প্রসার ঘটিয়েছেন। ‘বিদ্যালয় স্থাপন করাই শেষ নয়, বরং হাতে-কলমে শিক্ষায় প্রবৃত্ত হন।’ পাশাপাশি তার কালীগ্রাম পরগণার গ্রামে গ্রামে অবৈতনিক পাঠশালা চালু করেন। ১৯০৫ সালে কৃষি সমবায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে গরিব প্রজাদের সহজ শর্তে ঋণ দিয়েছিলেন, তা বিরল ঘটনা। তাই একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, কবিগুরু গ্রামাঞ্চলের মানুষের প্রাথমিক শিক্ষার কাজ হাতে নিয়েছিলেন।
লেখক: রবীন্দ্রস্মৃতি সংগ্রাহক ও গবেষক

আপনার মতামত লিখুন