সংবাদ

কৃষিজমি ও বন রক্ষায় কৃষিবনায়নের সম্ভাবনা


আবুল বাশার মিরাজ
আবুল বাশার মিরাজ
প্রকাশ: ৮ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৩২ এএম

কৃষিজমি ও বন রক্ষায় কৃষিবনায়নের সম্ভাবনা
দেশে পরিকল্পিতভাবে গাছ ও ফসলের সমন্বিত চাষের ইতিহাস প্রায় দেড় শতাব্দীর

প্রায় ১৮ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ। অথচ এই বিপুল জনগোষ্ঠীর বসবাস মাত্র ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ভূখণ্ডে। ফলে দেশের জমির ওপর চাপও অসীম। একই জমিতে বারবার ফসল ফলিয়ে মানুষের খাদ্যের চাহিদা মেটাতে হচ্ছে। দেশের প্রায় ৯ দশমিক ৯ মিলিয়ন হেক্টর নিট আবাদি জমিতে গড়ে ফসল নিবিড়তা এখন প্রায় ১৯৮ শতাংশ। অর্থাৎ অধিকাংশ জমিতে বছরে দুইবার, কোথাও কোথাও তিনবার পর্যন্ত ফসল ফলানো হচ্ছে।

কিন্তু যে জমি আমাদের খাদ্যের জোগান দেয়, সেই জমিই ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। ১৯৬০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দেশের আবাদযোগ্য ও কৃষিজমির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একই সঙ্গে সংকুচিত হয়েছে বনভূমিও। শুধু ২০০২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ প্রায় ৮ দশমিক ৮৫ হাজার হেক্টর আর্দ্র প্রাথমিক বন হারিয়েছে। ২০০০ সালের তুলনায় দেশের মোট বৃক্ষ আচ্ছাদনও কমেছে প্রায় ২ লাখ ৬২ হাজার হেক্টর বা ১৩ শতাংশ। একদিকে কৃষিজমি কমছে, অন্যদিকে বনভূমি হারাচ্ছে দেশ। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এবং প্রকৃতির ওপর বাড়তে থাকা চাপের এই সময়ে পুরোনো একটি কৃষিপদ্ধতি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। সেটি হলো কৃষিবনায়ন বা এগ্রোফরেস্ট্রি।

কৃষিবনায়নের মূল ধারণাটি সহজ। একই জমিতে পরিকল্পিতভাবে গাছের সঙ্গে ফসল চাষ করা এবং প্রয়োজনে এর সঙ্গে গবাদিপশু পালন যুক্ত করা। এতে কৃষককে গাছ ও ফসলের মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে হয় না। একই জমি থেকে পাওয়া যায় খাদ্য, কাঠ, ফল, পশুখাদ্য ও আয়। একই সঙ্গে বাড়ে পরিবেশের সহনশীলতাও।

বাংলাদেশে কৃষিবনায়ন নতুন কোনো ধারণা নয়। এ দেশে পরিকল্পিতভাবে গাছ ও ফসলের সমন্বিত চাষের ইতিহাস প্রায় দেড় শতাব্দীর। ১৮৭১ সালে মিয়ানমার থেকে আসা টাউংইয়া পদ্ধতি কাপ্তাই পাহাড়ে প্রথম প্রয়োগ করা হয়। এই পদ্ধতিতে সেগুনের তরুণ গাছের সারির মাঝখানে কৃষকেরা ধান ও শাকসবজি চাষ করতেন। এতে একদিকে বন পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হতো, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের খাদ্যের চাহিদাও পূরণ হতো। স্বল্প মেয়াদে খাদ্য এবং দীর্ঘ মেয়াদে কাঠ—একই জমি থেকে এই দুই ধরনের সুফল পাওয়ার ধারণাটিই আজকের কৃষিবনায়নের অন্যতম ভিত্তি। এরপর দেশে কৃষিবনায়ন নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রামের বেতাগী-পোমরা এলাকায় ১৯৭৯-৮০ সালে পরিচালিত সামাজিক বনায়ন কর্মসূচিকে দেশের প্রথম আনুষ্ঠানিক জনসম্পৃক্ত বন ব্যবস্থাপনা উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নব্বইয়ের দশক থেকে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর সহায়তায় উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী, গ্রাম ও খামার বনায়ন এবং বসতবাড়িকেন্দ্রিক বনায়ন কর্মসূচি সম্প্রসারিত হয়।

পরবর্তী সময়ে বাণিজ্যিক নার্সারি গড়ে তোলা এবং মানসম্মত চারা উৎপাদন ও সরবরাহের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সাম্প্রতিক সময়ে চরাঞ্চলভিত্তিক কৃষিবনায়ন এবং পুষ্টি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও সহনশীলতাভিত্তিক কৃষি ও গ্রামীণ রূপান্তর কর্মসূচির আওতায় কৃষিবনায়ন প্রকল্পের মতো উদ্যোগ বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকায় জলবায়ু সহনশীল কৃষিবনায়ন পদ্ধতি সম্প্রসারণে কাজ করছে।

বাংলাদেশের কৃষিবনায়নের সবচেয়ে পরিচিত রূপ হলো বসতবাড়িকেন্দ্রিক কৃষিবনায়ন। গ্রামীণ বাংলাদেশের অধিকাংশ বসতবাড়িই এক অর্থে ছোট্ট একটি কৃষিবন। বাড়ির আঙিনায় ফলের গাছ, কাঠের গাছ, বাঁশ, শাকসবজি ও বিভিন্ন ফসল একসঙ্গে বেড়ে ওঠে। ধারণা করা হয়, দেশের প্রায় ৮৫ শতাংশ গ্রামীণ পরিবার কোনো না কোনোভাবে এ ধরনের ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। দেশের জ্বালানি কাঠের ৮০ শতাংশের বেশি এবং বাঁশের প্রায় ৯০ শতাংশ আসে এই ব্যবস্থা থেকে।

সিলেটের কমলগঞ্জ উপজেলায় পরিচালিত একটি গবেষণায় বসতবাড়িকেন্দ্রিক কৃষিবনায়নের ২৯টি ভিন্ন বিন্যাস পাওয়া গেছে। কোথাও আম, কলা, মিষ্টিকুমড়া ও ফুলকপি একই জায়গায় চাষ হচ্ছে। আবার কোথাও সুপারি, আম, কলা ও ফরাসি শিমের মতো ফসল বিভিন্ন উচ্চতায় স্তর তৈরি করে বেড়ে উঠছে। একই জমিতে গাছের ছায়া, ঝোপঝাড় ও ভূমিস্তরের ফসল মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে একটি ছোট্ট বহুতল উৎপাদনব্যবস্থা।

বসতবাড়ির বাইরেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষিবনায়নের বৈচিত্র‍্য রয়েছে। ধান, পাট বা হলুদের সঙ্গে আম চাষ, বনভূমিতে টাউংইয়া পদ্ধতি, পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জুমচাষ, উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী, রাবারভিত্তিক কৃষিবনায়ন এবং চরাঞ্চলে গাছ ও ফসলের সমন্বিত চাষ এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। মধুপুরের শালবন এলাকায় পরিচালিত গবেষণায় লিচু, আনারস, আদা, পেঁপে ও কলার সমন্বিত কৃষিবনায়ন পদ্ধতি লাভজনক হওয়ার পাশাপাশি মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতেও ভালো ফল দিয়েছে। অর্থাৎ কৃষিবনায়ন শুধু উৎপাদন বাড়ায় না, জমির স্বাস্থ্য রক্ষাতেও ভূমিকা রাখতে পারে।

দেশের উত্তরাঞ্চল ও পার্বত্য এলাকায় পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বহুতল কৃষিবনায়ন ব্যবস্থায় একই জমির ব্যবহার তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর হয়। দিনাজপুরের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বসতবাড়ি ও কৃষিজমিভিত্তিক কৃষিবনায়ন থেকে তুলনামূলকভাবে দ্রুত ও কম খরচে আয় করা সম্ভব। অন্যদিকে, বাগানভিত্তিক কৃষিবনায়ন দীর্ঘ মেয়াদে বেশি আয় নিশ্চিত করতে পারে।

বাংলাদেশে বনভূমির পরিমাণও উদ্বেগজনকভাবে কম। বর্তমানে দেশের মোট আয়তনের মাত্র ১৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ বনভূমি। মাথাপিছু বনভূমির পরিমাণ মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ১৫ হেক্টর, যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অত্যন্ত কম। তাই শুধু বন সংরক্ষণ করলেই হবে না, কৃষিজমি ও মানুষের বসতভিটাসহ অন্যান্য ভূমি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও গাছের উপস্থিতি বাড়াতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটেও কৃষিবনায়নের গুরুত্ব বাড়ছে। বাংলাদেশের হালনাগাদ জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি) অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটি গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ উল্লেখযোগ্য হারে কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে কৃষিবনায়ন ও বন খাত কার্বন শোষণ এবং নিঃসরণ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। কৃষিবনায়নের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই। এটি শুধু গাছ লাগানোর কর্মসূচি নয়। এর মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন, কৃষকের আয়, পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাকে একই ব্যবস্থার মধ্যে আনা সম্ভব। অন্য অনেক পরিবেশগত উদ্যোগ কৃষকের কাছে বাড়তি দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু কৃষিবনায়ন কৃষকের অর্থনৈতিক প্রয়োজনের সঙ্গে পরিবেশের প্রয়োজনকে যুক্ত করে।

তবে সম্ভাবনা থাকলেই সাফল্য নিশ্চিত হয় না। কৃষিবনায়নের বিস্তারে এখনো বেশ কিছু বড় বাধা রয়েছে। বিশেষ করে চর ও পার্বত্য অঞ্চলে জমি ও গাছের মালিকানা নিয়ে অস্পষ্টতা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করে। কাঠ ও অন্যান্য বনজ পণ্যের বাজারব্যবস্থাও দুর্বল। অনেক ক্ষেত্রে মানসম্মত চারা পাওয়া যায় না। নারী কৃষকদের জমি, ঋণ ও প্রশিক্ষণের সুযোগও সীমিত। সবচেয়ে বড় কথা, কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রমে কৃষিবনায়ন এখনো প্রান্তিক একটি বিষয় হিসেবেই রয়ে গেছে।

বাংলাদেশের হাতে অবশ্য নীতিগত কিছু ভিত্তি রয়েছে। জাতীয় বন নীতিতে ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশের বৃক্ষ আচ্ছাদন ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। জাতীয় কৃষিনীতি আন্তঃফসল চাষকে উৎসাহিত করেছে। বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০-তেও দীর্ঘমেয়াদি ভূমি ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার দিকনির্দেশনা রয়েছে। তবে এসব নীতি ও উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। কৃষিবনায়নের জন্য ভূমি ও বৃক্ষের মালিকানা, মানসম্মত চারা উৎপাদন, বাজারব্যবস্থা, কৃষক প্রশিক্ষণ এবং জলবায়ু অর্থায়নকে একই কাঠামোর আওতায় আনা প্রয়োজন। এ জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় কৃষিবনায়ন নীতি প্রণয়ন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশ এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে কৃষিজমি কমছে, বনভূমি সংকুচিত হচ্ছে, মানুষের খাদ্যের চাহিদা বাড়ছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিও দিন দিন তীব্র হচ্ছে। এই বাস্তবতায় কৃষিবনায়ন হয়তো সব সমস্যার একমাত্র সমাধান নয়। তবে একই সঙ্গে একাধিক সমস্যা মোকাবিলায় এটি একটি কার্যকর পথ হতে পারে। একটি জমিতে যদি একই সঙ্গে খাদ্য, ফল, কাঠ, আয় ও পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়, তবে সেই সম্ভাবনাকে আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি কৃষিবনায়নকে বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবে, নাকি এটিকে দেশের ভবিষ্যৎ ভূমি ও কৃষি ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় কৌশল হিসেবে গ্রহণ করবে?

[লেখক: সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার, সার্ক কৃষি কেন্দ্র]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬


কৃষিজমি ও বন রক্ষায় কৃষিবনায়নের সম্ভাবনা

প্রকাশের তারিখ : ০৮ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

প্রায় ১৮ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ। অথচ এই বিপুল জনগোষ্ঠীর বসবাস মাত্র ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ভূখণ্ডে। ফলে দেশের জমির ওপর চাপও অসীম। একই জমিতে বারবার ফসল ফলিয়ে মানুষের খাদ্যের চাহিদা মেটাতে হচ্ছে। দেশের প্রায় ৯ দশমিক ৯ মিলিয়ন হেক্টর নিট আবাদি জমিতে গড়ে ফসল নিবিড়তা এখন প্রায় ১৯৮ শতাংশ। অর্থাৎ অধিকাংশ জমিতে বছরে দুইবার, কোথাও কোথাও তিনবার পর্যন্ত ফসল ফলানো হচ্ছে।

কিন্তু যে জমি আমাদের খাদ্যের জোগান দেয়, সেই জমিই ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। ১৯৬০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দেশের আবাদযোগ্য ও কৃষিজমির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একই সঙ্গে সংকুচিত হয়েছে বনভূমিও। শুধু ২০০২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ প্রায় ৮ দশমিক ৮৫ হাজার হেক্টর আর্দ্র প্রাথমিক বন হারিয়েছে। ২০০০ সালের তুলনায় দেশের মোট বৃক্ষ আচ্ছাদনও কমেছে প্রায় ২ লাখ ৬২ হাজার হেক্টর বা ১৩ শতাংশ। একদিকে কৃষিজমি কমছে, অন্যদিকে বনভূমি হারাচ্ছে দেশ। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এবং প্রকৃতির ওপর বাড়তে থাকা চাপের এই সময়ে পুরোনো একটি কৃষিপদ্ধতি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। সেটি হলো কৃষিবনায়ন বা এগ্রোফরেস্ট্রি।

কৃষিবনায়নের মূল ধারণাটি সহজ। একই জমিতে পরিকল্পিতভাবে গাছের সঙ্গে ফসল চাষ করা এবং প্রয়োজনে এর সঙ্গে গবাদিপশু পালন যুক্ত করা। এতে কৃষককে গাছ ও ফসলের মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে হয় না। একই জমি থেকে পাওয়া যায় খাদ্য, কাঠ, ফল, পশুখাদ্য ও আয়। একই সঙ্গে বাড়ে পরিবেশের সহনশীলতাও।

বাংলাদেশে কৃষিবনায়ন নতুন কোনো ধারণা নয়। এ দেশে পরিকল্পিতভাবে গাছ ও ফসলের সমন্বিত চাষের ইতিহাস প্রায় দেড় শতাব্দীর। ১৮৭১ সালে মিয়ানমার থেকে আসা টাউংইয়া পদ্ধতি কাপ্তাই পাহাড়ে প্রথম প্রয়োগ করা হয়। এই পদ্ধতিতে সেগুনের তরুণ গাছের সারির মাঝখানে কৃষকেরা ধান ও শাকসবজি চাষ করতেন। এতে একদিকে বন পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হতো, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের খাদ্যের চাহিদাও পূরণ হতো। স্বল্প মেয়াদে খাদ্য এবং দীর্ঘ মেয়াদে কাঠ—একই জমি থেকে এই দুই ধরনের সুফল পাওয়ার ধারণাটিই আজকের কৃষিবনায়নের অন্যতম ভিত্তি। এরপর দেশে কৃষিবনায়ন নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রামের বেতাগী-পোমরা এলাকায় ১৯৭৯-৮০ সালে পরিচালিত সামাজিক বনায়ন কর্মসূচিকে দেশের প্রথম আনুষ্ঠানিক জনসম্পৃক্ত বন ব্যবস্থাপনা উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নব্বইয়ের দশক থেকে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর সহায়তায় উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী, গ্রাম ও খামার বনায়ন এবং বসতবাড়িকেন্দ্রিক বনায়ন কর্মসূচি সম্প্রসারিত হয়।

পরবর্তী সময়ে বাণিজ্যিক নার্সারি গড়ে তোলা এবং মানসম্মত চারা উৎপাদন ও সরবরাহের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সাম্প্রতিক সময়ে চরাঞ্চলভিত্তিক কৃষিবনায়ন এবং পুষ্টি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও সহনশীলতাভিত্তিক কৃষি ও গ্রামীণ রূপান্তর কর্মসূচির আওতায় কৃষিবনায়ন প্রকল্পের মতো উদ্যোগ বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকায় জলবায়ু সহনশীল কৃষিবনায়ন পদ্ধতি সম্প্রসারণে কাজ করছে।

বাংলাদেশের কৃষিবনায়নের সবচেয়ে পরিচিত রূপ হলো বসতবাড়িকেন্দ্রিক কৃষিবনায়ন। গ্রামীণ বাংলাদেশের অধিকাংশ বসতবাড়িই এক অর্থে ছোট্ট একটি কৃষিবন। বাড়ির আঙিনায় ফলের গাছ, কাঠের গাছ, বাঁশ, শাকসবজি ও বিভিন্ন ফসল একসঙ্গে বেড়ে ওঠে। ধারণা করা হয়, দেশের প্রায় ৮৫ শতাংশ গ্রামীণ পরিবার কোনো না কোনোভাবে এ ধরনের ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। দেশের জ্বালানি কাঠের ৮০ শতাংশের বেশি এবং বাঁশের প্রায় ৯০ শতাংশ আসে এই ব্যবস্থা থেকে।

সিলেটের কমলগঞ্জ উপজেলায় পরিচালিত একটি গবেষণায় বসতবাড়িকেন্দ্রিক কৃষিবনায়নের ২৯টি ভিন্ন বিন্যাস পাওয়া গেছে। কোথাও আম, কলা, মিষ্টিকুমড়া ও ফুলকপি একই জায়গায় চাষ হচ্ছে। আবার কোথাও সুপারি, আম, কলা ও ফরাসি শিমের মতো ফসল বিভিন্ন উচ্চতায় স্তর তৈরি করে বেড়ে উঠছে। একই জমিতে গাছের ছায়া, ঝোপঝাড় ও ভূমিস্তরের ফসল মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে একটি ছোট্ট বহুতল উৎপাদনব্যবস্থা।

বসতবাড়ির বাইরেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষিবনায়নের বৈচিত্র‍্য রয়েছে। ধান, পাট বা হলুদের সঙ্গে আম চাষ, বনভূমিতে টাউংইয়া পদ্ধতি, পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জুমচাষ, উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী, রাবারভিত্তিক কৃষিবনায়ন এবং চরাঞ্চলে গাছ ও ফসলের সমন্বিত চাষ এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। মধুপুরের শালবন এলাকায় পরিচালিত গবেষণায় লিচু, আনারস, আদা, পেঁপে ও কলার সমন্বিত কৃষিবনায়ন পদ্ধতি লাভজনক হওয়ার পাশাপাশি মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতেও ভালো ফল দিয়েছে। অর্থাৎ কৃষিবনায়ন শুধু উৎপাদন বাড়ায় না, জমির স্বাস্থ্য রক্ষাতেও ভূমিকা রাখতে পারে।

দেশের উত্তরাঞ্চল ও পার্বত্য এলাকায় পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বহুতল কৃষিবনায়ন ব্যবস্থায় একই জমির ব্যবহার তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর হয়। দিনাজপুরের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বসতবাড়ি ও কৃষিজমিভিত্তিক কৃষিবনায়ন থেকে তুলনামূলকভাবে দ্রুত ও কম খরচে আয় করা সম্ভব। অন্যদিকে, বাগানভিত্তিক কৃষিবনায়ন দীর্ঘ মেয়াদে বেশি আয় নিশ্চিত করতে পারে।

বাংলাদেশে বনভূমির পরিমাণও উদ্বেগজনকভাবে কম। বর্তমানে দেশের মোট আয়তনের মাত্র ১৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ বনভূমি। মাথাপিছু বনভূমির পরিমাণ মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ১৫ হেক্টর, যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অত্যন্ত কম। তাই শুধু বন সংরক্ষণ করলেই হবে না, কৃষিজমি ও মানুষের বসতভিটাসহ অন্যান্য ভূমি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও গাছের উপস্থিতি বাড়াতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটেও কৃষিবনায়নের গুরুত্ব বাড়ছে। বাংলাদেশের হালনাগাদ জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি) অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটি গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ উল্লেখযোগ্য হারে কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে কৃষিবনায়ন ও বন খাত কার্বন শোষণ এবং নিঃসরণ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। কৃষিবনায়নের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই। এটি শুধু গাছ লাগানোর কর্মসূচি নয়। এর মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন, কৃষকের আয়, পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাকে একই ব্যবস্থার মধ্যে আনা সম্ভব। অন্য অনেক পরিবেশগত উদ্যোগ কৃষকের কাছে বাড়তি দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু কৃষিবনায়ন কৃষকের অর্থনৈতিক প্রয়োজনের সঙ্গে পরিবেশের প্রয়োজনকে যুক্ত করে।

তবে সম্ভাবনা থাকলেই সাফল্য নিশ্চিত হয় না। কৃষিবনায়নের বিস্তারে এখনো বেশ কিছু বড় বাধা রয়েছে। বিশেষ করে চর ও পার্বত্য অঞ্চলে জমি ও গাছের মালিকানা নিয়ে অস্পষ্টতা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করে। কাঠ ও অন্যান্য বনজ পণ্যের বাজারব্যবস্থাও দুর্বল। অনেক ক্ষেত্রে মানসম্মত চারা পাওয়া যায় না। নারী কৃষকদের জমি, ঋণ ও প্রশিক্ষণের সুযোগও সীমিত। সবচেয়ে বড় কথা, কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রমে কৃষিবনায়ন এখনো প্রান্তিক একটি বিষয় হিসেবেই রয়ে গেছে।

বাংলাদেশের হাতে অবশ্য নীতিগত কিছু ভিত্তি রয়েছে। জাতীয় বন নীতিতে ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশের বৃক্ষ আচ্ছাদন ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। জাতীয় কৃষিনীতি আন্তঃফসল চাষকে উৎসাহিত করেছে। বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০-তেও দীর্ঘমেয়াদি ভূমি ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার দিকনির্দেশনা রয়েছে। তবে এসব নীতি ও উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। কৃষিবনায়নের জন্য ভূমি ও বৃক্ষের মালিকানা, মানসম্মত চারা উৎপাদন, বাজারব্যবস্থা, কৃষক প্রশিক্ষণ এবং জলবায়ু অর্থায়নকে একই কাঠামোর আওতায় আনা প্রয়োজন। এ জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় কৃষিবনায়ন নীতি প্রণয়ন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশ এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে কৃষিজমি কমছে, বনভূমি সংকুচিত হচ্ছে, মানুষের খাদ্যের চাহিদা বাড়ছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিও দিন দিন তীব্র হচ্ছে। এই বাস্তবতায় কৃষিবনায়ন হয়তো সব সমস্যার একমাত্র সমাধান নয়। তবে একই সঙ্গে একাধিক সমস্যা মোকাবিলায় এটি একটি কার্যকর পথ হতে পারে। একটি জমিতে যদি একই সঙ্গে খাদ্য, ফল, কাঠ, আয় ও পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়, তবে সেই সম্ভাবনাকে আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি কৃষিবনায়নকে বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবে, নাকি এটিকে দেশের ভবিষ্যৎ ভূমি ও কৃষি ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় কৌশল হিসেবে গ্রহণ করবে?

[লেখক: সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার, সার্ক কৃষি কেন্দ্র]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত