দুর্গোৎসবের রেশ কাটতে না কাটতেই বাংলার উৎসবের মঞ্চে এবার মহাসমারোহে আবির্ভাব মা শ্যামার। দীপাবলির আলো, চোখধাঁধানো আলোকসজ্জা, বিশালাকার প্রতিমা এবং অভিনব শিল্পভাবনার মণ্ডপ, সব মিলিয়ে রবিবার সকাল থেকেই উৎসবের রঙে রঙিন পশ্চিমবঙ্গ। কলকাতা থেকে বারাসত, নৈহাটি, মধ্যমগ্রাম, দমদম, আসানসোল, দুর্গাপুর, সর্বত্রই কালীপুজোকে কেন্দ্র করে মানুষের উচ্ছ্বাস তুঙ্গে।
এবারের শ্যামাপুজোর সবচেয়ে বড় চমক পরিসংখ্যানেই। রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দা শাখার হিসাব অনুযায়ী, কলকাতা পুলিশ কমিশনারেট এলাকা বাদ দিয়েই পশ্চিমবঙ্গে এবার কালীপুজোর সংখ্যা ৭২ হাজার ৬০৯। গত দুর্গাপুজোয় এই সংখ্যা ছিল ৬৬ হাজার ৯১৯। অর্থাৎ পুজোর সংখ্যার নিরিখে এবার দুর্গাপুজোকেও ছাপিয়ে গিয়েছে শ্যামাপুজো। নতুন করে ৬৪১টি পুজো কমিটি এবার আত্মপ্রকাশ করেছে। রাজ্যে বড় বাজেটের কালীপুজোর সংখ্যা ১ হাজার ৫৭৫। পূর্ব মেদিনীপুর, বীরভূম ও পশ্চিম মেদিনীপুরে বড় বাজেটের পুজোর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।
উত্তর ২৪ পরগনার বারাসত এবারও কালীপুজোর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। বিশেষ করে শিমুলতলার শ্রীকৃষ্ণপুর সাংস্কৃতিক চক্রের সুবর্ণজয়ন্তী বর্ষের আয়োজন ঘিরে তৈরি হয়েছে বাড়তি উন্মাদনা। শিল্পী ভবতোষ সুতারের পরিকল্পনায় ‘অতল অনন্তম’ থিমে জল, আলো ও শব্দের অসাধারণ মেলবন্ধন ঘটানো হয়েছে। জলের ফোঁটার ছন্দের সঙ্গে বিশেষ প্রযুক্তিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মহাদেবের তাণ্ডব নৃত্য। প্রায় ২৩ ফুটের বিশাল মাতৃপ্রতিমা এবং টাকি রোডজুড়ে কয়েক কিলোমিটার চন্দননগরের আলোকসজ্জা দর্শনার্থীদের বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। এই পুজোর উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। উপস্থিত ছিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। বারাসতের পুজোর ইতিহাসে এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানও বিশেষ তাৎপর্য পেয়েছে।
অন্যদিকে, নৈহাটির আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ঐতিহ্যবাহী বড়মা। ১০৩ বছরের পুজোয় এবার নতুন সাজে ধরা দিয়েছেন দেবী। সোনা ও রুপো মিলিয়ে প্রায় ১১০ কেজি অলংকারে সাজানো হয়েছে বিশালাকার প্রতিমাকে। কপালে হিরে, চুনি ও পান্না বসানো বিশেষ টিপ, নতুন সীতাহার, সোনার মুকুট এবং রুপোর অলংকারে অনন্য রূপে সেজেছেন বড়মা। রবিবার সকাল থেকেই অরবিন্দ রোডে ভক্তদের ঢল। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসছেন মানত পূরণ করতে, কেউ দণ্ডি কাটছেন, কেউ আবার দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করছেন একবার মায়ের দর্শন পাওয়ার আশায়।
কলকাতা ও শহরতলির অন্যান্য পুজোতেও থিমের বৈচিত্র্য চোখে পড়ার মতো। কোথাও বাংলার লোকসংস্কৃতি, কোথাও জীবনের প্রবাহ, কোথাও মানুষের দৈনন্দিন জীবনসংগ্রাম, আবার কোথাও ঐতিহ্যবাহী মন্দির স্থাপত্যকে তুলে ধরা হয়েছে। বরিশা শান্তি সংঘের ‘যাপন প্রবাহ’, গিরিশ পার্কের ফাইভ স্টার স্পোর্টিং ক্লাবের ‘অগ্রদূত’, বাঘাযতীনের মৈনাক ক্লাবের ‘লৌকিক’, বিজয়গড় ৬ পল্লির ‘রূপান্তর’ এবং বড়নগরের নবোদয়ের দক্ষিণেশ্বর মন্দির-অনুপ্রাণিত মণ্ডপ বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করেছে।
এবারের পুজোয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানও বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে। মুখ্যমন্ত্রী, রাজ্যের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও বিনোদন জগতের পরিচিত ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতিতে একাধিক বড় পুজোর উদ্বোধন ঘিরে তৈরি হয়েছে উৎসাহ। তারকাদের উপস্থিতি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং বর্ণাঢ্য আয়োজন দর্শনার্থীদের আকর্ষণ আরও বাড়িয়েছে।
তবে এবারের উৎসবের পাশাপাশি নিরাপত্তাও বড় বিষয়। কলকাতার চোরবাগানের মর্মান্তিক পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনার পর বারাসত, নৈহাটি-সহ বিভিন্ন বড় পুজো এলাকায় প্রবেশ ও বেরনোর পৃথক পথ, সিসিটিভি নজরদারি, পুলিশ মোতায়েন এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের তরফে দর্শনার্থীদেরও সতর্কতা মেনে চলার আবেদন জানানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে এবারের শ্যামাপুজো শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বাংলার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক জীবনেরও এক বড় ছবি। কোথাও কয়েক দশকের ঐতিহ্য, কোথাও শিল্পীর কল্পনার নতুন প্রকাশ, কোথাও আবার ভক্তির আবেগে তৈরি হয়েছে জনসমুদ্র। দুর্গাপুজোর পর বাংলার উৎসবের দ্বিতীয় বৃহত্তম মঞ্চে এবার সংখ্যার নিরিখেও নিজের শক্তি প্রমাণ করল শ্যামাপুজো। আলো, আনন্দ আর মাতৃবন্দনায় আপাতত একটাই ছবি—দীপাবলির আলোয় জেগে রয়েছে বাংলা, ঘরে ঘরে আরাধিত হচ্ছেন মা শ্যামা।

রোববার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ নভেম্বর ২০২৬
দুর্গোৎসবের রেশ কাটতে না কাটতেই বাংলার উৎসবের মঞ্চে এবার মহাসমারোহে আবির্ভাব মা শ্যামার। দীপাবলির আলো, চোখধাঁধানো আলোকসজ্জা, বিশালাকার প্রতিমা এবং অভিনব শিল্পভাবনার মণ্ডপ, সব মিলিয়ে রবিবার সকাল থেকেই উৎসবের রঙে রঙিন পশ্চিমবঙ্গ। কলকাতা থেকে বারাসত, নৈহাটি, মধ্যমগ্রাম, দমদম, আসানসোল, দুর্গাপুর, সর্বত্রই কালীপুজোকে কেন্দ্র করে মানুষের উচ্ছ্বাস তুঙ্গে।
এবারের শ্যামাপুজোর সবচেয়ে বড় চমক পরিসংখ্যানেই। রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দা শাখার হিসাব অনুযায়ী, কলকাতা পুলিশ কমিশনারেট এলাকা বাদ দিয়েই পশ্চিমবঙ্গে এবার কালীপুজোর সংখ্যা ৭২ হাজার ৬০৯। গত দুর্গাপুজোয় এই সংখ্যা ছিল ৬৬ হাজার ৯১৯। অর্থাৎ পুজোর সংখ্যার নিরিখে এবার দুর্গাপুজোকেও ছাপিয়ে গিয়েছে শ্যামাপুজো। নতুন করে ৬৪১টি পুজো কমিটি এবার আত্মপ্রকাশ করেছে। রাজ্যে বড় বাজেটের কালীপুজোর সংখ্যা ১ হাজার ৫৭৫। পূর্ব মেদিনীপুর, বীরভূম ও পশ্চিম মেদিনীপুরে বড় বাজেটের পুজোর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।
উত্তর ২৪ পরগনার বারাসত এবারও কালীপুজোর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। বিশেষ করে শিমুলতলার শ্রীকৃষ্ণপুর সাংস্কৃতিক চক্রের সুবর্ণজয়ন্তী বর্ষের আয়োজন ঘিরে তৈরি হয়েছে বাড়তি উন্মাদনা। শিল্পী ভবতোষ সুতারের পরিকল্পনায় ‘অতল অনন্তম’ থিমে জল, আলো ও শব্দের অসাধারণ মেলবন্ধন ঘটানো হয়েছে। জলের ফোঁটার ছন্দের সঙ্গে বিশেষ প্রযুক্তিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মহাদেবের তাণ্ডব নৃত্য। প্রায় ২৩ ফুটের বিশাল মাতৃপ্রতিমা এবং টাকি রোডজুড়ে কয়েক কিলোমিটার চন্দননগরের আলোকসজ্জা দর্শনার্থীদের বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। এই পুজোর উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। উপস্থিত ছিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। বারাসতের পুজোর ইতিহাসে এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানও বিশেষ তাৎপর্য পেয়েছে।
অন্যদিকে, নৈহাটির আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ঐতিহ্যবাহী বড়মা। ১০৩ বছরের পুজোয় এবার নতুন সাজে ধরা দিয়েছেন দেবী। সোনা ও রুপো মিলিয়ে প্রায় ১১০ কেজি অলংকারে সাজানো হয়েছে বিশালাকার প্রতিমাকে। কপালে হিরে, চুনি ও পান্না বসানো বিশেষ টিপ, নতুন সীতাহার, সোনার মুকুট এবং রুপোর অলংকারে অনন্য রূপে সেজেছেন বড়মা। রবিবার সকাল থেকেই অরবিন্দ রোডে ভক্তদের ঢল। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসছেন মানত পূরণ করতে, কেউ দণ্ডি কাটছেন, কেউ আবার দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করছেন একবার মায়ের দর্শন পাওয়ার আশায়।
কলকাতা ও শহরতলির অন্যান্য পুজোতেও থিমের বৈচিত্র্য চোখে পড়ার মতো। কোথাও বাংলার লোকসংস্কৃতি, কোথাও জীবনের প্রবাহ, কোথাও মানুষের দৈনন্দিন জীবনসংগ্রাম, আবার কোথাও ঐতিহ্যবাহী মন্দির স্থাপত্যকে তুলে ধরা হয়েছে। বরিশা শান্তি সংঘের ‘যাপন প্রবাহ’, গিরিশ পার্কের ফাইভ স্টার স্পোর্টিং ক্লাবের ‘অগ্রদূত’, বাঘাযতীনের মৈনাক ক্লাবের ‘লৌকিক’, বিজয়গড় ৬ পল্লির ‘রূপান্তর’ এবং বড়নগরের নবোদয়ের দক্ষিণেশ্বর মন্দির-অনুপ্রাণিত মণ্ডপ বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করেছে।
এবারের পুজোয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানও বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে। মুখ্যমন্ত্রী, রাজ্যের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও বিনোদন জগতের পরিচিত ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতিতে একাধিক বড় পুজোর উদ্বোধন ঘিরে তৈরি হয়েছে উৎসাহ। তারকাদের উপস্থিতি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং বর্ণাঢ্য আয়োজন দর্শনার্থীদের আকর্ষণ আরও বাড়িয়েছে।
তবে এবারের উৎসবের পাশাপাশি নিরাপত্তাও বড় বিষয়। কলকাতার চোরবাগানের মর্মান্তিক পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনার পর বারাসত, নৈহাটি-সহ বিভিন্ন বড় পুজো এলাকায় প্রবেশ ও বেরনোর পৃথক পথ, সিসিটিভি নজরদারি, পুলিশ মোতায়েন এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের তরফে দর্শনার্থীদেরও সতর্কতা মেনে চলার আবেদন জানানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে এবারের শ্যামাপুজো শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বাংলার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক জীবনেরও এক বড় ছবি। কোথাও কয়েক দশকের ঐতিহ্য, কোথাও শিল্পীর কল্পনার নতুন প্রকাশ, কোথাও আবার ভক্তির আবেগে তৈরি হয়েছে জনসমুদ্র। দুর্গাপুজোর পর বাংলার উৎসবের দ্বিতীয় বৃহত্তম মঞ্চে এবার সংখ্যার নিরিখেও নিজের শক্তি প্রমাণ করল শ্যামাপুজো। আলো, আনন্দ আর মাতৃবন্দনায় আপাতত একটাই ছবি—দীপাবলির আলোয় জেগে রয়েছে বাংলা, ঘরে ঘরে আরাধিত হচ্ছেন মা শ্যামা।

আপনার মতামত লিখুন