সংবাদ

মজুরি আন্দোলন: ঢালাও ব্যাংক হিসাব জব্দে বিতর্ক, উদ্বেগ


মহসীন ইসলাম টুটুল
মহসীন ইসলাম টুটুল
প্রকাশ: ৮ নভেম্বর ২০২৬, ১০:০৫ পিএম

মজুরি আন্দোলন: ঢালাও ব্যাংক হিসাব জব্দে বিতর্ক, উদ্বেগ
ছ‌বি: সংগৃ‌হিত

দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে চলমান অস্থিরতা ও শ্রমিক অসন্তোষে ‘ইন্ধন’ এবং ‘অর্থায়নের’ অভিযোগে দুই শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ ও তথ্য তলবের ঘটনায় ব্যবসায়ী মহলে বিতর্ক ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে।

তারা বলছেন এমন অনেকের হিসাব জব্দ করা হয়েছে যাদের ব্যবসায়ী হিসেবে ‘সুনাম’ আছে এবং কোনো ‘রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা’ নেই।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এসব প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির ব্যাংক হিসাবের তথ্য দেয়ার জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ দিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১০০ ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব জব্দের (ফ্রিজ) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পোশাক ও বস্ত্র খাতের ১২৫টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাংক লেনদেনের বিস্তারিত বিবরণ তলব করা হয়েছে।

এনবিআরের তালিকায় দেশের তৈরি পোশাক, বস্ত্র, প্যাকেজিং ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের শীর্ষস্থানীয় অন্তত সাতটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর নাম এসেছে।

‘সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ ছাড়া’ এভাবে ঢালাও ব্যাংক হিসাব জব্দের পদক্ষেপে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে ‘নেতিবাচক প্রভাব’ ও রপ্তানি খাতে ‘আস্থার সংকটের’ আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। কার পরামর্শ বা বুদ্ধিতে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে সে প্রশ্নও উঠেছে ব্যবসায়ী মহলে।

এনবিআরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার ‘তথ্যের ভিত্তিতে’ এই নজিরবিহীন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তারা বলছেন অভিযোগ রয়েছে, পোশাক খাতের অস্থিরতাকে উসকে দিতে ‘বিভিন্ন মাধ্যম থেকে অর্থের জোগান’ দেওয়া হচ্ছিল।

অভিযোগ খতিয়ে দেখতে এনবিআরের করসংক্রান্ত দুটি বিশেষায়িত গোয়েন্দা শাখা, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) এবং আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট (আইটিআইআইইউ) তদন্ত শুরু করেছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এসব চিঠি পাঠিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ জমা দিতে বলা হয়েছে।

এর আগে সচিবালয়ে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অভিযোগ করেছিলেন, তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের মধ্যে যারা ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, তাদের কেউ কেউ শ্রমিকদের আন্দোলনে বাইরে থেকে ‘ইন্ধন ও অর্থ’ দিচ্ছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের পরপরই এনবিআরের এই তৎপরতার খবর পাওয়া যায়।

তালিকায় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি আছেন। আর দেশের শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের নাম রয়েছে। তালিকায় এমন কয়েকজন উদ্যোক্তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যাদের প্রত্যক্ষ কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নেই এবং ব্যবসায়ী মহলে পরিচ্ছন্ন ও পেশাদার হিসেবে তাদের ইতিবাচক ভাবমূর্তি রয়েছে।

শেল্টেক্ গ্রুপ ও এনভয় লিগ্যাসি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তানভীর আহমেদ ও তার মা রাশিদা আহমেদের ব্যাংক হিসাবও জব্দ করেছে এনবিআর। এই দুজনের রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা আছে এমন তথ্য কারো কাছে নেই। তৈরি পোশাক, বস্ত্র, সিরামিক, আবাসনসহ বিভিন্ন খাতের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত শেলটেক গ্রুপের দ্বিতীয় প্রজন্মের তরুণ ব্যবসায়ী তানভীর আহমেদের ভাবমূর্তি ব্যবসায়ী মহলে ইতিবাচক বলেই জানা গেছে। তার বাবা দেশের বিশিষ্ট শিল্পোদ্যোক্তা এনভয় টেক্সটাইলের চেয়ারম্যান কুতুবউদ্দিন আহমেদ। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এক সময়ে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুস সালাম মুশের্দীর মালিকানাধীন এনভয় গ্রুপের ব্যবসায়িক অংশীদার ছিলেন কুতুবউদ্দিন আহমেদ ও তার ছেলে। তবে সাড়ে চার বছর আগে তারা আলাদা হয়ে গেছেন।

জব্দের তালিকায় রয়েছে তুসুকা গ্রুপ। গ্রুপটির ১০টি প্রতিষ্ঠানের হিসাব তলবের পাশাপাশি নয়জন ব্যক্তির হিসাব জব্দ করা হয়েছে। গ্রুপের উদ্যোক্তাদের একজন ফয়জুর রহমান বাদল ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবং বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। গ্রুপের ১০টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব তলব এবং পরিচালক ফয়জুর রহমান, আরশাদ জামিল, রেফায়েত উল্লাহ (তোতা), ফিরোজ আলমসহ নয়জনের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে।

তুসুকা গ্রুপের একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার ব্যাংকের মাধ্যমে কর্মীদের বেতন স্থানান্তর করা হয়েছে। তবে একটা অংশ বেতন পাননি। কারণ, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। আমাদের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের আজকের সুনামে পৌঁছাতে বহু বছর সময় লেগেছে। শ্রমিক অসন্তোষের সময়ে অন্য কারখানার মতো আমাদের শ্রমিকদেরও কিছু দাবিদাওয়া থাকতে পারে, তার মানে এই নয় যে আমরাই শ্রমিকদের রাস্তায় নামিয়েছি। এমন পদক্ষেপ অন্যায্য।’

তুসুকা গ্রুপের ওই কর্মকর্তা জানান, তাদের কারখানায় ২০ থেকে ২৫ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। এক দিন কাজ বন্ধ থাকলে কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাহীন অংশীদারদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করায় কর্মীদের বেতন স্থানান্তর ব্যাহত হচ্ছে এবং বিদেশি ক্রেতাদের কাছে অত্যন্ত ভুল বার্তা যাচ্ছে।

এনবিআরের তদন্ত তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের একটি বড় অংশই ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী নীতি-নির্ধারক ও রাজনীতিক। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম, সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ ও সাবেক স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম। এ ছাড়া তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও ঢাকা উত্তর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এস এম মান্নান (কচি) এবং তার পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাবও তলব ও জব্দের আওতায় এসেছে।

তালিকায় আরও রয়েছে মিরপুরের সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা ও তার পরিবারের সদস্যদের নাম। ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের বোনের স্বামী আলিফ মোল্লার নামও হিসাব জব্দের তালিকায় রয়েছে। এদের অনেকেই হয় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন, নয়তো পলাতক।

তালিকায় সবচেয়ে বেশি প্রতিষ্ঠান রয়েছে সিরাজগঞ্জের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল মমিন মণ্ডলের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান মণ্ডল গ্রুপের। গ্রুপটির চেয়ারম্যান আবদুল মমিন মণ্ডল, এমডি আবদুল আলিম মণ্ডলসহ পরিবারের ১৯ জনের ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং কটন ক্লাব, কটন ক্লোদিং, অ্যাপোলো ফ্যাশন, ট্রপিক্যাল নিটেক্সসহ গ্রুপটির মোট ২৮টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের তথ্য তলব করা হয়েছে। গ্রুপটি বছরে অর্ধশত কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করে।

আশির দশকে প্রতিষ্ঠিত স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ। এই শীর্ষ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের তিনটি কোম্পানির হিসাব তলব করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠাতা এ কে এম মোশাররফ হোসেন, প্রকৌশলী মো. আতিকুর রহমান ও এমডি হাসনাত মোশাররফসহ পরিবারের ৮ জনের হিসাব জব্দ করা হয়েছে।

ক্ষমতাচ্যুত সাবেক সংসদ সদস্য আবদুস সালাম মুর্শেদীর মালিকানাধীন এনভয় গ্রুপের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের তথ্য চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সালাম মুর্শেদী, তার স্ত্রী ও মেয়ের হিসাব জব্দ করা হয়েছে।

সাবেক সংসদ সদস্য খসরু চৌধুরী ও তার পরিবারের চারজনের হিসাব জব্দ এবং নিপা নিটওয়্যারসহ গ্রুপের তিনটি প্রতিষ্ঠানের লেনদেন তথ্য তলব করা হয়েছে। খসরু চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চেয়ে পাননি। পরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি আত্মগোপনে আছেন।

গিভেন্সি গ্রুপের পাঁচটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের তথ্য চাওয়ার পাশাপাশি চেয়ারম্যান খতিব আবদুল জাহিদসহ চারজনের ব্যক্তিগত হিসাব জব্দ করা হয়েছে।

চট্টগ্রামের ওয়েল গ্রুপের তিন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব তলবের পাশাপাশি গ্রুপটির চেয়ারম্যান আবদুস সালাম, পরিচালক সৈয়দ নুরুল ইসলাম, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম, সৈয়দ শহীদুল ইসলাম, সৈয়দ তারিকুল ইসলামসহ ১১ জনের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। এই গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুস সালাম চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তার ভাই সৈয়দ নুরুল ইসলাম আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের উপদেষ্টা ছিলেন, বর্তমানে কারাবন্দী। ওয়েল গ্রুপের তৈরি পোশাক, বস্ত্র ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের ব্যবসা রয়েছে।

বিজিএমইএ এর একজন উপদেষ্টা সংবাদকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এটা সেনসেটিভ বিষয়। বিষয়টা রাষ্ট্রীয়। রাষ্ট্র জনগনের জন্য যা ভালো মনে করবে তাই করবে। এই বিষয়ে আমার মন্তব্য করা উচিত হবে না।’ বিজিএমইএ এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি, তাই এই বিষয়ে এখনই বিজিএমইএ কে জাড়ানো ঠিক হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ঢালাওভাবে রাজনৈতিক যোগসূত্রের সন্দেহ তৈরি করে ‘পরিচ্ছন্ন ও পেশাদার’ ব্যবসায়ীদের ব্যাংক হিসাব জব্দের ঘটনায় শিল্প খাতে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মতে, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলেও তদন্ত ছাড়া ঢালাও পদক্ষেপে সামগ্রিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক সংবাদকে বলেন, ‘শ্রমিক আন্দোলনে কারও অসৎ উদ্দেশ্য বা তৃতীয় পক্ষের ইন্ধন থাকলে সুনির্দিষ্ট তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের অবশ্যই চিহ্নিত করা উচিত। কিন্তু তথ্যপ্রমাণ ছাড়া ঢালাওভাবে ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হলে সাধারণ ব্যবসায়ীদের মাঝে আতঙ্ক তৈরি হবে এবং স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম ব্যাহত হবে।’

এনবিআর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন সংস্থার পাওয়া গোয়েন্দা তথ্য ক্রস-চেক করা হচ্ছে। তবে নিরীহ ও প্রকৃত উৎপাদনশীল ব্যবসায়ীরা যাতে কোনো প্রশাসনিক জটিলত’ বা অহেতুক ভোগান্তির মুখে না পড়েন, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার তাগিদ দিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও শিল্পমালিকরা।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬


মজুরি আন্দোলন: ঢালাও ব্যাংক হিসাব জব্দে বিতর্ক, উদ্বেগ

প্রকাশের তারিখ : ০৮ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে চলমান অস্থিরতা ও শ্রমিক অসন্তোষে ‘ইন্ধন’ এবং ‘অর্থায়নের’ অভিযোগে দুই শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ ও তথ্য তলবের ঘটনায় ব্যবসায়ী মহলে বিতর্ক ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে।

তারা বলছেন এমন অনেকের হিসাব জব্দ করা হয়েছে যাদের ব্যবসায়ী হিসেবে ‘সুনাম’ আছে এবং কোনো ‘রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা’ নেই।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এসব প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির ব্যাংক হিসাবের তথ্য দেয়ার জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ দিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১০০ ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব জব্দের (ফ্রিজ) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পোশাক ও বস্ত্র খাতের ১২৫টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাংক লেনদেনের বিস্তারিত বিবরণ তলব করা হয়েছে।

এনবিআরের তালিকায় দেশের তৈরি পোশাক, বস্ত্র, প্যাকেজিং ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের শীর্ষস্থানীয় অন্তত সাতটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর নাম এসেছে।

‘সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ ছাড়া’ এভাবে ঢালাও ব্যাংক হিসাব জব্দের পদক্ষেপে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে ‘নেতিবাচক প্রভাব’ ও রপ্তানি খাতে ‘আস্থার সংকটের’ আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। কার পরামর্শ বা বুদ্ধিতে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে সে প্রশ্নও উঠেছে ব্যবসায়ী মহলে।

এনবিআরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার ‘তথ্যের ভিত্তিতে’ এই নজিরবিহীন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তারা বলছেন অভিযোগ রয়েছে, পোশাক খাতের অস্থিরতাকে উসকে দিতে ‘বিভিন্ন মাধ্যম থেকে অর্থের জোগান’ দেওয়া হচ্ছিল।

অভিযোগ খতিয়ে দেখতে এনবিআরের করসংক্রান্ত দুটি বিশেষায়িত গোয়েন্দা শাখা, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) এবং আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট (আইটিআইআইইউ) তদন্ত শুরু করেছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এসব চিঠি পাঠিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ জমা দিতে বলা হয়েছে।

এর আগে সচিবালয়ে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অভিযোগ করেছিলেন, তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের মধ্যে যারা ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, তাদের কেউ কেউ শ্রমিকদের আন্দোলনে বাইরে থেকে ‘ইন্ধন ও অর্থ’ দিচ্ছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের পরপরই এনবিআরের এই তৎপরতার খবর পাওয়া যায়।

তালিকায় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি আছেন। আর দেশের শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের নাম রয়েছে। তালিকায় এমন কয়েকজন উদ্যোক্তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যাদের প্রত্যক্ষ কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নেই এবং ব্যবসায়ী মহলে পরিচ্ছন্ন ও পেশাদার হিসেবে তাদের ইতিবাচক ভাবমূর্তি রয়েছে।

শেল্টেক্ গ্রুপ ও এনভয় লিগ্যাসি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তানভীর আহমেদ ও তার মা রাশিদা আহমেদের ব্যাংক হিসাবও জব্দ করেছে এনবিআর। এই দুজনের রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা আছে এমন তথ্য কারো কাছে নেই। তৈরি পোশাক, বস্ত্র, সিরামিক, আবাসনসহ বিভিন্ন খাতের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত শেলটেক গ্রুপের দ্বিতীয় প্রজন্মের তরুণ ব্যবসায়ী তানভীর আহমেদের ভাবমূর্তি ব্যবসায়ী মহলে ইতিবাচক বলেই জানা গেছে। তার বাবা দেশের বিশিষ্ট শিল্পোদ্যোক্তা এনভয় টেক্সটাইলের চেয়ারম্যান কুতুবউদ্দিন আহমেদ। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এক সময়ে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুস সালাম মুশের্দীর মালিকানাধীন এনভয় গ্রুপের ব্যবসায়িক অংশীদার ছিলেন কুতুবউদ্দিন আহমেদ ও তার ছেলে। তবে সাড়ে চার বছর আগে তারা আলাদা হয়ে গেছেন।

জব্দের তালিকায় রয়েছে তুসুকা গ্রুপ। গ্রুপটির ১০টি প্রতিষ্ঠানের হিসাব তলবের পাশাপাশি নয়জন ব্যক্তির হিসাব জব্দ করা হয়েছে। গ্রুপের উদ্যোক্তাদের একজন ফয়জুর রহমান বাদল ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবং বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। গ্রুপের ১০টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব তলব এবং পরিচালক ফয়জুর রহমান, আরশাদ জামিল, রেফায়েত উল্লাহ (তোতা), ফিরোজ আলমসহ নয়জনের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে।

তুসুকা গ্রুপের একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার ব্যাংকের মাধ্যমে কর্মীদের বেতন স্থানান্তর করা হয়েছে। তবে একটা অংশ বেতন পাননি। কারণ, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। আমাদের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের আজকের সুনামে পৌঁছাতে বহু বছর সময় লেগেছে। শ্রমিক অসন্তোষের সময়ে অন্য কারখানার মতো আমাদের শ্রমিকদেরও কিছু দাবিদাওয়া থাকতে পারে, তার মানে এই নয় যে আমরাই শ্রমিকদের রাস্তায় নামিয়েছি। এমন পদক্ষেপ অন্যায্য।’

তুসুকা গ্রুপের ওই কর্মকর্তা জানান, তাদের কারখানায় ২০ থেকে ২৫ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। এক দিন কাজ বন্ধ থাকলে কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাহীন অংশীদারদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করায় কর্মীদের বেতন স্থানান্তর ব্যাহত হচ্ছে এবং বিদেশি ক্রেতাদের কাছে অত্যন্ত ভুল বার্তা যাচ্ছে।

এনবিআরের তদন্ত তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের একটি বড় অংশই ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী নীতি-নির্ধারক ও রাজনীতিক। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম, সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ ও সাবেক স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম। এ ছাড়া তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও ঢাকা উত্তর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এস এম মান্নান (কচি) এবং তার পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাবও তলব ও জব্দের আওতায় এসেছে।

তালিকায় আরও রয়েছে মিরপুরের সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা ও তার পরিবারের সদস্যদের নাম। ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের বোনের স্বামী আলিফ মোল্লার নামও হিসাব জব্দের তালিকায় রয়েছে। এদের অনেকেই হয় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন, নয়তো পলাতক।

তালিকায় সবচেয়ে বেশি প্রতিষ্ঠান রয়েছে সিরাজগঞ্জের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল মমিন মণ্ডলের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান মণ্ডল গ্রুপের। গ্রুপটির চেয়ারম্যান আবদুল মমিন মণ্ডল, এমডি আবদুল আলিম মণ্ডলসহ পরিবারের ১৯ জনের ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং কটন ক্লাব, কটন ক্লোদিং, অ্যাপোলো ফ্যাশন, ট্রপিক্যাল নিটেক্সসহ গ্রুপটির মোট ২৮টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের তথ্য তলব করা হয়েছে। গ্রুপটি বছরে অর্ধশত কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করে।

আশির দশকে প্রতিষ্ঠিত স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ। এই শীর্ষ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের তিনটি কোম্পানির হিসাব তলব করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠাতা এ কে এম মোশাররফ হোসেন, প্রকৌশলী মো. আতিকুর রহমান ও এমডি হাসনাত মোশাররফসহ পরিবারের ৮ জনের হিসাব জব্দ করা হয়েছে।

ক্ষমতাচ্যুত সাবেক সংসদ সদস্য আবদুস সালাম মুর্শেদীর মালিকানাধীন এনভয় গ্রুপের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের তথ্য চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সালাম মুর্শেদী, তার স্ত্রী ও মেয়ের হিসাব জব্দ করা হয়েছে।

সাবেক সংসদ সদস্য খসরু চৌধুরী ও তার পরিবারের চারজনের হিসাব জব্দ এবং নিপা নিটওয়্যারসহ গ্রুপের তিনটি প্রতিষ্ঠানের লেনদেন তথ্য তলব করা হয়েছে। খসরু চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চেয়ে পাননি। পরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি আত্মগোপনে আছেন।

গিভেন্সি গ্রুপের পাঁচটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের তথ্য চাওয়ার পাশাপাশি চেয়ারম্যান খতিব আবদুল জাহিদসহ চারজনের ব্যক্তিগত হিসাব জব্দ করা হয়েছে।

চট্টগ্রামের ওয়েল গ্রুপের তিন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব তলবের পাশাপাশি গ্রুপটির চেয়ারম্যান আবদুস সালাম, পরিচালক সৈয়দ নুরুল ইসলাম, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম, সৈয়দ শহীদুল ইসলাম, সৈয়দ তারিকুল ইসলামসহ ১১ জনের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। এই গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুস সালাম চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তার ভাই সৈয়দ নুরুল ইসলাম আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের উপদেষ্টা ছিলেন, বর্তমানে কারাবন্দী। ওয়েল গ্রুপের তৈরি পোশাক, বস্ত্র ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের ব্যবসা রয়েছে।

বিজিএমইএ এর একজন উপদেষ্টা সংবাদকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এটা সেনসেটিভ বিষয়। বিষয়টা রাষ্ট্রীয়। রাষ্ট্র জনগনের জন্য যা ভালো মনে করবে তাই করবে। এই বিষয়ে আমার মন্তব্য করা উচিত হবে না।’ বিজিএমইএ এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি, তাই এই বিষয়ে এখনই বিজিএমইএ কে জাড়ানো ঠিক হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ঢালাওভাবে রাজনৈতিক যোগসূত্রের সন্দেহ তৈরি করে ‘পরিচ্ছন্ন ও পেশাদার’ ব্যবসায়ীদের ব্যাংক হিসাব জব্দের ঘটনায় শিল্প খাতে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মতে, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলেও তদন্ত ছাড়া ঢালাও পদক্ষেপে সামগ্রিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক সংবাদকে বলেন, ‘শ্রমিক আন্দোলনে কারও অসৎ উদ্দেশ্য বা তৃতীয় পক্ষের ইন্ধন থাকলে সুনির্দিষ্ট তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের অবশ্যই চিহ্নিত করা উচিত। কিন্তু তথ্যপ্রমাণ ছাড়া ঢালাওভাবে ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হলে সাধারণ ব্যবসায়ীদের মাঝে আতঙ্ক তৈরি হবে এবং স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম ব্যাহত হবে।’

এনবিআর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন সংস্থার পাওয়া গোয়েন্দা তথ্য ক্রস-চেক করা হচ্ছে। তবে নিরীহ ও প্রকৃত উৎপাদনশীল ব্যবসায়ীরা যাতে কোনো প্রশাসনিক জটিলত’ বা অহেতুক ভোগান্তির মুখে না পড়েন, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার তাগিদ দিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও শিল্পমালিকরা।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত