সংবাদ

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা

এবার খুলছে পেপ্যালের বন্ধ দরজা


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১১ পিএম

এবার খুলছে পেপ্যালের বন্ধ দরজা
পেপ্যালের বন্ধ দরজা খুলবে এবার।

দীর্ঘ এক দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটতে চলেছে। ফ্রিল্যান্সার, ই-কমার্স উদ্যোক্তা ও আইটি খাতে কর্মরত লক্ষ লক্ষ তরুণের স্বপ্নের পেপ্যাল এবার সত্যি হতে যাচ্ছে। দেশে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে পেপ্যালের কার্যক্রম শুরু করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বুধবার (১৫ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি এ তথ্য জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, হাইটেক পার্ক ও আইসিটি সেন্টারগুলোর কার্যকর পরিচালনা এবং দেশে পেপ্যালের কার্যক্রম চালু করতে ইতোমধ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পালা শেষ হচ্ছে। ২০১৬ সাল থেকে বারবার আশার সঞ্চার, উদ্যোগের ঘোষণা, উচ্চপর্যায়ের বৈঠক- কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বারবারই ব্যর্থতা। তবে এবার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। প্রধানমন্ত্রী সরাসরি সংসদে দাঁড়িয়ে বিষয়টিকে রাজনৈতিক অগ্রাধিকার দিয়েছেন।

বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বড় ফ্রিল্যান্সিং বাজার। কিন্তু পেমেন্ট জটিলতার কারণে অনেকেই আয়ের পূর্ণ সুবিধা পান না। পেপ্যাল চালু হলে দ্রুত, নিরাপদ ও সরাসরি পেমেন্ট গ্রহণ সম্ভব হবে। পাশাপাশি ছোট উদ্যোক্তারা সহজেই আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য বিক্রি করে অর্থ দেশে আনতে পারবেন।

এ ছাড়া প্রবাসীরা সহজে অর্থ পাঠাতে পারলে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স বাড়তে পারে। ক্যাশলেস ট্রানজেকশন, অনলাইন ব্যবসা ও স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম আরও শক্তিশালী হবে।

বাংলাদেশে পেপ্যাল চালুর আলোচনা শুরু হয় মূলত ২০১০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে। ২০১৬ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি হয়, এমনকি ২০১৭ সালে ব্যাপক প্রচার প্রচারণা চালিয়ে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। কিন্তু বাস্তবে চালু হয় কেবল Xoom—যা পেপ্যালের একটি সহায়ক সেবা।

২০১৭ সালের ১৯ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে PayPal Xoom সেবা। এটি দিয়ে প্রবাসীরা বাংলাদেশে অর্থ পাঠাতে পারলেও ফ্রিল্যান্সারদের আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গ্রহণ বা অনলাইন ব্যবসার পূর্ণাঙ্গ সুবিধা কখনোই চালু হয়নি।

২০২১ সালেও পেপ্যাল চালুর ঘোষণা আসে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে ফ্রিল্যান্সারদের কাছে ‘পেপ্যাল আসছে’- এটি এক ধরনের পুনরাবৃত্ত প্রতিশ্রুতিতে পরিণত হয়। বাংলাদেশে পেপ্যাল চালু না হওয়ার কারণগুলো কেবল প্রযুক্তিগত নয়; বরং এটি একটি জটিল নীতিগত, আর্থিক ও আন্তর্জাতিক কাঠামোর সঙ্গে জড়িত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রধান বাধাগুলোর একটি হলো দেশের আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থায় পূর্ণাঙ্গ ‘ফাইন্যান্সিয়াল সেটেলমেন্ট’ কাঠামোর অভাব। অনলাইনে প্রতারণা বা আর্থিক জালিয়াতির ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক প্রতিকার দেওয়ার মতো ২৪ ঘণ্টার কোনো কেন্দ্রীয় সাপোর্ট সিস্টেম এখনও গড়ে ওঠেনি।

এছাড়া ব্যবহারকারীদের নির্ভরযোগ্য পরিচয় ও ঠিকানা যাচাইকরণ (কেওয়াইসি ও অ্যাড্রেস ভেরিফিকেশন) ব্যবস্থার দুর্বলতাও বড় প্রতিবন্ধকতা ছিল। নিয়ন্ত্রক দিক থেকেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে দীর্ঘদিন ধরে কঠোর নীতি অনুসরণ করে আসছে। পেপ্যাল চালুর জন্য প্রয়োজন অবাধ অর্থপ্রবাহ—যা বর্তমান কাঠামোয় সীমিত।

২০২৫ সালের শেষভাগ থেকে পরিস্থিতিতে কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর ঘোষণা দেন- পেপ্যাল বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করতে আগ্রহী। পরবর্তীতে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ঢাকায় এসে সরকার, ব্যাংকার এবং আইসিটি খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে।

২০২৬ সালের শুরুতে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী জানান, পেপ্যাল ‘নীতিগতভাবে আগ্রহী’, তবে এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এবার সেই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সংসদীয় ঘোষণা বিষয়টিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

পেপ্যাল বিশ্বের ২০০টিরও বেশি দেশে অনলাইনে টাকা পাঠানো-গ্রহণ, বিল পরিশোধ এবং আন্তর্জাতিক কেনাকাটার জন্য ব্যবহৃত একটি বিশ্বস্ত ডিজিটাল পেমেন্ট সেবা। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য পেপ্যাল শুধু একটি পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম নয়- এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন।

এবারের উদ্যোগ সফল হলে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সার, উদ্যোক্তা ও ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য এটি হতে পারে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬


এবার খুলছে পেপ্যালের বন্ধ দরজা

প্রকাশের তারিখ : ১৫ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

দীর্ঘ এক দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটতে চলেছে। ফ্রিল্যান্সার, ই-কমার্স উদ্যোক্তা ও আইটি খাতে কর্মরত লক্ষ লক্ষ তরুণের স্বপ্নের পেপ্যাল এবার সত্যি হতে যাচ্ছে। দেশে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে পেপ্যালের কার্যক্রম শুরু করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বুধবার (১৫ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি এ তথ্য জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, হাইটেক পার্ক ও আইসিটি সেন্টারগুলোর কার্যকর পরিচালনা এবং দেশে পেপ্যালের কার্যক্রম চালু করতে ইতোমধ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পালা শেষ হচ্ছে। ২০১৬ সাল থেকে বারবার আশার সঞ্চার, উদ্যোগের ঘোষণা, উচ্চপর্যায়ের বৈঠক- কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বারবারই ব্যর্থতা। তবে এবার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। প্রধানমন্ত্রী সরাসরি সংসদে দাঁড়িয়ে বিষয়টিকে রাজনৈতিক অগ্রাধিকার দিয়েছেন।

বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বড় ফ্রিল্যান্সিং বাজার। কিন্তু পেমেন্ট জটিলতার কারণে অনেকেই আয়ের পূর্ণ সুবিধা পান না। পেপ্যাল চালু হলে দ্রুত, নিরাপদ ও সরাসরি পেমেন্ট গ্রহণ সম্ভব হবে। পাশাপাশি ছোট উদ্যোক্তারা সহজেই আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য বিক্রি করে অর্থ দেশে আনতে পারবেন।

এ ছাড়া প্রবাসীরা সহজে অর্থ পাঠাতে পারলে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স বাড়তে পারে। ক্যাশলেস ট্রানজেকশন, অনলাইন ব্যবসা ও স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম আরও শক্তিশালী হবে।

বাংলাদেশে পেপ্যাল চালুর আলোচনা শুরু হয় মূলত ২০১০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে। ২০১৬ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি হয়, এমনকি ২০১৭ সালে ব্যাপক প্রচার প্রচারণা চালিয়ে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। কিন্তু বাস্তবে চালু হয় কেবল Xoom—যা পেপ্যালের একটি সহায়ক সেবা।

২০১৭ সালের ১৯ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে PayPal Xoom সেবা। এটি দিয়ে প্রবাসীরা বাংলাদেশে অর্থ পাঠাতে পারলেও ফ্রিল্যান্সারদের আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গ্রহণ বা অনলাইন ব্যবসার পূর্ণাঙ্গ সুবিধা কখনোই চালু হয়নি।

২০২১ সালেও পেপ্যাল চালুর ঘোষণা আসে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে ফ্রিল্যান্সারদের কাছে ‘পেপ্যাল আসছে’- এটি এক ধরনের পুনরাবৃত্ত প্রতিশ্রুতিতে পরিণত হয়। বাংলাদেশে পেপ্যাল চালু না হওয়ার কারণগুলো কেবল প্রযুক্তিগত নয়; বরং এটি একটি জটিল নীতিগত, আর্থিক ও আন্তর্জাতিক কাঠামোর সঙ্গে জড়িত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রধান বাধাগুলোর একটি হলো দেশের আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থায় পূর্ণাঙ্গ ‘ফাইন্যান্সিয়াল সেটেলমেন্ট’ কাঠামোর অভাব। অনলাইনে প্রতারণা বা আর্থিক জালিয়াতির ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক প্রতিকার দেওয়ার মতো ২৪ ঘণ্টার কোনো কেন্দ্রীয় সাপোর্ট সিস্টেম এখনও গড়ে ওঠেনি।

এছাড়া ব্যবহারকারীদের নির্ভরযোগ্য পরিচয় ও ঠিকানা যাচাইকরণ (কেওয়াইসি ও অ্যাড্রেস ভেরিফিকেশন) ব্যবস্থার দুর্বলতাও বড় প্রতিবন্ধকতা ছিল। নিয়ন্ত্রক দিক থেকেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে দীর্ঘদিন ধরে কঠোর নীতি অনুসরণ করে আসছে। পেপ্যাল চালুর জন্য প্রয়োজন অবাধ অর্থপ্রবাহ—যা বর্তমান কাঠামোয় সীমিত।

২০২৫ সালের শেষভাগ থেকে পরিস্থিতিতে কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর ঘোষণা দেন- পেপ্যাল বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করতে আগ্রহী। পরবর্তীতে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ঢাকায় এসে সরকার, ব্যাংকার এবং আইসিটি খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে।

২০২৬ সালের শুরুতে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী জানান, পেপ্যাল ‘নীতিগতভাবে আগ্রহী’, তবে এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এবার সেই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সংসদীয় ঘোষণা বিষয়টিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

পেপ্যাল বিশ্বের ২০০টিরও বেশি দেশে অনলাইনে টাকা পাঠানো-গ্রহণ, বিল পরিশোধ এবং আন্তর্জাতিক কেনাকাটার জন্য ব্যবহৃত একটি বিশ্বস্ত ডিজিটাল পেমেন্ট সেবা। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য পেপ্যাল শুধু একটি পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম নয়- এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন।

এবারের উদ্যোগ সফল হলে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সার, উদ্যোক্তা ও ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য এটি হতে পারে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত