সংবাদ

নির্বাচনী ধারাবাহিকতা না নির্বাচনপূর্ব ধারার এক্সটেনশন!


আনোয়ারুল হক
আনোয়ারুল হক
প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:২৫ পিএম

নির্বাচনী ধারাবাহিকতা না নির্বাচনপূর্ব ধারার এক্সটেনশন!
সংসদ অধিবেশন

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমীন সাংবাদিক সম্মেলন করে বলেছেন ‘আমাদের সরকারের এই ৬০ দিনে সবচাইতে বড় অর্জন বাংলাদেশের জনগণ তারেক রহমানকে বিশ্বাস করেছেন এবং তারেক রহমান জনগণকে বিশ্বাস করেছেন।’ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী কয়েকদিন আগে ফেইসবুক পোস্টে বলেছেন, ‘পাহাড়সমান সমস্যার ভার এবং মানুষের সীমাহীন প্রত্যাশার মধ্যে যাত্রা শুরু করা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার ইতোমধ্যেই সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। তার বিনয়, রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী হয়েও সহজ জীবনযাপন, একাগ্রতা ও সময়ানুবর্তিতা মানুষের মধ্যে আস্থা ও আশার সঞ্চার করেছে।’ সত্যতা থাকলেও এসব কথা বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের দু’মাস পার হওয়ার আগেই ব্যাকারনের বর্তমান কাল (প্রেজেন্ট টেন্স) থেকে অতীত কালে (পাস্ট টেন্স) পরিণত হতে চলেছে। অর্থাৎ তারেক রহমান মানুষের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিলেন এবং মানুষের মধ্যে আশা ও আস্থার সঞ্চার করেছিলেন। কিন্তু অল্প সময়েই আশা ভরসার জায়গাটা নিম্নগামী।

মানুষ প্রথমেই ধাক্কা খেলো তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের দিনেই বিদায়ী প্রধান উপদেষ্টার নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দেখে। ইউনূস মনে করেছিলেন ‘রাষ্ট্র নায়ক’ হিসেবে তার উপর যে বিশাল দায়িত্ব তা সামাল দেয়ার জন্য তারও একজন ‘অজিত দোভাল’ লাগবে। তাই চটজলদি মার্কিন মুলুক থেকে উড়িয়ে নিয়ে আসা হলো খলিলুর রহমানকে। ব্যক্তি হিসেবে নিঃসন্দেহে তিনি বিনয়ী ও বন্ধুসুলভ। কিন্তু রাষ্ট্রীয় গুরুদায়িত্ব পালনে তো বিনয়ী হলে চলে না। নিরাপত্তা ইস্যুর সঙ্গে তো দেশের পররাষ্ট্রনীতিও যুক্ত! তাই দায়িত্ব নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে পররাষ্ট্র উপদেষ্টাকে অনেকটা নিস্ক্রিয় করে পররাষ্ট্র বিষয়ক ইস্যুতেও তিনি তার হাতে স্টিয়ারিং তুলে নেন। করিডোর, বন্দর সহ নানা ইস্যুতে তিনি প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা রাখছিলেন। ঐ সময়ে বিএনপি নেতৃত্বও ছাত্র উপদেষ্টাদের সহ তার অপসারন দাবী করেছিলেন। আমেরিকার সঙ্গে যে দেশ বিরোধী গোপন বাণিজ্য চুক্তি তা সম্পাদনে তিনিই নেতৃত্ব দেন। তাকেই টেকনোক্র্যাট কোটায় পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে দেখে সবাই টাসকি খেলো। বুঝে নিলো ইউনূস মার্কিনী স্বার্থের সঙ্গে দেশকে ১৮ মাসে এমন আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখে গেছেন যে সরকার বদল হলেও তার থেকে বের হওয়ার পথ নেই। হয়তোবা লন্ডন সমাঝোতার অপ্রকাশিত শর্তে এমনটা উল্লেখ ছিলো!

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগ দেখেও সবাই বিষ্মিত হলো। বিশ্ববিদ্যালয় ভাইস চ্যান্সেলর থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশন বা জেলা পরিষদে প্রশাসক সব ক্ষেত্রেই দলীয় বিবেচনা থেকে নিয়োগ দান বিএনপিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আর মানুষ ক্ষুব্ধ হলো, বিবেকের দংশনে জর্জরিত হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার সহযোগী ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দন্ডপ্রাপ্তদের জন্য শোক প্রস্তাব গ্রহণের বহর দেখে। অথচ নিজেদেরকে মুক্তিযুদ্ধের দল দাবী করে নির্বাচনী প্রচারণায় বিএনপি জনগণের কাছে ভোট প্রার্থনা করেছে। জামাতকে স্বাধীনতা বিরোধী আখ্যায়িত করে তাদেরকে পরাভূত করার আহ্বান জানিয়েছে। সংসদ নেতা তারেক জিয়ার উপস্থিতিতে জাতীয় সংসদে যখন বিতর্কিত ঐ শোক প্রস্তাবসমূহ গৃহীত হিসেবে গণ্য হলো তখন মনে প্রশ্ন জাগছিলো ’৭১-এর ২৬ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণাটি পাঠ করার পর জিয়াউর রহমান যদি নিরস্ত্র অবস্থায় এই নিজামী- মুজাহিদদের সামনে পড়তেন তার পরিনতি তখন কী হতো! কী পরিনতি হতো আজকের সংসদের স্পিকার সম্মুখ সমরের মুক্তিযোদ্ধা বীর বিক্রম মেজর হাফিজ উদ্দিনের যদি তিনি ’৭১-এ জামাতীদের হাতে ধরা পড়তেন?

ক্রিকেটপ্রেমী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ পরিচিত। শহর থেকে গ্রাম সর্বত্রই ক্রিকেট খেলা নিয়ে মানুষের আগ্রহ। ক্রিকেট বোর্ডের নতুন এডহক কমিটি গঠন দেখে সেই মানুষ হতবাক। কমিটিতে প্রাধান্য পেয়েছেন সরকার দলীয় রাজনৈতিক নেতারা উত্তরাধিকাররা। পত্রিকায় প্রকাশিত তাদের একমাত্র ক্রেডেনশিয়াল-কে কোনো মন্ত্রী বা নেতার ছেলে, মেয়ে বা ভাই-বোন। কমিটি দেখে ক্রিকেটপ্রেমীরা বলছেন বিশ্বকাপ আমাদের ঘরে এই এলো বলে! নির্বাচিত সরকারের কাছে মানুষের প্রধান আশা ছিলো যে সরকার কতৃত্ববাদ, দলবাজি ও পরিবারতন্ত্র থেকে বেরিয়ে দল ও মত প্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করবে। স্বাধীন বিচার বিভাগের ব্যবস্থা করে আইনের শাসন এবং নিরপেক্ষ প্রশাসন গড়ে তুলে সুশাসন নিশ্চিত করবে, সীমাহীন দুর্নীতির যে রাজত্ব কায়েম হয়েছে তার লাগাম টেনে ধরবে। কিন্তু প্রত্যাশাকে হতাশায় পরিণত করে সংসদের প্রথম অধিবেশনতো প্রায় শেষ হতে চলেছে।

ইউনূস আমলে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারী হয়েছিলো যার মধ্যে ১১৩টি অধ্যাদেশ চলতি অধিবেশনে গৃহীত হয়েছে। ২০টি অধ্যাদেশ বাতিল বা তার কার্যকারিতা হারিয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ, অধস্তন আদালতের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণে স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, দুদক আইন সংশোধন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ সংক্রান্ত জরুরি অধ্যাদেশ। অধ্যাদেশের কারনেই এগুলো আইনে পরিণত করতে হবে তা নয়। বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, দলের ইশতেহার এবং মানুষের আকাঙ্ক্ষা এসব বিবেচনায় অধ্যাদেশ সমূহ বা তা প্রয়োজন মতো সংশোধন করেও আইন করা যেতো। কিন্তু চলে আসা কতৃত্ববাদী ব্যবস্থায় আইন, বিচার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির দুর্নীতি, মানবিক অধিকার সুরক্ষা ইত্যাদি বিষয়াদির উপর লাগাম বিএনপি সরকার দলীয় ভাবে রাখতে চায়। অথচ অতি নিকট অতীত আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে সর্বক্ষেত্রে কতৃত্ববাদ কি ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনে।

বিএনপি সেই সব অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করতে সুপারিশ করেছে যেগুলো দলীয়ভাবে তার পক্ষে যায়। যেমন ইউনূস সরকার জনপ্রতিনিধিদের ইচ্ছেমতো বরখাস্তের সুযোগ রেখে অধ্যাদেশ জারি করেছিল। বিএনপি সেটার সুযোগ নিয়ে ঐ অধ্যাদেশকে আইনে পরিনত করেছে। অতীতে সব সরকারই স্থানীয় সরকারকে নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগের একটি হাতিয়ার হিসেবে দেখতে চেয়েছে। সেই প্রচেষ্টার বিপরীতে কিছু করা হলো না। আওয়ামী লীগ আমলেও জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ ছিল প্রক্রিয়াভিত্তিক ও শর্তসাপেক্ষ। এখন আওয়ামী আমল অপেক্ষা খারাপ আইন হলো।

ইউনূস সরকারের নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বেআইনি ঘোষণার সময় বিএনপি বলেছিলো নির্বাহী আদেশে কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের পক্ষে তারা নয়। এ বিষয়ে জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে। এই রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েই তারা ভোটের সময় আওয়ামী সমর্থকদের কাছে যায় ও তাদের ভোট চায়। আওয়ামী লীগকে ভোটে অংশগ্রহণের সুযোগ না দিয়ে জনগণকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ দেয়া হয়নি। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন চব্বিশের হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে যে তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছিল, সেখানেও রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ না করার বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছিল। ইউনূস সরকার ঐ রিপোর্টকে বিচার প্রক্রিয়ায় এবং রাজনৈতিকভাবেও কাজে লাগালেন। কিন্তু রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ না করার সুপারিশ মানলেন না। বিএনপিও পূর্বের ঘোষণা থেকে সরে এসে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আদেশকে আইনে পরিণত করে গণতন্ত্রের পথে যাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে রাখলো। সম্ভবত স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগকে দল গোছানোর সুযোগ না দেয়া এবং নৌকা সমর্থকদের যে ভোট এবার ধানের শীষে এসেছে তার একটা অংশ স্থায়ী করার লক্ষ্যে বিএনপির এ প্রচেষ্টা। আবার এ আইন ‘৭১ এর যুদ্ধাপরাধী দলের বিরুদ্ধে প্রয়োগের রাস্তাও কিন্তু খোলা থাকলো। কেননা বীর মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় বদল আনলেও এটা কিন্তু বহাল আছে যে, বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে হানাদার ও দখলদার পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী ও তাদের এদেশীয় সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আলশামস, তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং দালাল ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন তারাই মুক্তিযোদ্ধা। অর্থাৎ দেশের আইন অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের বিরোধী অবস্থানে রয়েছে জামাত।

সংসদে কোনো সিদ্ধান্ত যদি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিঃশেষ করে দেয়ার উদ্দেশ্যে নেয়া হয়, সেটি গণতন্ত্রের জন্য স্বস্তির সংবাদ হতে পারে না। আবার আওয়ামী লীগ নিয়ে পরিস্থিতিটা এমন, ‘যার বিয়ে তার খবর নাই, পাড়াপড়শীর ঘুম নাই’। তারা এ মূহুর্তে রাজনীতিতে সক্রিয় হতে চান কিনা তাও স্পষ্ট নয়। দেশে যে বিরাট রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে গেছে, মানুষের বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মনোজগতে যে অভাবনীয় পরিবর্তন এসেছে সেসব বিষয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের হুঁশ আছে বলেও মনে হয় না। যাক আওয়ামী লীগ আওয়ামী লীগেরটা বুঝুক। কিন্তু ভয়টা অন্যখানে। ভয় হয় এ ধরনের আইন বুমেরাং না হয়ে আসে। এটাতো আমাদের অজানা নয় এক এগারোর ‘মাইনাস টু’ থিওরির প্রবক্তারা দেশীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে ক্রিয়াশীল ছিল এবং আছে। জুলাই অভ্যুত্থানে পরেও তারা কিন্তু সে লাইনে চেষ্টা করেছে। সেভাবে বয়ান সামনে এনেছে। কিন্তু পরিস্থিতির মোড় সে দিকে ঘুরানো সম্ভব না হওয়ায় ‘লন্ডন ˆবঠকের’ আয়োজনে যেতে হয়। বিএনপিরও তো অজানা নয়, এবারের নির্বাচনে জামাত আমীর এবং এনসিপির আহবায়কসহ কয়েকজনকে জিতিয়ে আনতে বিশেষ শক্তি যে কৌশলী ভূমিকা রেখেছে সে ক্ষেত্রে বিএনপিকে অসহায় মনে হয়েছে।

তবে সবটা দেখে মনে হচ্ছে সরকারী দল ও বিরোধী দলের মধ্যে এক ধরনের অঘোষিত সমঝোতার মধ্য দিয়েই সংসদের প্রথম অধিবেশন শেষ হবে। সরকারী দল শোক প্রস্তাব, জুলাই যোদ্ধা দায়মুক্তি, জুলাই স্মৃতি ঘর প্রতিষ্ঠা, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাখা ইত্যাদি বিষয়ে বিরোধী জোটকে খুশী করেছেন, বিপরীতে বিচারালয়, প্রশাসন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা, দুদক, মানবাধিকার বিষয়ক ব্যবস্থা নিজেদের কর্তৃত্বে রেখে রাষ্ট্র পরিচালনার লাগাম কতৃত্ববাদী পন্থায় আরো শক্তভাবে ধরতে চেয়েছেন। অবশ্য দুদক ও মানবাধিকার কমিশনের সংস্কার ও গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করে আরও শক্তিশালী করে পরবর্তী সময়ে আইন করার প্রতিশ্রুতি বিএনপির পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে। বিরোধী জোট যতটুকু অর্জন করেছে আপাত তাতেই খুশী। কিন্তু বিরোধী হিসেবে রাজনৈতিক স্টান্টবাজি অনুযায়ী যা যা বক্তব্য ও কর্মসূচী দেয়া প্রয়োজন তা বিরোধী জোট দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও দেবে। আসলে তারা কতৃত্ববাদী ব্যবস্থার বিরোধী নয় বরং কতৃত্ববাদী ব্যবস্থার মাধ্যমে উগ্রবাদী ও ধর্মান্ধ রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করাই তাদের মূল উদ্দেশ্য— যেমনটা তারা করেছেন ইউনূসের কর্তৃত্ববাদী শাসনকে ব্যবহার করে। ‘সংস্কার’ শব্দটি তাদের দূরভিসন্ধি বাস্তবায়নের ঢাল মাত্র। তবে দায়মুক্তিসহ নানা বিষয় ভবিষ্যতে কোন দিকে মোড় নেয় বলা মুশকিল। ইউনূস আমলজুড়ে মব সন্ত্রাস সহ মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাঙা, মাজার ভাঙা, হত্যাকান্ড সংঘটিত করা, ছায়ানট-উদীচী ও সংবাদমাধ্যমে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় তো দায়মুক্তি দেয়া হয়নি। থানা থেকে অস্ত্র লুটের ঘটনায়ও দায় মুক্তি দেয়া হয়নি। কানে টান পড়লে মাথাও আসবে।

ইউনূস আমল বা অনির্বাচিত আমলের সমাপ্তি হলেও যে কাউকে খুনের মামলায় অন্তর্ভুক্ত করে আটক করা, রিমান্ডে নেয়া ও জেলে পুরে রাখার ‘ ইউনূস - আসিফ নজরুল সংস্কৃতি’ বিএনপি আমলেও চালু আছে। প্রতিদিনই এ ধরণের গ্রেফতারি চলছে। ঘটনা কই আর গ্রেপ্তার কই— মানুষ মিলাতে পারে না। ঘটনার জন্য মামলা হচ্ছে, না মামলার জন্য ঘটনা সাজিয়ে রাখা আছে! বিএনপি আমলেও মাজারের উপর হামলা ও পীরকে পিটিয়ে মারার ‘তৌহিদী জনতা’ সংস্কৃতি চালু আছে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার ‘ডাস্টবিন শফিক’ এখনো ফেসবুকে উষ্কানিমূলক স্ট্যাটাস দিচ্ছেন। জ্বালানি সংকটের এই সময়ে তিনি স্ট্যাটাস দিলেন আমাদের সময়ে এ পরিস্থিতি হলে ‘ওই চল যমুনা যাই!! ...... হতো।’ তিনি কি প্রকারান্তরে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন (না থাকলেও সরকারিভাবে যমুনা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন) ঘেরাও করার উষ্কানি দিলেন? অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মত, ২০০৮ সালের নির্বাচিত সরকারকে ক্রমান্বয়ে এক এগারো সরকারের এক্সটেনশনে পরিণত করা হয়েছিলো। বর্তমান পরিস্থিতি দেখে জনমানসে প্রশ্ন জাগছে তাহলে ২০২৬-এ নির্বাচিত সরকারকেও কি ইউনূস সরকারের একধরনের এক্সটেনশনে পরিণত করার জন্য অপ্রকাশ্য কুশীলবরা সক্রিয়?

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬


নির্বাচনী ধারাবাহিকতা না নির্বাচনপূর্ব ধারার এক্সটেনশন!

প্রকাশের তারিখ : ১৯ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমীন সাংবাদিক সম্মেলন করে বলেছেন ‘আমাদের সরকারের এই ৬০ দিনে সবচাইতে বড় অর্জন বাংলাদেশের জনগণ তারেক রহমানকে বিশ্বাস করেছেন এবং তারেক রহমান জনগণকে বিশ্বাস করেছেন।’ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী কয়েকদিন আগে ফেইসবুক পোস্টে বলেছেন, ‘পাহাড়সমান সমস্যার ভার এবং মানুষের সীমাহীন প্রত্যাশার মধ্যে যাত্রা শুরু করা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার ইতোমধ্যেই সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। তার বিনয়, রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী হয়েও সহজ জীবনযাপন, একাগ্রতা ও সময়ানুবর্তিতা মানুষের মধ্যে আস্থা ও আশার সঞ্চার করেছে।’ সত্যতা থাকলেও এসব কথা বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের দু’মাস পার হওয়ার আগেই ব্যাকারনের বর্তমান কাল (প্রেজেন্ট টেন্স) থেকে অতীত কালে (পাস্ট টেন্স) পরিণত হতে চলেছে। অর্থাৎ তারেক রহমান মানুষের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিলেন এবং মানুষের মধ্যে আশা ও আস্থার সঞ্চার করেছিলেন। কিন্তু অল্প সময়েই আশা ভরসার জায়গাটা নিম্নগামী।

মানুষ প্রথমেই ধাক্কা খেলো তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের দিনেই বিদায়ী প্রধান উপদেষ্টার নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দেখে। ইউনূস মনে করেছিলেন ‘রাষ্ট্র নায়ক’ হিসেবে তার উপর যে বিশাল দায়িত্ব তা সামাল দেয়ার জন্য তারও একজন ‘অজিত দোভাল’ লাগবে। তাই চটজলদি মার্কিন মুলুক থেকে উড়িয়ে নিয়ে আসা হলো খলিলুর রহমানকে। ব্যক্তি হিসেবে নিঃসন্দেহে তিনি বিনয়ী ও বন্ধুসুলভ। কিন্তু রাষ্ট্রীয় গুরুদায়িত্ব পালনে তো বিনয়ী হলে চলে না। নিরাপত্তা ইস্যুর সঙ্গে তো দেশের পররাষ্ট্রনীতিও যুক্ত! তাই দায়িত্ব নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে পররাষ্ট্র উপদেষ্টাকে অনেকটা নিস্ক্রিয় করে পররাষ্ট্র বিষয়ক ইস্যুতেও তিনি তার হাতে স্টিয়ারিং তুলে নেন। করিডোর, বন্দর সহ নানা ইস্যুতে তিনি প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা রাখছিলেন। ঐ সময়ে বিএনপি নেতৃত্বও ছাত্র উপদেষ্টাদের সহ তার অপসারন দাবী করেছিলেন। আমেরিকার সঙ্গে যে দেশ বিরোধী গোপন বাণিজ্য চুক্তি তা সম্পাদনে তিনিই নেতৃত্ব দেন। তাকেই টেকনোক্র্যাট কোটায় পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে দেখে সবাই টাসকি খেলো। বুঝে নিলো ইউনূস মার্কিনী স্বার্থের সঙ্গে দেশকে ১৮ মাসে এমন আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখে গেছেন যে সরকার বদল হলেও তার থেকে বের হওয়ার পথ নেই। হয়তোবা লন্ডন সমাঝোতার অপ্রকাশিত শর্তে এমনটা উল্লেখ ছিলো!

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগ দেখেও সবাই বিষ্মিত হলো। বিশ্ববিদ্যালয় ভাইস চ্যান্সেলর থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশন বা জেলা পরিষদে প্রশাসক সব ক্ষেত্রেই দলীয় বিবেচনা থেকে নিয়োগ দান বিএনপিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আর মানুষ ক্ষুব্ধ হলো, বিবেকের দংশনে জর্জরিত হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার সহযোগী ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দন্ডপ্রাপ্তদের জন্য শোক প্রস্তাব গ্রহণের বহর দেখে। অথচ নিজেদেরকে মুক্তিযুদ্ধের দল দাবী করে নির্বাচনী প্রচারণায় বিএনপি জনগণের কাছে ভোট প্রার্থনা করেছে। জামাতকে স্বাধীনতা বিরোধী আখ্যায়িত করে তাদেরকে পরাভূত করার আহ্বান জানিয়েছে। সংসদ নেতা তারেক জিয়ার উপস্থিতিতে জাতীয় সংসদে যখন বিতর্কিত ঐ শোক প্রস্তাবসমূহ গৃহীত হিসেবে গণ্য হলো তখন মনে প্রশ্ন জাগছিলো ’৭১-এর ২৬ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণাটি পাঠ করার পর জিয়াউর রহমান যদি নিরস্ত্র অবস্থায় এই নিজামী- মুজাহিদদের সামনে পড়তেন তার পরিনতি তখন কী হতো! কী পরিনতি হতো আজকের সংসদের স্পিকার সম্মুখ সমরের মুক্তিযোদ্ধা বীর বিক্রম মেজর হাফিজ উদ্দিনের যদি তিনি ’৭১-এ জামাতীদের হাতে ধরা পড়তেন?

ক্রিকেটপ্রেমী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ পরিচিত। শহর থেকে গ্রাম সর্বত্রই ক্রিকেট খেলা নিয়ে মানুষের আগ্রহ। ক্রিকেট বোর্ডের নতুন এডহক কমিটি গঠন দেখে সেই মানুষ হতবাক। কমিটিতে প্রাধান্য পেয়েছেন সরকার দলীয় রাজনৈতিক নেতারা উত্তরাধিকাররা। পত্রিকায় প্রকাশিত তাদের একমাত্র ক্রেডেনশিয়াল-কে কোনো মন্ত্রী বা নেতার ছেলে, মেয়ে বা ভাই-বোন। কমিটি দেখে ক্রিকেটপ্রেমীরা বলছেন বিশ্বকাপ আমাদের ঘরে এই এলো বলে! নির্বাচিত সরকারের কাছে মানুষের প্রধান আশা ছিলো যে সরকার কতৃত্ববাদ, দলবাজি ও পরিবারতন্ত্র থেকে বেরিয়ে দল ও মত প্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করবে। স্বাধীন বিচার বিভাগের ব্যবস্থা করে আইনের শাসন এবং নিরপেক্ষ প্রশাসন গড়ে তুলে সুশাসন নিশ্চিত করবে, সীমাহীন দুর্নীতির যে রাজত্ব কায়েম হয়েছে তার লাগাম টেনে ধরবে। কিন্তু প্রত্যাশাকে হতাশায় পরিণত করে সংসদের প্রথম অধিবেশনতো প্রায় শেষ হতে চলেছে।

ইউনূস আমলে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারী হয়েছিলো যার মধ্যে ১১৩টি অধ্যাদেশ চলতি অধিবেশনে গৃহীত হয়েছে। ২০টি অধ্যাদেশ বাতিল বা তার কার্যকারিতা হারিয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ, অধস্তন আদালতের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণে স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, দুদক আইন সংশোধন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ সংক্রান্ত জরুরি অধ্যাদেশ। অধ্যাদেশের কারনেই এগুলো আইনে পরিণত করতে হবে তা নয়। বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, দলের ইশতেহার এবং মানুষের আকাঙ্ক্ষা এসব বিবেচনায় অধ্যাদেশ সমূহ বা তা প্রয়োজন মতো সংশোধন করেও আইন করা যেতো। কিন্তু চলে আসা কতৃত্ববাদী ব্যবস্থায় আইন, বিচার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির দুর্নীতি, মানবিক অধিকার সুরক্ষা ইত্যাদি বিষয়াদির উপর লাগাম বিএনপি সরকার দলীয় ভাবে রাখতে চায়। অথচ অতি নিকট অতীত আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে সর্বক্ষেত্রে কতৃত্ববাদ কি ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনে।

বিএনপি সেই সব অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করতে সুপারিশ করেছে যেগুলো দলীয়ভাবে তার পক্ষে যায়। যেমন ইউনূস সরকার জনপ্রতিনিধিদের ইচ্ছেমতো বরখাস্তের সুযোগ রেখে অধ্যাদেশ জারি করেছিল। বিএনপি সেটার সুযোগ নিয়ে ঐ অধ্যাদেশকে আইনে পরিনত করেছে। অতীতে সব সরকারই স্থানীয় সরকারকে নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগের একটি হাতিয়ার হিসেবে দেখতে চেয়েছে। সেই প্রচেষ্টার বিপরীতে কিছু করা হলো না। আওয়ামী লীগ আমলেও জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ ছিল প্রক্রিয়াভিত্তিক ও শর্তসাপেক্ষ। এখন আওয়ামী আমল অপেক্ষা খারাপ আইন হলো।

ইউনূস সরকারের নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বেআইনি ঘোষণার সময় বিএনপি বলেছিলো নির্বাহী আদেশে কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের পক্ষে তারা নয়। এ বিষয়ে জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে। এই রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েই তারা ভোটের সময় আওয়ামী সমর্থকদের কাছে যায় ও তাদের ভোট চায়। আওয়ামী লীগকে ভোটে অংশগ্রহণের সুযোগ না দিয়ে জনগণকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ দেয়া হয়নি। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন চব্বিশের হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে যে তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছিল, সেখানেও রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ না করার বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছিল। ইউনূস সরকার ঐ রিপোর্টকে বিচার প্রক্রিয়ায় এবং রাজনৈতিকভাবেও কাজে লাগালেন। কিন্তু রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ না করার সুপারিশ মানলেন না। বিএনপিও পূর্বের ঘোষণা থেকে সরে এসে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আদেশকে আইনে পরিণত করে গণতন্ত্রের পথে যাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে রাখলো। সম্ভবত স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগকে দল গোছানোর সুযোগ না দেয়া এবং নৌকা সমর্থকদের যে ভোট এবার ধানের শীষে এসেছে তার একটা অংশ স্থায়ী করার লক্ষ্যে বিএনপির এ প্রচেষ্টা। আবার এ আইন ‘৭১ এর যুদ্ধাপরাধী দলের বিরুদ্ধে প্রয়োগের রাস্তাও কিন্তু খোলা থাকলো। কেননা বীর মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় বদল আনলেও এটা কিন্তু বহাল আছে যে, বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে হানাদার ও দখলদার পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী ও তাদের এদেশীয় সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আলশামস, তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং দালাল ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন তারাই মুক্তিযোদ্ধা। অর্থাৎ দেশের আইন অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের বিরোধী অবস্থানে রয়েছে জামাত।

সংসদে কোনো সিদ্ধান্ত যদি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিঃশেষ করে দেয়ার উদ্দেশ্যে নেয়া হয়, সেটি গণতন্ত্রের জন্য স্বস্তির সংবাদ হতে পারে না। আবার আওয়ামী লীগ নিয়ে পরিস্থিতিটা এমন, ‘যার বিয়ে তার খবর নাই, পাড়াপড়শীর ঘুম নাই’। তারা এ মূহুর্তে রাজনীতিতে সক্রিয় হতে চান কিনা তাও স্পষ্ট নয়। দেশে যে বিরাট রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে গেছে, মানুষের বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মনোজগতে যে অভাবনীয় পরিবর্তন এসেছে সেসব বিষয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের হুঁশ আছে বলেও মনে হয় না। যাক আওয়ামী লীগ আওয়ামী লীগেরটা বুঝুক। কিন্তু ভয়টা অন্যখানে। ভয় হয় এ ধরনের আইন বুমেরাং না হয়ে আসে। এটাতো আমাদের অজানা নয় এক এগারোর ‘মাইনাস টু’ থিওরির প্রবক্তারা দেশীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে ক্রিয়াশীল ছিল এবং আছে। জুলাই অভ্যুত্থানে পরেও তারা কিন্তু সে লাইনে চেষ্টা করেছে। সেভাবে বয়ান সামনে এনেছে। কিন্তু পরিস্থিতির মোড় সে দিকে ঘুরানো সম্ভব না হওয়ায় ‘লন্ডন ˆবঠকের’ আয়োজনে যেতে হয়। বিএনপিরও তো অজানা নয়, এবারের নির্বাচনে জামাত আমীর এবং এনসিপির আহবায়কসহ কয়েকজনকে জিতিয়ে আনতে বিশেষ শক্তি যে কৌশলী ভূমিকা রেখেছে সে ক্ষেত্রে বিএনপিকে অসহায় মনে হয়েছে।

তবে সবটা দেখে মনে হচ্ছে সরকারী দল ও বিরোধী দলের মধ্যে এক ধরনের অঘোষিত সমঝোতার মধ্য দিয়েই সংসদের প্রথম অধিবেশন শেষ হবে। সরকারী দল শোক প্রস্তাব, জুলাই যোদ্ধা দায়মুক্তি, জুলাই স্মৃতি ঘর প্রতিষ্ঠা, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাখা ইত্যাদি বিষয়ে বিরোধী জোটকে খুশী করেছেন, বিপরীতে বিচারালয়, প্রশাসন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা, দুদক, মানবাধিকার বিষয়ক ব্যবস্থা নিজেদের কর্তৃত্বে রেখে রাষ্ট্র পরিচালনার লাগাম কতৃত্ববাদী পন্থায় আরো শক্তভাবে ধরতে চেয়েছেন। অবশ্য দুদক ও মানবাধিকার কমিশনের সংস্কার ও গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করে আরও শক্তিশালী করে পরবর্তী সময়ে আইন করার প্রতিশ্রুতি বিএনপির পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে। বিরোধী জোট যতটুকু অর্জন করেছে আপাত তাতেই খুশী। কিন্তু বিরোধী হিসেবে রাজনৈতিক স্টান্টবাজি অনুযায়ী যা যা বক্তব্য ও কর্মসূচী দেয়া প্রয়োজন তা বিরোধী জোট দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও দেবে। আসলে তারা কতৃত্ববাদী ব্যবস্থার বিরোধী নয় বরং কতৃত্ববাদী ব্যবস্থার মাধ্যমে উগ্রবাদী ও ধর্মান্ধ রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করাই তাদের মূল উদ্দেশ্য— যেমনটা তারা করেছেন ইউনূসের কর্তৃত্ববাদী শাসনকে ব্যবহার করে। ‘সংস্কার’ শব্দটি তাদের দূরভিসন্ধি বাস্তবায়নের ঢাল মাত্র। তবে দায়মুক্তিসহ নানা বিষয় ভবিষ্যতে কোন দিকে মোড় নেয় বলা মুশকিল। ইউনূস আমলজুড়ে মব সন্ত্রাস সহ মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাঙা, মাজার ভাঙা, হত্যাকান্ড সংঘটিত করা, ছায়ানট-উদীচী ও সংবাদমাধ্যমে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় তো দায়মুক্তি দেয়া হয়নি। থানা থেকে অস্ত্র লুটের ঘটনায়ও দায় মুক্তি দেয়া হয়নি। কানে টান পড়লে মাথাও আসবে।

ইউনূস আমল বা অনির্বাচিত আমলের সমাপ্তি হলেও যে কাউকে খুনের মামলায় অন্তর্ভুক্ত করে আটক করা, রিমান্ডে নেয়া ও জেলে পুরে রাখার ‘ ইউনূস - আসিফ নজরুল সংস্কৃতি’ বিএনপি আমলেও চালু আছে। প্রতিদিনই এ ধরণের গ্রেফতারি চলছে। ঘটনা কই আর গ্রেপ্তার কই— মানুষ মিলাতে পারে না। ঘটনার জন্য মামলা হচ্ছে, না মামলার জন্য ঘটনা সাজিয়ে রাখা আছে! বিএনপি আমলেও মাজারের উপর হামলা ও পীরকে পিটিয়ে মারার ‘তৌহিদী জনতা’ সংস্কৃতি চালু আছে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার ‘ডাস্টবিন শফিক’ এখনো ফেসবুকে উষ্কানিমূলক স্ট্যাটাস দিচ্ছেন। জ্বালানি সংকটের এই সময়ে তিনি স্ট্যাটাস দিলেন আমাদের সময়ে এ পরিস্থিতি হলে ‘ওই চল যমুনা যাই!! ...... হতো।’ তিনি কি প্রকারান্তরে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন (না থাকলেও সরকারিভাবে যমুনা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন) ঘেরাও করার উষ্কানি দিলেন? অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মত, ২০০৮ সালের নির্বাচিত সরকারকে ক্রমান্বয়ে এক এগারো সরকারের এক্সটেনশনে পরিণত করা হয়েছিলো। বর্তমান পরিস্থিতি দেখে জনমানসে প্রশ্ন জাগছে তাহলে ২০২৬-এ নির্বাচিত সরকারকেও কি ইউনূস সরকারের একধরনের এক্সটেনশনে পরিণত করার জন্য অপ্রকাশ্য কুশীলবরা সক্রিয়?

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত