সংবাদ

ধর্মের নামে সহিংসতা: কোথায় আমাদের সীমারেখা?


জিয়াউদ্দীন আহমেদ
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:২৯ পিএম

ধর্মের নামে সহিংসতা: কোথায় আমাদের সীমারেখা?
কুষ্টিয়ায় ধর্ম বিকৃতির অভিযোগে শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীর নামে একজনকে পিটিয়ে হত্যা করেছে এলাকাবাসী

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নে ইসলাম ধর্ম বিকৃতির অভিযোগে শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীর নামে এক সুফি পীরকে পিটিয়ে হত্যা করেছে এলাকাবাসী| তার আস্তানায় হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগও করা হয়েছে| তাকে যেদিন হত্যা করা হয় সেদিন সকালে কিছু লোক গোপনে বৈঠক করে এবং বৈঠকের পর কাটছাঁট করা তার ৩৬ সেকেণ্ডের একটি ভিডিও তিনটি ফেইসবুক পেইজ ও চারটি ব্যক্তিগত আইডি থেকে প্রচার করা হয়| এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘সত্যের সন্ধানে ফিলিপনগর’| ভিডিওটি পুলিশের নজরে এলে তারা এলাকায় গিয়ে খোঁজ-খবরও নিয়েছে| দুপুরে জনা পঞ্চাশেক লোক শামীমের দরবারে উপস্থিত হয়ে পুলিশের সম্মুখেই শামীমকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করে| পুলিশ ৫০ জন লোককে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি, অবশ্য পারার কথাও নয়| কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় মব সৃষ্টির কাহিনী পুলিশ সম্যকভাবে অবহিত, তখন মব নিয়ন্ত্রণ ছিল তাদের এক্তিয়ার বহির্ভূত| বিএনপি সরকার মব নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা দিলেও তার নিয়ন্ত্রণ পুলিশের এক্তিয়ারভুক্ত কিনা তা তারা এখনো বুঝে ওঠতে পারছে না|

দরবার ভাঙচুর ও হত্যায় অংশগ্রহণ করেছে যারা তাদের মধ্যে রয়েছে শিশু, কিশোর ও যুবক, দুয়েকজন ব্যতীত দাঙ্গাবাজদের কারো মুখে দাড়ি বা টুপি ছিল না| অনুভূতিতে আঘাত লাগার অজুহাতে আওয়ামী লীগ আমলেও যারা দেশের বিভিন্ন স্থানে মব সৃষ্টি করেছে তাদের বেশিরভাগ ছিল হাফপেন্ট আর লুঙ্গিপরা| তবে এদের যারা উত্তেজিত করে তারা ভিন্ন জগতের মানুষ, এদের বলা হয় ‘তৌহিদি জনতা’ বা ধর্মীয় ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ বিক্ষুব্ধ মুসলিম জনসমষ্টি| এই বিক্ষুব্ধ জনসমষ্টি প্রচলিত আইন মানে না, প্রশাসন মানে না, সরকারও মানে না| ভিকটিম শামীম রেজার যে ভিডিওটি পরিকল্পিতভাবে ঘটনার দিন প্রচার করা হয়েছিল তা ছিল ২০২১ বা ২০২৩ সনের, ওই ভিডিওতে তাকে কৃষ্ণ সাজে দেখা গেছে, তখন তার দাড়ি-চুল ছিল কালো|তিনি নাকি বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে সম্রাট আকবরের মতো একটা সমন্বয় করতে চেয়েছিলেন| ১৫৮২ সনে মুঘল সম্রাট আকবর তার প্রবর্তিত ‘দীন-ই-ইলাহি’র মাধ্যমে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে গেছেন| তার ওই মতবাদ কেউ গ্রহণ না করলেও মুসলিম ইতিহাসে তিনি কখনো ‘দীন-ই-ইলাহি’ প্রচারের জন্য অসম্মানিত হননি| শুধু তাই নয়, এবার পহেলা বৈশাখে মুসলিম বাঙালিরা ‘বৈশাখ-ই আকবর’ নামে একটি কর্মসূচিও পালন করেছে| শামীম রেজার ভিডিওটি ২০২১-২৫ সাল পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছিল| কিন্তু তাতে কোন অসুবিধা হয়েছে বলে কেউ অভিযোগ করেনি| কেউ তার ভিডিও দেখে ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়েছে বলেও শোনা যায়নি| তাহলে ৫ বছর পর ২০২৬ সালে হঠাৎ কেন কিছু লোকের অনুভূতিতে আঘাত লাগলো?

ধর্মীয় ইস্যুতে এমন বিক্ষুব্ধ জনগোষ্ঠী বেশি দেখা যায় পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশে| এই তিন দেশে ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর কিছু মানুষ ভিন্নমতের লোকদের হত্যা করার উন্মাদনায় উন্মত্ত| রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতাকে নির্বিঘ্ন রাখতে এদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দেখেও না দেখার ভান করে, তাই এদের বিরুদ্ধে লোক দেখানো ব্যবস্থা নিতেও গড়িমসি করে| বাংলাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ভোট হারানোর ভয়ে বাম-ডান সব রাজনৈতিক দল এই উগ্রতাকে সমীহ করে, তাই গণতান্ত্রিক নির্বাচন এই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে সাম্প্রদায়িক করে তুলছে| সরকারের উদাসীনতা আর প্রশাসনের নির্লিপ্তায় ধর্মীয় ইস্যুতে বিক্ষুব্ধ এই জনগোষ্ঠী বেপরোয়া| ধর্ম নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টিকারীদের হত্যা করতে পারার মধ্যে তারা স্বর্গীয় সুখ পায়, জেহাদের উত্তেজনায় ধর্মের বিরুদ্ধে গিয়ে জীবিত মানুষকে পুড়িয়ে মারে, কবর থেকে লাশ তুলে পিটাতে পিটাতে উল্লাস করে, মরদেহের ওপর ওঠে নৃত্য করে, পিটিয়ে মারা মৃতদেহ গাছে ঝুলিয়ে আগুনে পোড়ায়|

মানুষ পোড়ানো ইসলাম ধর্মে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও এটাকে তারা ধর্ম অবমাননা মনে করে না| বিভিন্ন আলেম ধর্ম নিয়ে কটুক্তি করলেও এদের অনুভূতিতে আঘাত লাগে না, আঘাত বেশি লাগে যখন কোন সুফি বা হিন্দু ধর্ম নিয়ে কথা বলে| মানুষ হিংস্র বলেই খান জাহান আলী মাজারের পুকুর ঘাটে মানত করে বেঁধে রাখে ছাগল বা কুকুর, ছুঁড়ে মারে হাঁস-মোরগ, পুকুরের কুমিরগুলো যখন অসহায় প্রাণীগুলো খেতে থাকে তখন পাড়ে অপেক্ষমান জনতা আনন্দে হাত তালি দেয়| আনন্দ পায় বলেই নুরাল পাগলার লাশ কবর থেকে তুলে পুড়িয়ে দেয়া হয়, আনন্দ পায় বলেই ২৮ বছর বয়সী পোষাক শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসকে শুধু পিটিয়ে হত্যা করা হয় না, গাছের ডালে টাঙিয়ে পুড়িয়েও দেয়া হয়| মানুষ হিংস্র| হিংস্র বলেই এক সময় হিংস্র পশুর খাঁচায় অপরাধীদের ফেলে দিয়ে তার বাঁচার আকুতি ও অসহায়ত্ব দেখে দর্শক আনন্দ পেত| এখনো সউদি আরবে গত শুক্রবার জুমার নামাজের পর চোর-ডাকাত-ব্যভিচারীর হাত ও গর্দান কাটার সময় মুসল্লিদের আনন্দ প্রকাশ করতে দেখা যায়| ৭০-৭২ খ্রিস্টাব্দে দুই গ্ল্যাডিয়েটরের আমৃত্যু লড়াইয়ে ভয়ঙ্কর মৃত্যুদৃশ্য দেখার জন্য রাজা-রাণীসহ ইতালির কলোসিয়ামে ৮০ হাজার দর্শকের সমাগম হতো| অনেক সময় বাঘ, সিংহের মতো হিংস্র প্রাণীর সঙ্গেও গ্লাডিয়েটরদের বদ্ধ খাঁচায় লড়াই করতে হতো, লড়াইরত গ্লাডিয়েটরের করুন মৃত্যু দেখে দর্শকরা কলোসিয়ামের গ্যালারিতে আনন্দে উল্লাস করতো| মানুষ হত্যায় যেই মানুষগুলো এত মজা পায় তারা সৃষ্টিকর্তার আশরাফুল মাখলুকাত হতে পারে না|

ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে বাড়াবাড়ির খবর নতুন কিছু নয়| আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে লালমনিরহাটের পাটগ্রামে যে রোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছে তা হিংস্র মানুষের বীভৎস রূপ| কোরআনে পা রাখার গুজব ছড়িয়ে জুয়েল নামে যে লোককে পিটিয়ে আর আগুনে পুড়ে হত্যা করা হয়েছিল তিনি মানসিকভাবে সুস্থ ছিলেন না| অসুস্থ্য হলেও তিনি যে কোরআনে পা রাখেননি তা মসজিদের খাদেম বারবার উল্লেখ করেছেন| জুয়েল রোজা রাখত, নামাজ পড়ত, সেইদিনও নামাজ পড়ে মসজিদে রাখা কোরআন শরীফ দেখছিলেন| কোরআনে পা রাখার গুজব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে শত শত লোক এসে জুয়েলকে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদে নিয়ে গিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলল| নিহত জুয়েলের দুই হাত, গলায় ও কোমরে রশি লাগিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ চত্বর থেকে প্রায় ৪২০ মিটার দূরে টেনেহিঁচড়ে আন্তজেলা মহাসড়কে নিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়| পিটিয়ে হত্যা, টেনেহিঁচড়ে নেয়া ও আগুন লাগানোর কাজে উৎসাহীদের মধ্যে ৬৫ শতাংশ ছিল কিশোর|

মব সৃষ্টি করে যে কোন মানুষকে বাংলাদেশে পিটিয়ে মেরে ফেলা সহজ| ‘ছেলেধরা’ অভিহিত করে বাংলাদেশে বহু লোককে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে| রাস্তায় যে কোন লোককে দেখিয়ে চোর বা ছিনতাইকারী বললেই আশপাশের কেউ যাচাই না করেই পিটাতে শুরু করে দেয়| অনুভুতির মব যত্রতত্র| প্রতিটি সরকারের প্রশ্রয়ে এই জাতীয় দানবীয় কর্মকাণ্ডের জন্য ইসলাম শান্তির ধর্ম হয়ে উঠতে পারল না| এআই-এর ভয়ানক আধিপত্যে এখন বোঝা যায় না, কোনটি আসল বা কোনটি নকল| আসল হলেও পিটিয়ে মেরে ফেলতে হবে কেন? ধর্ম কি এতই ঠুনকো যে, কেউ কিছু একটা বললেই তা বিলীন হয়ে যাবে! মনে হচ্ছে আমাদের ধর্মীয় শিক্ষায় কোন গলদ আছে, নতুবা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ ওঠলেই মানুষ এত হিংস্র হয়ে উঠে কেন ? বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ অন্যায় করে, ঘুষ খায়, মানুষ ঠকায়, মিথ্যা বলে, ধর্ষণ করে, বলাৎকার করে, কিন্তু কারো ধর্ম নিয়ে কটুক্তি করার কথা শোনা মাত্রই প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে পড়ে| ব্যক্তি জীবনে হয়তো এদের কেউই ধর্মকর্মে একনিষ্ঠ নয়| ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত হলে শাস্তির বিধান আছে, কিন্তু দণ্ডবিধি বা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ‘ধর্মীয় অনুভূতির’ কোন স্পষ্ট সংজ্ঞা নেই| অবশ্য সংজ্ঞা দেয়া সম্ভবও নয়, কারণ কোন কথায় কার অনুভুতিতে কিভাবে আঘাত লাগবে তা সুনির্দিষ্ট করা কঠিন|

১৯৫৩ সনে পাকিস্তানে আহমদিয়া বিরোধী দাঙ্গায় ২ হাজার কাদিয়ানিকে হত্যা করা হয়, দাঙ্গায় উসকানি দেয়ার অপরাধে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়| আহমদিয়া বিরোধী দাঙ্গার পর পাকিস্তান সরকার এর তদন্তে লাহোর হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ মুনিরকে প্রধান করে ‘পাঞ্জাব ডিস্টারবেন্সেস ইনকোয়ারি কোর্ট’ গঠন করে| ‘মুসলমান কাকে বলে’- মুনির কমিশনের এমন প্রশ্নের উত্তরে পাকিস্তানের নামকরা ১০ জন আলেম ১০ রকম সংজ্ঞা দেন এবং প্রত্যেক আলেমের সংজ্ঞা অনুযায়ী অন্য আলেমরা ‘কাফের’ হয়ে যান| মুনির রিপোর্ট আরও উল্লেখ করে যে, যদি সব আলেমের সংজ্ঞা একসাথে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে পাকিস্তানে কোনো মুসলমানই থাকে না| বাংলাদেশেও একজন আলেম আরেকজন আলেমকে ‘কাফের’ ফতোয়া দিচ্ছে| তারপরও ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত লাগার অভিযোগ উত্থাপনের আইন বলবৎ আছে|

শক্তি প্রয়োগে ভীতি সৃষ্টি হয়, কিন্তু মন জয় করা যায় না| অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের দুইজন নামকরা আলেমের ভিসা বাতিল করেছে অস্ট্রেলিয়া| জাপানে মসজিদ নির্মাণে বাধা দিচ্ছে স্থানীয় জাপানিরা| শুধু জাপান নয়, গ্রীস এবং ইতালিও মসজিদ করতে দিচ্ছে না| জাপান মুসলমানদের কবর দিয়ে জায়গা নষ্ট করারও ঘোর বিরোধী| পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ইসলাম ধর্ম নিয়ে ফোবিয়া বা ভীতি রয়েছে| আমার এক সহকর্মীর নামের শেষ অংশে ‘ইসলাম’ থাকায় আমেরিকা ভিসা দেয়নি, বোম্বে সিনেমার অভিনেতা শাহরুখের নামের শেষে ‘খান’ থাকায় তাকে আমেরিকার বিমানবন্দরে দুই ঘণ্টা ধরে জেরা করা হয়েছে, অবসর নেয়ার পর ভারতের রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালামের মুসলিম নামের কারণে আমেরিকার বিমানবন্দরে তাকে নাজেহাল করা হয়| ২০২৪ সনের পিউ রিসার্চের রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বের ৪০টিরও বেশি দেশে মুসলিমদের প্রতি সামাজিক ম্বৈরিতা ‘খুব উচ্চ’ পর্যায়ে রয়েছে| তাই ইসলাম ধর্মকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হলে সুরা নিসার ১৪০ নম্বর আয়াত মেনে চলা ফরজ, যাতে বলা হয়েছে, ‘যখন তোমরা শুনবে আল্লাহর আয়াতসমূহ অস্বীকার করা হচ্ছে ও তাকে বিদ্রূপ করা হচ্ছে, তখন তোমরা তাদের সঙ্গে বসবে না, যে পর্যন্ত না তারা অন্য কোনো প্রসঙ্গে লিপ্ত হবে’|

[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬


ধর্মের নামে সহিংসতা: কোথায় আমাদের সীমারেখা?

প্রকাশের তারিখ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নে ইসলাম ধর্ম বিকৃতির অভিযোগে শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীর নামে এক সুফি পীরকে পিটিয়ে হত্যা করেছে এলাকাবাসী| তার আস্তানায় হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগও করা হয়েছে| তাকে যেদিন হত্যা করা হয় সেদিন সকালে কিছু লোক গোপনে বৈঠক করে এবং বৈঠকের পর কাটছাঁট করা তার ৩৬ সেকেণ্ডের একটি ভিডিও তিনটি ফেইসবুক পেইজ ও চারটি ব্যক্তিগত আইডি থেকে প্রচার করা হয়| এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘সত্যের সন্ধানে ফিলিপনগর’| ভিডিওটি পুলিশের নজরে এলে তারা এলাকায় গিয়ে খোঁজ-খবরও নিয়েছে| দুপুরে জনা পঞ্চাশেক লোক শামীমের দরবারে উপস্থিত হয়ে পুলিশের সম্মুখেই শামীমকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করে| পুলিশ ৫০ জন লোককে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি, অবশ্য পারার কথাও নয়| কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় মব সৃষ্টির কাহিনী পুলিশ সম্যকভাবে অবহিত, তখন মব নিয়ন্ত্রণ ছিল তাদের এক্তিয়ার বহির্ভূত| বিএনপি সরকার মব নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা দিলেও তার নিয়ন্ত্রণ পুলিশের এক্তিয়ারভুক্ত কিনা তা তারা এখনো বুঝে ওঠতে পারছে না|

দরবার ভাঙচুর ও হত্যায় অংশগ্রহণ করেছে যারা তাদের মধ্যে রয়েছে শিশু, কিশোর ও যুবক, দুয়েকজন ব্যতীত দাঙ্গাবাজদের কারো মুখে দাড়ি বা টুপি ছিল না| অনুভূতিতে আঘাত লাগার অজুহাতে আওয়ামী লীগ আমলেও যারা দেশের বিভিন্ন স্থানে মব সৃষ্টি করেছে তাদের বেশিরভাগ ছিল হাফপেন্ট আর লুঙ্গিপরা| তবে এদের যারা উত্তেজিত করে তারা ভিন্ন জগতের মানুষ, এদের বলা হয় ‘তৌহিদি জনতা’ বা ধর্মীয় ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ বিক্ষুব্ধ মুসলিম জনসমষ্টি| এই বিক্ষুব্ধ জনসমষ্টি প্রচলিত আইন মানে না, প্রশাসন মানে না, সরকারও মানে না| ভিকটিম শামীম রেজার যে ভিডিওটি পরিকল্পিতভাবে ঘটনার দিন প্রচার করা হয়েছিল তা ছিল ২০২১ বা ২০২৩ সনের, ওই ভিডিওতে তাকে কৃষ্ণ সাজে দেখা গেছে, তখন তার দাড়ি-চুল ছিল কালো|তিনি নাকি বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে সম্রাট আকবরের মতো একটা সমন্বয় করতে চেয়েছিলেন| ১৫৮২ সনে মুঘল সম্রাট আকবর তার প্রবর্তিত ‘দীন-ই-ইলাহি’র মাধ্যমে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে গেছেন| তার ওই মতবাদ কেউ গ্রহণ না করলেও মুসলিম ইতিহাসে তিনি কখনো ‘দীন-ই-ইলাহি’ প্রচারের জন্য অসম্মানিত হননি| শুধু তাই নয়, এবার পহেলা বৈশাখে মুসলিম বাঙালিরা ‘বৈশাখ-ই আকবর’ নামে একটি কর্মসূচিও পালন করেছে| শামীম রেজার ভিডিওটি ২০২১-২৫ সাল পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছিল| কিন্তু তাতে কোন অসুবিধা হয়েছে বলে কেউ অভিযোগ করেনি| কেউ তার ভিডিও দেখে ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়েছে বলেও শোনা যায়নি| তাহলে ৫ বছর পর ২০২৬ সালে হঠাৎ কেন কিছু লোকের অনুভূতিতে আঘাত লাগলো?

ধর্মীয় ইস্যুতে এমন বিক্ষুব্ধ জনগোষ্ঠী বেশি দেখা যায় পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশে| এই তিন দেশে ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর কিছু মানুষ ভিন্নমতের লোকদের হত্যা করার উন্মাদনায় উন্মত্ত| রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতাকে নির্বিঘ্ন রাখতে এদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দেখেও না দেখার ভান করে, তাই এদের বিরুদ্ধে লোক দেখানো ব্যবস্থা নিতেও গড়িমসি করে| বাংলাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ভোট হারানোর ভয়ে বাম-ডান সব রাজনৈতিক দল এই উগ্রতাকে সমীহ করে, তাই গণতান্ত্রিক নির্বাচন এই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে সাম্প্রদায়িক করে তুলছে| সরকারের উদাসীনতা আর প্রশাসনের নির্লিপ্তায় ধর্মীয় ইস্যুতে বিক্ষুব্ধ এই জনগোষ্ঠী বেপরোয়া| ধর্ম নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টিকারীদের হত্যা করতে পারার মধ্যে তারা স্বর্গীয় সুখ পায়, জেহাদের উত্তেজনায় ধর্মের বিরুদ্ধে গিয়ে জীবিত মানুষকে পুড়িয়ে মারে, কবর থেকে লাশ তুলে পিটাতে পিটাতে উল্লাস করে, মরদেহের ওপর ওঠে নৃত্য করে, পিটিয়ে মারা মৃতদেহ গাছে ঝুলিয়ে আগুনে পোড়ায়|

মানুষ পোড়ানো ইসলাম ধর্মে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও এটাকে তারা ধর্ম অবমাননা মনে করে না| বিভিন্ন আলেম ধর্ম নিয়ে কটুক্তি করলেও এদের অনুভূতিতে আঘাত লাগে না, আঘাত বেশি লাগে যখন কোন সুফি বা হিন্দু ধর্ম নিয়ে কথা বলে| মানুষ হিংস্র বলেই খান জাহান আলী মাজারের পুকুর ঘাটে মানত করে বেঁধে রাখে ছাগল বা কুকুর, ছুঁড়ে মারে হাঁস-মোরগ, পুকুরের কুমিরগুলো যখন অসহায় প্রাণীগুলো খেতে থাকে তখন পাড়ে অপেক্ষমান জনতা আনন্দে হাত তালি দেয়| আনন্দ পায় বলেই নুরাল পাগলার লাশ কবর থেকে তুলে পুড়িয়ে দেয়া হয়, আনন্দ পায় বলেই ২৮ বছর বয়সী পোষাক শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসকে শুধু পিটিয়ে হত্যা করা হয় না, গাছের ডালে টাঙিয়ে পুড়িয়েও দেয়া হয়| মানুষ হিংস্র| হিংস্র বলেই এক সময় হিংস্র পশুর খাঁচায় অপরাধীদের ফেলে দিয়ে তার বাঁচার আকুতি ও অসহায়ত্ব দেখে দর্শক আনন্দ পেত| এখনো সউদি আরবে গত শুক্রবার জুমার নামাজের পর চোর-ডাকাত-ব্যভিচারীর হাত ও গর্দান কাটার সময় মুসল্লিদের আনন্দ প্রকাশ করতে দেখা যায়| ৭০-৭২ খ্রিস্টাব্দে দুই গ্ল্যাডিয়েটরের আমৃত্যু লড়াইয়ে ভয়ঙ্কর মৃত্যুদৃশ্য দেখার জন্য রাজা-রাণীসহ ইতালির কলোসিয়ামে ৮০ হাজার দর্শকের সমাগম হতো| অনেক সময় বাঘ, সিংহের মতো হিংস্র প্রাণীর সঙ্গেও গ্লাডিয়েটরদের বদ্ধ খাঁচায় লড়াই করতে হতো, লড়াইরত গ্লাডিয়েটরের করুন মৃত্যু দেখে দর্শকরা কলোসিয়ামের গ্যালারিতে আনন্দে উল্লাস করতো| মানুষ হত্যায় যেই মানুষগুলো এত মজা পায় তারা সৃষ্টিকর্তার আশরাফুল মাখলুকাত হতে পারে না|

ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে বাড়াবাড়ির খবর নতুন কিছু নয়| আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে লালমনিরহাটের পাটগ্রামে যে রোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছে তা হিংস্র মানুষের বীভৎস রূপ| কোরআনে পা রাখার গুজব ছড়িয়ে জুয়েল নামে যে লোককে পিটিয়ে আর আগুনে পুড়ে হত্যা করা হয়েছিল তিনি মানসিকভাবে সুস্থ ছিলেন না| অসুস্থ্য হলেও তিনি যে কোরআনে পা রাখেননি তা মসজিদের খাদেম বারবার উল্লেখ করেছেন| জুয়েল রোজা রাখত, নামাজ পড়ত, সেইদিনও নামাজ পড়ে মসজিদে রাখা কোরআন শরীফ দেখছিলেন| কোরআনে পা রাখার গুজব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে শত শত লোক এসে জুয়েলকে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদে নিয়ে গিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলল| নিহত জুয়েলের দুই হাত, গলায় ও কোমরে রশি লাগিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ চত্বর থেকে প্রায় ৪২০ মিটার দূরে টেনেহিঁচড়ে আন্তজেলা মহাসড়কে নিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়| পিটিয়ে হত্যা, টেনেহিঁচড়ে নেয়া ও আগুন লাগানোর কাজে উৎসাহীদের মধ্যে ৬৫ শতাংশ ছিল কিশোর|

মব সৃষ্টি করে যে কোন মানুষকে বাংলাদেশে পিটিয়ে মেরে ফেলা সহজ| ‘ছেলেধরা’ অভিহিত করে বাংলাদেশে বহু লোককে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে| রাস্তায় যে কোন লোককে দেখিয়ে চোর বা ছিনতাইকারী বললেই আশপাশের কেউ যাচাই না করেই পিটাতে শুরু করে দেয়| অনুভুতির মব যত্রতত্র| প্রতিটি সরকারের প্রশ্রয়ে এই জাতীয় দানবীয় কর্মকাণ্ডের জন্য ইসলাম শান্তির ধর্ম হয়ে উঠতে পারল না| এআই-এর ভয়ানক আধিপত্যে এখন বোঝা যায় না, কোনটি আসল বা কোনটি নকল| আসল হলেও পিটিয়ে মেরে ফেলতে হবে কেন? ধর্ম কি এতই ঠুনকো যে, কেউ কিছু একটা বললেই তা বিলীন হয়ে যাবে! মনে হচ্ছে আমাদের ধর্মীয় শিক্ষায় কোন গলদ আছে, নতুবা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ ওঠলেই মানুষ এত হিংস্র হয়ে উঠে কেন ? বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ অন্যায় করে, ঘুষ খায়, মানুষ ঠকায়, মিথ্যা বলে, ধর্ষণ করে, বলাৎকার করে, কিন্তু কারো ধর্ম নিয়ে কটুক্তি করার কথা শোনা মাত্রই প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে পড়ে| ব্যক্তি জীবনে হয়তো এদের কেউই ধর্মকর্মে একনিষ্ঠ নয়| ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত হলে শাস্তির বিধান আছে, কিন্তু দণ্ডবিধি বা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ‘ধর্মীয় অনুভূতির’ কোন স্পষ্ট সংজ্ঞা নেই| অবশ্য সংজ্ঞা দেয়া সম্ভবও নয়, কারণ কোন কথায় কার অনুভুতিতে কিভাবে আঘাত লাগবে তা সুনির্দিষ্ট করা কঠিন|

১৯৫৩ সনে পাকিস্তানে আহমদিয়া বিরোধী দাঙ্গায় ২ হাজার কাদিয়ানিকে হত্যা করা হয়, দাঙ্গায় উসকানি দেয়ার অপরাধে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়| আহমদিয়া বিরোধী দাঙ্গার পর পাকিস্তান সরকার এর তদন্তে লাহোর হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ মুনিরকে প্রধান করে ‘পাঞ্জাব ডিস্টারবেন্সেস ইনকোয়ারি কোর্ট’ গঠন করে| ‘মুসলমান কাকে বলে’- মুনির কমিশনের এমন প্রশ্নের উত্তরে পাকিস্তানের নামকরা ১০ জন আলেম ১০ রকম সংজ্ঞা দেন এবং প্রত্যেক আলেমের সংজ্ঞা অনুযায়ী অন্য আলেমরা ‘কাফের’ হয়ে যান| মুনির রিপোর্ট আরও উল্লেখ করে যে, যদি সব আলেমের সংজ্ঞা একসাথে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে পাকিস্তানে কোনো মুসলমানই থাকে না| বাংলাদেশেও একজন আলেম আরেকজন আলেমকে ‘কাফের’ ফতোয়া দিচ্ছে| তারপরও ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত লাগার অভিযোগ উত্থাপনের আইন বলবৎ আছে|

শক্তি প্রয়োগে ভীতি সৃষ্টি হয়, কিন্তু মন জয় করা যায় না| অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের দুইজন নামকরা আলেমের ভিসা বাতিল করেছে অস্ট্রেলিয়া| জাপানে মসজিদ নির্মাণে বাধা দিচ্ছে স্থানীয় জাপানিরা| শুধু জাপান নয়, গ্রীস এবং ইতালিও মসজিদ করতে দিচ্ছে না| জাপান মুসলমানদের কবর দিয়ে জায়গা নষ্ট করারও ঘোর বিরোধী| পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ইসলাম ধর্ম নিয়ে ফোবিয়া বা ভীতি রয়েছে| আমার এক সহকর্মীর নামের শেষ অংশে ‘ইসলাম’ থাকায় আমেরিকা ভিসা দেয়নি, বোম্বে সিনেমার অভিনেতা শাহরুখের নামের শেষে ‘খান’ থাকায় তাকে আমেরিকার বিমানবন্দরে দুই ঘণ্টা ধরে জেরা করা হয়েছে, অবসর নেয়ার পর ভারতের রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালামের মুসলিম নামের কারণে আমেরিকার বিমানবন্দরে তাকে নাজেহাল করা হয়| ২০২৪ সনের পিউ রিসার্চের রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বের ৪০টিরও বেশি দেশে মুসলিমদের প্রতি সামাজিক ম্বৈরিতা ‘খুব উচ্চ’ পর্যায়ে রয়েছে| তাই ইসলাম ধর্মকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হলে সুরা নিসার ১৪০ নম্বর আয়াত মেনে চলা ফরজ, যাতে বলা হয়েছে, ‘যখন তোমরা শুনবে আল্লাহর আয়াতসমূহ অস্বীকার করা হচ্ছে ও তাকে বিদ্রূপ করা হচ্ছে, তখন তোমরা তাদের সঙ্গে বসবে না, যে পর্যন্ত না তারা অন্য কোনো প্রসঙ্গে লিপ্ত হবে’|

[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত