স্বাধীনোত্তর যতগুলো জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, আদিবাসী পুরুষরা সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও কখনোই নির্বাচিত হতে পারেননি| আর নারীরা সংরক্ষিত আসন ব্যতীত সাহস দেখাতে পারেননি| বিগত সময়ে দু-একজন নারী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দিলেও দলীয়ভাবে মনোনয়ন আদায় করতে পারেননি| সংরক্ষিত নারী আসনে বারবার বৃহত্তর উত্তরবঙ্গের আদিবাসীরা উপেক্ষিত, অবহেলিত ও বঞ্চিত হয়ে আসছে| আমরা লক্ষ্য করেছি, অতীতে আদিবাসীদের পক্ষে জাতীয় সংসদে চাকমা, রাখাইন, মারমা ও তঞ্চঙ্গ্যা নারীরা একাধিকবার প্রতিনিধিত্ব করেছেন—এর বাইরে তেমন নজির নেই| স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের পরও উত্তরবঙ্গের আদিবাসী নারীরা সংরক্ষিত নারী আসনে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পাননি| পার্বত্য চট্টগ্রামের নির্বাচনী আসনগুলো থেকে আদিবাসীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হয়ে আসছেন, যা এখনও বিদ্যমান; পাশাপাশি সংরক্ষিত আসনেও নারীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে| কিন্তু জাতীয় সংসদে নির্বাচিত আদিবাসী নারী-পুরুষেরা নিজেদের নির্বাচনী এলাকা নিয়েই ব্যস্ত থেকেছেন; অন্য অঞ্চলের আদিবাসীদের আশা-আকাঙ্ক্ষা, চাওয়া-পাওয়া, সুখ-দুঃখের বিষয়ে তাদের তেমন সরব হতে দেখা যায়নি| ফলে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ক্ষমতায়নের দিক থেকে উত্তরবঙ্গের আদিবাসীরা এখনও প্রান্তিক পর্যায়েই অবস্থান করছেন| আমরা বিশ্বাস করি, একমাত্র সুযোগের অভাবেই তাদের মেধা, মনন ও দক্ষতার বিকাশ ঘটেনি|
নির্বাচন কমিশন ৮ এপ্রিল তফসিল ঘোষণার পর সংরক্ষিত নারী আসনে ইতোমধ্যে ৩৬১ জন বিএনপি, ১৩ জন জামায়াতে ইসলামী এবং একজন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের পক্ষে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন| ২১ এপ্রিল মনোনয়নপত্র জমা, ২৯ এপ্রিল প্রার্থিতা প্রত্যাহার এবং ৩০ এপ্রিল প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হবে| তফসিল অনুযায়ী আগামী ১২ মে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে| কমিশনের তথ্য অনুযায়ী বিএনপি ও তার জোট ৩৬টি আসন, জামায়াতে ইসলামী ও তার শরিকরা ১৩টি আসন এবং ছয়জন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যের জোট একটি আসন পাবে| ৬ এপ্রিল সংরক্ষিত নারী আসনের ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে; তালিকা অনুযায়ী ২৯৮ জন সংসদ সদস্য ভোট দেবেন| দলের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত মনোনীত ব্যক্তিরাই সংরক্ষিত আসনে আগামী পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হবেন|
আমরা জেনেছি, বৃহত্তর উত্তরবঙ্গ থেকে একাধিক আদিবাসী নারী সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন| অতীতের সরকারগুলো উত্তরবঙ্গকে যথাযথ মূল্যায়ন করেনি; লাখ লাখ আদিবাসীর দাবি-দাওয়া ও মনের কথা অপ্রকাশিতই থেকে গেছে| বর্তমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলই এ বিষয়ে কিছুটা সক্রিয়তা দেখিয়েছে|
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের প্রচারণায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ৭ ফেব্রুয়ারি দিনাজপুরের বিরামপুর সরকারি কলেজ মাঠে এক জনসভায় বলেন, ‘এই এলাকার মুসলমান, হিন্দু, আদিবাসী, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ—সবাই মিলে আমরা আমাদের রাজনৈতিক অধিকার প্রয়োগ করব| আমাদের পরিচয় হবে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে; ধর্ম নয়|’
প্রধানমন্ত্রীর পারিবারিক শিকড় দিনাজপুরের বিরামপুরে| এ অঞ্চলে সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালী, মুণ্ডা, রাজোয়াড় ও পাহান সম্প্রদায় বহু শতাব্দী ধরে বসবাস করে আসছে| তাদের পূর্বপুরুষরা পারস্পরিক সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করেছেন| আমরা বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রী উত্তরবঙ্গের আদিবাসী নারীদের সংরক্ষিত আসনে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত নেবেন|
সরকার গঠনের পর থেকেই বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একাধিকবার আদিবাসী প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন| গত ৩১ মার্চ ঢাকায় এক আলোচনা সভায় তিনি আদিবাসীদের ‘ভূমিপুত্র’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তারা এ দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং তাদের অধিকার অন্য সব নাগরিকের মতোই সমান| তিনি একটি বহুসাংস্কৃতিক রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন এবং আদিবাসী সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য তুলে ধরার কথাও বলেন| একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, এবার সংরক্ষিত নারী আসনে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর একজন প্রতিনিধি নির্বাচিত হতে পারেন|
আমরা উত্তরবঙ্গের আদিবাসীরা আশাবাদী| দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নেতার জন্ম ও শিকড় উত্তরবঙ্গেই| সংরক্ষিত নারী আসনের মাধ্যমে এই অঞ্চলের আদিবাসীদের কথা জাতীয় সংসদে প্রতিফলিত হলে তা নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে| অতীতে বাসন্তী চাকমা, গ্যোরভতি তঞ্চঙ্গ্যা, মানজু মারমা, এথিন রাখাইন, ম্যাম্যাচিন মারমাদের উপস্থিতি আমাদের গর্বিত করেছে| এবার উত্তরবঙ্গের আদিবাসী নারীদের সুযোগ দেয়া হলে সাঁওতাল, মাহালী, উরাঁও, মুণ্ডা, রাজোয়াড়, সিং, রায়, বর্মন, পাহান, কোলসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রান্তিক বাস্তবতা সামনে আসবে| কোডা, কোড়া, ভীল, তুরী ও পাহাড়িয়াদের সংগ্রামের কথাও জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্ব পাবে|
সরকারের সঠিক সিদ্ধান্তই আদিবাসীদের ভাষা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ম্ববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সহায়ক হবে| তাই আর উপেক্ষা নয়—সময়ের দাবি বিবেচনায় সংরক্ষিত নারী আসনের একটি উত্তরবঙ্গের আদিবাসী নারীদের জন্য বরাদ্দ করা হলে তা হবে ন্যায়সংগত ও দূরদর্শী পদক্ষেপ|
[লেখক: কলামিস্ট]

শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬
স্বাধীনোত্তর যতগুলো জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, আদিবাসী পুরুষরা সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও কখনোই নির্বাচিত হতে পারেননি| আর নারীরা সংরক্ষিত আসন ব্যতীত সাহস দেখাতে পারেননি| বিগত সময়ে দু-একজন নারী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দিলেও দলীয়ভাবে মনোনয়ন আদায় করতে পারেননি| সংরক্ষিত নারী আসনে বারবার বৃহত্তর উত্তরবঙ্গের আদিবাসীরা উপেক্ষিত, অবহেলিত ও বঞ্চিত হয়ে আসছে| আমরা লক্ষ্য করেছি, অতীতে আদিবাসীদের পক্ষে জাতীয় সংসদে চাকমা, রাখাইন, মারমা ও তঞ্চঙ্গ্যা নারীরা একাধিকবার প্রতিনিধিত্ব করেছেন—এর বাইরে তেমন নজির নেই| স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের পরও উত্তরবঙ্গের আদিবাসী নারীরা সংরক্ষিত নারী আসনে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পাননি| পার্বত্য চট্টগ্রামের নির্বাচনী আসনগুলো থেকে আদিবাসীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হয়ে আসছেন, যা এখনও বিদ্যমান; পাশাপাশি সংরক্ষিত আসনেও নারীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে| কিন্তু জাতীয় সংসদে নির্বাচিত আদিবাসী নারী-পুরুষেরা নিজেদের নির্বাচনী এলাকা নিয়েই ব্যস্ত থেকেছেন; অন্য অঞ্চলের আদিবাসীদের আশা-আকাঙ্ক্ষা, চাওয়া-পাওয়া, সুখ-দুঃখের বিষয়ে তাদের তেমন সরব হতে দেখা যায়নি| ফলে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ক্ষমতায়নের দিক থেকে উত্তরবঙ্গের আদিবাসীরা এখনও প্রান্তিক পর্যায়েই অবস্থান করছেন| আমরা বিশ্বাস করি, একমাত্র সুযোগের অভাবেই তাদের মেধা, মনন ও দক্ষতার বিকাশ ঘটেনি|
নির্বাচন কমিশন ৮ এপ্রিল তফসিল ঘোষণার পর সংরক্ষিত নারী আসনে ইতোমধ্যে ৩৬১ জন বিএনপি, ১৩ জন জামায়াতে ইসলামী এবং একজন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের পক্ষে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন| ২১ এপ্রিল মনোনয়নপত্র জমা, ২৯ এপ্রিল প্রার্থিতা প্রত্যাহার এবং ৩০ এপ্রিল প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হবে| তফসিল অনুযায়ী আগামী ১২ মে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে| কমিশনের তথ্য অনুযায়ী বিএনপি ও তার জোট ৩৬টি আসন, জামায়াতে ইসলামী ও তার শরিকরা ১৩টি আসন এবং ছয়জন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যের জোট একটি আসন পাবে| ৬ এপ্রিল সংরক্ষিত নারী আসনের ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে; তালিকা অনুযায়ী ২৯৮ জন সংসদ সদস্য ভোট দেবেন| দলের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত মনোনীত ব্যক্তিরাই সংরক্ষিত আসনে আগামী পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হবেন|
আমরা জেনেছি, বৃহত্তর উত্তরবঙ্গ থেকে একাধিক আদিবাসী নারী সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন| অতীতের সরকারগুলো উত্তরবঙ্গকে যথাযথ মূল্যায়ন করেনি; লাখ লাখ আদিবাসীর দাবি-দাওয়া ও মনের কথা অপ্রকাশিতই থেকে গেছে| বর্তমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলই এ বিষয়ে কিছুটা সক্রিয়তা দেখিয়েছে|
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের প্রচারণায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ৭ ফেব্রুয়ারি দিনাজপুরের বিরামপুর সরকারি কলেজ মাঠে এক জনসভায় বলেন, ‘এই এলাকার মুসলমান, হিন্দু, আদিবাসী, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ—সবাই মিলে আমরা আমাদের রাজনৈতিক অধিকার প্রয়োগ করব| আমাদের পরিচয় হবে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে; ধর্ম নয়|’
প্রধানমন্ত্রীর পারিবারিক শিকড় দিনাজপুরের বিরামপুরে| এ অঞ্চলে সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালী, মুণ্ডা, রাজোয়াড় ও পাহান সম্প্রদায় বহু শতাব্দী ধরে বসবাস করে আসছে| তাদের পূর্বপুরুষরা পারস্পরিক সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করেছেন| আমরা বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রী উত্তরবঙ্গের আদিবাসী নারীদের সংরক্ষিত আসনে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত নেবেন|
সরকার গঠনের পর থেকেই বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একাধিকবার আদিবাসী প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন| গত ৩১ মার্চ ঢাকায় এক আলোচনা সভায় তিনি আদিবাসীদের ‘ভূমিপুত্র’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তারা এ দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং তাদের অধিকার অন্য সব নাগরিকের মতোই সমান| তিনি একটি বহুসাংস্কৃতিক রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন এবং আদিবাসী সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য তুলে ধরার কথাও বলেন| একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, এবার সংরক্ষিত নারী আসনে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর একজন প্রতিনিধি নির্বাচিত হতে পারেন|
আমরা উত্তরবঙ্গের আদিবাসীরা আশাবাদী| দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নেতার জন্ম ও শিকড় উত্তরবঙ্গেই| সংরক্ষিত নারী আসনের মাধ্যমে এই অঞ্চলের আদিবাসীদের কথা জাতীয় সংসদে প্রতিফলিত হলে তা নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে| অতীতে বাসন্তী চাকমা, গ্যোরভতি তঞ্চঙ্গ্যা, মানজু মারমা, এথিন রাখাইন, ম্যাম্যাচিন মারমাদের উপস্থিতি আমাদের গর্বিত করেছে| এবার উত্তরবঙ্গের আদিবাসী নারীদের সুযোগ দেয়া হলে সাঁওতাল, মাহালী, উরাঁও, মুণ্ডা, রাজোয়াড়, সিং, রায়, বর্মন, পাহান, কোলসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রান্তিক বাস্তবতা সামনে আসবে| কোডা, কোড়া, ভীল, তুরী ও পাহাড়িয়াদের সংগ্রামের কথাও জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্ব পাবে|
সরকারের সঠিক সিদ্ধান্তই আদিবাসীদের ভাষা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ম্ববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সহায়ক হবে| তাই আর উপেক্ষা নয়—সময়ের দাবি বিবেচনায় সংরক্ষিত নারী আসনের একটি উত্তরবঙ্গের আদিবাসী নারীদের জন্য বরাদ্দ করা হলে তা হবে ন্যায়সংগত ও দূরদর্শী পদক্ষেপ|
[লেখক: কলামিস্ট]

আপনার মতামত লিখুন