অফিসের টেবিলে বসে প্রকাশ্যে ঘুষ নেওয়ার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর অবশেষে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলা এলজিইডি অফিসের হিসাবরক্ষক মোস্তাফিজুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. বেলাল হোসেন স্বাক্ষরিত ২৭ এপ্রিলের চিঠিতে এ নির্দেশ দেওয়া হয়। চিঠিতে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে মোস্তাফিজুরকে অফিসের দাপ্তরিক টেবিলে বসে দুজনের কাছ থেকে গুনে গুনে অর্থ নিতে দেখা গেছে। সরকারি অফিসে প্রকাশ্যে এমন অর্থ লেনদেনের ঘটনায় এলজিইডি তথা সরকারের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮-এর ৩(খ) ও ৩(ঘ) বিধিতে বর্ণিত অসদাচরণ ও দুর্নীতিপরায়ণতার দায়ে মোস্তাফিজুরকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। একই বিধিমালার ১২(১) ধারা অনুযায়ী তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। সাময়িক বরখাস্তকালীন সময়ে বিধি মোতাবেক খোরপোষ ভাতা পাবেন তিনি।
এ ছাড়া তাকে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত জবাব দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জবাব সন্তোষজনক না হলে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও উঠে এসেছে, ঘুষকাণ্ড ঢাকতে মোস্তাফিজুর অফিস থেকে সিসিটিভি ক্যামেরা অপসারণ করেন। কর্তৃপক্ষের কোনো অনুমতি ছাড়াই তিনি এটি খুলে ফেলেন। কিন্তু এর আগেই তার ঘুষ গ্রহণের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে।
তাছাড়া নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রভাব ঠেকাতে তিনি বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সচিবদের কাছ থেকে প্রত্যয়নপত্র নেওয়ার জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন। চাম্পাফুল ও মৌতলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সচিবদের কাছে উপজেলা প্রকৌশলী জাকির হোসেনের নাম ভাঙিয়ে প্রত্যয়নপত্রের জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
চাম্পাফুল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক গাইন জানান, উপজেলা প্রকৌশলীর নাম ভাঙিয়ে সচিব সাইদুর তার কাছ থেকে প্রত্যয়নপত্রে স্বাক্ষর নিয়ে নেন। এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানতেন না বলেও জানান।
কুশুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল কাশেম মাহমুদ আব্দুল্লাহ জানান, প্রত্যয়নপত্র নিতে কয়েকবার তার কাছে গেলেও তিনি স্বাক্ষর করেননি।
এলজিইডির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর (প্রশাসন) পক্ষে মেহেরপুরের হিসাবরক্ষক শহিদুল ইসলামকে কালিগঞ্জে বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মোস্তাফিজুর বদলি ঠেকাতে বিভিন্ন মহলে জোর তদবির শুরু করেন। পরবর্তীতে নিজেই বিভিন্ন জায়গায় বদলির আবেদন করলেও কর্তৃপক্ষ সাড়া দেয়নি।
ঘুষকাণ্ড ছাড়াও তার বিরুদ্ধে আরও একটি গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অফিসের পল্লী সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের (এলসিএস) এক নারী কর্মীকে দিয়ে অফিসের ঝাড়ু দেওয়া, চা বানানো ও ধোয়ামোছার কাজ করানো হতো। সেই সুযোগে ওই নারীকে তার ডরমেটরির রুম পরিষ্কার করানোর জন্য প্রায় প্রতিদিন ভোরে ডেকে নিয়ে অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি জানাজানি হলে উপজেলা প্রকৌশলী ওই নারী কর্মীকে অফিস থেকে বের করে দেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোস্তাফিজুর রহমান তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, অফিসের একটি গ্রুপ তাকে তাড়ানোর জন্য সব সময় মিথ্যা প্রচারণা ও চক্রান্ত চালিয়ে আসছে।
তবে এলজিইডির কালিগঞ্জ উপজেলা কার্যালয়ের সূত্র বলছে, অফিসে বসে বিভিন্ন ঠিকাদার, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সচিবদের কাছ থেকে প্রকল্পের কাজের বিলের জন্য প্রকাশ্যে ঘুষ নেওয়া ছিল মোস্তাফিজুরের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এটি ছিল ‘ওপেন সিক্রেট’।
হিসাবরক্ষক মোস্তাফিজুরের ঘুষকাণ্ডে উপজেলা প্রকৌশলী জাকির হোসেনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অনেকের অভিযোগ, এই দুর্নীতিতে তিনি সরাসরি জড়িত থাকলেও এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন।
জাকির হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সিসিটিভি ক্যামেরা অপসারণের বিষয়টি শুনেছি, দেখে ব্যবস্থা নেব।’ তবে অফিসে গিয়ে তিনি কোনো সিসিটিভি ক্যামেরার অস্তিত্ব পাননি বলেও জানান।

বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ এপ্রিল ২০২৬
অফিসের টেবিলে বসে প্রকাশ্যে ঘুষ নেওয়ার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর অবশেষে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলা এলজিইডি অফিসের হিসাবরক্ষক মোস্তাফিজুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. বেলাল হোসেন স্বাক্ষরিত ২৭ এপ্রিলের চিঠিতে এ নির্দেশ দেওয়া হয়। চিঠিতে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে মোস্তাফিজুরকে অফিসের দাপ্তরিক টেবিলে বসে দুজনের কাছ থেকে গুনে গুনে অর্থ নিতে দেখা গেছে। সরকারি অফিসে প্রকাশ্যে এমন অর্থ লেনদেনের ঘটনায় এলজিইডি তথা সরকারের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮-এর ৩(খ) ও ৩(ঘ) বিধিতে বর্ণিত অসদাচরণ ও দুর্নীতিপরায়ণতার দায়ে মোস্তাফিজুরকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। একই বিধিমালার ১২(১) ধারা অনুযায়ী তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। সাময়িক বরখাস্তকালীন সময়ে বিধি মোতাবেক খোরপোষ ভাতা পাবেন তিনি।
এ ছাড়া তাকে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত জবাব দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জবাব সন্তোষজনক না হলে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও উঠে এসেছে, ঘুষকাণ্ড ঢাকতে মোস্তাফিজুর অফিস থেকে সিসিটিভি ক্যামেরা অপসারণ করেন। কর্তৃপক্ষের কোনো অনুমতি ছাড়াই তিনি এটি খুলে ফেলেন। কিন্তু এর আগেই তার ঘুষ গ্রহণের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে।
তাছাড়া নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রভাব ঠেকাতে তিনি বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সচিবদের কাছ থেকে প্রত্যয়নপত্র নেওয়ার জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন। চাম্পাফুল ও মৌতলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সচিবদের কাছে উপজেলা প্রকৌশলী জাকির হোসেনের নাম ভাঙিয়ে প্রত্যয়নপত্রের জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
চাম্পাফুল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক গাইন জানান, উপজেলা প্রকৌশলীর নাম ভাঙিয়ে সচিব সাইদুর তার কাছ থেকে প্রত্যয়নপত্রে স্বাক্ষর নিয়ে নেন। এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানতেন না বলেও জানান।
কুশুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল কাশেম মাহমুদ আব্দুল্লাহ জানান, প্রত্যয়নপত্র নিতে কয়েকবার তার কাছে গেলেও তিনি স্বাক্ষর করেননি।
এলজিইডির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর (প্রশাসন) পক্ষে মেহেরপুরের হিসাবরক্ষক শহিদুল ইসলামকে কালিগঞ্জে বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মোস্তাফিজুর বদলি ঠেকাতে বিভিন্ন মহলে জোর তদবির শুরু করেন। পরবর্তীতে নিজেই বিভিন্ন জায়গায় বদলির আবেদন করলেও কর্তৃপক্ষ সাড়া দেয়নি।
ঘুষকাণ্ড ছাড়াও তার বিরুদ্ধে আরও একটি গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অফিসের পল্লী সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের (এলসিএস) এক নারী কর্মীকে দিয়ে অফিসের ঝাড়ু দেওয়া, চা বানানো ও ধোয়ামোছার কাজ করানো হতো। সেই সুযোগে ওই নারীকে তার ডরমেটরির রুম পরিষ্কার করানোর জন্য প্রায় প্রতিদিন ভোরে ডেকে নিয়ে অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি জানাজানি হলে উপজেলা প্রকৌশলী ওই নারী কর্মীকে অফিস থেকে বের করে দেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোস্তাফিজুর রহমান তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, অফিসের একটি গ্রুপ তাকে তাড়ানোর জন্য সব সময় মিথ্যা প্রচারণা ও চক্রান্ত চালিয়ে আসছে।
তবে এলজিইডির কালিগঞ্জ উপজেলা কার্যালয়ের সূত্র বলছে, অফিসে বসে বিভিন্ন ঠিকাদার, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সচিবদের কাছ থেকে প্রকল্পের কাজের বিলের জন্য প্রকাশ্যে ঘুষ নেওয়া ছিল মোস্তাফিজুরের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এটি ছিল ‘ওপেন সিক্রেট’।
হিসাবরক্ষক মোস্তাফিজুরের ঘুষকাণ্ডে উপজেলা প্রকৌশলী জাকির হোসেনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অনেকের অভিযোগ, এই দুর্নীতিতে তিনি সরাসরি জড়িত থাকলেও এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন।
জাকির হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সিসিটিভি ক্যামেরা অপসারণের বিষয়টি শুনেছি, দেখে ব্যবস্থা নেব।’ তবে অফিসে গিয়ে তিনি কোনো সিসিটিভি ক্যামেরার অস্তিত্ব পাননি বলেও জানান।

আপনার মতামত লিখুন