সংবাদ

মানুষ: পৃথিবীর ইতিহাসে ভয়াবহ এক হিংস্র প্রাণী


ওয়াসিম খান রানা
ওয়াসিম খান রানা
প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:২৫ পিএম

মানুষ: পৃথিবীর ইতিহাসে ভয়াবহ এক হিংস্র প্রাণী
লাল রক্তের রঙ। অথচ ভালোবাসে মানুষ।

মনে আছে, গেল বছরে ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে পাথর দিয়ে একজনকে হত্যার ঘটনায়? পথচারীরা ভিড় করে দাঁড়িয়ে মোবাইলে দৃশ্যটির শুধু ভিডিও করেছিল, হত্যাাকারীকে কেউ থামায়নি। কেউ সাহায্যও করেনি। 

না, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এটি আমাদের সভ্যতার এক নতুন দর্পণ। 

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে,
যা মানবতার সংজ্ঞাকে চ্যালেঞ্জ করে।

২০১৯ সালে বরগুনায় মিন্নি-রিফাত হত্যাকাণ্ড সারা দেশকে আলোড়িত করেছিল। দিনের বেলায় সবার সামনে, পরিকল্পিতভাবে একজন মানুষকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। হত্যাকারীরা কিন্তু পালায়নি, বরং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিল। ঠান্ডা মাথায় হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে সরে পড়েছিল। 

২০২০ সালে নোয়াখালীতে এক নারীকে প্রকাশ্যে নির্যাতনের ভিডিও সারা দেশকে স্তব্ধ করে দেয়। নির্যাতনকারীরা শুধু নির্যাতন করেই ক্ষান্ত হয়নি, ভিডিও করে তা ছড়িয়েও দিয়েছিল।যেন সেটা কোনো গৌরবের কাজ।

২০২১ সালে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাইয়ের নামে খুনের ঘটনা বেড়েছে। মাত্র একটি মোবাইল ফোনের জন্য মানুষ খুন হয়েছে। 

২০২২ সালে সিলেটে এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে গণধর্ষণের ঘটনা পুরো জাতিকে স্তম্ভিত করেছিল। অভিযুক্তরা ছিলেন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় লালিত।  

এসব ঘটনাও বিচ্ছিন্ন নয়। একটি গভীর সামাজিক সংকটের উপসর্গ। প্রশ্ন হলো- মানুষ কি সত্যি সত্যিই এতটা পরিবর্তিত হয়েছে? নাকি এই হিংস্রতা সবসময়ই ছিল, কেবল ভিন্নরূপে?

হিংস্রতা

বিবর্তনের দর্পণে মানুষের হিংস্রতা

লাখ লাখ বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষ হোমো হ্যাবিলিস যখন আফ্রিকার জঙ্গলে ঘুরে বেড়াত, তখন তাদের প্রতিদিনের যুদ্ধ ছিল বেঁচে থাকার জন্য। সিংহ, চিতাবাঘ, হায়েনা- প্রকৃতির হিংস্র প্রতিযোগীদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত রক্তাক্ত লড়াই।সেই লড়াইয়ে যারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারতো, বিপদে নিজেকে বাঁচাতে পারতো, তারাই টিকে থাকতো। ভয় থেকে আক্রমণ- এই প্রতিক্রিয়া ছিল বেঁচে থাকার হাতিয়ার।

বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘ফাইট-অর-ফ্লাইট রেসপন্স’। অ্যামিগডালা- মস্তিষ্কের সেই অংশ যা ভয় ও আগ্রাসন নিয়ন্ত্রণ করে। হাজার বছর ধরে এই বৈশিষ্ট্য বহন করে আসছে মানবমস্তিষ্ক। সমস্যা হলো, সেই প্রাচীন মস্তিষ্ক এখনও আমাদের শরীরে রয়েছে। শুধু প্রেক্ষাপট গেছে বদলে।

লাখ লাখ বছর আগে হিংস্রতা ছিল মূলত টিকে থাকার শেষ অবলম্বন। আর এখন হিংস্রতা হয়ে উঠেছে ক্ষমতা প্রদর্শনের হাতিয়ার।

লাল রঙের ভয় থেকে লাল রঙের প্রেম

আদিম মানুষ লাল রঙ দেখে আতঙ্কিত হতো। কারণ লাল মানে রক্ত, লাল মানে বিপদ, লাল মানে মৃত্যু। সূর্যাস্তের লাল আকাশ মানে শিকারি প্রাণীরা সক্রিয় হবে। ক্ষতস্থানের লাল মানে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ছে। লাল ছিল একটি জৈবিক সতর্কসংকেত।

আজ পৃথিবীর সর্বাধিক জনপ্রিয় রঙগুলোর মধ্যে লাল অন্যতম। ফেরারি গাড়ি লাল, যুদ্ধের পতাকা লাল, হিংসাত্মক ভিডিও গেমের স্ক্রিন লাল। আমরা সেই রঙকে ভালোবাসতে শিখেছি যা একদিন আমাদের মৃত্যুর বার্তা দিতো।

এই পরিবর্তন কি শুধুই রঙের? না। এটা আমাদের সংবেদনশীলতার। আমরা ধীরে ধীরে সেই সব বিষয়ের প্রতি অসাড় হয়ে যাচ্ছি যা একসময় আমাদের কাঁপিয়ে দিত।

রক্তের রঙকে ভালোবেসে ফেলে মানুষ

নিঃশব্দ কান্না থেকে নির্বিকার দর্শক

আদিম শিকারি-সংগ্রাহক সমাজে মানুষ একসঙ্গে বনে যেত। ছোট দলে, পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে। যখন কোনো হিংস্রপ্রাণী দলের কাউকে ধরে নিয়ে যেত, তখন বাকিরা দূর থেকে নিঃশব্দে দেখতো। সাহায্য করার ক্ষমতা ছিল না। কিন্তু সেই নিঃশব্দ কান্না ছিল তাদের একমাত্র সম্বল, গভীর বেদনার প্রকাশ, মানবিক একাত্মতার প্রমাণ।

আজ মানুষ মানুষকে শিকার করছে। কিন্তু দর্শকরা কাঁদছে না। তারা ভিডিও করছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করছে। কেউ কেউ রক্তাক্ত দৃশ্য দেখে ‘লাইক’ দিচ্ছে।

মনোবিজ্ঞানে এই ঘটনাকে বলা হয় ‘বাইস্ট্যান্ডার ইফেক্ট’। যত বেশি মানুষ থাকে, ততই কেউ সাহায্য করে না।  কারণ সবাই ভাবে অন্য কেউ করবে। কিন্তু এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আরও গভীর একটি সমস্যা- আমরা অনুভব করার ক্ষমতা হারাচ্ছি।

গোষ্ঠীগত হিংস্রতার অভিযোজন

ঢাকার যানজটে প্রতিদিন ঘটে ছোট ছোট সংঘর্ষ। দুটি গাড়ির মামুলি ধাক্কায় দুই পক্ষ মুহূর্তে মারমুখী হয়ে ওঠে। আমরা যে গাড়িতে থাকি, সেই ড্রাইভারের পক্ষে আমরা আওয়াজ তুলি তথ্য না জেনেই, বিচার না করেই।

সম্মিলিত হিংস্রতা

এটি বিবর্তনের একটি প্রাচীন বৈশিষ্ট্য- ‘ইন-গ্রুপ’ বনাম ‘আউট-গ্রুপ’ চিন্তাভাবনা। আমার দল, আমার মানুষ- এই বোধ থেকে তৈরি হয় অন্ধ আনুগত্য। আদিম সমাজে অন্য গোত্রের সদস্যরা সত্যিই প্রতিযোগী ছিল। কিন্তু আজ এই মানসিকতা অফিসের রাজনীতি থেকে শুরু করে জাতীয় সংঘাত পর্যন্ত বিস্তৃত।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতা এই মনোবিজ্ঞানের জীবন্ত উদাহরণ। প্রতিপক্ষকে মানুষ না ভেবে শত্রু ভাবার এই প্রবণতা হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছে।

যখন নৃশংসতা ‘স্বাভাবিক’ হয়ে যায়

সবচেয়ে ভয়ানক পরিবর্তন এটি নয় যে মানুষ হিংস্র হচ্ছে। মানুষ সবসময়ই হিংস্র হতে পারে। সবচেয়ে ভয়ানক পরিবর্তন হলো হিংস্রতা এখন ‘স্বাভাবিক’ হয়ে যাচ্ছে।

সভ্যরূপে হিংস্রতা

নব্বই দশকে বাংলাদেশে কোনো এলাকায় খুন হলে মানুষ দিনের পর দিন আলোচনা করতো। এখন প্রতিদিন একাধিক খুনের খবর আসে, পাঠক স্ক্রল করে পরের খবরে চলে যায়। মিডিয়া সায়েন্সে এটিকে বলা হয় ‘কম্পাশন ফ্যাটিগ’ বা করুণার ক্লান্তি।

যে শিশু প্রতিদিন সহিংস ভিডিও গেম খেলে, প্রতিদিন হিংসাত্মক কন্টেন্ট দেখে তার মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে সহিংসতাকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করতে শেখে। এটি মনোবিজ্ঞানে ‘ডিসেন্সিটাইজেশন’ নামে পরিচিত।

মানুষের মন থেকে মায়া-দয়া উঠে যাচ্ছে না, মায়া-দয়া প্রকাশের পরিসর সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। আমরা কাছের মানুষকে ভালোবাসি, দূরের মানুষকে পরিসংখ্যান মনে করি।

আধুনিক সভ্যতার বিরোধাভাস: উন্নতি ও পতন একসঙ্গে

মানুষ চাঁদে গেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করেছে, ক্যানসারের ওষুধ আবিষ্কার করছে। একই সময়ে মানুষ ইন্টারনেটে সাইবার বুলিং করছে, যৌন নিপীড়নের ভিডিও ভাইরাল করছে, পরিচিতজনকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করছে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতি মানুষকে নৈতিকভাবে উন্নত করেনি। বরং প্রযুক্তি হিংস্রতার নতুন হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। সাইবার ক্রাইম, ডিপফেক পর্নোগ্রাফি, অনলাইন হ্যারেসমেন্ট- এগুলো আধুনিক হিংস্রতার নতুন রূপ।

অনলাইনে বুলিং

বাংলাদেশে ফেসবুকের মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে কমপক্ষে একাধিকবার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা হয়েছে। মানুষ মানুষকে চেনে না, কিন্তু একটি পোস্ট দেখেই হিংস্র হয়ে ওঠে। এই হলো আধুনিক হিংস্রতার সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপ। 

মায়া-দয়া কোথায় গেল?

মনোবিজ্ঞানী পল ব্লুম তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, মানুষের সহানুভূতি মূলত ‘কাছের’ এবং ‘পরিচিত’ মানুষের জন্য কাজ করে। আমরা যাদের চিনি না তাদের কষ্ট আমাদের সেভাবে স্পর্শ করে না। এই জৈবিক সীমাবদ্ধতা সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে দূর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হয়নি।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনা নিয়মিত। মালিকপক্ষ জানে শ্রমিকরা কষ্ট পাচ্ছে। কিন্তু অর্থনৈতিক স্বার্থ সহানুভূতিকে দমিয়ে রাখে। এটি ব্যক্তিগত নৃশংসতা নয়, এটি কাঠামোগত হিংস্রতা।

পরিবারের মধ্যেও এই পরিবর্তন স্পষ্ট। বৃদ্ধ বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসার ঘটনা বাড়ছে। সন্তান পিতাকে হত্যা করছে সম্পত্তির জন্য। এই হিংস্রতা শুধু শারীরিক নয়, আবেগিক ও মনস্তাত্ত্বিক।

প্রতিরোধের সম্ভাবনা

হার্ভার্ড মনোবিজ্ঞানী স্টিভেন পিংকার তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য বেটার অ্যাঞ্জেলস অব আওয়ার নেচার’-এ দেখিয়েছেন যে দীর্ঘমেয়াদে পৃথিবীতে সহিংসতা কমছে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো দেশে সেই প্রবণতা এখনও স্পষ্ট নয়।

শিক্ষা, সচেতনতা ও জবাবদিহিতা- এই তিনটি উপাদানই পারে হিংস্রতার চক্র ভাঙতে। শিশুর মানসিক বিকাশে সহানুভূতির চর্চা জরুরি। বিচার ব্যবস্থায় দ্রুততা জরুরি। কিন্তু সবচেয়ে জরুরি হলো সামাজিক চেতনা হিংস্রতাকে আর ‘স্বাভাবিক’ না মানার সামষ্টিক সিদ্ধান্ত।

আদিম পরিবার

আমরা কি ফিরে যাব সেই নিঃশব্দ কান্নায়?

আদিম মানুষ যখন দূর থেকে সঙ্গীর মৃত্যু দেখে নিঃশব্দে কাঁদতো, সেই কান্নায় ছিল গভীর মানবতা। তারা সাহায্য করতে পারেনি, কিন্তু অনুভব করেছিল। আজ আমরা সাহায্য করতে পারি, কিন্তু অনুভব করি না।

মানুষ পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রাণী এই কথা সত্য। কিন্তু মানুষই একমাত্র প্রাণী যে নিজের বিপদ নিজে বুঝতে পারে। নিজের ভুল নিজে সংশোধন করতে পারে।

প্রশ্ন হলো- আমরা কি সেই সুযোগ কাজে লাগাব? নাকি ইতিহাস একদিন লিখবে - মানুষ পৃথিবীতে এসেছিল, সব ধ্বংস করেছিল, তারপর নিজেও শেষ হয়ে গিয়েছিল?

মানুষের মহত্ত্ব তার শক্তিতে নয়, তার ক্ষমতায় নয় মানুষের মহত্ত্ব তার অনুভব করার ক্ষমতায়। সেই ক্ষমতা হারালে, আমরা কেবল দ্বিপদী জন্তুতে পরিণত হব।

.

লেখক: ভিডিও বিভাগ প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল

.

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬


মানুষ: পৃথিবীর ইতিহাসে ভয়াবহ এক হিংস্র প্রাণী

প্রকাশের তারিখ : ২৮ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

মনে আছে, গেল বছরে ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে পাথর দিয়ে একজনকে হত্যার ঘটনায়? পথচারীরা ভিড় করে দাঁড়িয়ে মোবাইলে দৃশ্যটির শুধু ভিডিও করেছিল, হত্যাাকারীকে কেউ থামায়নি। কেউ সাহায্যও করেনি। 

না, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এটি আমাদের সভ্যতার এক নতুন দর্পণ। 

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে,
যা মানবতার সংজ্ঞাকে চ্যালেঞ্জ করে।

২০১৯ সালে বরগুনায় মিন্নি-রিফাত হত্যাকাণ্ড সারা দেশকে আলোড়িত করেছিল। দিনের বেলায় সবার সামনে, পরিকল্পিতভাবে একজন মানুষকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। হত্যাকারীরা কিন্তু পালায়নি, বরং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিল। ঠান্ডা মাথায় হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে সরে পড়েছিল। 

২০২০ সালে নোয়াখালীতে এক নারীকে প্রকাশ্যে নির্যাতনের ভিডিও সারা দেশকে স্তব্ধ করে দেয়। নির্যাতনকারীরা শুধু নির্যাতন করেই ক্ষান্ত হয়নি, ভিডিও করে তা ছড়িয়েও দিয়েছিল।যেন সেটা কোনো গৌরবের কাজ।

২০২১ সালে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাইয়ের নামে খুনের ঘটনা বেড়েছে। মাত্র একটি মোবাইল ফোনের জন্য মানুষ খুন হয়েছে। 

২০২২ সালে সিলেটে এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে গণধর্ষণের ঘটনা পুরো জাতিকে স্তম্ভিত করেছিল। অভিযুক্তরা ছিলেন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় লালিত।  

এসব ঘটনাও বিচ্ছিন্ন নয়। একটি গভীর সামাজিক সংকটের উপসর্গ। প্রশ্ন হলো- মানুষ কি সত্যি সত্যিই এতটা পরিবর্তিত হয়েছে? নাকি এই হিংস্রতা সবসময়ই ছিল, কেবল ভিন্নরূপে?

হিংস্রতা

বিবর্তনের দর্পণে মানুষের হিংস্রতা

লাখ লাখ বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষ হোমো হ্যাবিলিস যখন আফ্রিকার জঙ্গলে ঘুরে বেড়াত, তখন তাদের প্রতিদিনের যুদ্ধ ছিল বেঁচে থাকার জন্য। সিংহ, চিতাবাঘ, হায়েনা- প্রকৃতির হিংস্র প্রতিযোগীদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত রক্তাক্ত লড়াই।সেই লড়াইয়ে যারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারতো, বিপদে নিজেকে বাঁচাতে পারতো, তারাই টিকে থাকতো। ভয় থেকে আক্রমণ- এই প্রতিক্রিয়া ছিল বেঁচে থাকার হাতিয়ার।

বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘ফাইট-অর-ফ্লাইট রেসপন্স’। অ্যামিগডালা- মস্তিষ্কের সেই অংশ যা ভয় ও আগ্রাসন নিয়ন্ত্রণ করে। হাজার বছর ধরে এই বৈশিষ্ট্য বহন করে আসছে মানবমস্তিষ্ক। সমস্যা হলো, সেই প্রাচীন মস্তিষ্ক এখনও আমাদের শরীরে রয়েছে। শুধু প্রেক্ষাপট গেছে বদলে।

লাখ লাখ বছর আগে হিংস্রতা ছিল মূলত টিকে থাকার শেষ অবলম্বন। আর এখন হিংস্রতা হয়ে উঠেছে ক্ষমতা প্রদর্শনের হাতিয়ার।

লাল রঙের ভয় থেকে লাল রঙের প্রেম

আদিম মানুষ লাল রঙ দেখে আতঙ্কিত হতো। কারণ লাল মানে রক্ত, লাল মানে বিপদ, লাল মানে মৃত্যু। সূর্যাস্তের লাল আকাশ মানে শিকারি প্রাণীরা সক্রিয় হবে। ক্ষতস্থানের লাল মানে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ছে। লাল ছিল একটি জৈবিক সতর্কসংকেত।

আজ পৃথিবীর সর্বাধিক জনপ্রিয় রঙগুলোর মধ্যে লাল অন্যতম। ফেরারি গাড়ি লাল, যুদ্ধের পতাকা লাল, হিংসাত্মক ভিডিও গেমের স্ক্রিন লাল। আমরা সেই রঙকে ভালোবাসতে শিখেছি যা একদিন আমাদের মৃত্যুর বার্তা দিতো।

এই পরিবর্তন কি শুধুই রঙের? না। এটা আমাদের সংবেদনশীলতার। আমরা ধীরে ধীরে সেই সব বিষয়ের প্রতি অসাড় হয়ে যাচ্ছি যা একসময় আমাদের কাঁপিয়ে দিত।

রক্তের রঙকে ভালোবেসে ফেলে মানুষ

নিঃশব্দ কান্না থেকে নির্বিকার দর্শক

আদিম শিকারি-সংগ্রাহক সমাজে মানুষ একসঙ্গে বনে যেত। ছোট দলে, পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে। যখন কোনো হিংস্রপ্রাণী দলের কাউকে ধরে নিয়ে যেত, তখন বাকিরা দূর থেকে নিঃশব্দে দেখতো। সাহায্য করার ক্ষমতা ছিল না। কিন্তু সেই নিঃশব্দ কান্না ছিল তাদের একমাত্র সম্বল, গভীর বেদনার প্রকাশ, মানবিক একাত্মতার প্রমাণ।

আজ মানুষ মানুষকে শিকার করছে। কিন্তু দর্শকরা কাঁদছে না। তারা ভিডিও করছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করছে। কেউ কেউ রক্তাক্ত দৃশ্য দেখে ‘লাইক’ দিচ্ছে।

মনোবিজ্ঞানে এই ঘটনাকে বলা হয় ‘বাইস্ট্যান্ডার ইফেক্ট’। যত বেশি মানুষ থাকে, ততই কেউ সাহায্য করে না।  কারণ সবাই ভাবে অন্য কেউ করবে। কিন্তু এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আরও গভীর একটি সমস্যা- আমরা অনুভব করার ক্ষমতা হারাচ্ছি।

গোষ্ঠীগত হিংস্রতার অভিযোজন

ঢাকার যানজটে প্রতিদিন ঘটে ছোট ছোট সংঘর্ষ। দুটি গাড়ির মামুলি ধাক্কায় দুই পক্ষ মুহূর্তে মারমুখী হয়ে ওঠে। আমরা যে গাড়িতে থাকি, সেই ড্রাইভারের পক্ষে আমরা আওয়াজ তুলি তথ্য না জেনেই, বিচার না করেই।

সম্মিলিত হিংস্রতা

এটি বিবর্তনের একটি প্রাচীন বৈশিষ্ট্য- ‘ইন-গ্রুপ’ বনাম ‘আউট-গ্রুপ’ চিন্তাভাবনা। আমার দল, আমার মানুষ- এই বোধ থেকে তৈরি হয় অন্ধ আনুগত্য। আদিম সমাজে অন্য গোত্রের সদস্যরা সত্যিই প্রতিযোগী ছিল। কিন্তু আজ এই মানসিকতা অফিসের রাজনীতি থেকে শুরু করে জাতীয় সংঘাত পর্যন্ত বিস্তৃত।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতা এই মনোবিজ্ঞানের জীবন্ত উদাহরণ। প্রতিপক্ষকে মানুষ না ভেবে শত্রু ভাবার এই প্রবণতা হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছে।

যখন নৃশংসতা ‘স্বাভাবিক’ হয়ে যায়

সবচেয়ে ভয়ানক পরিবর্তন এটি নয় যে মানুষ হিংস্র হচ্ছে। মানুষ সবসময়ই হিংস্র হতে পারে। সবচেয়ে ভয়ানক পরিবর্তন হলো হিংস্রতা এখন ‘স্বাভাবিক’ হয়ে যাচ্ছে।

সভ্যরূপে হিংস্রতা

নব্বই দশকে বাংলাদেশে কোনো এলাকায় খুন হলে মানুষ দিনের পর দিন আলোচনা করতো। এখন প্রতিদিন একাধিক খুনের খবর আসে, পাঠক স্ক্রল করে পরের খবরে চলে যায়। মিডিয়া সায়েন্সে এটিকে বলা হয় ‘কম্পাশন ফ্যাটিগ’ বা করুণার ক্লান্তি।

যে শিশু প্রতিদিন সহিংস ভিডিও গেম খেলে, প্রতিদিন হিংসাত্মক কন্টেন্ট দেখে তার মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে সহিংসতাকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করতে শেখে। এটি মনোবিজ্ঞানে ‘ডিসেন্সিটাইজেশন’ নামে পরিচিত।

মানুষের মন থেকে মায়া-দয়া উঠে যাচ্ছে না, মায়া-দয়া প্রকাশের পরিসর সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। আমরা কাছের মানুষকে ভালোবাসি, দূরের মানুষকে পরিসংখ্যান মনে করি।

আধুনিক সভ্যতার বিরোধাভাস: উন্নতি ও পতন একসঙ্গে

মানুষ চাঁদে গেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করেছে, ক্যানসারের ওষুধ আবিষ্কার করছে। একই সময়ে মানুষ ইন্টারনেটে সাইবার বুলিং করছে, যৌন নিপীড়নের ভিডিও ভাইরাল করছে, পরিচিতজনকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করছে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতি মানুষকে নৈতিকভাবে উন্নত করেনি। বরং প্রযুক্তি হিংস্রতার নতুন হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। সাইবার ক্রাইম, ডিপফেক পর্নোগ্রাফি, অনলাইন হ্যারেসমেন্ট- এগুলো আধুনিক হিংস্রতার নতুন রূপ।

অনলাইনে বুলিং

বাংলাদেশে ফেসবুকের মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে কমপক্ষে একাধিকবার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা হয়েছে। মানুষ মানুষকে চেনে না, কিন্তু একটি পোস্ট দেখেই হিংস্র হয়ে ওঠে। এই হলো আধুনিক হিংস্রতার সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপ। 

মায়া-দয়া কোথায় গেল?

মনোবিজ্ঞানী পল ব্লুম তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, মানুষের সহানুভূতি মূলত ‘কাছের’ এবং ‘পরিচিত’ মানুষের জন্য কাজ করে। আমরা যাদের চিনি না তাদের কষ্ট আমাদের সেভাবে স্পর্শ করে না। এই জৈবিক সীমাবদ্ধতা সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে দূর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হয়নি।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনা নিয়মিত। মালিকপক্ষ জানে শ্রমিকরা কষ্ট পাচ্ছে। কিন্তু অর্থনৈতিক স্বার্থ সহানুভূতিকে দমিয়ে রাখে। এটি ব্যক্তিগত নৃশংসতা নয়, এটি কাঠামোগত হিংস্রতা।

পরিবারের মধ্যেও এই পরিবর্তন স্পষ্ট। বৃদ্ধ বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসার ঘটনা বাড়ছে। সন্তান পিতাকে হত্যা করছে সম্পত্তির জন্য। এই হিংস্রতা শুধু শারীরিক নয়, আবেগিক ও মনস্তাত্ত্বিক।

প্রতিরোধের সম্ভাবনা

হার্ভার্ড মনোবিজ্ঞানী স্টিভেন পিংকার তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য বেটার অ্যাঞ্জেলস অব আওয়ার নেচার’-এ দেখিয়েছেন যে দীর্ঘমেয়াদে পৃথিবীতে সহিংসতা কমছে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো দেশে সেই প্রবণতা এখনও স্পষ্ট নয়।

শিক্ষা, সচেতনতা ও জবাবদিহিতা- এই তিনটি উপাদানই পারে হিংস্রতার চক্র ভাঙতে। শিশুর মানসিক বিকাশে সহানুভূতির চর্চা জরুরি। বিচার ব্যবস্থায় দ্রুততা জরুরি। কিন্তু সবচেয়ে জরুরি হলো সামাজিক চেতনা হিংস্রতাকে আর ‘স্বাভাবিক’ না মানার সামষ্টিক সিদ্ধান্ত।

আদিম পরিবার

আমরা কি ফিরে যাব সেই নিঃশব্দ কান্নায়?

আদিম মানুষ যখন দূর থেকে সঙ্গীর মৃত্যু দেখে নিঃশব্দে কাঁদতো, সেই কান্নায় ছিল গভীর মানবতা। তারা সাহায্য করতে পারেনি, কিন্তু অনুভব করেছিল। আজ আমরা সাহায্য করতে পারি, কিন্তু অনুভব করি না।

মানুষ পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রাণী এই কথা সত্য। কিন্তু মানুষই একমাত্র প্রাণী যে নিজের বিপদ নিজে বুঝতে পারে। নিজের ভুল নিজে সংশোধন করতে পারে।

প্রশ্ন হলো- আমরা কি সেই সুযোগ কাজে লাগাব? নাকি ইতিহাস একদিন লিখবে - মানুষ পৃথিবীতে এসেছিল, সব ধ্বংস করেছিল, তারপর নিজেও শেষ হয়ে গিয়েছিল?

মানুষের মহত্ত্ব তার শক্তিতে নয়, তার ক্ষমতায় নয় মানুষের মহত্ত্ব তার অনুভব করার ক্ষমতায়। সেই ক্ষমতা হারালে, আমরা কেবল দ্বিপদী জন্তুতে পরিণত হব।

.

লেখক: ভিডিও বিভাগ প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল

.


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত