সংবাদ

উপকূলে টেকসই বেড়িবাঁধ কেন অধরাই থেকে যাচ্ছে?


আল শাহারিয়া
আল শাহারিয়া
প্রকাশ: ৩ মে ২০২৬, ০৭:২৩ পিএম

উপকূলে টেকসই বেড়িবাঁধ কেন অধরাই থেকে যাচ্ছে?

প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম বা ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস এলেই বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের চোখেমুখে আতঙ্কের ছায়া নেমে আসে। আকাশ কালো হলে তাদের মনে একটাই ভয় কাজ করে, বেড়িবাঁধ টিকবে তো? সিডর, আইলা, আম্পান থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড় রিমালের দিকে তাকালে একটি সাধারণ চিত্র চোখে পড়ে। জলোচ্ছ্বাসের তোড়ে মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে যায় মাটির বাঁধ। নোনা পানিতে তলিয়ে যায় মাইলের পর মাইল ফসলি জমি। ভেসে যায় মাছের ঘের এবং গৃহহীন হয় হাজারো মানুষ। এরপর শুরু হয় ত্রাণ বিতরণের গতানুগতিক কার্যক্রম। কিন্তু উপকূলের মানুষের মূল দাবি কখনো ত্রাণ ছিল না। তাদের একমাত্র চাওয়া একটি মজবুত ও টেকসই বেড়িবাঁধ। একটি শক্ত বাঁধ তাদের কাছে শুধু মাটির স্তূপ নয়, এটি তাদের জীবন ও জীবিকা টিকিয়ে রাখার প্রধান হাতিয়ার। 

সরকার যে বাঁধ নির্মাণ বা সংস্কারের জন্য বরাদ্দ দিচ্ছে না, বিষয়টি এমন নয়। প্রতি বছরই ভাঙা বাঁধ মেরামতের জন্য অনেক প্রকল্প নেওয়া হয়। জরুরি ভিত্তিতে কাজও শুরু হয়। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, পরবর্তী কোনো মাঝারি বা বড় দুর্যোগ এলেই সেই নবনির্মিত বাঁধ আবারো ভেঙে পড়ে। এখানেই একটি বড় প্রশ্ন সামনে চলে আসে। কেন আমরা শতকোটি টাকা খরচ করেও একটি টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে বারবার ব্যর্থ হচ্ছি? এই ব্যর্থতার কারণ কেবল প্রকৃতির রুদ্ররোষ নয়। এর পেছনে লুকিয়ে আছে আমাদের ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থাপনা, সেকেলে প্রকৌশল এবং স্বচ্ছতার চরম অভাব। 

বেড়িবাঁধ বারবার ভেঙে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো প্রকৌশলগত ত্রুটি ও অবাস্তব নকশার প্রয়োগ। ষাট বা সত্তরের দশকে উপকূলীয় পোল্ডারগুলো যে নকশায় তৈরি করা হয়েছিল, আজকের জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে তা অনেকটাই অকার্যকর হয়ে পড়েছে। গত কয়েক দশকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। জোয়ারের পানির প্রবল চাপ এবং নদীর গতিপথে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু আমরা এখনও সেই পুরনো আমলের মাটির বাঁধ নির্মাণের ধারণাতেই আটকে আছি। অনেক ক্ষেত্রে নদী খনন না করেই কেবল বালু ও কাদা মাটি দিয়ে বাঁধ উঁচু করা হয়। এই ধরনের মাটি পানির সামান্য চাপেও খুব দ্রুত ধসে যায়। আধুনিক প্রকৌশল বিদ্যা বলে, উপকূলীয় বাঁধ হতে হবে পর্যাপ্ত চওড়া এবং এর ঢাল হতে হবে অত্যন্ত হেলানো। খাড়াভাবে মাটির দেয়াল তুলে দিলে তা কখনো জলোচ্ছ্বাসের ধাক্কা সামলাতে পারে না। তাছাড়া উপকূলের মাটি লবণাক্ত হওয়ায় তা এমনিতেই ভঙ্গুর প্রকৃতির হয়। এই মাটিকে সঠিক প্রযুক্তিতে মজবুত না করে শুধু এক জায়গা থেকে কেটে অন্য জায়গায় স্তূপ করে রাখলে তা বাঁধের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে না। অনেক প্রকল্পে জিও ব্যাগ বা কংক্রিটের ব্লক ব্যবহার করা হলেও তার নিচে সঠিক ফিল্টার ম্যাটেরিয়াল দেয়া হয় না। ফলে নিচ থেকে মাটি সরে গিয়ে পুরো ব্লক ধসে পড়ে। 

প্রকৌশলগত ত্রুটির চেয়েও ভয়াবহ সমস্যা হলো বাঁধ নির্মাণে স্বচ্ছতার অভাব। উপকূলীয় এলাকায় বাঁধ সংস্কার এখন একটি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। এটাকে সংস্কার বাণিজ্য বলে আখ্যায়িত করাই যায়। একটি বাঁধ যদি সত্যিই টেকসই করে নির্মাণ করা হয়, তবে প্রতি বছর সংস্কারের নামে মোটা বাজেট বরাদ্দ আনা সম্ভব নয়। এই অনৈতিক চক্রটিই মূলত স্থায়ী সমাধানের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। প্রায়শই দেখা যায়, বর্ষা মৌসুমের ঠিক আগে আগে তড়িঘড়ি করে বাঁধ মেরামতের কার্যাদেশ দেয়া হয়। ঠিকাদাররা যেনতেনভাবে মাটির কাজ শুরু করেন। কয়েক দিন পর ভারী বৃষ্টি বা জোয়ারের পানিতে সেই নতুন মাটি ধুয়ে যায়। তখন প্রাকৃতিক দুর্যোগের দোহাই দিয়ে কাজের পুরো বিল তুলে নেয়া হয়। এখানে জবাবদিহি চাওয়ার মতো শক্তিশালী কোনো কাঠামো নেই। কোন মানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে, ব্লকগুলো সঠিক অনুপাতে তৈরি করা হয়েছে কি না, তা তদারকি করার জন্য নিরপেক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেই। দুর্নীতির এই মহোৎসব বন্ধ করতে না পারলে হাজার কোটি টাকা পানিতে ফেলেও উপকূলের মানুষকে নিরাপদ করা যাবে না। 

টেকসই বাঁধ নির্মাণে আরেকটি বড় অবহেলার জায়গা হলো স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণের অভাব। আমাদের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো মূলত ঢাকা থেকে পরিচালিত হয়। দু-একদিন ভিজিটে এসে তারপর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে প্রকৌশলীরা এমন সব নকশা তৈরি করেন, যার সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার অনেক অমিল থাকে। নদীর কোন বাঁকে পানির আঘাত সবচেয়ে বেশি বা অমাবস্যায় জোয়ারের পানি কতদূর পর্যন্ত উঠতে পারে, তা নদীর পাড়ে বসবাস করা মানুষ যতটা বোঝেন, তা অনেক সময় সাধারণ জরিপে ধরা পড়ে না। কিন্তু বাঁধ নির্মাণের কোনো পর্যায়েই স্থানীয় মানুষের কার্যকর মতামত নেয়া হয় না। ঠিকাদাররা যখন নিম্নমানের কাজ করেন, তখন স্থানীয়রা প্রতিবাদ করলেও তা আমলে নেয়া হয় না। উল্টো অনেক সময় তাদের ভয়ভীতি দেখানো হয়। একটি টেকসই বাঁধের জন্য স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মালিকানাবোধ অত্যন্ত জরুরি। প্রকল্প গ্রহণ, নকশা প্রণয়ন এবং কাজ চলাকালীন তদারকিতে যদি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করা হয়, তবে দুর্নীতির সুযোগ অনেকটাই কমে আসে। মানুষ যখন জানবে এই বাঁধ তাদের নিজেদের জীবন বাঁচাবে, তখন তারাই কাজের মান নিশ্চিতে প্রহরীর ভূমিকা পালন করবে। 

প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে কেবল কংক্রিট আর মাটি দিয়ে উপকূল রক্ষা করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান। অতীতে বেড়িবাঁধগুলোর বাইরে বিস্তীর্ণ ম্যানগ্রোভ জঙ্গল ছিল। জলোচ্ছ্বাস যখন আঘাত হানতো, তখন এই বনভূমি প্রথম ধাক্কাটা সামলে নিত। গাছের শিকড় মাটিকে শক্ত করে ধরে রাখতো এবং বাঁধের ওপর পানির সরাসরি চাপ কমিয়ে দিত। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় চিংড়ি ঘের তৈরি ও অবৈধ দখলের কারণে আমরা সেই প্রাকৃতিক ঢাল ধ্বংস করে ফেলেছি। এখন নদীর আগ্রাসী স্রোত সরাসরি এসে বাঁধে আছড়ে পড়ে। একটি আধুনিক ও দীর্ঘমেয়াদি বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পে অবশ্যই বনায়ন কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। বাঁধের দুই পাশে এবং নদীর চরে ব্যাপক হারে লবণসহিষ্ণু গভীর শিকড়যুক্ত গাছ লাগাতে হবে। এই সবুজ বেষ্টনি কেবল বাঁধকেই রক্ষা করবে না, একইসঙ্গে উপকূলের বিপন্ন বাস্তুতন্ত্রও টিকিয়ে রাখবে। 

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সামনের দিনগুলোতে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ হিসেবে এই বিপদের একেবারে প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে আছে। তাই গতানুগতিক চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে আসার এখনই সময়। উপকূলের সুরক্ষা নিশ্চিত করা শুধু সেই অঞ্চলের মানুষের জীবন বাঁচানোর বিষয় নয়। এটি আমাদের জাতীয় অর্থনীতি এবং সার্বিক খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। বাঁধ ভেঙে নোনা পানি লোকালয়ে ঢুকলে তা শুধু বসতবাড়িই ভাসায় না, আগামী কয়েক বছরের জন্য সেই জমির ফসল উৎপাদন ক্ষমতাও পুরোপুরি নষ্ট করে দেয়। 

সরকারকে এখন সাময়িক সমাধানের পথ পরিহার করে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিতে হবে। শতবর্ষী ডেল্টা প্ল্যানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিটি বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। বাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং প্রতিটি প্রকল্পের জন্য তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে কঠোর অডিট ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। এই প্রক্রিয়ায় কোনোভাবেই দুর্নীতির সুযোগ রাখা যাবে না। সর্বোপরি স্থানীয় মানুষকে এই উন্নয়ন প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে যুক্ত করতে হবে। বছরের পর বছর বালুর বাঁধ তৈরি করে কোটি কোটি টাকা জলে ভাসানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। একবার বড় বিনিয়োগ করে যদি একটি স্থায়ী ও মজবুত বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা যায়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ সাশ্রয় করবে। সময় এসেছে ত্রাণের রাজনীতি বাদ দিয়ে উপকূলের মানুষের টিকে থাকার প্রধান অধিকার নিশ্চিত করার। টেকসই বেড়িবাঁধ এখন আর কোনো বিলাসী স্বপ্ন নয়, এটি আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার অন্যতম পূর্বশর্ত। 

[লেখক: শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ০৩ মে ২০২৬


উপকূলে টেকসই বেড়িবাঁধ কেন অধরাই থেকে যাচ্ছে?

প্রকাশের তারিখ : ০৩ মে ২০২৬

featured Image

প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম বা ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস এলেই বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের চোখেমুখে আতঙ্কের ছায়া নেমে আসে। আকাশ কালো হলে তাদের মনে একটাই ভয় কাজ করে, বেড়িবাঁধ টিকবে তো? সিডর, আইলা, আম্পান থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড় রিমালের দিকে তাকালে একটি সাধারণ চিত্র চোখে পড়ে। জলোচ্ছ্বাসের তোড়ে মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে যায় মাটির বাঁধ। নোনা পানিতে তলিয়ে যায় মাইলের পর মাইল ফসলি জমি। ভেসে যায় মাছের ঘের এবং গৃহহীন হয় হাজারো মানুষ। এরপর শুরু হয় ত্রাণ বিতরণের গতানুগতিক কার্যক্রম। কিন্তু উপকূলের মানুষের মূল দাবি কখনো ত্রাণ ছিল না। তাদের একমাত্র চাওয়া একটি মজবুত ও টেকসই বেড়িবাঁধ। একটি শক্ত বাঁধ তাদের কাছে শুধু মাটির স্তূপ নয়, এটি তাদের জীবন ও জীবিকা টিকিয়ে রাখার প্রধান হাতিয়ার। 

সরকার যে বাঁধ নির্মাণ বা সংস্কারের জন্য বরাদ্দ দিচ্ছে না, বিষয়টি এমন নয়। প্রতি বছরই ভাঙা বাঁধ মেরামতের জন্য অনেক প্রকল্প নেওয়া হয়। জরুরি ভিত্তিতে কাজও শুরু হয়। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, পরবর্তী কোনো মাঝারি বা বড় দুর্যোগ এলেই সেই নবনির্মিত বাঁধ আবারো ভেঙে পড়ে। এখানেই একটি বড় প্রশ্ন সামনে চলে আসে। কেন আমরা শতকোটি টাকা খরচ করেও একটি টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে বারবার ব্যর্থ হচ্ছি? এই ব্যর্থতার কারণ কেবল প্রকৃতির রুদ্ররোষ নয়। এর পেছনে লুকিয়ে আছে আমাদের ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থাপনা, সেকেলে প্রকৌশল এবং স্বচ্ছতার চরম অভাব। 

বেড়িবাঁধ বারবার ভেঙে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো প্রকৌশলগত ত্রুটি ও অবাস্তব নকশার প্রয়োগ। ষাট বা সত্তরের দশকে উপকূলীয় পোল্ডারগুলো যে নকশায় তৈরি করা হয়েছিল, আজকের জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে তা অনেকটাই অকার্যকর হয়ে পড়েছে। গত কয়েক দশকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। জোয়ারের পানির প্রবল চাপ এবং নদীর গতিপথে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু আমরা এখনও সেই পুরনো আমলের মাটির বাঁধ নির্মাণের ধারণাতেই আটকে আছি। অনেক ক্ষেত্রে নদী খনন না করেই কেবল বালু ও কাদা মাটি দিয়ে বাঁধ উঁচু করা হয়। এই ধরনের মাটি পানির সামান্য চাপেও খুব দ্রুত ধসে যায়। আধুনিক প্রকৌশল বিদ্যা বলে, উপকূলীয় বাঁধ হতে হবে পর্যাপ্ত চওড়া এবং এর ঢাল হতে হবে অত্যন্ত হেলানো। খাড়াভাবে মাটির দেয়াল তুলে দিলে তা কখনো জলোচ্ছ্বাসের ধাক্কা সামলাতে পারে না। তাছাড়া উপকূলের মাটি লবণাক্ত হওয়ায় তা এমনিতেই ভঙ্গুর প্রকৃতির হয়। এই মাটিকে সঠিক প্রযুক্তিতে মজবুত না করে শুধু এক জায়গা থেকে কেটে অন্য জায়গায় স্তূপ করে রাখলে তা বাঁধের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে না। অনেক প্রকল্পে জিও ব্যাগ বা কংক্রিটের ব্লক ব্যবহার করা হলেও তার নিচে সঠিক ফিল্টার ম্যাটেরিয়াল দেয়া হয় না। ফলে নিচ থেকে মাটি সরে গিয়ে পুরো ব্লক ধসে পড়ে। 

প্রকৌশলগত ত্রুটির চেয়েও ভয়াবহ সমস্যা হলো বাঁধ নির্মাণে স্বচ্ছতার অভাব। উপকূলীয় এলাকায় বাঁধ সংস্কার এখন একটি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। এটাকে সংস্কার বাণিজ্য বলে আখ্যায়িত করাই যায়। একটি বাঁধ যদি সত্যিই টেকসই করে নির্মাণ করা হয়, তবে প্রতি বছর সংস্কারের নামে মোটা বাজেট বরাদ্দ আনা সম্ভব নয়। এই অনৈতিক চক্রটিই মূলত স্থায়ী সমাধানের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। প্রায়শই দেখা যায়, বর্ষা মৌসুমের ঠিক আগে আগে তড়িঘড়ি করে বাঁধ মেরামতের কার্যাদেশ দেয়া হয়। ঠিকাদাররা যেনতেনভাবে মাটির কাজ শুরু করেন। কয়েক দিন পর ভারী বৃষ্টি বা জোয়ারের পানিতে সেই নতুন মাটি ধুয়ে যায়। তখন প্রাকৃতিক দুর্যোগের দোহাই দিয়ে কাজের পুরো বিল তুলে নেয়া হয়। এখানে জবাবদিহি চাওয়ার মতো শক্তিশালী কোনো কাঠামো নেই। কোন মানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে, ব্লকগুলো সঠিক অনুপাতে তৈরি করা হয়েছে কি না, তা তদারকি করার জন্য নিরপেক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেই। দুর্নীতির এই মহোৎসব বন্ধ করতে না পারলে হাজার কোটি টাকা পানিতে ফেলেও উপকূলের মানুষকে নিরাপদ করা যাবে না। 

টেকসই বাঁধ নির্মাণে আরেকটি বড় অবহেলার জায়গা হলো স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণের অভাব। আমাদের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো মূলত ঢাকা থেকে পরিচালিত হয়। দু-একদিন ভিজিটে এসে তারপর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে প্রকৌশলীরা এমন সব নকশা তৈরি করেন, যার সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার অনেক অমিল থাকে। নদীর কোন বাঁকে পানির আঘাত সবচেয়ে বেশি বা অমাবস্যায় জোয়ারের পানি কতদূর পর্যন্ত উঠতে পারে, তা নদীর পাড়ে বসবাস করা মানুষ যতটা বোঝেন, তা অনেক সময় সাধারণ জরিপে ধরা পড়ে না। কিন্তু বাঁধ নির্মাণের কোনো পর্যায়েই স্থানীয় মানুষের কার্যকর মতামত নেয়া হয় না। ঠিকাদাররা যখন নিম্নমানের কাজ করেন, তখন স্থানীয়রা প্রতিবাদ করলেও তা আমলে নেয়া হয় না। উল্টো অনেক সময় তাদের ভয়ভীতি দেখানো হয়। একটি টেকসই বাঁধের জন্য স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মালিকানাবোধ অত্যন্ত জরুরি। প্রকল্প গ্রহণ, নকশা প্রণয়ন এবং কাজ চলাকালীন তদারকিতে যদি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করা হয়, তবে দুর্নীতির সুযোগ অনেকটাই কমে আসে। মানুষ যখন জানবে এই বাঁধ তাদের নিজেদের জীবন বাঁচাবে, তখন তারাই কাজের মান নিশ্চিতে প্রহরীর ভূমিকা পালন করবে। 

প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে কেবল কংক্রিট আর মাটি দিয়ে উপকূল রক্ষা করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান। অতীতে বেড়িবাঁধগুলোর বাইরে বিস্তীর্ণ ম্যানগ্রোভ জঙ্গল ছিল। জলোচ্ছ্বাস যখন আঘাত হানতো, তখন এই বনভূমি প্রথম ধাক্কাটা সামলে নিত। গাছের শিকড় মাটিকে শক্ত করে ধরে রাখতো এবং বাঁধের ওপর পানির সরাসরি চাপ কমিয়ে দিত। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় চিংড়ি ঘের তৈরি ও অবৈধ দখলের কারণে আমরা সেই প্রাকৃতিক ঢাল ধ্বংস করে ফেলেছি। এখন নদীর আগ্রাসী স্রোত সরাসরি এসে বাঁধে আছড়ে পড়ে। একটি আধুনিক ও দীর্ঘমেয়াদি বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পে অবশ্যই বনায়ন কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। বাঁধের দুই পাশে এবং নদীর চরে ব্যাপক হারে লবণসহিষ্ণু গভীর শিকড়যুক্ত গাছ লাগাতে হবে। এই সবুজ বেষ্টনি কেবল বাঁধকেই রক্ষা করবে না, একইসঙ্গে উপকূলের বিপন্ন বাস্তুতন্ত্রও টিকিয়ে রাখবে। 

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সামনের দিনগুলোতে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ হিসেবে এই বিপদের একেবারে প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে আছে। তাই গতানুগতিক চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে আসার এখনই সময়। উপকূলের সুরক্ষা নিশ্চিত করা শুধু সেই অঞ্চলের মানুষের জীবন বাঁচানোর বিষয় নয়। এটি আমাদের জাতীয় অর্থনীতি এবং সার্বিক খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। বাঁধ ভেঙে নোনা পানি লোকালয়ে ঢুকলে তা শুধু বসতবাড়িই ভাসায় না, আগামী কয়েক বছরের জন্য সেই জমির ফসল উৎপাদন ক্ষমতাও পুরোপুরি নষ্ট করে দেয়। 

সরকারকে এখন সাময়িক সমাধানের পথ পরিহার করে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিতে হবে। শতবর্ষী ডেল্টা প্ল্যানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিটি বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। বাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং প্রতিটি প্রকল্পের জন্য তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে কঠোর অডিট ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। এই প্রক্রিয়ায় কোনোভাবেই দুর্নীতির সুযোগ রাখা যাবে না। সর্বোপরি স্থানীয় মানুষকে এই উন্নয়ন প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে যুক্ত করতে হবে। বছরের পর বছর বালুর বাঁধ তৈরি করে কোটি কোটি টাকা জলে ভাসানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। একবার বড় বিনিয়োগ করে যদি একটি স্থায়ী ও মজবুত বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা যায়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ সাশ্রয় করবে। সময় এসেছে ত্রাণের রাজনীতি বাদ দিয়ে উপকূলের মানুষের টিকে থাকার প্রধান অধিকার নিশ্চিত করার। টেকসই বেড়িবাঁধ এখন আর কোনো বিলাসী স্বপ্ন নয়, এটি আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার অন্যতম পূর্বশর্ত। 

[লেখক: শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত