সংবাদ

বহুমুখী অর্থনৈতিক চাপে দেশ


রেজাউল করিম খোকন
রেজাউল করিম খোকন
প্রকাশ: ৩ মে ২০২৬, ০৭:২৫ পিএম

বহুমুখী অর্থনৈতিক চাপে দেশ
মুরগি ও ডিমের দাম বেড়েছে

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাবে পরিবহন খরচ বাড়ছে। এর ঢেউ ইতোমধ্যে নিত্যপণ্যের দামে লাগতে শুরু করেছে। সামনে আরও দাম বৃদ্ধির শঙ্কা রয়েছে। তাই এখনই খরচ নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি। জ্বালানি খরচ বাড়লে পণ্য পরিবহন ব্যয়ও বাড়ে। ফলে পণ্য ও সেবার খরচ বৃদ্ধি পায় এবং এর প্রভাব পড়ে বাজারদরে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, মার্চ মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরও বেশি।

বৈশ্বিক জ্বালানি ও সরবরাহ পরিস্থিতির কারণে মূল্যস্ফীতি দ্রুত কমার সম্ভাবনা কম। এমন অবস্থায় সামনের দিনগুলোয় খরচের চাপ আরও বাড়তে পারে। তাই হিসাব করে চলাই সীমিত আয় ও মধ্যবিত্ত পরিবারের টিকে থাকার কার্যকর কৌশল হতে পারে। বর্তমানে দেশের মানুষ ক্রমেই একটি কঠিন পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদায়ের পর অনেকেই আশা করেছিলেন, দেড় বছরের স্থবিরতা কাটিয়ে অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে প্রাণ ফিরবে, শিল্পকারখানা সচল হবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। কিন্তু বাস্তবতা এখন ভিন্ন।

দেশের অর্থনীতি এখন একাধিক চাপে রয়েছে। মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি, মানুষের আয় চাপে রয়েছে, কর্মসংস্থান পরিস্থিতি দুর্বল। বিনিয়োগও প্রত্যাশামতো বাড়ছে না। এর মধ্যে নতুন করে জ্বালানি ও বৈদেশিক খাতে চাপের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এ অবস্থায় নতুন সরকারের সামনে মূল প্রশ্ন—কোন সমস্যাকে আগে অগ্রাধিকার দেয়া হবে: মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, ব্যাংক খাত, নাকি জ্বালানি?

বাংলাদেশের মতো ঘাটতি বাজেটের দেশে সরকারকে ধার করে চলতে হয়। দেশি বা বিদেশি—উভয় উৎস থেকেই ঋণ নেয়া হয়। সরকার আগে ব্যয় করে, পরে অর্থের সংস্থান করে। নতুন সরকারকে আগের প্রকল্পগুলোর ব্যয়ের চাপও বহন করতে হচ্ছে। সরকারের আয়ের প্রধান উৎস রাজস্ব খাত হলেও বর্তমানে রাজস্ব আদায়ের পরিস্থিতি দুর্বল। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে শুল্ক-কর আদায়ে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার ঘাটতি হয়েছে, যা এযাবৎকালের সর্বোচ্চ। ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থাও সন্তোষজনক নয়। ফলে রাজস্ব আয় দ্রুত বাড়বে, এমন আশা করা কঠিন।

এ পরিস্থিতিতে সরকারি বেতন-ভাতা, সুদ ব্যয়, ভর্তুকি ও চলমান প্রকল্পের ব্যয় মেটাতে সরকারকে নিয়মিত ঋণ নিতে হচ্ছে। ঋণ ব্যবস্থাপনা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কখনো কখনো কেন্দ্রীয় ব্যাংককেও টাকা ছাপিয়ে সহায়তা দিতে হচ্ছে। এতে রিজার্ভ মানি বৃদ্ধি পায়, যা বাজারে অর্থের জোগান বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়াতে পারে।

এদিকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটও দ্রুত বদলাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর বেশি পড়ছে। ফলে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নতুন করে সাজানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলেছে, বৈশ্বিক সংঘাতের ফলে জ্বালানি ও পণ্যের দাম বাড়বে, উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়বে। একই সঙ্গে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শ্রমবাজারে চাপ বাড়বে। বিনিয়োগকারীদের আস্থাও কমে যেতে পারে, যা আর্থিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যেসব দেশ জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তাদের ঝুঁকি বেশি।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক সহায়তার জন্য উদ্যোগ নিয়েছে। তবে আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির শর্ত পূরণে ধীরগতির কারণে ঋণের কিস্তি ছাড়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। রাজস্ব খাত, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং জ্বালানি ভর্তুকি সংস্কারসহ বিভিন্ন বিষয়ে অগ্রগতি প্রয়োজন। এসব সংস্কার কার্যক্রমে গতি না এলে কাঙ্ক্ষিত সহায়তা পাওয়া কঠিন হবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সমšি^ত ও বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণ। স্বল্পমেয়াদি চাপ মোকাবিলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার ভিত্তি তৈরি করা জরুরি। এজন্য অগ্রাধিকার নির্ধারণ, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব বাড়ানো এবং কাঠামোগত সংস্কারে দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ০৩ মে ২০২৬


বহুমুখী অর্থনৈতিক চাপে দেশ

প্রকাশের তারিখ : ০৩ মে ২০২৬

featured Image

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাবে পরিবহন খরচ বাড়ছে। এর ঢেউ ইতোমধ্যে নিত্যপণ্যের দামে লাগতে শুরু করেছে। সামনে আরও দাম বৃদ্ধির শঙ্কা রয়েছে। তাই এখনই খরচ নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি। জ্বালানি খরচ বাড়লে পণ্য পরিবহন ব্যয়ও বাড়ে। ফলে পণ্য ও সেবার খরচ বৃদ্ধি পায় এবং এর প্রভাব পড়ে বাজারদরে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, মার্চ মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরও বেশি।

বৈশ্বিক জ্বালানি ও সরবরাহ পরিস্থিতির কারণে মূল্যস্ফীতি দ্রুত কমার সম্ভাবনা কম। এমন অবস্থায় সামনের দিনগুলোয় খরচের চাপ আরও বাড়তে পারে। তাই হিসাব করে চলাই সীমিত আয় ও মধ্যবিত্ত পরিবারের টিকে থাকার কার্যকর কৌশল হতে পারে। বর্তমানে দেশের মানুষ ক্রমেই একটি কঠিন পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদায়ের পর অনেকেই আশা করেছিলেন, দেড় বছরের স্থবিরতা কাটিয়ে অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে প্রাণ ফিরবে, শিল্পকারখানা সচল হবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। কিন্তু বাস্তবতা এখন ভিন্ন।

দেশের অর্থনীতি এখন একাধিক চাপে রয়েছে। মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি, মানুষের আয় চাপে রয়েছে, কর্মসংস্থান পরিস্থিতি দুর্বল। বিনিয়োগও প্রত্যাশামতো বাড়ছে না। এর মধ্যে নতুন করে জ্বালানি ও বৈদেশিক খাতে চাপের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এ অবস্থায় নতুন সরকারের সামনে মূল প্রশ্ন—কোন সমস্যাকে আগে অগ্রাধিকার দেয়া হবে: মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, ব্যাংক খাত, নাকি জ্বালানি?

বাংলাদেশের মতো ঘাটতি বাজেটের দেশে সরকারকে ধার করে চলতে হয়। দেশি বা বিদেশি—উভয় উৎস থেকেই ঋণ নেয়া হয়। সরকার আগে ব্যয় করে, পরে অর্থের সংস্থান করে। নতুন সরকারকে আগের প্রকল্পগুলোর ব্যয়ের চাপও বহন করতে হচ্ছে। সরকারের আয়ের প্রধান উৎস রাজস্ব খাত হলেও বর্তমানে রাজস্ব আদায়ের পরিস্থিতি দুর্বল। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে শুল্ক-কর আদায়ে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার ঘাটতি হয়েছে, যা এযাবৎকালের সর্বোচ্চ। ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থাও সন্তোষজনক নয়। ফলে রাজস্ব আয় দ্রুত বাড়বে, এমন আশা করা কঠিন।

এ পরিস্থিতিতে সরকারি বেতন-ভাতা, সুদ ব্যয়, ভর্তুকি ও চলমান প্রকল্পের ব্যয় মেটাতে সরকারকে নিয়মিত ঋণ নিতে হচ্ছে। ঋণ ব্যবস্থাপনা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কখনো কখনো কেন্দ্রীয় ব্যাংককেও টাকা ছাপিয়ে সহায়তা দিতে হচ্ছে। এতে রিজার্ভ মানি বৃদ্ধি পায়, যা বাজারে অর্থের জোগান বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়াতে পারে।

এদিকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটও দ্রুত বদলাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর বেশি পড়ছে। ফলে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নতুন করে সাজানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলেছে, বৈশ্বিক সংঘাতের ফলে জ্বালানি ও পণ্যের দাম বাড়বে, উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়বে। একই সঙ্গে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শ্রমবাজারে চাপ বাড়বে। বিনিয়োগকারীদের আস্থাও কমে যেতে পারে, যা আর্থিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যেসব দেশ জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তাদের ঝুঁকি বেশি।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক সহায়তার জন্য উদ্যোগ নিয়েছে। তবে আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির শর্ত পূরণে ধীরগতির কারণে ঋণের কিস্তি ছাড়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। রাজস্ব খাত, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং জ্বালানি ভর্তুকি সংস্কারসহ বিভিন্ন বিষয়ে অগ্রগতি প্রয়োজন। এসব সংস্কার কার্যক্রমে গতি না এলে কাঙ্ক্ষিত সহায়তা পাওয়া কঠিন হবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সমšি^ত ও বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণ। স্বল্পমেয়াদি চাপ মোকাবিলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার ভিত্তি তৈরি করা জরুরি। এজন্য অগ্রাধিকার নির্ধারণ, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব বাড়ানো এবং কাঠামোগত সংস্কারে দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত