সমসাময়িক বাংলাদেশে পরিচয় আর কেবল পরিবার, ভাষা, ধর্ম বা ভৌগোলিক অবস্থানের আদিম সূত্রে নির্ধারিত হয় না—এটি ক্রমশ এক জটিল ‘ভোক্তা আচরণ’ বা ‘কনজিউমার বিহেভিয়ার’-এর মাধ্যমে নির্মিত হচ্ছে। বাজার এখন আর কেবল পণ্য ও সেবার আদান-প্রদানের একটি সাধারণ চত্বর নয়; এটি এখন এমন এক প্রতীকী ও রাজনৈতিক ক্ষেত্র, যেখানে মানুষ নিজের অস্তিত্ব, আকাঙ্ক্ষা এবং সামাজিক অবস্থানকে প্রতিনিয়ত সংজ্ঞায়িত করছে। ঢাকার বিলাসবহুল শপিং মল থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর এবং অনলাইন ও ফেইসবুক মার্কেটপ্লেস—সবখানেই ‘ভোগ’ বা ‘কনজাম্পশন’ এখন একটি শক্তিশালী ভাষায় পরিণত হয়েছে। এই ভাষার মাধ্যমেই ব্যক্তি সমাজকে বলছে সে আসলে কে, এবং সে কোন অবস্থানে পৌঁছাতে চায়।
পরিচয় রাজনীতির এই নতুন রূপান্তরটি নিছক অর্থনৈতিক নয়, বরং গভীরভাবে মনস্তাত্ত্বিক। বাংলাদেশে একসময় পরিচয় নির্ধারিত হতো আদর্শিক অবস্থান বা শ্রেণীসংগ্রামের ভিত্তিতে। কিন্তু বর্তমানের বিশ্বায়িত বাস্তবতায় সেই জায়গা দখল করেছে ব্র্যান্ডের লোগো, স্মার্টফোনের মডেল এবং জীবনযাত্রার আভিজাত্য। এই পরিবর্তনের ফলে আমাদের সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তিগুলোও পণ্যমুখী হয়ে উঠেছে।
ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়েরে বোর্দিউ তার বিখ্যাত গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, মানুষের খাদ্যাভ্যাস, পোশাকের ধরন কিংবা বিচিত্র সব পছন্দ আসলে তার ‘সাংস্কৃতিক পুঁজি’-র বহিঃপ্রকাশ। বোর্দিউর মতে, উচ্চবিত্তরা কেবল সম্পদ দিয়ে নয়, বরং তাদের বিশেষ রুচি (টেস্ট) দিয়ে নিজেদের সাধারণ মানুষ থেকে আলাদা করে। বাংলাদেশেও এই বাস্তবতার প্রতিফলন অত্যন্ত তীব্র।
একটি নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের পোশাক পরা কিংবা দামি কফি শপে বসে আড্ডা দেয়া এখন আর কেবল বিলাসিতা নয়; এটি একটি ‘সাংস্কৃতিক সংকেত’। এই সংকেতটি সমাজে এক ধরনের কৃত্রিম উঁচু-নিচু ভেদাভেদ বা ‘সোশ্যাল ডিস্টিংশন’ তৈরি করে। যখন একজন ব্যক্তি স্থানীয় পণ্যের চেয়ে বিদেশি ব্র্যান্ডকে প্রাধান্য দেন, তখন তিনি আসলে একটি বিশেষ বিশ্বজনীন পরিচয়ের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে চান। এই প্রক্রিয়ায় পরিচয় আর জন্মগত থাকে না, তা হয়ে ওঠে অর্জিত এবং ক্রয়যোগ্য।
আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী থরস্টেইন ভেবলেন এক শতাব্দী আগে ‘কনস্পিকুয়াস কনজাম্পশন’ বা ‘দৃষ্টিনন্দন ভোগ’-এর ধারণাটি দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, মানুষ পণ্য কেনে তার ব্যবহারিক মূল্যের জন্য নয়, বরং সমাজে নিজের মর্যাদা প্রদর্শনের জন্য। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই তত্ত্বটি এখনকার চেয়ে প্রাসঙ্গিক আর কখনোই ছিল না।
বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের কাছে বিয়ে, ঈদ কিংবা যেকোনো সামাজিক অনুষ্ঠান এখন আর কেবল উৎসব নয়, বরং এটি নিজের সক্ষমতা প্রদর্শনের একটি বৃহৎ মঞ্চ। দামি গাড়ি, দামি আসবাবপত্র এবং ব্র্যান্ডের ঘড়ি ব্যবহার করার মাধ্যমে ব্যক্তি এটি প্রমাণ করতে চায় যে সে ‘সাফল্যের’ চূড়ায় পৌঁছেছে। মজার বিষয় হলো, এই প্রদর্শনের প্রবণতা এখন আর কেবল উচ্চবিত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে নিম্ন-মধ্যবিত্ত এমনকি শ্রমজীবী মানুষের মধ্যেও এই ‘প্রদর্শনীমূলক ভোগ’ ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মৌলিক চাহিদা অপূর্ণ রেখেও মানুষ কেবল সামাজিক মর্যাদা রক্ষার তাগিদে দামি গ্যাজেট বা ফ্যাশনেবল পণ্য ক্রয় করছে। এই ‘ধারের ওপর গড়া আধুনিকতা’ আমাদের সমাজের এক গভীর অর্থনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
বাংলাদেশে পরিচয় রাজনীতি ঐতিহাসিকভাবে ভাষা, ধর্ম এবং জাতীয়তাবাদের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তবে বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে এই উপাদানগুলো বাজারের পণ্যে পরিণত হতে শুরু করেছে। সাংস্কৃতিক তাত্ত্বিক স্টুয়ার্ট হলো-এর মতে, পরিচয় কোনো স্থির বিষয় নয়; এটি প্রতিনিয়ত বিভিন্ন প্রতীকের মাধ্যমে নির্মিত হয়। বাংলাদেশে বর্তমান সময়ে ‘হালাল’ প্রসাধনী, ‘মডেস্ট ফ্যাশন’ (শালীন পোশাক) কিংবা ‘দেশি অর্গানিক’ খাদ্যের যে জোয়ার, তা আসলে বাজারভিত্তিক পরিচয়েরই প্রতিফলন।
একজন ব্যক্তি যখন ‘হালাল’ লেবেলযুক্ত সাবান বা শ্যাম্পু কেনেন, তখন তিনি কেবল একটি পণ্য কিনছেন না; তিনি নিজের ধর্মীয় পরিচয়ের একটি স্বীকৃতিও কিনছেন। একইভাবে, ‘দেশি’ পণ্যের বিজ্ঞাপনে যখন জাতীয়তাবাদকে পুঁজি করা হয়, তখন ক্রেতা সেই পণ্যটি কিনে নিজেকে একজন ‘দেশপ্রেমিক’ নাগরিক হিসেবে অনুভব করেন। অর্থাৎ, বাজার এখন আমাদের ধর্মবিশ্বাস এবং দেশপ্রেমকেও প্যাকেটজাত করে বিক্রি করছে। এখানে কার্ল মার্কস-এর ‘কমোডিটি ফেটিশজম’ বা পণ্যের মোহময়তার ধারণাটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। পণ্যের পেছনে থাকা শ্রমিকের ঘাম বা উৎপাদন কাঠামোর শোষণের কথা আমরা ভুলে যাই, যখন পণ্যটি আমাদের সামনে একটি বিশেষ আদর্শিক পরিচয় নিয়ে হাজির হয়।
বাংলাদেশে ভোক্তা সংস্কৃতির এই উল্লম্ফনে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। ফেইসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং টিকটক এখন পরিচয় নির্মাণের প্রধান কারখানা। ইনস্টাগ্রামের নান্দনিকতা বা ‘এস্থেটিকস’ এখন তরুণ প্রজন্মের কাছে জীবনের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজের প্রকৃত জীবনের চেয়ে ‘ডিজিটাল উপস্থিতি’ এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ইনফ্লুয়েন্সার বা ডিজিটাল প্রভাবশালীদের জীবনধারা দেখে সাধারণ তরুণরা নিজেদের জীবনকে মূল্যায়ন করছে। এই প্রক্রিয়ায় ‘নিজস্বতা’ বা ‘অথেন্টিসিটি’ একটি ব্যবসায়িক প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। ব্যক্তি এখন আর তার নিজের জন্য বাঁচে না; সে বাঁচে তার ভার্চুয়াল অনুসারীদের লাইক এবং শেয়ারের জন্য। এই ‘ডিজিটাল প্রদর্শনী’ মানুষকে একটি মেকি সত্তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানী জিগমুন্ট বাউম্যান একে বলেছিলেন ‘লিকুইড মডার্নিটি’ বা তরল আধুনিকতা। যেখানে সবকিছুই অস্থায়ী—আজকের পরিচয় কালকের নতুন কোনো ট্রেন্ডের কাছে ফিকে হয়ে যায়। এই অস্থিতিশীলতা মানুষের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী উদ্বেগ এবং হীনমন্যতা তৈরি করছে।
বিশ্বায়ন বা গ্লোবালাইজেশন বাংলাদেশে একটি ‘হাইব্রিড’ বা মিশ্র সাংস্কৃতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে। সমাজবিজ্ঞানে একে ‘গ্লোকালাইজেশন’ বলা হয়। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে বৈশ্বিক সংস্কৃতি স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে নতুন রূপ ধারণ করে। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ফাস্ট ফুড চেইন যখন স্থানীয় মশলা ব্যবহার করে মেনু তৈরি করে, কিংবা যখন পাশ্চাত্য ঘরানার পোশাকে দেশি নকশা যোগ করা হয়, তখন সেটি এই গ্লোকালাইজেশনেরই উদাহরণ।
তবে এই মিশ্রণ সবসময় ইতিবাচক নয়। এর ফলে আমাদের স্থানীয় ঐতিহ্যগুলো অনেক সময় তার গভীরতা হারিয়ে কেবল পর্যটন বা বিপণনের সামগ্রীতে পরিণত হয়। মেলা, পূজা বা ঈদের ঐতিহ্যবাহী অনুষঙ্গগুলো এখন কর্পোরেট স্পন্সরশিপের ওপর নির্ভরশীল। ফলে পরিচয় আর শেকড় থেকে আসে না, তা আসে কর্পোরেট ব্র্যান্ডিং থেকে। এই ‘ব্র্যান্ডেড পরিচয়’ আমাদের সাংস্কৃতিক স্বকীয়তাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
ভোক্তা সংস্কৃতির এই প্রসারের সমান্তরালে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক বৈষম্যও বৃদ্ধি পেয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্পের যে শ্রমিক ৫ ডলারের মজুরিতে একটি ব্র্যান্ডের শার্ট তৈরি করছেন, সেই একই শার্ট যখন ঢাকার কোনো অভিজাত শপিং মলে ৫০ ডলারে বিক্রি হয়, তখন সেটি এক চরম বৈপরীত্য তুলে ধরে। একদিকে ভোগের উৎসব, অন্যদিকে উৎপাদনের কঠোর শ্রম।
এই ব্যবস্থার অন্যতম বড় ঝুঁকি হলো ‘ভোগের আর্থিকীকরণ’। মোবাইল ব্যাংকিং এবং ক্রেডিট কার্ডের সহজলভ্যতা মানুষকে সঞ্চয়ের চেয়ে ব্যয়ের দিকে বেশি উৎসাহিত করছে। ‘এখনই ভোগ করুন, পরে পরিশোধ করুন’—এই নীতি মানুষকে দীর্ঘমেয়াদী ঋণের ফাঁদে ফেলছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম, যারা পরিচয় গঠনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, তারা এই আর্থিক ঝুঁকির প্রধান শিকার। পরিচয় এখানে কেবল একটি সাংস্কৃতিক বিষয় নয়, এটি হয়ে উঠছে একটি বিশাল আর্থিক বোঝা।
ভোক্তা সংস্কৃতির সবচেয়ে গভীর প্রভাব পড়েছে আমাদের রাজনৈতিক চেতনার ওপর। যখন পরিচয় ক্রমশ ভোগের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন একজন ব্যক্তি নিজেকে ‘নাগরিক’ হিসেবে ভাবার চেয়ে ‘ভোক্তা’ হিসেবে ভাবতে বেশি পছন্দ করেন। নাগরিকের দায়িত্ব হলো রাষ্ট্র ও সমাজের প্রশ্নে সক্রিয় হওয়া, কিন্তু ভোক্তার দায়িত্ব হলো কেবল নিজের পছন্দ ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করা।
রাজনীতিও এখন অনেকটা পণ্যের বিপণনের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো এখন জনগণের কাছে নাগরিক অধিকারের চেয়ে ‘উন্নয়নের সুফল’ এবং ‘সুযোগ-সুবিধা’ বেশি বিক্রি করতে চায়। ফলে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এখন জীবনধারার পছন্দে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি হ্যাসট্যাগ ব্যবহার করা কিংবা সচেতনতামূলক পোস্ট শেয়ার করাকেই অনেকে বড় ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে গণ্য করছেন। একে ‘স্ল্যাক্টিভিজম’ বা অলস সক্রিয়তা বলা হয়। এটি মানুষকে গভীর কাঠামোগত পরিবর্তনের লড়াই থেকে দূরে সরিয়ে দিয়ে একটি প্রতীকী তৃপ্তির মধ্যে আবদ্ধ রাখে।
বাংলাদেশের ভোক্তা সংস্কৃতিতে নারীদের ভূমিকা দ্বিমুখী। একদিকে, অনলাইন ব্যবসা এবং এফ-কমার্স প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অনেক নারী উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। এটি তাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং ক্ষমতায়নের সুযোগ তৈরি করেছে। তারা নিজেদের পছন্দমতো পোশাক বা পণ্য নির্বাচন করে প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন।
অন্যদিকে, বাজার নারীর পরিচয়কে নতুনভাবে পণ্যায়িত করছে। সৌন্দর্য পণ্য, ডায়েট প্ল্যান এবং মডেস্ট ফ্যাশনের নামে নারীর ওপর নতুন নতুন সৌন্দর্যের মানদণ্ড চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। নারীকে এখন প্রতিনিয়ত ‘নিখুঁত’ হওয়ার চাপে থাকতে হয়, যা মূলত বাজারেরই একটি কৌশল। ফলে ক্ষমতায়নের আড়ালে অনেক সময় নতুন ধরনের পরনির্ভরশীলতা এবং আত্মবিশ্বাসের অভাব তৈরি হচ্ছে।
ভোক্তা সংস্কৃতি ও পরিচয় রাজনীতির এই মেলবন্ধন আমাদের সামনে কিছু মৌলিক প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। আমরা কি কেবল পণ্যের মাধ্যমেই নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করব? আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম কি কেবল ব্র্যান্ডের লোগো দেখেই একে অপরকে মূল্যায়ন করবে? অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যদি কেবল ভোগের উন্মাদনা তৈরি করে এবং সামাজিক সংহতি নষ্ট করে, তবে সেই প্রবৃদ্ধির সার্থকতা কোথায়?
বাংলাদেশ এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের একদিকে আছে উদীয়মান অর্থনীতির হাতছানি, অন্যদিকে আছে শেকড়হীন পরিচয়ের ঝুঁকি। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ হলো ভোক্তা সংস্কৃতিকে পুরোপুরি অস্বীকার করা নয়, বরং একে সমালোচনামূলকভাবে দেখা। আমাদের বুঝতে হবে যে, মানুষের পরিচয় তার কেনা পণ্যে নয়, বরং তার মানবিক মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার মধ্যে নিহিত।
পরিচয় কোনো ব্র্যান্ড নয় যা বাজার থেকে কেনা যায়; এটি একটি চর্চা যা তিলে তিলে গড়ে তুলতে হয়। অন্তর্ভুক্তি কোনো শপিং মলের সদস্যপদে নেই, এটি আছে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের প্রতি সম্মান ও সহমর্মিতার মধ্যে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আমরা কতটা সচেতনভাবে এই ‘ব্র্যান্ডে গড়া সত্তা’ থেকে বেরিয়ে এসে একটি প্রকৃত মানবিক ও সামষ্টিক পরিচয় নির্মাণ করতে পারি তার ওপর।
বাজার আমাদের পণ্য দিতে পারে, কিন্তু গরিমা দিতে পারে না। বাজার আমাদের সুবিধাবাদ দিতে পারে, কিন্তু মুক্তি দিতে পারে না। পরিচয় যখন ভোগের দাস হয়ে পড়ে, তখন মানুষের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য হারিয়ে যায়। তাই আমাদের প্রয়োজন এমন এক সাংস্কৃতিক জাগরণ, যা মানুষকে পুনরায় ‘ভোক্তা’ থেকে ‘নাগরিক’ হিসেবে রূপান্তরিত করবে এবং পণ্যের সম্পর্কের চেয়ে মানুষের সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেবে। বাংলাদেশের এই দীর্ঘ যাত্রা কেবল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নয়, বরং এটি আত্মপরিচয় পুনরুদ্ধারেরও এক মহান লড়াই।
[লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী]

রোববার, ০৩ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ মে ২০২৬
সমসাময়িক বাংলাদেশে পরিচয় আর কেবল পরিবার, ভাষা, ধর্ম বা ভৌগোলিক অবস্থানের আদিম সূত্রে নির্ধারিত হয় না—এটি ক্রমশ এক জটিল ‘ভোক্তা আচরণ’ বা ‘কনজিউমার বিহেভিয়ার’-এর মাধ্যমে নির্মিত হচ্ছে। বাজার এখন আর কেবল পণ্য ও সেবার আদান-প্রদানের একটি সাধারণ চত্বর নয়; এটি এখন এমন এক প্রতীকী ও রাজনৈতিক ক্ষেত্র, যেখানে মানুষ নিজের অস্তিত্ব, আকাঙ্ক্ষা এবং সামাজিক অবস্থানকে প্রতিনিয়ত সংজ্ঞায়িত করছে। ঢাকার বিলাসবহুল শপিং মল থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর এবং অনলাইন ও ফেইসবুক মার্কেটপ্লেস—সবখানেই ‘ভোগ’ বা ‘কনজাম্পশন’ এখন একটি শক্তিশালী ভাষায় পরিণত হয়েছে। এই ভাষার মাধ্যমেই ব্যক্তি সমাজকে বলছে সে আসলে কে, এবং সে কোন অবস্থানে পৌঁছাতে চায়।
পরিচয় রাজনীতির এই নতুন রূপান্তরটি নিছক অর্থনৈতিক নয়, বরং গভীরভাবে মনস্তাত্ত্বিক। বাংলাদেশে একসময় পরিচয় নির্ধারিত হতো আদর্শিক অবস্থান বা শ্রেণীসংগ্রামের ভিত্তিতে। কিন্তু বর্তমানের বিশ্বায়িত বাস্তবতায় সেই জায়গা দখল করেছে ব্র্যান্ডের লোগো, স্মার্টফোনের মডেল এবং জীবনযাত্রার আভিজাত্য। এই পরিবর্তনের ফলে আমাদের সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তিগুলোও পণ্যমুখী হয়ে উঠেছে।
ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়েরে বোর্দিউ তার বিখ্যাত গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, মানুষের খাদ্যাভ্যাস, পোশাকের ধরন কিংবা বিচিত্র সব পছন্দ আসলে তার ‘সাংস্কৃতিক পুঁজি’-র বহিঃপ্রকাশ। বোর্দিউর মতে, উচ্চবিত্তরা কেবল সম্পদ দিয়ে নয়, বরং তাদের বিশেষ রুচি (টেস্ট) দিয়ে নিজেদের সাধারণ মানুষ থেকে আলাদা করে। বাংলাদেশেও এই বাস্তবতার প্রতিফলন অত্যন্ত তীব্র।
একটি নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের পোশাক পরা কিংবা দামি কফি শপে বসে আড্ডা দেয়া এখন আর কেবল বিলাসিতা নয়; এটি একটি ‘সাংস্কৃতিক সংকেত’। এই সংকেতটি সমাজে এক ধরনের কৃত্রিম উঁচু-নিচু ভেদাভেদ বা ‘সোশ্যাল ডিস্টিংশন’ তৈরি করে। যখন একজন ব্যক্তি স্থানীয় পণ্যের চেয়ে বিদেশি ব্র্যান্ডকে প্রাধান্য দেন, তখন তিনি আসলে একটি বিশেষ বিশ্বজনীন পরিচয়ের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে চান। এই প্রক্রিয়ায় পরিচয় আর জন্মগত থাকে না, তা হয়ে ওঠে অর্জিত এবং ক্রয়যোগ্য।
আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী থরস্টেইন ভেবলেন এক শতাব্দী আগে ‘কনস্পিকুয়াস কনজাম্পশন’ বা ‘দৃষ্টিনন্দন ভোগ’-এর ধারণাটি দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, মানুষ পণ্য কেনে তার ব্যবহারিক মূল্যের জন্য নয়, বরং সমাজে নিজের মর্যাদা প্রদর্শনের জন্য। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই তত্ত্বটি এখনকার চেয়ে প্রাসঙ্গিক আর কখনোই ছিল না।
বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের কাছে বিয়ে, ঈদ কিংবা যেকোনো সামাজিক অনুষ্ঠান এখন আর কেবল উৎসব নয়, বরং এটি নিজের সক্ষমতা প্রদর্শনের একটি বৃহৎ মঞ্চ। দামি গাড়ি, দামি আসবাবপত্র এবং ব্র্যান্ডের ঘড়ি ব্যবহার করার মাধ্যমে ব্যক্তি এটি প্রমাণ করতে চায় যে সে ‘সাফল্যের’ চূড়ায় পৌঁছেছে। মজার বিষয় হলো, এই প্রদর্শনের প্রবণতা এখন আর কেবল উচ্চবিত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে নিম্ন-মধ্যবিত্ত এমনকি শ্রমজীবী মানুষের মধ্যেও এই ‘প্রদর্শনীমূলক ভোগ’ ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মৌলিক চাহিদা অপূর্ণ রেখেও মানুষ কেবল সামাজিক মর্যাদা রক্ষার তাগিদে দামি গ্যাজেট বা ফ্যাশনেবল পণ্য ক্রয় করছে। এই ‘ধারের ওপর গড়া আধুনিকতা’ আমাদের সমাজের এক গভীর অর্থনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
বাংলাদেশে পরিচয় রাজনীতি ঐতিহাসিকভাবে ভাষা, ধর্ম এবং জাতীয়তাবাদের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তবে বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে এই উপাদানগুলো বাজারের পণ্যে পরিণত হতে শুরু করেছে। সাংস্কৃতিক তাত্ত্বিক স্টুয়ার্ট হলো-এর মতে, পরিচয় কোনো স্থির বিষয় নয়; এটি প্রতিনিয়ত বিভিন্ন প্রতীকের মাধ্যমে নির্মিত হয়। বাংলাদেশে বর্তমান সময়ে ‘হালাল’ প্রসাধনী, ‘মডেস্ট ফ্যাশন’ (শালীন পোশাক) কিংবা ‘দেশি অর্গানিক’ খাদ্যের যে জোয়ার, তা আসলে বাজারভিত্তিক পরিচয়েরই প্রতিফলন।
একজন ব্যক্তি যখন ‘হালাল’ লেবেলযুক্ত সাবান বা শ্যাম্পু কেনেন, তখন তিনি কেবল একটি পণ্য কিনছেন না; তিনি নিজের ধর্মীয় পরিচয়ের একটি স্বীকৃতিও কিনছেন। একইভাবে, ‘দেশি’ পণ্যের বিজ্ঞাপনে যখন জাতীয়তাবাদকে পুঁজি করা হয়, তখন ক্রেতা সেই পণ্যটি কিনে নিজেকে একজন ‘দেশপ্রেমিক’ নাগরিক হিসেবে অনুভব করেন। অর্থাৎ, বাজার এখন আমাদের ধর্মবিশ্বাস এবং দেশপ্রেমকেও প্যাকেটজাত করে বিক্রি করছে। এখানে কার্ল মার্কস-এর ‘কমোডিটি ফেটিশজম’ বা পণ্যের মোহময়তার ধারণাটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। পণ্যের পেছনে থাকা শ্রমিকের ঘাম বা উৎপাদন কাঠামোর শোষণের কথা আমরা ভুলে যাই, যখন পণ্যটি আমাদের সামনে একটি বিশেষ আদর্শিক পরিচয় নিয়ে হাজির হয়।
বাংলাদেশে ভোক্তা সংস্কৃতির এই উল্লম্ফনে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। ফেইসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং টিকটক এখন পরিচয় নির্মাণের প্রধান কারখানা। ইনস্টাগ্রামের নান্দনিকতা বা ‘এস্থেটিকস’ এখন তরুণ প্রজন্মের কাছে জীবনের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজের প্রকৃত জীবনের চেয়ে ‘ডিজিটাল উপস্থিতি’ এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ইনফ্লুয়েন্সার বা ডিজিটাল প্রভাবশালীদের জীবনধারা দেখে সাধারণ তরুণরা নিজেদের জীবনকে মূল্যায়ন করছে। এই প্রক্রিয়ায় ‘নিজস্বতা’ বা ‘অথেন্টিসিটি’ একটি ব্যবসায়িক প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। ব্যক্তি এখন আর তার নিজের জন্য বাঁচে না; সে বাঁচে তার ভার্চুয়াল অনুসারীদের লাইক এবং শেয়ারের জন্য। এই ‘ডিজিটাল প্রদর্শনী’ মানুষকে একটি মেকি সত্তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানী জিগমুন্ট বাউম্যান একে বলেছিলেন ‘লিকুইড মডার্নিটি’ বা তরল আধুনিকতা। যেখানে সবকিছুই অস্থায়ী—আজকের পরিচয় কালকের নতুন কোনো ট্রেন্ডের কাছে ফিকে হয়ে যায়। এই অস্থিতিশীলতা মানুষের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী উদ্বেগ এবং হীনমন্যতা তৈরি করছে।
বিশ্বায়ন বা গ্লোবালাইজেশন বাংলাদেশে একটি ‘হাইব্রিড’ বা মিশ্র সাংস্কৃতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে। সমাজবিজ্ঞানে একে ‘গ্লোকালাইজেশন’ বলা হয়। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে বৈশ্বিক সংস্কৃতি স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে নতুন রূপ ধারণ করে। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ফাস্ট ফুড চেইন যখন স্থানীয় মশলা ব্যবহার করে মেনু তৈরি করে, কিংবা যখন পাশ্চাত্য ঘরানার পোশাকে দেশি নকশা যোগ করা হয়, তখন সেটি এই গ্লোকালাইজেশনেরই উদাহরণ।
তবে এই মিশ্রণ সবসময় ইতিবাচক নয়। এর ফলে আমাদের স্থানীয় ঐতিহ্যগুলো অনেক সময় তার গভীরতা হারিয়ে কেবল পর্যটন বা বিপণনের সামগ্রীতে পরিণত হয়। মেলা, পূজা বা ঈদের ঐতিহ্যবাহী অনুষঙ্গগুলো এখন কর্পোরেট স্পন্সরশিপের ওপর নির্ভরশীল। ফলে পরিচয় আর শেকড় থেকে আসে না, তা আসে কর্পোরেট ব্র্যান্ডিং থেকে। এই ‘ব্র্যান্ডেড পরিচয়’ আমাদের সাংস্কৃতিক স্বকীয়তাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
ভোক্তা সংস্কৃতির এই প্রসারের সমান্তরালে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক বৈষম্যও বৃদ্ধি পেয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্পের যে শ্রমিক ৫ ডলারের মজুরিতে একটি ব্র্যান্ডের শার্ট তৈরি করছেন, সেই একই শার্ট যখন ঢাকার কোনো অভিজাত শপিং মলে ৫০ ডলারে বিক্রি হয়, তখন সেটি এক চরম বৈপরীত্য তুলে ধরে। একদিকে ভোগের উৎসব, অন্যদিকে উৎপাদনের কঠোর শ্রম।
এই ব্যবস্থার অন্যতম বড় ঝুঁকি হলো ‘ভোগের আর্থিকীকরণ’। মোবাইল ব্যাংকিং এবং ক্রেডিট কার্ডের সহজলভ্যতা মানুষকে সঞ্চয়ের চেয়ে ব্যয়ের দিকে বেশি উৎসাহিত করছে। ‘এখনই ভোগ করুন, পরে পরিশোধ করুন’—এই নীতি মানুষকে দীর্ঘমেয়াদী ঋণের ফাঁদে ফেলছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম, যারা পরিচয় গঠনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, তারা এই আর্থিক ঝুঁকির প্রধান শিকার। পরিচয় এখানে কেবল একটি সাংস্কৃতিক বিষয় নয়, এটি হয়ে উঠছে একটি বিশাল আর্থিক বোঝা।
ভোক্তা সংস্কৃতির সবচেয়ে গভীর প্রভাব পড়েছে আমাদের রাজনৈতিক চেতনার ওপর। যখন পরিচয় ক্রমশ ভোগের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন একজন ব্যক্তি নিজেকে ‘নাগরিক’ হিসেবে ভাবার চেয়ে ‘ভোক্তা’ হিসেবে ভাবতে বেশি পছন্দ করেন। নাগরিকের দায়িত্ব হলো রাষ্ট্র ও সমাজের প্রশ্নে সক্রিয় হওয়া, কিন্তু ভোক্তার দায়িত্ব হলো কেবল নিজের পছন্দ ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করা।
রাজনীতিও এখন অনেকটা পণ্যের বিপণনের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো এখন জনগণের কাছে নাগরিক অধিকারের চেয়ে ‘উন্নয়নের সুফল’ এবং ‘সুযোগ-সুবিধা’ বেশি বিক্রি করতে চায়। ফলে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এখন জীবনধারার পছন্দে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি হ্যাসট্যাগ ব্যবহার করা কিংবা সচেতনতামূলক পোস্ট শেয়ার করাকেই অনেকে বড় ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে গণ্য করছেন। একে ‘স্ল্যাক্টিভিজম’ বা অলস সক্রিয়তা বলা হয়। এটি মানুষকে গভীর কাঠামোগত পরিবর্তনের লড়াই থেকে দূরে সরিয়ে দিয়ে একটি প্রতীকী তৃপ্তির মধ্যে আবদ্ধ রাখে।
বাংলাদেশের ভোক্তা সংস্কৃতিতে নারীদের ভূমিকা দ্বিমুখী। একদিকে, অনলাইন ব্যবসা এবং এফ-কমার্স প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অনেক নারী উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। এটি তাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং ক্ষমতায়নের সুযোগ তৈরি করেছে। তারা নিজেদের পছন্দমতো পোশাক বা পণ্য নির্বাচন করে প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন।
অন্যদিকে, বাজার নারীর পরিচয়কে নতুনভাবে পণ্যায়িত করছে। সৌন্দর্য পণ্য, ডায়েট প্ল্যান এবং মডেস্ট ফ্যাশনের নামে নারীর ওপর নতুন নতুন সৌন্দর্যের মানদণ্ড চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। নারীকে এখন প্রতিনিয়ত ‘নিখুঁত’ হওয়ার চাপে থাকতে হয়, যা মূলত বাজারেরই একটি কৌশল। ফলে ক্ষমতায়নের আড়ালে অনেক সময় নতুন ধরনের পরনির্ভরশীলতা এবং আত্মবিশ্বাসের অভাব তৈরি হচ্ছে।
ভোক্তা সংস্কৃতি ও পরিচয় রাজনীতির এই মেলবন্ধন আমাদের সামনে কিছু মৌলিক প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। আমরা কি কেবল পণ্যের মাধ্যমেই নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করব? আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম কি কেবল ব্র্যান্ডের লোগো দেখেই একে অপরকে মূল্যায়ন করবে? অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যদি কেবল ভোগের উন্মাদনা তৈরি করে এবং সামাজিক সংহতি নষ্ট করে, তবে সেই প্রবৃদ্ধির সার্থকতা কোথায়?
বাংলাদেশ এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের একদিকে আছে উদীয়মান অর্থনীতির হাতছানি, অন্যদিকে আছে শেকড়হীন পরিচয়ের ঝুঁকি। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ হলো ভোক্তা সংস্কৃতিকে পুরোপুরি অস্বীকার করা নয়, বরং একে সমালোচনামূলকভাবে দেখা। আমাদের বুঝতে হবে যে, মানুষের পরিচয় তার কেনা পণ্যে নয়, বরং তার মানবিক মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার মধ্যে নিহিত।
পরিচয় কোনো ব্র্যান্ড নয় যা বাজার থেকে কেনা যায়; এটি একটি চর্চা যা তিলে তিলে গড়ে তুলতে হয়। অন্তর্ভুক্তি কোনো শপিং মলের সদস্যপদে নেই, এটি আছে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের প্রতি সম্মান ও সহমর্মিতার মধ্যে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আমরা কতটা সচেতনভাবে এই ‘ব্র্যান্ডে গড়া সত্তা’ থেকে বেরিয়ে এসে একটি প্রকৃত মানবিক ও সামষ্টিক পরিচয় নির্মাণ করতে পারি তার ওপর।
বাজার আমাদের পণ্য দিতে পারে, কিন্তু গরিমা দিতে পারে না। বাজার আমাদের সুবিধাবাদ দিতে পারে, কিন্তু মুক্তি দিতে পারে না। পরিচয় যখন ভোগের দাস হয়ে পড়ে, তখন মানুষের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য হারিয়ে যায়। তাই আমাদের প্রয়োজন এমন এক সাংস্কৃতিক জাগরণ, যা মানুষকে পুনরায় ‘ভোক্তা’ থেকে ‘নাগরিক’ হিসেবে রূপান্তরিত করবে এবং পণ্যের সম্পর্কের চেয়ে মানুষের সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেবে। বাংলাদেশের এই দীর্ঘ যাত্রা কেবল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নয়, বরং এটি আত্মপরিচয় পুনরুদ্ধারেরও এক মহান লড়াই।
[লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী]

আপনার মতামত লিখুন