সংবাদ

সুনামগঞ্জে হাওরে অপরিকল্পিত বাঁধের মাশুল

সরকারি হিসেবে ৫০০ কোটি হলেও বাস্তবে ক্ষতি ‘হাজার কোটির বেশি’


লতিফুর রহমান রাজু, সুনামগঞ্জ
লতিফুর রহমান রাজু, সুনামগঞ্জ
প্রকাশ: ৩ মে ২০২৬, ০৯:২৭ পিএম

সরকারি হিসেবে ৫০০ কোটি হলেও বাস্তবে ক্ষতি ‘হাজার কোটির বেশি’
সুনামগঞ্জের দেখার হাওরে বুক সমান পানিতে নেমে ধান কাটার চেষ্টা করছেন কৃষকরা। অকাল বন্যা ও জলাবদ্ধতায় তলিয়ে গেছে কয়েক হাজার হেক্টর জমির ফসল। ছবি : সংবাদ

সুনামগঞ্জের আকাশজুড়ে গত দুই দিন হালকা রোদের দেখা মিললেও কৃষকের মুখে হাসি নেই। যে রোদ সোনালি ধান শুকানোর কাজে আসার কথা ছিল, তা এখন কেবল চোখের জল শুকানোর উপজীব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। জেলার বিভিন্ন হাওরে এখন উৎসবের বদলে চলছে হাহাকার। কোথাও কোমর পানি, কোথাও বুক সমান পানিতে নেমে কৃষকেরা কাটছেন তাদের শেষ সম্বল-অর্ধেক পাকা ধান।

ভারী বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় ইতিমধ্যে জেলার হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মতে, ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। তবে স্থানীয় কৃষক ও নাগরিক সংগঠনগুলোর দাবি, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ এক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে

জামালগঞ্জ উপজেলার পুরান রামনগর গ্রামের কৃষক আব্দুল মুকিদ ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘ধান রক্ষার জন্য যে বাঁধ দেওয়া হয়েছিল, সেটিই এখন আমাদের গলার কাঁটা।’  তার অভিযোগ, অপরিকল্পিতভাবে এই বাঁধ দেওয়ার ফলে হাওরের পানি নামতে পারছে না। ৩০ কিয়ার জমিতে চাষ করেও তিনি এক মুঠো ধান ঘরে তুলতে পারেননি।

একই চিত্র দেখার হাওর পাড়ের মোল্লাপাড়া ইউনিয়নেও। সেখানে জলাবদ্ধতা শুরু হলে কৃষকেরা বাঁধ কেটে পানি নামানোর দাবি জানালেও প্রশাসন তাতে কর্ণপাত করেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশ দিন পর বাঁধ কাটা হলেও ততক্ষণে সব ধান পচে নষ্ট হয়ে গেছে।

একসময় যারা গ্রামের সচ্ছল গৃহস্থ ছিলেন, এই অকাল বন্যায় তারাও আজ নিঃস্ব। দরিয়াবাজ গ্রামের হাজী আব্দুল কাদির বা আবুল কালামের মতো বড় কৃষকেরা প্রত্যেকেই ৮-১০ একর জমিতে বোরো চাষ করেছিলেন। পানির নিচে ধান তলিয়ে যাওয়ায় এখন পরিবারের ভরণপোষণ আর ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচ চালানো নিয়ে তারা দিশেহারা। অনেকে জমি বিক্রি বা বন্ধক রাখার কথা ভাবছেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক জানিয়েছেন, জেলায় এ পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়েছে। তবে ‘হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন’-এর সভাপতি রাজু আহমেদের মতে, নষ্ট হওয়া ফসলের পরিমাণ অন্তত ৫০ হাজার হেক্টর। 

কৃষকদের মতে, শ্রমিকের চড়া মজুরি (প্রতিজন ১২০০ টাকা) দিয়েও পানির নিচ থেকে ধান তোলা সম্ভব হচ্ছে না। তীব্র ঠান্ডায় ধান কাটতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন অনেক শ্রমিক।

এদিকে ৩ মে থেকে সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়েছে। প্রতি মণ ধানের দাম ১৪৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সুনামগঞ্জ জেলায় এবার ২১ হাজার ৩৪৯ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

তবে সাধারণ কৃষকদের প্রশ্ন, গুদামে ধান বিক্রির যে কঠোর নিয়মকানুন, তা মেনে তারা কতটুকু লাভবান হতে পারবেন? মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আসল কৃষকেরা তালিকার বাইরে থেকে যাবেন কি না, সেই আশঙ্কাই এখন প্রবল।

হাওরের ঢেউ এখন আর আনন্দ দেয় না কৃষকদের। সেই ঢেউ যেন তাদের বুকে কান্নার আঘাত হয়ে বাজছে। বছরের একমাত্র ফসল হারিয়ে আগামী দিনগুলো কীভাবে কাটবে, সেই দুশ্চিন্তাই এখন সুনামগঞ্জের প্রতিটি কৃষক পরিবারের সঙ্গী।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ০৩ মে ২০২৬


সরকারি হিসেবে ৫০০ কোটি হলেও বাস্তবে ক্ষতি ‘হাজার কোটির বেশি’

প্রকাশের তারিখ : ০৩ মে ২০২৬

featured Image

সুনামগঞ্জের আকাশজুড়ে গত দুই দিন হালকা রোদের দেখা মিললেও কৃষকের মুখে হাসি নেই। যে রোদ সোনালি ধান শুকানোর কাজে আসার কথা ছিল, তা এখন কেবল চোখের জল শুকানোর উপজীব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। জেলার বিভিন্ন হাওরে এখন উৎসবের বদলে চলছে হাহাকার। কোথাও কোমর পানি, কোথাও বুক সমান পানিতে নেমে কৃষকেরা কাটছেন তাদের শেষ সম্বল-অর্ধেক পাকা ধান।

ভারী বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় ইতিমধ্যে জেলার হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মতে, ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। তবে স্থানীয় কৃষক ও নাগরিক সংগঠনগুলোর দাবি, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ এক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে

জামালগঞ্জ উপজেলার পুরান রামনগর গ্রামের কৃষক আব্দুল মুকিদ ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘ধান রক্ষার জন্য যে বাঁধ দেওয়া হয়েছিল, সেটিই এখন আমাদের গলার কাঁটা।’  তার অভিযোগ, অপরিকল্পিতভাবে এই বাঁধ দেওয়ার ফলে হাওরের পানি নামতে পারছে না। ৩০ কিয়ার জমিতে চাষ করেও তিনি এক মুঠো ধান ঘরে তুলতে পারেননি।

একই চিত্র দেখার হাওর পাড়ের মোল্লাপাড়া ইউনিয়নেও। সেখানে জলাবদ্ধতা শুরু হলে কৃষকেরা বাঁধ কেটে পানি নামানোর দাবি জানালেও প্রশাসন তাতে কর্ণপাত করেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশ দিন পর বাঁধ কাটা হলেও ততক্ষণে সব ধান পচে নষ্ট হয়ে গেছে।

একসময় যারা গ্রামের সচ্ছল গৃহস্থ ছিলেন, এই অকাল বন্যায় তারাও আজ নিঃস্ব। দরিয়াবাজ গ্রামের হাজী আব্দুল কাদির বা আবুল কালামের মতো বড় কৃষকেরা প্রত্যেকেই ৮-১০ একর জমিতে বোরো চাষ করেছিলেন। পানির নিচে ধান তলিয়ে যাওয়ায় এখন পরিবারের ভরণপোষণ আর ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচ চালানো নিয়ে তারা দিশেহারা। অনেকে জমি বিক্রি বা বন্ধক রাখার কথা ভাবছেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক জানিয়েছেন, জেলায় এ পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়েছে। তবে ‘হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন’-এর সভাপতি রাজু আহমেদের মতে, নষ্ট হওয়া ফসলের পরিমাণ অন্তত ৫০ হাজার হেক্টর। 

কৃষকদের মতে, শ্রমিকের চড়া মজুরি (প্রতিজন ১২০০ টাকা) দিয়েও পানির নিচ থেকে ধান তোলা সম্ভব হচ্ছে না। তীব্র ঠান্ডায় ধান কাটতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন অনেক শ্রমিক।

এদিকে ৩ মে থেকে সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়েছে। প্রতি মণ ধানের দাম ১৪৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সুনামগঞ্জ জেলায় এবার ২১ হাজার ৩৪৯ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

তবে সাধারণ কৃষকদের প্রশ্ন, গুদামে ধান বিক্রির যে কঠোর নিয়মকানুন, তা মেনে তারা কতটুকু লাভবান হতে পারবেন? মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আসল কৃষকেরা তালিকার বাইরে থেকে যাবেন কি না, সেই আশঙ্কাই এখন প্রবল।

হাওরের ঢেউ এখন আর আনন্দ দেয় না কৃষকদের। সেই ঢেউ যেন তাদের বুকে কান্নার আঘাত হয়ে বাজছে। বছরের একমাত্র ফসল হারিয়ে আগামী দিনগুলো কীভাবে কাটবে, সেই দুশ্চিন্তাই এখন সুনামগঞ্জের প্রতিটি কৃষক পরিবারের সঙ্গী।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত