সংবাদ

‘শাপলা চত্বরে হত্যাযজ্ঞের প্রধান পরিকল্পনাকারী শেখ হাসিনা: চিফ প্রসিকিউটর


নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
প্রকাশ: ৫ মে ২০২৬, ০৩:৫৩ পিএম

‘শাপলা চত্বরে হত্যাযজ্ঞের প্রধান পরিকল্পনাকারী শেখ হাসিনা: চিফ প্রসিকিউটর
প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম

গত এক যুগ আগে ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেই ‘প্রধান আসামি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন দল। ওই রাতের ঘটনাসহ দুই দিনে ঢাকা ও এর আশপাশের জেলায় মোট ৫৮ জন নিহত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছেন তারা।

মঙ্গলবার (৫ মে) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন কার্যালয়ে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম এসব তথ্য জানান। এই ঘটনার তদন্ত কাজ প্রায় ৯০ শতাংশ শেষ হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, চলতি বছরের ৭ জুনের মধ্যেই এ মামলার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া সম্ভব হবে।

তদন্তের অগ্রগতি তুলে ধরে প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, "তৎকালীন সরকারের উদ্দেশ্য ছিল যে, এই ইসলামিক গ্রুপটাকে বা এই সংগঠনটাকে একেবারেই নিধন করে দেওয়া।"

শেখ হাসিনা প্রধান আসামি হবেন কি না এবং নির্দেশদাতা হিসেবে তার ভূমিকা কী ছিল- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে প্রসিকিউটর বলেন, “ তার সংশ্লিষ্টতা আমরা পেয়েছি। উনি তো প্ল্যানিংই (পরিকল্পনা) করেছেন, উনি সব করলেন। যাদের যাদের সংশ্লিষ্টতা আছে, অন্যান্য বাহিনী প্রধানদের  আমরা সবাইকে নিয়ে আসব।”

নিহতের সংখ্যা ৫৮, ‘হাজার হাজার নয়: শাপলা চত্বরের ঘটনায় 'শত শত বা হাজার হাজার' মানুষ নিহত হওয়ার যে দাবি বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ময়দানে করা হয়েছে, তা নাকচ করে দিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের এই প্রসিকিউটর। তদন্তে পাওয়া সুনির্দিষ্ট তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, “রাজনৈতিকভাবে বা মাঠে বলা আর আমাদের ইনভেস্টিগেশনে বলার মধ্যে পার্থক্য আছে। আমরা তদন্তে যা পেয়েছি তার বাইরে কিছুই বলতে পারব না।”

নিহতের পরিসংখ্যান দিয়ে প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, “শুধু শাপলা চত্বরে বা ঢাকার মধ্যে ৩২ জনের নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পরের দিন নারায়ণগঞ্জে আরও প্রায় ২০ জন, চট্টগ্রামে পাঁচজন এবং কুমিল্লায় একজন নিহত হয়েছেন। সব মিলিয়ে আমরা এই পর্যন্ত প্রায় ৫৮ জনের নিহত হওয়ার ঘটনা শনাক্ত করতে পেরেছি এবং তাদের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।”

আমিনুল ইসলাম জানান, নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে। ৫ মে রাত আড়াইটার দিকে শাপলা চত্বরে মূল অভিযানের আগেই গুলিস্তান-মতিঝিল এলাকায় সংঘর্ষে অন্তত ১৮-২০ জন নিহত হয়েছিলেন বলেও দাবি তার।

পরিকল্পিত 'টার্গেটেড কিলিং' ও মানবতাবিরোধী অপরাধ: শাপলা চত্বরের ওই ক্র্যাকডাউনকে 'মানবতাবিরোধী অপরাধ' হিসেবে দেখছে ট্রাইব্যুনাল। বিষয়টির আইনি ব্যাখ্যা দিয়ে আমিনুল ইসলাম বলেন, “আমাদের আইনটাই বলছে যে, যদি কোনো ইসলামিক গ্রুপ বা কোনো টার্গেটেড কিলিং হয় এবং এটা যদি সিস্টেমেটিক ও ওয়াইডস্প্রেড হয়, অবশ্যই এই আইনের আওতায় আসবে। আমি তো দেখি যে সবগুলার উপাদানই এর মধ্যে আছে।”

প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম আরও বলেন, “হেফাজতে ইসলাম আগে থেকেই প্রতিবাদ করে আসছিল এবং ঢাকায় অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। তাদেরকে যেভাবেই হোক রেস্ট্রেইন (আটকানো) করতে হবে, ব্যর্থ হলে খুন করতে হবে— এটা পুরোটাই সিস্টেমেটিক এবং ওয়াইডস্প্রেড অ্যাটাক। একটি মাস্টার পরিকল্পনার ধারাবাহিকতায় একদম ফিল্ড লেভেলে গিয়ে পারপিট্রেটররা (অপরাধীরা) একই উদ্দেশ্যে কাজটা করেছে।”

আসামি কারা: তদন্তের স্বার্থে আসামিদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ না করলেও এই মামলায় আসামির সংখ্যা ৩০ জনের নিচে হবে না বলে জানান আমিনুল ইসলাম। ইতিমধ্যে তৎকালীন পুলিশের আইজিপি এই মামলায় গ্রেপ্তার আছেন জানিয়ে তিনি বলেন, “সরকার প্রধান থেকে শুরু করে তৎকালীন বাহিনীর প্রধান, পুলিশ কমিশনারসহ অনেকেই এর সাথে জড়িত থাকতে পারেন।”

মেজর জেনারেল (বরখাস্ত) জিয়াউল আহসানের ভূমিকার বিষয়ে প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, “তার প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা আছে, তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন।”

অন্যদিকে তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিষয়ে প্রসিকিউটর বলেন, “তার বিষয়টা আন্ডার ইনভেস্টিগেশন (তদন্তাধীন)। তিনি ওই সময় দেশের বাইরে ছিলেন বলে আমরা জানতে পেরেছি, সেটা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তবে সুপিরিয়র কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি (ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়বদ্ধতা) যদি থাকে, তবে যেকোনো জায়গা থেকেই তার দায় থাকে।”

রাজনৈতিক আপস তদন্তের বিষয় নয়: হত্যাকাণ্ডের কয়েক বছর পর কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি এবং হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে 'কওমি জননী' উপাধি দেওয়ার মাধ্যমে যে রাজনৈতিক সমঝোতা হয়েছিল, সেটি ট্রাইব্যুনালের তদন্তের আওতাভুক্ত নয় বলে স্পষ্ট করেছেন প্রসিকিউটর আমিনুল।

প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, “তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম একরকম, আর আমাদের বিচারের ইনভেস্টিগেশনের পরিধিটা আলাদা। হত্যাকাণ্ডের পরে যে রাজনৈতিক নেগোসিয়েশন বা ঘটনা, সেটা সঙ্গত কারণেই আমাদের ইনভেস্টিগেশনে আসবে না, আসা উচিতও না।”

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬


‘শাপলা চত্বরে হত্যাযজ্ঞের প্রধান পরিকল্পনাকারী শেখ হাসিনা: চিফ প্রসিকিউটর

প্রকাশের তারিখ : ০৫ মে ২০২৬

featured Image

গত এক যুগ আগে ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেই ‘প্রধান আসামি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন দল। ওই রাতের ঘটনাসহ দুই দিনে ঢাকা ও এর আশপাশের জেলায় মোট ৫৮ জন নিহত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছেন তারা।

মঙ্গলবার (৫ মে) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন কার্যালয়ে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম এসব তথ্য জানান। এই ঘটনার তদন্ত কাজ প্রায় ৯০ শতাংশ শেষ হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, চলতি বছরের ৭ জুনের মধ্যেই এ মামলার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া সম্ভব হবে।

তদন্তের অগ্রগতি তুলে ধরে প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, "তৎকালীন সরকারের উদ্দেশ্য ছিল যে, এই ইসলামিক গ্রুপটাকে বা এই সংগঠনটাকে একেবারেই নিধন করে দেওয়া।"

শেখ হাসিনা প্রধান আসামি হবেন কি না এবং নির্দেশদাতা হিসেবে তার ভূমিকা কী ছিল- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে প্রসিকিউটর বলেন, “ তার সংশ্লিষ্টতা আমরা পেয়েছি। উনি তো প্ল্যানিংই (পরিকল্পনা) করেছেন, উনি সব করলেন। যাদের যাদের সংশ্লিষ্টতা আছে, অন্যান্য বাহিনী প্রধানদের  আমরা সবাইকে নিয়ে আসব।”

নিহতের সংখ্যা ৫৮, ‘হাজার হাজার নয়: শাপলা চত্বরের ঘটনায় 'শত শত বা হাজার হাজার' মানুষ নিহত হওয়ার যে দাবি বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ময়দানে করা হয়েছে, তা নাকচ করে দিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের এই প্রসিকিউটর। তদন্তে পাওয়া সুনির্দিষ্ট তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, “রাজনৈতিকভাবে বা মাঠে বলা আর আমাদের ইনভেস্টিগেশনে বলার মধ্যে পার্থক্য আছে। আমরা তদন্তে যা পেয়েছি তার বাইরে কিছুই বলতে পারব না।”

নিহতের পরিসংখ্যান দিয়ে প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, “শুধু শাপলা চত্বরে বা ঢাকার মধ্যে ৩২ জনের নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পরের দিন নারায়ণগঞ্জে আরও প্রায় ২০ জন, চট্টগ্রামে পাঁচজন এবং কুমিল্লায় একজন নিহত হয়েছেন। সব মিলিয়ে আমরা এই পর্যন্ত প্রায় ৫৮ জনের নিহত হওয়ার ঘটনা শনাক্ত করতে পেরেছি এবং তাদের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।”

আমিনুল ইসলাম জানান, নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে। ৫ মে রাত আড়াইটার দিকে শাপলা চত্বরে মূল অভিযানের আগেই গুলিস্তান-মতিঝিল এলাকায় সংঘর্ষে অন্তত ১৮-২০ জন নিহত হয়েছিলেন বলেও দাবি তার।

পরিকল্পিত 'টার্গেটেড কিলিং' ও মানবতাবিরোধী অপরাধ: শাপলা চত্বরের ওই ক্র্যাকডাউনকে 'মানবতাবিরোধী অপরাধ' হিসেবে দেখছে ট্রাইব্যুনাল। বিষয়টির আইনি ব্যাখ্যা দিয়ে আমিনুল ইসলাম বলেন, “আমাদের আইনটাই বলছে যে, যদি কোনো ইসলামিক গ্রুপ বা কোনো টার্গেটেড কিলিং হয় এবং এটা যদি সিস্টেমেটিক ও ওয়াইডস্প্রেড হয়, অবশ্যই এই আইনের আওতায় আসবে। আমি তো দেখি যে সবগুলার উপাদানই এর মধ্যে আছে।”

প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম আরও বলেন, “হেফাজতে ইসলাম আগে থেকেই প্রতিবাদ করে আসছিল এবং ঢাকায় অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। তাদেরকে যেভাবেই হোক রেস্ট্রেইন (আটকানো) করতে হবে, ব্যর্থ হলে খুন করতে হবে— এটা পুরোটাই সিস্টেমেটিক এবং ওয়াইডস্প্রেড অ্যাটাক। একটি মাস্টার পরিকল্পনার ধারাবাহিকতায় একদম ফিল্ড লেভেলে গিয়ে পারপিট্রেটররা (অপরাধীরা) একই উদ্দেশ্যে কাজটা করেছে।”

আসামি কারা: তদন্তের স্বার্থে আসামিদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ না করলেও এই মামলায় আসামির সংখ্যা ৩০ জনের নিচে হবে না বলে জানান আমিনুল ইসলাম। ইতিমধ্যে তৎকালীন পুলিশের আইজিপি এই মামলায় গ্রেপ্তার আছেন জানিয়ে তিনি বলেন, “সরকার প্রধান থেকে শুরু করে তৎকালীন বাহিনীর প্রধান, পুলিশ কমিশনারসহ অনেকেই এর সাথে জড়িত থাকতে পারেন।”

মেজর জেনারেল (বরখাস্ত) জিয়াউল আহসানের ভূমিকার বিষয়ে প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, “তার প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা আছে, তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন।”

অন্যদিকে তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিষয়ে প্রসিকিউটর বলেন, “তার বিষয়টা আন্ডার ইনভেস্টিগেশন (তদন্তাধীন)। তিনি ওই সময় দেশের বাইরে ছিলেন বলে আমরা জানতে পেরেছি, সেটা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তবে সুপিরিয়র কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি (ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়বদ্ধতা) যদি থাকে, তবে যেকোনো জায়গা থেকেই তার দায় থাকে।”

রাজনৈতিক আপস তদন্তের বিষয় নয়: হত্যাকাণ্ডের কয়েক বছর পর কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি এবং হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে 'কওমি জননী' উপাধি দেওয়ার মাধ্যমে যে রাজনৈতিক সমঝোতা হয়েছিল, সেটি ট্রাইব্যুনালের তদন্তের আওতাভুক্ত নয় বলে স্পষ্ট করেছেন প্রসিকিউটর আমিনুল।

প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, “তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম একরকম, আর আমাদের বিচারের ইনভেস্টিগেশনের পরিধিটা আলাদা। হত্যাকাণ্ডের পরে যে রাজনৈতিক নেগোসিয়েশন বা ঘটনা, সেটা সঙ্গত কারণেই আমাদের ইনভেস্টিগেশনে আসবে না, আসা উচিতও না।”


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত