রাজধানীর নগর প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু নগরভবন। যেখানে নীতিমালা তৈরি হয়। আইন প্রয়োগের দিকনির্দেশনা আসে। সেই ভবনেই যদি নিয়ম ভঙ্গের দৃশ্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তবে প্রশ্ন জাগে: বাস্তবে আইন কতটা কার্যকর?
রাজধানীর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) কার্যালয় নগরভবনে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে এক ভিন্ন বাস্তবতা। দেয়ালে পোস্টার-ব্যানার লাগানো নিষিদ্ধ এমন স্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও ভবনের প্রধান ফটক থেকে শুরু করে সিঁড়ি, লিফটের সামনে, এমনকি বিভিন্ন কর্মকর্তার কক্ষের প্রবেশমুখেও লাগানো পোস্টার ও ব্যানার।
ভবনের ভেতরে যত এগোনো যায়, ততই স্পষ্ট হয় এই অনিয়মের বিস্তার। সিঁড়ির পাশের দেয়াল, লিফটের সামনে, করিডরের প্রতিটি মোড়ে পোস্টার সাঁটানো হয়েছে।
১২ তলা বিশিষ্ট এই ভবনের প্রায় প্রতিটি তলায় একই চিত্র। কোথাও চারটি, কোথাও পাঁচটি আবার কোথাও তারও বেশি পোস্টার দেখা গেছে। তিন ফুটের একটি দেয়ালের ভেতরেও পোস্টার সাঁটানো হয়েছে। লিফটের ভেতরের অংশেও আঠার দাগ স্পষ্ট। সব মিলিয়ে এটি যেন একটি প্রশাসনিক ভবনের চেয়ে বেশি কোনো রাজনৈতিক প্রচারণার অঘোষিত প্রদর্শনীস্থল।
ডিএসসিসির নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো দেয়ালে পোস্টার লাগানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। প্রয়োজনে ব্যানার ব্যবহার করা হলেও তা সর্বোচ্চ দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে অপসারণ করতে হবে-এমন নির্দেশনাও রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সেই নিয়ম কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ।
ব্যানারের দূষণ। ছবি: সংবাদ
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, ১ মে শ্রমিক দিবসসহ বিভিন্ন উপলক্ষে টানানো ব্যানার ও পোস্টার দীর্ঘদিন ধরেই ঝুলে আছে। কোথাও রং ফিকে হয়ে গেছে,অপসারণের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না। এই অবস্থা শুধু সৌন্দর্য নষ্ট করছে না, বরং প্রশাসনিক শৃঙ্খলার প্রশ্নও তুলে দিচ্ছে।নগরভবনে ট্রেড লাইসেন্স করতে গিয়েছিলেন আরিফুর রহমান। থাকেন চানখারপুল এলাকায়। নগরভবনেই বুধবার (৬ মে) কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, “আমি কয়েক বছর ধরেই এখানে আসা-যাওয়া করি। আগে এমন অবস্থা ছিল না। তখন ভবনটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতো। এখন দেয়াল পোস্টারে ভরা। আমি আজকে দোকানের ট্রেড লাইসেন্সের টাকা জমা দিতে এসেছি, কিন্তু ভেতরে ঢুকেই একটা অগোছালো পরিবেশ চোখে পড়ল। ”
আরিফুর রহমান আরও বলেন, “এটা একটা সরকারি অফিস। এখানে একটা শৃঙ্খলা থাকা উচিত। কিন্তু বাস্তবে যা দেখছি, তা খুবই হতাশাজনক। তবে সত্যি কথা বলতে কি, এগুলো নিয়ে কিছু বলা কঠিন। কারণ সবাই জানে কারা এসব লাগায়। সরকার দলীয় লোকদের বিরুদ্ধে কিছু বললে অনেক সময় ঝামেলায় পড়তে হয়। তাই চাইলেও আমরা সাধারণ মানুষ মুখ খুলতে পারি না।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসসিসির একাধিক কর্মচারীও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান। তাদের একজন বলেন, “নিয়ম অনুযায়ী কোনো পোস্টার লাগানোর সুযোগ নেই। ব্যানারও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সরিয়ে ফেলতে হয়। কিন্তু বাস্তবে আমরা সেটা মানতে পারছি না। অনেক সময় উপরের চাপ থাকে। আবার অনেক সময় রাজনৈতিক বিবেচনাও কাজ করে। আমরা কোনো পোস্টার খুলতে গেলে, বিভিন্ন দিক থেকে ফোন আসে। ফলে আর এগোতে পারি না। চাকরি বাঁচানোই তখন বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।”
আরেকজন কর্মচারী বলেন, “এই বিষয়টা সবাই দেখে, কিন্তু কেউ প্রকাশ্যে বলতে চায় না। কারণ এখানে কাজ করতে হলে অনেক কিছু সহ্য করতে হয়। নিয়ম আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই। এই বাস্তবতা আমরা প্রতিদিন দেখি।”নগরভবনে সেবা নিতে এসেছেন টুটু ইসলাম (ছদ্মনাম)। পেশায় হকার। পুনর্বাসনের জন্য কাগজপত্র জমা দিতে এসেছেন। তিনি সংবাদকে বলেন, “আমি ভোটার আইডি কার্ড, ছবি আর জন্ম নিবন্ধনের কাগজ জমা দিতে এসেছি। আমাদের বলা হয়েছে এগুলো দিলে পরে দোকান দেওয়া হবে। আমরা সেই আশায় ঘুরছি। কিন্তু এখানে এসে যে পরিবেশ দেখি, সেটা ভালো লাগে না। দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার, সবকিছু এলোমেলো। যারা এগুলো লাগায় তারা তো শিক্ষিত মানুষ। তাদের কাছ থেকে তো ভালো কিছু আশা করি। কিন্তু বাস্তবে উল্টোটা দেখি। তবে এসব নিয়ে কিছু বলতে ভয় লাগে। যদি নাম কেটে দেয়, তাহলে তো আমরা বড় সমস্যায় পড়ে যাব।”
বকশীবাজার এলাকার বাসিন্দা তারেক। তিনি হোল্ডিং ট্যাক্স সংক্রান্ত কাজে এসেছেন নগরভবনে। তার কথা, “আমরা সব সময় উন্নয়ন আর আধুনিক শহরের কথা বলি। কিন্তু বাস্তবে যদি এই চিত্র দেখি, তাহলে তো মনে হয় আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে আছি। অন্য দেশে গেলে দেখা যায়, নির্দিষ্ট জায়গা ছাড়া কোথাও পোস্টার লাগানো যায় না। সেখানে আইন খুব কঠোরভাবে মানা হয়। কিন্তু আমাদের এখানে যে যার মতো করে দেয়াল ব্যবহার করছে। এটা শুধু সৌন্দর্যের বিষয় না- এটা একটা শৃঙ্খলার বিষয়।”ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম সংবাদকে বলেন, “আমাদের অফিস এলাকায় পোস্টার বা ব্যানার লাগানোর ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত করা হয়। আমরা চাই ভবনের সৌন্দর্য বজায় থাকুক। এজন্য এলইডি স্ক্রিন ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়। পোস্টার লাগালে পরিবেশ নষ্ট হয়। তাই আমরা নিষেধ করি। তবে মাঝে মাঝে কিছু লাগানো হয়। সবকিছু আমাদের নজরে আসে না।”

বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ মে ২০২৬
রাজধানীর নগর প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু নগরভবন। যেখানে নীতিমালা তৈরি হয়। আইন প্রয়োগের দিকনির্দেশনা আসে। সেই ভবনেই যদি নিয়ম ভঙ্গের দৃশ্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তবে প্রশ্ন জাগে: বাস্তবে আইন কতটা কার্যকর?
রাজধানীর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) কার্যালয় নগরভবনে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে এক ভিন্ন বাস্তবতা। দেয়ালে পোস্টার-ব্যানার লাগানো নিষিদ্ধ এমন স্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও ভবনের প্রধান ফটক থেকে শুরু করে সিঁড়ি, লিফটের সামনে, এমনকি বিভিন্ন কর্মকর্তার কক্ষের প্রবেশমুখেও লাগানো পোস্টার ও ব্যানার।
ভবনের ভেতরে যত এগোনো যায়, ততই স্পষ্ট হয় এই অনিয়মের বিস্তার। সিঁড়ির পাশের দেয়াল, লিফটের সামনে, করিডরের প্রতিটি মোড়ে পোস্টার সাঁটানো হয়েছে।
১২ তলা বিশিষ্ট এই ভবনের প্রায় প্রতিটি তলায় একই চিত্র। কোথাও চারটি, কোথাও পাঁচটি আবার কোথাও তারও বেশি পোস্টার দেখা গেছে। তিন ফুটের একটি দেয়ালের ভেতরেও পোস্টার সাঁটানো হয়েছে। লিফটের ভেতরের অংশেও আঠার দাগ স্পষ্ট। সব মিলিয়ে এটি যেন একটি প্রশাসনিক ভবনের চেয়ে বেশি কোনো রাজনৈতিক প্রচারণার অঘোষিত প্রদর্শনীস্থল।
ডিএসসিসির নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো দেয়ালে পোস্টার লাগানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। প্রয়োজনে ব্যানার ব্যবহার করা হলেও তা সর্বোচ্চ দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে অপসারণ করতে হবে-এমন নির্দেশনাও রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সেই নিয়ম কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ।
ব্যানারের দূষণ। ছবি: সংবাদ
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, ১ মে শ্রমিক দিবসসহ বিভিন্ন উপলক্ষে টানানো ব্যানার ও পোস্টার দীর্ঘদিন ধরেই ঝুলে আছে। কোথাও রং ফিকে হয়ে গেছে,অপসারণের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না। এই অবস্থা শুধু সৌন্দর্য নষ্ট করছে না, বরং প্রশাসনিক শৃঙ্খলার প্রশ্নও তুলে দিচ্ছে।নগরভবনে ট্রেড লাইসেন্স করতে গিয়েছিলেন আরিফুর রহমান। থাকেন চানখারপুল এলাকায়। নগরভবনেই বুধবার (৬ মে) কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, “আমি কয়েক বছর ধরেই এখানে আসা-যাওয়া করি। আগে এমন অবস্থা ছিল না। তখন ভবনটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতো। এখন দেয়াল পোস্টারে ভরা। আমি আজকে দোকানের ট্রেড লাইসেন্সের টাকা জমা দিতে এসেছি, কিন্তু ভেতরে ঢুকেই একটা অগোছালো পরিবেশ চোখে পড়ল। ”
আরিফুর রহমান আরও বলেন, “এটা একটা সরকারি অফিস। এখানে একটা শৃঙ্খলা থাকা উচিত। কিন্তু বাস্তবে যা দেখছি, তা খুবই হতাশাজনক। তবে সত্যি কথা বলতে কি, এগুলো নিয়ে কিছু বলা কঠিন। কারণ সবাই জানে কারা এসব লাগায়। সরকার দলীয় লোকদের বিরুদ্ধে কিছু বললে অনেক সময় ঝামেলায় পড়তে হয়। তাই চাইলেও আমরা সাধারণ মানুষ মুখ খুলতে পারি না।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসসিসির একাধিক কর্মচারীও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান। তাদের একজন বলেন, “নিয়ম অনুযায়ী কোনো পোস্টার লাগানোর সুযোগ নেই। ব্যানারও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সরিয়ে ফেলতে হয়। কিন্তু বাস্তবে আমরা সেটা মানতে পারছি না। অনেক সময় উপরের চাপ থাকে। আবার অনেক সময় রাজনৈতিক বিবেচনাও কাজ করে। আমরা কোনো পোস্টার খুলতে গেলে, বিভিন্ন দিক থেকে ফোন আসে। ফলে আর এগোতে পারি না। চাকরি বাঁচানোই তখন বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।”
আরেকজন কর্মচারী বলেন, “এই বিষয়টা সবাই দেখে, কিন্তু কেউ প্রকাশ্যে বলতে চায় না। কারণ এখানে কাজ করতে হলে অনেক কিছু সহ্য করতে হয়। নিয়ম আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই। এই বাস্তবতা আমরা প্রতিদিন দেখি।”নগরভবনে সেবা নিতে এসেছেন টুটু ইসলাম (ছদ্মনাম)। পেশায় হকার। পুনর্বাসনের জন্য কাগজপত্র জমা দিতে এসেছেন। তিনি সংবাদকে বলেন, “আমি ভোটার আইডি কার্ড, ছবি আর জন্ম নিবন্ধনের কাগজ জমা দিতে এসেছি। আমাদের বলা হয়েছে এগুলো দিলে পরে দোকান দেওয়া হবে। আমরা সেই আশায় ঘুরছি। কিন্তু এখানে এসে যে পরিবেশ দেখি, সেটা ভালো লাগে না। দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার, সবকিছু এলোমেলো। যারা এগুলো লাগায় তারা তো শিক্ষিত মানুষ। তাদের কাছ থেকে তো ভালো কিছু আশা করি। কিন্তু বাস্তবে উল্টোটা দেখি। তবে এসব নিয়ে কিছু বলতে ভয় লাগে। যদি নাম কেটে দেয়, তাহলে তো আমরা বড় সমস্যায় পড়ে যাব।”
বকশীবাজার এলাকার বাসিন্দা তারেক। তিনি হোল্ডিং ট্যাক্স সংক্রান্ত কাজে এসেছেন নগরভবনে। তার কথা, “আমরা সব সময় উন্নয়ন আর আধুনিক শহরের কথা বলি। কিন্তু বাস্তবে যদি এই চিত্র দেখি, তাহলে তো মনে হয় আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে আছি। অন্য দেশে গেলে দেখা যায়, নির্দিষ্ট জায়গা ছাড়া কোথাও পোস্টার লাগানো যায় না। সেখানে আইন খুব কঠোরভাবে মানা হয়। কিন্তু আমাদের এখানে যে যার মতো করে দেয়াল ব্যবহার করছে। এটা শুধু সৌন্দর্যের বিষয় না- এটা একটা শৃঙ্খলার বিষয়।”ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম সংবাদকে বলেন, “আমাদের অফিস এলাকায় পোস্টার বা ব্যানার লাগানোর ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত করা হয়। আমরা চাই ভবনের সৌন্দর্য বজায় থাকুক। এজন্য এলইডি স্ক্রিন ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়। পোস্টার লাগালে পরিবেশ নষ্ট হয়। তাই আমরা নিষেধ করি। তবে মাঝে মাঝে কিছু লাগানো হয়। সবকিছু আমাদের নজরে আসে না।”

আপনার মতামত লিখুন