সংবাদ

ভ্রমণ

দূর দ্বীপবাসিনী


আবদুল লতিফ
আবদুল লতিফ
প্রকাশ: ৭ মে ২০২৬, ১২:২১ এএম

দূর দ্বীপবাসিনী
লেখক ও তার সহধর্মিণী

অনেক দিন থেকে মালদ্বীপ ভ্রমণের একটা প্রবল বাসনা মনের মধ্যে গুঞ্জরণ তুলেছিল| একটা অন্য রকম দেশ, হাজার দ্বীপ দিয়ে ˆতরি| আর চারিদিকে দৃষ্টিনন্দন নীল সমুদ্রজল ঢেউ তুলে পারের পানে ছুটে আসে বারংবার| সব সমুদ্রের তো একই রকম চেহারা| জীবনে অনেক দেশে অনেক রকম সমুদ্রদর্শনের সৌভাগ্য হয়েছে| আর আমাদের নিজের দেশের কক্সবাজার, সেন্টমার্টিনের সমুদ্র সেও কী কোনো অংশে কম? তবু বৈচিত্র্য মহিমায় এক সমুদ্র অন্য সমুদ্রের থেকে আলাদা| ইন্দোনেশিয়ার বালির, নুসা পেনিডায় পাহাড়ের ওপর থেকে সমুদ্রের যে বর্ণবৈচিত্র্য আর বিশাল ঢেউ দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়েছি, তেমনটা বার্সিলোনা, ক্লিফটন কিংবা জুহু বিচে দেখিনি| সেখানে সমুদ্র অন্য রকমের রূপ নিয়ে হাজির হয়| সে এক অন্য রকমের বিস্ময়| 

প্রস্তুতিপর্ব যখন চলছে, তখন দেখলাম উৎসাহ কারোরই কম নেই| স্ত্রী লায়লা ফারজানা, শাহরিয়ার পত্নী শিরিন সবাই দারুণ খুশি| শিরিনকে ক্ষ্যাপাবার জন্যে বলি, এত খরচাপাতি করে মালদ্বীপ যাবার দরকারটা কী? সেই তো একই সমুদ্র অর্থাৎ পানি| আমাদের নিজের দেশে কি নদীনালা, খালবিল কম আছে? পানি দেখতে বিদেশ যাওয়ার বিলাসিতা কেন? শিরিন ক্ষেপে যায়, বলে বেশ তো তবে আপনার যাবার দরকার নেই| থাকুন আপনি ঘরে বসে আমরা একাই যাবো| আমি তখন বলি, অবলা মেয়েদের একা ভিনদেশে পাঠিয়ে আমি কি আর নিশ্চিন্তে থাকতে পারবো? বিদেশ বিভুঁইয়ে দুটি মহিলা কষ্ট পাবে তাতে যে আমার পৌরুষ ব্যহত হবে| সে কলঙ্কের ভার বহন করতে পারবো না| অতএব আমাকেও অনিচ্ছাসত্ত্বে¡ও সঙ্গী হতে হবে|

ইতোমধ্যে মালদ্বীপ সম্পর্কে কিছু কিছু তথ্য জানা হয়ে গেছে| ভারতের বেশ কিছুটা দক্ষিণে বিষুবরেখা বরাবর ক্ষুদ্র আকারের ১১৯০ দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে একটি স্বাধীন দেশ| এর মধ্যে বসতি আছে মাত্র ২০০টি দ্বীপে আর সব মিলিয়ে সারা দেশটির মোট জনসংখ্যা সাড়ে পাঁচ লক্ষ| সমুদ্রপৃষ্ঠে প্রবাল দিয়ে গড়ে উঠেছিলো এই দ্বীপপুঞ্জ| তারপর খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতাব্দীতে ভারত এবং শ্রীলঙ্কা থেকে একদল বৌদ্ধ নাবিক সেখানে ঘাঁটি স্থাপন করেন| পরবর্তীতে ১১৫৩ সালে সেখানে ইসলাম ধর্ম প্রতিষ্ঠালাভ করে| বর্তমানে এ দেশের প্রশাসন কঠোরভাবে ইসলাম ধর্মের অনুসারী|

মহাসাগরের বুকে গড়ে ওঠা ৩৫,২০৯ বর্গমিটারের দ্বীপপুঞ্জ সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে মাত্র ৬ ফুট উচ্চতায় অবস্থান করছে| ফলে ˆবশি^ক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে যে বিপর্যয় ঘটবে তখন তার প্রভাবে যখন মেরু অঞ্চলের বরফ গলতে থাকবে সে সময় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সমগ্র দেশটি সমুদ্রের নিচে তলিয়ে যাবে| এমনি এক মহাবিপর্যয়ের আশঙ্কা নিয়ে দেশটি দাঁড়িয়ে আছে| 

১৮ মার্চ ২০২২ উড়োজাহাজে আমাদের যাত্রা শুরু হলো| গন্তব্য মালদ্বীপের ভেলানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর| ১৯৭২ সালের দিকে যখন মালদ্বীপে দলে দলে পর্যটকরা আসতে থাকলেন, সে সময় একটি আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দরের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়| তখন দেশের প্রেসিডেন্ট ছিলেন ইব্রাহিম নাসির| তাঁরই উদ্যোগে এই বিমানবন্দরের কাজ শুরু হয়| ২০১১ সালে দেশের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম নাসিরের নাম যুক্ত করে বিমানবন্দরটির নাম রাখা হয় ইব্রাহিম নাসির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর| তবে ২০১৭ সালে ইব্রাহিম নাসিরের পারিবারিক গৃহের নাম অনুসারে বিমান বন্দরটির নাম পরিবর্তন করে ভেলানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রাখা হয়| বিমানবন্দরটি ছোট কিন্তু সুশৃঙ্খল| ইমিগ্রেশন আর লাগেজ গ্রহণের পালা শেষ করে বাইরে বেরিয়ে আসতেই দেখি অভ্যর্থনা জানাতে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে আছে এক তরুণ, সাথে একটি মেয়ে যার নাম সিনা| শ্যামলবরণ এই মেয়েটি চমৎকার ইংরেজি বলতে পারে| সিনা জানালো এই বিমানবন্দরে আমাদের অবস্থানের সময় সে আমাদের গাইড হিসেবে কাজ করবে| কিছু সাহায্যের অবশ্যই দরকার কারণ এখানে আমাদের প্রায় চার ঘন্টা অবস্থান করতে হবে| তারপর অন্য একটি আভ্যন্তরীণ বিমানযোগে আমরা যাবো একটি দ্বীপ রিসোর্টে| সিনা আমাদের বসিয়ে দিল বিমানবন্দরের লাউঞ্জে| এখানে আপাততঃ আমাদের বিশ্রাম এবং খাদ্যপানীয়ের প্রয়োজন মিটবে|

বিমানবন্দর থেকে বেরিয়েই আমাদের চোখে পড়েছে রাস্তার ধারেই আদিগন্ত সমুদ্র, নীলের বন্যায় ভেসে যাচ্ছে| প্রথম দর্শনেই চোখ জুড়িয়ে গেল| অনেকক্ষণ ধরে এলাকাটিতে ঘুরে বেড়ালাম, ছবি তুললাম| তারপর সময় হতেই মলডিভিয়ান এয়ারলাইনসের একটা আভ্যন্তরীণ বিমানে উঠে বসলাম| দেড় ঘণ্টা যাত্রার পর আমাদের যেতে হবে Gan Island  বিমানবন্দরে| রাতের অন্ধকারে বিমান উড়ে চলেছে| সামান্য আতিথেয়তার পর ফ্লাইট স্টুয়ার্ড আমাদের প্রত্যেকের হাতে ধরিয়ে দিল একটা সার্টিফিকেট, যার ওপর মোট চারটি ভাষায় লেখা আছে Equator Crossing Certificate অর্থাৎ বিষুবরেখা অতিক্রমন সনদপত্র| পৃথিবীর মোট দেশের ওপর দিয়ে ভৌগোলিক বিষুবরেখা চলে গেছে, মালদ্বীপ তাদের মধ্যে একটি| বহু যুগ আগের একটা পুরোনো ঐতিহ্য আছে| সে সময় জলপথে যে সব নাবিক বিষুবরেখা অতিক্রম করতো, বিষুবরেখা অতিক্রমণ সনদপত্র প্রদান করে তাদের নাবিক জীবনকে সম্মানিত করা হতো| তারপর Baptismal ceremony নামক আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে তাদেরকে খ্রিস্টধর্মের রীতিমতে বাপ্তাইজ করা হতো| বিষুবরেখা অতিক্রমকারী নাবিকদের বলা হতোShellbacks, যারা রোমান জলদেবতা নেপচুনের বিশ^স্ত প্রতিনিধি বলে গণ্য হতো| অপরদিকে যারা বিষুবরেখা অতিক্রম করেনি সে সব নাবিকদের বলা হতো Pollywogs| পুরোনো ঐতিহাসিক ঐতিহ্যকে মনে করিয়ে দেবার জন্য বিমান প্রতিষ্ঠানের এই প্রতীক সনদপত্র লাভ করে বেশ ভালো লাগলো| বিষয়টা লায়লাকে বুঝিয়ে বলতে ও মুচকি হেসে বললে, আমরা তাহলে এখন থেকে Shellbacks কী বলো? বললাম এখনো হইনি, আমাদেরকে এখনো বাপ্তাইজ করা হয়নি| ও বললে, যাঃ, ওটা তো খ্রিস্টানদের জন্য|

Gan Island-এর ছোট এয়ারপোর্টের বাইরে আবছা আলোর সাথে মিশেছে পূর্ণিমা চাঁদের আলো| আজ একাধারে শবে বরাত এবং দোল পূর্ণিমা| মালপত্র সাথে নিয়ে খানিকটা পথ হেঁটে আমরা ঘাটে এসে একটা স্পীডবোটে সওয়ার হলাম| সমুদ্রের ওপর দিয়ে স্পীডবোট ছুটে চললো Addu attol-এর দিকে| মাত্র আধ ঘণ্টার পথ| কিন্তু এই স্বল্পসময়ে প্রকৃতির যে রূপ দর্শন করেছি তা আজীবন আমার স্মৃতিতে অম্লান হয়ে থাকবে| আমার দীর্ঘ জীবনে বহুবার পূর্ণিমা চাঁদের অপরূপ শোভা নানাভাবে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে| কিন্তু আজ রাতের বেলা সমুদ্রপথে চলার সময় দেখলাম আকাশে বিশাল এক চাঁদ, সাগরের তরঙ্গে ঝিলমিল করে উঠে সাগরের আদিগন্ত জলরাশিতে ব্যপ্ত হয়ে গেছে| একবার মেঘহীন আকাশের দিকে তাকাচ্ছি, পরক্ষণেই চোখ সরিয়ে নিচ্ছি সাগরের জলরাশির দিকে, যেখানে তরঙ্গের সাথে ধেয়ে চলেছে জ্যোৎস্নার বিজুলিরেখা| বোটের সব আলো নেভানো| জানালা দিয়ে যে নারীর মুখে চাঁদের আলো এসে মায়াময় করে তুলেছে, মনে হলো জন্মজন্মান্তর আমার পাশে বসে থাকা এই রমণীকে আমি চিনি না| কে এই রহস্যময়ী নারী?

Addu attol-এর ঘাটে  এসে যখন তরী ভিড়লো, তখন বেশ রাত হয়ে গেছে| সারাদিনের যাত্রায় ক্লান্ত শরীর| ঘাট থেকে নামার পর বেশ খানিকটা পথ হেঁটে আমাদের জন্য নির্ধারিত Beach Resort-এর কক্ষে মালপত্র রেখে রাতের আহারের উদ্দেশ্যে ডাইনিং হলে গেলাম| রাত হয়ে যাওয়াতে সব অতিথিরাই বিদায় নিয়েছেন| শুধু আমরা দশ বারো জন যারা এইমাত্র পৌঁছেছি, তাদের জন্যে এখনকার আয়োজন| আজকের মেন্যু মুলত এ দেশীয় খাদ্যের সমাহার| তার মধ্যে সামুদ্রিক বা সি ফুডের আধিক্য| দেখে ভালো লাগলো যে এখানে যারা কর্মরত আছে তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা বাংলাদেশী|

Beach Villa Resort একতলা স্বয়ংসম্পূর্ণ কক্ষ দিয়ে ˆতরি একটি কটেজ| প্রতি পরিবারের জন্য পৃথক এক একটি থাকার ঘর| মূল প্রবেশপথ ছাড়াও আরো দুটি নির্গমন পথ আছে| একটি স্নানঘরের দিকে, সেখানে খোলা ছাদ আর অন্যটি একেবারে সমুদ্রসৈকতের ধারে| সেখানে বিচ চেয়ার, দোলনা আর খোলা আকাশের নিচে শুয়ে থাকার ব্যবস্থা আছে|

ডাইনিং হল থেকে ফিরে সমুদ্রের দিকের দরজা খুলে বাইরে খোলা আকাশের দিকে চোখ মেললাম| অপূর্ব পূর্ণিমা চাঁদ, উৎসব দিনের চাঁদ, মেঘ ফুঁড়ে স্নিগ্ধ আলোর বন্যায় চারিদিক উজ্জ্বল করে তুলেছে আর সীমাহীন সমুদ্রের শান্ত তরঙ্গের ওপর পড়ে পালী আলোয় ঝিকমিক করছে| পূর্ব দিগন্তে একরাশ ধূসর মেঘ সমুদ্রের জলের ওপর নুয়ে পড়েছে| স্নিগ্ধ বাতাসে ˆসকতের ওপর পেতে রাখা বিচ চেয়ারটায় বসে আকাশ, জ্যোৎস্না, সাগর আর মেঘের অপরূপ দৃশ্যের কাছে কিছুক্ষণের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিলাম|

আসলে প্রকৃতির রূপ কখনো ভাষায় বর্ণনা করা যায় না| ভাষার সীমারেখা বড়ই সঙ্কীর্ণ| তবু সাহিত্যিকেরা কিছুটা হলেও প্রকৃতির বর্ণনা করতে পারেন, আমরা আনাড়িরা সেটুকুও পারি না| আবার অভিজ্ঞ চিত্রশিল্পীদের তুলিতে প্রকৃতির প্রাণবন্ত ছবি দেখতে পাওয়া যায় বটে কিন্তু সেখানেও ঘাটতি থেকে যায়| শিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা কথা মনে পড়ছে| “লাবণ্য তো অনুভব করি এবং চোখেও দেখি একসঙ্গে, অথচ জিনিসটা এমনই যে পাকাপাকি একটা ব্যাখ্যার মধ্যে ধরাছোঁয়া দিতেই চায় না|” 

সাগরদ্বীপে ভোর হয়ে আসছে| ঘুম ভাঙতেই বেরিয়ে পড়েছি ˆসকতের ধারে| তখন সবেমাত্র পুবের আকাশে রঙের ছোঁয়া বুলিয়ে দিয়ে সূর্য উঠি উঠি করছে| আর রজনীর শশী গগণের কোণে লুকায় শরণ মাগে| সাগরের সাদা বালির ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নির্জন রাস্তার ওপর এসে পড়েছি| রাস্তার ওপাশ থেকে হিজাব পরিহিতা একটি রমণী ধীর পায়ে হেঁটে আসছে| কাছাকাছি আসতে মৃদু হেসে বললাম, সুপ্রভাত| প্রত্যুত্তরে মেয়েটিও শুভেচ্ছা বিনিময় করে হাসলো| 

তুমি নিশ্চয়ই এদেশের স্থানীয় অধিবাসী?

আবার মিষ্টি হেসে হ্যাঁ সূচক মাথা নেড়ে সে আমার প্রশ্নের জবাব দিলো|

তোমাদের দেশটা বড় সুন্দর, একরাতের মধ্যেই আমি এদেশের প্রেমে পড়ে গেছি| তারপর একটু থেমে বললাম, তুমি নিজেও খুব সুন্দর|

জোরে হেসে গড়িয়ে পড়লো মেয়েটি| বললাম, এমন করে হাসলে যে?

তুমি সত্য মিথ্যা দুটোই বেশ সুন্দর করে বলতে পারো|

আমি অবাক হয়ে বললাম কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা?

তোমার কথার প্রথম অংশ একেবারে সত্য| আমাদের দেশটা সত্যিই খুব সুন্দর| স্বচ্ছ নীল জলের ওপর গড়ে ওঠা এই দ্বীপের আকর্ষণে বহু বিদেশি অতিথিরা প্রতি বছর এখানে ছুটে আসে| আর ঐ যে শেষে বললে আমি সুন্দর, ওটা একটা ডাহা মিথ্যে কথা|

আমি রাগের ভান করলাম| কেন তোমার কথাটা মিথ্যে মনে হলো?

খুব সহজ, আমি জানি আমি দেখতে ভালো নই, আমার রঙ কালো|

তুমি আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় নোবেল বিজয়ী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম শুনেছ? তিনি মেঘলা দিনে গ্রামের এক শ্যামলা মেয়েকে দেখে তার নাম দিয়েছিলেন কৃষ্ণকলি| তার কালো হরিণ চোখের মায়ায় তিনি মুগ্ধ হয়ে বিখ্যাত একটি গান লিখেছিলেন|

কৃষ্ণকলি মানে কী?

কৃষ্ণকলি আমাদের দেশের একটা ফুলের নাম| সন্ধ্যায় ফোটে বলে এর অন্য নাম সন্ধ্যামালতী| ফ্লাওয়ার অব দ্য ইভনিং|

কবিরা সবকিছুর মধ্যে সৌন্দর্য খুঁজে নেয়| আমাদের দেশেও অনেক কবি-সাহিত্যিক আছেন| তোমার দেশের কবির ভাবনা আমাদের দেশের এক কবির কবিতায় পাওয়া যায়—

It’s not the voice

It’s not the looks

It’s not the clothes you adorn

It’s not the colour of your skin

It’s about the character

The personality

It’s the integrity

With which you carry yourself

Face and deal the world with.

কবির নাম মুনা আমিনা|

বাঃ, সুন্দর কবিতা আর তোমার ইংরেজি উচ্চারণও খুব সুন্দর|

আমাদের দেশের একশ’ ভাগ লোকই শিক্ষিত| সবাই ইংরেজি বলতে পারে|

সোসাল মিডিয়ার সাথে যোগাযোগ আছে? এই যেমন, ফেসবুক, হোয়াটস& আ্যাপ এই সব?

আমাকে দেবে? আমি দেশে ফিরে তোমার সাথে যোগাযোগ রাখবো|

ফেসবুক খুঁজলে আমাকে পাবে, খুঁজে বের কোরো|

তোমার নামটাও তো জানা হলো না|

ফাতিমাথ| আচ্ছা আমি এখন চলি, কাজ আছে|

আর একটু দাঁড়াও না|

না বিদেশি, আমার অনেক কাজ আছে| তোমার সাথে দাঁড়িয়ে গল্প করলে চলবে না|

তারপর একটু থেমে বললো, পথ চলতে কত মানুষের সঙ্গেই তো আমাদের দেখা হয়| পথের দেখা পথেই মিলিয়ে যায়|

আমি কিন্তু তোমাকে মনে রাখতে চাই|

বেশ তো, রেখো| কোনো এক অবসরে স্মরণ কোরো আজকের সুন্দর প্রভাতবেলার কথা|

তুমি মনে রাখবে?

কি জানি, হয়ত রাখবো| কিন্তু আর নয়, ঐ দেখ, পুব আকাশে সূর্য উঠছে| এনজয় তা সানরাইজ| 

বলেই সেই দূরদ্বীপবাসিনী এক নিমেষে উধাও হলো সামনে থেকে|

আকাশের দিকে চেয়ে দেখি মেঘের হিজাব পরে সূর্য উঠছে| সারা আকাশে ছড়িয়ে গেছে ক্ষণিক আগে দেখা দূরদ্বীপবাসিনীর মুখের মতোই দীপ্ত রাঙা সূর্য| আজ সূর্যের কপালটাও যেন ওরই মতো হিজাবে মোড়া|

এরই মধ্যে সাগরজলে নেমে পড়েছে কিছু লোকজন| একদিকে বিশাল বপু, স্ফীত মধ্যপ্রদেশ প্রায় পোশাকবিহীন একজন শ্বেতাঙ্গ| অন্যদিকে বিকিনি পরিহিতা কয়েকজন শ্বেতাঙ্গিনী| সমুদ্রের শীতল মায়াবি শরীরের সাথে নিজের শরীরটাকে সম্পূর্ণভাবে মিশিয়ে জলতরঙ্গকে আলিঙ্গন করতে না পারলে, সমুদ্রস্নান অসম্পূর্ণ হয়ে যায়| তাই হয়ত ওরা বেছে নিয়েছে এই সংক্ষিপ্ত পোশাক| কখনো বা দেখা যাচ্ছে এই পোশাকে তারা খোলা আকাশের নিচে সূর্যস্নান করছে|

চলতে চলতে দেখা হয়ে গেল লায়লা ফারজানা আর কন্যা ঐশীর সাথে| ওরাও প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছে| শাহরিয়ার দম্পতিদের ডেকে নিয়ে সবাই একসাথে প্রাতঃরাশের উদ্দেশ্যে ডাইনিং হলের দিকে চললাম| ডাইনিং হলের প্রবেশ দরজার কাছাকাছি আমাদের জন্যে একটা টেবিল নির্ধারণ করা আছে| সেখানে বসে আগত ভ্রমণকারীদের দেখতে পাচ্ছি| বেশিরভাগ অতিথি আসছে জোড়ায় জোড়ায়| মালদ্বীপের এই রিসোর্টটিতে অনেকেই আসে মধুচন্দ্রিমা যাপন করতে| বেশিরভাগ অতিথি এসেছে পাশ্চাত্য দেশগুলো থেকে| কয়েকজনকে দেখে দক্ষিণ ভারতীয় বলে মনে হলো| এরই মধ্যে আমার অর্ধাঙ্গিনী লায়লা দু’জন বাংলাদেশিকে খুঁজে পেয়েছে| বিদেশের মাটিতে দেশের মানুষকে খুঁজে পেলে তারা একে অন্যের খুব আপনজন হয়ে যায়| এরা দু’জন হলো রাহী আর হিমিকা| হিমিকা পেশায় ডাক্তার, আর রাহী একটা খ্যাতনামা বিদেশি কোম্পানীর কর্মকর্তা| ওরা দুটি শিশুপুত্রকে ওদের বাবা মা’র কাছে রেখে এখানে বেড়াতে এসেছে, একান্তে আপন ভুবন ˆতরি করে|

মধ্যাহ্নের তপ্ত বেলা, মাথার ওপর পবনদেব অগ্নিবান নিক্ষেপ করে চলেছেন| এরই মধ্যে আমরা দ্বীপের চারপাশটা ঘুরে দেখে নিয়েছি| এলাকাটা বেশ ছোট| বিভিন্ন ধরনের কিছু কটেজ, আর তারই চারপাশে নানা ধরনের ফুল আর নাম না জানা গাছের সমারোহ| কয়েকটি নারকেল গাছ, ফলের ভারে নুয়ে পড়েছে| পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ সব দিকেই সুনীল সাগর| সেখানে স্বচ্ছ জলে অসংখ্য মাছের গতিশীল বিচরণ| এর মধ্যে ছোট একটা হাঙরকেও ছোটাছুটি করতে দেখা গেল| ঐশীর সাধ হলো সমুদ্রের তলদেশটাও সে একবার দেখে আসবে| ও আগেই জেনে নিয়েছে যে এখানে অভিজ্ঞ ডুবুরির তত্ত্বাবধানে স্কুবা ডাইভিং এর ব্যবস্থা আছে|

সন্ধ্যেবেলায় রাহী হিমিকা দম্পতির সাথে দেখা হয়ে গেল| হিমিকা বললে, “আজ আমাদের বিবাহবার্ষিকী”| তার মানে এ বছর ওরা ওদের বিবাহবার্ষিকী পালন করতে মালদ্বীপকে বেছে নিয়েছে| শুনে খুব ভালো লাগলো|  রোমান্টিক এই জুটিকে অভিনন্দন জানিয়ে আমরা জনশূন্য জেটির ধারে ওদের সাথে গল্প করতে বসলাম| ওদের পারিবারিক গল্প শুনলাম| আমরা নিজেরাও প্রতি বিবাহবার্ষিকীতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ি| পথ বেঁধে দেয় আমাদের বন্ধনহীন গ্রন্থি| আমাদের স্মরণীয় একটা বিবাহবার্ষিকীর গল্প শোনালাম| প্রবীণ আর নবীনের এই সংক্ষিপ্ত আড্ডা বেশ জমে উঠলো|

পরদিন আবার সূর্যওঠা ভোরে ঘুম ভাঙলো| বিচ ভিলা রিসোর্টে আজই আমাদের শেষ দিন| এর পর আমরা চলে যাবো অল্প একটু দূরে ওয়াটার ভিলা কটেজে| ঐশী মামনি সারাদিন ধরে সমুদ্রের জলে ভিজছে| ওর আনন্দ দেখে বাধা দিতে পারি না কিন্তু ভয় হয় যদি ঠাণ্ডা লাগে| বিকেলে স্কুবা ডাইভিং থেকে ফিরে এসে দারুণ উত্তেজনা নিয়ে ডুবুরির মতো সমুদ্রের অনেক নিচে ঘুরে আসার গল্প শোনালো| কিছুক্ষণের জন্য যেন কোনো এক বিশাল অ্যাকুরিয়ামের ভেতরে ভেসে বেড়ানো| মেয়েটার খুশি দেখে আমাদের খুব ভালো লাগছে| 

ওয়াটার ভিলা কটেজগুলো তৈরি হয়েছে একেবারে সাগরের ওপরে| কাঠের বোর্ডওয়ের রাস্তা পার হয়ে ভিলাতে যেতে হয়| সেখানে পাশাপাশি তিনটি কক্ষে আমাদের আর শাহরিয়ার দম্পতিদের থাকার জায়গা বরাদ্দ হয়েছে| প্রতিটি কক্ষের পিছন দিকে কাঠের পাটাতনে খোলা আকাশের নিচে সমুদ্রদর্শনের ব্যবস্থা| সেখানে আছে ছোট টেবিল চেয়ার আর একটু শোবার মতো স্থান| একটি সিঁড়ি সরাসরি সাগরের জলের মধ্যে নেমে গেছে| দারুণ পরিবেশ|

এখন আমাদের ঘরের মধ্যে সাগর| বসে বসে প্রাণভরে নীল সাগরের ¯^চ্ছ জলের খেলা দেখছি| জলের মধ্যে মাছেদের স্বচ্ছন্দ বিহার, স্নিগ্ধ বাতাস, আকাশে খণ্ড খণ্ড মেঘ, সবকিছু মনকে উদাস করে তোলে| প্রকৃতি কোনোদিন পুরোনো হয় না| সুন্দরের আবেদন চিরন্তন| খবর পেয়েছি আজ সাগরে “ঈশান“ নামে একটা ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হয়েছে| তার প্রভাবে সাগর এখন বেশ চঞ্চল| সাগরের অশান্ত ঊর্মিমালা তীরে এসে বারবার ভেঙে পড়ছে| একটা গান মনে গুঞ্জরণ তুলছে, “এই সাগরের কত রূপ দেখেছি, কখনো শান্ত রূপে কখনো অশান্ত সে, আমি শুধু চেয়ে চেয়ে থেকেছি”|

রাতে মোমজোছনায় অঙ্গ ভিজিয়ে দুজনা মুখোমুখি অতীত স্মৃতির ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছি| কিছুক্ষণ পর শাহরিয়ার দম্পতি এলো| ওদের সাথে গল্প করতে করতে অনেক রাত হয়ে গেলো| সকালে আবার সাগর জলে ঘুরে বেড়ানো| এখানে ব্লু লেগুনের মতো সাগর, আশেপাশে জলের উচ্চতা চার পাঁচ ফুটের বেশি নয়| অনায়াসে হেঁটে চলাচল করা যায়| আজ আমাদের Addu Attol ছেড়ে চলে যেতে হবে রাজধানী মালেতে| বাংলাদেশি একজন কর্মীর সাথে আলাপ হলো| অল্পবয়সী ছেলে, নাম রিপন| কাজের সন্ধানে দেশ ছেড়ে এখানে এসে কাজ পেয়েছে| বেতন মাত্র ২৫০ মার্কিন ডলার| বিদেশি পর্যটকদের কাছ থেকে অনেক সময় দু’তিনশ’ ডলার টিপস পায়| সব টাকাই সে তার দরিদ্র বাবা মা আর ভাই বোনদের জন্যে দেশে পাঠিয়ে দেয়| জিজ্ঞেস করলাম, দেশের জন্যে মন খারাপ করে না? ও মলিন হেসে বললো, অভ্যেস হয়ে গেছে|

আবার সেই একই পথ, অর্থাৎ স্পীড বোটে Gann Airport আর উড়োজাহাজে রাজধানী মালে| এবার দিনের বেলা স্পীড বোটে আসার সময় একই সাগরের জলে আকাশ নীল, ঘন নীল আর ফিরোজা রঙের বাহার দেখে চোখ জুড়িয়ে গেলো| ভেলোনা এয়ারপোর্ট থেকে আমাদের হোটেল খুব বেশি দূরে নয়| জায়গাটার নাম হুলহুমালে| আসার পথে রাস্তার এপাশে শুধুই সাগর| হেটেলের তিনতলার বারান্দার সামনেও দিগন্তবিস্তৃত সাগর|

মালে শহরটা খুব ছোট কিন্তু বেশ ছিমছাম, পরিচ্ছন্ন| পর্যটকদের আকর্ষণ করা অনেক স্যুভেনিরের দোকান আছে| সেসব দোকানে বাঙালি ছেলেদের দেখা পাওয়া যায়| একটা ছেলের সাথে আলাপ হলো| ওর নাম ইয়াসিন আরাফাত| রিক্রুটিং এজেন্টের মাধ্যমে এ দেশে এসেছে| ওর কাছ থেকে জানলাম, চাকরির বাজারে ইংরেজিতে কথা বলার দক্ষতার মূল্য আছে| কোনরকম ঝুটঝামেলায় নিজেকে না জড়ালে এ দেশে দীর্ঘদিন থাকতে কোন অসুবিধে হয় না|

রাস্তায় চলার সময় দেখছি, এদেশের মেয়েদের সবারই মাথায় হিজাব, আর নয়তো বোরখায় সর্বাঙ্গ মোড়া| কিন্তু প্রত্যেকেই খুব স্মার্ট| বোরখাপরিহিতা নারী পেছনে তার বান্ধবীকে বসিয়ে মোটরসাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে, এ দৃশ্যও বেশ কয়েকবার চোখে পড়লো| এরা কঠোর ইসলামি শাসন মেনে চলে কিন্তু তাতে তাদের আভিজাত্য বা স্মার্টনেসের ঘাটতি হয় না|

দর্শনীয় স্থান বলতে প্রেসিডেন্টের প্রাসাদ, যাদুঘর, প্রবাল পাথরে ˆতরি গ্র্যান্ড ফ্রাইডে মসজিদ, সৌদি বাদশাহের অর্থায়নে গড়া কিং সালমান মসজিদ, সেন্ট্রাল পার্ক ইত্যাদি| শহরে শপিং সেন্টারে ঘোরা ছাড়া আমরা শুধু পাখির চোখে মালে শহরকে দেখেছি| তবে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সেন্ট্রাল পার্কে আর তার আশেপাশে ঘুরে বেড়িয়েছি| সেন্ট্রাল পার্কে আমিনাথ নামে এক মহিলার সাথে পরিচয় হলো| আমিনাথ তার কন্যাকে স্কুলে পাঠিয়ে পার্কেও ছায়ায় বসে মেয়ের স্কুল ছুটির জন্যে অপেক্ষা করছে|

লাল লাল ফুলে ভরে আছে একটি কৃষ্ণচূড়া গাছ| এ যে আমাদের বড় পরিচিত, বড় প্রিয় গাছ| এ যেন আমাদের দু’দেশের ˆমত্রীবন্ধনের সাক্ষী| সবচেয়ে আশ্চর্য হলাম যখন গাছের আড়াল থেকে অতি পরিচিত সুরে একটা কোকিল গেয়ে উঠলো, কুহু কুহু| সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে বসন্তের আহ্বানে চিরচেনা কোকিল কি এদেশে এসেছে? পার্ক পরিভ্রমণ শেষ করে এবার আমরা ফিরে চলেছি হোটেলের দিকে| সময় অল্প, এবার আবার ফিরে যেতে হবে চিরচেনা জন্মভূমিতে|

আমাদের মালদ্বীপ ভ্রমণ শেষ হয়েছে| যাবার আগে মালদ্বীপ সম্পর্কে মাত্র কয়েক লাইনে ইংল্যান্ডের এক কবির কবিতা দিয়ে আমার লেখা শেষ করছি|

An Island Paradise

You’re lying on a sun kissed beach,

watching the shadows of palm trees

swaying back and forward

under a warm breeze.

The sun is warming you

from your fingers to your toes.

You’re on an island paradise

away from the chilly winds that blow.

Relaxing in that dream world,

you have made for yourself,

while the real world

is a million miles away.

David Harris

22 March 2008

Bradfield, England

এই হলো মালদ্বীপের আসল রূপ|

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬


দূর দ্বীপবাসিনী

প্রকাশের তারিখ : ০৭ মে ২০২৬

featured Image


অনেক দিন থেকে মালদ্বীপ ভ্রমণের একটা প্রবল বাসনা মনের মধ্যে গুঞ্জরণ তুলেছিল| একটা অন্য রকম দেশ, হাজার দ্বীপ দিয়ে ˆতরি| আর চারিদিকে দৃষ্টিনন্দন নীল সমুদ্রজল ঢেউ তুলে পারের পানে ছুটে আসে বারংবার| সব সমুদ্রের তো একই রকম চেহারা| জীবনে অনেক দেশে অনেক রকম সমুদ্রদর্শনের সৌভাগ্য হয়েছে| আর আমাদের নিজের দেশের কক্সবাজার, সেন্টমার্টিনের সমুদ্র সেও কী কোনো অংশে কম? তবু বৈচিত্র্য মহিমায় এক সমুদ্র অন্য সমুদ্রের থেকে আলাদা| ইন্দোনেশিয়ার বালির, নুসা পেনিডায় পাহাড়ের ওপর থেকে সমুদ্রের যে বর্ণবৈচিত্র্য আর বিশাল ঢেউ দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়েছি, তেমনটা বার্সিলোনা, ক্লিফটন কিংবা জুহু বিচে দেখিনি| সেখানে সমুদ্র অন্য রকমের রূপ নিয়ে হাজির হয়| সে এক অন্য রকমের বিস্ময়| 

প্রস্তুতিপর্ব যখন চলছে, তখন দেখলাম উৎসাহ কারোরই কম নেই| স্ত্রী লায়লা ফারজানা, শাহরিয়ার পত্নী শিরিন সবাই দারুণ খুশি| শিরিনকে ক্ষ্যাপাবার জন্যে বলি, এত খরচাপাতি করে মালদ্বীপ যাবার দরকারটা কী? সেই তো একই সমুদ্র অর্থাৎ পানি| আমাদের নিজের দেশে কি নদীনালা, খালবিল কম আছে? পানি দেখতে বিদেশ যাওয়ার বিলাসিতা কেন? শিরিন ক্ষেপে যায়, বলে বেশ তো তবে আপনার যাবার দরকার নেই| থাকুন আপনি ঘরে বসে আমরা একাই যাবো| আমি তখন বলি, অবলা মেয়েদের একা ভিনদেশে পাঠিয়ে আমি কি আর নিশ্চিন্তে থাকতে পারবো? বিদেশ বিভুঁইয়ে দুটি মহিলা কষ্ট পাবে তাতে যে আমার পৌরুষ ব্যহত হবে| সে কলঙ্কের ভার বহন করতে পারবো না| অতএব আমাকেও অনিচ্ছাসত্ত্বে¡ও সঙ্গী হতে হবে|

ইতোমধ্যে মালদ্বীপ সম্পর্কে কিছু কিছু তথ্য জানা হয়ে গেছে| ভারতের বেশ কিছুটা দক্ষিণে বিষুবরেখা বরাবর ক্ষুদ্র আকারের ১১৯০ দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে একটি স্বাধীন দেশ| এর মধ্যে বসতি আছে মাত্র ২০০টি দ্বীপে আর সব মিলিয়ে সারা দেশটির মোট জনসংখ্যা সাড়ে পাঁচ লক্ষ| সমুদ্রপৃষ্ঠে প্রবাল দিয়ে গড়ে উঠেছিলো এই দ্বীপপুঞ্জ| তারপর খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতাব্দীতে ভারত এবং শ্রীলঙ্কা থেকে একদল বৌদ্ধ নাবিক সেখানে ঘাঁটি স্থাপন করেন| পরবর্তীতে ১১৫৩ সালে সেখানে ইসলাম ধর্ম প্রতিষ্ঠালাভ করে| বর্তমানে এ দেশের প্রশাসন কঠোরভাবে ইসলাম ধর্মের অনুসারী|

মহাসাগরের বুকে গড়ে ওঠা ৩৫,২০৯ বর্গমিটারের দ্বীপপুঞ্জ সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে মাত্র ৬ ফুট উচ্চতায় অবস্থান করছে| ফলে ˆবশি^ক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে যে বিপর্যয় ঘটবে তখন তার প্রভাবে যখন মেরু অঞ্চলের বরফ গলতে থাকবে সে সময় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সমগ্র দেশটি সমুদ্রের নিচে তলিয়ে যাবে| এমনি এক মহাবিপর্যয়ের আশঙ্কা নিয়ে দেশটি দাঁড়িয়ে আছে| 

১৮ মার্চ ২০২২ উড়োজাহাজে আমাদের যাত্রা শুরু হলো| গন্তব্য মালদ্বীপের ভেলানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর| ১৯৭২ সালের দিকে যখন মালদ্বীপে দলে দলে পর্যটকরা আসতে থাকলেন, সে সময় একটি আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দরের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়| তখন দেশের প্রেসিডেন্ট ছিলেন ইব্রাহিম নাসির| তাঁরই উদ্যোগে এই বিমানবন্দরের কাজ শুরু হয়| ২০১১ সালে দেশের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম নাসিরের নাম যুক্ত করে বিমানবন্দরটির নাম রাখা হয় ইব্রাহিম নাসির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর| তবে ২০১৭ সালে ইব্রাহিম নাসিরের পারিবারিক গৃহের নাম অনুসারে বিমান বন্দরটির নাম পরিবর্তন করে ভেলানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রাখা হয়| বিমানবন্দরটি ছোট কিন্তু সুশৃঙ্খল| ইমিগ্রেশন আর লাগেজ গ্রহণের পালা শেষ করে বাইরে বেরিয়ে আসতেই দেখি অভ্যর্থনা জানাতে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে আছে এক তরুণ, সাথে একটি মেয়ে যার নাম সিনা| শ্যামলবরণ এই মেয়েটি চমৎকার ইংরেজি বলতে পারে| সিনা জানালো এই বিমানবন্দরে আমাদের অবস্থানের সময় সে আমাদের গাইড হিসেবে কাজ করবে| কিছু সাহায্যের অবশ্যই দরকার কারণ এখানে আমাদের প্রায় চার ঘন্টা অবস্থান করতে হবে| তারপর অন্য একটি আভ্যন্তরীণ বিমানযোগে আমরা যাবো একটি দ্বীপ রিসোর্টে| সিনা আমাদের বসিয়ে দিল বিমানবন্দরের লাউঞ্জে| এখানে আপাততঃ আমাদের বিশ্রাম এবং খাদ্যপানীয়ের প্রয়োজন মিটবে|

বিমানবন্দর থেকে বেরিয়েই আমাদের চোখে পড়েছে রাস্তার ধারেই আদিগন্ত সমুদ্র, নীলের বন্যায় ভেসে যাচ্ছে| প্রথম দর্শনেই চোখ জুড়িয়ে গেল| অনেকক্ষণ ধরে এলাকাটিতে ঘুরে বেড়ালাম, ছবি তুললাম| তারপর সময় হতেই মলডিভিয়ান এয়ারলাইনসের একটা আভ্যন্তরীণ বিমানে উঠে বসলাম| দেড় ঘণ্টা যাত্রার পর আমাদের যেতে হবে Gan Island  বিমানবন্দরে| রাতের অন্ধকারে বিমান উড়ে চলেছে| সামান্য আতিথেয়তার পর ফ্লাইট স্টুয়ার্ড আমাদের প্রত্যেকের হাতে ধরিয়ে দিল একটা সার্টিফিকেট, যার ওপর মোট চারটি ভাষায় লেখা আছে Equator Crossing Certificate অর্থাৎ বিষুবরেখা অতিক্রমন সনদপত্র| পৃথিবীর মোট দেশের ওপর দিয়ে ভৌগোলিক বিষুবরেখা চলে গেছে, মালদ্বীপ তাদের মধ্যে একটি| বহু যুগ আগের একটা পুরোনো ঐতিহ্য আছে| সে সময় জলপথে যে সব নাবিক বিষুবরেখা অতিক্রম করতো, বিষুবরেখা অতিক্রমণ সনদপত্র প্রদান করে তাদের নাবিক জীবনকে সম্মানিত করা হতো| তারপর Baptismal ceremony নামক আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে তাদেরকে খ্রিস্টধর্মের রীতিমতে বাপ্তাইজ করা হতো| বিষুবরেখা অতিক্রমকারী নাবিকদের বলা হতোShellbacks, যারা রোমান জলদেবতা নেপচুনের বিশ^স্ত প্রতিনিধি বলে গণ্য হতো| অপরদিকে যারা বিষুবরেখা অতিক্রম করেনি সে সব নাবিকদের বলা হতো Pollywogs| পুরোনো ঐতিহাসিক ঐতিহ্যকে মনে করিয়ে দেবার জন্য বিমান প্রতিষ্ঠানের এই প্রতীক সনদপত্র লাভ করে বেশ ভালো লাগলো| বিষয়টা লায়লাকে বুঝিয়ে বলতে ও মুচকি হেসে বললে, আমরা তাহলে এখন থেকে Shellbacks কী বলো? বললাম এখনো হইনি, আমাদেরকে এখনো বাপ্তাইজ করা হয়নি| ও বললে, যাঃ, ওটা তো খ্রিস্টানদের জন্য|

Gan Island-এর ছোট এয়ারপোর্টের বাইরে আবছা আলোর সাথে মিশেছে পূর্ণিমা চাঁদের আলো| আজ একাধারে শবে বরাত এবং দোল পূর্ণিমা| মালপত্র সাথে নিয়ে খানিকটা পথ হেঁটে আমরা ঘাটে এসে একটা স্পীডবোটে সওয়ার হলাম| সমুদ্রের ওপর দিয়ে স্পীডবোট ছুটে চললো Addu attol-এর দিকে| মাত্র আধ ঘণ্টার পথ| কিন্তু এই স্বল্পসময়ে প্রকৃতির যে রূপ দর্শন করেছি তা আজীবন আমার স্মৃতিতে অম্লান হয়ে থাকবে| আমার দীর্ঘ জীবনে বহুবার পূর্ণিমা চাঁদের অপরূপ শোভা নানাভাবে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে| কিন্তু আজ রাতের বেলা সমুদ্রপথে চলার সময় দেখলাম আকাশে বিশাল এক চাঁদ, সাগরের তরঙ্গে ঝিলমিল করে উঠে সাগরের আদিগন্ত জলরাশিতে ব্যপ্ত হয়ে গেছে| একবার মেঘহীন আকাশের দিকে তাকাচ্ছি, পরক্ষণেই চোখ সরিয়ে নিচ্ছি সাগরের জলরাশির দিকে, যেখানে তরঙ্গের সাথে ধেয়ে চলেছে জ্যোৎস্নার বিজুলিরেখা| বোটের সব আলো নেভানো| জানালা দিয়ে যে নারীর মুখে চাঁদের আলো এসে মায়াময় করে তুলেছে, মনে হলো জন্মজন্মান্তর আমার পাশে বসে থাকা এই রমণীকে আমি চিনি না| কে এই রহস্যময়ী নারী?

Addu attol-এর ঘাটে  এসে যখন তরী ভিড়লো, তখন বেশ রাত হয়ে গেছে| সারাদিনের যাত্রায় ক্লান্ত শরীর| ঘাট থেকে নামার পর বেশ খানিকটা পথ হেঁটে আমাদের জন্য নির্ধারিত Beach Resort-এর কক্ষে মালপত্র রেখে রাতের আহারের উদ্দেশ্যে ডাইনিং হলে গেলাম| রাত হয়ে যাওয়াতে সব অতিথিরাই বিদায় নিয়েছেন| শুধু আমরা দশ বারো জন যারা এইমাত্র পৌঁছেছি, তাদের জন্যে এখনকার আয়োজন| আজকের মেন্যু মুলত এ দেশীয় খাদ্যের সমাহার| তার মধ্যে সামুদ্রিক বা সি ফুডের আধিক্য| দেখে ভালো লাগলো যে এখানে যারা কর্মরত আছে তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা বাংলাদেশী|

Beach Villa Resort একতলা স্বয়ংসম্পূর্ণ কক্ষ দিয়ে ˆতরি একটি কটেজ| প্রতি পরিবারের জন্য পৃথক এক একটি থাকার ঘর| মূল প্রবেশপথ ছাড়াও আরো দুটি নির্গমন পথ আছে| একটি স্নানঘরের দিকে, সেখানে খোলা ছাদ আর অন্যটি একেবারে সমুদ্রসৈকতের ধারে| সেখানে বিচ চেয়ার, দোলনা আর খোলা আকাশের নিচে শুয়ে থাকার ব্যবস্থা আছে|

ডাইনিং হল থেকে ফিরে সমুদ্রের দিকের দরজা খুলে বাইরে খোলা আকাশের দিকে চোখ মেললাম| অপূর্ব পূর্ণিমা চাঁদ, উৎসব দিনের চাঁদ, মেঘ ফুঁড়ে স্নিগ্ধ আলোর বন্যায় চারিদিক উজ্জ্বল করে তুলেছে আর সীমাহীন সমুদ্রের শান্ত তরঙ্গের ওপর পড়ে পালী আলোয় ঝিকমিক করছে| পূর্ব দিগন্তে একরাশ ধূসর মেঘ সমুদ্রের জলের ওপর নুয়ে পড়েছে| স্নিগ্ধ বাতাসে ˆসকতের ওপর পেতে রাখা বিচ চেয়ারটায় বসে আকাশ, জ্যোৎস্না, সাগর আর মেঘের অপরূপ দৃশ্যের কাছে কিছুক্ষণের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিলাম|

আসলে প্রকৃতির রূপ কখনো ভাষায় বর্ণনা করা যায় না| ভাষার সীমারেখা বড়ই সঙ্কীর্ণ| তবু সাহিত্যিকেরা কিছুটা হলেও প্রকৃতির বর্ণনা করতে পারেন, আমরা আনাড়িরা সেটুকুও পারি না| আবার অভিজ্ঞ চিত্রশিল্পীদের তুলিতে প্রকৃতির প্রাণবন্ত ছবি দেখতে পাওয়া যায় বটে কিন্তু সেখানেও ঘাটতি থেকে যায়| শিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা কথা মনে পড়ছে| “লাবণ্য তো অনুভব করি এবং চোখেও দেখি একসঙ্গে, অথচ জিনিসটা এমনই যে পাকাপাকি একটা ব্যাখ্যার মধ্যে ধরাছোঁয়া দিতেই চায় না|” 

সাগরদ্বীপে ভোর হয়ে আসছে| ঘুম ভাঙতেই বেরিয়ে পড়েছি ˆসকতের ধারে| তখন সবেমাত্র পুবের আকাশে রঙের ছোঁয়া বুলিয়ে দিয়ে সূর্য উঠি উঠি করছে| আর রজনীর শশী গগণের কোণে লুকায় শরণ মাগে| সাগরের সাদা বালির ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নির্জন রাস্তার ওপর এসে পড়েছি| রাস্তার ওপাশ থেকে হিজাব পরিহিতা একটি রমণী ধীর পায়ে হেঁটে আসছে| কাছাকাছি আসতে মৃদু হেসে বললাম, সুপ্রভাত| প্রত্যুত্তরে মেয়েটিও শুভেচ্ছা বিনিময় করে হাসলো| 

তুমি নিশ্চয়ই এদেশের স্থানীয় অধিবাসী?

আবার মিষ্টি হেসে হ্যাঁ সূচক মাথা নেড়ে সে আমার প্রশ্নের জবাব দিলো|

তোমাদের দেশটা বড় সুন্দর, একরাতের মধ্যেই আমি এদেশের প্রেমে পড়ে গেছি| তারপর একটু থেমে বললাম, তুমি নিজেও খুব সুন্দর|

জোরে হেসে গড়িয়ে পড়লো মেয়েটি| বললাম, এমন করে হাসলে যে?

তুমি সত্য মিথ্যা দুটোই বেশ সুন্দর করে বলতে পারো|

আমি অবাক হয়ে বললাম কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা?

তোমার কথার প্রথম অংশ একেবারে সত্য| আমাদের দেশটা সত্যিই খুব সুন্দর| স্বচ্ছ নীল জলের ওপর গড়ে ওঠা এই দ্বীপের আকর্ষণে বহু বিদেশি অতিথিরা প্রতি বছর এখানে ছুটে আসে| আর ঐ যে শেষে বললে আমি সুন্দর, ওটা একটা ডাহা মিথ্যে কথা|

আমি রাগের ভান করলাম| কেন তোমার কথাটা মিথ্যে মনে হলো?

খুব সহজ, আমি জানি আমি দেখতে ভালো নই, আমার রঙ কালো|

তুমি আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় নোবেল বিজয়ী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম শুনেছ? তিনি মেঘলা দিনে গ্রামের এক শ্যামলা মেয়েকে দেখে তার নাম দিয়েছিলেন কৃষ্ণকলি| তার কালো হরিণ চোখের মায়ায় তিনি মুগ্ধ হয়ে বিখ্যাত একটি গান লিখেছিলেন|

কৃষ্ণকলি মানে কী?

কৃষ্ণকলি আমাদের দেশের একটা ফুলের নাম| সন্ধ্যায় ফোটে বলে এর অন্য নাম সন্ধ্যামালতী| ফ্লাওয়ার অব দ্য ইভনিং|

কবিরা সবকিছুর মধ্যে সৌন্দর্য খুঁজে নেয়| আমাদের দেশেও অনেক কবি-সাহিত্যিক আছেন| তোমার দেশের কবির ভাবনা আমাদের দেশের এক কবির কবিতায় পাওয়া যায়—

It’s not the voice

It’s not the looks

It’s not the clothes you adorn

It’s not the colour of your skin

It’s about the character

The personality

It’s the integrity

With which you carry yourself

Face and deal the world with.

কবির নাম মুনা আমিনা|

বাঃ, সুন্দর কবিতা আর তোমার ইংরেজি উচ্চারণও খুব সুন্দর|

আমাদের দেশের একশ’ ভাগ লোকই শিক্ষিত| সবাই ইংরেজি বলতে পারে|

সোসাল মিডিয়ার সাথে যোগাযোগ আছে? এই যেমন, ফেসবুক, হোয়াটস& আ্যাপ এই সব?

আমাকে দেবে? আমি দেশে ফিরে তোমার সাথে যোগাযোগ রাখবো|

ফেসবুক খুঁজলে আমাকে পাবে, খুঁজে বের কোরো|

তোমার নামটাও তো জানা হলো না|

ফাতিমাথ| আচ্ছা আমি এখন চলি, কাজ আছে|

আর একটু দাঁড়াও না|

না বিদেশি, আমার অনেক কাজ আছে| তোমার সাথে দাঁড়িয়ে গল্প করলে চলবে না|

তারপর একটু থেমে বললো, পথ চলতে কত মানুষের সঙ্গেই তো আমাদের দেখা হয়| পথের দেখা পথেই মিলিয়ে যায়|

আমি কিন্তু তোমাকে মনে রাখতে চাই|

বেশ তো, রেখো| কোনো এক অবসরে স্মরণ কোরো আজকের সুন্দর প্রভাতবেলার কথা|

তুমি মনে রাখবে?

কি জানি, হয়ত রাখবো| কিন্তু আর নয়, ঐ দেখ, পুব আকাশে সূর্য উঠছে| এনজয় তা সানরাইজ| 

বলেই সেই দূরদ্বীপবাসিনী এক নিমেষে উধাও হলো সামনে থেকে|

আকাশের দিকে চেয়ে দেখি মেঘের হিজাব পরে সূর্য উঠছে| সারা আকাশে ছড়িয়ে গেছে ক্ষণিক আগে দেখা দূরদ্বীপবাসিনীর মুখের মতোই দীপ্ত রাঙা সূর্য| আজ সূর্যের কপালটাও যেন ওরই মতো হিজাবে মোড়া|

এরই মধ্যে সাগরজলে নেমে পড়েছে কিছু লোকজন| একদিকে বিশাল বপু, স্ফীত মধ্যপ্রদেশ প্রায় পোশাকবিহীন একজন শ্বেতাঙ্গ| অন্যদিকে বিকিনি পরিহিতা কয়েকজন শ্বেতাঙ্গিনী| সমুদ্রের শীতল মায়াবি শরীরের সাথে নিজের শরীরটাকে সম্পূর্ণভাবে মিশিয়ে জলতরঙ্গকে আলিঙ্গন করতে না পারলে, সমুদ্রস্নান অসম্পূর্ণ হয়ে যায়| তাই হয়ত ওরা বেছে নিয়েছে এই সংক্ষিপ্ত পোশাক| কখনো বা দেখা যাচ্ছে এই পোশাকে তারা খোলা আকাশের নিচে সূর্যস্নান করছে|

চলতে চলতে দেখা হয়ে গেল লায়লা ফারজানা আর কন্যা ঐশীর সাথে| ওরাও প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছে| শাহরিয়ার দম্পতিদের ডেকে নিয়ে সবাই একসাথে প্রাতঃরাশের উদ্দেশ্যে ডাইনিং হলের দিকে চললাম| ডাইনিং হলের প্রবেশ দরজার কাছাকাছি আমাদের জন্যে একটা টেবিল নির্ধারণ করা আছে| সেখানে বসে আগত ভ্রমণকারীদের দেখতে পাচ্ছি| বেশিরভাগ অতিথি আসছে জোড়ায় জোড়ায়| মালদ্বীপের এই রিসোর্টটিতে অনেকেই আসে মধুচন্দ্রিমা যাপন করতে| বেশিরভাগ অতিথি এসেছে পাশ্চাত্য দেশগুলো থেকে| কয়েকজনকে দেখে দক্ষিণ ভারতীয় বলে মনে হলো| এরই মধ্যে আমার অর্ধাঙ্গিনী লায়লা দু’জন বাংলাদেশিকে খুঁজে পেয়েছে| বিদেশের মাটিতে দেশের মানুষকে খুঁজে পেলে তারা একে অন্যের খুব আপনজন হয়ে যায়| এরা দু’জন হলো রাহী আর হিমিকা| হিমিকা পেশায় ডাক্তার, আর রাহী একটা খ্যাতনামা বিদেশি কোম্পানীর কর্মকর্তা| ওরা দুটি শিশুপুত্রকে ওদের বাবা মা’র কাছে রেখে এখানে বেড়াতে এসেছে, একান্তে আপন ভুবন ˆতরি করে|

মধ্যাহ্নের তপ্ত বেলা, মাথার ওপর পবনদেব অগ্নিবান নিক্ষেপ করে চলেছেন| এরই মধ্যে আমরা দ্বীপের চারপাশটা ঘুরে দেখে নিয়েছি| এলাকাটা বেশ ছোট| বিভিন্ন ধরনের কিছু কটেজ, আর তারই চারপাশে নানা ধরনের ফুল আর নাম না জানা গাছের সমারোহ| কয়েকটি নারকেল গাছ, ফলের ভারে নুয়ে পড়েছে| পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ সব দিকেই সুনীল সাগর| সেখানে স্বচ্ছ জলে অসংখ্য মাছের গতিশীল বিচরণ| এর মধ্যে ছোট একটা হাঙরকেও ছোটাছুটি করতে দেখা গেল| ঐশীর সাধ হলো সমুদ্রের তলদেশটাও সে একবার দেখে আসবে| ও আগেই জেনে নিয়েছে যে এখানে অভিজ্ঞ ডুবুরির তত্ত্বাবধানে স্কুবা ডাইভিং এর ব্যবস্থা আছে|

সন্ধ্যেবেলায় রাহী হিমিকা দম্পতির সাথে দেখা হয়ে গেল| হিমিকা বললে, “আজ আমাদের বিবাহবার্ষিকী”| তার মানে এ বছর ওরা ওদের বিবাহবার্ষিকী পালন করতে মালদ্বীপকে বেছে নিয়েছে| শুনে খুব ভালো লাগলো|  রোমান্টিক এই জুটিকে অভিনন্দন জানিয়ে আমরা জনশূন্য জেটির ধারে ওদের সাথে গল্প করতে বসলাম| ওদের পারিবারিক গল্প শুনলাম| আমরা নিজেরাও প্রতি বিবাহবার্ষিকীতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ি| পথ বেঁধে দেয় আমাদের বন্ধনহীন গ্রন্থি| আমাদের স্মরণীয় একটা বিবাহবার্ষিকীর গল্প শোনালাম| প্রবীণ আর নবীনের এই সংক্ষিপ্ত আড্ডা বেশ জমে উঠলো|

পরদিন আবার সূর্যওঠা ভোরে ঘুম ভাঙলো| বিচ ভিলা রিসোর্টে আজই আমাদের শেষ দিন| এর পর আমরা চলে যাবো অল্প একটু দূরে ওয়াটার ভিলা কটেজে| ঐশী মামনি সারাদিন ধরে সমুদ্রের জলে ভিজছে| ওর আনন্দ দেখে বাধা দিতে পারি না কিন্তু ভয় হয় যদি ঠাণ্ডা লাগে| বিকেলে স্কুবা ডাইভিং থেকে ফিরে এসে দারুণ উত্তেজনা নিয়ে ডুবুরির মতো সমুদ্রের অনেক নিচে ঘুরে আসার গল্প শোনালো| কিছুক্ষণের জন্য যেন কোনো এক বিশাল অ্যাকুরিয়ামের ভেতরে ভেসে বেড়ানো| মেয়েটার খুশি দেখে আমাদের খুব ভালো লাগছে| 

ওয়াটার ভিলা কটেজগুলো তৈরি হয়েছে একেবারে সাগরের ওপরে| কাঠের বোর্ডওয়ের রাস্তা পার হয়ে ভিলাতে যেতে হয়| সেখানে পাশাপাশি তিনটি কক্ষে আমাদের আর শাহরিয়ার দম্পতিদের থাকার জায়গা বরাদ্দ হয়েছে| প্রতিটি কক্ষের পিছন দিকে কাঠের পাটাতনে খোলা আকাশের নিচে সমুদ্রদর্শনের ব্যবস্থা| সেখানে আছে ছোট টেবিল চেয়ার আর একটু শোবার মতো স্থান| একটি সিঁড়ি সরাসরি সাগরের জলের মধ্যে নেমে গেছে| দারুণ পরিবেশ|

এখন আমাদের ঘরের মধ্যে সাগর| বসে বসে প্রাণভরে নীল সাগরের ¯^চ্ছ জলের খেলা দেখছি| জলের মধ্যে মাছেদের স্বচ্ছন্দ বিহার, স্নিগ্ধ বাতাস, আকাশে খণ্ড খণ্ড মেঘ, সবকিছু মনকে উদাস করে তোলে| প্রকৃতি কোনোদিন পুরোনো হয় না| সুন্দরের আবেদন চিরন্তন| খবর পেয়েছি আজ সাগরে “ঈশান“ নামে একটা ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হয়েছে| তার প্রভাবে সাগর এখন বেশ চঞ্চল| সাগরের অশান্ত ঊর্মিমালা তীরে এসে বারবার ভেঙে পড়ছে| একটা গান মনে গুঞ্জরণ তুলছে, “এই সাগরের কত রূপ দেখেছি, কখনো শান্ত রূপে কখনো অশান্ত সে, আমি শুধু চেয়ে চেয়ে থেকেছি”|

রাতে মোমজোছনায় অঙ্গ ভিজিয়ে দুজনা মুখোমুখি অতীত স্মৃতির ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছি| কিছুক্ষণ পর শাহরিয়ার দম্পতি এলো| ওদের সাথে গল্প করতে করতে অনেক রাত হয়ে গেলো| সকালে আবার সাগর জলে ঘুরে বেড়ানো| এখানে ব্লু লেগুনের মতো সাগর, আশেপাশে জলের উচ্চতা চার পাঁচ ফুটের বেশি নয়| অনায়াসে হেঁটে চলাচল করা যায়| আজ আমাদের Addu Attol ছেড়ে চলে যেতে হবে রাজধানী মালেতে| বাংলাদেশি একজন কর্মীর সাথে আলাপ হলো| অল্পবয়সী ছেলে, নাম রিপন| কাজের সন্ধানে দেশ ছেড়ে এখানে এসে কাজ পেয়েছে| বেতন মাত্র ২৫০ মার্কিন ডলার| বিদেশি পর্যটকদের কাছ থেকে অনেক সময় দু’তিনশ’ ডলার টিপস পায়| সব টাকাই সে তার দরিদ্র বাবা মা আর ভাই বোনদের জন্যে দেশে পাঠিয়ে দেয়| জিজ্ঞেস করলাম, দেশের জন্যে মন খারাপ করে না? ও মলিন হেসে বললো, অভ্যেস হয়ে গেছে|

আবার সেই একই পথ, অর্থাৎ স্পীড বোটে Gann Airport আর উড়োজাহাজে রাজধানী মালে| এবার দিনের বেলা স্পীড বোটে আসার সময় একই সাগরের জলে আকাশ নীল, ঘন নীল আর ফিরোজা রঙের বাহার দেখে চোখ জুড়িয়ে গেলো| ভেলোনা এয়ারপোর্ট থেকে আমাদের হোটেল খুব বেশি দূরে নয়| জায়গাটার নাম হুলহুমালে| আসার পথে রাস্তার এপাশে শুধুই সাগর| হেটেলের তিনতলার বারান্দার সামনেও দিগন্তবিস্তৃত সাগর|

মালে শহরটা খুব ছোট কিন্তু বেশ ছিমছাম, পরিচ্ছন্ন| পর্যটকদের আকর্ষণ করা অনেক স্যুভেনিরের দোকান আছে| সেসব দোকানে বাঙালি ছেলেদের দেখা পাওয়া যায়| একটা ছেলের সাথে আলাপ হলো| ওর নাম ইয়াসিন আরাফাত| রিক্রুটিং এজেন্টের মাধ্যমে এ দেশে এসেছে| ওর কাছ থেকে জানলাম, চাকরির বাজারে ইংরেজিতে কথা বলার দক্ষতার মূল্য আছে| কোনরকম ঝুটঝামেলায় নিজেকে না জড়ালে এ দেশে দীর্ঘদিন থাকতে কোন অসুবিধে হয় না|

রাস্তায় চলার সময় দেখছি, এদেশের মেয়েদের সবারই মাথায় হিজাব, আর নয়তো বোরখায় সর্বাঙ্গ মোড়া| কিন্তু প্রত্যেকেই খুব স্মার্ট| বোরখাপরিহিতা নারী পেছনে তার বান্ধবীকে বসিয়ে মোটরসাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে, এ দৃশ্যও বেশ কয়েকবার চোখে পড়লো| এরা কঠোর ইসলামি শাসন মেনে চলে কিন্তু তাতে তাদের আভিজাত্য বা স্মার্টনেসের ঘাটতি হয় না|

দর্শনীয় স্থান বলতে প্রেসিডেন্টের প্রাসাদ, যাদুঘর, প্রবাল পাথরে ˆতরি গ্র্যান্ড ফ্রাইডে মসজিদ, সৌদি বাদশাহের অর্থায়নে গড়া কিং সালমান মসজিদ, সেন্ট্রাল পার্ক ইত্যাদি| শহরে শপিং সেন্টারে ঘোরা ছাড়া আমরা শুধু পাখির চোখে মালে শহরকে দেখেছি| তবে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সেন্ট্রাল পার্কে আর তার আশেপাশে ঘুরে বেড়িয়েছি| সেন্ট্রাল পার্কে আমিনাথ নামে এক মহিলার সাথে পরিচয় হলো| আমিনাথ তার কন্যাকে স্কুলে পাঠিয়ে পার্কেও ছায়ায় বসে মেয়ের স্কুল ছুটির জন্যে অপেক্ষা করছে|

লাল লাল ফুলে ভরে আছে একটি কৃষ্ণচূড়া গাছ| এ যে আমাদের বড় পরিচিত, বড় প্রিয় গাছ| এ যেন আমাদের দু’দেশের ˆমত্রীবন্ধনের সাক্ষী| সবচেয়ে আশ্চর্য হলাম যখন গাছের আড়াল থেকে অতি পরিচিত সুরে একটা কোকিল গেয়ে উঠলো, কুহু কুহু| সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে বসন্তের আহ্বানে চিরচেনা কোকিল কি এদেশে এসেছে? পার্ক পরিভ্রমণ শেষ করে এবার আমরা ফিরে চলেছি হোটেলের দিকে| সময় অল্প, এবার আবার ফিরে যেতে হবে চিরচেনা জন্মভূমিতে|

আমাদের মালদ্বীপ ভ্রমণ শেষ হয়েছে| যাবার আগে মালদ্বীপ সম্পর্কে মাত্র কয়েক লাইনে ইংল্যান্ডের এক কবির কবিতা দিয়ে আমার লেখা শেষ করছি|

An Island Paradise

You’re lying on a sun kissed beach,

watching the shadows of palm trees

swaying back and forward

under a warm breeze.

The sun is warming you

from your fingers to your toes.

You’re on an island paradise

away from the chilly winds that blow.

Relaxing in that dream world,

you have made for yourself,

while the real world

is a million miles away.

David Harris

22 March 2008

Bradfield, England

এই হলো মালদ্বীপের আসল রূপ|


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত