মানুষের যোগাযোগের প্রথমত মাধ্যম ভাষা| ভাষা আবিষ্কারের ফলেই
মানুষ তার সুখ-দুখ,
আশা-আকাঙ্ক্ষা, অন্তর্নিহিত স্বপ্ন অভিব্যক্তি ও নিরাশার কথা
প্রকাশ করতে পারলো মানুষের
কাছে| আবহমানকাল থেকে ভাবপ্রবণ মানুষের
কেউ কেউ গল্প, কল্প-কাহিনি বলে; আর কেউ
কেউ তা শুনে আনন্দ
পেতেন| লেখাপড়া না জানা প্রাচীন
মানুষ পশু শিকার, যুদ্ধ-বিগ্রহ, প্রেম, পার্বণ নিয়ে রচনা করেছেন
নানা কাহিনি, লোকগাথা, লোকগীতি, লোকগান এবং লোকছড়া| এসব
কাহিনিতে বর্ণিত হয়েছে সেকালের সমাজ, সংস্কৃতি ও লোকমানস| গ্রামীণ
ভাব ও ভাষায় রচিত
এসব সাহিত্যই লোকসাহিত্য| সমকালীন সমাজজীবন থেকে উৎসারিত এ
সাহিত্য দীর্ঘদিন ধরে মানুষের মুখে
মুখে প্রচলিত হয়ে আসছে| ক্রমে
গণমানুষের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতিকে নির্ভর
করে এ সাহিত্য বিস্তৃতি
লাভ করেছে| লোকসাহিত্যের অধিকাংশ জায়গাজুড়ে রয়েছে নর-নারীর প্রেম,
দেব-দেবীর প্রেম, নবী-রাসুল-খোদাপ্রেম
ইত্যাদি| বলা যায়, মধ্যযুগের
লোকগীতিগুলো ধর্ম ও প্রেমের
এক মিশ্র আখ্যান| আমাদের লোকসাহিত্য লোকগীতিতে সমৃদ্ধ| আর লোকগীতিকাগুলোয় নর-নারীর প্রেম বিশেষ একটি অনুষঙ্গ|
নারীর প্রতি পুরুষের এবং পুরুষের প্রতি
নারীর আকর্ষণ সহজাত| প্রকৃতিগতভাবে সম্পর্কযুক্তও| এ আকর্ষণ থেকেই
প্রেম-প্রীতি, স্নেহ-মমতা, বিরহ-ভালোবাসার সৃষ্টি
হয়েছে| সুন্দরী নারীরা যুগে যুগে পুরুষহৃদয়
উদ্বেলিত করে চলেছে তাদের
বিচিত্র চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে| নারীর রূপের আকর্ষণ পুরুষের নিকট স্বভাবজাত| নারীদের
এমন রূপ বর্ণনা করে
এক শ্রেণির ভাবপ্রবণ মানুষ গ্রামের মজলিশকে সরগরম করে রাখতেন| কোনো
কোনো গায়েন (বাউল বৈরাগী) গান
গেয়ে নিজে যেমন আনন্দ
পেতেন তেমনি পল্লীগাঁয়ের মানুষের মনেও বইয়ে দিতেন
আনন্দের ফল্গুধারা| মাঝিমাল্লা, কৃষকেরাও এসব গেয়ে চিত্তানন্দে
কর্মোদ্দীপনা সৃষ্টি করতেন| দেখা যায়, লোকসাহিত্যের
এক বড়ো জায়গা জুড়ে
নারীর রূপ বর্ণনা— বিশেষ
অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করছে| কেবল
লোকসাহিত্যে নয়, আমাদের নাগরিক
সাহিত্যেও নারীর রূপ সৌন্দর্য ফুটে
উঠেছে নানা উপমা উৎপ্রেক্ষায়|
আবহমান বাংলার রূপসী নারীদের অনেকেই ছিলেন রূপের ব্যাপারে সচেতন| লক্ষ করলে দেখা
যাবে— কোনো কোনো অংশে
আধুনিক নারীদের চেয়ে আগেকার নারীদের
রূপসচেতনতা কম ছিলো না|
নারীর সাজগোজ ও রূপচর্চার উপকরণ
সম্পর্কে তেমন একটি বর্ণনা
দেখা যায়—
“মসলিনিয়া শাড়ী আগে ফিন্দাও
কন্যায়/ গজমতি হার দেও তুলিয়া
গলায়|/ রাম লক্ষণ শংখ
দুই মুইট তুলিয়া দেও
হাতে/ ঐ যে দেখ
সিতিপাত তুলিয়া দেও মাথে|/ রুনুঝুনু
নেপুর দেও পায়েতে পরাইয়া|১
হরেক রকমের অলঙ্কার ব্যবহারে সচেতন ছিলেন নারী সমাজ| বিয়ের
কন্যাকে বত্রিশ জাতের প্রসাধনী দিয়ে সাজানোর বর্ণনা
এ যুগের পার্লারসাজকেও হার মানাবে| একটু
লক্ষ করা যেতে পারে—
“হিরামতি নথ দেও নাকেতে
পরাইয়া/ হীরামদন গরি দেও কানেতে
ঝুলাইয়া|/ নাকেতে লটকাইয়া দেও মুক্তা ঝলমল/
চউখেতে লেপিয়া দেও ঐ কটরার
কাজল/ হিরার পাঁচ আংটি দেও
পাঁচই আঙুলে|২
বর্তমান বাজারে রকমারি শাড়ির নাম শোনা যায়|
প্রাচীন লোককবিগণও এ ব্যাপারে কম
সচেতন ছিলেন না| নানা জাতের
শাড়ির নাম গেঁথে রেখেছেন
কাব্যের শরীরে| রং-বেরংয়ের শাড়ি
যেমন: আসমানতেরা, কনকলতা, মেঘডুম্বর, গঙ্গাজল, মুক্তামনি, কেঁও, মসলিন প্রভৃতি| নানা উপমায় শাড়ির
উজ্জ্বলতা এবং ˆবশিষ্ট্যেরও সন্ধান
পাওয়া যায়—
পরথমে পরাইল শাড়ী নামে গঙ্গাজল
নউখের উপর তুললে শাড়ী
করে টলমল
তারপরে পরাইল শাড়ী নামে মুক্তামনি
সাত রাজার ধন লাগছে শাড়ীর
গাঁথুনি|
তারপরে পরাইল শাড়ী নাম তার
কেঁও
শাড়ীর মধ্যে আঁকিয়া থুইছে ছ’কুড়ি দেও|
আরেক শাড়ী তুলিয়া রাখছে
আসমানতেরা নাম
লতাপাতা আঁকছে কত নবিসিন্দা কাম|
সাজিয়া পরিয়া কন্যা রূপের পানে চায়
চান সুরুজ লজ্জা পাইয়া আবের নীচে যায়|৩
আদিকাল থেকে লোকসাহিত্যের খনি
বুকে নিয়ে আছে হাওর,
বিল, জল, জঙ্গলবেষ্টিত, সুজলা
সুফলা এই বাংলা| বাংলাদেশের
উত্তর পূর্বাঞ্চল বিশেষ করে সিলেট অঞ্চল
লোকসাহিত্যের এক উর্বর জায়গা|
এখানে লোককবিদের রচিত, সংগৃহীত প্রতিটি লোকগাথা বা কাহিনি যেন
এক একটি প্রেমের নির্ঝরিণী|
এসব পুঁথি পদাবলিতে বাঙালি নারীদের সত্যিকার প্রেমধর্মের পরিচয় পাওয়া যায়| আলাল-দুলাল
বা দেওয়ানা-মদিনার কাহিনির নায়িকা মদিনা বিবির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে সুদূর প্রাশ্চাত্য
পণ্ডিত রোঁমা রোলাও এর ভূয়সী প্রশংসা
করেছেন| স্বামীর প্রতি নিখাঁদ বিশ^াস ও
ভক্তির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখা যায় মদিনা
চরিত্রে| স্বামীর তালাকনামার কথা অন্য পুরুষের
মুখে শুনে মদিনা তা
বিশশ্বাস করতে পারে না|
বরং— “আইজ বানায় তালের
পিডা [পিঠা] কাইল কানায় খৈ/
ছিক্কাতে তুলিয়া রাখে গামছা-বান্দা দৈ
॥/ শাইল ধানের চিড়া
কত যতন করিয়া/ হাঁড়ীতে
ভরিয়া রাখে ছিক্কাতে তুলিয়া
॥”
কত গভীর পতিপ্রেম থাকলে,
স্বামীর প্রতি কত অন্ধ ও
অগাধ বিশশ্বাস থাকলে একজন নারী এমন
কাজ করতে পারেন| স্বামী
দুলালের তালাকদান মদিনা কোনোমতেই বিশ্বাস করতে পারেনি| অবশেষে
সে জানতে পারলো তার স্বামী তাকে
সত্যি সত্যিই তালাক দিয়েছে| স্বামী প্রত্যাখ্যাত মদিনার মনের অবস্থা ধরা
পড়ে পালাকারের পংক্তিতে— “কান্দিয়া কান্দিয়া বিবির দুঃখে দিন যায়/ খানাপিনা
ছাড়্যা [ছাইড়া] কেবল করে হায়
হায়|/ ... /তারপর না একদিন সগল
[সকল] চিন্তা থইয়া/ বেস্তের হুরী না গেলো
বেস্তেতে চলিয়া|”
হবিগঞ্জের বানিয়াচঙ্গ অঞ্চল থেকে চন্দ কুমার
দে’র মাধ্যমে ড.
দীনেশ চন্দ্র সেন ‘সোনা বিবির
পালা’ নামে একটি কাহিনিকাব্য
সংগ্রহ করেছেন| আখ্যানে বর্ণিত হয়েছে— সোনা বিবির স্বামী
মামুদ মিয়া ছিলেন পত্নিপ্রেমী
এক মানুষ| নিজের স্ত্রীর রূপ সৌন্দর্যে বিভোর
ছিলেন মামুদ মিয়া| পালাকারের অনবদ্য বর্ণনায় সোনা বিবির রূপ
সৌন্দর্য ধরা পড়ে— “হাইট্যা
যায়রে সোনা বিবি কলসি
কাংখে লইয়া/ চাইয়া থাকে মামুদ মিয়া
হাতের কাম থইয়া|/ যখন
হায়গো সোনা বিবি বান্দে
মাথার চুল/ হাইস্যা হাইস্যা
মামুদ মিয়া তুইল্যা আনে
ফুল/ যখন হায়রে সোনা
বিবি রান্ধিবারে যায়/ মামুদ ভাবে
মলিন অঙ্গ হইবে ধুয়ায়/
মামুদের সঙ্গে সোনা বিবি হাইস্যা
কয় কথা/ কি দিয়া
সাজাইবে ভাবে সাধের স্বর্ণলতা|/
হাটে যায় বাজারে যায়
মামুদ কিনা বেচা করে/
লাভের কড়ি দিয়া নিতুই
সাজায় সোনারে|/ কানের লাগি কানফুল আনে
দাঁতের লাগি মিশি/ শতেক
চাম্পা ফুইট্যা উঠে সোনার মুখের
হাসি|/ আউলা কেশ ঝাইড়্যা
কন্যায় তুইল্যা বান্ধে চুল/ মুখখানি যেমন
কন্যার হাওরের পদ্মফুল|”
একজন নিরক্ষর ও জন্মান্ধ কবি
ছিলেন ˆফজু| তিনি অনেক
পালা রচনা করেছেন| ˆফজু
রচিত ‘সুরত জামাল ও
অধুয়া সুন্দরী’ পালায় জামাল খা ও অধুয়ার
চমৎকার রূপ ও প্রেমের
বর্ণনা করেছেন| কাহিনিতে দেওয়ান আলালের স্ত্রী স্বপ্নে দেখলেন যে, পুণ্য মাসের
চাঁদ যেন সে কোলে
নিল| বিবির স্বপ্নের কথা শুনে আলাল
স্বপ্নের ব্যাখ্যা করেন, আমরা পুত্র সন্তান
লাভের সৌভাগ্য হবো| এরপর দশ
মাস দশ দিন গত
হবার পর সত্যি সত্যিই
জন্ম হয় এক পুত্র
সন্তানের| আদর করে নাম
রাখা হয় সুরত জামাল|
এদিকে দুবরাজ রাজার এক অসম্ভব সুন্দরী
কন্যা হলো অধুয়া| অধুয়া
সুন্দরী ফুল তুলতে গিয়ে
একদিন জামালের রূপের তুফানে পড়ে পাগলপ্রায় হয়ে
পরে| অধুয়ার রূপের আগুন জামাল খাঁর
মনেও সমান তুফান তুলে|
এক রসঘন বর্ণনায় কাহিনি
এগিয়ে যায়| এক সময়
জামাল খা ও অধুয়ার
হয় মিলন| এরপর আত্মীয় স্বজনের
চক্রান্তে সুরত জমাল প্রাণ
হারালে স্ত্রী অধুয়া সুন্দরী বিষপানে আত্মহত্যা করেন| ‘সুরত জামাল ও
অধুয়া সুন্দরী’ পালায় বাঙালি নারী চরিত্রের স্বরূপ
উন্মোচিত হয়েছে| পতিপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী অধুয়ার রূপ লাবণ্য ও
প্রেম প্রণয় খুব কম ক্ষেত্রেই
পরিলক্ষিত হয়| পালার কাহিনিতে
অধুয়ার রূপের বর্ণনা দেখা যায়— “দুবরাজ
রাজার কন্যা অধুয়া সুন্দরী/তার রূপে লাজ
পায় যত হুর পরী|/আসমানের দিকে কন্যা চোখ
মেল্যা চায়/শরমে সুরুজ
গিয়া আবেতে লুকায়|/একদিন অধুয়া যে ফুল তুলিতে
যায়/ চাঁন্দের সমান জামাল খাঁরে
পথে দেখতে পায়|/ জামালের রূপ কন্যা চউখেতে
দেখিয়া/ মনে মনে ভাবে
কন্যা পাগল হইয়া|/ চাইর
চউখ এক হইল যাইবার
কালে/ ভমরা উড়িয়া যায়
ছাইড়্যা যেন ফুলে|”
বাংলা লোকসাহিত্যের বিশাল ভাণ্ডার লোকগীতিকাগুলোর নানা পালায় লোককবিরা
অনুপম উপমা দিয়ে নারীর
রূপকে পাঠকের কাছে জীবন্ত করে
তুলেছেন| নারীর রূপ সৌন্দর্যে রাঙিয়ে
তুলেছেন লোকসাহিত্যের বিশাল এক ক্যানভাস| বলা
যায়, লোককবিরা প্রেমকে নানাভাবে নানা শব্দ উপমায়
কারুকার্যময় করে রেখেছেন| তারা
প্রেম প্রণয়ের এক একটি চিত্র
এমনভাবে উপস্থিত করেছেন যেন আমাদের চোখের
সামনে সহজেই ভেসে ওঠে সেই
সব নারী অবয়ব| লোকপালায়
নারী চরিত্রগুলো স্বীয় বৈশিষ্ট্য ও নানা গুণে
মহীয়ান| যে গুণের মধ্যে
রয়েছে গভীর পতিপ্রেম, পতিব্রত,
শ্রদ্ধা-স্নেহ-প্রবণতা, সংযম-সহিষ্ণুতা, সমাজ
ও ব্যক্তি জীবনে সজাগ ও সচেতনতা|
প্রকৃত নারীপ্রেম বিভোর ও অনড়| লোককবিরা
নানা বর্ণনায় নারী সৌন্দর্য আশ্চর্যভাবে
আকর্ষণীয় করে তুলেছেন| এর
সাহিত্যমূল্য মোটেও কম নয়| এই
সাহিত্য যেমন লোকজীবনকে পরম
তৃপ্তি ও অপরিমেয় আনন্দ
দেয় তেমনি সুন্দর সমাজ জীবনের চিত্রও
তুলে ধরে|
পল্লি কবি বা পদকর্তারা
নারীর রূপ সৌন্দর্য সাদামাটাভাবে
বর্ণনা করলেও সহজে তা পাঠকহৃদয়
আকৃষ্ট করে| যেমন— ‘আগল
ডাগল আখিরে আসমানের তারা/ তিলেক মাত্র দেখলে না যায় পাশুরা|’৬ নানামাত্রিক আলঙ্কারিক
ভাষায় নিজেদের শিল্প-সৌন্দর্যের স্ফুরণ ঘটিয়েছেন| সিলেট গীতিকার এক বর্ণনায় দেখা
যায়— ধনীর গৃহস্থ কন্যা
যৌবনে পদার্পণ করে| যৌবনের আগমনে
কন্যার শরীর ও রূপের
পরিবর্তন ঘটে| এ নিয়ে
লোককবির মনোহারী ভাষা ও নান্দনিক
বর্ণনা লক্ষ্যণীয়— “মুখ কিনি সুন্দর
সান্দর খামুর খুমুর করে/ রদির আলাইচ
পাইলে উনাই উনাই পরে/
লীলা¤^রী পিন্দি যিবলা
রদিত করে কাম/ উনাইয়া
উনাইয়া পরে চান মুখের
ঘাম|/ ঘামোর মাঝে রদির চিলিক
ঝক&মকি করে/ রাতির
আন্দারিত যেমন জিনিপুক চরে|”
কিংবা— “ছুরত বিবি আলে
ঢিলে যৌবনের ঠেলায়/ যার হমুখে পরে
বিবি হেঅউ একবার চায়|/অমনেই সুন্দর আছিল মানে কইতা
পরি/ অখোন যৌবন পাইয়া
রূপ পড়ে ঝরি|”
এত রূপঝরা পাগলকরা নারী স্বামীপ্রেমে ছিলেন
অনুগত| কোনো লোভ লালসা
দিয়ে কেউ তাকে স্বামীর
আনুগত্য থেকে বিমুখ করতে
পারেনি| ‘শান্তি কন্যার বারো মাসিতে’ শান্তির
দৃঢ় প্রত্যয় স্বামীর প্রতি অগাধ বিশ্বাস সওদাগরের
(সওদাগররূপী নিজের স্বামীর) শত প্রলোভন, ছলনা
উপেক্ষা করে নিজের সতীত্ব
ও ˆনতিকতার বিরল প্রমাণ দিয়েছেন|
ছদ্মবেশী সওদাগর শান্তিকে তার স্বামীর মৃত্যুর
দুঃসংবাদ অবতারণা করে— ‘তোরই স্বামী খাইছে
কাটা কাঞ্চনপুরের ভাটি’; শান্তি জানে তার সাধু
যেখানেই থাকুক জীবিত আছে, ছদ্মবেশী সওদাগর
তাকে লোভ দেখিয়ে ফুসলাতে
চাচ্ছে, তার যৌবনের বেপারি
হতে চাচ্ছে| স্বামীর প্রতি অনড় বিশ^াসী
শান্তি তাই সওদাগরকে ঝটপট
উত্তর দেয়— “যদি সাউদে খাইতরে
কাটা কাঞ্চনপুরের ভাটি,/ আউলাইত মাথার কেশ, ছিড়িত গজমতি|
ওরে কি॥/ রাম
লক্ষণ দুই মুটি শঙ্খ
ভাঙ্গি হইত চুর/ খসিয়া
পড়িত আমার চরণের নেপুর|
ওরে কি॥/ দিনে
দিনে হইত মলিন শিরের
সিন্দুর,/ তবে সে বুঝিতাম
সাধু গেছৈইন যমপুর| ওরে কি॥”৯
এভাবে আমাদের লোকসাহিত্যে পালাগান, লোকগীতি, ধাঁধা, হেঁয়ালি ও কাহিনিগুলোতে পুরুষ
ও নারীর প্রেম অতুলনীয় সৌন্দর্যে ভরে উঠেছে| নারীর
রূপ, গুণ, প্রেম, চরিত্র
প্রভৃতি বিষয়কেন্দ্রিক রচনাগুলো ছন্দ-অলঙ্কারে অপূর্ব
ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করেছে— যা এক স্বতন্ত্র
শিল্পজগতের সন্ধান দেয়| আবহমান বাংলার
প্রকৃত রূপ খুঁজে পাওয়া
যায় এ সাহিত্যে|

বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬
মানুষের যোগাযোগের প্রথমত মাধ্যম ভাষা| ভাষা আবিষ্কারের ফলেই
মানুষ তার সুখ-দুখ,
আশা-আকাঙ্ক্ষা, অন্তর্নিহিত স্বপ্ন অভিব্যক্তি ও নিরাশার কথা
প্রকাশ করতে পারলো মানুষের
কাছে| আবহমানকাল থেকে ভাবপ্রবণ মানুষের
কেউ কেউ গল্প, কল্প-কাহিনি বলে; আর কেউ
কেউ তা শুনে আনন্দ
পেতেন| লেখাপড়া না জানা প্রাচীন
মানুষ পশু শিকার, যুদ্ধ-বিগ্রহ, প্রেম, পার্বণ নিয়ে রচনা করেছেন
নানা কাহিনি, লোকগাথা, লোকগীতি, লোকগান এবং লোকছড়া| এসব
কাহিনিতে বর্ণিত হয়েছে সেকালের সমাজ, সংস্কৃতি ও লোকমানস| গ্রামীণ
ভাব ও ভাষায় রচিত
এসব সাহিত্যই লোকসাহিত্য| সমকালীন সমাজজীবন থেকে উৎসারিত এ
সাহিত্য দীর্ঘদিন ধরে মানুষের মুখে
মুখে প্রচলিত হয়ে আসছে| ক্রমে
গণমানুষের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতিকে নির্ভর
করে এ সাহিত্য বিস্তৃতি
লাভ করেছে| লোকসাহিত্যের অধিকাংশ জায়গাজুড়ে রয়েছে নর-নারীর প্রেম,
দেব-দেবীর প্রেম, নবী-রাসুল-খোদাপ্রেম
ইত্যাদি| বলা যায়, মধ্যযুগের
লোকগীতিগুলো ধর্ম ও প্রেমের
এক মিশ্র আখ্যান| আমাদের লোকসাহিত্য লোকগীতিতে সমৃদ্ধ| আর লোকগীতিকাগুলোয় নর-নারীর প্রেম বিশেষ একটি অনুষঙ্গ|
নারীর প্রতি পুরুষের এবং পুরুষের প্রতি
নারীর আকর্ষণ সহজাত| প্রকৃতিগতভাবে সম্পর্কযুক্তও| এ আকর্ষণ থেকেই
প্রেম-প্রীতি, স্নেহ-মমতা, বিরহ-ভালোবাসার সৃষ্টি
হয়েছে| সুন্দরী নারীরা যুগে যুগে পুরুষহৃদয়
উদ্বেলিত করে চলেছে তাদের
বিচিত্র চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে| নারীর রূপের আকর্ষণ পুরুষের নিকট স্বভাবজাত| নারীদের
এমন রূপ বর্ণনা করে
এক শ্রেণির ভাবপ্রবণ মানুষ গ্রামের মজলিশকে সরগরম করে রাখতেন| কোনো
কোনো গায়েন (বাউল বৈরাগী) গান
গেয়ে নিজে যেমন আনন্দ
পেতেন তেমনি পল্লীগাঁয়ের মানুষের মনেও বইয়ে দিতেন
আনন্দের ফল্গুধারা| মাঝিমাল্লা, কৃষকেরাও এসব গেয়ে চিত্তানন্দে
কর্মোদ্দীপনা সৃষ্টি করতেন| দেখা যায়, লোকসাহিত্যের
এক বড়ো জায়গা জুড়ে
নারীর রূপ বর্ণনা— বিশেষ
অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করছে| কেবল
লোকসাহিত্যে নয়, আমাদের নাগরিক
সাহিত্যেও নারীর রূপ সৌন্দর্য ফুটে
উঠেছে নানা উপমা উৎপ্রেক্ষায়|
আবহমান বাংলার রূপসী নারীদের অনেকেই ছিলেন রূপের ব্যাপারে সচেতন| লক্ষ করলে দেখা
যাবে— কোনো কোনো অংশে
আধুনিক নারীদের চেয়ে আগেকার নারীদের
রূপসচেতনতা কম ছিলো না|
নারীর সাজগোজ ও রূপচর্চার উপকরণ
সম্পর্কে তেমন একটি বর্ণনা
দেখা যায়—
“মসলিনিয়া শাড়ী আগে ফিন্দাও
কন্যায়/ গজমতি হার দেও তুলিয়া
গলায়|/ রাম লক্ষণ শংখ
দুই মুইট তুলিয়া দেও
হাতে/ ঐ যে দেখ
সিতিপাত তুলিয়া দেও মাথে|/ রুনুঝুনু
নেপুর দেও পায়েতে পরাইয়া|১
হরেক রকমের অলঙ্কার ব্যবহারে সচেতন ছিলেন নারী সমাজ| বিয়ের
কন্যাকে বত্রিশ জাতের প্রসাধনী দিয়ে সাজানোর বর্ণনা
এ যুগের পার্লারসাজকেও হার মানাবে| একটু
লক্ষ করা যেতে পারে—
“হিরামতি নথ দেও নাকেতে
পরাইয়া/ হীরামদন গরি দেও কানেতে
ঝুলাইয়া|/ নাকেতে লটকাইয়া দেও মুক্তা ঝলমল/
চউখেতে লেপিয়া দেও ঐ কটরার
কাজল/ হিরার পাঁচ আংটি দেও
পাঁচই আঙুলে|২
বর্তমান বাজারে রকমারি শাড়ির নাম শোনা যায়|
প্রাচীন লোককবিগণও এ ব্যাপারে কম
সচেতন ছিলেন না| নানা জাতের
শাড়ির নাম গেঁথে রেখেছেন
কাব্যের শরীরে| রং-বেরংয়ের শাড়ি
যেমন: আসমানতেরা, কনকলতা, মেঘডুম্বর, গঙ্গাজল, মুক্তামনি, কেঁও, মসলিন প্রভৃতি| নানা উপমায় শাড়ির
উজ্জ্বলতা এবং ˆবশিষ্ট্যেরও সন্ধান
পাওয়া যায়—
পরথমে পরাইল শাড়ী নামে গঙ্গাজল
নউখের উপর তুললে শাড়ী
করে টলমল
তারপরে পরাইল শাড়ী নামে মুক্তামনি
সাত রাজার ধন লাগছে শাড়ীর
গাঁথুনি|
তারপরে পরাইল শাড়ী নাম তার
কেঁও
শাড়ীর মধ্যে আঁকিয়া থুইছে ছ’কুড়ি দেও|
আরেক শাড়ী তুলিয়া রাখছে
আসমানতেরা নাম
লতাপাতা আঁকছে কত নবিসিন্দা কাম|
সাজিয়া পরিয়া কন্যা রূপের পানে চায়
চান সুরুজ লজ্জা পাইয়া আবের নীচে যায়|৩
আদিকাল থেকে লোকসাহিত্যের খনি
বুকে নিয়ে আছে হাওর,
বিল, জল, জঙ্গলবেষ্টিত, সুজলা
সুফলা এই বাংলা| বাংলাদেশের
উত্তর পূর্বাঞ্চল বিশেষ করে সিলেট অঞ্চল
লোকসাহিত্যের এক উর্বর জায়গা|
এখানে লোককবিদের রচিত, সংগৃহীত প্রতিটি লোকগাথা বা কাহিনি যেন
এক একটি প্রেমের নির্ঝরিণী|
এসব পুঁথি পদাবলিতে বাঙালি নারীদের সত্যিকার প্রেমধর্মের পরিচয় পাওয়া যায়| আলাল-দুলাল
বা দেওয়ানা-মদিনার কাহিনির নায়িকা মদিনা বিবির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে সুদূর প্রাশ্চাত্য
পণ্ডিত রোঁমা রোলাও এর ভূয়সী প্রশংসা
করেছেন| স্বামীর প্রতি নিখাঁদ বিশ^াস ও
ভক্তির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখা যায় মদিনা
চরিত্রে| স্বামীর তালাকনামার কথা অন্য পুরুষের
মুখে শুনে মদিনা তা
বিশশ্বাস করতে পারে না|
বরং— “আইজ বানায় তালের
পিডা [পিঠা] কাইল কানায় খৈ/
ছিক্কাতে তুলিয়া রাখে গামছা-বান্দা দৈ
॥/ শাইল ধানের চিড়া
কত যতন করিয়া/ হাঁড়ীতে
ভরিয়া রাখে ছিক্কাতে তুলিয়া
॥”
কত গভীর পতিপ্রেম থাকলে,
স্বামীর প্রতি কত অন্ধ ও
অগাধ বিশশ্বাস থাকলে একজন নারী এমন
কাজ করতে পারেন| স্বামী
দুলালের তালাকদান মদিনা কোনোমতেই বিশ্বাস করতে পারেনি| অবশেষে
সে জানতে পারলো তার স্বামী তাকে
সত্যি সত্যিই তালাক দিয়েছে| স্বামী প্রত্যাখ্যাত মদিনার মনের অবস্থা ধরা
পড়ে পালাকারের পংক্তিতে— “কান্দিয়া কান্দিয়া বিবির দুঃখে দিন যায়/ খানাপিনা
ছাড়্যা [ছাইড়া] কেবল করে হায়
হায়|/ ... /তারপর না একদিন সগল
[সকল] চিন্তা থইয়া/ বেস্তের হুরী না গেলো
বেস্তেতে চলিয়া|”
হবিগঞ্জের বানিয়াচঙ্গ অঞ্চল থেকে চন্দ কুমার
দে’র মাধ্যমে ড.
দীনেশ চন্দ্র সেন ‘সোনা বিবির
পালা’ নামে একটি কাহিনিকাব্য
সংগ্রহ করেছেন| আখ্যানে বর্ণিত হয়েছে— সোনা বিবির স্বামী
মামুদ মিয়া ছিলেন পত্নিপ্রেমী
এক মানুষ| নিজের স্ত্রীর রূপ সৌন্দর্যে বিভোর
ছিলেন মামুদ মিয়া| পালাকারের অনবদ্য বর্ণনায় সোনা বিবির রূপ
সৌন্দর্য ধরা পড়ে— “হাইট্যা
যায়রে সোনা বিবি কলসি
কাংখে লইয়া/ চাইয়া থাকে মামুদ মিয়া
হাতের কাম থইয়া|/ যখন
হায়গো সোনা বিবি বান্দে
মাথার চুল/ হাইস্যা হাইস্যা
মামুদ মিয়া তুইল্যা আনে
ফুল/ যখন হায়রে সোনা
বিবি রান্ধিবারে যায়/ মামুদ ভাবে
মলিন অঙ্গ হইবে ধুয়ায়/
মামুদের সঙ্গে সোনা বিবি হাইস্যা
কয় কথা/ কি দিয়া
সাজাইবে ভাবে সাধের স্বর্ণলতা|/
হাটে যায় বাজারে যায়
মামুদ কিনা বেচা করে/
লাভের কড়ি দিয়া নিতুই
সাজায় সোনারে|/ কানের লাগি কানফুল আনে
দাঁতের লাগি মিশি/ শতেক
চাম্পা ফুইট্যা উঠে সোনার মুখের
হাসি|/ আউলা কেশ ঝাইড়্যা
কন্যায় তুইল্যা বান্ধে চুল/ মুখখানি যেমন
কন্যার হাওরের পদ্মফুল|”
একজন নিরক্ষর ও জন্মান্ধ কবি
ছিলেন ˆফজু| তিনি অনেক
পালা রচনা করেছেন| ˆফজু
রচিত ‘সুরত জামাল ও
অধুয়া সুন্দরী’ পালায় জামাল খা ও অধুয়ার
চমৎকার রূপ ও প্রেমের
বর্ণনা করেছেন| কাহিনিতে দেওয়ান আলালের স্ত্রী স্বপ্নে দেখলেন যে, পুণ্য মাসের
চাঁদ যেন সে কোলে
নিল| বিবির স্বপ্নের কথা শুনে আলাল
স্বপ্নের ব্যাখ্যা করেন, আমরা পুত্র সন্তান
লাভের সৌভাগ্য হবো| এরপর দশ
মাস দশ দিন গত
হবার পর সত্যি সত্যিই
জন্ম হয় এক পুত্র
সন্তানের| আদর করে নাম
রাখা হয় সুরত জামাল|
এদিকে দুবরাজ রাজার এক অসম্ভব সুন্দরী
কন্যা হলো অধুয়া| অধুয়া
সুন্দরী ফুল তুলতে গিয়ে
একদিন জামালের রূপের তুফানে পড়ে পাগলপ্রায় হয়ে
পরে| অধুয়ার রূপের আগুন জামাল খাঁর
মনেও সমান তুফান তুলে|
এক রসঘন বর্ণনায় কাহিনি
এগিয়ে যায়| এক সময়
জামাল খা ও অধুয়ার
হয় মিলন| এরপর আত্মীয় স্বজনের
চক্রান্তে সুরত জমাল প্রাণ
হারালে স্ত্রী অধুয়া সুন্দরী বিষপানে আত্মহত্যা করেন| ‘সুরত জামাল ও
অধুয়া সুন্দরী’ পালায় বাঙালি নারী চরিত্রের স্বরূপ
উন্মোচিত হয়েছে| পতিপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী অধুয়ার রূপ লাবণ্য ও
প্রেম প্রণয় খুব কম ক্ষেত্রেই
পরিলক্ষিত হয়| পালার কাহিনিতে
অধুয়ার রূপের বর্ণনা দেখা যায়— “দুবরাজ
রাজার কন্যা অধুয়া সুন্দরী/তার রূপে লাজ
পায় যত হুর পরী|/আসমানের দিকে কন্যা চোখ
মেল্যা চায়/শরমে সুরুজ
গিয়া আবেতে লুকায়|/একদিন অধুয়া যে ফুল তুলিতে
যায়/ চাঁন্দের সমান জামাল খাঁরে
পথে দেখতে পায়|/ জামালের রূপ কন্যা চউখেতে
দেখিয়া/ মনে মনে ভাবে
কন্যা পাগল হইয়া|/ চাইর
চউখ এক হইল যাইবার
কালে/ ভমরা উড়িয়া যায়
ছাইড়্যা যেন ফুলে|”
বাংলা লোকসাহিত্যের বিশাল ভাণ্ডার লোকগীতিকাগুলোর নানা পালায় লোককবিরা
অনুপম উপমা দিয়ে নারীর
রূপকে পাঠকের কাছে জীবন্ত করে
তুলেছেন| নারীর রূপ সৌন্দর্যে রাঙিয়ে
তুলেছেন লোকসাহিত্যের বিশাল এক ক্যানভাস| বলা
যায়, লোককবিরা প্রেমকে নানাভাবে নানা শব্দ উপমায়
কারুকার্যময় করে রেখেছেন| তারা
প্রেম প্রণয়ের এক একটি চিত্র
এমনভাবে উপস্থিত করেছেন যেন আমাদের চোখের
সামনে সহজেই ভেসে ওঠে সেই
সব নারী অবয়ব| লোকপালায়
নারী চরিত্রগুলো স্বীয় বৈশিষ্ট্য ও নানা গুণে
মহীয়ান| যে গুণের মধ্যে
রয়েছে গভীর পতিপ্রেম, পতিব্রত,
শ্রদ্ধা-স্নেহ-প্রবণতা, সংযম-সহিষ্ণুতা, সমাজ
ও ব্যক্তি জীবনে সজাগ ও সচেতনতা|
প্রকৃত নারীপ্রেম বিভোর ও অনড়| লোককবিরা
নানা বর্ণনায় নারী সৌন্দর্য আশ্চর্যভাবে
আকর্ষণীয় করে তুলেছেন| এর
সাহিত্যমূল্য মোটেও কম নয়| এই
সাহিত্য যেমন লোকজীবনকে পরম
তৃপ্তি ও অপরিমেয় আনন্দ
দেয় তেমনি সুন্দর সমাজ জীবনের চিত্রও
তুলে ধরে|
পল্লি কবি বা পদকর্তারা
নারীর রূপ সৌন্দর্য সাদামাটাভাবে
বর্ণনা করলেও সহজে তা পাঠকহৃদয়
আকৃষ্ট করে| যেমন— ‘আগল
ডাগল আখিরে আসমানের তারা/ তিলেক মাত্র দেখলে না যায় পাশুরা|’৬ নানামাত্রিক আলঙ্কারিক
ভাষায় নিজেদের শিল্প-সৌন্দর্যের স্ফুরণ ঘটিয়েছেন| সিলেট গীতিকার এক বর্ণনায় দেখা
যায়— ধনীর গৃহস্থ কন্যা
যৌবনে পদার্পণ করে| যৌবনের আগমনে
কন্যার শরীর ও রূপের
পরিবর্তন ঘটে| এ নিয়ে
লোককবির মনোহারী ভাষা ও নান্দনিক
বর্ণনা লক্ষ্যণীয়— “মুখ কিনি সুন্দর
সান্দর খামুর খুমুর করে/ রদির আলাইচ
পাইলে উনাই উনাই পরে/
লীলা¤^রী পিন্দি যিবলা
রদিত করে কাম/ উনাইয়া
উনাইয়া পরে চান মুখের
ঘাম|/ ঘামোর মাঝে রদির চিলিক
ঝক&মকি করে/ রাতির
আন্দারিত যেমন জিনিপুক চরে|”
কিংবা— “ছুরত বিবি আলে
ঢিলে যৌবনের ঠেলায়/ যার হমুখে পরে
বিবি হেঅউ একবার চায়|/অমনেই সুন্দর আছিল মানে কইতা
পরি/ অখোন যৌবন পাইয়া
রূপ পড়ে ঝরি|”
এত রূপঝরা পাগলকরা নারী স্বামীপ্রেমে ছিলেন
অনুগত| কোনো লোভ লালসা
দিয়ে কেউ তাকে স্বামীর
আনুগত্য থেকে বিমুখ করতে
পারেনি| ‘শান্তি কন্যার বারো মাসিতে’ শান্তির
দৃঢ় প্রত্যয় স্বামীর প্রতি অগাধ বিশ্বাস সওদাগরের
(সওদাগররূপী নিজের স্বামীর) শত প্রলোভন, ছলনা
উপেক্ষা করে নিজের সতীত্ব
ও ˆনতিকতার বিরল প্রমাণ দিয়েছেন|
ছদ্মবেশী সওদাগর শান্তিকে তার স্বামীর মৃত্যুর
দুঃসংবাদ অবতারণা করে— ‘তোরই স্বামী খাইছে
কাটা কাঞ্চনপুরের ভাটি’; শান্তি জানে তার সাধু
যেখানেই থাকুক জীবিত আছে, ছদ্মবেশী সওদাগর
তাকে লোভ দেখিয়ে ফুসলাতে
চাচ্ছে, তার যৌবনের বেপারি
হতে চাচ্ছে| স্বামীর প্রতি অনড় বিশ^াসী
শান্তি তাই সওদাগরকে ঝটপট
উত্তর দেয়— “যদি সাউদে খাইতরে
কাটা কাঞ্চনপুরের ভাটি,/ আউলাইত মাথার কেশ, ছিড়িত গজমতি|
ওরে কি॥/ রাম
লক্ষণ দুই মুটি শঙ্খ
ভাঙ্গি হইত চুর/ খসিয়া
পড়িত আমার চরণের নেপুর|
ওরে কি॥/ দিনে
দিনে হইত মলিন শিরের
সিন্দুর,/ তবে সে বুঝিতাম
সাধু গেছৈইন যমপুর| ওরে কি॥”৯
এভাবে আমাদের লোকসাহিত্যে পালাগান, লোকগীতি, ধাঁধা, হেঁয়ালি ও কাহিনিগুলোতে পুরুষ
ও নারীর প্রেম অতুলনীয় সৌন্দর্যে ভরে উঠেছে| নারীর
রূপ, গুণ, প্রেম, চরিত্র
প্রভৃতি বিষয়কেন্দ্রিক রচনাগুলো ছন্দ-অলঙ্কারে অপূর্ব
ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করেছে— যা এক স্বতন্ত্র
শিল্পজগতের সন্ধান দেয়| আবহমান বাংলার
প্রকৃত রূপ খুঁজে পাওয়া
যায় এ সাহিত্যে|

আপনার মতামত লিখুন