কানাডায় যেতে এবার সম্মত হলেন রবীন্দ্রনাথ, ব্রিটিশ কলম্বিয়া প্রদেশের বড় শহর ভ্যাঙ্কুবারে কানাডার ত্রিবার্ষিক জাতীয় শিক্ষাপরিষদ সম্মিলনে যেতে রাজি হলেন শুধু পরিষদের আমন্ত্রণেই নয়, রবীন্দ্রনাথ জেনেছিলেন যাদের আগ্রহাতিশয্যে এই আমান্ত্রণপত্র তৈরি হয়েছিল, তাদের মধ্যে প্রধানত রয়েছেন চিত্রশিল্পী এবং আলোকচিত্রীগণ| বিশেষ করে সেই ১৯২৮-এর সেপ্টেম্বরে ভ্যাঙ্কুবারের School of Decorative and
Applied Arts-এ বিশিষ্ট শিল্পী Fred Varley এবং Jock Macdonald শিক্ষাদানে নিয়োজিত ছিলেন| ছিলেন বিখ্যাত আলোকচিত্রী John Vanderpant, এছাড়াও শিল্পী Emily Carr তো ছিলেনই, ‘This was the group that
pushed for RabindranathÕs invitation to the
Triennial Conference.’ আলোকচিত্রী Vanderpant-এর স্টুডিওতে সংরক্ষণের জন্য রবীন্দ্রনাথের প্রোর্ট্রেট ছবিও তোলা হবে| রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মনে করছেন, ‘কানাডার এই শিক্ষা পরিষদ ও বিশ্বভারতীর শিক্ষাদর্শের মধ্যে একটা মিল খুঁজিয়া পাওয়া যায়; বোধ হয় সেই জন্য কানাডার জাতীয় শিক্ষা পরিষদ ভারতের শিক্ষাদর্শনের প্রতীকরূপে রবীন্দ্রনাথকে আহ্বান করিয়াছে|’
কানাডার ভাবনার খোঁজখবর, রবীন্দ্রনাথকে আমন্ত্রণের পিছনে সেরকম ভাবনা কাজ করেছে কিনা তা প্রমাণিত করার দলিল আমাদের হাতে নেই, প্রভাত বাবুর হাতেও ছিল না| কানাডার শিল্পীগ্রুপ ঐতিহাসিক ‘Group Seven’-এর Fred Varley, Emily Carr এবং ওই গ্রুপের ‘সহযোগী’ এবং Group Eleven-এর Jock Maccdonald-এর ভূমিকার কথা জানা যায় নির্ভরযোগ্য প্রকাশনার সূত্রে, খুব আলোচিত এবং রবীন্দ্রানুরাগীদের জন্য আগ্রহোদ্দীপক তথ্যসমৃদ্ধ গ্রন্থ ‘Rabindranath Tagore One
Hundred Years of Global Reception' গ্রন্থে কানাডার আমন্ত্রণ এবং একদা প্রত্যাখ্যানের নানা খবর ও তথ্য দিয়ে প্রমাণিত করে তুলেছে| দ্বিতীয় সূত্র মূলত এটাই প্রাথমিক সূত্র ‘The Daily Toronto Star’-এর একটি প্রতিবেদন— ‘Hindu Shuns Canada’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯১৬ সারের ২৭ সেপ্টেম্বর| প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী ১৯১৬ সালে কানাডার শিক্ষা পরিষদের আমন্ত্রণ রবীন্দ্রনাথ প্রত্যাখান করেছিলেন| রবীন্দ্রনাথের মতো মানবিক এবং আত্মমর্যাদাসম্পন্ন শিল্পী, কবির পক্ষে ওই প্রত্যাখ্যান ছিল উপযুক্ত জবাব| এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না ১৯১৬ সালে রবীন্দ্রনাথ বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেননি| করেন আরও ৪/৫ বছর পর| তো ওই পরিষদ ‘বিশ্বভারতীর শিক্ষাদর্শের’ নমুনা দেখার তখনো সুযোগ পায়নি! এই আমন্ত্রণ পাওয়ার তিন বছর আগে কানাডা আমেরিকাসহ এশিয়া আফ্রিকা অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের মধ্যে তিনিই প্রথম সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করে বিশ্বের অত্যন্ত পরিচিত এবং সম্মানিত একজন কবি|
কানাডায় আমন্ত্রণ পাওয়ার সময় কবি রবীন্দ্রনাথের মনে ছিল ১৯১৪ সালে ‘কামাগাটা মারু’ জাহাজে আসা ৩৭৬ জন ভারতীয়র করুণ অবমাননার কথা| জাপানের বাষ্পচালিত জাহাজ কামাগাটা মারুতে ছিল ৩৪০ জন শিখ, ২৪ জন মুসলমান এবং ১২ জন হিন্দু| কানাডার ইমিগ্রেশন অথরিটি ভ্যাঙ্কুবার বন্দরে তাদের নামতে দেয় না| ইন্ডিয়া তখন ব্রিটিশ শাসনের অন্তর্ভুক্ত হলেও কানাডা বর্ণদূষ্ট পক্ষপাতিত্বের কারণে ভারতীয়দের প্রত্যাখ্যান করে কানাডা ইমিগ্রেশন পলিসির (৮ জানুয়ারি ১৯০৮) একটি ধারা Continuous Journey-র দোহাই দিয়ে| এই ধারার প্রয়োগ সম্পূর্ণভাবেই সাদা কানাডিয়ানদের বর্ণবৈষম্যমূলক আচরণ| কারণ একই সময়ে ইউরোপ থেকে চার লক্ষের ওপর অভিবাসী কানাডার বন্দর দিয়ে প্রবেশ করে| ‘Continuous journey
regulation’-এর মূল কথা হলো নিজ জন্মভূমি বা নাগরিকতাপ্রাপ্ত দেশ থেকে টিকিট করে সরাসরি কানাডায় আগমনকে বোঝায়| ভারতের বন্দর থেকে কানাডার দূরত্ব অনেক, পথে অনিবার্য যাত্রা বিরতি জাপানের বন্দরে, তো এভাবেই Continuous
journey regulation ভংগ হয়ে যায়| সাদা ইউরোপিয়ানদের ক্ষেত্রে তার প্রয়োগ না করে ভারতীয় বা অশ্বেতাঙ্গদের জন্যই বুঝি ওই ধারা| যাই হোক ২৩ মে ১৯১৪ সালে ভ্যাঙ্কুবার বন্দর পৌঁছায় এবং কানাডার নৌবাহিনীর পাহারায় ২৩ জুলাই ১৯১৪ তারিখে বন্দর ছাড়তে বাধ্য হয়| ওই জাহাজ কলকাতার বজবজ বন্দরে পৌঁছায় ২৭ সেপ্টে¤^র ১৯১৪| পৌঁছার পর পরই ইন্ডিয়ার ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী পুলিশ জাহাজের যাত্রীদের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে| যাত্রীদের মধ্যে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছিল তাদেরসহ যাত্রীদের গ্রেফতারই শুধু করে না, নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ২৬ জনকে খুন করে| ভারতীয়দের এই অপমানের কথা রবীন্দ্রনাথ ভুলে যাননি| The Daily Toronto Star-এর ওই প্রতিবেদন আরও জানায়, রবীন্দ্রনাথ এও জানিয়েছেন তিনি কখনোই কানাডা ভ্রমণে আসবেন না যেখানে ‘...on account of manner in
which his countrymen had been treated, and that he would not set foot on
Canadian or Australian soil while his countrymen were treated as they were.’ প্রতিবেদক রবীন্দ্রনাথের কোনো বক্তব্যের উদ্ধৃতি না দেখিয়েই মন্তব্য করেন, “Tagore had indicated that
he would never visit Canada...” (!), রবীন্দ্রনাথের এমন বক্তব্যের কোনো উদ্ধৃতি নেই, যদিও প্রতিবেদক অন্য ক্ষেত্রে প্রচুর উদ্ধৃতি দিয়েছেন|
অস্ট্রেলিয়ার ‘The Immigration Restriction
Act 1901’-এর ‘হোয়াইট অস্ট্রেলিয়া নীতি’ও অত্যন্ত বর্ণবিদ্বেষী আইন, যে আইনে ভারতীয় এবং অশ্বেতাঙ্গদের অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশের প্রতিবন্ধকতা ˆতরি করেছিল|আত্মমর্যাদাসম্পন্ন কবি কানাডা অস্ট্রেলিয়া জাপান যেতেই শুধু অসম্মত ছিলেন তা নয়, তিনি নিজের দেশের রাজনৈতিক নেতাদের সাম্রাজ্যবাদীদের তোষামোদ করতে দেখেও অত্যন্ত ব্যথিত হন| গান্ধী এবং তাঁর নেতৃত্বে কংগ্রেস অনুমোদিত বৃটিশ সাম্রাজ্যের অধীন পূর্ব ও মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ও আফ্রিকার মুক্তি আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদী উত্থানকে দমন করতে ভারতীয় ˆসন্যদের প্রেরণের ঘোর বিরোধিতা করেছেন| ভারতীয় সৈন্যদের সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থে বিদেশে দাসবৃত্তি করাকে ‘ঘোরতর অন্যায় ও পাপ কাজ’ মনে করেছেন| গান্ধীকে ২০টি চিঠি দিয়ে ভারতীয়দের না পাঠাতে অনুরোধ করেছিলেন| প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন এই চিঠিগুলো তিনি লিখিয়েছেন অ্যান্ডরুজকে দিয়ে| ‘শূদ্রধর্ম’ প্রবন্ধে (১৯২১) সাম্রাজ্যবাদীদের সেবায় ভারতীয়দের দাসবৃত্তির মানসিকতাকে তীব্র ধিক্কার জানিয়েছেন|
জাপান ভ্রমণের ইচ্ছা ও আমন্ত্রণ প্রথমে তিনি ত্যাগ ও প্রত্যাখ্যান করেছিলেন শুধু ১৯১৫ সনের চলমান আর্থিক সঙ্কটের জন্যই নয়, জাপানের আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী আচরণের জন্যও| প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপ যখন ব্যস্ত তখন জাপান পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ায় তার সাম্রাজ্য বিস্তারে নানাবিধ অন্যায় করে আসছিল| বিশেষ করে যখন চীনের সান্টুন প্রদেশে জার্মানির অধিকৃত অংশ ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে দখল করে নেয়| এবং চীনের ওপর ২১ দফা দাবি চাপিয়ে অন্যায় চাপ প্রয়োগ করতে থাকে| তিনি তখন শিল্পী রোটেস্টাইনকে লেখেন, ‘I was planning to go to
Japan, but the spirit of modern Japan repels me.’ কিন্তু পরের বছর, ১৯১৬ সালে তিনি আবার জাপানকে দেয়া তাঁর প্রতিশ্রুতি রক্ষার স্বার্থে জাপান যেতে সম্মত হলেও তখন অ্যান্ডরুজকে লেখেন (১২ জুলাই ১৯১৫) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি চিঠি| এই গদ্যে শুধু প্রাসঙ্গিক অংশটুকু দেখে নেয়া যায়| তিনি লিখেছেন, ‘I gave up Japan but Japan
is insistent... I feel I am bound by my promise. But I am almost sure that
Japan has eyes upon India. She is hungry – she is munching Corea (Korea). She has fastened her teeth upon China and it will be an
evil day for India when Japan will have her opportunity.” যাই হোক, আরও কিছু সঙ্কট এবং জাহাজে সিট পাওয়ার অসুবিধা কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত একটি ছোট মালবাহী জাহাজ তোসা-মারু (Tosa-Maru)তে টিকিট পেয়ে ১ মে তারিখে উঠলেও জাপানের পথে জাহাজ ছাড়ে ৩ মে ১৯১৬ তারিখে কলকাতা বন্দর থেকে|জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ‘নাইটহুড’ খেতাব ফিরিয়ে দেয়াসহ রবীন্দ্রনাথ দেশে দেশে সাম্রাজ্যবাদীদের অন্যায়, অমানবিক আচরণের প্রতিবাদ করেছেন আবার সেসব দেশে যেয়েও বক্তৃতা বিবৃতিতে মানবতার অবমাননার নিন্দা করেছেন, শান্তি ও মঙ্গল কামনা করেছেন| বিশ্বব্যাপী মুক্তিকামী মানুষদের মুক্তির সপক্ষে রবীন্দ্রনাথের বক্তৃতা, বিবৃতি, চিঠিপত্রসহ নানা প্রকাশনায় তা ছড়িয়ে আছে|যাই হোক, কানাডার আমন্ত্রণ প্রথমে প্রত্যাখ্যান, অনেক বছর পর আবার তেমন আমন্ত্রণ গ্রহণ করার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের মানবিক ভূমিকা এবং অগ্রাধিকার বুঝে নিতে সংক্ষিপ্ত ও প্রাসঙ্গিক এসব কিছু কথা রবীন্দ্র মানসের পরিচয় মাত্র| কানাডার বিশিষ্ট শিল্পী সমাজ এবং বিশেষ করে সেই ১৯২৮ সালে ভ্যাঙ্কুবারের শিল্প সংস্কৃতির পরিমণ্ডলে আলোকচিত্রী জন ভ্যান্ডারপেন্ট তখন অন্যতম নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি| এই শিল্পী সমাজের আগ্রহেই রবীন্দ্রনাথের মূলত কানাডায় আগমন হলেও তিনি শিক্ষা পরিষদের আয়োজনে শিক্ষাদর্শনের ওপর গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ, সাক্ষাৎকার দেন| কানাডার পথে দীর্ঘ যাত্রা শুরু হয় ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯২৯-এ কলকাতার বিপুল বিদায় অভিনন্দনের মধ্য দিয়ে| কলকাতা থেকে বোম্বে, সেখানে তিনি উঠবেন বোম্বে বন্দরে অপেক্ষমাণ ‘নালদারা’ জাহাজে| যাত্রাপথের বিভিন্ন বন্দর শহরে যাত্রাবিরতির সময় ওই শহরের মেয়র ও লেখক শিল্পী সুধী সমাজের আমন্ত্রণে রাত্রি যাপন শেষে আবার এসে জাহাজে চড়া| পূর্ব নির্ধারিত ও আমন্ত্রণকারী শহরগুলোতে সংবর্ধনা, ভাষণ, সাক্ষাৎ চলেছেই এবং ওই সব সভা থেকে অর্জিত সম্মানী হিসেবে পাওয়া অর্থ তিনি বোলপুর বিশ্বভারতী ও আশ্রমে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন| আশ্রম, বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক জটিলতাসহ কিছু শৃঙ্খলাজনিত সঙ্কটও ঘনীভূত হয়ে আসছিল| সেসব বিষয়ে তিনি জাহাজে বসেই একাধিক পত্র লেখেন নন্দলাল বসু, প্রতিমা দেবী, কবি অমিয় চক্রবর্তীসহ সংশ্লিষ্টজনদের| রবীন্দ্রনাথের যাত্রাসঙ্গী ছিলেন রেভারেন্ড অধ্যাপক বয়েড টাকার, কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, শিল্পী অধ্যাপক অপূর্বকুমার চন্দ— যিনি তখন রবীন্দ্রনাথের সচিবের দায়িত্ব পালন করছিলেন| কলকাতা থেকে ট্রেনে বোম্বে আসবার পথে রবীন্দ্রনাথ ভ্রাতুষ্পুত্র সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের করা মহাভারতের মূল আখ্যানভাগ স্কুলের জন্য পাঠ্যরূপ হিসেবে সম্পাদনা করেন| মূলত তিনি ওই আখ্যানকে আরও সংহত করে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ কাহিনি অংশটুকুর সংকলন সম্পাদন করেন| ‘কুরুপাণ্ডব’ নামে গ্রন্থটি ১৯৩১ সালে প্রকাশিত হয়|
কানাডার পথে বোম্বে থেকে ‘নালদারা’ জাহাজে অবতরণ করে খুশিই হলেন কারণ তাঁর জন্য ‘যুগল কেবিন’-এর ব্যবস্থা হয়েছিল| ওই কেবিনে বসেই তিনি শুরু করেন কানাডার বিভিন্ন সভার জন্য লেকচার লিখতে| দীর্ঘ যাত্রাপথে জাহাজের বিরতির প্রয়োজন হয়| ওই বিরতির কথা পূর্ব থেকেই ঘোষিত থাকে বলে বিভিন্ন বন্দর শহরের পূর্ব নির্ধারিত আতিথ্য গ্রহণ করেন| প্রথম স্বল্পকালীন বিরতি হয় কলম্বো ৪ মার্চ, তারপর পেনাঙ ৮ মার্চ অল্প সময়ের জন্য, এরপর নালদারা থামে সিঙ্গাপুর ১০ মার্চ| আকাশে ঘন মেঘ ঘনিয়ে এলেও স্থানীয় ভারত সমিতির নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা কবিকে প্রণাম জানাতে আসে| বিকেলে ‘নেমাজী’ সাহেব কবির সম্মানে এক ভোজসভার আয়োজন করেন প্রচুর ভারতীয়দের সঙ্গে নিয়ে| এরপর জাহাজ ১৫ মার্চ হংকং পৌঁছলে নেমাজী পরিবারের এক সদস্য ধনী ব্যবসায়ী কবি ও তার সহযাত্রীদের অতিথিরূপে গ্রহণ করলেন| মালয়ের গভর্নর স্যার সেসিল ক্লেমেন্টির সরকারি বাসভবনে ছিল মধ্যাহ্নভোজ| পরে, ‘হিন্দু-বণিক’ সভায় কবিকে সংবর্ধনা| কবি জাহাজ থেকে প্রতিমা দেবিকে লিখছেন, ‘আমাকে হঙকঙয়ের ভারতীয়রা একটা রুপোর বাক্সে ৮০০ টাকা উপহার দিয়েছে, বাক্সটা একদা তোমার ঘরেই পৌঁছাবে| যদিও টাকাটা বিশ্বভারতীর|’ সাংহাই বন্দরে পৌঁছল ১৯ মার্চ, তিন দিনের যাত্রাবিরতি শেষে জাপানের বন্দর মোজি (২২ মার্চ) হয়ে ২৪ মার্চ য়োকোহামা, পরে মোটরযোগে টোকিও| সাংহাই ইয়োকোহামা, টোকিও সর্বক্ষণ ব্যস্ত থাকেন সভাসমিতি আর সংবর্ধনায়| কবি ক্লান্ত ও দুর্বল বোধ করলেও আমন্ত্রণ গ্রহণ করতেই হচ্ছিল| টোকিও থেকে নির্মল কুমারী মহলানবিশকে লিখছেন,... ‘যেহেতু দুর্ভাগ্যক্রমে আমিও বিখ্যাত সেই জন্য আমাকে আমার বিখ্যাত সমান মাপের উপদ্রব সহ্য করতে হয়|’ জাপানিদের আন্তরিক অভিনন্দন অভ্যর্থনায় ভাষণ, লেকচার এবং সাক্ষাৎকারে দোভাষী ভদ্রলোক/ভদ্রমহিলা ইংরেজি ও জাপানি ভাষার মধ্যকার দূরত্ব ঘুচিয়ে কবিকে জাপানিদের আরও নিকটতম করে তুলেছিলেন| এরপর প্রবাসী ভারতীয়দের নিজ¯^ বহু আয়োজন ছিলই| সব শেষে ২৮ মার্চ ভারতীয়দের নিমন্ত্রণে মধ্যাহ্নভোজের পরে বেলা তিনটায় কানাডার উদ্দেশ্যে পুনরায় যাত্রা আরম্ভ করলেন ‘এমপ্রেস অব ইন্ডিয়া স্টিমার’ করে| দ্বীপ (ভ্যাঙ্কুবার আইল্যান্ড) ভিক্টোরিয়া শহরের নিকটবর্তী বন্দরে এসে জাহাজ ভিড়ল ৬ এপ্রিল| কানাডার অঙ্গরাজ্য বৃটিশ কলম্বিয়ার রাজধানী ভিক্টোরিয়া শহরে প্রধানত শিখ সম্প্রদায় কবিকে প্রথমবারের মতো কানাডার মাটিতে স্বাগত করল| কবির এই আগমন রেডিও এবং সংবাদপত্র (The Daily Times Victoria B. C. 6 April 1929) প্রচার হওয়ার পরপর কানাডা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নানা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সংস্থা থেকে ‘টেলিগ্রাফ ও কেবলে আমন্ত্রণের বন্যা আসিতে আরম্ভ করিল|’ অ্যান্ডরুজ আমেরিকা থেকে এসে কবির সঙ্গে মিলিত হলেন ভিক্টোরিয়ায়| ভিক্টোরিয়া পৌঁছার দিন সন্ধ্যায় শিক্ষা পরিষদের সভা; কানাডার বিভিন্ন রাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ব্রিটেন, জাপান প্রভৃতি দেশের প্রতিনিধিরাও ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন এবং তারা প্রত্যেকে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে মিলিত হন| কানাডার রাজধানী অটোয়া হতে গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিংডন সস্ত্রীক উপস্থিত হলেন| শিক্ষা পরিষদের সভায় রবীন্দ্রনাথ ভাষণ দিলেন, শিরোনাম— ‘The Philosophy of Leisure’ পশ্চিমের আদর্শ “Time is money” রবীন্দ্রনাথ বললেন, অবসর হলো ঐশ্বর্য— “Leisure is wealth” কবির ভাষণে বলেন, বহু শতাব্দির সাধনালব্ধ অবসরের ফলে মানুষ সভ্য হয়েছে| কবির ভাষণের ওপর নানা বিপরীতধর্মী আলোচনা হয়| পশ্চিমা জীবনধারার মধ্যে ˆবষয়িক প্রাপ্তি ও অতি ব্যস্ততায় মানবাত্মার যন্ত্রণা বৃদ্ধি, শান্তি বিঘ্নিত| বিশ্রাম অবসর মানুষকে ভাবতে বুঝতে সাহায্য করে| সময়ের কারণে কবিকে ভাষণ সংক্ষিপ্ত করায় হয়তো তার বক্তব্য সম্পূর্ণ বিকশিত রূপে সবার কাছে পৌঁছতে পারে না| ভিক্টোরিয়া সভার পরের দিন সকলে বড় শহর ভ্যাঙ্কুবার পৌঁছলেন, ৮ এপ্রিল শিক্ষাসভায় রবীন্দ্রনাথ ভাষণ দিলেন, বিষয়— ‘The Principles of Literature’| দীর্ঘ ভাষণে কবি সাহিত্যের ধর্ম দর্শন বিষয়ে পূর্ব পশ্চিমের তুলনার সঙ্গে সর্বজনীন আদর্শের কথাও বলেন, তিনি বক্তৃতা শেষে কানাডা সম্পর্কেও মন্তব্য করেন| সেই মন্তব্যে যদিও ভারতীয়দের অবমাননার ইতিহাস সরাসরি না তুলে বলেন, “...Canada is too young to fall a victim to the malady of disillusionment and scepticism, and she must believe in great ideals in the face of contradiction.”
দশ দিনের কানাডা ভ্রমণ শেষে ট্রেনযোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লস এঞ্জেলেস ১৮ এপ্রিল পৌঁছার পূর্বে কানাডার বিভিন্ন সংবাদপত্রের বহু সাংবাদিককে তিনি সাক্ষাৎকার দেন| এর মধ্যে খুব প্রাসঙ্গিক হলো ‘জুয়িস স্ট্যান্ডার্ড’ পত্রিকার সঙ্গের সাক্ষাৎকারটি| তিনি ইহুদিদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, “গভীরভাবে বিবেচনা করলে দেখা যায় যে, ইহুদি ও আরবরা এক পরিবার, হ্যাঁ, এক মহান পরিবারের সদস্য|... আরবরা তো আপনাদের অত্যন্ত কাছের মানুষ|... আরবদের তুলনায় তারা (পশ্চিমা দেশ) সত্যি সত্যি আপনাদের চেয়ে দূরবর্তী| আরবদের সঙ্গে আপনাদের অনেক মিল আছে| ওদের সঙ্গে তো কোনো বিষয়েই আপনাদের মিল নেই| এমনকি যন্ত্র সংস্কৃতির দেশ যে আমেরিকা, সেখানেও আপনারা একই সঙ্গে ইহুদি আমেরিকান হিসেবে বসবাস করতে পারেন| কিন্তু আপনারা একই সঙ্গে ইহুদি ও প্যালেস্টাইন হতে পারেন না কেন?’
লস এঞ্জেলেস বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সমক্ষে কবি একদিন ভাষণ দিলেন, কবির আমন্ত্রণ ছিল ডেট্রয়েট, কলোম্বিয়া, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও শহরে, লস এঞ্জেলেস হতে এইসব পূর্ব প্রান্তের শহরে যাওয়ার সময় বিপত্তি দেখা দিল, কবির পাসপোর্ট খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না| অধ্যাপক টাকার যিনি আমেরিকার অধিবাসী তিনি অ্যান্ডরুজসহ কবিকে নিয়ে গেলেন নতুন পাসপোর্টের জন্য পাসপোর্ট অফিসে| সেই অফিসে অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নানা রুটিন প্রশ্নের অহেতুক যন্ত্রণায় কবি বিরক্ত হন| কবি সম্পর্কে অজ্ঞ ইমিগ্রেশনের এইসব কেরানি প্রশ্ন করে— রবীন্দ্রনাথ পড়ালেখা জানেন কিনা, প্রয়োজনীয় টাকা আছে কিনা, টাকা না থাকলে কী শাস্তি হবে ইত্যাদি| প্রশ্নে কবি ধৈর্য হারিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাকি সব আমন্ত্রণ উপেক্ষা করেই ২০ এপ্রিল লস এঞ্জেলেস থেকে দেশের পথে যাত্রা শুরু করেন|

বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ মে ২০২৬
কানাডায় যেতে এবার সম্মত হলেন রবীন্দ্রনাথ, ব্রিটিশ কলম্বিয়া প্রদেশের বড় শহর ভ্যাঙ্কুবারে কানাডার ত্রিবার্ষিক জাতীয় শিক্ষাপরিষদ সম্মিলনে যেতে রাজি হলেন শুধু পরিষদের আমন্ত্রণেই নয়, রবীন্দ্রনাথ জেনেছিলেন যাদের আগ্রহাতিশয্যে এই আমান্ত্রণপত্র তৈরি হয়েছিল, তাদের মধ্যে প্রধানত রয়েছেন চিত্রশিল্পী এবং আলোকচিত্রীগণ| বিশেষ করে সেই ১৯২৮-এর সেপ্টেম্বরে ভ্যাঙ্কুবারের School of Decorative and
Applied Arts-এ বিশিষ্ট শিল্পী Fred Varley এবং Jock Macdonald শিক্ষাদানে নিয়োজিত ছিলেন| ছিলেন বিখ্যাত আলোকচিত্রী John Vanderpant, এছাড়াও শিল্পী Emily Carr তো ছিলেনই, ‘This was the group that
pushed for RabindranathÕs invitation to the
Triennial Conference.’ আলোকচিত্রী Vanderpant-এর স্টুডিওতে সংরক্ষণের জন্য রবীন্দ্রনাথের প্রোর্ট্রেট ছবিও তোলা হবে| রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মনে করছেন, ‘কানাডার এই শিক্ষা পরিষদ ও বিশ্বভারতীর শিক্ষাদর্শের মধ্যে একটা মিল খুঁজিয়া পাওয়া যায়; বোধ হয় সেই জন্য কানাডার জাতীয় শিক্ষা পরিষদ ভারতের শিক্ষাদর্শনের প্রতীকরূপে রবীন্দ্রনাথকে আহ্বান করিয়াছে|’
কানাডার ভাবনার খোঁজখবর, রবীন্দ্রনাথকে আমন্ত্রণের পিছনে সেরকম ভাবনা কাজ করেছে কিনা তা প্রমাণিত করার দলিল আমাদের হাতে নেই, প্রভাত বাবুর হাতেও ছিল না| কানাডার শিল্পীগ্রুপ ঐতিহাসিক ‘Group Seven’-এর Fred Varley, Emily Carr এবং ওই গ্রুপের ‘সহযোগী’ এবং Group Eleven-এর Jock Maccdonald-এর ভূমিকার কথা জানা যায় নির্ভরযোগ্য প্রকাশনার সূত্রে, খুব আলোচিত এবং রবীন্দ্রানুরাগীদের জন্য আগ্রহোদ্দীপক তথ্যসমৃদ্ধ গ্রন্থ ‘Rabindranath Tagore One
Hundred Years of Global Reception' গ্রন্থে কানাডার আমন্ত্রণ এবং একদা প্রত্যাখ্যানের নানা খবর ও তথ্য দিয়ে প্রমাণিত করে তুলেছে| দ্বিতীয় সূত্র মূলত এটাই প্রাথমিক সূত্র ‘The Daily Toronto Star’-এর একটি প্রতিবেদন— ‘Hindu Shuns Canada’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯১৬ সারের ২৭ সেপ্টেম্বর| প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী ১৯১৬ সালে কানাডার শিক্ষা পরিষদের আমন্ত্রণ রবীন্দ্রনাথ প্রত্যাখান করেছিলেন| রবীন্দ্রনাথের মতো মানবিক এবং আত্মমর্যাদাসম্পন্ন শিল্পী, কবির পক্ষে ওই প্রত্যাখ্যান ছিল উপযুক্ত জবাব| এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না ১৯১৬ সালে রবীন্দ্রনাথ বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেননি| করেন আরও ৪/৫ বছর পর| তো ওই পরিষদ ‘বিশ্বভারতীর শিক্ষাদর্শের’ নমুনা দেখার তখনো সুযোগ পায়নি! এই আমন্ত্রণ পাওয়ার তিন বছর আগে কানাডা আমেরিকাসহ এশিয়া আফ্রিকা অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের মধ্যে তিনিই প্রথম সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করে বিশ্বের অত্যন্ত পরিচিত এবং সম্মানিত একজন কবি|
কানাডায় আমন্ত্রণ পাওয়ার সময় কবি রবীন্দ্রনাথের মনে ছিল ১৯১৪ সালে ‘কামাগাটা মারু’ জাহাজে আসা ৩৭৬ জন ভারতীয়র করুণ অবমাননার কথা| জাপানের বাষ্পচালিত জাহাজ কামাগাটা মারুতে ছিল ৩৪০ জন শিখ, ২৪ জন মুসলমান এবং ১২ জন হিন্দু| কানাডার ইমিগ্রেশন অথরিটি ভ্যাঙ্কুবার বন্দরে তাদের নামতে দেয় না| ইন্ডিয়া তখন ব্রিটিশ শাসনের অন্তর্ভুক্ত হলেও কানাডা বর্ণদূষ্ট পক্ষপাতিত্বের কারণে ভারতীয়দের প্রত্যাখ্যান করে কানাডা ইমিগ্রেশন পলিসির (৮ জানুয়ারি ১৯০৮) একটি ধারা Continuous Journey-র দোহাই দিয়ে| এই ধারার প্রয়োগ সম্পূর্ণভাবেই সাদা কানাডিয়ানদের বর্ণবৈষম্যমূলক আচরণ| কারণ একই সময়ে ইউরোপ থেকে চার লক্ষের ওপর অভিবাসী কানাডার বন্দর দিয়ে প্রবেশ করে| ‘Continuous journey
regulation’-এর মূল কথা হলো নিজ জন্মভূমি বা নাগরিকতাপ্রাপ্ত দেশ থেকে টিকিট করে সরাসরি কানাডায় আগমনকে বোঝায়| ভারতের বন্দর থেকে কানাডার দূরত্ব অনেক, পথে অনিবার্য যাত্রা বিরতি জাপানের বন্দরে, তো এভাবেই Continuous
journey regulation ভংগ হয়ে যায়| সাদা ইউরোপিয়ানদের ক্ষেত্রে তার প্রয়োগ না করে ভারতীয় বা অশ্বেতাঙ্গদের জন্যই বুঝি ওই ধারা| যাই হোক ২৩ মে ১৯১৪ সালে ভ্যাঙ্কুবার বন্দর পৌঁছায় এবং কানাডার নৌবাহিনীর পাহারায় ২৩ জুলাই ১৯১৪ তারিখে বন্দর ছাড়তে বাধ্য হয়| ওই জাহাজ কলকাতার বজবজ বন্দরে পৌঁছায় ২৭ সেপ্টে¤^র ১৯১৪| পৌঁছার পর পরই ইন্ডিয়ার ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী পুলিশ জাহাজের যাত্রীদের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে| যাত্রীদের মধ্যে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছিল তাদেরসহ যাত্রীদের গ্রেফতারই শুধু করে না, নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ২৬ জনকে খুন করে| ভারতীয়দের এই অপমানের কথা রবীন্দ্রনাথ ভুলে যাননি| The Daily Toronto Star-এর ওই প্রতিবেদন আরও জানায়, রবীন্দ্রনাথ এও জানিয়েছেন তিনি কখনোই কানাডা ভ্রমণে আসবেন না যেখানে ‘...on account of manner in
which his countrymen had been treated, and that he would not set foot on
Canadian or Australian soil while his countrymen were treated as they were.’ প্রতিবেদক রবীন্দ্রনাথের কোনো বক্তব্যের উদ্ধৃতি না দেখিয়েই মন্তব্য করেন, “Tagore had indicated that
he would never visit Canada...” (!), রবীন্দ্রনাথের এমন বক্তব্যের কোনো উদ্ধৃতি নেই, যদিও প্রতিবেদক অন্য ক্ষেত্রে প্রচুর উদ্ধৃতি দিয়েছেন|
অস্ট্রেলিয়ার ‘The Immigration Restriction
Act 1901’-এর ‘হোয়াইট অস্ট্রেলিয়া নীতি’ও অত্যন্ত বর্ণবিদ্বেষী আইন, যে আইনে ভারতীয় এবং অশ্বেতাঙ্গদের অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশের প্রতিবন্ধকতা ˆতরি করেছিল|আত্মমর্যাদাসম্পন্ন কবি কানাডা অস্ট্রেলিয়া জাপান যেতেই শুধু অসম্মত ছিলেন তা নয়, তিনি নিজের দেশের রাজনৈতিক নেতাদের সাম্রাজ্যবাদীদের তোষামোদ করতে দেখেও অত্যন্ত ব্যথিত হন| গান্ধী এবং তাঁর নেতৃত্বে কংগ্রেস অনুমোদিত বৃটিশ সাম্রাজ্যের অধীন পূর্ব ও মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ও আফ্রিকার মুক্তি আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদী উত্থানকে দমন করতে ভারতীয় ˆসন্যদের প্রেরণের ঘোর বিরোধিতা করেছেন| ভারতীয় সৈন্যদের সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থে বিদেশে দাসবৃত্তি করাকে ‘ঘোরতর অন্যায় ও পাপ কাজ’ মনে করেছেন| গান্ধীকে ২০টি চিঠি দিয়ে ভারতীয়দের না পাঠাতে অনুরোধ করেছিলেন| প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন এই চিঠিগুলো তিনি লিখিয়েছেন অ্যান্ডরুজকে দিয়ে| ‘শূদ্রধর্ম’ প্রবন্ধে (১৯২১) সাম্রাজ্যবাদীদের সেবায় ভারতীয়দের দাসবৃত্তির মানসিকতাকে তীব্র ধিক্কার জানিয়েছেন|
জাপান ভ্রমণের ইচ্ছা ও আমন্ত্রণ প্রথমে তিনি ত্যাগ ও প্রত্যাখ্যান করেছিলেন শুধু ১৯১৫ সনের চলমান আর্থিক সঙ্কটের জন্যই নয়, জাপানের আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী আচরণের জন্যও| প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপ যখন ব্যস্ত তখন জাপান পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ায় তার সাম্রাজ্য বিস্তারে নানাবিধ অন্যায় করে আসছিল| বিশেষ করে যখন চীনের সান্টুন প্রদেশে জার্মানির অধিকৃত অংশ ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে দখল করে নেয়| এবং চীনের ওপর ২১ দফা দাবি চাপিয়ে অন্যায় চাপ প্রয়োগ করতে থাকে| তিনি তখন শিল্পী রোটেস্টাইনকে লেখেন, ‘I was planning to go to
Japan, but the spirit of modern Japan repels me.’ কিন্তু পরের বছর, ১৯১৬ সালে তিনি আবার জাপানকে দেয়া তাঁর প্রতিশ্রুতি রক্ষার স্বার্থে জাপান যেতে সম্মত হলেও তখন অ্যান্ডরুজকে লেখেন (১২ জুলাই ১৯১৫) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি চিঠি| এই গদ্যে শুধু প্রাসঙ্গিক অংশটুকু দেখে নেয়া যায়| তিনি লিখেছেন, ‘I gave up Japan but Japan
is insistent... I feel I am bound by my promise. But I am almost sure that
Japan has eyes upon India. She is hungry – she is munching Corea (Korea). She has fastened her teeth upon China and it will be an
evil day for India when Japan will have her opportunity.” যাই হোক, আরও কিছু সঙ্কট এবং জাহাজে সিট পাওয়ার অসুবিধা কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত একটি ছোট মালবাহী জাহাজ তোসা-মারু (Tosa-Maru)তে টিকিট পেয়ে ১ মে তারিখে উঠলেও জাপানের পথে জাহাজ ছাড়ে ৩ মে ১৯১৬ তারিখে কলকাতা বন্দর থেকে|জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ‘নাইটহুড’ খেতাব ফিরিয়ে দেয়াসহ রবীন্দ্রনাথ দেশে দেশে সাম্রাজ্যবাদীদের অন্যায়, অমানবিক আচরণের প্রতিবাদ করেছেন আবার সেসব দেশে যেয়েও বক্তৃতা বিবৃতিতে মানবতার অবমাননার নিন্দা করেছেন, শান্তি ও মঙ্গল কামনা করেছেন| বিশ্বব্যাপী মুক্তিকামী মানুষদের মুক্তির সপক্ষে রবীন্দ্রনাথের বক্তৃতা, বিবৃতি, চিঠিপত্রসহ নানা প্রকাশনায় তা ছড়িয়ে আছে|যাই হোক, কানাডার আমন্ত্রণ প্রথমে প্রত্যাখ্যান, অনেক বছর পর আবার তেমন আমন্ত্রণ গ্রহণ করার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের মানবিক ভূমিকা এবং অগ্রাধিকার বুঝে নিতে সংক্ষিপ্ত ও প্রাসঙ্গিক এসব কিছু কথা রবীন্দ্র মানসের পরিচয় মাত্র| কানাডার বিশিষ্ট শিল্পী সমাজ এবং বিশেষ করে সেই ১৯২৮ সালে ভ্যাঙ্কুবারের শিল্প সংস্কৃতির পরিমণ্ডলে আলোকচিত্রী জন ভ্যান্ডারপেন্ট তখন অন্যতম নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি| এই শিল্পী সমাজের আগ্রহেই রবীন্দ্রনাথের মূলত কানাডায় আগমন হলেও তিনি শিক্ষা পরিষদের আয়োজনে শিক্ষাদর্শনের ওপর গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ, সাক্ষাৎকার দেন| কানাডার পথে দীর্ঘ যাত্রা শুরু হয় ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯২৯-এ কলকাতার বিপুল বিদায় অভিনন্দনের মধ্য দিয়ে| কলকাতা থেকে বোম্বে, সেখানে তিনি উঠবেন বোম্বে বন্দরে অপেক্ষমাণ ‘নালদারা’ জাহাজে| যাত্রাপথের বিভিন্ন বন্দর শহরে যাত্রাবিরতির সময় ওই শহরের মেয়র ও লেখক শিল্পী সুধী সমাজের আমন্ত্রণে রাত্রি যাপন শেষে আবার এসে জাহাজে চড়া| পূর্ব নির্ধারিত ও আমন্ত্রণকারী শহরগুলোতে সংবর্ধনা, ভাষণ, সাক্ষাৎ চলেছেই এবং ওই সব সভা থেকে অর্জিত সম্মানী হিসেবে পাওয়া অর্থ তিনি বোলপুর বিশ্বভারতী ও আশ্রমে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন| আশ্রম, বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক জটিলতাসহ কিছু শৃঙ্খলাজনিত সঙ্কটও ঘনীভূত হয়ে আসছিল| সেসব বিষয়ে তিনি জাহাজে বসেই একাধিক পত্র লেখেন নন্দলাল বসু, প্রতিমা দেবী, কবি অমিয় চক্রবর্তীসহ সংশ্লিষ্টজনদের| রবীন্দ্রনাথের যাত্রাসঙ্গী ছিলেন রেভারেন্ড অধ্যাপক বয়েড টাকার, কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, শিল্পী অধ্যাপক অপূর্বকুমার চন্দ— যিনি তখন রবীন্দ্রনাথের সচিবের দায়িত্ব পালন করছিলেন| কলকাতা থেকে ট্রেনে বোম্বে আসবার পথে রবীন্দ্রনাথ ভ্রাতুষ্পুত্র সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের করা মহাভারতের মূল আখ্যানভাগ স্কুলের জন্য পাঠ্যরূপ হিসেবে সম্পাদনা করেন| মূলত তিনি ওই আখ্যানকে আরও সংহত করে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ কাহিনি অংশটুকুর সংকলন সম্পাদন করেন| ‘কুরুপাণ্ডব’ নামে গ্রন্থটি ১৯৩১ সালে প্রকাশিত হয়|
কানাডার পথে বোম্বে থেকে ‘নালদারা’ জাহাজে অবতরণ করে খুশিই হলেন কারণ তাঁর জন্য ‘যুগল কেবিন’-এর ব্যবস্থা হয়েছিল| ওই কেবিনে বসেই তিনি শুরু করেন কানাডার বিভিন্ন সভার জন্য লেকচার লিখতে| দীর্ঘ যাত্রাপথে জাহাজের বিরতির প্রয়োজন হয়| ওই বিরতির কথা পূর্ব থেকেই ঘোষিত থাকে বলে বিভিন্ন বন্দর শহরের পূর্ব নির্ধারিত আতিথ্য গ্রহণ করেন| প্রথম স্বল্পকালীন বিরতি হয় কলম্বো ৪ মার্চ, তারপর পেনাঙ ৮ মার্চ অল্প সময়ের জন্য, এরপর নালদারা থামে সিঙ্গাপুর ১০ মার্চ| আকাশে ঘন মেঘ ঘনিয়ে এলেও স্থানীয় ভারত সমিতির নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা কবিকে প্রণাম জানাতে আসে| বিকেলে ‘নেমাজী’ সাহেব কবির সম্মানে এক ভোজসভার আয়োজন করেন প্রচুর ভারতীয়দের সঙ্গে নিয়ে| এরপর জাহাজ ১৫ মার্চ হংকং পৌঁছলে নেমাজী পরিবারের এক সদস্য ধনী ব্যবসায়ী কবি ও তার সহযাত্রীদের অতিথিরূপে গ্রহণ করলেন| মালয়ের গভর্নর স্যার সেসিল ক্লেমেন্টির সরকারি বাসভবনে ছিল মধ্যাহ্নভোজ| পরে, ‘হিন্দু-বণিক’ সভায় কবিকে সংবর্ধনা| কবি জাহাজ থেকে প্রতিমা দেবিকে লিখছেন, ‘আমাকে হঙকঙয়ের ভারতীয়রা একটা রুপোর বাক্সে ৮০০ টাকা উপহার দিয়েছে, বাক্সটা একদা তোমার ঘরেই পৌঁছাবে| যদিও টাকাটা বিশ্বভারতীর|’ সাংহাই বন্দরে পৌঁছল ১৯ মার্চ, তিন দিনের যাত্রাবিরতি শেষে জাপানের বন্দর মোজি (২২ মার্চ) হয়ে ২৪ মার্চ য়োকোহামা, পরে মোটরযোগে টোকিও| সাংহাই ইয়োকোহামা, টোকিও সর্বক্ষণ ব্যস্ত থাকেন সভাসমিতি আর সংবর্ধনায়| কবি ক্লান্ত ও দুর্বল বোধ করলেও আমন্ত্রণ গ্রহণ করতেই হচ্ছিল| টোকিও থেকে নির্মল কুমারী মহলানবিশকে লিখছেন,... ‘যেহেতু দুর্ভাগ্যক্রমে আমিও বিখ্যাত সেই জন্য আমাকে আমার বিখ্যাত সমান মাপের উপদ্রব সহ্য করতে হয়|’ জাপানিদের আন্তরিক অভিনন্দন অভ্যর্থনায় ভাষণ, লেকচার এবং সাক্ষাৎকারে দোভাষী ভদ্রলোক/ভদ্রমহিলা ইংরেজি ও জাপানি ভাষার মধ্যকার দূরত্ব ঘুচিয়ে কবিকে জাপানিদের আরও নিকটতম করে তুলেছিলেন| এরপর প্রবাসী ভারতীয়দের নিজ¯^ বহু আয়োজন ছিলই| সব শেষে ২৮ মার্চ ভারতীয়দের নিমন্ত্রণে মধ্যাহ্নভোজের পরে বেলা তিনটায় কানাডার উদ্দেশ্যে পুনরায় যাত্রা আরম্ভ করলেন ‘এমপ্রেস অব ইন্ডিয়া স্টিমার’ করে| দ্বীপ (ভ্যাঙ্কুবার আইল্যান্ড) ভিক্টোরিয়া শহরের নিকটবর্তী বন্দরে এসে জাহাজ ভিড়ল ৬ এপ্রিল| কানাডার অঙ্গরাজ্য বৃটিশ কলম্বিয়ার রাজধানী ভিক্টোরিয়া শহরে প্রধানত শিখ সম্প্রদায় কবিকে প্রথমবারের মতো কানাডার মাটিতে স্বাগত করল| কবির এই আগমন রেডিও এবং সংবাদপত্র (The Daily Times Victoria B. C. 6 April 1929) প্রচার হওয়ার পরপর কানাডা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নানা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সংস্থা থেকে ‘টেলিগ্রাফ ও কেবলে আমন্ত্রণের বন্যা আসিতে আরম্ভ করিল|’ অ্যান্ডরুজ আমেরিকা থেকে এসে কবির সঙ্গে মিলিত হলেন ভিক্টোরিয়ায়| ভিক্টোরিয়া পৌঁছার দিন সন্ধ্যায় শিক্ষা পরিষদের সভা; কানাডার বিভিন্ন রাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ব্রিটেন, জাপান প্রভৃতি দেশের প্রতিনিধিরাও ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন এবং তারা প্রত্যেকে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে মিলিত হন| কানাডার রাজধানী অটোয়া হতে গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিংডন সস্ত্রীক উপস্থিত হলেন| শিক্ষা পরিষদের সভায় রবীন্দ্রনাথ ভাষণ দিলেন, শিরোনাম— ‘The Philosophy of Leisure’ পশ্চিমের আদর্শ “Time is money” রবীন্দ্রনাথ বললেন, অবসর হলো ঐশ্বর্য— “Leisure is wealth” কবির ভাষণে বলেন, বহু শতাব্দির সাধনালব্ধ অবসরের ফলে মানুষ সভ্য হয়েছে| কবির ভাষণের ওপর নানা বিপরীতধর্মী আলোচনা হয়| পশ্চিমা জীবনধারার মধ্যে ˆবষয়িক প্রাপ্তি ও অতি ব্যস্ততায় মানবাত্মার যন্ত্রণা বৃদ্ধি, শান্তি বিঘ্নিত| বিশ্রাম অবসর মানুষকে ভাবতে বুঝতে সাহায্য করে| সময়ের কারণে কবিকে ভাষণ সংক্ষিপ্ত করায় হয়তো তার বক্তব্য সম্পূর্ণ বিকশিত রূপে সবার কাছে পৌঁছতে পারে না| ভিক্টোরিয়া সভার পরের দিন সকলে বড় শহর ভ্যাঙ্কুবার পৌঁছলেন, ৮ এপ্রিল শিক্ষাসভায় রবীন্দ্রনাথ ভাষণ দিলেন, বিষয়— ‘The Principles of Literature’| দীর্ঘ ভাষণে কবি সাহিত্যের ধর্ম দর্শন বিষয়ে পূর্ব পশ্চিমের তুলনার সঙ্গে সর্বজনীন আদর্শের কথাও বলেন, তিনি বক্তৃতা শেষে কানাডা সম্পর্কেও মন্তব্য করেন| সেই মন্তব্যে যদিও ভারতীয়দের অবমাননার ইতিহাস সরাসরি না তুলে বলেন, “...Canada is too young to fall a victim to the malady of disillusionment and scepticism, and she must believe in great ideals in the face of contradiction.”
দশ দিনের কানাডা ভ্রমণ শেষে ট্রেনযোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লস এঞ্জেলেস ১৮ এপ্রিল পৌঁছার পূর্বে কানাডার বিভিন্ন সংবাদপত্রের বহু সাংবাদিককে তিনি সাক্ষাৎকার দেন| এর মধ্যে খুব প্রাসঙ্গিক হলো ‘জুয়িস স্ট্যান্ডার্ড’ পত্রিকার সঙ্গের সাক্ষাৎকারটি| তিনি ইহুদিদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, “গভীরভাবে বিবেচনা করলে দেখা যায় যে, ইহুদি ও আরবরা এক পরিবার, হ্যাঁ, এক মহান পরিবারের সদস্য|... আরবরা তো আপনাদের অত্যন্ত কাছের মানুষ|... আরবদের তুলনায় তারা (পশ্চিমা দেশ) সত্যি সত্যি আপনাদের চেয়ে দূরবর্তী| আরবদের সঙ্গে আপনাদের অনেক মিল আছে| ওদের সঙ্গে তো কোনো বিষয়েই আপনাদের মিল নেই| এমনকি যন্ত্র সংস্কৃতির দেশ যে আমেরিকা, সেখানেও আপনারা একই সঙ্গে ইহুদি আমেরিকান হিসেবে বসবাস করতে পারেন| কিন্তু আপনারা একই সঙ্গে ইহুদি ও প্যালেস্টাইন হতে পারেন না কেন?’
লস এঞ্জেলেস বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সমক্ষে কবি একদিন ভাষণ দিলেন, কবির আমন্ত্রণ ছিল ডেট্রয়েট, কলোম্বিয়া, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও শহরে, লস এঞ্জেলেস হতে এইসব পূর্ব প্রান্তের শহরে যাওয়ার সময় বিপত্তি দেখা দিল, কবির পাসপোর্ট খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না| অধ্যাপক টাকার যিনি আমেরিকার অধিবাসী তিনি অ্যান্ডরুজসহ কবিকে নিয়ে গেলেন নতুন পাসপোর্টের জন্য পাসপোর্ট অফিসে| সেই অফিসে অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নানা রুটিন প্রশ্নের অহেতুক যন্ত্রণায় কবি বিরক্ত হন| কবি সম্পর্কে অজ্ঞ ইমিগ্রেশনের এইসব কেরানি প্রশ্ন করে— রবীন্দ্রনাথ পড়ালেখা জানেন কিনা, প্রয়োজনীয় টাকা আছে কিনা, টাকা না থাকলে কী শাস্তি হবে ইত্যাদি| প্রশ্নে কবি ধৈর্য হারিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাকি সব আমন্ত্রণ উপেক্ষা করেই ২০ এপ্রিল লস এঞ্জেলেস থেকে দেশের পথে যাত্রা শুরু করেন|

আপনার মতামত লিখুন