সংবাদ

প্রবন্ধ / পঁচিশে বৈশাখ রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী স্মরণে--

রবীন্দ্রনাথের গান ও তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী


হোসেন আবদুল মান্নান
হোসেন আবদুল মান্নান
প্রকাশ: ৭ মে ২০২৬, ১২:৩৯ এএম

রবীন্দ্রনাথের গান ও তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী
রবীন্দ্রনাথের আঁকা চিত্রকর্ম

বাঙালি সংগীতপ্রিয় জাতি| যুগ-যুগান্তর ধরে সংগীত পিপাসু অগণিত মানুষের জন্ম হয়েছে এ বাংলায়| হাজার বছরের ঐতিহ্যে লালিত এই মাটির সোঁদাগন্ধে মিশে আছে সুরের অমৃতধারা| বাঙালির রক্তে, ধমনিতে যেনো নিরন্তর প্রবহমান এক ঐশ্বরিক সুরলহরী

ও সুরের মূর্ছনা| এদেশেই ফকির সিরাজ সাঁইয়ের শিষ্য কিংবদন্তি লালন ফকির থেকে হালের শাহ আবদুল করিম পর্যন্ত শত সহস্র স্বভাবকবি ও কালজয়ী গীতিকবির জন্ম হয়েছে| যাঁদের সৃষ্টি গান, বাণী ও সুর আবহমান বাংলা এবং বাঙালির উদাস হৃদয়কে দোলায়িত করে| তাঁদের প্রতিভার সম্মোহনী শক্তিতে মুগ্ধ করে, আন্দোলিত করে তোলে মানব জনমকে|

তবু একথা বললে মোটেও অত্যুক্তি হবে না যে, বাংলা ভাষায় এমন অভূতপূর্ব কথা, সুর ও স্বরলিপির সংমিশ্রণ প্রথমে ঘটাতে সক্ষম হন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর| রবীন্দ্রনাথের আগে বাংলার কোনো গীতিকবি এত শুদ্ধ, পরিশীলিত রূপচিত্রে ভাষার গভীরতার বিবেচনায় তথা সুরে, তালে, লয়ে বাণীকে এমন অনবদ্য হৃদয়গ্রাহী  ছন্দের ইন্দ্রজালে বেঁধে পরিবেশন করতে পারেনি| এটা বোঝার জন্যে বড় বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার পড়ে না| কেবল নিবিড় অভিনিবেশ নিয়ে তাঁর গানকে শ্রবণ করলেই তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে| তাঁর গান বাঙালি শ্রোতাকে যেমন মন্ত্রমুগ্ধ করে, আপ্লূত করে, হৃদয়ের একূল-ওকূল ভাসিয়ে নেয় আবার একই সাথে ভাবিত করে, তাড়িত এবং প্রাণিত করে| মনে হয়, তাঁর গানকে আশ্রয় করেই বাঙালি বেঁচে আছে, বেঁচে থাকবে অনন্তকাল| কারণ ঋষি, দার্শনিক এবং মহামানব রবীন্দ্রনাথকে একসঙ্গে পাওয়া যায় কেবল তাঁর গানেই, অন্যত্রে নয়| এ জন্যই বোধকরি, বিখ্যাত বাঙালি সংগীত শিল্পী কবির সুমন রবীন্দ্রনাথকে ‘বাংলা গানের ঈশ্বর’ বলেছেন|

দুই

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবি| তিনি কবিগুরু নামেই খ্যাত| তাঁর শত-শত কবিতা প্রয়াণের ৮৫ বছর পর আজো সমান জনপ্রিয়| দেশের শিক্ষিত বাঙালি ঘরে ঘরে সংরক্ষণ করছেন তাঁর ‘সঞ্চয়িতা’ ও তাঁর ‘গীতবিতান’| আধুনিক বা উত্তর-আধুনিক সবকিছু ছাপিয়ে বাঙালির কণ্ঠসুধায় ভাস্বর হয়ে আছে তাঁর সময়োত্তীর্ণ কাব্য- সম্ভার| যেমনি ছন্দে তেমনি গদ্যে, তিনিই আধুনিক, একা এবং  একজন| তাঁর ধারেকাছেও নেই কেউ| এর জন্যে একটি বিষয় বিস্ময়করভাবে লক্ষণীয় যে, আজকের তরুণ তরুণীরাও তাদের কণ্ঠশীলনে ও আবৃত্তির তালিকার জন্যে সর্বাধিক নির্বাচন করছে রবীন্দ্র কাব্য থেকে| আজো তাঁকে অতিক্রম করে যেতে পারছে না অন্যরা| একই সাথে নানা ভাষাভাষি নতুন প্রজন্মও রিমিক্স করে কণ্ঠে তুলে নিচ্ছে রবীন্দ্রনাথের প্রাণ-হরা ও কালজয়ী বাণীপ্রধান গানকে| তারা আনন্দ খুঁজে পাচ্ছে সুরে ও তালে, যা তাঁর নিজেরই সৃষ্টি| আজকে ভাষান্তর করে, অনুবাদ করে বিশ্বব্যাপী রবীন্দ্রনাথের গান গাওয়া হচ্ছে| এ গান কালের অতলে বিলীন হচ্ছে না বরং সময়ের স্রোতে এর ধারা প্রবহমান থাকছে| সেদিক থেকে বললে তাঁর সেরা রচনা ‘গীতাঞ্জলি’ নির্বাচিত গানেরই সমষ্টি| তাঁর গানের অসাধারণ বাণীর অনুবাদও হয়ে উঠেছে মানুষের মৌলিক চিন্তার আধার| বলা হয় যে, “যদি তোর ডাক শুনে কেউ / না আসে— তবে একলা চলরে”

গানটি বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় গুজরাটি ভাষায় যেদিন মহাত্মা গান্ধীকে শোনানো হয়েছিল সেই থেকে রবীন্দ্রনাথ তাঁর গুরুদেব হয়ে যান| এই একটা গানের ভেতরই গান্ধী তাঁর চিরকালীন রণনীতিকে খুঁজে পেয়েছিলেন|

তিন.

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৯০ থেকে ১৯০৫ সালের মধ্যে প্রায় অর্ধশতাধিক দেশাত্মবোধক গান রচনা করেছিলেন| আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, সে সময়কার তিনটা গানই পৃথক তিনটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে| ভারত, বাংলাদেশ এবং শ্রীলঙ্কা তাদের জাতীয় সংগীত করেছে| পৃথিবীর আর কোনো কবি বা গীতি কবির এমন সৌভাগ্য কেউ দেখেনি| তাঁর কবিতা, গান, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস, নাটক, চিঠিপত্র এমন বিপুলসংখ্যক সৃষ্টির অমরত্ব নিয়ে তিনি কখনো কখনো সংশয় প্রকাশ করেছেন| বলেছেন, “আমার কীর্তিরে আমি করি না বিশ্বাস/জানি, কালসিন্ধু তারে/নিয়ত তরঙ্গাঘাতে /দিনে দিনে/ দিবে লুপ্ত করি|”

রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে গবেষণা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা অব্যাহত রয়েছে| গায়কী নিয়ে রয়েছে মতদ্বৈধতা এবং মতভেদ| কালক্রমে গানে কিছু পরিবর্তনও এসেছে| আদি ধারার মধ্যে শ্রুতিমধুর মেলোডি ধরে রাখার প্রয়াস রয়েছে| রবীন্দ্রনাথ তাঁর সংগীত চিন্তাতে এক জায়গায় বলেছেন, “আমি বলি নি যে, আমি যা ভেবে অমুক সুর দিয়েছি, তোমাকে গাইবার সময়ে সেইভাবেই হতে হবে”— সুরকারের সুর বজায় রেখেও এক্সপ্রেশনে কমবেশি  স্বাধীনতা  চাইবার এখতিয়ার গায়কের আছে| তাঁর গানের সংখ্যা নিয়েও কিঞ্চিৎ  মতপার্থক্য আছে| কোথাও বলা হয়েছে ১৯৫০টি আবার কোথাও ১৮০০টি বা তার অধিক| বলা হয়, সেই ১৬ বছর বয়সে শুরু করেছিলেন ‘গহন কুসুম কুঞ্জ মাঝে’ দিয়ে আর শেষ হয় ৮০ বছর বয়সে ‘তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি/ বিচিত্র ছলনাজালে/হে ছলনাময়ী’| একটানা ৬০ বছরের বেশি সময় ধরে চলেছিল তাঁর সৃষ্টিকর্ম| দিনে দিনে বিশাল বিস্তৃত ভাণ্ডার গড়ে তুলেছিলেন তিনি| তাঁর এমন ধারাবাহিক ও নিরবচ্ছিন্ন সৃজনশীলতায় জীবনের সকল স্তরেই তিনি যেমন কবিতা রচনা করেছেন তেমনি গান ও স্বরলিপি রচনা করে গেছেন|

চার.

রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে বাঙালির আবেগ, উচ্ছ্বাস আর আনন্দের সীমা নাই| এ গান কেউ শোনে নেশার মতন, কেউ ধারণ করে, আত্মস্থ করে উপাসনার মতন করে| গল্পে, আড্ডায়, অনুষ্ঠানে, পার্বণে, সুরুচিশীলনে, বিদায়ে, আগমনে, শুরুতে বা শেষে তাঁর গান বেজে ওঠে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক এবং আভিজাত্যের প্রতিধ্বনি হয়ে| এই গান মানুষের মরমের গহীনে স্পর্শ করে যায়, নিমিষে ক্লান্তিহীন শ্রান্তিহীন করে দেয়| তাঁর গানের ভেতর দিয়ে জীবনের বোধের অতলান্তে প্রবেশ করা যায় অনায়াসে ও অবলীলায়| কারও কারও কাছে জীবন সঞ্জীবনী টনিকের মতো কাজ করে চলেছে তাঁর সৃষ্ট সেই চিরন্তন বাণী|

পাঁচ.

বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ প্রতিমুহূর্তে জীবন্ত| আর এটা মূলত তাঁর কবিতা ও গানের ভেতর দিয়ে|  নিজের গান নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দারুণ আত্মবিশ্বাস ও অহঙ্কার ছিল| তিনি বলেছিলেন, “জীবনের ৮০ বছর অবধি চাষ করেছি অনেক| সব ফসলই যে মরাইতে জমা হবে, তা বলতে পারিনে| কিছু ইঁদুরে খাবে, তবু বাকি থাকবে কিছু| জোর করে বলা যায় না| যুগ বদলায়, কাল বদলায় তার সঙ্গে সবকিছুই বদলায়| তবে সবচেয়ে স্থায়ী হবে আমার গান, এটা জোর করে বলতে পারি| বিশেষ করে বাঙালিরা শোকে, দুঃখে, আনন্দে আমার গান না গেয়ে তাদের উপায় নেই| যুগে যুগে এ গান তাদের গাইতেই হবে|”

কী অব্যর্থ ভবিষ্যৎ বাণী! কী অসাধারণ ত্রিকালদ্রষ্টা ও যুগদর্শী ছিলেন তিনি|

পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট গবেষক ও অধ্যাপক প্রয়াত সুধীর চক্রবর্তী বলেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথ বাংলা গানের সর্বনাশ ও সর্বস্ব| তাঁর বই ‘গানের লীলার সেই কিনারে’| অর্থাৎ বাংলা গানের বাণী ও সুর সৃষ্টিতে তাঁকে অতিক্রম করা প্রায় অসম্ভব|

বাংলাদেশের বিশিষ্ট লেখক ও অধ্যাপক হায়াৎ মামুদ বলেছেন, ‘প্রকৃত পক্ষে বাঙালির কাছে রবীন্দ্রনাথ সর্বব্যাপী ও সর্বগ্রাসী| তাঁকে বাদ দিয়ে বাঙালির গর্ব করার বিশেষ কিছু আর থাকে না|’

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬


রবীন্দ্রনাথের গান ও তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী

প্রকাশের তারিখ : ০৭ মে ২০২৬

featured Image

বাঙালি সংগীতপ্রিয় জাতি| যুগ-যুগান্তর ধরে সংগীত পিপাসু অগণিত মানুষের জন্ম হয়েছে এ বাংলায়| হাজার বছরের ঐতিহ্যে লালিত এই মাটির সোঁদাগন্ধে মিশে আছে সুরের অমৃতধারা| বাঙালির রক্তে, ধমনিতে যেনো নিরন্তর প্রবহমান এক ঐশ্বরিক সুরলহরী

ও সুরের মূর্ছনা| এদেশেই ফকির সিরাজ সাঁইয়ের শিষ্য কিংবদন্তি লালন ফকির থেকে হালের শাহ আবদুল করিম পর্যন্ত শত সহস্র স্বভাবকবি ও কালজয়ী গীতিকবির জন্ম হয়েছে| যাঁদের সৃষ্টি গান, বাণী ও সুর আবহমান বাংলা এবং বাঙালির উদাস হৃদয়কে দোলায়িত করে| তাঁদের প্রতিভার সম্মোহনী শক্তিতে মুগ্ধ করে, আন্দোলিত করে তোলে মানব জনমকে|

তবু একথা বললে মোটেও অত্যুক্তি হবে না যে, বাংলা ভাষায় এমন অভূতপূর্ব কথা, সুর ও স্বরলিপির সংমিশ্রণ প্রথমে ঘটাতে সক্ষম হন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর| রবীন্দ্রনাথের আগে বাংলার কোনো গীতিকবি এত শুদ্ধ, পরিশীলিত রূপচিত্রে ভাষার গভীরতার বিবেচনায় তথা সুরে, তালে, লয়ে বাণীকে এমন অনবদ্য হৃদয়গ্রাহী  ছন্দের ইন্দ্রজালে বেঁধে পরিবেশন করতে পারেনি| এটা বোঝার জন্যে বড় বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার পড়ে না| কেবল নিবিড় অভিনিবেশ নিয়ে তাঁর গানকে শ্রবণ করলেই তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে| তাঁর গান বাঙালি শ্রোতাকে যেমন মন্ত্রমুগ্ধ করে, আপ্লূত করে, হৃদয়ের একূল-ওকূল ভাসিয়ে নেয় আবার একই সাথে ভাবিত করে, তাড়িত এবং প্রাণিত করে| মনে হয়, তাঁর গানকে আশ্রয় করেই বাঙালি বেঁচে আছে, বেঁচে থাকবে অনন্তকাল| কারণ ঋষি, দার্শনিক এবং মহামানব রবীন্দ্রনাথকে একসঙ্গে পাওয়া যায় কেবল তাঁর গানেই, অন্যত্রে নয়| এ জন্যই বোধকরি, বিখ্যাত বাঙালি সংগীত শিল্পী কবির সুমন রবীন্দ্রনাথকে ‘বাংলা গানের ঈশ্বর’ বলেছেন|

দুই

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবি| তিনি কবিগুরু নামেই খ্যাত| তাঁর শত-শত কবিতা প্রয়াণের ৮৫ বছর পর আজো সমান জনপ্রিয়| দেশের শিক্ষিত বাঙালি ঘরে ঘরে সংরক্ষণ করছেন তাঁর ‘সঞ্চয়িতা’ ও তাঁর ‘গীতবিতান’| আধুনিক বা উত্তর-আধুনিক সবকিছু ছাপিয়ে বাঙালির কণ্ঠসুধায় ভাস্বর হয়ে আছে তাঁর সময়োত্তীর্ণ কাব্য- সম্ভার| যেমনি ছন্দে তেমনি গদ্যে, তিনিই আধুনিক, একা এবং  একজন| তাঁর ধারেকাছেও নেই কেউ| এর জন্যে একটি বিষয় বিস্ময়করভাবে লক্ষণীয় যে, আজকের তরুণ তরুণীরাও তাদের কণ্ঠশীলনে ও আবৃত্তির তালিকার জন্যে সর্বাধিক নির্বাচন করছে রবীন্দ্র কাব্য থেকে| আজো তাঁকে অতিক্রম করে যেতে পারছে না অন্যরা| একই সাথে নানা ভাষাভাষি নতুন প্রজন্মও রিমিক্স করে কণ্ঠে তুলে নিচ্ছে রবীন্দ্রনাথের প্রাণ-হরা ও কালজয়ী বাণীপ্রধান গানকে| তারা আনন্দ খুঁজে পাচ্ছে সুরে ও তালে, যা তাঁর নিজেরই সৃষ্টি| আজকে ভাষান্তর করে, অনুবাদ করে বিশ্বব্যাপী রবীন্দ্রনাথের গান গাওয়া হচ্ছে| এ গান কালের অতলে বিলীন হচ্ছে না বরং সময়ের স্রোতে এর ধারা প্রবহমান থাকছে| সেদিক থেকে বললে তাঁর সেরা রচনা ‘গীতাঞ্জলি’ নির্বাচিত গানেরই সমষ্টি| তাঁর গানের অসাধারণ বাণীর অনুবাদও হয়ে উঠেছে মানুষের মৌলিক চিন্তার আধার| বলা হয় যে, “যদি তোর ডাক শুনে কেউ / না আসে— তবে একলা চলরে”

গানটি বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় গুজরাটি ভাষায় যেদিন মহাত্মা গান্ধীকে শোনানো হয়েছিল সেই থেকে রবীন্দ্রনাথ তাঁর গুরুদেব হয়ে যান| এই একটা গানের ভেতরই গান্ধী তাঁর চিরকালীন রণনীতিকে খুঁজে পেয়েছিলেন|

তিন.

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৯০ থেকে ১৯০৫ সালের মধ্যে প্রায় অর্ধশতাধিক দেশাত্মবোধক গান রচনা করেছিলেন| আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, সে সময়কার তিনটা গানই পৃথক তিনটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে| ভারত, বাংলাদেশ এবং শ্রীলঙ্কা তাদের জাতীয় সংগীত করেছে| পৃথিবীর আর কোনো কবি বা গীতি কবির এমন সৌভাগ্য কেউ দেখেনি| তাঁর কবিতা, গান, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস, নাটক, চিঠিপত্র এমন বিপুলসংখ্যক সৃষ্টির অমরত্ব নিয়ে তিনি কখনো কখনো সংশয় প্রকাশ করেছেন| বলেছেন, “আমার কীর্তিরে আমি করি না বিশ্বাস/জানি, কালসিন্ধু তারে/নিয়ত তরঙ্গাঘাতে /দিনে দিনে/ দিবে লুপ্ত করি|”

রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে গবেষণা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা অব্যাহত রয়েছে| গায়কী নিয়ে রয়েছে মতদ্বৈধতা এবং মতভেদ| কালক্রমে গানে কিছু পরিবর্তনও এসেছে| আদি ধারার মধ্যে শ্রুতিমধুর মেলোডি ধরে রাখার প্রয়াস রয়েছে| রবীন্দ্রনাথ তাঁর সংগীত চিন্তাতে এক জায়গায় বলেছেন, “আমি বলি নি যে, আমি যা ভেবে অমুক সুর দিয়েছি, তোমাকে গাইবার সময়ে সেইভাবেই হতে হবে”— সুরকারের সুর বজায় রেখেও এক্সপ্রেশনে কমবেশি  স্বাধীনতা  চাইবার এখতিয়ার গায়কের আছে| তাঁর গানের সংখ্যা নিয়েও কিঞ্চিৎ  মতপার্থক্য আছে| কোথাও বলা হয়েছে ১৯৫০টি আবার কোথাও ১৮০০টি বা তার অধিক| বলা হয়, সেই ১৬ বছর বয়সে শুরু করেছিলেন ‘গহন কুসুম কুঞ্জ মাঝে’ দিয়ে আর শেষ হয় ৮০ বছর বয়সে ‘তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি/ বিচিত্র ছলনাজালে/হে ছলনাময়ী’| একটানা ৬০ বছরের বেশি সময় ধরে চলেছিল তাঁর সৃষ্টিকর্ম| দিনে দিনে বিশাল বিস্তৃত ভাণ্ডার গড়ে তুলেছিলেন তিনি| তাঁর এমন ধারাবাহিক ও নিরবচ্ছিন্ন সৃজনশীলতায় জীবনের সকল স্তরেই তিনি যেমন কবিতা রচনা করেছেন তেমনি গান ও স্বরলিপি রচনা করে গেছেন|

চার.

রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে বাঙালির আবেগ, উচ্ছ্বাস আর আনন্দের সীমা নাই| এ গান কেউ শোনে নেশার মতন, কেউ ধারণ করে, আত্মস্থ করে উপাসনার মতন করে| গল্পে, আড্ডায়, অনুষ্ঠানে, পার্বণে, সুরুচিশীলনে, বিদায়ে, আগমনে, শুরুতে বা শেষে তাঁর গান বেজে ওঠে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক এবং আভিজাত্যের প্রতিধ্বনি হয়ে| এই গান মানুষের মরমের গহীনে স্পর্শ করে যায়, নিমিষে ক্লান্তিহীন শ্রান্তিহীন করে দেয়| তাঁর গানের ভেতর দিয়ে জীবনের বোধের অতলান্তে প্রবেশ করা যায় অনায়াসে ও অবলীলায়| কারও কারও কাছে জীবন সঞ্জীবনী টনিকের মতো কাজ করে চলেছে তাঁর সৃষ্ট সেই চিরন্তন বাণী|

পাঁচ.

বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ প্রতিমুহূর্তে জীবন্ত| আর এটা মূলত তাঁর কবিতা ও গানের ভেতর দিয়ে|  নিজের গান নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দারুণ আত্মবিশ্বাস ও অহঙ্কার ছিল| তিনি বলেছিলেন, “জীবনের ৮০ বছর অবধি চাষ করেছি অনেক| সব ফসলই যে মরাইতে জমা হবে, তা বলতে পারিনে| কিছু ইঁদুরে খাবে, তবু বাকি থাকবে কিছু| জোর করে বলা যায় না| যুগ বদলায়, কাল বদলায় তার সঙ্গে সবকিছুই বদলায়| তবে সবচেয়ে স্থায়ী হবে আমার গান, এটা জোর করে বলতে পারি| বিশেষ করে বাঙালিরা শোকে, দুঃখে, আনন্দে আমার গান না গেয়ে তাদের উপায় নেই| যুগে যুগে এ গান তাদের গাইতেই হবে|”

কী অব্যর্থ ভবিষ্যৎ বাণী! কী অসাধারণ ত্রিকালদ্রষ্টা ও যুগদর্শী ছিলেন তিনি|

পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট গবেষক ও অধ্যাপক প্রয়াত সুধীর চক্রবর্তী বলেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথ বাংলা গানের সর্বনাশ ও সর্বস্ব| তাঁর বই ‘গানের লীলার সেই কিনারে’| অর্থাৎ বাংলা গানের বাণী ও সুর সৃষ্টিতে তাঁকে অতিক্রম করা প্রায় অসম্ভব|

বাংলাদেশের বিশিষ্ট লেখক ও অধ্যাপক হায়াৎ মামুদ বলেছেন, ‘প্রকৃত পক্ষে বাঙালির কাছে রবীন্দ্রনাথ সর্বব্যাপী ও সর্বগ্রাসী| তাঁকে বাদ দিয়ে বাঙালির গর্ব করার বিশেষ কিছু আর থাকে না|’


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত