বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই উত্তপ্ত পশ্চিমবঙ্গ। পালাবদলের আবহে রাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে ভয়াবহ ভোট পরবর্তী হিংসা। গত ৪৮ ঘণ্টায় অন্তত পাঁচজনের মৃত্যুর ঘটনায় কার্যত উদ্বেগের চরমে প্রশাসন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নির্বাচন কমিশন ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির ঘোষণা করলেও মাটির পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে।
এই আবহেই বুধবার গভীর রাতে ঘটে গেল এক চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড। নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর থেকে জয়ী বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর ঘনিষ্ঠ সহকারী চন্দ্রনাথ রথকে উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রামে প্রকাশ্যে গুলি করে খুন করা হয়। ঘটনায় রাজনৈতিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। বিজেপির অভিযোগের তির সরাসরি তৃণমূলের দিকে। যদিও অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কনগ্রেস এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, বুধবার রাতে দোহরিয়া এলাকায় গাড়িতে করে যাচ্ছিলেন চন্দ্রনাথ রথ। সেই সময় একটি গাড়ি সামনে এসে পথ আটকে দেয়। ঠিক তখনই বাইকে চেপে আসা দুই দুষ্কৃতি এলোপাথাড়ি ১০ থেকে ১২ রাউন্ড গুলি চালায়। গাড়ির কাচ ভেদ করে গুলি লাগে চন্দ্রনাথের মাথা ও শরীরে। গুরুতর আহত হন চালক বুদ্ধদেব বেরাও-ও। দ্রুত নিউ বারাকপুরের একটি নার্সিংহোমে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা চন্দ্রনাথকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
ঘটনার পর রাতেই এলাকায় পৌঁছে যান শুভেন্দু অধিকারী, বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার এবং ডিজিপি সিদ্ধিনাথ গুপ্তা। নার্সিংহোম চত্বরে মোতায়েন করা হয় বিশাল পুলিশ বাহিনী। বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের বিক্ষোভে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। ইতিমধ্যেই হামলায় ব্যবহৃত সন্দেহভাজন গাড়িটি বাজেয়াপ্ত করেছে পুলিশ। সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে তদন্ত শুরু হয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, হামলাকারীরা পেশাদার ভাড়াটে খুনি।
জানা গিয়েছে, রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনের প্রাক্তনী চন্দ্রনাথ রথের আদি বাড়ি পূর্ব মেদিনীপুরের চণ্ডীপুরে। একসময় ভারতীয় সেনাবাহিনীতেও কাজ করেছেন তিনি। গত পাঁচ বছর ধরে শুভেন্দু অধিকারীর অত্যন্ত বিশ্বস্ত সহকারী হিসেবে কাজ করছিলেন। তাঁর মা স্থানীয় পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য ছিলেন।
তবে শুধু মধ্যমগ্রামেই নয়, বুধবার রাত থেকেই উত্তর ২৪ পরগনার একাধিক এলাকায় নতুন করে ছড়িয়েছে অশান্তি। সোদপুরের দত্ত রোড এলাকায় বোমাবাজিতে কয়েকজন আহত হয়েছেন। বসিরহাটের গোত্রা এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন এক বিজেপি কর্মী।
অন্যদিকে, কোচবিহারের সিতাইয়ে তৃণমূল সমর্থক মুন্নাফ মিয়ার বাড়িতে হামলা ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিবাদ করায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাঁর মাথায় কোপ মারা হয়। গভীর রাতে হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। একইসঙ্গে তুফানগঞ্জ ও উত্তর দিনাজপুরের চোপড়াতেও আক্রান্ত হয়েছেন বিজেপি কর্মীরা।
রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত—আসানসোল, নন্দীগ্রাম, রঘুনাথপুর, আরামবাগ, রামপুরহাট, ঝাড়গ্রাম, বনগাঁ ও মুর্শিদাবাদ জুড়ে দফায় দফায় সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের খবর মিলেছে। তৃণমূলের একাধিক দলীয় কার্যালয়ে আগুন লাগানো হয়েছে বলে অভিযোগ। বিভিন্ন এলাকায় কর্মীদের বাড়ি ও দোকান ভাঙচুরের ঘটনাও সামনে এসেছে। বহু জায়গায় মহিলাদেরও হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে কড়া বার্তা দিয়েছেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার গনেশ কুমার । রাজ্যের ডিজিপি সিদ্ধিনাথ গুপ্তা জানিয়েছেন, “ভোট পরবর্তী হিংসা ঠেকাতে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছি। প্রয়োজন হলে কার্ফুও জারি করা হবে।”
ভবানী ভবনে সাংবাদিক বৈঠকে তিনি জানান, এখনও পর্যন্ত ভোট পরবর্তী হিংসার ঘটনায় ২০০টি এফআইআর দায়ের হয়েছে। গ্রেপ্তার হয়েছেন ৪৩৩ জন। আগাম সতর্কতামূলক গ্রেপ্তারির সংখ্যা ১১০০। কলকাতা পুলিশ এলাকায় ৩৯টি মামলা দায়ের হয়েছে, গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১০০ জনকে। বাজেয়াপ্ত হয়েছে তিনটি বন্দুক ও ছ’রাউন্ড গুলি।
এদিকে বিজেপির রাজ্য সভাপতি সমিক ভট্টাচারি নবান্নে গিয়ে স্বরাষ্ট্র সচিব সংঘমিত্রা ঘোষের সঙ্গে বৈঠক করে ভোট পরবর্তী হিংসা রুখতে দ্রুত পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। সূত্রের খবর, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ অবজার্ভার, পুলিশ অবজার্ভার, ডিজি সিআরপিএফ, ডিজি বিএসএফ ও ডিজি সিআইএসএফ-কে নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকও করেছেন ডিজিপি।
কলকাতার নগরপাল অজয় নন্দ সাধারণ মানুষকে গুজবে কান না দেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন। শহরে মোতায়েন করা হচ্ছে ৬৫ কোম্পানি বাহিনী ও ৪০টি কুইক রেসপন্স টিম। অনুমতি ছাড়া মিছিলের উপরও জারি হয়েছে নিষেধাজ্ঞা।
বাংলার রাজনৈতিক পালাবদলের আবহে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই হিংসার আগুন কত দূর ছড়াবে? প্রশাসনের কড়া বার্তা সত্ত্বেও পরিস্থিতি যে এখনও সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসেনি, তা স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে একের পর এক রক্তাক্ত ঘটনায়।

বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ মে ২০২৬
বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই উত্তপ্ত পশ্চিমবঙ্গ। পালাবদলের আবহে রাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে ভয়াবহ ভোট পরবর্তী হিংসা। গত ৪৮ ঘণ্টায় অন্তত পাঁচজনের মৃত্যুর ঘটনায় কার্যত উদ্বেগের চরমে প্রশাসন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নির্বাচন কমিশন ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির ঘোষণা করলেও মাটির পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে।
এই আবহেই বুধবার গভীর রাতে ঘটে গেল এক চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড। নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর থেকে জয়ী বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর ঘনিষ্ঠ সহকারী চন্দ্রনাথ রথকে উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রামে প্রকাশ্যে গুলি করে খুন করা হয়। ঘটনায় রাজনৈতিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। বিজেপির অভিযোগের তির সরাসরি তৃণমূলের দিকে। যদিও অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কনগ্রেস এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, বুধবার রাতে দোহরিয়া এলাকায় গাড়িতে করে যাচ্ছিলেন চন্দ্রনাথ রথ। সেই সময় একটি গাড়ি সামনে এসে পথ আটকে দেয়। ঠিক তখনই বাইকে চেপে আসা দুই দুষ্কৃতি এলোপাথাড়ি ১০ থেকে ১২ রাউন্ড গুলি চালায়। গাড়ির কাচ ভেদ করে গুলি লাগে চন্দ্রনাথের মাথা ও শরীরে। গুরুতর আহত হন চালক বুদ্ধদেব বেরাও-ও। দ্রুত নিউ বারাকপুরের একটি নার্সিংহোমে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা চন্দ্রনাথকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
ঘটনার পর রাতেই এলাকায় পৌঁছে যান শুভেন্দু অধিকারী, বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার এবং ডিজিপি সিদ্ধিনাথ গুপ্তা। নার্সিংহোম চত্বরে মোতায়েন করা হয় বিশাল পুলিশ বাহিনী। বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের বিক্ষোভে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। ইতিমধ্যেই হামলায় ব্যবহৃত সন্দেহভাজন গাড়িটি বাজেয়াপ্ত করেছে পুলিশ। সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে তদন্ত শুরু হয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, হামলাকারীরা পেশাদার ভাড়াটে খুনি।
জানা গিয়েছে, রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনের প্রাক্তনী চন্দ্রনাথ রথের আদি বাড়ি পূর্ব মেদিনীপুরের চণ্ডীপুরে। একসময় ভারতীয় সেনাবাহিনীতেও কাজ করেছেন তিনি। গত পাঁচ বছর ধরে শুভেন্দু অধিকারীর অত্যন্ত বিশ্বস্ত সহকারী হিসেবে কাজ করছিলেন। তাঁর মা স্থানীয় পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য ছিলেন।
তবে শুধু মধ্যমগ্রামেই নয়, বুধবার রাত থেকেই উত্তর ২৪ পরগনার একাধিক এলাকায় নতুন করে ছড়িয়েছে অশান্তি। সোদপুরের দত্ত রোড এলাকায় বোমাবাজিতে কয়েকজন আহত হয়েছেন। বসিরহাটের গোত্রা এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন এক বিজেপি কর্মী।
অন্যদিকে, কোচবিহারের সিতাইয়ে তৃণমূল সমর্থক মুন্নাফ মিয়ার বাড়িতে হামলা ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিবাদ করায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাঁর মাথায় কোপ মারা হয়। গভীর রাতে হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। একইসঙ্গে তুফানগঞ্জ ও উত্তর দিনাজপুরের চোপড়াতেও আক্রান্ত হয়েছেন বিজেপি কর্মীরা।
রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত—আসানসোল, নন্দীগ্রাম, রঘুনাথপুর, আরামবাগ, রামপুরহাট, ঝাড়গ্রাম, বনগাঁ ও মুর্শিদাবাদ জুড়ে দফায় দফায় সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের খবর মিলেছে। তৃণমূলের একাধিক দলীয় কার্যালয়ে আগুন লাগানো হয়েছে বলে অভিযোগ। বিভিন্ন এলাকায় কর্মীদের বাড়ি ও দোকান ভাঙচুরের ঘটনাও সামনে এসেছে। বহু জায়গায় মহিলাদেরও হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে কড়া বার্তা দিয়েছেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার গনেশ কুমার । রাজ্যের ডিজিপি সিদ্ধিনাথ গুপ্তা জানিয়েছেন, “ভোট পরবর্তী হিংসা ঠেকাতে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছি। প্রয়োজন হলে কার্ফুও জারি করা হবে।”
ভবানী ভবনে সাংবাদিক বৈঠকে তিনি জানান, এখনও পর্যন্ত ভোট পরবর্তী হিংসার ঘটনায় ২০০টি এফআইআর দায়ের হয়েছে। গ্রেপ্তার হয়েছেন ৪৩৩ জন। আগাম সতর্কতামূলক গ্রেপ্তারির সংখ্যা ১১০০। কলকাতা পুলিশ এলাকায় ৩৯টি মামলা দায়ের হয়েছে, গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১০০ জনকে। বাজেয়াপ্ত হয়েছে তিনটি বন্দুক ও ছ’রাউন্ড গুলি।
এদিকে বিজেপির রাজ্য সভাপতি সমিক ভট্টাচারি নবান্নে গিয়ে স্বরাষ্ট্র সচিব সংঘমিত্রা ঘোষের সঙ্গে বৈঠক করে ভোট পরবর্তী হিংসা রুখতে দ্রুত পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। সূত্রের খবর, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ অবজার্ভার, পুলিশ অবজার্ভার, ডিজি সিআরপিএফ, ডিজি বিএসএফ ও ডিজি সিআইএসএফ-কে নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকও করেছেন ডিজিপি।
কলকাতার নগরপাল অজয় নন্দ সাধারণ মানুষকে গুজবে কান না দেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন। শহরে মোতায়েন করা হচ্ছে ৬৫ কোম্পানি বাহিনী ও ৪০টি কুইক রেসপন্স টিম। অনুমতি ছাড়া মিছিলের উপরও জারি হয়েছে নিষেধাজ্ঞা।
বাংলার রাজনৈতিক পালাবদলের আবহে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই হিংসার আগুন কত দূর ছড়াবে? প্রশাসনের কড়া বার্তা সত্ত্বেও পরিস্থিতি যে এখনও সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসেনি, তা স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে একের পর এক রক্তাক্ত ঘটনায়।

আপনার মতামত লিখুন