রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগকে কেন্দ্র করে অনিয়ম ও অনৈতিকতার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, আবেদনকারী দুই প্রার্থীর মধ্যে একজনের আবেদন বাতিল হওয়ার পর মাত্র একজন প্রার্থীর ভাইভা নেয়া হয় এবং পরে তাকেই নিয়োগ দেওয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ২৮ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে ফোকলোর বিভাগে দুইজন সহকারী অধ্যাপক (না পাওয়া গেলে প্রভাষক) এবং তিনজন প্রভাষক নিয়োগের জন্য আবেদন আহ্বান করা হয়। তাতে সহকারী অধ্যাপক পদে দুটি এবং প্রভাষক পদে ২৮টি আবেদন জমা পড়ে। পরে তথ্য যাচাইয়ের সময় সহকারী অধ্যাপক পদে একজনের আবেদন ‘অসঙ্গতির’ কারণে বাতিল করা হয়। ফলে একজন প্রার্থীই বৈধ হিসেবে বিবেচিত হন। পরবর্তীতে ওই প্রার্থী এবং প্রভাষক পদের আবেদনকারীদের নিয়ে ভাইভা বোর্ড হয়। শেষে এরশাদুল হককে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
সংশোধিত নিয়োগ বিধি অনুযায়ী, বিজ্ঞাপিত পদের বিপরীতে অন্তত তিনগুণ প্রার্থীকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য বাছাই করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি পর্যাপ্ত যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে আবার বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়। এছাড়া কোনো বিভাগে যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে বিভাগীয় প্ল্যানিং কমিটির সুপারিশ ও সিন্ডিকেটের অনুমোদন সাপেক্ষে শর্ত শিথিল করে পুনঃবিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রভাষক নিয়োগের সুযোগ রয়েছে।
তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, সহকারী অধ্যাপক ও প্রভাষক পদের বিজ্ঞপ্তি একসঙ্গে প্রকাশিত হলে বোর্ড প্রয়োজনে প্রার্থীকে উপযুক্ত বিবেচনায় নিয়োগ দিতে পারে। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, একটি পদের বিপরীতে মাত্র একজন প্রার্থী থাকলে তাকে সরাসরি নিয়োগ দেওয়া নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। তাদের মতে, এ ধরনের ক্ষেত্রে নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল করে পুনঃবিজ্ঞপ্তি দেওয়া উচিত ছিল, যাতে প্রকৃত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হয়।
অভিযোগ রয়েছে, বিভাগের তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে আর্থিক লেনদেনও হয়েছে। যদিও এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিভাগের এক শিক্ষক জানান, প্ল্যানিং কমিটির প্রাথমিক সভায় সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগ না দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে হাতে লেখা কার্যবিবরণীর পরিবর্তে টাইপ করা কাগজে সিদ্ধান্ত প্রস্তুত করে সদস্যদের স্বাক্ষর নেওয়া হয়। এমনকি যাকে কমিটি বাতিল করেছিল, তাকেও রেজিস্ট্রার দপ্তর থেকে ইন্টারভিউ কার্ড দেওয়া হয়।
ওই শিক্ষক আরও অভিযোগ করেন, এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার পেছনে বিপুল অঙ্কের আর্থিক লেনদেন হয়েছে। নিয়োগ হওয়ার পর চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর হোসেন ৫৫ লাখ টাকা দিয়ে গাড়ি কেনেন এবং রাজশাহী শহরের ভদ্রা এলাকায় একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কেনেন বলেও অভিযোগ করেন ওই শিক্ষক।
তার আরও অভিযোগ, বগুড়া অঞ্চলের এক যোগ্য প্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় প্রথম হলেও তাকে বাদ দিয়ে চেয়ারম্যানের নিজ এলাকা ঝিনাইদহের দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়া হয়। বাদ পড়া প্রার্থীর বিরুদ্ধে দুই বছর আগের একটি অভিযোগ সামনে আনা হয়, যদিও সেটি তদন্তে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশে শিক্ষক নিয়োগে লিখিত পরীক্ষার কোনো বিধান নেই। তবে একাধিক প্রবীণ শিক্ষক অভিযোগ করেছেন, তৎকালীন প্রশাসন নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে সুবিধা দিতে বিধিবহির্ভূতভাবে লিখিত পরীক্ষার ব্যবস্থা চালু করে। তাদের মতে, এতে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
বিভাগ ও রেজিস্ট্রার দপ্তর সূত্রে জানা যায়, ফোকলোর বিভাগের নিয়োগ বোর্ডে বহিঃস্থ বিশেষজ্ঞ হিসেবে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রশিদুজ্জামানকে রাখা হয়। ফোকলোর একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্র হওয়া সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সরাসরি বিশেষজ্ঞ না রেখে ভিন্ন বিভাগের শিক্ষককে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দিতেই এ ধরনের বিশেষজ্ঞ নির্বাচন করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ইফতিখার-উল আলম মাসউদ বলেন, “নিয়োগের ক্ষেত্রে সাধারণত একটি পদের বিপরীতে তিনজন প্রার্থীকে ভাইভায় ডাকার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। তবে কাট-অফ নম্বরে একাধিক প্রার্থী একই নম্বর পেলে ভাইভায় প্রার্থীর সংখ্যা বাড়তে পারে।”
তিনি আরও বলেন, পর্যাপ্ত আবেদনকারী না পাওয়া গেলে পুনঃবিজ্ঞপ্তির সুযোগ রয়েছে এবং প্ল্যানিং কমিটি আবেদনকারীদের যোগ্যতা যাচাই করে সুপারিশ দেয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কোনো জটিলতা দেখা দিলে বিষয়টি সিন্ডিকেটে উপস্থাপন করা হয়।
রেজিস্ট্রার আরও জানান, সহকারী অধ্যাপক ও প্রভাষক পদের বিজ্ঞপ্তি একসঙ্গে দেওয়া হলে বোর্ড প্রয়োজনে সহকারী অধ্যাপক পদের প্রার্থীকে প্রভাষক হিসেবে সুপারিশ করতে পারে। আবার প্রভাষক পদের কোনো আবেদনকারী ‘অসামান্য যোগ্য’ হলে তাকেও সহকারী অধ্যাপক পদে সুপারিশ করার ‘সুযোগ রয়েছে’।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, শিক্ষক নিয়োগের সিলেকশন বোর্ডে সাধারণত উপাচার্য, সংশ্লিষ্ট বিভাগের চেয়ারম্যান, একজন বাইরের বিশেষজ্ঞ এবং দুইজন সিন্ডিকেট সদস্য থাকেন। বাইরের বিশেষজ্ঞ নির্ধারণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট। প্রশাসনের দাবি, ফোকলোরের মতো বিশেষায়িত বিভাগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বা কাছাকাছি বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়ে থাকে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফোকলোর অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর হোসেন (বাবু) বলেন, “শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়েছে। লিখিত এবং মৌখিক পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে যারা মেধা তালিকায় প্রথম ও দ্বিতীয় হয়েছিলেন, তাদেরকেই মূলত নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আমার পক্ষ থেকে ব্যক্তিগতভাবে কোনো প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করা হয়নি, বরং মেধা তালিকার ক্রম অনুসরণ করা হয়েছে এবং তৎকালীন উপাচার্যও বিষয়টি সম্পর্কে জানেন।”
নিয়োগে আঞ্চলিকতা বা নিজ জেলার মানুষকে প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি। তার দাবি, ‘নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে একজনের বাড়ি ঝিনাইদহের মহেশপুরে হলেও তিনি অনার্সে প্রথম এবং মাস্টার্সে দ্বিতীয় স্থান অধিকারী ছিলেন।’ এছাড়া ‘তার ফ্ল্যাটটি করোনাকালে কেনা এবং পদ্মা আবাসিক এলাকায় থাকা একটি জমি বিক্রির টাকায় গাড়ি কেনা হয়েছে’ বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, “অভিযোগের মূল উদ্দেশ্য হলো আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো প্রশাসনিক পদে আসা থেকে বিরত রাখা। দীর্ঘ সময় ক্যাম্পাসে থাকার কারণে একটি পক্ষ আমাকে প্রশাসনিক পদ থেকে দূরে রাখতে এসব ভিত্তিহীন তথ্য ছড়াচ্ছে।”
সিলেকশন বোর্ডে সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মাঈন উদ্দিন। তিনি বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত স্বচ্ছ ছিল এবং মেধা যাচাইয়ের জন্য লিখিত পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে ‘ব্লাইন্ড ইভ্যালুয়েশন’ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। ভাইভা বা মৌখিক পরীক্ষার জন্য প্রতি পদের বিপরীতে তিনজনকে ডাকার বিষয়টিও কোনো কঠোর লিখিত নিয়ম নয়, বরং বোর্ডের কাজের সুবিধার্থে এটি একটি অনুমান হিসেবে ধরা হয়েছিল।
তার দাবি, নিয়োগ প্রক্রিয়াটি ‘সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, মেধাভিত্তিক এবং একাডেমিক মানদণ্ড’ অনুসরণ করে হয়েছে।
বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, “সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

শনিবার, ০৯ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ মে ২০২৬
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগকে কেন্দ্র করে অনিয়ম ও অনৈতিকতার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, আবেদনকারী দুই প্রার্থীর মধ্যে একজনের আবেদন বাতিল হওয়ার পর মাত্র একজন প্রার্থীর ভাইভা নেয়া হয় এবং পরে তাকেই নিয়োগ দেওয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ২৮ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে ফোকলোর বিভাগে দুইজন সহকারী অধ্যাপক (না পাওয়া গেলে প্রভাষক) এবং তিনজন প্রভাষক নিয়োগের জন্য আবেদন আহ্বান করা হয়। তাতে সহকারী অধ্যাপক পদে দুটি এবং প্রভাষক পদে ২৮টি আবেদন জমা পড়ে। পরে তথ্য যাচাইয়ের সময় সহকারী অধ্যাপক পদে একজনের আবেদন ‘অসঙ্গতির’ কারণে বাতিল করা হয়। ফলে একজন প্রার্থীই বৈধ হিসেবে বিবেচিত হন। পরবর্তীতে ওই প্রার্থী এবং প্রভাষক পদের আবেদনকারীদের নিয়ে ভাইভা বোর্ড হয়। শেষে এরশাদুল হককে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
সংশোধিত নিয়োগ বিধি অনুযায়ী, বিজ্ঞাপিত পদের বিপরীতে অন্তত তিনগুণ প্রার্থীকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য বাছাই করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি পর্যাপ্ত যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে আবার বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়। এছাড়া কোনো বিভাগে যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে বিভাগীয় প্ল্যানিং কমিটির সুপারিশ ও সিন্ডিকেটের অনুমোদন সাপেক্ষে শর্ত শিথিল করে পুনঃবিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রভাষক নিয়োগের সুযোগ রয়েছে।
তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, সহকারী অধ্যাপক ও প্রভাষক পদের বিজ্ঞপ্তি একসঙ্গে প্রকাশিত হলে বোর্ড প্রয়োজনে প্রার্থীকে উপযুক্ত বিবেচনায় নিয়োগ দিতে পারে। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, একটি পদের বিপরীতে মাত্র একজন প্রার্থী থাকলে তাকে সরাসরি নিয়োগ দেওয়া নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। তাদের মতে, এ ধরনের ক্ষেত্রে নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল করে পুনঃবিজ্ঞপ্তি দেওয়া উচিত ছিল, যাতে প্রকৃত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হয়।
অভিযোগ রয়েছে, বিভাগের তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে আর্থিক লেনদেনও হয়েছে। যদিও এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিভাগের এক শিক্ষক জানান, প্ল্যানিং কমিটির প্রাথমিক সভায় সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগ না দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে হাতে লেখা কার্যবিবরণীর পরিবর্তে টাইপ করা কাগজে সিদ্ধান্ত প্রস্তুত করে সদস্যদের স্বাক্ষর নেওয়া হয়। এমনকি যাকে কমিটি বাতিল করেছিল, তাকেও রেজিস্ট্রার দপ্তর থেকে ইন্টারভিউ কার্ড দেওয়া হয়।
ওই শিক্ষক আরও অভিযোগ করেন, এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার পেছনে বিপুল অঙ্কের আর্থিক লেনদেন হয়েছে। নিয়োগ হওয়ার পর চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর হোসেন ৫৫ লাখ টাকা দিয়ে গাড়ি কেনেন এবং রাজশাহী শহরের ভদ্রা এলাকায় একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কেনেন বলেও অভিযোগ করেন ওই শিক্ষক।
তার আরও অভিযোগ, বগুড়া অঞ্চলের এক যোগ্য প্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় প্রথম হলেও তাকে বাদ দিয়ে চেয়ারম্যানের নিজ এলাকা ঝিনাইদহের দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়া হয়। বাদ পড়া প্রার্থীর বিরুদ্ধে দুই বছর আগের একটি অভিযোগ সামনে আনা হয়, যদিও সেটি তদন্তে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশে শিক্ষক নিয়োগে লিখিত পরীক্ষার কোনো বিধান নেই। তবে একাধিক প্রবীণ শিক্ষক অভিযোগ করেছেন, তৎকালীন প্রশাসন নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে সুবিধা দিতে বিধিবহির্ভূতভাবে লিখিত পরীক্ষার ব্যবস্থা চালু করে। তাদের মতে, এতে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
বিভাগ ও রেজিস্ট্রার দপ্তর সূত্রে জানা যায়, ফোকলোর বিভাগের নিয়োগ বোর্ডে বহিঃস্থ বিশেষজ্ঞ হিসেবে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রশিদুজ্জামানকে রাখা হয়। ফোকলোর একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্র হওয়া সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সরাসরি বিশেষজ্ঞ না রেখে ভিন্ন বিভাগের শিক্ষককে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দিতেই এ ধরনের বিশেষজ্ঞ নির্বাচন করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ইফতিখার-উল আলম মাসউদ বলেন, “নিয়োগের ক্ষেত্রে সাধারণত একটি পদের বিপরীতে তিনজন প্রার্থীকে ভাইভায় ডাকার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। তবে কাট-অফ নম্বরে একাধিক প্রার্থী একই নম্বর পেলে ভাইভায় প্রার্থীর সংখ্যা বাড়তে পারে।”
তিনি আরও বলেন, পর্যাপ্ত আবেদনকারী না পাওয়া গেলে পুনঃবিজ্ঞপ্তির সুযোগ রয়েছে এবং প্ল্যানিং কমিটি আবেদনকারীদের যোগ্যতা যাচাই করে সুপারিশ দেয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কোনো জটিলতা দেখা দিলে বিষয়টি সিন্ডিকেটে উপস্থাপন করা হয়।
রেজিস্ট্রার আরও জানান, সহকারী অধ্যাপক ও প্রভাষক পদের বিজ্ঞপ্তি একসঙ্গে দেওয়া হলে বোর্ড প্রয়োজনে সহকারী অধ্যাপক পদের প্রার্থীকে প্রভাষক হিসেবে সুপারিশ করতে পারে। আবার প্রভাষক পদের কোনো আবেদনকারী ‘অসামান্য যোগ্য’ হলে তাকেও সহকারী অধ্যাপক পদে সুপারিশ করার ‘সুযোগ রয়েছে’।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, শিক্ষক নিয়োগের সিলেকশন বোর্ডে সাধারণত উপাচার্য, সংশ্লিষ্ট বিভাগের চেয়ারম্যান, একজন বাইরের বিশেষজ্ঞ এবং দুইজন সিন্ডিকেট সদস্য থাকেন। বাইরের বিশেষজ্ঞ নির্ধারণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট। প্রশাসনের দাবি, ফোকলোরের মতো বিশেষায়িত বিভাগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বা কাছাকাছি বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়ে থাকে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফোকলোর অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর হোসেন (বাবু) বলেন, “শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়েছে। লিখিত এবং মৌখিক পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে যারা মেধা তালিকায় প্রথম ও দ্বিতীয় হয়েছিলেন, তাদেরকেই মূলত নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আমার পক্ষ থেকে ব্যক্তিগতভাবে কোনো প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করা হয়নি, বরং মেধা তালিকার ক্রম অনুসরণ করা হয়েছে এবং তৎকালীন উপাচার্যও বিষয়টি সম্পর্কে জানেন।”
নিয়োগে আঞ্চলিকতা বা নিজ জেলার মানুষকে প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি। তার দাবি, ‘নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে একজনের বাড়ি ঝিনাইদহের মহেশপুরে হলেও তিনি অনার্সে প্রথম এবং মাস্টার্সে দ্বিতীয় স্থান অধিকারী ছিলেন।’ এছাড়া ‘তার ফ্ল্যাটটি করোনাকালে কেনা এবং পদ্মা আবাসিক এলাকায় থাকা একটি জমি বিক্রির টাকায় গাড়ি কেনা হয়েছে’ বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, “অভিযোগের মূল উদ্দেশ্য হলো আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো প্রশাসনিক পদে আসা থেকে বিরত রাখা। দীর্ঘ সময় ক্যাম্পাসে থাকার কারণে একটি পক্ষ আমাকে প্রশাসনিক পদ থেকে দূরে রাখতে এসব ভিত্তিহীন তথ্য ছড়াচ্ছে।”
সিলেকশন বোর্ডে সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মাঈন উদ্দিন। তিনি বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত স্বচ্ছ ছিল এবং মেধা যাচাইয়ের জন্য লিখিত পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে ‘ব্লাইন্ড ইভ্যালুয়েশন’ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। ভাইভা বা মৌখিক পরীক্ষার জন্য প্রতি পদের বিপরীতে তিনজনকে ডাকার বিষয়টিও কোনো কঠোর লিখিত নিয়ম নয়, বরং বোর্ডের কাজের সুবিধার্থে এটি একটি অনুমান হিসেবে ধরা হয়েছিল।
তার দাবি, নিয়োগ প্রক্রিয়াটি ‘সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, মেধাভিত্তিক এবং একাডেমিক মানদণ্ড’ অনুসরণ করে হয়েছে।
বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, “সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

আপনার মতামত লিখুন