সংবাদ

সুন্দরীরা কেন বখাটের প্রেমে?

খারাপের প্রতি ‘ঝোঁক’ কেন স্বাভাবিক


ওয়াসিম খান রানা
ওয়াসিম খান রানা
প্রকাশ: ৮ মে ২০২৬, ০৪:৪০ পিএম

খারাপের প্রতি ‘ঝোঁক’ কেন স্বাভাবিক
সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে- শুনতে সহজ মনে হলেও এর গভীরে লুকিয়ে আছে রহস্য।

‘সকালবেলা মেয়েকে স্কুলে দিয়ে রামপুরার একটি দোকানে এক কাপ চা খাওয়ার অভ্যাস আমার নিত্যদিনের। প্রতিদিন পাঁচ-ছয়জন ছেলে সেখানে আড্ডা দেয়। তাদের মধ্যে একটা ছেলে প্রথম প্রথম চুপ করে বসে থাকত। বাকিরা সিগারেট, চা হাতে নিয়ে তাদের কোনো না কোনো শিক্ষকের নামে গীবত করত, সে অস্বস্তিতে চা খেত। তাদের মধ্যে কেউ একজন একটি সিগারেট দিয়ে বলত, 'নে একটান দে।' পাশের ছেলেরা বলত, ‘অরে দিয়া লাভ নাই, ও ফিডার ছাড়া কিছু খায় না।’

সপ্তাহ দুয়েক পরে আজ দেখলাম, সেই ছেলেই সবচেয়ে জোরে জোরে হাসছে। এসেই বলল, ‘মামা একটা ব্যানসন দাও।' আমি দীর্ঘক্ষণ ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। পাশের দোকানি আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মামা, ছেলেটা ভালো ছিল, পোলাপাইনের লগে মিশে ফাতরা হয়ে গেছে।' বলছিলেন মোহাম্মদ নিজামুদ্দিন নামে এক চাকরীজীবী।

আদিম মানুষেরা দল বাঁধতো। সেই দলে ব্যক্তির স্বতন্ত্র হওয়ার সুযোগ কম থাকতো।

কথায় বলে সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে। এই পৃথিবীতে খারাপ মানুষের সংখ্যা খুব কম। কিন্তু এদের বিস্তার ভয়াবহ। এরা ভালোকে মন্দের দিকে প্রভাবিত করতে পারে খুব সহজে। পানিকে যে পাত্রে রাখা হয়, সে সেই পাত্রের আকার ধারন করে। মানুষও অনেকটা তেমন। পরিবেশের চাপে, সঙ্গীদের প্রভাবে, ধীরে ধীরে নিজের আকার বদলায়। কিন্তু পার্থক্য হলো, পানি যখন পাত্র বদলায় তখন আবার নতুন আকার নেয়। মানুষ একবার বেঁকে গেলে সহজে সোজা হয় না।

মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘সামাজিক অনুসরণ’। মানুষ স্বভাবতই দলের সঙ্গে মিলে যেতে চায়। কারণ লক্ষ লক্ষ বছর ধরে মানব সভ্যতায় দল থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া মানে ছিল মৃত্যু। সেই প্রবৃত্তি এখনো আমাদের মাথার ভেতরে গেঁথে আছে। কিন্তু এই প্রবণতাই যখন খারাপ সঙ্গের মাঝে পড়ে, তখন সেটি মানুষকে ভেতর থেকে বদলে দেয়। ধীরে ধীরে, টের পাওয়ার আগেই।

যেভাবে শুরু হয় পতন, ধাপে ধাপে

প্রথমে আসে মানিয়ে নেওয়ার ইচ্ছা। অফিসে নতুন যোগ দিয়েছেন, বা নতুন পাড়ায় উঠেছেন। আশেপাশের মানুষগুলো একটু অন্যরকম। তারা হয়তো সহকর্মীর পেছনে কথা বলে, বা ফাঁকি দেওয়াকে বুদ্ধিমানের কাজ মনে করে। আপনি বিরক্ত হন, কিন্তু মুখে কিছু বলেন না। কারণ নতুন জায়গায় উল্টোপাল্টা কথা বলাটা বুদ্ধিমানের না। এই চুপ করে থাকাটাই প্রথম ধাপ।

দ্বিতীয় ধাপে আসে হালকা অংশগ্রহণ। একদিন কেউ জিজ্ঞেস করে, ‘আচ্ছা, নেসার সাহেব কেমন মানুষ বলো তো?' আপনি হয়তো বলেন, ‘বেশি একটা চিনি না।' এটা মিথ্যা না, কিন্তু পুরোপুরি সত্যিও না। আসলে আপনি জানেন নেসার সাহেব ভালো মানুষ, কিন্তু দলের মতের বিরুদ্ধে যেতে মন চায় না।

তৃতীয় ধাপে আসে যুক্তিতর্কের পুনর্গঠন। মানুষ নিজেকে ভালো মনে করতে চায়, এটাই স্বাভাবিক। তাই সে নিজের পরিবর্তনকে সমর্থন করার জন্য নিজের মনের ভেতরেই নতুন যুক্তি তৈরি করে। “আসলে ঘুষ না নিলে টিকে থাকা যায় না”, “সবাই তো করছে, আমি না করলে কী হবে?”, “এটা তো আর বড় কিছু না”।  মনোবিজ্ঞানে এর নাম “কগনেটিভ ডিজোনেন্স রিডাকশন”। অর্থাৎ নিজের কাজ আর নিজের বিশ্বাসের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, মানুষ সেটা কমাতে বিশ্বাসটাকেই বদলে ফেলে।

নিজেকে পড়ে, নিজের ভেতরে আবদ্ধ হওয়া কঠিন

চতুর্থ ধাপে, যখন আর নিজেও টের পায় না, অভ্যাস হয়ে যায়। একটা সময় ছিল, সারাদিন অফিসের পর যখন রাতে ঘুমানোর আগে অস্থিরতা লাগত, কেন এমন হয়? সবাই একটু ভালোভাবে ভালোবেসে কাজগুলো শেষ করলেই হয়, মাস শেষে অফিস থেকে যে টাকাটা পাচ্ছি তা হালাল হচ্ছে তো। এখন আর অস্থিরতা কাজ করে না। বিবেকের কণ্ঠস্বর ক্রমশ নিচু হতে হতে একদিন প্রায় নিঃশব্দ হয়ে যায়।

ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় আসা ছেলেটা গ্রামে সবার প্রিয়, সৎ, কথা রাখে। মেসে উঠেছে নতুন বন্ধুদের সঙ্গে। এখানে রাত জেগে আড্ডা, ফাঁকিবাজি, হয়তো ছোট ছোট অসততা। প্রথম মাসে সে অস্বস্তিতে ছিল। দুই বছর পরে সে নিজেই মেসের নতুন ছেলেটিকে নতুন নতুন ফন্দি শেখাচ্ছে।

অফিসের সৎ কর্মকর্তা ঘুষ নেন না, নিয়ম মেনে চলেন। কিন্তু সারাদিন যাদের সঙ্গে কাজ করছেন, তারা সবাই ভিন্ন পথের পথিক। একা একা সৎ থাকতে গেলে কাজ আটকায়, পদোন্নতি হয় না, সহকর্মীরা দূরত্ব রাখে। কোনো একদিন সে হিসাব মেলাতে বসে এবং সিদ্ধান্ত নেয়, “একটু মিলিয়ে চলব।”

এই গল্পগুলো ব্যতিক্রম না। এগুলোই নিয়ম। তাহলে উল্টোটা কেন হয় না? খারাপ মানুষ ভালো কেন হয় না?

সুন্দরীরা সাময়িকভাবে বখাটেদের পাল্লায় পড়ে। তবে...

যদি সঙ্গের প্রভাব এত শক্তিশালী, তাহলে একজন খারাপ মানুষকে ভালো মানুষের সঙ্গে রাখলে তারও তো হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবতা তা বলে না। কারণটা হলো বিনিয়োগের অসামঞ্জস্য। খারাপ অভ্যাস মানুষকে স্বল্পমেয়াদি সুবিধা দেয়। আরাম, ক্ষমতা, অর্থ, বা অন্তত ঝামেলা এড়ানো। ভালো থাকার জন্য লাগে ধৈর্য, ত্যাগ ও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি। একজন যে মিথ্যা বলে অভ্যস্ত, তার কাছে সত্য বলা মানে ঝামেলা ডেকে আনা। সে কেন সেই কষ্ট নেবে, যদি না তার ভেতর থেকে পরিবর্তনের তীব্র ইচ্ছা না জাগে?

আরেকটি কারণ হলো পরিচয়ের সংকট। খারাপ মানুষটির চারপাশে যারা আছে তারা তার এই রূপটাকেই চেনে। ভালো মানুষের সঙ্গে থাকলেও তার নিজের পুরনো দল আছে, পুরনো সম্পর্ক আছে, পুরনো পরিচয় আছে। সেই টান সহজে কাটে না।

“কয়লা ধুলে ময়লা যায় না”- কথাটা নিষ্ঠুর শোনালেও এর পেছনে একটা মনস্তাত্ত্বিক সত্য আছে। পরিবর্তন তখনই হয় যখন মানুষ নিজে চায়। বাইরে থেকে আলো ঢেলে দিলেই অন্ধকার যায় না, ভেতর থেকে জানালা খুলতে হয়।

ভালো মানুষ কেন বেশি ঝুঁকিতে?

এটা পরস্পরবিরোধী শোনাবে, কিন্তু সত্যি যে ভালো মানুষরাই বেশি ঝুঁকিতে থাকে। কারণ ভালো মানুষের মধ্যে থাকে সহানুভূতি। সে মানুষের দোষ বোঝার চেষ্টা করে, মাফ করে দেয়, সুযোগ দেয়। এই গুণগুলোই তাকে দুর্বল করে তোলে খারাপ সঙ্গের সামনে। আবার ভালো মানুষের থাকে অপরাধবোধ। কাউকে ‘না’ বলতে পারে না, বন্ধুত্ব হারাতে ভয় পায়। এই দুর্বলতাকে কাজে লাগায় তার চারপাশের মানুষেরা, সচেতনভাবেই, কিন্তু আপনার অবচেতনে।

দ্বন্দ্ব আসে ভেতর থেকেই। ভালো আর মন্দের বিভেদ করার দ্বন্দ্ব

সবচেয়ে বড় কথা, ভালো মানুষ ধরে নেয় সে নিরাপদ। সে ভাবে, “আমার মূল্যবোধ শক্ত, আমি বদলাব না”। এই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসই তাকে সতর্ক হতে বাধা দেয়। নদীর স্রোতও তেমন। যে সাঁতারু নিজেকে শক্তিশালী মনে করে সে অনেক সময় জলের মাঝখানে গিয়ে বিপদে পড়ে। যে ভয় পেয়ে সাবধানে থাকে, সে তীরের কাছাকাছিই থাকে।

ক্লাসে যে ছেলেটা পড়াশোনা করে, শিক্ষকদের সম্মান করে, কাউকে কষ্ট দেয় না, সে প্রেম করার সাহসও দেখায় না, কাউকে ভালো লাগলেও সহজে বলতে পারে না। আর যদি অনেক সাহস সঞ্চার করে বলেও ফেলে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় মেয়েটা সায় দেয় না। আর যে ছেলেটা ক্লাস ফাঁকি দেয়, পেছনের বেঞ্চে বসে আড্ডা দেয়, শিক্ষকের পিঠ ফিরলে সবাইকে হাসায়, সে-ই পায় ক্লাসের সবচেয়ে সুন্দর মেয়েটার মন। ভালো ছেলেগুলো অবাক হয়ে ভাবে, “আমরা কি ভুল কিছু করলাম?” না, তারা ভুল কিছু করেনি। কিন্তু তারা এমন একটা খেলায় অংশ নিয়েছে যেখানে নিয়ম মানা পুরস্কারযোগ্য নয়, চোখে পড়াটা পুরস্কারযোগ্য।

এখানেও সেই একই সঙ্গদোষের মনোবিজ্ঞান কাজ করে, তবে একটু ভিন্নভাবে। মেয়েটা সচেতনভাবে “বাজে ছেলেকে” বেছে নেয়নি। সে বেছে নিয়েছে উত্তেজনাকে, অনিশ্চয়তাকে এবং সামাজিক দৃশ্যমানতাকে।

মানুষের মস্তিষ্ক, বিশেষত তরুণ বয়সে, অনিশ্চয়তাকে উত্তেজনা হিসেবে পড়ে। বাজে ছেলেটা কখন কী করবে, কেউ জানে না। এই না-জানার মধ্যে একটা টান আছে, যেটাকে অনেকে ভুলভাবে ‘রসায়ন’ বলে চেনে। আর ভালো ছেলেটা? সে নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য, কিন্তু সে চোখে পড়ে না। পরিচিত জিনিসে স্বভাবতই মুগ্ধতা কম।

ক্লাসের অনেকে যদি বাজে ছেলেটার দিকে তাকায়, তার ডাকে সাড়া দেয়, তাকে নিয়ে কথা বলে, তাহলে অবচেতন মন বলে, এই মানুষটার কোনো বিশেষ গুণ আছে। এটা যুক্তির কথা নয়, প্রবৃত্তির কথা। সঙ্গ শুধু সিগারেট ধরায় না। সঙ্গ মানদণ্ডও বদলে দেয়। কাকে ভালো লাগবে, কাকে চাওয়া উচিত, কে আকর্ষণীয়, এই সংজ্ঞাগুলোও সেই পরিবেশ থেকেই আসে।

বাইরের চোখ আর ভেতরের চোখ কখনও কখনও ভিন্ন হয়ে যায়।

রামপুরার চায়ের দোকানের ছেলেটা আর ক্লাসের সুন্দর মেয়েটা, দুজনেই একই কাজ করেছে। একজন সঙ্গের চাপে নিজেকে বদলে ফেলেছে, আরেকজন সঙ্গের তৈরি মানদণ্ডে ভুল জিনিসকে সঠিক মনে করেছে।

আর ভালো ছেলেটা? সে হয়তো সত্যিকারের ভালো মানুষ। কিন্তু যে পরিবেশে সে বড় হয়েছে, সেখানে ‘ভালো’ হওয়া যথেষ্ট নয়। কারণ ভালো মানুষ তৈরি করে স্থিরতা, আর স্থিরতাকে মানুষ অনেক সময় একঘেয়েমি মনে করে। বাজে ছেলেটা তৈরি করে অনিশ্চয়তা, আর অনিশ্চয়তাকে মানুষ ভুলভাবে জীবন্ত মনে করে।

এই ভুলের মাশুল দিতে হয় অনেক পরে। যখন উত্তেজনা ফুরিয়ে যায়, যখন অনিশ্চয়তা আর রোমাঞ্চ মনে হয় না বরং ভার মনে হয়, তখন মানুষ খোঁজে নির্ভরযোগ্যতা। তখন সে যাকে আগে একঘেঁয়ে মনে করেছিল, তাকেই খোঁজে।

নিজেকে হারিয়ে খুঁজতে থাকি অনন্তকাল।

কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে যায়। কারণ ভালো মানুষও অপেক্ষায় থাকতে থাকতে একদিন শেখে যে অপেক্ষা করে লাভ নেই। আর ঠিক সেইদিন থেকে পৃথিবীতে আরেকটা ভালো মানুষ কমে যায়।

সঙ্গ বাছুন, নিজের জন্য

পুরনো বাংলায় একটা কথা ছিল, “সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ”। কথাটা ধর্মীয় আবরণে বলা, কিন্তু এর মনস্তাত্ত্বিক সত্যতা আধুনিক গবেষণাও স্বীকার করে। আপনি কাদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন, কাদের কথা শুনছেন, কাদের হাসিতে হাসছেন, এই ছোট ছোট সিদ্ধান্তগুলোই আপনার পরবর্তী পাঁচ বছরের মানুষটাকে তৈরি করছে। একইভাবে, কাকে ভালো লাগবে, কাকে বেছে নেবেন, এই সিদ্ধান্তও আপনার একা নয়, পরিবেশ এখানে কানে কানে কথা বলে।

খারাপ মানুষকে বাঁচানোর দায়িত্ব আপনার না। নিজেকে হারিয়ে ফেলার বিনিময়ে কাউকে ভালো করা যায় না। নিজে ডুবে অন্যকে সাঁতার শেখানো যায় না, এটা নিছক বোকামি।

নিজের দিগন্ত নিজেই খুঁজে নিতে পারে মানুষ

মানুষই একমাত্র প্রাণী যে নিজের পরিবেশ নিজে বেছে নিতে পারে। সেই বেছে নেওয়ার স্বাধীনতাটুকু হেলায় হারাবেন না। মনে রাখবেন, লোহা পানিতে ডোবে, কিন্তু নাবিক পানির ওপর ভাসে। পার্থক্যটা হলো, নাবিক জানে কোথায় দাঁড়াতে হয়।

লেখক: চিফ, ভিডিও এডিটিং বিভাগ, সংবাদ ডিজিটাল

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ০৮ মে ২০২৬


খারাপের প্রতি ‘ঝোঁক’ কেন স্বাভাবিক

প্রকাশের তারিখ : ০৮ মে ২০২৬

featured Image

‘সকালবেলা মেয়েকে স্কুলে দিয়ে রামপুরার একটি দোকানে এক কাপ চা খাওয়ার অভ্যাস আমার নিত্যদিনের। প্রতিদিন পাঁচ-ছয়জন ছেলে সেখানে আড্ডা দেয়। তাদের মধ্যে একটা ছেলে প্রথম প্রথম চুপ করে বসে থাকত। বাকিরা সিগারেট, চা হাতে নিয়ে তাদের কোনো না কোনো শিক্ষকের নামে গীবত করত, সে অস্বস্তিতে চা খেত। তাদের মধ্যে কেউ একজন একটি সিগারেট দিয়ে বলত, 'নে একটান দে।' পাশের ছেলেরা বলত, ‘অরে দিয়া লাভ নাই, ও ফিডার ছাড়া কিছু খায় না।’

সপ্তাহ দুয়েক পরে আজ দেখলাম, সেই ছেলেই সবচেয়ে জোরে জোরে হাসছে। এসেই বলল, ‘মামা একটা ব্যানসন দাও।' আমি দীর্ঘক্ষণ ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। পাশের দোকানি আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মামা, ছেলেটা ভালো ছিল, পোলাপাইনের লগে মিশে ফাতরা হয়ে গেছে।' বলছিলেন মোহাম্মদ নিজামুদ্দিন নামে এক চাকরীজীবী।

আদিম মানুষেরা দল বাঁধতো। সেই দলে ব্যক্তির স্বতন্ত্র হওয়ার সুযোগ কম থাকতো।

কথায় বলে সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে। এই পৃথিবীতে খারাপ মানুষের সংখ্যা খুব কম। কিন্তু এদের বিস্তার ভয়াবহ। এরা ভালোকে মন্দের দিকে প্রভাবিত করতে পারে খুব সহজে। পানিকে যে পাত্রে রাখা হয়, সে সেই পাত্রের আকার ধারন করে। মানুষও অনেকটা তেমন। পরিবেশের চাপে, সঙ্গীদের প্রভাবে, ধীরে ধীরে নিজের আকার বদলায়। কিন্তু পার্থক্য হলো, পানি যখন পাত্র বদলায় তখন আবার নতুন আকার নেয়। মানুষ একবার বেঁকে গেলে সহজে সোজা হয় না।

মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘সামাজিক অনুসরণ’। মানুষ স্বভাবতই দলের সঙ্গে মিলে যেতে চায়। কারণ লক্ষ লক্ষ বছর ধরে মানব সভ্যতায় দল থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া মানে ছিল মৃত্যু। সেই প্রবৃত্তি এখনো আমাদের মাথার ভেতরে গেঁথে আছে। কিন্তু এই প্রবণতাই যখন খারাপ সঙ্গের মাঝে পড়ে, তখন সেটি মানুষকে ভেতর থেকে বদলে দেয়। ধীরে ধীরে, টের পাওয়ার আগেই।

যেভাবে শুরু হয় পতন, ধাপে ধাপে

প্রথমে আসে মানিয়ে নেওয়ার ইচ্ছা। অফিসে নতুন যোগ দিয়েছেন, বা নতুন পাড়ায় উঠেছেন। আশেপাশের মানুষগুলো একটু অন্যরকম। তারা হয়তো সহকর্মীর পেছনে কথা বলে, বা ফাঁকি দেওয়াকে বুদ্ধিমানের কাজ মনে করে। আপনি বিরক্ত হন, কিন্তু মুখে কিছু বলেন না। কারণ নতুন জায়গায় উল্টোপাল্টা কথা বলাটা বুদ্ধিমানের না। এই চুপ করে থাকাটাই প্রথম ধাপ।

দ্বিতীয় ধাপে আসে হালকা অংশগ্রহণ। একদিন কেউ জিজ্ঞেস করে, ‘আচ্ছা, নেসার সাহেব কেমন মানুষ বলো তো?' আপনি হয়তো বলেন, ‘বেশি একটা চিনি না।' এটা মিথ্যা না, কিন্তু পুরোপুরি সত্যিও না। আসলে আপনি জানেন নেসার সাহেব ভালো মানুষ, কিন্তু দলের মতের বিরুদ্ধে যেতে মন চায় না।

তৃতীয় ধাপে আসে যুক্তিতর্কের পুনর্গঠন। মানুষ নিজেকে ভালো মনে করতে চায়, এটাই স্বাভাবিক। তাই সে নিজের পরিবর্তনকে সমর্থন করার জন্য নিজের মনের ভেতরেই নতুন যুক্তি তৈরি করে। “আসলে ঘুষ না নিলে টিকে থাকা যায় না”, “সবাই তো করছে, আমি না করলে কী হবে?”, “এটা তো আর বড় কিছু না”।  মনোবিজ্ঞানে এর নাম “কগনেটিভ ডিজোনেন্স রিডাকশন”। অর্থাৎ নিজের কাজ আর নিজের বিশ্বাসের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, মানুষ সেটা কমাতে বিশ্বাসটাকেই বদলে ফেলে।

নিজেকে পড়ে, নিজের ভেতরে আবদ্ধ হওয়া কঠিন

চতুর্থ ধাপে, যখন আর নিজেও টের পায় না, অভ্যাস হয়ে যায়। একটা সময় ছিল, সারাদিন অফিসের পর যখন রাতে ঘুমানোর আগে অস্থিরতা লাগত, কেন এমন হয়? সবাই একটু ভালোভাবে ভালোবেসে কাজগুলো শেষ করলেই হয়, মাস শেষে অফিস থেকে যে টাকাটা পাচ্ছি তা হালাল হচ্ছে তো। এখন আর অস্থিরতা কাজ করে না। বিবেকের কণ্ঠস্বর ক্রমশ নিচু হতে হতে একদিন প্রায় নিঃশব্দ হয়ে যায়।

ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় আসা ছেলেটা গ্রামে সবার প্রিয়, সৎ, কথা রাখে। মেসে উঠেছে নতুন বন্ধুদের সঙ্গে। এখানে রাত জেগে আড্ডা, ফাঁকিবাজি, হয়তো ছোট ছোট অসততা। প্রথম মাসে সে অস্বস্তিতে ছিল। দুই বছর পরে সে নিজেই মেসের নতুন ছেলেটিকে নতুন নতুন ফন্দি শেখাচ্ছে।

অফিসের সৎ কর্মকর্তা ঘুষ নেন না, নিয়ম মেনে চলেন। কিন্তু সারাদিন যাদের সঙ্গে কাজ করছেন, তারা সবাই ভিন্ন পথের পথিক। একা একা সৎ থাকতে গেলে কাজ আটকায়, পদোন্নতি হয় না, সহকর্মীরা দূরত্ব রাখে। কোনো একদিন সে হিসাব মেলাতে বসে এবং সিদ্ধান্ত নেয়, “একটু মিলিয়ে চলব।”

এই গল্পগুলো ব্যতিক্রম না। এগুলোই নিয়ম। তাহলে উল্টোটা কেন হয় না? খারাপ মানুষ ভালো কেন হয় না?

সুন্দরীরা সাময়িকভাবে বখাটেদের পাল্লায় পড়ে। তবে...

যদি সঙ্গের প্রভাব এত শক্তিশালী, তাহলে একজন খারাপ মানুষকে ভালো মানুষের সঙ্গে রাখলে তারও তো হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবতা তা বলে না। কারণটা হলো বিনিয়োগের অসামঞ্জস্য। খারাপ অভ্যাস মানুষকে স্বল্পমেয়াদি সুবিধা দেয়। আরাম, ক্ষমতা, অর্থ, বা অন্তত ঝামেলা এড়ানো। ভালো থাকার জন্য লাগে ধৈর্য, ত্যাগ ও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি। একজন যে মিথ্যা বলে অভ্যস্ত, তার কাছে সত্য বলা মানে ঝামেলা ডেকে আনা। সে কেন সেই কষ্ট নেবে, যদি না তার ভেতর থেকে পরিবর্তনের তীব্র ইচ্ছা না জাগে?

আরেকটি কারণ হলো পরিচয়ের সংকট। খারাপ মানুষটির চারপাশে যারা আছে তারা তার এই রূপটাকেই চেনে। ভালো মানুষের সঙ্গে থাকলেও তার নিজের পুরনো দল আছে, পুরনো সম্পর্ক আছে, পুরনো পরিচয় আছে। সেই টান সহজে কাটে না।

“কয়লা ধুলে ময়লা যায় না”- কথাটা নিষ্ঠুর শোনালেও এর পেছনে একটা মনস্তাত্ত্বিক সত্য আছে। পরিবর্তন তখনই হয় যখন মানুষ নিজে চায়। বাইরে থেকে আলো ঢেলে দিলেই অন্ধকার যায় না, ভেতর থেকে জানালা খুলতে হয়।

ভালো মানুষ কেন বেশি ঝুঁকিতে?

এটা পরস্পরবিরোধী শোনাবে, কিন্তু সত্যি যে ভালো মানুষরাই বেশি ঝুঁকিতে থাকে। কারণ ভালো মানুষের মধ্যে থাকে সহানুভূতি। সে মানুষের দোষ বোঝার চেষ্টা করে, মাফ করে দেয়, সুযোগ দেয়। এই গুণগুলোই তাকে দুর্বল করে তোলে খারাপ সঙ্গের সামনে। আবার ভালো মানুষের থাকে অপরাধবোধ। কাউকে ‘না’ বলতে পারে না, বন্ধুত্ব হারাতে ভয় পায়। এই দুর্বলতাকে কাজে লাগায় তার চারপাশের মানুষেরা, সচেতনভাবেই, কিন্তু আপনার অবচেতনে।

দ্বন্দ্ব আসে ভেতর থেকেই। ভালো আর মন্দের বিভেদ করার দ্বন্দ্ব

সবচেয়ে বড় কথা, ভালো মানুষ ধরে নেয় সে নিরাপদ। সে ভাবে, “আমার মূল্যবোধ শক্ত, আমি বদলাব না”। এই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসই তাকে সতর্ক হতে বাধা দেয়। নদীর স্রোতও তেমন। যে সাঁতারু নিজেকে শক্তিশালী মনে করে সে অনেক সময় জলের মাঝখানে গিয়ে বিপদে পড়ে। যে ভয় পেয়ে সাবধানে থাকে, সে তীরের কাছাকাছিই থাকে।

ক্লাসে যে ছেলেটা পড়াশোনা করে, শিক্ষকদের সম্মান করে, কাউকে কষ্ট দেয় না, সে প্রেম করার সাহসও দেখায় না, কাউকে ভালো লাগলেও সহজে বলতে পারে না। আর যদি অনেক সাহস সঞ্চার করে বলেও ফেলে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় মেয়েটা সায় দেয় না। আর যে ছেলেটা ক্লাস ফাঁকি দেয়, পেছনের বেঞ্চে বসে আড্ডা দেয়, শিক্ষকের পিঠ ফিরলে সবাইকে হাসায়, সে-ই পায় ক্লাসের সবচেয়ে সুন্দর মেয়েটার মন। ভালো ছেলেগুলো অবাক হয়ে ভাবে, “আমরা কি ভুল কিছু করলাম?” না, তারা ভুল কিছু করেনি। কিন্তু তারা এমন একটা খেলায় অংশ নিয়েছে যেখানে নিয়ম মানা পুরস্কারযোগ্য নয়, চোখে পড়াটা পুরস্কারযোগ্য।

এখানেও সেই একই সঙ্গদোষের মনোবিজ্ঞান কাজ করে, তবে একটু ভিন্নভাবে। মেয়েটা সচেতনভাবে “বাজে ছেলেকে” বেছে নেয়নি। সে বেছে নিয়েছে উত্তেজনাকে, অনিশ্চয়তাকে এবং সামাজিক দৃশ্যমানতাকে।

মানুষের মস্তিষ্ক, বিশেষত তরুণ বয়সে, অনিশ্চয়তাকে উত্তেজনা হিসেবে পড়ে। বাজে ছেলেটা কখন কী করবে, কেউ জানে না। এই না-জানার মধ্যে একটা টান আছে, যেটাকে অনেকে ভুলভাবে ‘রসায়ন’ বলে চেনে। আর ভালো ছেলেটা? সে নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য, কিন্তু সে চোখে পড়ে না। পরিচিত জিনিসে স্বভাবতই মুগ্ধতা কম।

ক্লাসের অনেকে যদি বাজে ছেলেটার দিকে তাকায়, তার ডাকে সাড়া দেয়, তাকে নিয়ে কথা বলে, তাহলে অবচেতন মন বলে, এই মানুষটার কোনো বিশেষ গুণ আছে। এটা যুক্তির কথা নয়, প্রবৃত্তির কথা। সঙ্গ শুধু সিগারেট ধরায় না। সঙ্গ মানদণ্ডও বদলে দেয়। কাকে ভালো লাগবে, কাকে চাওয়া উচিত, কে আকর্ষণীয়, এই সংজ্ঞাগুলোও সেই পরিবেশ থেকেই আসে।

বাইরের চোখ আর ভেতরের চোখ কখনও কখনও ভিন্ন হয়ে যায়।

রামপুরার চায়ের দোকানের ছেলেটা আর ক্লাসের সুন্দর মেয়েটা, দুজনেই একই কাজ করেছে। একজন সঙ্গের চাপে নিজেকে বদলে ফেলেছে, আরেকজন সঙ্গের তৈরি মানদণ্ডে ভুল জিনিসকে সঠিক মনে করেছে।

আর ভালো ছেলেটা? সে হয়তো সত্যিকারের ভালো মানুষ। কিন্তু যে পরিবেশে সে বড় হয়েছে, সেখানে ‘ভালো’ হওয়া যথেষ্ট নয়। কারণ ভালো মানুষ তৈরি করে স্থিরতা, আর স্থিরতাকে মানুষ অনেক সময় একঘেয়েমি মনে করে। বাজে ছেলেটা তৈরি করে অনিশ্চয়তা, আর অনিশ্চয়তাকে মানুষ ভুলভাবে জীবন্ত মনে করে।

এই ভুলের মাশুল দিতে হয় অনেক পরে। যখন উত্তেজনা ফুরিয়ে যায়, যখন অনিশ্চয়তা আর রোমাঞ্চ মনে হয় না বরং ভার মনে হয়, তখন মানুষ খোঁজে নির্ভরযোগ্যতা। তখন সে যাকে আগে একঘেঁয়ে মনে করেছিল, তাকেই খোঁজে।

নিজেকে হারিয়ে খুঁজতে থাকি অনন্তকাল।

কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে যায়। কারণ ভালো মানুষও অপেক্ষায় থাকতে থাকতে একদিন শেখে যে অপেক্ষা করে লাভ নেই। আর ঠিক সেইদিন থেকে পৃথিবীতে আরেকটা ভালো মানুষ কমে যায়।

সঙ্গ বাছুন, নিজের জন্য

পুরনো বাংলায় একটা কথা ছিল, “সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ”। কথাটা ধর্মীয় আবরণে বলা, কিন্তু এর মনস্তাত্ত্বিক সত্যতা আধুনিক গবেষণাও স্বীকার করে। আপনি কাদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন, কাদের কথা শুনছেন, কাদের হাসিতে হাসছেন, এই ছোট ছোট সিদ্ধান্তগুলোই আপনার পরবর্তী পাঁচ বছরের মানুষটাকে তৈরি করছে। একইভাবে, কাকে ভালো লাগবে, কাকে বেছে নেবেন, এই সিদ্ধান্তও আপনার একা নয়, পরিবেশ এখানে কানে কানে কথা বলে।

খারাপ মানুষকে বাঁচানোর দায়িত্ব আপনার না। নিজেকে হারিয়ে ফেলার বিনিময়ে কাউকে ভালো করা যায় না। নিজে ডুবে অন্যকে সাঁতার শেখানো যায় না, এটা নিছক বোকামি।

নিজের দিগন্ত নিজেই খুঁজে নিতে পারে মানুষ

মানুষই একমাত্র প্রাণী যে নিজের পরিবেশ নিজে বেছে নিতে পারে। সেই বেছে নেওয়ার স্বাধীনতাটুকু হেলায় হারাবেন না। মনে রাখবেন, লোহা পানিতে ডোবে, কিন্তু নাবিক পানির ওপর ভাসে। পার্থক্যটা হলো, নাবিক জানে কোথায় দাঁড়াতে হয়।


লেখক: চিফ, ভিডিও এডিটিং বিভাগ, সংবাদ ডিজিটাল


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত