নতুন ইটের বাড়ি তৈরি শেষ হয়েছে মাত্র। কথা ছিল ঈদুল আজহার পর বিয়ে করবেন ২১ বছরের তরুণ তারেক রহমান। কিন্তু একটি সড়ক দুর্ঘটনা তার সেই স্বপ্ন আর পরিবারের সব আশা এক নিমেষেই ধূলিসাৎ করে দিল। পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে বাড়ি ফেরার পথে প্রাণ হারিয়েছেন তারেকসহ নওগাঁর মান্দা উপজেলার ১২ জন ফেরিওয়ালা।
সোমবার (২৫ মে) ভোরে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলায় রডবোঝাই একটি ট্রাক উল্টে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। এতে মোট ১৬ জন নিহত হয়েছেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নিহতদের মধ্যে ১২ জনের বাড়ি নওগাঁর মান্দা উপজেলার ভারশোঁ ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে এবং একজনের বাড়ি নিয়ামতপুর উপজেলার মালঞ্চি গ্রামে। তবে এখন পর্যন্ত ১২ জনের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে।
নিহতদের মধ্যে মান্দা উপজেলার রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের তারেক রহমান, আব্দুল বারেক, মোহাম্মদ বাদশা, মো. সোহাগ, মোহাম্মদ রবিউল ও মোহাম্মদ সাগর রয়েছেন। এ ছাড়া একই উপজেলার মুর্শিদপুর গ্রামের মইনুর ইসলাম এবং পাকুড়িয়া গ্রামের দুই ভাই মাইনুল ও গিয়াসউদ্দিনের মৃত্যু হয়েছে।
নিহতদের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তারা সবাই পেশায় ‘হরেক মাল’ বিক্রেতা বা ভ্রাম্যমাণ হকার ছিলেন। দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে তারা পুরোনো মোবাইল ও পরিত্যক্ত প্লাস্টিকসহ নানা জিনিসপত্র কেনাবেচা করতেন। প্রায় ২০ দিন আগে ব্যবসার কাজে তারা নোয়াখালী গিয়েছিলেন।
ঈদ উপলক্ষে বাড়ি ফিরতে তারা নোয়াখালী থেকে রওনা হন। যাতায়াত খরচ বাঁচাতে ফেনী থেকে উত্তরবঙ্গগামী একটি রডবোঝাই ট্রাকে চড়ে বসেন। কিন্তু টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে পৌঁছালে ট্রাকটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই ১৫ জনের মৃত্যু হয়, পরে হাসপাতালে আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে।
নিহত তারেক রহমানের বাড়ি রাজেন্দ্রবাটি গ্রামে। তার অকাল মৃত্যুতে পরিবারে চলছে শোকের মাতম। দুই ছেলের উপার্জনে সদ্য তৈরি করা পাকা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন বাবা সুলতান ও মা মোমেনা বেগম।
শোকাতুর কণ্ঠে সুলতান বলেন, ‘আমার দুই ছেলে নোয়াখালীতে হরেক মালের ব্যবসা করত। তাদের কষ্টার্জিত টাকায় ভাঙা ঘর মেরামত করে ইটের দেয়াল দিয়েছি। এখনো চাল দেওয়া হয়নি। কথা ছিল বাড়ি শেষ হলে ছোট ছেলেকে বিয়ে দেব। কিন্তু সব শেষ হয়ে গেল।’
মা মোমেনা বেগম বিলাপ করে বলছিলেন, ‘ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে কত কষ্ট করে ভাঙা ঘরে থাকতাম। ছেলেরা আমাদের কষ্টের দিন শেষ করেছিল। আজ সকালে খবর পেলাম আমার ছোট ছেলেটা আর ফিরবে না, লাশ হয়ে ফিরছে।’
নিহতদের পরিবারের সদস্যদের এমন আহাজারিতে পুরো এলাকার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। একই ইউনিয়নের এতগুলো প্রাণ অকালে ঝরে যাওয়ায় স্তব্ধ হয়ে পড়েছে গ্রামগুলো।
মান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খোরশেদ আলম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, টাঙ্গাইলে ট্রাক উল্টে নিহত হওয়ার ঘটনায় এখন পর্যন্ত মান্দা উপজেলার ৯ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। মরদেহগুলো গ্রামের বাড়িতে আনার প্রক্রিয়া চলছে।
আপনার মতামত লিখুন