সংবাদ

বাংলা উপন্যাসে নদী : জীবন, সমাজ ও সংস্কৃতির বহুমাত্রিক প্রতিফলন


অয়নিকা আলপনা
অয়নিকা আলপনা
প্রকাশ: ৯ জুলাই ২০২৬, ০২:২২ এএম

বাংলা উপন্যাসে নদী : জীবন, সমাজ ও সংস্কৃতির বহুমাত্রিক প্রতিফলন
অপরাহ্ণের পদ্মা নদী

উপন্যাস সাহিত্যে নদী গুরুত্বপূর্ণ অপরিহার্য নান্দনিক প্রবাহধারা| পাশ্চাত্য সাহিত্যিকদের মতো পাশ্চ্য সহিত্যিকবৃন্দ নদী এবং মানুষের জীবনের যোগসূত্রতাকে নির্ণয় করেছেন| পাশ্চাত্য সাহিত্যিক মারিয়া এজওয়ার্থ, উইলিয়াম ফকনার, জিন গিয়ালো, মিখাইল শলোকভ, এমিলিয়া পারদো বাজান  প্রমুখ নদীকেন্দ্রিক যাপিতজীবনকে সাহিত্যে স্থান দিয়েছেন| এসব উপন্যাসে গ্রামীণ মানবজীবনের চিত্রের পাশাপাশি নানাবিধ উপাদান তথা প্রেম, রাজনীতি, সমাজ, নানামুখী মনস্তত্ত্ব, বিদ্রোহ, বিপ্লব-সংহতি প্রভৃতির চিত্র উপস্থাপিত হয়েছে| বাংলা সাহিত্যে নদীকেন্দ্রিক উল্লেখযোগ্য উপন্যাসমানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি, অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নাম, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাঁসুলী বাঁকের উপকথা, সমরেশ বসুর গঙ্গা, আবু ইসহাকের পদ্মার পলিদ্বীপ, আলাউদ্দীন আল আজাদের কর্ণফুলী, শহীদুল্লাহ কায়সার সারেং বৌ হুমায়ুন কবিরের নদী নারী কাজী আবদুল ওদুদের নদীবক্ষে, দেবেশ রায়ের তিস্তাপারের বৃত্তান্ত, তিস্তাপুরাণ, প্রমথনাথ বিশীর কোপবতী, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের, গঙ্গা একটি নদীর নাম, শামসুদ্দীন আবুল কালামের সমুদ্র বাসর, হারুন পাশার তিস্তা প্রভৃতি| নদীকে কেন্দ্র করে সভ্যতার সূচনা বিকাশ| নদী মানবজীবনকে নিয়ন্ত্রণ করেছে, আবার সভ্যতার ঐশ্বর্য ধ্বংসের পেছনেও নদীর অবদান রয়েছে| নদী যেমন মানুষকে বেঁচে থাকার প্রেরণা যোগায়তেমনই রাহুর মতো সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে তাকে নিঃস্বও করে দেয়| উপর্যুক্ত নদীভিত্তিক উপন্যাসে জীবন গড়া ভাঙার খেলায় নদী রহস্যময়ী হিসেবে চিত্রায়িত; নদী যেন নারীর শরীরধারীচঞ্চল শরীরের পরতে পরতে যার ভিন্ন ভিন্ন রূপের মাধুরী|

আধুনিক বাংলা উপন্যাসের সার্থক স্রষ্টা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দুর্গেশনন্দিনী কিংবা কৃষ্ণকান্তের উইল- নদীর প্রসঙ্গ উঠে আসলেও তাঁর চন্দ্রশেখর উপন্যাসে নদী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে| রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নৌকাডুবি, গোরা উপন্যাসে নদী নদীকেন্দ্রিক মানুষের জীবন স্থান পেয়েছে| নৌকাডুবিতে নদীকেন্দ্রিক জেলে-মাঝিদের চিত্র লক্ষণীয়| গোরাতে জীবন উপলব্ধির সার্থক চিত্র নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে| শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বড়দিদি উপন্যাসে নদীকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের যাপিতজীবন প্রবাহকে তুলে ধরেছেন| জেলেজীবনের সুখ-দুঃখের চিত্র ব্যাপক বিস্তৃত আকার লাভ করেছে শ্রীকান্ত উপন্যাসে| বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় নদীর নামকরণে ইছামতি উপন্যাস রচনা করেছেন| জীবনবাস্তবতার চিত্র ঐতিহাসিক চিত্র উপন্যাসটির পারস্পরিক যোগসূত্রকে সমন্বি করেছে| আফগান যুদ্ধ, তিতুমীর, নীল বিদ্রোহ, ছোট লাটের নদীর পরিদর্শন প্রভৃতির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট উপন্যাসের গতিকে সমৃদ্ধ করেছে| এছাড়া প্রকৃতির জীবনঘনিষ্ঠ ছবি যেমন দুই তীরে ঘন সবুজ ঝোপ, জলের ওপর লতার দুলনি, বট, অশ্ব, বৈবচি, বাঁশঝাড়, গাঙ শালিকের গর্ত, বাবলার সোনালি ফুল, ওপার থেকে নীল মালার ভেসে আসার চিত্রকে ঔপন্যাসিক নান্দনিকভাবে চিত্রায়িত করেছেন|

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় হাঁসুলী বাঁকের উপকথা উপন্যাসে কোপাই নদীকে অবলম্বন করে সমাজের বিস্তার লক্ষণীয়| এছাড়া তিনি কালিন্দী নদীকে কেন্দ্র করে কালিন্দী উপন্যাস রচনা করেছেন| মনোজ বসু দক্ষিণবঙ্গের নদী, নদীতীরবর্তী মানুষের জীবন এবং সুন্দরবনের চিত্র অঙ্কন করেছেন তাঁর জল জঙ্গল উপন্যাসে| এছাড়া তিনি ময়ূরাক্ষী নদীকে নিয়ে রচনা করেছেন ময়ূরাক্ষী উপন্যাসযেখানে নদী বিনোদিনী একই সুতোয় গাথা এবং নদীর নিঃশব্দতার মাঝে বিনোদিনী নিজের জীবনকে খুঁজে পায়|

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসে পদ্মা নদী কেবল একটি ভৌগোলিক উপাদান নয়; এটি কাহিনির কেন্দ্রীয় শক্তিযা চরিত্র, সমাজ জীবনকে গভীরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে| কুবের, কপিলা, হোসেন মিয়া প্রমুখ জেলে সম্প্রদায়ের মানুষের জীবন নদীকেন্দ্রিকমাছ ধরা, নৌযাত্রা নদীর ওপর নির্ভরশীল জীবনযাপন তাদের অস্তিত্বের মূল ভিত্তি| একই সঙ্গে পদ্মা নদী প্রকৃতির অনিশ্চয়তা নির্মমতার প্রতীক| নদীর ভাঙন, প্রবল স্রোত ঝড় মানুষের জীবনে বারবার বিপর্যয় ডেকে আনে| এছাড়া নদী চরিত্রগুলোর আবেগ মানসিকতার প্রতিফলন হিসেবেও কাজ করে| কুবেরের টানাপোড়েন, কপিলার সঙ্গে তার সম্পর্ক জীবনের অনিশ্চয়তানদীর স্রোতের মতো পরিবর্তনশীল| পদ্মা তীরবর্তী মানুষের জীবনযাপন, তাদের নৌকা, মাছ ধরা, বাজার, ধর্মীয় বিশ্বাস, প্রেম, সহিংসতা কুসংস্কারসবকিছুই যেন নদীর গতিপথের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে| এছাড়া নদীর মাধ্যমে ভাষা সংস্কৃতির বৈচিত্র্য লক্ষণীয়প্রত্যেক চরিত্রের জীবনভাষা অভিজ্ঞতা আলাদাযা নদী তীরবর্তী সমাজের বহুমাত্রিকতা নির্দেশ করে|

গঙ্গা নদীকে কেন্দ্র করে কমলকুমার মজুমদার অন্তর্জলী যাত্রা নির্মাণ করেছেন| উপন্যাসের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে গঙ্গা নদীউপন্যাসের শুরু শেষ নদীকে আবর্তন করে| উপন্যাসে নদী কাহিনির কেন্দ্রীয় প্রতীক এবং নদী জীবন, মৃত্যু, ধর্মবিশ্বাস মানবিকতার গভীর সংকটকে বহুমাত্রিকভাবে প্রকাশ করে| নদীকে ঘিরে উপন্যাসের পরিবেশ যেমন নির্মিততেমনই প্রতিটি চরিত্রের মানসিক অবস্থাও এর সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত| নদী এখানে জীবন মৃত্যুর সীমানা নির্দেশ করে| মৃত্যুপথযাত্রী বৃদ্ধকে নদীর তীরে এনে রাখা হয় এই বিশ্বাসে যেসেখানে মৃত্যুবরণ করলে আত্মার মুক্তি বা মোক্ষলাভ হবে| ফলে নদী তার কাছে একদিকে চূড়ান্ত আশ্রয়, অন্যদিকে অসহায় প্রতীক্ষার প্রতীক| জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো নদীর তীরে নীরব উপস্থিতির মধ্যে কাটায়যা মৃত্যুর অনিবার্যতাকে স্পষ্ট করে| অন্যদিকে নববধূর দাম্পত্য জীবনের সূচনা ঘটে নদীর তীরে, মৃত্যুর ছায়ায়| নদীর বিস্তৃত নীরবতা নির্জনতা নববধূর অন্তর্গত শূন্যতা, আতঙ্ক নিঃসঙ্গতাকে বহুগুণে বাড়িয়ে তোলেএখানে নদী তার ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন অপ্রাপ্তির প্রতীক হয়ে ওঠে| পুরোহিত ধর্মান্ধ সমাজের প্রতিনিধিদের কাছে নদী পবিত্রতার আধার| তারা বিশ্বাস করে নদীর তীরে মৃত্যুই আত্মার পরিত্রাণ নিশ্চিত করেতাদের বিশ্বাস নদীকে আধ্যাত্মিক মর্যাদা দিলেও বাস্তবে নির্মম সামাজিক প্রথাকে বৈধতা দেয়—  যেখানে মৃত্যুপথযাত্রী মানুষকে মানবিক সেবা থেকে বঞ্চিত করে নদীর ধারে ফেলে রাখা হয়| ফলে নদী হয়ে ওঠেএকদিকে ধর্মীয় মুক্তির প্রতীক, অন্যদিকে কুসংস্কার অমানবিকতার বাহক| মানুষের জন্ম-মৃত্যু, দুঃখ-বেদনাসবকিছুর ঊর্ধ্বে নদী নিজের গতিতে বহমান থাকে ˆবপরীত্য উপন্যাসের দার্শনিক গভীরতাকে আরও তীব্র করে|

অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের অনবদ্য সৃষ্টিযেখানে কুমিল্লা জেলার তিতাস নদী তার তীরবর্তী মানুষের জীবন গভীরভাবে চিত্রিত হয়েছে| উপন্যাসে নদী জীবন, সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে| উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্রতিতাস নদী| উপন্যাসের শুরুই হয়েছে নদীকে ঘিরে— ‘তিতাস একটি নদীর নাম...’ পরিচয়ের মধ্য দিয়েই নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে| তিতাসের কূলজুড়ে গড়ে ওঠা মানুষের জীবন, তাদের স্বপ্ন, বেদনা অস্তিত্বের সংগ্রাম নদীর সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে যুক্ত| তিতাস নদীকে কেন্দ্র করে মালো সম্প্রদায়ের জীবন গড়ে উঠেছে| মাছ ধরা, নৌকা চালানো, বাজারে মাছ বিক্রি করাতাদের জীবিকার প্রধান মাধ্যম| কিন্তু এই জীবিকা যেমন আনন্দের, তেমনই অনিশ্চয়তা ভরপুর| নদীর স্বাভাবিক গতিপথে ভাঙন, শুকিয়ে যাওয়া বা দখল হয়ে যাওয়ার ফলে তাদের জীবনও বারবার বিপর্যস্ত হয়| তাসত্ত্বে নৌকা বাইচ উৎসবকে কেন্দ্র করে মানুষের আনন্দ চিত্র লক্ষণীয়তাদের জীবনের অপরিহার্য উপকরণ এই নৌকা দৌড় খেলা| দুপাড় ঘিরে হাজার হাজার ছোটবড় নৌকা— ‘এইভাবে যত দূর চোখ মেলা যায় কেবল নৌকা আর নৌকা, আর তাতে মানুষের বোঝাই| নদীর মাঝখান দিয়া দৌড়ের নৌকার প্রতিযোগিতা|’ বিভিন্ন গানের সুর ভেসে ওঠে তিতাসের স্রোতে| এসব গানে প্রেম কিংবা বেদনার গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে| রাধা-কৃষ্ণের অপার্থিব প্রেম তিতাস পাড়ের মানুষের হৃদয়ে দোলা দেয়| এসব গান জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ| এছাড়া পালাগানের পরস্পরের প্রতি বাক আক্রমণের পাশাপাশি আদিরসের বিস্তার লক্ষণীয়| উপন্যাসে মুর্শিদি গান, বাউল গান, মারফতী গান, পুঁথি পড়া, পদ্মপুরাণের লোকসংস্কৃতি উঠে এসেছে| বেদেনিদের জীবনচিত্রও উপন্যাসে লক্ষণীয়তারা নৌকা করে এসে নদীতে নোঙর ফেলে| আয়না, চিরুনি, বঁড়শি, মাথার কাঁটা, কাচের চুড়ি, পুতির মালা বিক্রি করে এবং সাপের খেলা দেখিয়ে তারা জীবন নির্বাহ করে| আবিরের ছোঁয়ায় নিজেদের রঙিন করা এবং নানাধরনের গান নাচানাচি করে আনন্দ করাসমস্তই লোক-বাংলার সংস্কৃতি| ‘মেয়েদের রঙ-মাখামাখির পালা চলিতেছে, এদিকে পুরুষের হোলি-গান শুরু হইয়াছে| একজনকে সাজাইয়াছে হোলির রাজা| তার গলায় কলাগাছের খোলের মালা, মাথায় কলাপাতার টাপর, পরনে ছেঁড়া ধুতি, গায়ে ছেঁড়া ফতুয়া| মাঝে মাঝে উঠিয়া কোমর বাঁকাইয়া নাচে, আবার বসিয়া বিরাম নেয়|’ মালোদের সংস্কৃতির অধঃপতিত রূপ বা শেকড়ে টান লাগার চিত্রও অদ্বৈত মল্লবর্মণ তুলে ধরেছেন| বাসন্তীর মধ্য দিয়ে বিষয়টি ব্যাপ্ত হয়েছেনিজস্ব সংস্কৃতির অবক্ষয় যন্ত্রণাকে ধারণ করে| অপরদিকে বাসন্তীর নিজের যন্ত্রণাও যেন তিতাসের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছেফলে তিতাস বাসন্তী যেন এক সত্তায় পরিণত হয়েছে| অদ্বৈত মল্লবর্মণ তাঁর ˆশশব লালিত অভিজ্ঞতাকে মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনায় উপন্যাস উপস্থাপন করেছেন| উপন্যাসটির লোকজ উপাদান, গঠনশৈলী, ভাষা, চরিত্র, মনস্তত্ত্ব প্রভৃতি বিচার্য বিষয়| মালোদের জীবন বদলে নানামাত্রিক চিত্রযা কখনো আনন্দের কখনো বা সর্বস্ব হারানোর ব্যাকুলতা-আর্তনাদের চিত্র, কিংবা বিদেশি সংস্কৃতির আগমনে নিজস্ব সংস্কৃতির নিবু নিবু অবস্থা উপস্থাপিত হয়েছে| তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসে নদী শুধু একটি প্রাকৃতিক উপাদান নয়; এটি একটি জাতিগোষ্ঠীর জীবন, সংস্কৃতি, ইতিহাস অস্তিত্বের প্রতীক| নদী যেমন জীবন দেয়তেমনই তার পরিবর্তনে জীবনও ধ্বংস হয়ে যায় ˆদ্বত সত্যই উপন্যাসটির মূল দার্শনিক ভিত্তি তৈরি করেছে|

পূর্ববাংলার প্রথম উপন্যাস হিসেবে কাজী আফসার উদ্দীনের চর ভাঙা চর উপন্যাসটি উল্লেখযোগ্য| ধলেশ^রী চরের মানুষের জীবনচিত্র এখানে রূপায়িত হয়েছে| এছাড়া শামসুদ্দীন আবুল কালাম-এর কাঞ্চনমালা উপন্যাসে পদ্মা নদী এবং এর শাখা নদীর প্রসঙ্গ থাকলেও কাশবনের কন্যাতে কোনো নদীর নাম উল্লেখ নেই| ˆসয়দ ওয়ালীউল্লাহ কাঁদো নদী কাঁদো-তে নদীকে নামকরণে স্থান দিলেও উপন্যাসটি সম্পূর্ণ নদীকেন্দ্রিক নয়| বাকাল নদীর অনুষঙ্গ উপন্যাসে বিদ্যমানবর্তমানে শুকিয়ে যাওয়া নদীর স্টিমারে যাত্রীরা অতীতের কথা বলে| তাদের কথার স্রোত যেন নদীর কথার স্রোতে পরিণত হয়| তবারক মিঞা মুহাম্মদ মুস্তফার আত্মহত্যার প্রসঙ্গ তুলে ধরে, ‘নদী কি তার নিজের দুঃখে কেঁদেছিল? নদী কেঁদেছিল তার দুঃখেই|’ অন্যদিকে কয়াল নদী সারেংদের জীবন নিয়ে শহীদুল্লা কায়সার সারেং বৌ উপন্যাস রচনা করেন| কদম জীবিকার তাগিদে জাহাজি জীবন বেছে নিয়েছে এবং ঔপন্যাসিক তার জাহাজি জীবনের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিলেও উপন্যাসের মূল কাহিনি গড়ে উঠেছে তার স্ত্রী নবিতুনকে ঘিরে| স্বামীর অনুপস্থিতিতে সারেং বৌ-এর সতীত্ব রক্ষার প্রাণপণ সংগ্রামের পাশাপাশি খাবারের অভাব এবং প্রকৃতির আগ্রাসী খেয়ালের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার অসফল চেষ্টা লক্ষণীয়| তবুও সমস্ত লোভ-প্রলোভন-দুঃখ দারিদ্র্যকে জয় করেছে কদম নবিতুন| আর তাদের জীবনের সাথে গাথা কয়াল নদীযেন মমতাময়ী এক মায়ের প্রতিরূপ|

সমরেশ বসুর গঙ্গা উপন্যাসটি গঙ্গা নদী এবং নদীকে অবলম্বন করে জেলেদের আশা, স্বপ্ন, বেদনা যন্ত্রণার প্রস্ফুটিত রূপ নির্ণিত হয়েছে| কর্ণফুলী নদীর তীরে বসবাসরত বিশেষ সম্প্রদায়ের চিত্র উঠে এসেছে আলাউদ্দীন আল আজাদের কর্ণফুলী (১৯৬২) উপন্যাসে| সবুজের আচ্ছাদন, সাগরের সঙ্গম, সাম্পানের বয়ে চলা, পাহাড়ের গড়ন, উজ্জ্বল জীবনের স্বপ্ন সংগ্রাম, পকেট মেরে জীবিকা অর্জনের চিত্র পাঠককের আগ্রহকে দ্বিগুণ করলেও দখলদারের শকুনি নজর, তীরবর্তী অঞ্চলে গড়ে ওঠা দালানকোঠা-হাট বাজার, ঘর, আড়তঘর নদীর নব্যতা হারানোর চিত্র পাঠককে নাড়া দেয়| ‘এমন চিকন গাং, এমন বনজঙ্গল পাহাড় টিবির ভিতরে এতবড় কান্ড ভাবতে পারিনি| গল্প শুনেছে কিন্তু সেভাবে সে আন্দাজ তা সামান্যই| বিরাট বাঁধ নদীকে আটকে রেখেছে ধারে ছোটখাটো একটা শহর| রেস্ট হাউস, অফিসারদের ঘরবাড়ি মজুর বস্তি! স্কুল, সিনেমাহল, বাচ্চা-কাচ্চাদের খেলার মাঠ, সবই আছে মসজিদটাও দেখবার মতো|’ কর্ণফুলীর বুকে বয়ে চলা উপন্যাসের প্রধান বিষয়| আবু ইসহাস বত্রিশ খণ্ডের উপন্যাস পদ্মার পলিদ্বীপে পদ্মার চরে মানুষের জীবনব্যবস্থা, চর দখল-বেদখলের চিত্র, অনিশ্চিত জীবনচিত্র, শোষক শক্তি জঙ্গুরুল্লার জয়-পরাজয় চিত্র, রূপজানের উত্থাপন উপন্যাসের প্রধান বিষয়বস্তু| অর্থাৎ একদিকেখুনের চরদখল অন্যদিকে রূপজান-জরিনা-ফজলকেন্দ্রিক প্রেম আখ্যানদুটো কাহিনি পরিপূরকভাবে উপন্যাসকে অগ্রসর করেছে|

তিন খণ্ডে বিভক্ত হুমায়ুন কবিরের নদী নারী উপন্যাসে পদ্মা নদীর রূপের সঙ্গে তিন নারীকে যথা আমিনা, আয়েষা এবং নুরুকে একাকার করেছেন| বৈশাখের প্রচণ্ড ঝড়ে নজুমিয়ার জলে ডুবে যাওয়া, সন্তানের মৃত্যুতে মায়ের পদ্মা তীরে আত্মহনন, মালেককে নিয়ে আসগর এবং তার স্ত্রী সমুদ্রের দিকে নতুন দ্বীপের বাসনা, মালেক নুরুর জন্মবৃত্তান্ত, শেষে নতুন ঠিকানার খোঁজে মালেকের গৃহত্যাগসমস্ত ঘটনাকে ঔপন্যাসিক পদ্মাকে কেন্দ্র করে রচনা করেছেন| মানুষের মতো পদ্মার ভিন্নভিন্ন রূপ প্রকৃতিকে প্রভাবিত করে| খরার পরে বন্যায় ফসল নষ্ট হয়, ফলে অভাব বাড়ে| ঔপন্যাসিকে বর্ণনায় পদ্মার উত্তাল ঝড়ের চিত্রও লক্ষণীয়| ‘মাঝিমাল্লা পঞ্চায়েত সবাই ঝড়ের সঙ্গে লড়ছে| মেঘের আবছা অন্ধকারে তাদের মানুষ বলে মনে হয় না| থেকে-থেকে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল কিন্তু বিদ্যুৎ ঝলকেও জমাট অন্ধকার যেন কমছে না| মেঘের ডাকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পদ্মার গভীর গর্জ্জন| ঢেউ-এর আঘাতে নৌকা এক একবার কেঁপে উঠছে আর ফেনায় পাটাতন ভরে যাচ্ছে| দীর্ঘ ঢেউ-এর রেখার ওপরে সমানে ফেনা যেন হিংস্র অজগরের জিহ্বার মতো লকলক করছে|’

দেবেশ রায়ের তিস্তাপারের বৃত্তান্ত উপন্যাসে তিস্তা নদী কেবল একটি ভৌগোলিক জলধারা নয়এটি উত্তরবঙ্গের মানুষের জীবন, ইতিহাস, সমাজ, রাজনীতি অস্তিত্বসংকটের এক জটিল বহুমাত্রিক প্রতীক| জাতপর্ব, বনপর্ব, চরপর্ব, ফরেস্টের বৃক্ষপর্ব, মিটিং মিছিল পর্ব, তিস্তা ব্যারেজ পর্বএক পর্ব থেকে অন্য পর্বে তিস্তা তার নিজস্ব খেয়ালে বয়ে যায় এবং একটি চরিত্র হয়ে আশেপাশের মানুষের জীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, মিলন-বিরহকে প্রত্যক্ষ করেছে| উপন্যাসে তিস্তা নদীকে কেন্দ্র করেই চর নদীতীরবর্তী মানুষের জীবনচিত্র নির্মিত হয়েছে| তবে জোতদার গয়ানাথের তিস্তাকে দেখার ধরন এবং ভিটা হারানো নিতাই এর চোখে তিস্তা একরকম নয়| দেবেশ রায় উপন্যাসে তিস্তা নদীকে কেন্দ্র করে ক্ষমতা, দখলদারিত্ব সামাজিক ˆবষম্যের চিত্রও তুলে ধরেছেন| চর দখল, জমি নিয়ে সংঘাত এবং প্রান্তিক মানুষের বঞ্চনা নদীর ভাঙা-গড়া ভূমির মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে| ফলে নদী শুধু প্রকৃতি নয়সামাজিক রাজনৈতিক বাস্তবতারও প্রতীক হয়ে ওঠে| গয়ানাথ নিজের স্বার্থে তথা জোতের জরিপের জন্য বাখারুর শরীরকে উত্তাল তিস্তায় ফেলে দেয়, কখনো বাখারুকে দিয়ে তিস্তায় ভাসিয়ে দেওয়া ফরেস্টের গাছ ডাঙায় তুলে বিক্রি করে| অথচ বাখারুর বুকে ব্যাজ লাগানোর মতো কোনো কাপড় নেই| এছাড়া উপন্যাসে চরবাসী হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থান থাকলেও তাদের জীবনে উন্নয়ন নিরাপত্তার অভাব স্পষ্টউপন্যাসে ˆবষম্য অনগ্রসরতার চিত্র বাস্তবভাবে উপস্থাপিত|

পদ্মা নদীকে কেন্দ্র করে অমিয়ভূষণ মজুমদার গড় শ্রীখণ্ড উপন্যাস রচনা করেছেন| মধু সাধু খাঁ-তেও নদী প্রসঙ্গ উল্লেখযোগ্য| এছাড়া, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খোয়াবনামা, তপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের নদী মাটি অরণ্য, শওকত ওসমানের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস জলাংগী, সেলিনা হোসেনের জলোচ্ছ্বাস, পোকামাকড়ের ঘরবসতি প্রভৃতি উপন্যাসে নদী গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে|

বাংলা উপন্যাসে নদী কেবল ভৌগোলিক বাস্তবতা নয়এটি জীবন, সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ| নদী কখনো মমতাময়ী মা, আবার কখনো ধ্বংসাত্মক শক্তি ˆদ্বত রূপের মধ্য দিয়ে বাংলা উপন্যাসে নদী তার গভীর তাৎপর্য বহন করে| নদী তীরবর্তী সমাজের জীবনযাত্রা, ইতিহাস, সংস্কৃতি ঐতিহ্য, অস্তিত্বসংকট, নদী রক্ষা, দূষণ, জলশূন্যতা এবং জীবনের নানান দিক সাহিত্যিকবৃন্দ সাবলীল শিল্পসম্মত ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছেন| নদীকে কেন্দ্র করে মানুষের বেঁচে থাকা, সংগ্রাম, আশা-নিরাশা এবং পরিবর্তনের ধারাও এসব উপন্যাসে প্রতিফলিত হয়েছে| কালের প্রবাহে দখলদারিত্ব মানবসৃষ্ট নানা কারণে নদী আজ অনেক ক্ষেত্রেই বিপন্ন হয়ে পড়েছে| তাই ভৌগোলিক অবস্থান নির্ণয় এবং ঐতিহ্য রক্ষার ক্ষেত্রে নদীর স্বকীয় ˆবশিষ্ট্য সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিতনদীকেন্দ্রিক উপন্যাসগুলোতে বাস্তবতা সত্যাসত্য বহুমাত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে গভীরভাবে উপস্থাপিত হয়েছে|

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬


বাংলা উপন্যাসে নদী : জীবন, সমাজ ও সংস্কৃতির বহুমাত্রিক প্রতিফলন

প্রকাশের তারিখ : ০৯ জুলাই ২০২৬

featured Image

উপন্যাস সাহিত্যে নদী গুরুত্বপূর্ণ অপরিহার্য নান্দনিক প্রবাহধারা| পাশ্চাত্য সাহিত্যিকদের মতো পাশ্চ্য সহিত্যিকবৃন্দ নদী এবং মানুষের জীবনের যোগসূত্রতাকে নির্ণয় করেছেন| পাশ্চাত্য সাহিত্যিক মারিয়া এজওয়ার্থ, উইলিয়াম ফকনার, জিন গিয়ালো, মিখাইল শলোকভ, এমিলিয়া পারদো বাজান  প্রমুখ নদীকেন্দ্রিক যাপিতজীবনকে সাহিত্যে স্থান দিয়েছেন| এসব উপন্যাসে গ্রামীণ মানবজীবনের চিত্রের পাশাপাশি নানাবিধ উপাদান তথা প্রেম, রাজনীতি, সমাজ, নানামুখী মনস্তত্ত্ব, বিদ্রোহ, বিপ্লব-সংহতি প্রভৃতির চিত্র উপস্থাপিত হয়েছে| বাংলা সাহিত্যে নদীকেন্দ্রিক উল্লেখযোগ্য উপন্যাসমানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি, অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নাম, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাঁসুলী বাঁকের উপকথা, সমরেশ বসুর গঙ্গা, আবু ইসহাকের পদ্মার পলিদ্বীপ, আলাউদ্দীন আল আজাদের কর্ণফুলী, শহীদুল্লাহ কায়সার সারেং বৌ হুমায়ুন কবিরের নদী নারী কাজী আবদুল ওদুদের নদীবক্ষে, দেবেশ রায়ের তিস্তাপারের বৃত্তান্ত, তিস্তাপুরাণ, প্রমথনাথ বিশীর কোপবতী, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের, গঙ্গা একটি নদীর নাম, শামসুদ্দীন আবুল কালামের সমুদ্র বাসর, হারুন পাশার তিস্তা প্রভৃতি| নদীকে কেন্দ্র করে সভ্যতার সূচনা বিকাশ| নদী মানবজীবনকে নিয়ন্ত্রণ করেছে, আবার সভ্যতার ঐশ্বর্য ধ্বংসের পেছনেও নদীর অবদান রয়েছে| নদী যেমন মানুষকে বেঁচে থাকার প্রেরণা যোগায়তেমনই রাহুর মতো সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে তাকে নিঃস্বও করে দেয়| উপর্যুক্ত নদীভিত্তিক উপন্যাসে জীবন গড়া ভাঙার খেলায় নদী রহস্যময়ী হিসেবে চিত্রায়িত; নদী যেন নারীর শরীরধারীচঞ্চল শরীরের পরতে পরতে যার ভিন্ন ভিন্ন রূপের মাধুরী|

আধুনিক বাংলা উপন্যাসের সার্থক স্রষ্টা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দুর্গেশনন্দিনী কিংবা কৃষ্ণকান্তের উইল- নদীর প্রসঙ্গ উঠে আসলেও তাঁর চন্দ্রশেখর উপন্যাসে নদী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে| রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নৌকাডুবি, গোরা উপন্যাসে নদী নদীকেন্দ্রিক মানুষের জীবন স্থান পেয়েছে| নৌকাডুবিতে নদীকেন্দ্রিক জেলে-মাঝিদের চিত্র লক্ষণীয়| গোরাতে জীবন উপলব্ধির সার্থক চিত্র নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে| শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বড়দিদি উপন্যাসে নদীকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের যাপিতজীবন প্রবাহকে তুলে ধরেছেন| জেলেজীবনের সুখ-দুঃখের চিত্র ব্যাপক বিস্তৃত আকার লাভ করেছে শ্রীকান্ত উপন্যাসে| বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় নদীর নামকরণে ইছামতি উপন্যাস রচনা করেছেন| জীবনবাস্তবতার চিত্র ঐতিহাসিক চিত্র উপন্যাসটির পারস্পরিক যোগসূত্রকে সমন্বি করেছে| আফগান যুদ্ধ, তিতুমীর, নীল বিদ্রোহ, ছোট লাটের নদীর পরিদর্শন প্রভৃতির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট উপন্যাসের গতিকে সমৃদ্ধ করেছে| এছাড়া প্রকৃতির জীবনঘনিষ্ঠ ছবি যেমন দুই তীরে ঘন সবুজ ঝোপ, জলের ওপর লতার দুলনি, বট, অশ্ব, বৈবচি, বাঁশঝাড়, গাঙ শালিকের গর্ত, বাবলার সোনালি ফুল, ওপার থেকে নীল মালার ভেসে আসার চিত্রকে ঔপন্যাসিক নান্দনিকভাবে চিত্রায়িত করেছেন|

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় হাঁসুলী বাঁকের উপকথা উপন্যাসে কোপাই নদীকে অবলম্বন করে সমাজের বিস্তার লক্ষণীয়| এছাড়া তিনি কালিন্দী নদীকে কেন্দ্র করে কালিন্দী উপন্যাস রচনা করেছেন| মনোজ বসু দক্ষিণবঙ্গের নদী, নদীতীরবর্তী মানুষের জীবন এবং সুন্দরবনের চিত্র অঙ্কন করেছেন তাঁর জল জঙ্গল উপন্যাসে| এছাড়া তিনি ময়ূরাক্ষী নদীকে নিয়ে রচনা করেছেন ময়ূরাক্ষী উপন্যাসযেখানে নদী বিনোদিনী একই সুতোয় গাথা এবং নদীর নিঃশব্দতার মাঝে বিনোদিনী নিজের জীবনকে খুঁজে পায়|

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসে পদ্মা নদী কেবল একটি ভৌগোলিক উপাদান নয়; এটি কাহিনির কেন্দ্রীয় শক্তিযা চরিত্র, সমাজ জীবনকে গভীরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে| কুবের, কপিলা, হোসেন মিয়া প্রমুখ জেলে সম্প্রদায়ের মানুষের জীবন নদীকেন্দ্রিকমাছ ধরা, নৌযাত্রা নদীর ওপর নির্ভরশীল জীবনযাপন তাদের অস্তিত্বের মূল ভিত্তি| একই সঙ্গে পদ্মা নদী প্রকৃতির অনিশ্চয়তা নির্মমতার প্রতীক| নদীর ভাঙন, প্রবল স্রোত ঝড় মানুষের জীবনে বারবার বিপর্যয় ডেকে আনে| এছাড়া নদী চরিত্রগুলোর আবেগ মানসিকতার প্রতিফলন হিসেবেও কাজ করে| কুবেরের টানাপোড়েন, কপিলার সঙ্গে তার সম্পর্ক জীবনের অনিশ্চয়তানদীর স্রোতের মতো পরিবর্তনশীল| পদ্মা তীরবর্তী মানুষের জীবনযাপন, তাদের নৌকা, মাছ ধরা, বাজার, ধর্মীয় বিশ্বাস, প্রেম, সহিংসতা কুসংস্কারসবকিছুই যেন নদীর গতিপথের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে| এছাড়া নদীর মাধ্যমে ভাষা সংস্কৃতির বৈচিত্র্য লক্ষণীয়প্রত্যেক চরিত্রের জীবনভাষা অভিজ্ঞতা আলাদাযা নদী তীরবর্তী সমাজের বহুমাত্রিকতা নির্দেশ করে|

গঙ্গা নদীকে কেন্দ্র করে কমলকুমার মজুমদার অন্তর্জলী যাত্রা নির্মাণ করেছেন| উপন্যাসের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে গঙ্গা নদীউপন্যাসের শুরু শেষ নদীকে আবর্তন করে| উপন্যাসে নদী কাহিনির কেন্দ্রীয় প্রতীক এবং নদী জীবন, মৃত্যু, ধর্মবিশ্বাস মানবিকতার গভীর সংকটকে বহুমাত্রিকভাবে প্রকাশ করে| নদীকে ঘিরে উপন্যাসের পরিবেশ যেমন নির্মিততেমনই প্রতিটি চরিত্রের মানসিক অবস্থাও এর সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত| নদী এখানে জীবন মৃত্যুর সীমানা নির্দেশ করে| মৃত্যুপথযাত্রী বৃদ্ধকে নদীর তীরে এনে রাখা হয় এই বিশ্বাসে যেসেখানে মৃত্যুবরণ করলে আত্মার মুক্তি বা মোক্ষলাভ হবে| ফলে নদী তার কাছে একদিকে চূড়ান্ত আশ্রয়, অন্যদিকে অসহায় প্রতীক্ষার প্রতীক| জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো নদীর তীরে নীরব উপস্থিতির মধ্যে কাটায়যা মৃত্যুর অনিবার্যতাকে স্পষ্ট করে| অন্যদিকে নববধূর দাম্পত্য জীবনের সূচনা ঘটে নদীর তীরে, মৃত্যুর ছায়ায়| নদীর বিস্তৃত নীরবতা নির্জনতা নববধূর অন্তর্গত শূন্যতা, আতঙ্ক নিঃসঙ্গতাকে বহুগুণে বাড়িয়ে তোলেএখানে নদী তার ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন অপ্রাপ্তির প্রতীক হয়ে ওঠে| পুরোহিত ধর্মান্ধ সমাজের প্রতিনিধিদের কাছে নদী পবিত্রতার আধার| তারা বিশ্বাস করে নদীর তীরে মৃত্যুই আত্মার পরিত্রাণ নিশ্চিত করেতাদের বিশ্বাস নদীকে আধ্যাত্মিক মর্যাদা দিলেও বাস্তবে নির্মম সামাজিক প্রথাকে বৈধতা দেয়—  যেখানে মৃত্যুপথযাত্রী মানুষকে মানবিক সেবা থেকে বঞ্চিত করে নদীর ধারে ফেলে রাখা হয়| ফলে নদী হয়ে ওঠেএকদিকে ধর্মীয় মুক্তির প্রতীক, অন্যদিকে কুসংস্কার অমানবিকতার বাহক| মানুষের জন্ম-মৃত্যু, দুঃখ-বেদনাসবকিছুর ঊর্ধ্বে নদী নিজের গতিতে বহমান থাকে ˆবপরীত্য উপন্যাসের দার্শনিক গভীরতাকে আরও তীব্র করে|

অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের অনবদ্য সৃষ্টিযেখানে কুমিল্লা জেলার তিতাস নদী তার তীরবর্তী মানুষের জীবন গভীরভাবে চিত্রিত হয়েছে| উপন্যাসে নদী জীবন, সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে| উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্রতিতাস নদী| উপন্যাসের শুরুই হয়েছে নদীকে ঘিরে— ‘তিতাস একটি নদীর নাম...’ পরিচয়ের মধ্য দিয়েই নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে| তিতাসের কূলজুড়ে গড়ে ওঠা মানুষের জীবন, তাদের স্বপ্ন, বেদনা অস্তিত্বের সংগ্রাম নদীর সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে যুক্ত| তিতাস নদীকে কেন্দ্র করে মালো সম্প্রদায়ের জীবন গড়ে উঠেছে| মাছ ধরা, নৌকা চালানো, বাজারে মাছ বিক্রি করাতাদের জীবিকার প্রধান মাধ্যম| কিন্তু এই জীবিকা যেমন আনন্দের, তেমনই অনিশ্চয়তা ভরপুর| নদীর স্বাভাবিক গতিপথে ভাঙন, শুকিয়ে যাওয়া বা দখল হয়ে যাওয়ার ফলে তাদের জীবনও বারবার বিপর্যস্ত হয়| তাসত্ত্বে নৌকা বাইচ উৎসবকে কেন্দ্র করে মানুষের আনন্দ চিত্র লক্ষণীয়তাদের জীবনের অপরিহার্য উপকরণ এই নৌকা দৌড় খেলা| দুপাড় ঘিরে হাজার হাজার ছোটবড় নৌকা— ‘এইভাবে যত দূর চোখ মেলা যায় কেবল নৌকা আর নৌকা, আর তাতে মানুষের বোঝাই| নদীর মাঝখান দিয়া দৌড়ের নৌকার প্রতিযোগিতা|’ বিভিন্ন গানের সুর ভেসে ওঠে তিতাসের স্রোতে| এসব গানে প্রেম কিংবা বেদনার গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে| রাধা-কৃষ্ণের অপার্থিব প্রেম তিতাস পাড়ের মানুষের হৃদয়ে দোলা দেয়| এসব গান জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ| এছাড়া পালাগানের পরস্পরের প্রতি বাক আক্রমণের পাশাপাশি আদিরসের বিস্তার লক্ষণীয়| উপন্যাসে মুর্শিদি গান, বাউল গান, মারফতী গান, পুঁথি পড়া, পদ্মপুরাণের লোকসংস্কৃতি উঠে এসেছে| বেদেনিদের জীবনচিত্রও উপন্যাসে লক্ষণীয়তারা নৌকা করে এসে নদীতে নোঙর ফেলে| আয়না, চিরুনি, বঁড়শি, মাথার কাঁটা, কাচের চুড়ি, পুতির মালা বিক্রি করে এবং সাপের খেলা দেখিয়ে তারা জীবন নির্বাহ করে| আবিরের ছোঁয়ায় নিজেদের রঙিন করা এবং নানাধরনের গান নাচানাচি করে আনন্দ করাসমস্তই লোক-বাংলার সংস্কৃতি| ‘মেয়েদের রঙ-মাখামাখির পালা চলিতেছে, এদিকে পুরুষের হোলি-গান শুরু হইয়াছে| একজনকে সাজাইয়াছে হোলির রাজা| তার গলায় কলাগাছের খোলের মালা, মাথায় কলাপাতার টাপর, পরনে ছেঁড়া ধুতি, গায়ে ছেঁড়া ফতুয়া| মাঝে মাঝে উঠিয়া কোমর বাঁকাইয়া নাচে, আবার বসিয়া বিরাম নেয়|’ মালোদের সংস্কৃতির অধঃপতিত রূপ বা শেকড়ে টান লাগার চিত্রও অদ্বৈত মল্লবর্মণ তুলে ধরেছেন| বাসন্তীর মধ্য দিয়ে বিষয়টি ব্যাপ্ত হয়েছেনিজস্ব সংস্কৃতির অবক্ষয় যন্ত্রণাকে ধারণ করে| অপরদিকে বাসন্তীর নিজের যন্ত্রণাও যেন তিতাসের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছেফলে তিতাস বাসন্তী যেন এক সত্তায় পরিণত হয়েছে| অদ্বৈত মল্লবর্মণ তাঁর ˆশশব লালিত অভিজ্ঞতাকে মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনায় উপন্যাস উপস্থাপন করেছেন| উপন্যাসটির লোকজ উপাদান, গঠনশৈলী, ভাষা, চরিত্র, মনস্তত্ত্ব প্রভৃতি বিচার্য বিষয়| মালোদের জীবন বদলে নানামাত্রিক চিত্রযা কখনো আনন্দের কখনো বা সর্বস্ব হারানোর ব্যাকুলতা-আর্তনাদের চিত্র, কিংবা বিদেশি সংস্কৃতির আগমনে নিজস্ব সংস্কৃতির নিবু নিবু অবস্থা উপস্থাপিত হয়েছে| তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসে নদী শুধু একটি প্রাকৃতিক উপাদান নয়; এটি একটি জাতিগোষ্ঠীর জীবন, সংস্কৃতি, ইতিহাস অস্তিত্বের প্রতীক| নদী যেমন জীবন দেয়তেমনই তার পরিবর্তনে জীবনও ধ্বংস হয়ে যায় ˆদ্বত সত্যই উপন্যাসটির মূল দার্শনিক ভিত্তি তৈরি করেছে|

পূর্ববাংলার প্রথম উপন্যাস হিসেবে কাজী আফসার উদ্দীনের চর ভাঙা চর উপন্যাসটি উল্লেখযোগ্য| ধলেশ^রী চরের মানুষের জীবনচিত্র এখানে রূপায়িত হয়েছে| এছাড়া শামসুদ্দীন আবুল কালাম-এর কাঞ্চনমালা উপন্যাসে পদ্মা নদী এবং এর শাখা নদীর প্রসঙ্গ থাকলেও কাশবনের কন্যাতে কোনো নদীর নাম উল্লেখ নেই| ˆসয়দ ওয়ালীউল্লাহ কাঁদো নদী কাঁদো-তে নদীকে নামকরণে স্থান দিলেও উপন্যাসটি সম্পূর্ণ নদীকেন্দ্রিক নয়| বাকাল নদীর অনুষঙ্গ উপন্যাসে বিদ্যমানবর্তমানে শুকিয়ে যাওয়া নদীর স্টিমারে যাত্রীরা অতীতের কথা বলে| তাদের কথার স্রোত যেন নদীর কথার স্রোতে পরিণত হয়| তবারক মিঞা মুহাম্মদ মুস্তফার আত্মহত্যার প্রসঙ্গ তুলে ধরে, ‘নদী কি তার নিজের দুঃখে কেঁদেছিল? নদী কেঁদেছিল তার দুঃখেই|’ অন্যদিকে কয়াল নদী সারেংদের জীবন নিয়ে শহীদুল্লা কায়সার সারেং বৌ উপন্যাস রচনা করেন| কদম জীবিকার তাগিদে জাহাজি জীবন বেছে নিয়েছে এবং ঔপন্যাসিক তার জাহাজি জীবনের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিলেও উপন্যাসের মূল কাহিনি গড়ে উঠেছে তার স্ত্রী নবিতুনকে ঘিরে| স্বামীর অনুপস্থিতিতে সারেং বৌ-এর সতীত্ব রক্ষার প্রাণপণ সংগ্রামের পাশাপাশি খাবারের অভাব এবং প্রকৃতির আগ্রাসী খেয়ালের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার অসফল চেষ্টা লক্ষণীয়| তবুও সমস্ত লোভ-প্রলোভন-দুঃখ দারিদ্র্যকে জয় করেছে কদম নবিতুন| আর তাদের জীবনের সাথে গাথা কয়াল নদীযেন মমতাময়ী এক মায়ের প্রতিরূপ|

সমরেশ বসুর গঙ্গা উপন্যাসটি গঙ্গা নদী এবং নদীকে অবলম্বন করে জেলেদের আশা, স্বপ্ন, বেদনা যন্ত্রণার প্রস্ফুটিত রূপ নির্ণিত হয়েছে| কর্ণফুলী নদীর তীরে বসবাসরত বিশেষ সম্প্রদায়ের চিত্র উঠে এসেছে আলাউদ্দীন আল আজাদের কর্ণফুলী (১৯৬২) উপন্যাসে| সবুজের আচ্ছাদন, সাগরের সঙ্গম, সাম্পানের বয়ে চলা, পাহাড়ের গড়ন, উজ্জ্বল জীবনের স্বপ্ন সংগ্রাম, পকেট মেরে জীবিকা অর্জনের চিত্র পাঠককের আগ্রহকে দ্বিগুণ করলেও দখলদারের শকুনি নজর, তীরবর্তী অঞ্চলে গড়ে ওঠা দালানকোঠা-হাট বাজার, ঘর, আড়তঘর নদীর নব্যতা হারানোর চিত্র পাঠককে নাড়া দেয়| ‘এমন চিকন গাং, এমন বনজঙ্গল পাহাড় টিবির ভিতরে এতবড় কান্ড ভাবতে পারিনি| গল্প শুনেছে কিন্তু সেভাবে সে আন্দাজ তা সামান্যই| বিরাট বাঁধ নদীকে আটকে রেখেছে ধারে ছোটখাটো একটা শহর| রেস্ট হাউস, অফিসারদের ঘরবাড়ি মজুর বস্তি! স্কুল, সিনেমাহল, বাচ্চা-কাচ্চাদের খেলার মাঠ, সবই আছে মসজিদটাও দেখবার মতো|’ কর্ণফুলীর বুকে বয়ে চলা উপন্যাসের প্রধান বিষয়| আবু ইসহাস বত্রিশ খণ্ডের উপন্যাস পদ্মার পলিদ্বীপে পদ্মার চরে মানুষের জীবনব্যবস্থা, চর দখল-বেদখলের চিত্র, অনিশ্চিত জীবনচিত্র, শোষক শক্তি জঙ্গুরুল্লার জয়-পরাজয় চিত্র, রূপজানের উত্থাপন উপন্যাসের প্রধান বিষয়বস্তু| অর্থাৎ একদিকেখুনের চরদখল অন্যদিকে রূপজান-জরিনা-ফজলকেন্দ্রিক প্রেম আখ্যানদুটো কাহিনি পরিপূরকভাবে উপন্যাসকে অগ্রসর করেছে|

তিন খণ্ডে বিভক্ত হুমায়ুন কবিরের নদী নারী উপন্যাসে পদ্মা নদীর রূপের সঙ্গে তিন নারীকে যথা আমিনা, আয়েষা এবং নুরুকে একাকার করেছেন| বৈশাখের প্রচণ্ড ঝড়ে নজুমিয়ার জলে ডুবে যাওয়া, সন্তানের মৃত্যুতে মায়ের পদ্মা তীরে আত্মহনন, মালেককে নিয়ে আসগর এবং তার স্ত্রী সমুদ্রের দিকে নতুন দ্বীপের বাসনা, মালেক নুরুর জন্মবৃত্তান্ত, শেষে নতুন ঠিকানার খোঁজে মালেকের গৃহত্যাগসমস্ত ঘটনাকে ঔপন্যাসিক পদ্মাকে কেন্দ্র করে রচনা করেছেন| মানুষের মতো পদ্মার ভিন্নভিন্ন রূপ প্রকৃতিকে প্রভাবিত করে| খরার পরে বন্যায় ফসল নষ্ট হয়, ফলে অভাব বাড়ে| ঔপন্যাসিকে বর্ণনায় পদ্মার উত্তাল ঝড়ের চিত্রও লক্ষণীয়| ‘মাঝিমাল্লা পঞ্চায়েত সবাই ঝড়ের সঙ্গে লড়ছে| মেঘের আবছা অন্ধকারে তাদের মানুষ বলে মনে হয় না| থেকে-থেকে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল কিন্তু বিদ্যুৎ ঝলকেও জমাট অন্ধকার যেন কমছে না| মেঘের ডাকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পদ্মার গভীর গর্জ্জন| ঢেউ-এর আঘাতে নৌকা এক একবার কেঁপে উঠছে আর ফেনায় পাটাতন ভরে যাচ্ছে| দীর্ঘ ঢেউ-এর রেখার ওপরে সমানে ফেনা যেন হিংস্র অজগরের জিহ্বার মতো লকলক করছে|’

দেবেশ রায়ের তিস্তাপারের বৃত্তান্ত উপন্যাসে তিস্তা নদী কেবল একটি ভৌগোলিক জলধারা নয়এটি উত্তরবঙ্গের মানুষের জীবন, ইতিহাস, সমাজ, রাজনীতি অস্তিত্বসংকটের এক জটিল বহুমাত্রিক প্রতীক| জাতপর্ব, বনপর্ব, চরপর্ব, ফরেস্টের বৃক্ষপর্ব, মিটিং মিছিল পর্ব, তিস্তা ব্যারেজ পর্বএক পর্ব থেকে অন্য পর্বে তিস্তা তার নিজস্ব খেয়ালে বয়ে যায় এবং একটি চরিত্র হয়ে আশেপাশের মানুষের জীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, মিলন-বিরহকে প্রত্যক্ষ করেছে| উপন্যাসে তিস্তা নদীকে কেন্দ্র করেই চর নদীতীরবর্তী মানুষের জীবনচিত্র নির্মিত হয়েছে| তবে জোতদার গয়ানাথের তিস্তাকে দেখার ধরন এবং ভিটা হারানো নিতাই এর চোখে তিস্তা একরকম নয়| দেবেশ রায় উপন্যাসে তিস্তা নদীকে কেন্দ্র করে ক্ষমতা, দখলদারিত্ব সামাজিক ˆবষম্যের চিত্রও তুলে ধরেছেন| চর দখল, জমি নিয়ে সংঘাত এবং প্রান্তিক মানুষের বঞ্চনা নদীর ভাঙা-গড়া ভূমির মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে| ফলে নদী শুধু প্রকৃতি নয়সামাজিক রাজনৈতিক বাস্তবতারও প্রতীক হয়ে ওঠে| গয়ানাথ নিজের স্বার্থে তথা জোতের জরিপের জন্য বাখারুর শরীরকে উত্তাল তিস্তায় ফেলে দেয়, কখনো বাখারুকে দিয়ে তিস্তায় ভাসিয়ে দেওয়া ফরেস্টের গাছ ডাঙায় তুলে বিক্রি করে| অথচ বাখারুর বুকে ব্যাজ লাগানোর মতো কোনো কাপড় নেই| এছাড়া উপন্যাসে চরবাসী হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থান থাকলেও তাদের জীবনে উন্নয়ন নিরাপত্তার অভাব স্পষ্টউপন্যাসে ˆবষম্য অনগ্রসরতার চিত্র বাস্তবভাবে উপস্থাপিত|

পদ্মা নদীকে কেন্দ্র করে অমিয়ভূষণ মজুমদার গড় শ্রীখণ্ড উপন্যাস রচনা করেছেন| মধু সাধু খাঁ-তেও নদী প্রসঙ্গ উল্লেখযোগ্য| এছাড়া, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খোয়াবনামা, তপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের নদী মাটি অরণ্য, শওকত ওসমানের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস জলাংগী, সেলিনা হোসেনের জলোচ্ছ্বাস, পোকামাকড়ের ঘরবসতি প্রভৃতি উপন্যাসে নদী গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে|

বাংলা উপন্যাসে নদী কেবল ভৌগোলিক বাস্তবতা নয়এটি জীবন, সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ| নদী কখনো মমতাময়ী মা, আবার কখনো ধ্বংসাত্মক শক্তি ˆদ্বত রূপের মধ্য দিয়ে বাংলা উপন্যাসে নদী তার গভীর তাৎপর্য বহন করে| নদী তীরবর্তী সমাজের জীবনযাত্রা, ইতিহাস, সংস্কৃতি ঐতিহ্য, অস্তিত্বসংকট, নদী রক্ষা, দূষণ, জলশূন্যতা এবং জীবনের নানান দিক সাহিত্যিকবৃন্দ সাবলীল শিল্পসম্মত ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছেন| নদীকে কেন্দ্র করে মানুষের বেঁচে থাকা, সংগ্রাম, আশা-নিরাশা এবং পরিবর্তনের ধারাও এসব উপন্যাসে প্রতিফলিত হয়েছে| কালের প্রবাহে দখলদারিত্ব মানবসৃষ্ট নানা কারণে নদী আজ অনেক ক্ষেত্রেই বিপন্ন হয়ে পড়েছে| তাই ভৌগোলিক অবস্থান নির্ণয় এবং ঐতিহ্য রক্ষার ক্ষেত্রে নদীর স্বকীয় ˆবশিষ্ট্য সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিতনদীকেন্দ্রিক উপন্যাসগুলোতে বাস্তবতা সত্যাসত্য বহুমাত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে গভীরভাবে উপস্থাপিত হয়েছে|


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত