সংবাদ

বাংলা সাহিত্যে বর্ষা

‘ঝর ঝর বরিষে জলধার’


ওবায়েদ আকাশ
ওবায়েদ আকাশ
প্রকাশ: ৯ জুলাই ২০২৬, ০১:১৮ পিএম

‘ঝর ঝর বরিষে জলধার’
শিল্পী : মনিরুল ইসলাম


বাংলা সাহিত্যে বর্ষার প্রসঙ্গ উত্থাপন মাত্রই, প্রথমে মনে পড়ে সংস্কৃত কাব্যমেঘদূত’-এর কথা| মহাকবি কালিদাস রচিত এইমেঘদূতযেন বর্ষার অপর নাম| কালিদাস চতুর্থ বা পঞ্চম শতকের কবি| প্রায় দুই হাজার বছর পরেওমেঘদূতকেন এখনো প্রাসঙ্গিক, কোনো সামান্য জিজ্ঞাসা নয়| প্রধানত মেঘদূত কাব্যে বর্ষার নিঃসঙ্গতা কিংবা বিরহ যেমন কবিতাকে অনেক বেশি স্থায়িত্ব দিয়েছে; অন্যদিকে সমগ্র কবিতার বর্ণনা বিষয় বিন্যাসের শক্তিমেঘদূতকে এখনো স্মরণ করতে বাধ্য করে| কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পর্যন্ত লিখছেন

কবিবর, কবে কোন বিস্মৃত বরষে

কোন& পুণ্য আষাঢ়ের প্রথম দিবসে

লিখেছিলে মেঘদূত! মেঘমন্দ্র শ্লোক

বিশ্বের বিরহী যত সকলের শোক

রাখিয়াছে আপন আঁধার স্তরে স্তরে

সঘনসংগীতমাঝে পুঞ্জীভূত করে|

মহাকবি কালিদাসেরমেঘদূতকাব্যটি পূর্বমেঘ উত্তরমেঘ দুটি অংশে বিভক্ত| মেঘদূত কাব্যের প্রথমাংশেপূর্বমেঘযেখানে দেখানো হয়েছে যক্ষ বিরহকাতর হয়ে মেঘকে দূত হিসেবে গ্রহণ করেছে| এবং কবি মেঘের যাত্রাপথের প্রকৃতি বর্ষার রূপ অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন| যক্ষ স্ত্রীর প্রেমে মগ্ন হয়ে তার দায়িত্বে অবহেলা করে| প্রভু কুবের যক্ষকে এক বছরের জন্য প্রিয়তমা পত্নীর কাছ থেকে দূরে থাকার অভিশাপ দেন| অভিশাপের পর যক্ষকেঅলকাপুরীথেকে বহু দূররামগিরিপর্বতের এক নির্জন আশ্রমে নির্বাসিত জীবন কাটাতে হয়| বিরহের আট মাস কেটে যাওয়ার পর, আষাঢ় মাসের প্রথম দিনে আকাশে নতুন মেঘ দেখে যক্ষ ব্যাকুল হয়ে ওঠেন| নিজের বিরহবেদনা কুশলবার্তা হিমালয়ের অলকাপুরীতে অবস্থানরত তাঁর প্রিয়ার কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য যক্ষ সেই চেতনাহীন জড় মেঘকে তাঁর দূত হিসেবে নির্বাচন করেন| এখান থেকেই কাব্যটির নাম হয়েছেমেঘদূত’| বুদ্ধদেব বসু অনূদিত একটি শ্লোক পাঠ করা যাকমেঘদূতথেকেপূর্বমেঘ অংশের নং শ্লোক:

কেমনে প্রিয়তমা রাখবে প্রাণ তার অদূরে উদ্যত শ্রাবণে

যদি না জলধরে বাহন রে আমি পাঠাই মঙ্গল-বার্তা?

যক্ষ অতএব কুড়চি ফুল দিয়ে সাজিয়ে প্রণয়ের অর্ঘ্য

স্বাগত-সম্ভাষ জানালে মেঘবরে মোহন, প্রীতিময় বচনে|

মেঘদূতজুড়ে কালিদাস যেভাবে বর্ষাঋতু বিরহের বর্ণনা করেছেন, সেই আবেদন আজ শত শত বছর পরও আমাদের কাছে জীবন্ত আখ্যান| 

মধ্যযুগের বাংলা কাব্যে বর্ষা মূলত প্রেম-বিরহ এবং প্রকৃতি চেতনার এক গভীর অনুষঙ্গ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে| ˆবষ্ণব পদাবলি মঙ্গলকাব্যের মতো প্রাচীন সাহিত্যধারায় বর্ষা হয়ে উঠেছিল রাধার বিরহ-যাতনার তীব্র রূপক এবং প্রাক-কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ জীবনের দর্পণ| মধ্যযুগের বাংলা কাব্যে বর্ষার চিত্রকল্পগুলো কয়েকটি প্রধান ভাগে বিন্যস্ত:

ˆবষ্ণব পদাবলিতে (যেমন: চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি, জ্ঞানদাস) বর্ষার অবিরাম বারিধারা রাধার বিরহকে তীব্র করে তুলত| বর্ষার ঘনঘোর মেঘ অন্ধকার রাত্রে প্রিয়তম কৃষ্ণের অনুপস্থিতি রাধার মনকে আচ্ছন্ন করত, যা কাব্যেপ্রেমের আগুনে ঘিয়ের ছিটাহিসেবে কাজ করেছে|

মধ্যযুগের কাব্যেবারোমাসিরচনার একটি শক্তিশালী ধারা ছিল| এখানে আষাঢ় বা শ্রাবণের মতো বর্ষার মাসগুলোতে বিরহী নায়িকার নিঃসঙ্গতার করুণ চিত্র ফুটিয়ে তোলা হতো, যেখানে বর্ষা হয়ে উঠত দীর্ঘশ্বাসের প্রতীক|

মধ্যযুগীয় সাহিত্যে যমুনা তীরের কদম গাছের নিচে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের মিলন বিরহের বর্ণনা এসেছে, যা বর্ষার চিরায়ত রূপ হিসেবে আজও বাংলা সাহিত্যে উজ্জ্বল আসন করে নিয়েছে|

মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যগুলোতে (বিশেষত মনসামঙ্গলে) বর্ষার প্রকোপ সাপের উপদ্রব উঠে এসেছে| এতে দেবীর মাহাত্ম্য প্রচারের পাশাপাশি তৎকালীন সাধারণ মানুষের বর্ষাকালের দুর্যোগময় জীবন অসহায়ত্বের প্রমাণ মেলে|

প্রাচীন চর্যাপদ, মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদাবলি থেকে আধুনিক বাংলা সাহিত্যে বর্ষা বারবার ফিরে এসেছে প্রেম, বিরহ প্রকৃতির বন্দনা হিসেবে| যেমনমধ্যযুগের কবি বিদ্যাপতির ভরা বাদর’ ˆবষ্ণব পদাবলিতে বলছেন

সখি হামারি দুখের নাহি ওর!

ভরা বাদর, মাহ ভাদর, শূন্য মন্দির মোর|’

এর অর্থ হলোহে সখী, আমার দুঃখের কোনো শেষ নাই| এই ভরা ভাদ্র মাস, চারিদিকে অবিরাম বর্ষণ, অথচ আমার ঘর প্রিয়তম ছাড়া শূন্য হয়ে পড়ে আছে|

ঝর ঝর বরিষে’ বৈষ্ণব পদাবলিতে কবি চণ্ডীদাস বর্ষার প্রকৃতির মাধ্যমে রাধার অন্তরের আকুলতাকে খুব প্রাণবন্ত ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন

মেঘ যামিনী অতি ঘন আন্ধিয়ার|

ঝর ঝর বরিষে জলধার

এর অর্থ হলোমেঘাচ্ছন্ন রাত অত্যন্ত অন্ধকার| চারিদিকে ঝরঝর শব্দে অবিরাম জলধারা ঝরে পড়ছেযা রাধার একাকীত্ব বিরহকে আরও গভীর করে তুলছে|

গোবিন্দদাসেরকণ্টক গাড়ি কমলসম পদতল’ বৈষ্ণব পদাবলিতে বর্ষার ঝড়-বাদল, পিচ্ছিল পথ বজ্রপাতকে উপেক্ষা করে রাধা যখন কৃষ্ণের সাথে দেখা করতে যান সেই সাহসিকতার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে:

কণ্টক গাড়ি কমল-সম পদতল

মঞ্জীর চীরহি ঝাঁপি|

গাগরি বারি ঢারি করি পিছল

চলতহি অঙ্গুলি চাপি

অর্থ: রাধা তাঁর পদ্মের মতো নরম পায়ে কাঁটা বিঁধিয়ে, নূপুরের শব্দ কাপড়ে ঢেকে, মেঝেতে কলসির জল ঢেলে পিচ্ছিল করে সেখানে আঙুলের ওপর ভর দিয়ে হাঁটা অনুশীলন করছেন| যেন বর্ষার রাতে পিচ্ছিল দুর্গম পথে চলতে গিয়ে তিনি পড়ে না যান|

মুকুন্দরাম চক্রবর্তীরফুল্লরার বারোমাসিচণ্ডীমঙ্গল কাব্যে বর্ষা এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপেদারিদ্র্য বাস্তব জীবনের কষ্ট হিসেবে| চণ্ডীমঙ্গলে ব্যাধ-পত্নী ফুল্লরা নিজের ঘরের করুণ অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন

আষাঢ়ে পুরিল মহী নব মেঘের জল|

বড়ই বিষাদ পাইনু কর্কট বাদল

মাংসের পসরা লয়ে ফিরি ঘরে ঘরে|

খরিদ্দার নাহি মিলে বৃষ্টি জলধারে

এর অর্থ আষাঢ় মাসের ভারী বৃষ্টিতে পৃথিবী ভিজে যাওয়ায় মন খুব বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে| মাংসের পসরা নিয়ে ঘরে ঘরে ঘুরলেও এই বৃষ্টির কারণে কোনো ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না|

আবার বৈষ্ণব পদাবলিতে জ্ঞানদাস বর্ষার প্রকৃতি মনের ভাবকে অনন্য উপমায় প্রকাশ করেছেন

সুখের লাগিয়া ঘর বাঁধিনু

অনলে পুড়িয়া গেল|

অমিয়া-সায়রে সিনান করিতে

সমর ভেল

মানে, সুখের জন্য যে ঘর বাঁধা হয়েছে তা আগুনে পুড়ে গেল| অমৃতের সাগরে স্নান করতে গিয়ে সেটাও যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হলো|

বর্ষা এবং রবীন্দ্রনাথ যেন যেন এক নিবিড় সম্পর্কে বাঁধা| বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কোনো লেখকের রচনায় এত বেশি বর্ষার প্রসঙ্গ আসেনি| রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যে বর্ষা এক গভীর অনুভূতির নাম| তাঁর কবিতা, গান উপন্যাসে বর্ষা কেবল ঋতু হিসেবে নয়, বরং মানবমনের বিরহ, মিলন এবং প্রকৃতির সজীবতার প্রতীক হিসেবে বারবার স্থান পেয়েছে|

ষোলো বছর বয়সে লেখাবর্ষণকবিতা দিয়ে শুরু করে আমৃত্যু বর্ষার রূপ তিনি তাঁর লেখায় ফুটিয়ে তুলেছেন| শান্তিনিকেতনে তিনিবর্ষামঙ্গলউৎসবের সূচনা করেছিলেন, যেখানে বর্ষার আবাহন বন্দনা করা হয়|

সোনার তরীকাব্যে রবীন্দ্রনাথ বলছেন

গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা

কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা|

রাশি রাশি ভারা ভারা

ধান কাটা হল সারা,

ভরা নদী ক্ষুরধারা

খরপরশা|

কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা

রবীন্দ্র কাব্যে বর্ষাথেকে আরও কিছু উদ্ধৃতি যেমন

বাদল-দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান,

আমি দিতে এসেছি শ্রাবণের গান|”

এমন দিনে তারে বলা যায়

এমন ঘন ঘোর বরিষায়|”

বৃষ্টি পড়ে টাপুরটুপুর

নদে এলো বান

নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহিরে

ওরে আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে

পাগলা হাওয়ার বাদল-দিনে

পাগল আমার মন জেগে ওঠে

আজি ঝর ঝর মুখর বাদর দিনে,

জানি নে জানি নে কিছুতে কেন যে মন লাগে না

মন মোর মেঘের সঙ্গী

উড়ে চলে দিগদিগন্তের পানে

নিঃসীম শূন্যে শ্রাবণ বর্ষণ সংগীতে

রিমঝিম রিমঝিম...”

এছাড়ানৌকাডুবি মতো উপন্যাসে কিংবা তাঁর ভ্রমণকাহিনীগুলোতে আত্মজীবনীমূলক রচনাজীবনস্মৃতিতে বর্ষার আবহ একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে এসেছে|

বসন্ত বর্ষানিবন্ধে কবিগুরু বর্ষার চরিত্র বর্ণনা করেছেন এইভাবে— ‘বসন্ত উদাসীন, গৃহত্যাগী| বর্ষা সংসারী, গৃহী| বসন্ত আমাদের মনকে চারিদিকে বিক্ষিপ্ত করিয়া দেয়, বর্ষা তাহাকে এক স্থানে ঘনীভূত করিয়া রাখে|’

পদ্মা নদীতে কাটানো তাঁর দিনগুলোতে বর্ষার রূপছিন্নপত্রেঅত্যন্ত জীবন্তভাবে প্রতিফলিত হয়েছে| রবীন্দ্রনাথ বর্ষাকে দেখেছেন এক শান্ত, সংসারী গৃহী ঋতু হিসেবে| বর্ষার বারিধারা প্রকৃতিকে যেমন সিক্ত নতুন জীবন উপহার দেয়, তেমনি মানুষের বিশুষ্ক মনকে পরম প্রশান্তিতে ভরিয়ে তোলে| বর্ষার প্রতি কবির মন, ভাবনা এতোটাই আবিষ্ট ছিল যে, বর্ষার বিদায়ের সময়েও কবি লিখছেন

“...তুমি যেও না

তুমি যেও না

আমার বাদলের গান হয় নি সারা...”

কবি নজরুল ইসলাম বর্ষাকে প্রেম-বিরহ-বেদনার ঋতু হিসেবে দেখেছেন| তাঁর বিখ্যাতবর্ষা বিদায়কবিতায় বর্ষার আগমন যেন মানুষের হৃদয়ে প্রিয়জনের স্মৃতি একাকীত্বের কষ্টকে উসকে দেয়|

তাঁর কাব্যে বর্ষা কেবল মেঘ আর বৃষ্টির খেলা নয়, বরং এটি বাদলের পরী, কেতকী পাতার তরী, এবং ক্ষণিকার মতো রূপকথার প্রতীকে ধরা দিয়েছে| তাঁরইন্দ্র-পতনকবিতায় আষাঢ়ের প্রথম দিনের এক রুদ্র রূপ তুলে ধরেছেন এভাবে

তখনও অস্ত যায়নি সূর্য, সহসা হইল শুরু

অম্বরে ঘন ডম্বরু-ধ্বনি গুরুগুরুগুরু গুরু|

আকাশে আকাশে বাজিছে কোন& ইন্দ্রের আগমনী?

শুনি, অম্বুদ-কম্বু-নিনাদে ঘন বৃংহিত-ধ্বনি|

বাজে চিক্কুর-হ্রেষা-হর্ষণ মেঘ-মন্দুরা-মাঝে,

সাজিল প্রথম আষাঢ় আজিকে প্রলংকর সাজে!”

জীবনানন্দ দাশের কাব্যে বর্ষা বৃষ্টি এক অনন্য নস্টালজিক চিত্রকল্পময় রূপ ধারণ করেছে| যেখানে রবীন্দ্রনাথের বর্ষা প্রবল আনন্দময়, সেখানে জীবনানন্দের বর্ষা বাংলার মেঠোপথ, নদী ধানখেতের স্নিগ্ধতায় ভরা| তাঁর লেখায় বর্ষা একদিকে বিষণ্নতার প্রতীক, অন্যদিকে তা প্রকৃতির আদিম রূপ প্রেম প্রকাশের মাধ্যম| তাঁর বিখ্যাতরূপসী বাংলাকাব্যগ্রন্থেএই জল ভালো লাগেকবিতায় লিখছেন

এই জল ভালো লাগে; বৃষ্টির রূপালি জল কত দিন এসে

ধুয়েছে আমার দেহবুলায়ে দিয়েছে চুলচোখের উপরে তার শান

জলের গন্ধটুকু লেগে আছে;”

আবার তারকেমন বৃষ্টি ঝরেকবিতায় বলছেন

হৃদয়ে যেমন বৃষ্টি ঝরে

তেমনি আকাশ আজ ঝরেছে কি পৃথিবীরপরে?”

আমরা নাগরিক বৃষ্টির প্রসঙ্গ নিয়ে যদি বলি, তবে অবশ্যই তো আমাদের ফিরে যেতে হবে কবি শহীদ কাদরীরবৃষ্টি বৃষ্টিকবিতায়

জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যায় জনারণ্য, শহরের জানু

আর চকচকে ঝলমলে বেসামাল এভিনিউ

এই সাঁঝে, প্রলয় হাওয়ার এই সাঁঝে

(হাওয়া যেন ইস্রাফিলের ওঁ)

বৃষ্টি পড়ে মোটরের বনেটে টেরচা,

ভেতরে নিস্তব্ধ যাত্রী, মাথা নীচু

ত্রাস আর উৎকণ্ঠায় হঠাৎ চমকে

দ্যাখে,— জল

অবিরল

জল, জল, জল

তীব্র, হিংস্র

খল,

আর ইচ্ছায় কি অনিচ্ছায় শোনে

ক্রন্দন, ক্রন্দন

... ... ...

বৃষ্টির বিপুল জলে ভ্রমণ-পথের চিহ্ন

ধুয়ে গেছে, মুছে গেছে

কেবল করুণ টা

বিমর্ষ স্মৃতির ভার নিয়ে সহর্ষে সদলবলে

বয়ে চলে জল পৌরসমিতির মিছিলের মতো

নর্দমার ফোয়ারার দিকে,—”

ষাটের দশকের অকাল প্রয়াত কবি কবিতার রাজপুত্র আবুল হাসানেরবৃষ্টি চিহ্নিত ভালবাসাকবিতায় বৃষ্টি পড়ে করুণ দুর্দশার বর্ণনায় নস্টালজিক রূপে

মনে আছে একবার বৃষ্টি নেমেছিল?

একবার ডাউন ট্রেনের মতো বৃষ্টি এসে থেমেছিল

আমাদের ইস্টিশনে সারাদিন জল ডাকাতের মতো

উৎপাত শুরু করে দিয়েছিল তারা;

ছোট-খাটো রাজনীতিকের মতো পাড়ায়-পাড়ায়

জুড়ে দিয়েছিল অথই স্লোগান|

তবু কেউ আমাদের কাদা ভেঙে যাইনি মিটিং-

থিয়েটার পণ্ড হলো, বৃষ্টিতে সভা আর

তাসের আড্ডার লোক ফিরে এলো ঘরে;

ব্যবসার হলো ক্ষতি দারুণ দুর্দশা,

সারাদিন অমুক নিপাত যাক, অমুক জিন্দাবাদ

অমুকের ধ্বংস চাই বলে আর হাবিজাবি হলো না পাড়াটা|

ভদ্রশান্ত কেবল কয়েকটি গাছ বেফাঁস নারীর মতো

চুল ঝাড়ানো আঙ্গিনায় হঠাৎ বাতাসে আর

পাশের বাড়ীতে কোনো হারমোনিয়ামে শুধু উঠতি এক আগ্রহী গায়িকা

স্বরচিত মেঘমালা গাইলো তিনবার!

ষাটের দশকের আরেক প্রধান কবি রফিক আজাদ তো তার বইয়ের নামকরণই করেছেনবর্ষণশব্দটি যুক্ত করে— ‘বর্ষণে আনন্দে যাও মানুষের কাছে’| এই কবির কবিতায় বর্ষার আনন্দ-বেদনা যেন জনমানুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের সেতুবন্ধ|

বর্তমান সময় পর্যন্ত অসংখ্য কবির কবিতায় বর্ষার প্রসঙ্গ এসেছে নতুনরূপে, নব দ্যোতনায়| এখন তো মেঘ-বৃষ্টিও ক্রয় করা যায়| এখন যেমন বর্ষায়ও কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি ঝরে না; তেমনিভাবে আজকের কবিদের বর্ষার কবিতায়ও সরসরি বর্ষণপ্রসঙ্গ অনুপস্থিত থাকতে পারে| প্রসঙ্গ আলোচিত হবে অন্যত্র

কবিতা ছাড়াও আমাদের উপন্যাস সাহিত্যে বর্ষার প্রসঙ্গ এসেছে প্রবলভাবে| মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়েরপুতুল নাচের ইতিকথা’, অদৈত মল্লবর্মণেরতিতাস একটি নদীর নাম’, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়েরকবি’, আবু ইসহাকেরপদ্মার পলিদ্বীপ’, ˆসয়দ শামসুল হকেরবৃষ্টি বিদ্রোহীগণসহ আরও অসংখ্য কথাসাহিত্যে বৃষ্টির প্রসঙ্গ বর্ষার রূপবর্ণনার চমৎকার সাহিত্যভাণ্ডার রয়েছে আমাদের| তবে বর্ষা ব্যাপারটাই কিন্তু কাব্যিক| বর্ষায় কবিমন যেন ব্যাকুল হয়ে ওঠে বিরহ বেদনায়| আবার বাকপটু প্রেমিক-প্রেমিকার মুখের অমৃত বচনের মতোই যেন ঝরে বৃষ্টি| তাছাড়া প্রকৃতির মাধুর্যের বিপুল বিস্তৃত অরণ্যই যেন বৃষ্টিমুখর নিসর্গ|

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬


‘ঝর ঝর বরিষে জলধার’

প্রকাশের তারিখ : ০৯ জুলাই ২০২৬

featured Image


বাংলা সাহিত্যে বর্ষার প্রসঙ্গ উত্থাপন মাত্রই, প্রথমে মনে পড়ে সংস্কৃত কাব্যমেঘদূত’-এর কথা| মহাকবি কালিদাস রচিত এইমেঘদূতযেন বর্ষার অপর নাম| কালিদাস চতুর্থ বা পঞ্চম শতকের কবি| প্রায় দুই হাজার বছর পরেওমেঘদূতকেন এখনো প্রাসঙ্গিক, কোনো সামান্য জিজ্ঞাসা নয়| প্রধানত মেঘদূত কাব্যে বর্ষার নিঃসঙ্গতা কিংবা বিরহ যেমন কবিতাকে অনেক বেশি স্থায়িত্ব দিয়েছে; অন্যদিকে সমগ্র কবিতার বর্ণনা বিষয় বিন্যাসের শক্তিমেঘদূতকে এখনো স্মরণ করতে বাধ্য করে| কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পর্যন্ত লিখছেন

কবিবর, কবে কোন বিস্মৃত বরষে

কোন& পুণ্য আষাঢ়ের প্রথম দিবসে

লিখেছিলে মেঘদূত! মেঘমন্দ্র শ্লোক

বিশ্বের বিরহী যত সকলের শোক

রাখিয়াছে আপন আঁধার স্তরে স্তরে

সঘনসংগীতমাঝে পুঞ্জীভূত করে|

মহাকবি কালিদাসেরমেঘদূতকাব্যটি পূর্বমেঘ উত্তরমেঘ দুটি অংশে বিভক্ত| মেঘদূত কাব্যের প্রথমাংশেপূর্বমেঘযেখানে দেখানো হয়েছে যক্ষ বিরহকাতর হয়ে মেঘকে দূত হিসেবে গ্রহণ করেছে| এবং কবি মেঘের যাত্রাপথের প্রকৃতি বর্ষার রূপ অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন| যক্ষ স্ত্রীর প্রেমে মগ্ন হয়ে তার দায়িত্বে অবহেলা করে| প্রভু কুবের যক্ষকে এক বছরের জন্য প্রিয়তমা পত্নীর কাছ থেকে দূরে থাকার অভিশাপ দেন| অভিশাপের পর যক্ষকেঅলকাপুরীথেকে বহু দূররামগিরিপর্বতের এক নির্জন আশ্রমে নির্বাসিত জীবন কাটাতে হয়| বিরহের আট মাস কেটে যাওয়ার পর, আষাঢ় মাসের প্রথম দিনে আকাশে নতুন মেঘ দেখে যক্ষ ব্যাকুল হয়ে ওঠেন| নিজের বিরহবেদনা কুশলবার্তা হিমালয়ের অলকাপুরীতে অবস্থানরত তাঁর প্রিয়ার কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য যক্ষ সেই চেতনাহীন জড় মেঘকে তাঁর দূত হিসেবে নির্বাচন করেন| এখান থেকেই কাব্যটির নাম হয়েছেমেঘদূত’| বুদ্ধদেব বসু অনূদিত একটি শ্লোক পাঠ করা যাকমেঘদূতথেকেপূর্বমেঘ অংশের নং শ্লোক:

কেমনে প্রিয়তমা রাখবে প্রাণ তার অদূরে উদ্যত শ্রাবণে

যদি না জলধরে বাহন রে আমি পাঠাই মঙ্গল-বার্তা?

যক্ষ অতএব কুড়চি ফুল দিয়ে সাজিয়ে প্রণয়ের অর্ঘ্য

স্বাগত-সম্ভাষ জানালে মেঘবরে মোহন, প্রীতিময় বচনে|

মেঘদূতজুড়ে কালিদাস যেভাবে বর্ষাঋতু বিরহের বর্ণনা করেছেন, সেই আবেদন আজ শত শত বছর পরও আমাদের কাছে জীবন্ত আখ্যান| 

মধ্যযুগের বাংলা কাব্যে বর্ষা মূলত প্রেম-বিরহ এবং প্রকৃতি চেতনার এক গভীর অনুষঙ্গ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে| ˆবষ্ণব পদাবলি মঙ্গলকাব্যের মতো প্রাচীন সাহিত্যধারায় বর্ষা হয়ে উঠেছিল রাধার বিরহ-যাতনার তীব্র রূপক এবং প্রাক-কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ জীবনের দর্পণ| মধ্যযুগের বাংলা কাব্যে বর্ষার চিত্রকল্পগুলো কয়েকটি প্রধান ভাগে বিন্যস্ত:

ˆবষ্ণব পদাবলিতে (যেমন: চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি, জ্ঞানদাস) বর্ষার অবিরাম বারিধারা রাধার বিরহকে তীব্র করে তুলত| বর্ষার ঘনঘোর মেঘ অন্ধকার রাত্রে প্রিয়তম কৃষ্ণের অনুপস্থিতি রাধার মনকে আচ্ছন্ন করত, যা কাব্যেপ্রেমের আগুনে ঘিয়ের ছিটাহিসেবে কাজ করেছে|

মধ্যযুগের কাব্যেবারোমাসিরচনার একটি শক্তিশালী ধারা ছিল| এখানে আষাঢ় বা শ্রাবণের মতো বর্ষার মাসগুলোতে বিরহী নায়িকার নিঃসঙ্গতার করুণ চিত্র ফুটিয়ে তোলা হতো, যেখানে বর্ষা হয়ে উঠত দীর্ঘশ্বাসের প্রতীক|

মধ্যযুগীয় সাহিত্যে যমুনা তীরের কদম গাছের নিচে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের মিলন বিরহের বর্ণনা এসেছে, যা বর্ষার চিরায়ত রূপ হিসেবে আজও বাংলা সাহিত্যে উজ্জ্বল আসন করে নিয়েছে|

মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যগুলোতে (বিশেষত মনসামঙ্গলে) বর্ষার প্রকোপ সাপের উপদ্রব উঠে এসেছে| এতে দেবীর মাহাত্ম্য প্রচারের পাশাপাশি তৎকালীন সাধারণ মানুষের বর্ষাকালের দুর্যোগময় জীবন অসহায়ত্বের প্রমাণ মেলে|

প্রাচীন চর্যাপদ, মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদাবলি থেকে আধুনিক বাংলা সাহিত্যে বর্ষা বারবার ফিরে এসেছে প্রেম, বিরহ প্রকৃতির বন্দনা হিসেবে| যেমনমধ্যযুগের কবি বিদ্যাপতির ভরা বাদর’ ˆবষ্ণব পদাবলিতে বলছেন

সখি হামারি দুখের নাহি ওর!

ভরা বাদর, মাহ ভাদর, শূন্য মন্দির মোর|’

এর অর্থ হলোহে সখী, আমার দুঃখের কোনো শেষ নাই| এই ভরা ভাদ্র মাস, চারিদিকে অবিরাম বর্ষণ, অথচ আমার ঘর প্রিয়তম ছাড়া শূন্য হয়ে পড়ে আছে|

ঝর ঝর বরিষে’ বৈষ্ণব পদাবলিতে কবি চণ্ডীদাস বর্ষার প্রকৃতির মাধ্যমে রাধার অন্তরের আকুলতাকে খুব প্রাণবন্ত ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন

মেঘ যামিনী অতি ঘন আন্ধিয়ার|

ঝর ঝর বরিষে জলধার

এর অর্থ হলোমেঘাচ্ছন্ন রাত অত্যন্ত অন্ধকার| চারিদিকে ঝরঝর শব্দে অবিরাম জলধারা ঝরে পড়ছেযা রাধার একাকীত্ব বিরহকে আরও গভীর করে তুলছে|

গোবিন্দদাসেরকণ্টক গাড়ি কমলসম পদতল’ বৈষ্ণব পদাবলিতে বর্ষার ঝড়-বাদল, পিচ্ছিল পথ বজ্রপাতকে উপেক্ষা করে রাধা যখন কৃষ্ণের সাথে দেখা করতে যান সেই সাহসিকতার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে:

কণ্টক গাড়ি কমল-সম পদতল

মঞ্জীর চীরহি ঝাঁপি|

গাগরি বারি ঢারি করি পিছল

চলতহি অঙ্গুলি চাপি

অর্থ: রাধা তাঁর পদ্মের মতো নরম পায়ে কাঁটা বিঁধিয়ে, নূপুরের শব্দ কাপড়ে ঢেকে, মেঝেতে কলসির জল ঢেলে পিচ্ছিল করে সেখানে আঙুলের ওপর ভর দিয়ে হাঁটা অনুশীলন করছেন| যেন বর্ষার রাতে পিচ্ছিল দুর্গম পথে চলতে গিয়ে তিনি পড়ে না যান|

মুকুন্দরাম চক্রবর্তীরফুল্লরার বারোমাসিচণ্ডীমঙ্গল কাব্যে বর্ষা এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপেদারিদ্র্য বাস্তব জীবনের কষ্ট হিসেবে| চণ্ডীমঙ্গলে ব্যাধ-পত্নী ফুল্লরা নিজের ঘরের করুণ অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন

আষাঢ়ে পুরিল মহী নব মেঘের জল|

বড়ই বিষাদ পাইনু কর্কট বাদল

মাংসের পসরা লয়ে ফিরি ঘরে ঘরে|

খরিদ্দার নাহি মিলে বৃষ্টি জলধারে

এর অর্থ আষাঢ় মাসের ভারী বৃষ্টিতে পৃথিবী ভিজে যাওয়ায় মন খুব বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে| মাংসের পসরা নিয়ে ঘরে ঘরে ঘুরলেও এই বৃষ্টির কারণে কোনো ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না|

আবার বৈষ্ণব পদাবলিতে জ্ঞানদাস বর্ষার প্রকৃতি মনের ভাবকে অনন্য উপমায় প্রকাশ করেছেন

সুখের লাগিয়া ঘর বাঁধিনু

অনলে পুড়িয়া গেল|

অমিয়া-সায়রে সিনান করিতে

সমর ভেল

মানে, সুখের জন্য যে ঘর বাঁধা হয়েছে তা আগুনে পুড়ে গেল| অমৃতের সাগরে স্নান করতে গিয়ে সেটাও যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হলো|

বর্ষা এবং রবীন্দ্রনাথ যেন যেন এক নিবিড় সম্পর্কে বাঁধা| বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কোনো লেখকের রচনায় এত বেশি বর্ষার প্রসঙ্গ আসেনি| রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যে বর্ষা এক গভীর অনুভূতির নাম| তাঁর কবিতা, গান উপন্যাসে বর্ষা কেবল ঋতু হিসেবে নয়, বরং মানবমনের বিরহ, মিলন এবং প্রকৃতির সজীবতার প্রতীক হিসেবে বারবার স্থান পেয়েছে|

ষোলো বছর বয়সে লেখাবর্ষণকবিতা দিয়ে শুরু করে আমৃত্যু বর্ষার রূপ তিনি তাঁর লেখায় ফুটিয়ে তুলেছেন| শান্তিনিকেতনে তিনিবর্ষামঙ্গলউৎসবের সূচনা করেছিলেন, যেখানে বর্ষার আবাহন বন্দনা করা হয়|

সোনার তরীকাব্যে রবীন্দ্রনাথ বলছেন

গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা

কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা|

রাশি রাশি ভারা ভারা

ধান কাটা হল সারা,

ভরা নদী ক্ষুরধারা

খরপরশা|

কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা

রবীন্দ্র কাব্যে বর্ষাথেকে আরও কিছু উদ্ধৃতি যেমন

বাদল-দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান,

আমি দিতে এসেছি শ্রাবণের গান|”

এমন দিনে তারে বলা যায়

এমন ঘন ঘোর বরিষায়|”

বৃষ্টি পড়ে টাপুরটুপুর

নদে এলো বান

নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহিরে

ওরে আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে

পাগলা হাওয়ার বাদল-দিনে

পাগল আমার মন জেগে ওঠে

আজি ঝর ঝর মুখর বাদর দিনে,

জানি নে জানি নে কিছুতে কেন যে মন লাগে না

মন মোর মেঘের সঙ্গী

উড়ে চলে দিগদিগন্তের পানে

নিঃসীম শূন্যে শ্রাবণ বর্ষণ সংগীতে

রিমঝিম রিমঝিম...”

এছাড়ানৌকাডুবি মতো উপন্যাসে কিংবা তাঁর ভ্রমণকাহিনীগুলোতে আত্মজীবনীমূলক রচনাজীবনস্মৃতিতে বর্ষার আবহ একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে এসেছে|

বসন্ত বর্ষানিবন্ধে কবিগুরু বর্ষার চরিত্র বর্ণনা করেছেন এইভাবে— ‘বসন্ত উদাসীন, গৃহত্যাগী| বর্ষা সংসারী, গৃহী| বসন্ত আমাদের মনকে চারিদিকে বিক্ষিপ্ত করিয়া দেয়, বর্ষা তাহাকে এক স্থানে ঘনীভূত করিয়া রাখে|’

পদ্মা নদীতে কাটানো তাঁর দিনগুলোতে বর্ষার রূপছিন্নপত্রেঅত্যন্ত জীবন্তভাবে প্রতিফলিত হয়েছে| রবীন্দ্রনাথ বর্ষাকে দেখেছেন এক শান্ত, সংসারী গৃহী ঋতু হিসেবে| বর্ষার বারিধারা প্রকৃতিকে যেমন সিক্ত নতুন জীবন উপহার দেয়, তেমনি মানুষের বিশুষ্ক মনকে পরম প্রশান্তিতে ভরিয়ে তোলে| বর্ষার প্রতি কবির মন, ভাবনা এতোটাই আবিষ্ট ছিল যে, বর্ষার বিদায়ের সময়েও কবি লিখছেন

“...তুমি যেও না

তুমি যেও না

আমার বাদলের গান হয় নি সারা...”

কবি নজরুল ইসলাম বর্ষাকে প্রেম-বিরহ-বেদনার ঋতু হিসেবে দেখেছেন| তাঁর বিখ্যাতবর্ষা বিদায়কবিতায় বর্ষার আগমন যেন মানুষের হৃদয়ে প্রিয়জনের স্মৃতি একাকীত্বের কষ্টকে উসকে দেয়|

তাঁর কাব্যে বর্ষা কেবল মেঘ আর বৃষ্টির খেলা নয়, বরং এটি বাদলের পরী, কেতকী পাতার তরী, এবং ক্ষণিকার মতো রূপকথার প্রতীকে ধরা দিয়েছে| তাঁরইন্দ্র-পতনকবিতায় আষাঢ়ের প্রথম দিনের এক রুদ্র রূপ তুলে ধরেছেন এভাবে

তখনও অস্ত যায়নি সূর্য, সহসা হইল শুরু

অম্বরে ঘন ডম্বরু-ধ্বনি গুরুগুরুগুরু গুরু|

আকাশে আকাশে বাজিছে কোন& ইন্দ্রের আগমনী?

শুনি, অম্বুদ-কম্বু-নিনাদে ঘন বৃংহিত-ধ্বনি|

বাজে চিক্কুর-হ্রেষা-হর্ষণ মেঘ-মন্দুরা-মাঝে,

সাজিল প্রথম আষাঢ় আজিকে প্রলংকর সাজে!”

জীবনানন্দ দাশের কাব্যে বর্ষা বৃষ্টি এক অনন্য নস্টালজিক চিত্রকল্পময় রূপ ধারণ করেছে| যেখানে রবীন্দ্রনাথের বর্ষা প্রবল আনন্দময়, সেখানে জীবনানন্দের বর্ষা বাংলার মেঠোপথ, নদী ধানখেতের স্নিগ্ধতায় ভরা| তাঁর লেখায় বর্ষা একদিকে বিষণ্নতার প্রতীক, অন্যদিকে তা প্রকৃতির আদিম রূপ প্রেম প্রকাশের মাধ্যম| তাঁর বিখ্যাতরূপসী বাংলাকাব্যগ্রন্থেএই জল ভালো লাগেকবিতায় লিখছেন

এই জল ভালো লাগে; বৃষ্টির রূপালি জল কত দিন এসে

ধুয়েছে আমার দেহবুলায়ে দিয়েছে চুলচোখের উপরে তার শান

জলের গন্ধটুকু লেগে আছে;”

আবার তারকেমন বৃষ্টি ঝরেকবিতায় বলছেন

হৃদয়ে যেমন বৃষ্টি ঝরে

তেমনি আকাশ আজ ঝরেছে কি পৃথিবীরপরে?”

আমরা নাগরিক বৃষ্টির প্রসঙ্গ নিয়ে যদি বলি, তবে অবশ্যই তো আমাদের ফিরে যেতে হবে কবি শহীদ কাদরীরবৃষ্টি বৃষ্টিকবিতায়

জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যায় জনারণ্য, শহরের জানু

আর চকচকে ঝলমলে বেসামাল এভিনিউ

এই সাঁঝে, প্রলয় হাওয়ার এই সাঁঝে

(হাওয়া যেন ইস্রাফিলের ওঁ)

বৃষ্টি পড়ে মোটরের বনেটে টেরচা,

ভেতরে নিস্তব্ধ যাত্রী, মাথা নীচু

ত্রাস আর উৎকণ্ঠায় হঠাৎ চমকে

দ্যাখে,— জল

অবিরল

জল, জল, জল

তীব্র, হিংস্র

খল,

আর ইচ্ছায় কি অনিচ্ছায় শোনে

ক্রন্দন, ক্রন্দন

... ... ...

বৃষ্টির বিপুল জলে ভ্রমণ-পথের চিহ্ন

ধুয়ে গেছে, মুছে গেছে

কেবল করুণ টা

বিমর্ষ স্মৃতির ভার নিয়ে সহর্ষে সদলবলে

বয়ে চলে জল পৌরসমিতির মিছিলের মতো

নর্দমার ফোয়ারার দিকে,—”

ষাটের দশকের অকাল প্রয়াত কবি কবিতার রাজপুত্র আবুল হাসানেরবৃষ্টি চিহ্নিত ভালবাসাকবিতায় বৃষ্টি পড়ে করুণ দুর্দশার বর্ণনায় নস্টালজিক রূপে

মনে আছে একবার বৃষ্টি নেমেছিল?

একবার ডাউন ট্রেনের মতো বৃষ্টি এসে থেমেছিল

আমাদের ইস্টিশনে সারাদিন জল ডাকাতের মতো

উৎপাত শুরু করে দিয়েছিল তারা;

ছোট-খাটো রাজনীতিকের মতো পাড়ায়-পাড়ায়

জুড়ে দিয়েছিল অথই স্লোগান|

তবু কেউ আমাদের কাদা ভেঙে যাইনি মিটিং-

থিয়েটার পণ্ড হলো, বৃষ্টিতে সভা আর

তাসের আড্ডার লোক ফিরে এলো ঘরে;

ব্যবসার হলো ক্ষতি দারুণ দুর্দশা,

সারাদিন অমুক নিপাত যাক, অমুক জিন্দাবাদ

অমুকের ধ্বংস চাই বলে আর হাবিজাবি হলো না পাড়াটা|

ভদ্রশান্ত কেবল কয়েকটি গাছ বেফাঁস নারীর মতো

চুল ঝাড়ানো আঙ্গিনায় হঠাৎ বাতাসে আর

পাশের বাড়ীতে কোনো হারমোনিয়ামে শুধু উঠতি এক আগ্রহী গায়িকা

স্বরচিত মেঘমালা গাইলো তিনবার!

ষাটের দশকের আরেক প্রধান কবি রফিক আজাদ তো তার বইয়ের নামকরণই করেছেনবর্ষণশব্দটি যুক্ত করে— ‘বর্ষণে আনন্দে যাও মানুষের কাছে’| এই কবির কবিতায় বর্ষার আনন্দ-বেদনা যেন জনমানুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের সেতুবন্ধ|

বর্তমান সময় পর্যন্ত অসংখ্য কবির কবিতায় বর্ষার প্রসঙ্গ এসেছে নতুনরূপে, নব দ্যোতনায়| এখন তো মেঘ-বৃষ্টিও ক্রয় করা যায়| এখন যেমন বর্ষায়ও কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি ঝরে না; তেমনিভাবে আজকের কবিদের বর্ষার কবিতায়ও সরসরি বর্ষণপ্রসঙ্গ অনুপস্থিত থাকতে পারে| প্রসঙ্গ আলোচিত হবে অন্যত্র

কবিতা ছাড়াও আমাদের উপন্যাস সাহিত্যে বর্ষার প্রসঙ্গ এসেছে প্রবলভাবে| মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়েরপুতুল নাচের ইতিকথা’, অদৈত মল্লবর্মণেরতিতাস একটি নদীর নাম’, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়েরকবি’, আবু ইসহাকেরপদ্মার পলিদ্বীপ’, ˆসয়দ শামসুল হকেরবৃষ্টি বিদ্রোহীগণসহ আরও অসংখ্য কথাসাহিত্যে বৃষ্টির প্রসঙ্গ বর্ষার রূপবর্ণনার চমৎকার সাহিত্যভাণ্ডার রয়েছে আমাদের| তবে বর্ষা ব্যাপারটাই কিন্তু কাব্যিক| বর্ষায় কবিমন যেন ব্যাকুল হয়ে ওঠে বিরহ বেদনায়| আবার বাকপটু প্রেমিক-প্রেমিকার মুখের অমৃত বচনের মতোই যেন ঝরে বৃষ্টি| তাছাড়া প্রকৃতির মাধুর্যের বিপুল বিস্তৃত অরণ্যই যেন বৃষ্টিমুখর নিসর্গ|


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত