অনেক বড় স্বপ্ন দেখেছিলেন সোহেল। ইতালি যাবেন, ভালো একটি চাকরি করবেন, সংসার সামলাবেন। সেই স্বপ্নপূরণের আশ্বাস দিয়েছিলেন আত্মীয় ও পরিচিত মুখের একদল মানুষ। কিন্তু স্বপ্ন পূরণের বদলে সোহেলকে পৌঁছে দেওয়া হয় লিবিয়ার ত্রিপলীতে, এক ভয়ঙ্কর মানব পাচারকারী চক্রের হাতে।
নির্যাতন, নগ্ন করে মারধর, বৈদ্যুতিক তারের নির্যাতন- সব সহ্য করতে হয়েছে তাকে। মুক্তিপণ হিসেবে পরিবারের কাছ থেকে আদায় করা হয় প্রায় ৬৩ লাখ টাকা। দীর্ঘ সাত মাস পর অবশেষে সোহেলকে উদ্ধার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
মঙ্গলবার (২৬ মে) পিবিআই ঢাকা মেট্রো (উত্তর) এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই সফল অভিযানের কথা জানায়।
সোহেলের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার শিউরে উঠেছেন স্ত্রী উর্মি বেগম ও পরিবারের অন্য সদস্যরা। উর্মি বেগম এ ব্যাপরে মামলা দায়ের করেছেন।
দায়ের করা এজাহার সূত্রে জানা যায়, পরিবারের আত্মীয় ও পরিচিত মো. আলাউদ্দিন কবিরাজের মাধ্যমেই সোহেলের ইতালি যাওয়ার সূত্রপাত। ২০২৫ সালের অক্টোবরে আলাউদ্দিন সোহেলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন ইতালি প্রবাসী রিয়াজুল মাদবরের। রিয়াজুল ও তার সহযোগীরা সোহেলকে ‘স্টুডেন্ট ভিসায়’ ইতালি পাঠানোর আশ্বাস দেন। স্থানীয় ম্যানেজার পরিচয়ে যুক্ত হন টিটু মীর।
রিয়াজুল, আলাউদ্দিন ও টিটু মীরের সঙ্গে মৌখিক চুক্তি হয় সোহেলের। ইতালি পৌঁছে দেওয়ার বিনিময়ে দাবি করা হয় ২৪ লাখ টাকা। চুক্তিমতো প্রথমে দেওয়া হয় ৪ লাখ টাকা। পরে বিভিন্ন ধাপে ব্যাংকিং চ্যানেলে আরও ৬ লাখ, ৫ লাখ ও ৮ লাখ টাকা দেওয়া হয়। কিন্তু ইতালির বদলে সোহেলকে পাঠানো হয় লিবিয়ার ত্রিপলীতে। সেখানে অপহরণকারীদের কাছে তাকে ‘বিক্রি’ করে দেওয়া হয়।
ত্রিপলীতে জিম্মি হয়ে পড়ে সোহেল। অপহরণকারীরা তার স্ত্রী উর্মি বেগমের ইমো অ্যাকাউন্টে ভিডিও পাঠায়। ভিডিওতে দেখা যায় রক্তাক্ত, মারাত্মক আহত সোহেলকে। তার হাতের নখ প্লাস দিয়ে থেঁতলে দেওয়া হয়েছে। শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্লেডের দাগ, বিদ্যুতের তারের চিহ্ন। এমনকি নগ্ন করে হাত-মুখ বেঁধে নির্যাতনের ঘটনাও ঘটানো হয়।
অপহরণকারীরা জানায়, সোহেলকে জীবিত ফেরত পেতে ২৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিতে হবে। শুধু উর্মি বেগমকে নয়, সোহেলের ভাই, বাবা-মা সবাইকে একইভাবে ভয়ভীতি দেখানো হয়।
এদিকে সোহেলের পরিবার যখন রিয়াজুল ও আলাউদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করে, তখন তারা সোহেলকে দ্রুত মুক্ত করার আশ্বাস দিয়ে আরও ২০ লাখ টাকা নেয়। পাশাপাশি তারা পরিবারকে ইমো অ্যাপ বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেয়। দীর্ঘ সময় পার হলেও সোহেলের সন্ধান না পেয়ে উর্মি বেগম গত ৬ এপ্রিল তুরাগ থানায় মামলা করেন।
মামলার গুরুত্ব বুঝে পিবিআই ঢাকা মেট্রো (উত্তর) নিজ উদ্যোগে তদন্ত শুরু করে। গত ২১ এপ্রিল টিটু মীর ও রহিমা বেগমকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মোবাইল ফোন জব্দ করে তথ্য বিশ্লেষণ করে চিহ্নিত করা হয় আরও আসামি। কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া থেকে গ্রেপ্তার করা হয় ইসমাইল দেওয়ানকে। চক্রের একাধিক ব্যাংক হিসাব বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সহায়তায় ফ্রিজ করা হয়।
পিবিআইয়ের ধারাবাহিক অভিযানে চাপে পড়ে অপহরণকারীরা সোহেলকে ত্রিপলীর একটি অজ্ঞাত স্থানে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশিরা তাকে আশ্রয় দেন। পিবিআই, ইউএনওডিসি, লিবিয়াস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস ও আইওএম-এর (ইউএন মাইগ্রেশন) সহায়তায় গত ৩ মে তাকে লিবিয়ার ত্রিপলীতে আইওএম-এর নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়।
সর্বশেষ সোমবার (২৫ মে) সোহেলকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পিবিআই হেফাজতে আনা হয়। তিনি ইতোমধ্যে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।
পিবিআই জানিয়েছে, এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে শতাধিক ব্যক্তিকে লিবিয়ায় পাচার করে প্রতারণা ও নির্যাতনের মাধ্যমে অর্থ আদায় করছিল। মামলার অন্যান্য পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার ও অর্থপাচারের নেটওয়ার্ক উদঘাটনে তদন্ত চলছে। বিদেশগামী সাধারণ মানুষকে দালালচক্রের প্রলোভনে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে পিবিআই। বৈধ পথে ও ভিসা ছাড়া বিদেশে না যেতে সতর্ক করা হয়েছে।

মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ মে ২০২৬
অনেক বড় স্বপ্ন দেখেছিলেন সোহেল। ইতালি যাবেন, ভালো একটি চাকরি করবেন, সংসার সামলাবেন। সেই স্বপ্নপূরণের আশ্বাস দিয়েছিলেন আত্মীয় ও পরিচিত মুখের একদল মানুষ। কিন্তু স্বপ্ন পূরণের বদলে সোহেলকে পৌঁছে দেওয়া হয় লিবিয়ার ত্রিপলীতে, এক ভয়ঙ্কর মানব পাচারকারী চক্রের হাতে।
নির্যাতন, নগ্ন করে মারধর, বৈদ্যুতিক তারের নির্যাতন- সব সহ্য করতে হয়েছে তাকে। মুক্তিপণ হিসেবে পরিবারের কাছ থেকে আদায় করা হয় প্রায় ৬৩ লাখ টাকা। দীর্ঘ সাত মাস পর অবশেষে সোহেলকে উদ্ধার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
মঙ্গলবার (২৬ মে) পিবিআই ঢাকা মেট্রো (উত্তর) এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই সফল অভিযানের কথা জানায়।
সোহেলের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার শিউরে উঠেছেন স্ত্রী উর্মি বেগম ও পরিবারের অন্য সদস্যরা। উর্মি বেগম এ ব্যাপরে মামলা দায়ের করেছেন।
দায়ের করা এজাহার সূত্রে জানা যায়, পরিবারের আত্মীয় ও পরিচিত মো. আলাউদ্দিন কবিরাজের মাধ্যমেই সোহেলের ইতালি যাওয়ার সূত্রপাত। ২০২৫ সালের অক্টোবরে আলাউদ্দিন সোহেলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন ইতালি প্রবাসী রিয়াজুল মাদবরের। রিয়াজুল ও তার সহযোগীরা সোহেলকে ‘স্টুডেন্ট ভিসায়’ ইতালি পাঠানোর আশ্বাস দেন। স্থানীয় ম্যানেজার পরিচয়ে যুক্ত হন টিটু মীর।
রিয়াজুল, আলাউদ্দিন ও টিটু মীরের সঙ্গে মৌখিক চুক্তি হয় সোহেলের। ইতালি পৌঁছে দেওয়ার বিনিময়ে দাবি করা হয় ২৪ লাখ টাকা। চুক্তিমতো প্রথমে দেওয়া হয় ৪ লাখ টাকা। পরে বিভিন্ন ধাপে ব্যাংকিং চ্যানেলে আরও ৬ লাখ, ৫ লাখ ও ৮ লাখ টাকা দেওয়া হয়। কিন্তু ইতালির বদলে সোহেলকে পাঠানো হয় লিবিয়ার ত্রিপলীতে। সেখানে অপহরণকারীদের কাছে তাকে ‘বিক্রি’ করে দেওয়া হয়।
ত্রিপলীতে জিম্মি হয়ে পড়ে সোহেল। অপহরণকারীরা তার স্ত্রী উর্মি বেগমের ইমো অ্যাকাউন্টে ভিডিও পাঠায়। ভিডিওতে দেখা যায় রক্তাক্ত, মারাত্মক আহত সোহেলকে। তার হাতের নখ প্লাস দিয়ে থেঁতলে দেওয়া হয়েছে। শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্লেডের দাগ, বিদ্যুতের তারের চিহ্ন। এমনকি নগ্ন করে হাত-মুখ বেঁধে নির্যাতনের ঘটনাও ঘটানো হয়।
অপহরণকারীরা জানায়, সোহেলকে জীবিত ফেরত পেতে ২৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিতে হবে। শুধু উর্মি বেগমকে নয়, সোহেলের ভাই, বাবা-মা সবাইকে একইভাবে ভয়ভীতি দেখানো হয়।
এদিকে সোহেলের পরিবার যখন রিয়াজুল ও আলাউদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করে, তখন তারা সোহেলকে দ্রুত মুক্ত করার আশ্বাস দিয়ে আরও ২০ লাখ টাকা নেয়। পাশাপাশি তারা পরিবারকে ইমো অ্যাপ বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেয়। দীর্ঘ সময় পার হলেও সোহেলের সন্ধান না পেয়ে উর্মি বেগম গত ৬ এপ্রিল তুরাগ থানায় মামলা করেন।
মামলার গুরুত্ব বুঝে পিবিআই ঢাকা মেট্রো (উত্তর) নিজ উদ্যোগে তদন্ত শুরু করে। গত ২১ এপ্রিল টিটু মীর ও রহিমা বেগমকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মোবাইল ফোন জব্দ করে তথ্য বিশ্লেষণ করে চিহ্নিত করা হয় আরও আসামি। কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া থেকে গ্রেপ্তার করা হয় ইসমাইল দেওয়ানকে। চক্রের একাধিক ব্যাংক হিসাব বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সহায়তায় ফ্রিজ করা হয়।
পিবিআইয়ের ধারাবাহিক অভিযানে চাপে পড়ে অপহরণকারীরা সোহেলকে ত্রিপলীর একটি অজ্ঞাত স্থানে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশিরা তাকে আশ্রয় দেন। পিবিআই, ইউএনওডিসি, লিবিয়াস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস ও আইওএম-এর (ইউএন মাইগ্রেশন) সহায়তায় গত ৩ মে তাকে লিবিয়ার ত্রিপলীতে আইওএম-এর নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়।
সর্বশেষ সোমবার (২৫ মে) সোহেলকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পিবিআই হেফাজতে আনা হয়। তিনি ইতোমধ্যে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।
পিবিআই জানিয়েছে, এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে শতাধিক ব্যক্তিকে লিবিয়ায় পাচার করে প্রতারণা ও নির্যাতনের মাধ্যমে অর্থ আদায় করছিল। মামলার অন্যান্য পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার ও অর্থপাচারের নেটওয়ার্ক উদঘাটনে তদন্ত চলছে। বিদেশগামী সাধারণ মানুষকে দালালচক্রের প্রলোভনে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে পিবিআই। বৈধ পথে ও ভিসা ছাড়া বিদেশে না যেতে সতর্ক করা হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন