সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার যাদুকাটা নদীর তীরে অবস্থিত দেশের অন্যতম দৃষ্টিনন্দন শিমুল বাগানটি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী চক্র নদীর পাড় কেটে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করায় পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ এই স্থানটি এখন চরম হুমকির মুখে।
উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান প্রয়াত জয়নাল আবেদীনের উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই বাগানে প্রতিবছর বসন্তে লাল শিমুল ফুল ফোটে। প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশ-বিদেশ থেকে হাজারো পর্যটক এখানে ভিড় জমান। তবে সম্প্রতি যাদুকাটা নদীর তীর ঘেঁষে অবাধে বালু উত্তোলনের কারণে নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। ফলে একের পর এক শিমুল গাছ নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে জানা গেছে, শুধু শিমুল বাগানই নয়, যাদুকাটা নদীর ওপর নির্মাণাধীন সেতুটিও মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। ইতিমধ্যে যাদুকাটা সেতুর ৫টি গার্ডার ভেঙে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, ড্রেজার মেশিন দিয়ে অনিয়ন্ত্রিত বালু তোলাই এর মূল কারণ।
অভিযোগ রয়েছে, একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে যাদুকাটা নদীর তীরবর্তী শিমুল বাগান, সেতুর পাশ, গড়কাটি এলাকা এবং ঝালরটেক ও ঘাগটিয়া গ্রামের পাকা রাস্তার মাথা পর্যন্ত এলাকায় প্রতিদিন রাতের আঁধারে ও ভোরে বালু উত্তোলন করছে। পরিবেশবিধ্বংসী ড্রেজার ও ‘সেভ মেশিন’ ব্যবহারের পাশাপাশি নদীর পাড়ে গভীর গর্ত (কোয়ারি) করে বালু তোলা হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, নদীজুড়ে শত শত ড্রেজার মেশিন চলছে। এই অপকর্মের মূল হোতা হিসেবে ঘাগটিয়া গ্রামের রানু মেম্বার ও মানিগাঁউ গ্রামের হাসানের নাম উঠে এসেছে। তবে রানু মেম্বার তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
নদীভাঙনের কারণে ইতিমধ্যে ওই এলাকার ২০ থেকে ২৫টি গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহু মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। হুমকির মুখে পড়েছে যাদুকাটা তীরের গুচ্ছগ্রামও। গত ২৫ মে এলাকাবাসী ওমরপুর গ্রামের বাসিন্দা মেহরাবকে একটি স্টিলবডি নৌকাসহ আটক করে। জিজ্ঞাসাবাদে মেহরাব জানান, রানু মেম্বার ও হাসান তাকে এই বালু বোঝাই নৌকাটি দিয়েছিলেন।
যাদুকাটা নদীর ইজারাদার শাহ রুবেল ও নাসির মিয়া বলেন, ‘আমরা শুরু থেকেই পাড় কাটার বিরুদ্ধে। শিমুল বাগান ও সেতু রক্ষায় আমরা পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনেরও দাবি জানিয়েছি।’
তাহিরপুর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহরুখ আলম সান্তনু বলেন, ‘অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসন তৎপর রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের চিঠি দিয়ে সতর্ক করার পাশাপাশি নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। রানু মেম্বার ও হাসানসহ জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।’
বাদাঘাট পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নাজমুল ইসলাম ও তাহিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম জানান, জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে পুলিশি তৎপরতা আরও জোরদার করা হচ্ছে।
সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এ বি এম জাকির হোসেন বলেন, ‘যাদুকাটা ও ধোপাজান নদীতে অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন বন্ধে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি। এ পর্যন্ত ৪৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং ২৯৯ জনকে আসামি করা হয়েছে। রানু মেম্বারের নামেই অন্তত ১০টি মামলা রয়েছে। শিগগিরই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, ‘ঈদের পর আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত কোর কমিটির সভায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করে অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
এদিকে প্রশাসনের নানা আশ্বাসের পরও দীর্ঘদিন ধরে চলা এই অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। পরিবেশপ্রেমী ও পর্যটন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ঐতিহ্যবাহী এই শিমুল বাগান রক্ষায় অনতিবিলম্বে প্রশাসনের কার্যকর ও জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।

মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ মে ২০২৬
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার যাদুকাটা নদীর তীরে অবস্থিত দেশের অন্যতম দৃষ্টিনন্দন শিমুল বাগানটি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী চক্র নদীর পাড় কেটে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করায় পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ এই স্থানটি এখন চরম হুমকির মুখে।
উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান প্রয়াত জয়নাল আবেদীনের উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই বাগানে প্রতিবছর বসন্তে লাল শিমুল ফুল ফোটে। প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশ-বিদেশ থেকে হাজারো পর্যটক এখানে ভিড় জমান। তবে সম্প্রতি যাদুকাটা নদীর তীর ঘেঁষে অবাধে বালু উত্তোলনের কারণে নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। ফলে একের পর এক শিমুল গাছ নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে জানা গেছে, শুধু শিমুল বাগানই নয়, যাদুকাটা নদীর ওপর নির্মাণাধীন সেতুটিও মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। ইতিমধ্যে যাদুকাটা সেতুর ৫টি গার্ডার ভেঙে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, ড্রেজার মেশিন দিয়ে অনিয়ন্ত্রিত বালু তোলাই এর মূল কারণ।
অভিযোগ রয়েছে, একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে যাদুকাটা নদীর তীরবর্তী শিমুল বাগান, সেতুর পাশ, গড়কাটি এলাকা এবং ঝালরটেক ও ঘাগটিয়া গ্রামের পাকা রাস্তার মাথা পর্যন্ত এলাকায় প্রতিদিন রাতের আঁধারে ও ভোরে বালু উত্তোলন করছে। পরিবেশবিধ্বংসী ড্রেজার ও ‘সেভ মেশিন’ ব্যবহারের পাশাপাশি নদীর পাড়ে গভীর গর্ত (কোয়ারি) করে বালু তোলা হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, নদীজুড়ে শত শত ড্রেজার মেশিন চলছে। এই অপকর্মের মূল হোতা হিসেবে ঘাগটিয়া গ্রামের রানু মেম্বার ও মানিগাঁউ গ্রামের হাসানের নাম উঠে এসেছে। তবে রানু মেম্বার তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
নদীভাঙনের কারণে ইতিমধ্যে ওই এলাকার ২০ থেকে ২৫টি গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহু মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। হুমকির মুখে পড়েছে যাদুকাটা তীরের গুচ্ছগ্রামও। গত ২৫ মে এলাকাবাসী ওমরপুর গ্রামের বাসিন্দা মেহরাবকে একটি স্টিলবডি নৌকাসহ আটক করে। জিজ্ঞাসাবাদে মেহরাব জানান, রানু মেম্বার ও হাসান তাকে এই বালু বোঝাই নৌকাটি দিয়েছিলেন।
যাদুকাটা নদীর ইজারাদার শাহ রুবেল ও নাসির মিয়া বলেন, ‘আমরা শুরু থেকেই পাড় কাটার বিরুদ্ধে। শিমুল বাগান ও সেতু রক্ষায় আমরা পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনেরও দাবি জানিয়েছি।’
তাহিরপুর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহরুখ আলম সান্তনু বলেন, ‘অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসন তৎপর রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের চিঠি দিয়ে সতর্ক করার পাশাপাশি নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। রানু মেম্বার ও হাসানসহ জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।’
বাদাঘাট পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নাজমুল ইসলাম ও তাহিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম জানান, জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে পুলিশি তৎপরতা আরও জোরদার করা হচ্ছে।
সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এ বি এম জাকির হোসেন বলেন, ‘যাদুকাটা ও ধোপাজান নদীতে অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন বন্ধে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি। এ পর্যন্ত ৪৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং ২৯৯ জনকে আসামি করা হয়েছে। রানু মেম্বারের নামেই অন্তত ১০টি মামলা রয়েছে। শিগগিরই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, ‘ঈদের পর আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত কোর কমিটির সভায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করে অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
এদিকে প্রশাসনের নানা আশ্বাসের পরও দীর্ঘদিন ধরে চলা এই অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। পরিবেশপ্রেমী ও পর্যটন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ঐতিহ্যবাহী এই শিমুল বাগান রক্ষায় অনতিবিলম্বে প্রশাসনের কার্যকর ও জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।

আপনার মতামত লিখুন