সংবাদ

বিরোধী দলনেতা নির্বাচন ঘিরে সাংবিধানিক বিতর্ক


দীপক মুখার্জী, কলকাতা
দীপক মুখার্জী, কলকাতা
প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, ০২:১৫ পিএম

বিরোধী দলনেতা নির্বাচন ঘিরে সাংবিধানিক বিতর্ক

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজ্য rরাজনীতিতে জোরদার সংঘাত—সরকার বনাম বিরোধী, আর তৃণমূলের অন্দরেই চলছে ঠান্ডা যুদ্ধ। সেই রাজনৈতিক লড়াই এবার গড়িয়েছে আদালতে, যেখানে উঠছে একের পর এক বড় সাংবিধানিক প্রশ্ন।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন সংঘাত তৈরি হয়েছে দলীয় সিদ্ধান্ত বনাম বিধানসভার ক্ষমতা। এই সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পরেও স্পিকারের সিদ্ধান্তে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। আর এই সিদ্ধান্তকেই চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এখন মামলার শুনানি চলছে  কলকাতা হাইকোর্ট-এ, যা ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।

ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-র নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস বিরোধী দলনেতা হিসেবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম স্পিকারের কাছে পাঠায়। কিন্তু সেই চিঠির ভিত্তিতে কোনও পদক্ষেপ না নিয়ে, পরবর্তীতে অন্য একটি দল ত্যগি গোষ্ঠীর দেওয়া চিঠির ভিত্তিতে স্পিকার রথীন্দ্র বসু ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে ঘোষণা করেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তার আগেই দলবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে ঋতব্রতকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। ফলে প্রশ্ন ওঠে—একজন বহিষ্কৃত বিধায়ক কীভাবে সেই দলেরই বিরোধী দলনেতা হতে পারেন?

এই নিয়েই আদালতে কড়া প্রশ্ন তোলেন বিচারপতি কৃষ্ণ রাও। তিনি স্পষ্টভাবে জানতে চান, প্রথমে জমা দেওয়া দলীয় চিঠিকে উপেক্ষা করে কেন দ্বিতীয় চিঠির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। আরও বড় প্রশ্ন সই জালিয়াতির অভিযোগ ওঠার পর কেন দু’পক্ষকে ডেকে শুনানি করা হয়নি? আদালতের মতে, এটি প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতির পরিপন্থী। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ছিল—১ জুন বহিষ্কারের চিঠি পাওয়ার পরেও ৩ জুন কীভাবে সেই ব্যক্তিকেই বিরোধী দলনেতা করা হলো?

স্পিকারের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, প্রথম চিঠিতে সই জালিয়াতির অভিযোগ থাকায় সেটি সন্দেহজনক ছিল এবং সেই কারণেই পদক্ষেপ করা হয়নি। অন্যদিকে, দ্বিতীয় চিঠির ক্ষেত্রে ৫৮ জন বিধায়ক স্বশরীরে উপস্থিত হয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাদের নেতা হিসেবে সমর্থন জানান। স্পিকারের মতে, বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের নির্দিষ্ট কোনও আইন নেই, তাই সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতেই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

ঋতব্রতের পক্ষেও একই যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে—সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কের সমর্থনই এখানে মুখ্য। এছাড়া, দলত্যাগবিরোধী আইনে এখনও বিদ্রোহী বিধায়কদের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ না হওয়ায় তারা আইনত এখনও দলের সদস্য বলেই দাবি করা হয়েছে। ফলে তাদের সমর্থন বৈধ।

অন্যদিকে, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, বিরোধী দলনেতা নির্বাচন করার অধিকার একমাত্র সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের। দল যাকে মনোনীত করবে, স্পিকারের কাজ সেটিকে স্বীকৃতি দেওয়া তা বদলানোর অধিকার তাঁর নেই। এছাড়া, বহিষ্কৃত একজন ব্যক্তিকে এই পদে বসানো সম্পূর্ণ বেআইনি বলেও দাবি করা হয়েছে।

সব পক্ষের সওয়াল-জবাব শোনার পর বিচারপতি কৃষ্ণ রাও আপাতত রায় স্থগিত রেখেছেন। তবে এই মামলার গুরুত্ব শুধু একজন বিরোধী দলনেতাকে ঘিরে নয়—এটি ঠিক করে দিতে পারে ভবিষ্যতে দলীয় সিদ্ধান্ত বড় হবে, না বিধায়ক সংখ্যাগরিষ্ঠতার মতামত প্রাধান্য পাবে। একইসঙ্গে স্পিকারের সাংবিধানিক ভূমিকা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

এখন নজর আদালতের চূড়ান্ত রায়ের দিকে কারণ এই রায় শুধু এই বিতর্কের নিষ্পত্তিই করবে না, বরং ভবিষ্যতের রাজনীতির পথও নির্ধারণ করতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬


বিরোধী দলনেতা নির্বাচন ঘিরে সাংবিধানিক বিতর্ক

প্রকাশের তারিখ : ১৮ জুন ২০২৬

featured Image

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজ্য rরাজনীতিতে জোরদার সংঘাত—সরকার বনাম বিরোধী, আর তৃণমূলের অন্দরেই চলছে ঠান্ডা যুদ্ধ। সেই রাজনৈতিক লড়াই এবার গড়িয়েছে আদালতে, যেখানে উঠছে একের পর এক বড় সাংবিধানিক প্রশ্ন।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন সংঘাত তৈরি হয়েছে দলীয় সিদ্ধান্ত বনাম বিধানসভার ক্ষমতা। এই সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পরেও স্পিকারের সিদ্ধান্তে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। আর এই সিদ্ধান্তকেই চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এখন মামলার শুনানি চলছে  কলকাতা হাইকোর্ট-এ, যা ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।

ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-র নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস বিরোধী দলনেতা হিসেবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম স্পিকারের কাছে পাঠায়। কিন্তু সেই চিঠির ভিত্তিতে কোনও পদক্ষেপ না নিয়ে, পরবর্তীতে অন্য একটি দল ত্যগি গোষ্ঠীর দেওয়া চিঠির ভিত্তিতে স্পিকার রথীন্দ্র বসু ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে ঘোষণা করেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তার আগেই দলবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে ঋতব্রতকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। ফলে প্রশ্ন ওঠে—একজন বহিষ্কৃত বিধায়ক কীভাবে সেই দলেরই বিরোধী দলনেতা হতে পারেন?

এই নিয়েই আদালতে কড়া প্রশ্ন তোলেন বিচারপতি কৃষ্ণ রাও। তিনি স্পষ্টভাবে জানতে চান, প্রথমে জমা দেওয়া দলীয় চিঠিকে উপেক্ষা করে কেন দ্বিতীয় চিঠির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। আরও বড় প্রশ্ন সই জালিয়াতির অভিযোগ ওঠার পর কেন দু’পক্ষকে ডেকে শুনানি করা হয়নি? আদালতের মতে, এটি প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতির পরিপন্থী। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ছিল—১ জুন বহিষ্কারের চিঠি পাওয়ার পরেও ৩ জুন কীভাবে সেই ব্যক্তিকেই বিরোধী দলনেতা করা হলো?

স্পিকারের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, প্রথম চিঠিতে সই জালিয়াতির অভিযোগ থাকায় সেটি সন্দেহজনক ছিল এবং সেই কারণেই পদক্ষেপ করা হয়নি। অন্যদিকে, দ্বিতীয় চিঠির ক্ষেত্রে ৫৮ জন বিধায়ক স্বশরীরে উপস্থিত হয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাদের নেতা হিসেবে সমর্থন জানান। স্পিকারের মতে, বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের নির্দিষ্ট কোনও আইন নেই, তাই সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতেই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

ঋতব্রতের পক্ষেও একই যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে—সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কের সমর্থনই এখানে মুখ্য। এছাড়া, দলত্যাগবিরোধী আইনে এখনও বিদ্রোহী বিধায়কদের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ না হওয়ায় তারা আইনত এখনও দলের সদস্য বলেই দাবি করা হয়েছে। ফলে তাদের সমর্থন বৈধ।

অন্যদিকে, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, বিরোধী দলনেতা নির্বাচন করার অধিকার একমাত্র সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের। দল যাকে মনোনীত করবে, স্পিকারের কাজ সেটিকে স্বীকৃতি দেওয়া তা বদলানোর অধিকার তাঁর নেই। এছাড়া, বহিষ্কৃত একজন ব্যক্তিকে এই পদে বসানো সম্পূর্ণ বেআইনি বলেও দাবি করা হয়েছে।

সব পক্ষের সওয়াল-জবাব শোনার পর বিচারপতি কৃষ্ণ রাও আপাতত রায় স্থগিত রেখেছেন। তবে এই মামলার গুরুত্ব শুধু একজন বিরোধী দলনেতাকে ঘিরে নয়—এটি ঠিক করে দিতে পারে ভবিষ্যতে দলীয় সিদ্ধান্ত বড় হবে, না বিধায়ক সংখ্যাগরিষ্ঠতার মতামত প্রাধান্য পাবে। একইসঙ্গে স্পিকারের সাংবিধানিক ভূমিকা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

এখন নজর আদালতের চূড়ান্ত রায়ের দিকে কারণ এই রায় শুধু এই বিতর্কের নিষ্পত্তিই করবে না, বরং ভবিষ্যতের রাজনীতির পথও নির্ধারণ করতে পারে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত