সংবাদ

‘না ধরলে চাকরি থাকবে না’


নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ১০:০৭ পিএম

‘না ধরলে চাকরি থাকবে না’
ছবি : সংগৃহীত

২০১৫ সালের ২০ ফেব্রয়ারি বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলা ছাত্রদলের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টিপু হাওলাদার ও উপজেলা জাতীয়বাদী সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) সাংগঠনিক সম্পাদক কবির মোল্লাকে ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দিয়েছেন পুলিশের এক কর্মকর্তা।

তিনি আদালতকে জানিয়েছেন, সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর নির্দেশে এবং তৎকালীন পুলিশ সুপার (এসপি) এ কে এম এহসানউল্লাহর হুমকিতে তিনি আসামিদের ধরতে বাধ্য হয়েছিলেন। পরে ঢাকায় গ্রেপ্তার হওয়া ওই দুই ব্যক্তিকে বরিশালে নিয়ে ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যা করা হয়।

মঙ্গলবার (২৩ জুন) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় তৃতীয় সাক্ষী হিসেবে এই জবানবন্দি দেন তৎকালীন এ গোয়েন্দা কর্মকর্তা।

এদিন ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষে উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাস্মদ ও শহিদুল ইসলাম। অন্যদিকে আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী আবুল হাসান এবং পলাতক আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন।

শুনানির সময় কারাগারে থাকা দুই আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।

আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সিআইডির বর্তমান সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) মো. খলিলুর রহমানের বলেন, “পুলিশ সুপার মহোদয় বলেন যে, আসামিদের যে কোনো মূল্যে ধরতে হবে। না ধরলে চাকরি থাকবে না এবং উপরের অনেক চাপ আছে।”

২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে জবানবন্দিতে বলা হয়, ওই বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি বরিশালের তৎকালীন পুলিশ সুপার এ কে এম এহসানউল্লাহ এসআই খলিলুর রহমানকে তার অফিসে ডাকেন। সেখানে আগৈলঝাড়া থানার তৎকালীন ওসি মনিরুল ইসলাম এবং এসআই মো. নজরুল ইসলামও উপস্থিত ছিলেন। পুলিশ সুপার মহোদয় বলেন, বাকেরগঞ্জ থানা এবং আগৈলঝাড়া থানার মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার করার জন্য আগৈলঝাড়া ও গৌড়নদী উপজেলার এমপি আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন।”

এসপির নির্দেশে এসআই খলিলুর এবং এসআই নজরুল ঢাকার ডিবি অফিসে যান। ডিএমপির তৎকালীন ডিসি (ডিবি) এবং এসি মহরমের সহায়তায় তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে ২০১৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাত দেড়টার দিকে আশুলিয়ার কুরগাঁও থেকে কবির মোল্লাকে এবং রাত আড়াইটার দিকে কেরানীগঞ্জের মধ্যেরচর থেকে টিপু হাওলাদারকে গ্রেপ্তার করা হয়।

আসামিদের গ্রেপ্তারের পর রাতেই এসআই নজরুল ইসলাম একটি ভাড়া করা মাইক্রোবাসে করে তাদের নিয়ে বরিশালের উদ্দেশ্যে রওনা হন। এসআই খলিলুর রহমান মামলার অন্য কাজের জন্য ঢাকায় থেকে যান।

জবানবন্দিতে তিনি বলেন, “আমি লোকমুখে ও টিভি স্ক্রলের মাধ্যমে জানতে পারি যে, গ্রেফতারকৃত আসামিদের ক্রস ফায়ারে দেওয়া হয়েছে। পরে জানতে পারি, এই হত্যাকান্ডের মূল আসামি এমপি আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর নির্দেশে তৎকালীন পুলিশ সুপার এহসানউল্লাহর হুকুমে উজিরপুর থানার ২ জন অফিসার এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।”

এর আগে, গত ২০ মে এই জোড়া ‘ক্রসফায়ারে’র ঘটনায় আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহসহ চারজনের বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল।

মামলার অন্য আসামিরা হলেন- বরিশালের সাবেক এসপি এ কে এম এহসান উল্লাহ, উজিরপুর থানার সাবেক এএসআই মাহাবুল ইসলাম ও জসিম উদ্দিন। আসামিদের মধ্যে হাসানাত আব্দুল্লাহ ও এহসান উল্লাহ পলাতক রয়েছেন। বাকি দুজন গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে কারাগারে আছেন। 

প্রসিকিউশনের অভিযোগে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ হওয়ায় আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ ক্ষমতার অপব্যবহার করে ছাত্রদল ও জাসাসের ওই দুই নেতাকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। তার নির্দেশেই এসপি এহসান উল্লাহ তা বাস্তবায়ন করেন। উজিরপুর থানা পুলিশ এএসআই মাহাবুল ও জসিমকে দিয়ে আগৈলঝাড়া বাইপাস সড়কের পাশে ‘ক্রসফায়ারের নাটক’ সাজিয়ে তাদের হত্যা করে।

তবে গত ১৪ মে আসামিদের অব্যাহতির আবেদনের শুনানিতে তাদের আইনজীবী আবুল হাসান দাবি করেন, “যে ঘটনার কথা বলা হচ্ছে এর সঙ্গে আসামিরা জড়িত নন। মিথ্যা ও বানোয়াট গল্পের মাধ্যমে তাদের জড়ানো হয়েছে।”

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ বরিশাল-১ আসন থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত ১৫ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে এই হত্যার লিখিত অভিযোগ করা হয়।

নির্ধারিত সময়ে আত্মসমর্পণ না করায় গত ২৫ মার্চ হাসানাত আব্দুল্লাহকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পলাতক’ ঘোষণা করে ট্রাইব্যুনাল। 

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তার ছেলে সেরনিয়াবাত মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি। তার আরেক ছেলে ও ভাই আত্মগোপনে রয়েছেন। হাসানাত আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে দুদক জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলা করেছে এবং বরিশালেও তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬


‘না ধরলে চাকরি থাকবে না’

প্রকাশের তারিখ : ২৩ জুন ২০২৬

featured Image

২০১৫ সালের ২০ ফেব্রয়ারি বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলা ছাত্রদলের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টিপু হাওলাদার ও উপজেলা জাতীয়বাদী সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) সাংগঠনিক সম্পাদক কবির মোল্লাকে ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দিয়েছেন পুলিশের এক কর্মকর্তা।

তিনি আদালতকে জানিয়েছেন, সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর নির্দেশে এবং তৎকালীন পুলিশ সুপার (এসপি) এ কে এম এহসানউল্লাহর হুমকিতে তিনি আসামিদের ধরতে বাধ্য হয়েছিলেন। পরে ঢাকায় গ্রেপ্তার হওয়া ওই দুই ব্যক্তিকে বরিশালে নিয়ে ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যা করা হয়।

মঙ্গলবার (২৩ জুন) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় তৃতীয় সাক্ষী হিসেবে এই জবানবন্দি দেন তৎকালীন এ গোয়েন্দা কর্মকর্তা।

এদিন ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষে উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাস্মদ ও শহিদুল ইসলাম। অন্যদিকে আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী আবুল হাসান এবং পলাতক আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন।

শুনানির সময় কারাগারে থাকা দুই আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।

আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সিআইডির বর্তমান সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) মো. খলিলুর রহমানের বলেন, “পুলিশ সুপার মহোদয় বলেন যে, আসামিদের যে কোনো মূল্যে ধরতে হবে। না ধরলে চাকরি থাকবে না এবং উপরের অনেক চাপ আছে।”

২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে জবানবন্দিতে বলা হয়, ওই বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি বরিশালের তৎকালীন পুলিশ সুপার এ কে এম এহসানউল্লাহ এসআই খলিলুর রহমানকে তার অফিসে ডাকেন। সেখানে আগৈলঝাড়া থানার তৎকালীন ওসি মনিরুল ইসলাম এবং এসআই মো. নজরুল ইসলামও উপস্থিত ছিলেন। পুলিশ সুপার মহোদয় বলেন, বাকেরগঞ্জ থানা এবং আগৈলঝাড়া থানার মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার করার জন্য আগৈলঝাড়া ও গৌড়নদী উপজেলার এমপি আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন।”

এসপির নির্দেশে এসআই খলিলুর এবং এসআই নজরুল ঢাকার ডিবি অফিসে যান। ডিএমপির তৎকালীন ডিসি (ডিবি) এবং এসি মহরমের সহায়তায় তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে ২০১৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাত দেড়টার দিকে আশুলিয়ার কুরগাঁও থেকে কবির মোল্লাকে এবং রাত আড়াইটার দিকে কেরানীগঞ্জের মধ্যেরচর থেকে টিপু হাওলাদারকে গ্রেপ্তার করা হয়।

আসামিদের গ্রেপ্তারের পর রাতেই এসআই নজরুল ইসলাম একটি ভাড়া করা মাইক্রোবাসে করে তাদের নিয়ে বরিশালের উদ্দেশ্যে রওনা হন। এসআই খলিলুর রহমান মামলার অন্য কাজের জন্য ঢাকায় থেকে যান।

জবানবন্দিতে তিনি বলেন, “আমি লোকমুখে ও টিভি স্ক্রলের মাধ্যমে জানতে পারি যে, গ্রেফতারকৃত আসামিদের ক্রস ফায়ারে দেওয়া হয়েছে। পরে জানতে পারি, এই হত্যাকান্ডের মূল আসামি এমপি আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর নির্দেশে তৎকালীন পুলিশ সুপার এহসানউল্লাহর হুকুমে উজিরপুর থানার ২ জন অফিসার এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।”

এর আগে, গত ২০ মে এই জোড়া ‘ক্রসফায়ারে’র ঘটনায় আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহসহ চারজনের বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল।

মামলার অন্য আসামিরা হলেন- বরিশালের সাবেক এসপি এ কে এম এহসান উল্লাহ, উজিরপুর থানার সাবেক এএসআই মাহাবুল ইসলাম ও জসিম উদ্দিন। আসামিদের মধ্যে হাসানাত আব্দুল্লাহ ও এহসান উল্লাহ পলাতক রয়েছেন। বাকি দুজন গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে কারাগারে আছেন। 

প্রসিকিউশনের অভিযোগে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ হওয়ায় আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ ক্ষমতার অপব্যবহার করে ছাত্রদল ও জাসাসের ওই দুই নেতাকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। তার নির্দেশেই এসপি এহসান উল্লাহ তা বাস্তবায়ন করেন। উজিরপুর থানা পুলিশ এএসআই মাহাবুল ও জসিমকে দিয়ে আগৈলঝাড়া বাইপাস সড়কের পাশে ‘ক্রসফায়ারের নাটক’ সাজিয়ে তাদের হত্যা করে।

তবে গত ১৪ মে আসামিদের অব্যাহতির আবেদনের শুনানিতে তাদের আইনজীবী আবুল হাসান দাবি করেন, “যে ঘটনার কথা বলা হচ্ছে এর সঙ্গে আসামিরা জড়িত নন। মিথ্যা ও বানোয়াট গল্পের মাধ্যমে তাদের জড়ানো হয়েছে।”

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ বরিশাল-১ আসন থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত ১৫ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে এই হত্যার লিখিত অভিযোগ করা হয়।

নির্ধারিত সময়ে আত্মসমর্পণ না করায় গত ২৫ মার্চ হাসানাত আব্দুল্লাহকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পলাতক’ ঘোষণা করে ট্রাইব্যুনাল। 

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তার ছেলে সেরনিয়াবাত মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি। তার আরেক ছেলে ও ভাই আত্মগোপনে রয়েছেন। হাসানাত আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে দুদক জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলা করেছে এবং বরিশালেও তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত