সংবাদ

দানবাক্সের অর্থ আগে কোথায় যেত, এখন কার নিয়ন্ত্রণে


নিজস্ব বার্তা পরিবেশক, সিলেট
নিজস্ব বার্তা পরিবেশক, সিলেট
প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ০৫:৩৬ পিএম

দানবাক্সের অর্থ আগে কোথায় যেত, এখন কার নিয়ন্ত্রণে
সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজার

হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্সের অর্থের ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। কয়েক শ’ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রকাশ্যে দানবাক্স ও ডেগ খুলে টাকা গণনার পর সামনে এসেছে নানা প্রশ্ন। বিশেষ করে, এতদিন দানের অর্থ কোথায় যেত, কীভাবে ব্যয় হতো এবং এখন সেই অর্থ কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে- এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে।

সোমবার (২৩ জুন) জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে মাজারে স্থাপিত তিনটি ডেগ ও একটি দানবাক্স খুলে গণনা করা হয়। এতে নগদ ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৫৯ টাকা, ৭ আনা সোনা এবং কিছু বিদেশি মুদ্রা পাওয়া যায়। মাত্র চার দিনে এত অর্থ জমা হওয়ার বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সাঈদা পারভীন বলেন, “মাজারের টাকা সোনালী ব্যাংকে মাজারের নামীয় একটি হিসাবে রাখা হবে। সম্প্রতি এই হিসাব খোলা হয়েছে। পরবর্তীতে এ অর্থের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”

তবে মাজার কর্তৃপক্ষ বলছে, এ ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ত করা হয়নি। 

হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের খাদেম মুফতি রায়হান উদ্দিন মুন্না বলেন, “আমরা মিডিয়ার মাধ্যমে শুনেছি, মাজারের নামে একটি ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে। কিন্তু এতে আমাদের কাউকে সম্পৃক্ত করা হয়নি। এমনকি আমাদের জানানোও হয়নি। দানবাক্সের টাকা গণনার বিষয়টিও আগে জানানো হয়নি।”

মাজারভক্তদের সংগঠন আশেকানে আউলিয়া বাংলাদেশ-এর চেয়ারম্যান জামান চৌধুরী বলেন, “শুনেছি জেলা প্রশাসন একটি ব্যাংক হিসাব খুলেছে। কিন্তু মাজার সংশ্লিষ্ট কাউকে এতে সম্পৃক্ত করা হয়নি। এই টাকা কীভাবে ব্যয় হবে বা কারা ব্যয় করবে সেটাও আমরা জানি না।”

গত সপ্তাহে আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথা বলে জেলা প্রশাসন মাজারের তিনটি ডেগ সিলগালা করে এবং নতুন দানবাক্স স্থাপন করে। এ নিয়ে মাজার সংশ্লিষ্টদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। এরই মধ্যে রোববার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করা হয়। যদিও প্রত্যাহারের কারণ উল্লেখ করা হয়নি।

জেলা প্রশাসকের দায়িত্বে থাকাকালে সারওয়ার আলম বলেছিলেন, “মাজারের টাকা সরকার নেবে না। এই টাকা মাজারেই ব্যয় করা হবে। জেলা প্রশাসক ও ওয়াকফ ইন্সপেক্টরের যৌথ হিসাবে এই অর্থ রাখা হবে।”

আগে কীভাবে ব্যয় হতো দানের অর্থ

মাজারের খাদেম মুফতি রায়হান উদ্দিন মুন্না বলেন, “হযরত শাহজালাল (রহ.) বিয়ে করেননি। তবে তার ভাগনে বিয়ে করেছিলেন। শাহজালাল (রহ.) জীবিত থাকতেই মাজারের আয়ের একটি অংশ তার ভাগনের পরিবারের জন্য বরাদ্দ করার ব্যবস্থা করেছিলেন বলে প্রচলিত রয়েছে। বর্তমানে সেই বংশধরদের প্রায় ৩০০ পরিবার রয়েছে।”

মুফতি রায়হান উদ্দিন মুন্না বলেন, “এই পরিবারগুলোর সদস্যরা ‘বাড়ি প্রথা’র মাধ্যমে পালাক্রমে মাজারের দায়িত্ব পালন করেন। যিনি দায়িত্বে থাকেন, তিনি মাজারের রক্ষণাবেক্ষণ, কর্মচারীদের বেতন, লঙ্গরখানার খরচ এবং অন্যান্য ব্যয় নির্বাহ করেন। এরপর উদ্বৃত্ত অর্থ হাদিয়া হিসেবে গ্রহণ করেন। এছাড়া সদকার টাকা প্রয়োজনীয় ব্যক্তিদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।”

মাজারের খাদেম আরও বলেন, “আমরা কখনোই মাজারে দান করার জন্য প্রচারণা চালাই না। মানুষ তাদের ভক্তি ও ভালোবাসা থেকেই এখানে এসে দান করেন।”

দিনে কত টাকা ওঠে

মাজারে প্রতিদিন কত অর্থ দান হয়, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো হিসাব নেই। তবে আশেকানে আউলিয়া বাংলাদেশ-এর চেয়ারম্যান বলেন, “কোনো দিন ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা, কোনো দিন ৫০ হাজার টাকা ওঠে। আবার বৃহস্পতিবার বা ভক্ত সমাগম বেশি হলে এক থেকে দেড় লাখ টাকাও উঠতে পারে।” 

তবে মাত্র চার দিনে সাড়ে ১৭ লাখ টাকার বেশি পাওয়ার ঘটনায় প্রকৃত অর্থের পরিমাণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

বিভেদের আশঙ্কা

নাগরিক সংগঠক আব্দুল করিম কিম মনে করেন, মাজারে নগদ অর্থ দানের প্রচলন খুব বেশি পুরনো নয়। তিনি বলেন, “আগে মানুষ ফলমূল, সবজি কিংবা গৃহপালিত পশু-পাখি নিয়ে আসতেন। একসময় মাজারে আগত ভক্ত ও পর্যটকদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও মাজার কর্তৃপক্ষকে করতে হতো। তখন অনেক সময় ব্যয়ই আয়ের চেয়ে বেশি হতো।”

আব্দুল করিম আরও বলেন, “জেলা প্রশাসনের সাম্প্রতিক উদ্যোগ মাজার অনুসারী ও কওমি ঘরানার মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছে। এতে দুই পক্ষকে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে।”

মাজারের দানের অর্থের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ব্যবস্থাপনা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা কাটেনি। একদিকে প্রশাসন আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথা বলছে, অন্যদিকে মাজার কর্তৃপক্ষ ও ভক্তদের একটি অংশ ঐতিহ্যগত ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার দাবি জানাচ্ছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬


দানবাক্সের অর্থ আগে কোথায় যেত, এখন কার নিয়ন্ত্রণে

প্রকাশের তারিখ : ২৩ জুন ২০২৬

featured Image

হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্সের অর্থের ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। কয়েক শ’ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রকাশ্যে দানবাক্স ও ডেগ খুলে টাকা গণনার পর সামনে এসেছে নানা প্রশ্ন। বিশেষ করে, এতদিন দানের অর্থ কোথায় যেত, কীভাবে ব্যয় হতো এবং এখন সেই অর্থ কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে- এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে।

সোমবার (২৩ জুন) জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে মাজারে স্থাপিত তিনটি ডেগ ও একটি দানবাক্স খুলে গণনা করা হয়। এতে নগদ ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৫৯ টাকা, ৭ আনা সোনা এবং কিছু বিদেশি মুদ্রা পাওয়া যায়। মাত্র চার দিনে এত অর্থ জমা হওয়ার বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সাঈদা পারভীন বলেন, “মাজারের টাকা সোনালী ব্যাংকে মাজারের নামীয় একটি হিসাবে রাখা হবে। সম্প্রতি এই হিসাব খোলা হয়েছে। পরবর্তীতে এ অর্থের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”

তবে মাজার কর্তৃপক্ষ বলছে, এ ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ত করা হয়নি। 

হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের খাদেম মুফতি রায়হান উদ্দিন মুন্না বলেন, “আমরা মিডিয়ার মাধ্যমে শুনেছি, মাজারের নামে একটি ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে। কিন্তু এতে আমাদের কাউকে সম্পৃক্ত করা হয়নি। এমনকি আমাদের জানানোও হয়নি। দানবাক্সের টাকা গণনার বিষয়টিও আগে জানানো হয়নি।”

মাজারভক্তদের সংগঠন আশেকানে আউলিয়া বাংলাদেশ-এর চেয়ারম্যান জামান চৌধুরী বলেন, “শুনেছি জেলা প্রশাসন একটি ব্যাংক হিসাব খুলেছে। কিন্তু মাজার সংশ্লিষ্ট কাউকে এতে সম্পৃক্ত করা হয়নি। এই টাকা কীভাবে ব্যয় হবে বা কারা ব্যয় করবে সেটাও আমরা জানি না।”

গত সপ্তাহে আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথা বলে জেলা প্রশাসন মাজারের তিনটি ডেগ সিলগালা করে এবং নতুন দানবাক্স স্থাপন করে। এ নিয়ে মাজার সংশ্লিষ্টদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। এরই মধ্যে রোববার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করা হয়। যদিও প্রত্যাহারের কারণ উল্লেখ করা হয়নি।

জেলা প্রশাসকের দায়িত্বে থাকাকালে সারওয়ার আলম বলেছিলেন, “মাজারের টাকা সরকার নেবে না। এই টাকা মাজারেই ব্যয় করা হবে। জেলা প্রশাসক ও ওয়াকফ ইন্সপেক্টরের যৌথ হিসাবে এই অর্থ রাখা হবে।”

আগে কীভাবে ব্যয় হতো দানের অর্থ

মাজারের খাদেম মুফতি রায়হান উদ্দিন মুন্না বলেন, “হযরত শাহজালাল (রহ.) বিয়ে করেননি। তবে তার ভাগনে বিয়ে করেছিলেন। শাহজালাল (রহ.) জীবিত থাকতেই মাজারের আয়ের একটি অংশ তার ভাগনের পরিবারের জন্য বরাদ্দ করার ব্যবস্থা করেছিলেন বলে প্রচলিত রয়েছে। বর্তমানে সেই বংশধরদের প্রায় ৩০০ পরিবার রয়েছে।”

মুফতি রায়হান উদ্দিন মুন্না বলেন, “এই পরিবারগুলোর সদস্যরা ‘বাড়ি প্রথা’র মাধ্যমে পালাক্রমে মাজারের দায়িত্ব পালন করেন। যিনি দায়িত্বে থাকেন, তিনি মাজারের রক্ষণাবেক্ষণ, কর্মচারীদের বেতন, লঙ্গরখানার খরচ এবং অন্যান্য ব্যয় নির্বাহ করেন। এরপর উদ্বৃত্ত অর্থ হাদিয়া হিসেবে গ্রহণ করেন। এছাড়া সদকার টাকা প্রয়োজনীয় ব্যক্তিদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।”

মাজারের খাদেম আরও বলেন, “আমরা কখনোই মাজারে দান করার জন্য প্রচারণা চালাই না। মানুষ তাদের ভক্তি ও ভালোবাসা থেকেই এখানে এসে দান করেন।”

দিনে কত টাকা ওঠে

মাজারে প্রতিদিন কত অর্থ দান হয়, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো হিসাব নেই। তবে আশেকানে আউলিয়া বাংলাদেশ-এর চেয়ারম্যান বলেন, “কোনো দিন ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা, কোনো দিন ৫০ হাজার টাকা ওঠে। আবার বৃহস্পতিবার বা ভক্ত সমাগম বেশি হলে এক থেকে দেড় লাখ টাকাও উঠতে পারে।” 

তবে মাত্র চার দিনে সাড়ে ১৭ লাখ টাকার বেশি পাওয়ার ঘটনায় প্রকৃত অর্থের পরিমাণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

বিভেদের আশঙ্কা

নাগরিক সংগঠক আব্দুল করিম কিম মনে করেন, মাজারে নগদ অর্থ দানের প্রচলন খুব বেশি পুরনো নয়। তিনি বলেন, “আগে মানুষ ফলমূল, সবজি কিংবা গৃহপালিত পশু-পাখি নিয়ে আসতেন। একসময় মাজারে আগত ভক্ত ও পর্যটকদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও মাজার কর্তৃপক্ষকে করতে হতো। তখন অনেক সময় ব্যয়ই আয়ের চেয়ে বেশি হতো।”

আব্দুল করিম আরও বলেন, “জেলা প্রশাসনের সাম্প্রতিক উদ্যোগ মাজার অনুসারী ও কওমি ঘরানার মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছে। এতে দুই পক্ষকে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে।”

মাজারের দানের অর্থের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ব্যবস্থাপনা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা কাটেনি। একদিকে প্রশাসন আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথা বলছে, অন্যদিকে মাজার কর্তৃপক্ষ ও ভক্তদের একটি অংশ ঐতিহ্যগত ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার দাবি জানাচ্ছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত