সংবাদ

মতামত

সড়ক দুর্ঘটনার দায়মুক্তি ও প্রাণহানির খতিয়ান

বাংলাদেশে প্রতিটি ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার পর একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে: শোকার্ত পরিবার, জনরোষ, তদন্তের দাবি এবং কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হওয়ার আগেই ঘটে যায় আরেকটি দুর্ঘটনা। সড়কপথ বিপজ্জনক হতে পারে, চালকরা ভুলও করতে পারেন—তবে এটিই মূল সমস্যা নয়। আসল সমস্যা হলো, যে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব, তারা বারবার সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হচ্ছে, বিদ্যমান আইন প্রয়োগ করতে পারছে না এবং কোনো অঘটন ঘটলে তার দায়বদ্ধতাও এড়িয়ে যাচ্ছে। আমাদের সড়ক নিরাপত্তা সংকট মূলত একটি জবাবদিহিতার সংকট।কত মানুষ মারা যাচ্ছে, তা নিয়ে আমাদের কোনো ঐকমত্যই নেই। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪,২৮৫টি দুর্ঘটনায় ৪,১৫৭ জন নিহত এবং ৫,৩৯১ জন আহত হয়েছে। অন্যদিকে, ‘রোড সেফটি ফাউন্ডেশন’-এর হিসাব অনুযায়ী, কেবল সেপ্টেম্বর মাসেই ৪৪২টি দুর্ঘটনায় ৪২৩ জন নিহত ও ৬৭৪ জন আহত হয়েছেন। ২০২৫ সালের ক্ষেত্রে ‘বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি’ ৯,১১১ জনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছে, যেখানে ‘রোড সেফটি ফাউন্ডেশন’-এর হিসাবে এই সংখ্যা ৭,৩৫৯। বিভিন্ন সংস্থা ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করায় এই পরিসংখ্যানগুলোর মধ্যে পার্থক্য দেখা দেয়।আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রাক্কলন অনুযায়ী, প্রকৃত চিত্র হয়তো আরও ভয়াবহ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৩১,৫৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, অথচ সরকারি নথিতে এই সংখ্যা ৫,০৮৪। এত বড় ব্যবধান ইঙ্গিত দেয় যে, সরকারি নথিতে মৃত্যুর একটি বড় অংশই বাদ পড়ে যাচ্ছে। নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান ছাড়া সরকারের পক্ষে এটি জানা সম্ভব নয় যে, কোন সড়কগুলো সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক, কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে অথবা কোনো নীতি আদৌ কার্যকর হচ্ছে কি না।এর সমাধান হলো একটি সমন্বিত জাতীয় তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলা, যেখানে পুলিশি প্রতিবেদন, হাসপাতালের তথ্য, মৃত্যু নিবন্ধন এবং বিমা দাবির মতো সব উপাত্ত একত্রিত থাকবে। প্রতিটি মৃত্যুকে একই পদ্ধতিতে নথিবদ্ধ করতে হবে—যার মধ্যে হাসপাতালে পৌঁছানোর পর মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তিদের তথ্যও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।সঠিক পরিসংখ্যান কেবল একটি সূচনা মাত্র। মূল দুর্বলতাটি হলো—বিদ্যমান নিরাপত্তা বিধিগুলো কার্যকর করার ক্ষেত্রে। যদি গাড়ির ফিটনেস সনদ কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র হয়, ত্রুটিগুলো মেরামত না করা হয়, অথবা সনদটি অর্থের বিনিময়ে কেনা হয়ে থাকে—তবে তা কাউকে সুরক্ষা দিতে পারে না। ত্রুটিপূর্ণ ব্রেক, ক্ষয়ে যাওয়া টায়ার, নষ্ট বাতি, অনিরাপদ পরিবর্তন এবং অতিরিক্ত বোঝাই যানবাহন একটি ছোট ভুলকেও প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় রূপ দিতে পারে। গাড়ির পরিদর্শন হতে হবে প্রকৃত কারিগরি যাচাই-বাছাই, যার নথিপত্র থাকবে উন্মুক্ত এবং যার ওপর থাকবে নিরপেক্ষ তদারকি।চালকদের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন একই ধরনের কঠোর নজরদারি। যখন নিয়োগকর্তারা অত্যন্ত কঠিন সময়সূচী চাপিয়ে দেন, চালকরা বিশ্রামের সুযোগ পান না এবং মুনাফার দৌড়ে বেপরোয়া আচরণকে উৎসাহিত করা হয়, তখন ড্রাইভিং লাইসেন্সের গুরুত্ব আর থাকে না। পরিবহন পরিচালনাকারীদের নিশ্চিত করতে হবে যে, তাদের চালকরা যোগ্য, দায়িত্ব পালনের জন্য শারীরিকভাবে সক্ষম এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম পেয়েছেন কি না। কোনো অননুমোদিত ব্যক্তি যখন যাত্রী পরিবহনকারী যানবাহন চালানোর সুযোগ পান, তখন কেবল চালককেই নয়, বরং যারা তাকে অনুমতি দিয়েছে, তাদেরও দায়বদ্ধ করতে হবে।মোটরসাইকেল আরোহী এবং পথচারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকেন। ‘বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি’-র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২,৯৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রশিক্ষণ, বৈধ লাইসেন্স, সঠিক মানের হেলমেট ব্যবহার এবং দ্রুতগতির যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া—এসবই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন ডেলিভারি কর্মীকে যেন কখনোই কঠোর সময়সীমা মেনে চলা এবং নিরাপদে বাড়ি ফেরার মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে না হয়।পথচারীদের ক্ষেত্রে সমস্যাটি প্রায়শই থাকে রাস্তা বা অবকাঠামোতেই। ফুটপাতগুলো ভাঙাচোরা, হকারদের দখলে থাকা, অথবা অনেক জায়গায় ফুটপাতই নেই। স্কুল, বাজার বা বাস স্টপের মতো জায়গাগুলোর আশেপাশে নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা খুবই অপ্রতুল। স্থানীয় কাউন্সিল এবং সড়ক সংস্থাগুলোর উচিত জনবহুল এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন ফুটপাত, স্পষ্টভাবে চিহ্নিত পারাপারের স্থান, পর্যাপ্ত আলোকব্যবস্থা এবং যৌক্তিক গতিসীমা নিশ্চিত করা।সড়ক নকশার বিষয়টি যতটা গুরুত্ব পাওয়ার কথা, বাস্তবে তা পায় না। প্রতিটি মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনার পর ওভারটেকিংয়ের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা, লেন বিভাজন, দিকনির্দেশক চিহ্ন, সংযোগস্থল এবং দ্রুতগতির সড়কে ধীরগতির যানবাহনের উপস্থিতি—এসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠা উচিত। মিডিয়ান ব্যারিয়ার, নিরাপদ সংযোগস্থল, বাস্তবসম্মত গতিসীমা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে পারে যেন একজন চালকের ভুলে অনেক মানুষের প্রাণহানি না ঘটে।দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। অ্যাম্বুলেন্সের ধীরগতি এবং হাসপাতালে নিম্নমানের চিকিৎসা সেবা অনেক ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী নয় এমন আঘাতকেও মৃত্যুর কারণ করে তুলতে পারে। জরুরি পরিষেবা, পুলিশ, অ্যাম্বুলেন্স ও হাসপাতালগুলোর মধ্যে আরও ভালো সমন্বয় প্রয়োজন; পাশাপাশি প্রশিক্ষিত প্রাথমিক সহায়তাকারী এবং ট্রমা কেয়ার ব্যবস্থা থাকা জরুরি।প্রস্তাবিত ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন ২০২৬’-এ এসব ঘাটতির বেশ কয়েকটি সমাধানের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জরুরি চিকিৎসা সেবা, দুর্ঘটনাকবলিতদের সহায়তাকারীদের সুরক্ষা, খারাপ ড্রাইভিংয়ের জন্য পয়েন্টভিত্তিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং বারবার আইন লঙ্ঘনকারীদের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান। তবে এর প্রকৃত কার্যকারিতা নির্ভর করবে আইনের চূড়ান্ত খসড়া এবং তা কীভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে তার ওপর।জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা দিবস কেবল বক্তৃতা, র্যালি বা সচেতনতামূলক প্রচারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। সরকার ২০২৭ সালের মধ্যে একটি সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আসল পরীক্ষাটি হলো—আইন পাস হলো কি না তা নয়, বরং এর ফলে মৃত্যু ও গুরুতর আহতের সংখ্যা কমে কি না।প্রতিটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার দ্রুত তদন্ত হওয়া উচিত। যদি অবহেলা, জাল নথিপত্র ব্যবহার, অননুমোদিত ড্রাইভিং বা সরকারি কর্মকর্তাদের অসদাচরণ প্রমাণিত হয়, তবে অবশ্যই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে কোনো অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ছাড়াই ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন সহায়তা প্রদান করতে হবে।বাংলাদেশের এমন একটি সড়ক নিরাপত্তা পরিকল্পনা প্রয়োজন, যেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ থাকবে, সময়সীমা নির্ধারণ করা থাকবে এবং ফলাফলের পরিমাপ করা হবে। একটি জাতীয় টাস্ক ফোর্স গঠন করা যেতে পারে, যার বিআরটিএ, পুলিশ, সড়ক সংশ্লিষ্ট সংস্থা, স্থানীয় সরকার এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার মধ্যে সমন্বয় সাধনের কর্তৃত্ব থাকবে।নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থাকে কেবল নথিপত্রনির্ভর না রেখে বাস্তব প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তুলতে হবে। বিআরটিএ-এর উচিত যানবাহনের ফিটনেস সনদ, পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং পরিদর্শন ফলাফলের একটি উন্মুক্ত ও অনুসন্ধানযোগ্য ডিজিটাল রেকর্ড রাখা। প্রতিটি বড় সড়ক প্রকল্প চালুর আগে একটি নিরপেক্ষ নিরাপত্তা নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে।জরুরি সেবাদানকারী কর্মী, অ্যাম্বুলেন্স এবং উপযুক্ত হাসপাতালের মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে। পুরো ব্যবস্থার মধ্যেই জবাবদিহিতার কাঠামো থাকা জরুরি। প্রতিটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার দ্রুত তদন্ত হতে হবে এবং তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ বাস্তবায়নের দায়িত্ব নির্দিষ্ট সংস্থার ওপর অর্পণ করতে হবে।এর মূল পরীক্ষাটি খুবই সহজ। প্রতিটি দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানকে জানতে হবে তাদের কাছ থেকে কী প্রত্যাশা করা হচ্ছে; প্রতিটি ব্যর্থতার কারণ খতিয়ে দেখতে হবে এবং প্রতিটি ফলাফল জনসমক্ষে উন্মুক্ত রাখতে হবে। যেসব মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য, সেগুলোকে ‘যাতায়াতের অনিবার্য মূল্য’ হিসেবে মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।যতদিন পর্যন্ত প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে নিয়মিতভাবে জবাবদিহিতার আওতায় না আনা হবে, ততদিন সড়ক নিরাপত্তা আমাদের নিজেদের জনগণের সুরক্ষায় ব্যর্থতারই একটি পরিমাপক হয়ে থাকবে। কোনো মানুষ মারা যাওয়ার পর কর্তৃপক্ষ কী প্রতিক্রিয়া দেখাল, তা দিয়ে অগ্রগতি বিচার করা যাবে না; বরং যাতায়াত ব্যবস্থাকে কতটা নিরাপদ করা সম্ভব হলো, তার ওপর ভিত্তি করেই প্রকৃত অগ্রগতি মূল্যায়ন করতে হবে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী]

সড়ক দুর্ঘটনার দায়মুক্তি ও প্রাণহানির খতিয়ান