স্পিকারের বক্তব্যের আয়নায় সমাজের চিত্র
‘এখানে সমাজের নিকৃষ্ট যে লোকটা, সে-ই এমপি, মন্ত্রী হয়। সবচেয়ে বড় দুর্নীতিবাজেরা সমাজের নেতা হয়ে গেছেন। সমাজব্যবস্থাটাই এমন হয়েছে, এখানে ভালো মানুষের নির্বাচনে দাঁড়ানোর সুযোগ নেই’—জাতীয় সংসদের স্পিকার।তিনি কঠিন সত্য কথা বলেছেন। তার কথায় প্রবল ক্ষোভ ও আত্মবিশ্বাস ছিল। দুটি বাক্যের মধ্যেই যেন গোটা দেশের চিত্র ফুটে উঠেছে। যদিও এমন কথা অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন। তবে জাতীয় সংসদের স্পিকার যখন এ কথা বলেন, তখন এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য ভিন্নতর হয়ে ওঠে।মনে পড়ে, আশির দশকের গোড়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় এমনই একটি বক্তব্য শোনার সুযোগ হয়েছিল। তখনকার দিনের একজন বিখ্যাত বিচারপতি তার প্রধান অতিথির ভাষণে একই ধরনের মন্তব্য করেছিলেন। সেই বিচারপতির ছাত্ররাজনীতির পটভূমি ছিল খুবই প্রণিধানযোগ্য। তিনি সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্র সংসদের ভিপি হিসেবে মাতৃভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ডাকসুর এক অভিষেক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, ‘দেশে বর্তমানে ভালো মানুষের কোনো মূল্য নেই, সমাজে তারা দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন।’ একই সঙ্গে তরুণদের অবক্ষয়ের কথা তুলে ধরে বলেছিলেন, ‘যেখানে তরুণেরা বিপথগামী হবে, সেখান থেকে মুক্তি আশা করা যায় না।’এখন ভাবলে মনে হয়, বিগত চার দশকের বেশি সময়ে দেশের জনসংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হওয়া ছাড়া মানুষের শ্রেণিচরিত্রে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। আজও সেই বক্তব্য শতভাগ সত্য ও প্রাসঙ্গিক।২.বাংলাদেশের বর্তমান আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় সমাজের সৎ, বিবেকবান, দেশপ্রেমিক, ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষগুলো হঠাৎ গজিয়ে ওঠা অসৎ, অসাধু, লুটেরা ও প্রতারকদের কালোটাকার আড়ালে ক্রমাগত ঢাকা পড়ে গেছেন। সমাজে তারা এতটাই অসহায় যে মুখ খুলে বলতেও পারছেন না, তারা ভালো নেই। একদিকে তারা পারছেন না নিজেদের পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রাখতে, অন্যদিকে অবৈধ অর্থের মালিক এবং নব্য চাঁদাবাজ ও দখলদার শ্রেণির কবলে পড়ে রক্ষা করতে পারছেন না নিজেদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি। দেশের অরাজনৈতিক, দেশপ্রেমিক ভালো মানুষগুলোর মুখে যেন কোনো শব্দ নেই। তারা নীরব দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।গত কয়েক বছরে গ্রামে-গঞ্জে, পাড়ায়-মহল্লায় সর্বত্র একশ্রেণির উঠতি বয়সী তরুণের উত্থান লক্ষ করা যাচ্ছে। তবে এ জাগরণ সমাজহিতৈষী নয়, বরং সমাজবিরোধী। তারা লেখাপড়ায় নেই, থাকলেও যৎসামান্য। তারা ব্যবহৃত হচ্ছে নানা অপকর্মের হাতিয়ার হিসেবে। তাদের ব্যবহার করছেন তথাকথিত দলবাজ, পল্টিবাজ ও ক্ষমতালোভী নেতারা।নেতাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ আলোকিত। তারা বিদেশে পড়াশোনা করছে কিংবা অন্য উদ্দেশ্যে সেখানে বসবাস করছে। তাদের অর্থবিত্তের জোগান আসে এ দেশ থেকে। বিদেশে তারা আরাম-আয়েশের জীবন কাটাচ্ছে। অন্যদিকে অন্যের সন্তানদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে মাদক, নেশার উপকরণ, মোটরসাইকেলের চাবি। তাদের দেওয়া হচ্ছে চাঁদাবাজি ও দখলবাজির দায়িত্ব। সারা দেশে তারাই এখন জাতীয় সমস্যার আরেক নাম।এদের কোনো দলমত নেই, আদর্শ নেই। তারা সব সময় ক্ষমতাসীন দলের কাছাকাছি থাকা পাতিনেতাদের পদলেহন করে, ভোল পাল্টে সুযোগ নেয়। নেতাদের দেওয়া আদেশ-নির্দেশ পালন করাই তাদের প্রধান কাজ।স্পিকার খেদের সঙ্গে আরও একটি মূল্যবান কথা বলেছেন, ‘নেতারা মাদক খায়, কর্মীরাও মাদক খায়। সব বাটপারের কারখানা হয়ে গেছে এসব জায়গা। ধীরে ধীরে চোখের সামনে সমাজটা নষ্ট হয়ে গেল।’ এ যেন চারদিকে এক অদ্ভুত আঁধার নেমে আসছে।৩.আশির দশকের আরও একটি সংবাদ শিরোনামের কথা মনে পড়ে। মাসিক গণস্বাস্থ্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল এক ভয়াবহ প্রচ্ছদ কাহিনি—‘নেশার কবলে বাংলাদেশ’। তখন এমন শিরোনাম ছিল অবিশ্বাস্য। প্রয়াত আলোচিত সাংবাদিক মিনার মাহমুদ এ প্রচ্ছদ কাহিনি রচনা করেছিলেন। তৎকালীন ঢাকার চানখাঁরপুল, সদরঘাট, মিরপুরসহ নানা স্থানের মাদকের আখড়ার কথা উল্লেখ ছিল এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। এতে দেশে নেশা ও মাদকের সর্বগ্রাসী ছোবলের ইঙ্গিত ছিল। যদিও তখন পর্যন্ত এ বিষয়ে দেশের সাধারণ মানুষের তেমন কোনো ধারণাই ছিল না।অথচ আজকের প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতায় পণ্য হিসেবে মাদকের অবাধ বিচরণ অনেক বেশি সহজলভ্য হয়েছে। দেশের গ্রামে গ্রামে, পাড়ায় পাড়ায়, ঘরে ঘরে মাদক ছড়িয়ে পড়েছে। এদের পেছনে রয়েছে নেতারা, যাঁরা নিয়ন্ত্রণ করছেন অন্য সবকিছু। চিহ্নিত মাদকসেবী ও মাদক কারবারিরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখের সামনে দিনরাত নিরাপদে মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। হাটবাজারে সবার জ্ঞাতসারে কেনাবেচা হচ্ছে মাদকদ্রব্য। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যও মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছেন বলে খবর ছড়িয়ে পড়ছে। একশ্রেণির তরুণ রাতে মাদক সেবন করে, দিনে চাঁদাবাজি করে এলাকা চষে বেড়াচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, এদের রোখার ক্ষমতা যেন কারও হাতে নেই। সত্যিকার অর্থেই এখন সমগ্র বাংলাদেশ নেশার কবলে।৪.এবার স্পিকারের কথায় ফিরে আসা যাক। কেন এ দেশে নিকৃষ্ট দুর্নীতিবাজেরা এমপি-মন্ত্রী হন? অতীতে এ বিষয়ে অনেক সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বয়ে গেছে। হালের টক শো তো আছেই। কিন্তু কোনো সমাধান কি এসেছে? আসেনি। কারণ, যাঁরা সভায় সভাপতির আসনে বসে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, কালোটাকা ও মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলেন, দিনের শেষে তারাই আবার মনোনয়ন-বাণিজ্যেরও হোতা হয়ে ওঠেন।যে দেশে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদাধিকারীরাও এমপি পদে মনোনয়নের জন্য আদাজল খেয়ে তদবিরে নেমে যান, সেখানে শিক্ষিত, সৎ, দেশপ্রেমিক ও ভালো মানুষের নির্বাচিত হওয়া সম্ভব কি? দেশের গত কয়েক বছরের চিত্র তো তা-ই বলে।এমনও দেখা গেছে, একাধিক উচ্চশিক্ষিত ও যোগ্য ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে আশ্চর্যজনকভাবে প্রায় অশিক্ষিত একজন বিত্তবান পাদুকা ব্যবসায়ীর পক্ষে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে দেনদরবার হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তারই মনোনয়নপ্রাপ্তি ঘটেছে। তিনি এমপি হয়েছেন। বছরের পর বছর এলাকার হাজার হাজার দেশে-বিদেশে উচ্চশিক্ষিত মানুষের ওপর খবরদারি চালিয়েছেন।এখানে শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টি বিবেচ্য নয় বলে তারা নির্ভয়ে, নিঃসংকোচে বাহিনী নিয়ে মাঠে নেমে পড়েন। সংসদের পাঁচ বছরে এরা মোটামুটি নীরবতা পালন করেন। কারণ, এটাই তাদের নিরাপদে ও শত্রুমুক্ত থাকার কৌশল। কেবল নিভৃতে নিজেদের ব্যবসায় মনোনিবেশ করেন। অল্প সময়ের মধ্যে আলাদিনের প্রদীপের মতো জ্বলে ওঠেন। নির্বাচনের আগে করা বিপুল ব্যয় পুষিয়ে নিয়ে রাতারাতি ফুলেফেঁপে ওঠেন।এ দেশে এমপির গাড়ি ও জাতীয় সংসদের মূল্যবান প্রতীক যেন বাণিজ্যে লক্ষ্মীর মতো কাজ করে। এটি এখন ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পপতি হওয়ার এক অসাধারণ সোপানের নাম।বলাবাহুল্য, দেশে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা মাঠপর্যায়ে কাজ করে থাকে। নির্বাচন এলে তারা যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি তৎপর হয়। গত এক দশক ধরে লক্ষণীয় যে সম্ভাব্য প্রার্থীরা এসব সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন। তাদের লিখিত মতামত ও জনপ্রিয়তা যাচাইবিষয়ক গোপন প্রতিবেদন পাওয়ার জন্য প্রায় সবাই ছোটাছুটি করেন। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও সাধ্যাতীত চেষ্টা করে সরকারকে অবহিত করে। কিন্তু বাস্তবে এসব তথ্য খুব বেশি আমলে নেওয়া হয় না। দলগুলোর সর্বোচ্চ নেতৃত্বের তালিকাই শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হয়।মনে হয়, এটিও এক অদ্ভুত রাষ্ট্রীয় আচার ও প্রথায় পরিণত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ ও নৈর্ব্যক্তিকভাবে যোগ্য প্রার্থী বাছাই করা হচ্ছে না। ফলে জাতীয় সংসদ যেন এক দুর্বোধ্য প্রাচীরের ভেতরে আটকে পড়েছে। এ প্রাচীর ভেদ করে বেরিয়ে আসা সহজ হবে না। কেননা, সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হয় অর্থের শক্তিতে।৫.অথচ জাতীয় সংসদের সদস্য, উচ্চ আদালতের বিচারক, সিটি করপোরেশন, জেলা, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা মেয়র নির্বাচনের ক্ষেত্রে উপযুক্ত শিক্ষাগত যোগ্যতার মাপকাঠি নির্ধারণের দায়িত্ব জাতীয় সংসদের হাতেই রয়েছে। কিন্তু কোনো আমলেই বিষয়টি গুরুত্ব পায় না। সংখ্যাগরিষ্ঠতার সর্বোচ্চ অবস্থানে থেকেও এ বিষয়ে কখনো আইন পাস হয় না। এতেই বোঝা যায়, আইন প্রণয়নের পথে বাধা বা অন্তরায় কোথায়।এমনকি কখনো কখনো উচ্চ আদালতের সম্মতি তথা নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও এসব বাস্তবায়িত হয়নি। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীর পথ পেরিয়ে এসেও জাতি আজ একই তিমিরে ঘুরপাক খাচ্ছে।বর্তমান স্পিকার একজন আইনপ্রণেতা, বহুবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য, খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এবং বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী ব্যক্তিত্ব। তিনি অশীতিপর একজন ঝানু পার্লামেন্টারিয়ানও বটে। তার মুখ থেকে এমন হতাশার মন্তব্য সমগ্র জাতির সামনে প্রশ্নের জন্ম দেবে, এটাই স্বাভাবিক।আশির দশকের আরও একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে। জেনারেল হোসেন মুহাম্মদ এরশাদ তখন ক্ষমতায়। সাপ্তাহিক বিচিত্রায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরী ছিলেন এর প্রতিবেদক। তিনি গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস, নাকি আফগান মওলানা জালাল উদ্দিন রুমির উদ্ধৃতি দিয়েছিলেন, তা ঠিক মনে নেই। বাণীটি ছিল, ‘এমন এক সময় আসবে, যখন জ্ঞানীরা জ্ঞানী হওয়ার কারণে অনুশোচনা করবেন, মূর্খরা তাদের মূর্খতার জন্য গর্ব করবেন, আর দুর্নীতিবাজেরা তাদের দুর্নীতির জন্য উল্লাস করবেন।’যত দূর মনে পড়ে, ওই প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে সেই সাংবাদিককে তখন অনেক খেসারত দিতে হয়েছিল। এখন দেশের যেদিকেই তাকানো যায়, এমন উল্লাসের নৃত্যই চোখে পড়ে। আর সমাজের উৎকৃষ্ট ও ভালো মানুষগুলো যেন অনুশোচনার আগুনে তিলে তিলে দগ্ধ হচ্ছেন।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: গল্পকার]