চট্টগ্রাম বন্দরে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে পণ্য আমদানির প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। কখনো স্ক্র্যাপের নামে যন্ত্রপাতি ও বিলাসবহুল গাড়ি, কখনো মডেলিং ক্লে ঘোষণায় প্রসাধনসামগ্রী, আবার কখনো অন্য পণ্যের আড়ালে মোবাইল ফোন আমদানি করা হচ্ছে। আমদানির নথিতে পণ্যের বিবরণ এক থাকলেও বাস্তবে কন্টেইনার খুলে মিলছে ভিন্ন পণ্য। এতে একদিকে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে বৈধ আমদানিকারকেরাও পড়ছেন অসম প্রতিযোগিতার মুখে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) মিথ্যা ঘোষণার সন্দেহে ৪৬৭টি আমদানি চালান জব্দ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ২৭০টি। এ থেকে রাজস্ব ও জরিমানা বাবদ আদায় হয়েছে প্রায় ৫৮ কোটি ২ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় চালান জব্দ ও মামলা—উভয় ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটেছে।
মিথ্যা ঘোষণার অভিনব কৌশল
শুল্ক ফাঁকির ক্ষেত্রে আমদানিকারকদের একটি অংশ নানা কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছেন। পণ্যের প্রকৃত পরিচয় গোপন করে কম শুল্কের পণ্য হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। কখনো পণ্যের পরিমাণ কম দেখানো হচ্ছে, আবার কখনো কম শুল্কের পণ্যের আড়ালে উচ্চমূল্যের পণ্য আমদানি করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে কাস্টমসের নজির আসা অনিয়মের মধ্যে রয়েছে—স্ক্র্যাপ ঘোষণায় যন্ত্রপাতি ও বিলাসবহুল গাড়ি আমদানি, মডেলিং ক্লে ঘোষণায় প্রসাধনসামগ্রী আনা এবং অন্যান্য পণ্যের আড়ালে মোবাইল ফোন আমদানি। এ ধরনের চালান শনাক্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পণ্য জব্দ ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পণ্যের সঠিক বিবরণ, মূল্য ও পরিমাণ গোপন করে শুল্ক কম দেওয়ার চেষ্টা শুধু রাজস্ব ক্ষতির কারণ নয়; এটি দেশের আমদানি ব্যবস্থাপনা ও বাণিজ্যিক শৃঙ্খলার জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
ময়মনসিংহের রানু ফার্মের চালান নিয়ে প্রশ্ন
ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার কাল্লাপাগলা এলাকার ‘রানু ফার্ম অ্যান্ড হ্যাচারি লিমিটেড’-এর একটি চালান সম্প্রতি আলোচনায় এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদের ‘ডাইনামিক ফ্রেইট সিস্টেম’ নামের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ২ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে বিল অব এন্ট্রি (নম্বর: সি-১২১২৫৮১৬) দাখিল করে।
অভিযোগ রয়েছে, মূলধনী যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানির আওতায় রেয়াত সুবিধা নিয়ে চালানটি খালাস করা হয়েছে। এতে প্রাপ্য শুল্ক-কর আদায়ে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
বৈধ ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ ও কঠোর নজরদারি
মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানির সবচেয়ে বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থায়। একই সঙ্গে নিয়ম মেনে যথোপযুক্ত শুল্ক পরিশোধ করে ব্যবসা পরিচালনা করা বৈধ ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।
চট্টগ্রাম চেম্বারের পরিচালক ও চট্টগ্রাম কাস্টমস অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য মো. ইসমাইল খান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মিথ্যা ঘোষণার পেছনে কখনো কখনো সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত থাকে। ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা ঘোষণাকারীদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে, অতিরিক্ত কড়াকড়ির কারণে যেন বৈধ ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।’
অন্যদিকে চট্টগ্রাম কাস্টমসের সহকারী কমিশনার ও মুখপাত্র মোহাম্মদ শরীফ আল আমিন গণমাধ্যমকে জানান, মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি ঠেকাতে তদারকি জোরদার করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো হচ্ছে।
বন্দর সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু চালান জব্দ ও মামলা করে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। মিথ্যা ঘোষণার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত ভূমিকা শনাক্ত, অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধ এবং রাজস্ব ফাঁকিবাজ চক্রের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ নভেম্বর ২০২৬
চট্টগ্রাম বন্দরে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে পণ্য আমদানির প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। কখনো স্ক্র্যাপের নামে যন্ত্রপাতি ও বিলাসবহুল গাড়ি, কখনো মডেলিং ক্লে ঘোষণায় প্রসাধনসামগ্রী, আবার কখনো অন্য পণ্যের আড়ালে মোবাইল ফোন আমদানি করা হচ্ছে। আমদানির নথিতে পণ্যের বিবরণ এক থাকলেও বাস্তবে কন্টেইনার খুলে মিলছে ভিন্ন পণ্য। এতে একদিকে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে বৈধ আমদানিকারকেরাও পড়ছেন অসম প্রতিযোগিতার মুখে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) মিথ্যা ঘোষণার সন্দেহে ৪৬৭টি আমদানি চালান জব্দ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ২৭০টি। এ থেকে রাজস্ব ও জরিমানা বাবদ আদায় হয়েছে প্রায় ৫৮ কোটি ২ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় চালান জব্দ ও মামলা—উভয় ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটেছে।
মিথ্যা ঘোষণার অভিনব কৌশল
শুল্ক ফাঁকির ক্ষেত্রে আমদানিকারকদের একটি অংশ নানা কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছেন। পণ্যের প্রকৃত পরিচয় গোপন করে কম শুল্কের পণ্য হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। কখনো পণ্যের পরিমাণ কম দেখানো হচ্ছে, আবার কখনো কম শুল্কের পণ্যের আড়ালে উচ্চমূল্যের পণ্য আমদানি করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে কাস্টমসের নজির আসা অনিয়মের মধ্যে রয়েছে—স্ক্র্যাপ ঘোষণায় যন্ত্রপাতি ও বিলাসবহুল গাড়ি আমদানি, মডেলিং ক্লে ঘোষণায় প্রসাধনসামগ্রী আনা এবং অন্যান্য পণ্যের আড়ালে মোবাইল ফোন আমদানি। এ ধরনের চালান শনাক্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পণ্য জব্দ ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পণ্যের সঠিক বিবরণ, মূল্য ও পরিমাণ গোপন করে শুল্ক কম দেওয়ার চেষ্টা শুধু রাজস্ব ক্ষতির কারণ নয়; এটি দেশের আমদানি ব্যবস্থাপনা ও বাণিজ্যিক শৃঙ্খলার জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
ময়মনসিংহের রানু ফার্মের চালান নিয়ে প্রশ্ন
ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার কাল্লাপাগলা এলাকার ‘রানু ফার্ম অ্যান্ড হ্যাচারি লিমিটেড’-এর একটি চালান সম্প্রতি আলোচনায় এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদের ‘ডাইনামিক ফ্রেইট সিস্টেম’ নামের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ২ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে বিল অব এন্ট্রি (নম্বর: সি-১২১২৫৮১৬) দাখিল করে।
অভিযোগ রয়েছে, মূলধনী যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানির আওতায় রেয়াত সুবিধা নিয়ে চালানটি খালাস করা হয়েছে। এতে প্রাপ্য শুল্ক-কর আদায়ে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
বৈধ ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ ও কঠোর নজরদারি
মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানির সবচেয়ে বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থায়। একই সঙ্গে নিয়ম মেনে যথোপযুক্ত শুল্ক পরিশোধ করে ব্যবসা পরিচালনা করা বৈধ ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।
চট্টগ্রাম চেম্বারের পরিচালক ও চট্টগ্রাম কাস্টমস অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য মো. ইসমাইল খান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মিথ্যা ঘোষণার পেছনে কখনো কখনো সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত থাকে। ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা ঘোষণাকারীদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে, অতিরিক্ত কড়াকড়ির কারণে যেন বৈধ ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।’
অন্যদিকে চট্টগ্রাম কাস্টমসের সহকারী কমিশনার ও মুখপাত্র মোহাম্মদ শরীফ আল আমিন গণমাধ্যমকে জানান, মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি ঠেকাতে তদারকি জোরদার করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো হচ্ছে।
বন্দর সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু চালান জব্দ ও মামলা করে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। মিথ্যা ঘোষণার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত ভূমিকা শনাক্ত, অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধ এবং রাজস্ব ফাঁকিবাজ চক্রের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

আপনার মতামত লিখুন