লন্ডন এমন এক শহর, যেখানে বর্তমানের ব্যস্ততার পাশেই অতীত নীরবে বসবাস করে। রাজপথে হাঁটতে হাঁটতে কখনো মনে হয়, পুরোনো ভবনগুলো যেন সময়ের কাছে লেখা দীর্ঘ চিঠি—যার প্রতিটি জানালায় আটকে আছে কোনো এক যুগের গল্প। টেমসের জল বয়ে যায়, বদলায় নগরীর চেহারা, বদলায় মানুষের জীবনযাপন; তবু ইতিহাসের কিছু চিহ্ন থেকে যায় অবিচল। এমন এক শহরে আমার গন্তব্য ব্রিটিশ লাইব্রেরি। সেখানে যাচ্ছিলাম একটি বিখ্যাত গ্রন্থাগার দেখতে, কিন্তু ফিরে এলাম নিজের সমাজ, ইতিহাস ও জ্ঞানচর্চা নিয়ে অনেকগুলো প্রশ্ন সঙ্গে নিয়ে।
সেন্ট প্যানক্রাসের ব্যস্ত এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা ভবনটির স্থাপত্যে প্রথমেই চোখে পড়ে লাল ইটের গাম্ভীর্য। বিশাল অথচ সংযত অবয়ব; যেন নিজের গুরুত্ব ঘোষণা না করেও তা জানান দিতে জানে। বাইরে মানুষের দ্রুত পদচারণা, যানবাহনের শব্দ, স্টেশনের ব্যস্ততা। ভেতরে প্রবেশ করতেই সেই কোলাহল যেন কয়েক ধাপ দূরে সরে যায়। এখানে নীরবতা শূন্য নয়; বরং অসংখ্য মানুষের চিন্তা, শ্রম ও আবিষ্কারের উপস্থিতিতে পরিপূর্ণ।
ব্রিটিশ লাইব্রেরি ১৯৭৩ সালের ১ জুলাই যুক্তরাজ্যের স্বতন্ত্র জাতীয় গ্রন্থাগার হিসেবে যাত্রা শুরু করে। তবে এর শেকড় আরও পুরোনো। ১৭৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ব্রিটিশ মিউজিয়ামের গ্রন্থসংগ্রহের মধ্যেই এর ইতিহাসের সূচনা। সেন্ট প্যানক্রাসে বর্তমান ভবনটি ১৯৯৮ সালে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ উদ্বোধন করেন। সময়ের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে প্রতিষ্ঠানটি আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গ্রন্থাগারে পরিণত হয়েছে। এর সংগ্রহে রয়েছে ১৭ কোটিরও বেশি উপাদান—বই, পাণ্ডুলিপি, সংবাদপত্র, মানচিত্র, চিঠি, আলোকচিত্র, শব্দরেকর্ডিং, সংগীতের স্বরলিপি ও অসংখ্য ঐতিহাসিক দলিল।
সংখ্যাটি বিস্ময়কর, কিন্তু সংখ্যার চেয়েও বড় বিস্ময় এর ভেতরে জমা মানুষের জীবন। কোনো বিবর্ণ চিঠিতে হয়তো অপেক্ষার কথা লেখা আছে, কোনো পুরোনো সংবাদপত্রে ধরা আছে একটি সময়ের রাজনৈতিক উত্তাপ, কোনো মানচিত্রে চিহ্নিত হয়েছে আজ আর নেই এমন জনপদ। কাগজের গায়ে কালি শুকিয়ে গেছে বহু আগে, কিন্তু তার ভেতরের সময় এখনো শুকায়নি। একটি দলিল খুললে কখনো রাষ্ট্রের ইতিহাস সামনে আসে, কখনো সাধারণ মানুষের অজানা জীবনের দরজা খুলে যায়। এখানে ইতিহাস শুধু রাজা-বাদশাহ কিংবা যুদ্ধজয়ের বিবরণ নয়; মানুষের প্রতিদিনের বেঁচে থাকার চিহ্নও।
ট্রেজারিজ গ্যালারিতে গিয়ে সেই অনুভূতি আরও তীব্র হলো। ম্যাগনা কার্টা, শেক্সপিয়রের প্রথম ফোলিও, লিওনার্দো দা ভিঞ্চির নোটবুকের মতো ঐতিহাসিক নিদর্শন মানুষের চিন্তার অসাধারণ ক্ষমতার কথা মনে করিয়ে দেয়। কয়েক শতাব্দী আগে লেখা কোনো পঙ্ক্তি কিংবা আঁকা কোনো রেখার সামনে দাঁড়িয়ে বোঝা যায়, মানুষের সৃষ্টিশীলতা সময়ের সীমানা মানে না। একটি দলিল নাগরিক অধিকার সম্পর্কে রাষ্ট্রের ধারণা বদলে দিতে পারে, একটি সাহিত্যকর্ম ভাষার প্রকাশভঙ্গিকে নতুন দিগন্তে পৌঁছে দিতে পারে। এসব নিদর্শন তাই কেবল অতীতের স্মারক নয়, মানুষের চিন্তার বিবর্তনেরও সাক্ষ্য।
তবে এই সংগ্রহের সামনে দাঁড়িয়ে মুগ্ধতার পাশাপাশি কিছু কঠিন প্রশ্নও মনে আসে। ইতিহাসের সম্পদ কার? কোন পথে, কার অনুমতিতে, কোন রাজনৈতিক বাস্তবতায় এক ভূখণ্ডের সাংস্কৃতিক নিদর্শন অন্য ভূখণ্ডের সংগ্রহশালায় স্থান পেয়েছে? ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ঔপনিবেশিক অতীত বিবেচনায় প্রশ্নগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। উপনিবেশ থেকে সংগৃহীত বহু নিদর্শনের মালিকানা ও প্রত্যর্পণ নিয়ে আজও বিতর্ক রয়েছে। কোনো ঐতিহাসিক বস্তু যত্নে সংরক্ষণ করা জরুরি, কিন্তু তার উৎস, অধিকার ও সংগ্রহের ইতিহাসের প্রতিও দায়বদ্ধ থাকা প্রয়োজন। অতীতকে কেবল প্রদর্শন করাই যথেষ্ট নয়; অতীতের অন্যায় নিয়েও সৎ আলোচনা দরকার।
এই বিশাল সংগ্রহে দক্ষিণ এশিয়ার ভাষা, সাহিত্য, ধর্ম ও সংস্কৃতির বহু উপাদান রয়েছে। দূরদেশের একটি গ্রন্থাগারে উপমহাদেশের পরিচিত সাংস্কৃতিক চিহ্ন দেখে নিজের শেকড়ের কথা মনে পড়ল। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যও এই বৃহত্তর ইতিহাসের অংশ। আমাদের পুঁথি, পুরোনো সংবাদপত্র, সাহিত্যকর্ম ও সামাজিক দলিল শুধু আমাদের নিজস্ব সম্পদ নয়; মানবসভ্যতার ইতিহাস বোঝারও উপকরণ। অথচ দেশে ফিরে তাকালে দেখা যায়, বহু মূল্যবান পাণ্ডুলিপি ও ঐতিহাসিক দলিল এখনো যথাযথ সংরক্ষণের অপেক্ষায়। কোথাও পরিচর্যার অভাব, কোথাও অর্থের সংকট, কোথাও আবার প্রয়োজনীয় উদ্যোগের ঘাটতি। অন্যের সংগ্রহশালায় নিজের ঐতিহ্যের চিহ্ন দেখে গর্বিত হওয়া সহজ; নিজের ঘরের সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব নেওয়াই কঠিন।
ব্রিটিশ লাইব্রেরির প্রকৃত শক্তি শুধু তার সংগ্রহের বিশালতায় নয়, জ্ঞানচর্চার ব্যবস্থাতেও। নির্ধারিত নিয়মে রিডার পাস নিয়ে গবেষক, শিক্ষার্থী ও পাঠকেরা পাঠকক্ষে কাজ করতে পারেন। কেউ পুরোনো দলিল ঘেঁটে ইতিহাসের অজানা অধ্যায় খুঁজছেন, কেউ ভাষার বিবর্তন অনুসন্ধান করছেন, কেউ সংবাদপত্রের পাতায় খুঁজছেন কোনো ঘটনার হারিয়ে যাওয়া সূত্র। তাঁদের নীরব শ্রমে বোঝা যায়, জ্ঞান কোনো সাজানো প্রদর্শনী নয়; এটি নিরন্তর অনুসন্ধানের বিষয়। সংরক্ষিত তথ্য তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়।
এই পরিবেশে দাঁড়িয়ে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও পাঠাভ্যাসের কথাও মনে হলো। বাংলাদেশে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গ্রন্থাগার আছে, কিন্তু সবখানে তা শিক্ষার্থীদের জীবন্ত অভ্যাসের অংশ হয়ে উঠতে পারেনি। কোথাও বইয়ের ঘাটতি, কোথাও পাঠকক্ষের অনুপযুক্ত পরিবেশ, কোথাও আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও ডিজিটাল সংরক্ষণের অভাব। আমরা পরীক্ষার প্রস্তুতিতে যতটা সময় দিই, মুক্তভাবে পড়া ও জানার আনন্দে ততটা সময় দিই কি? যে শিক্ষার্থী শুধু নির্ধারিত পাঠের উত্তর মুখস্থ করে, তার সামনে পৃথিবীর বিস্তৃত প্রশ্নগুলো অনেক সময় অদেখাই থেকে যায়।
গ্রন্থাগার তাই কোনো প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত আয়োজন নয়; এটি একটি সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি। সড়ক মানুষের চলার পথ তৈরি করে, গ্রন্থাগার তৈরি করে চিন্তার পথ। হাসপাতাল যেমন শরীরের সুরক্ষায় প্রয়োজন, তেমনি পাঠাগার প্রয়োজন সমাজের মননশীলতা ও বিচারবোধের বিকাশে। উন্নয়নের হিসাব শুধু সেতু, ভবন কিংবা বড় প্রকল্প দিয়ে সম্পূর্ণ হয় না। সেই হিসাবের মধ্যে থাকতে হয় কত শিশু বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে, কত তরুণ গবেষণার সুযোগ পাচ্ছে, কত পুরোনো দলিল নিরাপদে সংরক্ষিত হচ্ছে—এসব প্রশ্নও।
ব্রিটিশ লাইব্রেরির সাধারণ প্রবেশ বিনা মূল্যে। স্থায়ী ট্রেজারিজ গ্যালারিও সাধারণত বিনা টিকিটে দেখা যায়; বিশেষ প্রদর্শনীর ক্ষেত্রে আলাদা টিকিট লাগতে পারে। এই উন্মুক্ততা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জ্ঞানচর্চার দরজা যত বেশি মানুষের জন্য খোলা থাকবে, সমাজে কৌতূহল ও অনুসন্ধানের পরিসরও তত বাড়বে। কোনো শিশু প্রথমবার কয়েক শ বছরের পুরোনো পাণ্ডুলিপি দেখে হয়তো ইতিহাসের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠবে। সেই ছোট্ট বিস্ময়ই একদিন বড় কোনো অনুসন্ধানের শুরু হতে পারে।
গ্রন্থাগার থেকে বেরিয়ে আবার ইউস্টন রোডের ব্যস্ততায় ফিরে এলাম। শহর তার নিজস্ব গতিতে ছুটছে। অথচ মনে হচ্ছিল, ভেতরে দেখা প্রতিটি নিদর্শন যেন একটি করে প্রশ্ন রেখে গেছে। আমাদের ইতিহাস কতটা নিরাপদ, আমাদের পাঠাগার কতটা প্রাণবন্ত, জ্ঞান ও গবেষণা রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারে কতটা জায়গা পাচ্ছে? ব্রিটিশ লাইব্রেরি দেখে বুঝলাম, একটি জাতির পরিচয় শুধু তার অতীতের গৌরবে নয়; সেই অতীতকে সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ ও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ববোধেও। সেদিন তাই শুধু একটি গ্রন্থাগার দেখে ফিরিনি; নিজের সমাজের দিকে নতুন করে তাকানোর প্রয়োজন অনুভব করেছি।
[লেখক: যুক্তরাজ্য প্রবাসী]

বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ নভেম্বর ২০২৬
লন্ডন এমন এক শহর, যেখানে বর্তমানের ব্যস্ততার পাশেই অতীত নীরবে বসবাস করে। রাজপথে হাঁটতে হাঁটতে কখনো মনে হয়, পুরোনো ভবনগুলো যেন সময়ের কাছে লেখা দীর্ঘ চিঠি—যার প্রতিটি জানালায় আটকে আছে কোনো এক যুগের গল্প। টেমসের জল বয়ে যায়, বদলায় নগরীর চেহারা, বদলায় মানুষের জীবনযাপন; তবু ইতিহাসের কিছু চিহ্ন থেকে যায় অবিচল। এমন এক শহরে আমার গন্তব্য ব্রিটিশ লাইব্রেরি। সেখানে যাচ্ছিলাম একটি বিখ্যাত গ্রন্থাগার দেখতে, কিন্তু ফিরে এলাম নিজের সমাজ, ইতিহাস ও জ্ঞানচর্চা নিয়ে অনেকগুলো প্রশ্ন সঙ্গে নিয়ে।
সেন্ট প্যানক্রাসের ব্যস্ত এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা ভবনটির স্থাপত্যে প্রথমেই চোখে পড়ে লাল ইটের গাম্ভীর্য। বিশাল অথচ সংযত অবয়ব; যেন নিজের গুরুত্ব ঘোষণা না করেও তা জানান দিতে জানে। বাইরে মানুষের দ্রুত পদচারণা, যানবাহনের শব্দ, স্টেশনের ব্যস্ততা। ভেতরে প্রবেশ করতেই সেই কোলাহল যেন কয়েক ধাপ দূরে সরে যায়। এখানে নীরবতা শূন্য নয়; বরং অসংখ্য মানুষের চিন্তা, শ্রম ও আবিষ্কারের উপস্থিতিতে পরিপূর্ণ।
ব্রিটিশ লাইব্রেরি ১৯৭৩ সালের ১ জুলাই যুক্তরাজ্যের স্বতন্ত্র জাতীয় গ্রন্থাগার হিসেবে যাত্রা শুরু করে। তবে এর শেকড় আরও পুরোনো। ১৭৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ব্রিটিশ মিউজিয়ামের গ্রন্থসংগ্রহের মধ্যেই এর ইতিহাসের সূচনা। সেন্ট প্যানক্রাসে বর্তমান ভবনটি ১৯৯৮ সালে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ উদ্বোধন করেন। সময়ের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে প্রতিষ্ঠানটি আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গ্রন্থাগারে পরিণত হয়েছে। এর সংগ্রহে রয়েছে ১৭ কোটিরও বেশি উপাদান—বই, পাণ্ডুলিপি, সংবাদপত্র, মানচিত্র, চিঠি, আলোকচিত্র, শব্দরেকর্ডিং, সংগীতের স্বরলিপি ও অসংখ্য ঐতিহাসিক দলিল।
সংখ্যাটি বিস্ময়কর, কিন্তু সংখ্যার চেয়েও বড় বিস্ময় এর ভেতরে জমা মানুষের জীবন। কোনো বিবর্ণ চিঠিতে হয়তো অপেক্ষার কথা লেখা আছে, কোনো পুরোনো সংবাদপত্রে ধরা আছে একটি সময়ের রাজনৈতিক উত্তাপ, কোনো মানচিত্রে চিহ্নিত হয়েছে আজ আর নেই এমন জনপদ। কাগজের গায়ে কালি শুকিয়ে গেছে বহু আগে, কিন্তু তার ভেতরের সময় এখনো শুকায়নি। একটি দলিল খুললে কখনো রাষ্ট্রের ইতিহাস সামনে আসে, কখনো সাধারণ মানুষের অজানা জীবনের দরজা খুলে যায়। এখানে ইতিহাস শুধু রাজা-বাদশাহ কিংবা যুদ্ধজয়ের বিবরণ নয়; মানুষের প্রতিদিনের বেঁচে থাকার চিহ্নও।
ট্রেজারিজ গ্যালারিতে গিয়ে সেই অনুভূতি আরও তীব্র হলো। ম্যাগনা কার্টা, শেক্সপিয়রের প্রথম ফোলিও, লিওনার্দো দা ভিঞ্চির নোটবুকের মতো ঐতিহাসিক নিদর্শন মানুষের চিন্তার অসাধারণ ক্ষমতার কথা মনে করিয়ে দেয়। কয়েক শতাব্দী আগে লেখা কোনো পঙ্ক্তি কিংবা আঁকা কোনো রেখার সামনে দাঁড়িয়ে বোঝা যায়, মানুষের সৃষ্টিশীলতা সময়ের সীমানা মানে না। একটি দলিল নাগরিক অধিকার সম্পর্কে রাষ্ট্রের ধারণা বদলে দিতে পারে, একটি সাহিত্যকর্ম ভাষার প্রকাশভঙ্গিকে নতুন দিগন্তে পৌঁছে দিতে পারে। এসব নিদর্শন তাই কেবল অতীতের স্মারক নয়, মানুষের চিন্তার বিবর্তনেরও সাক্ষ্য।
তবে এই সংগ্রহের সামনে দাঁড়িয়ে মুগ্ধতার পাশাপাশি কিছু কঠিন প্রশ্নও মনে আসে। ইতিহাসের সম্পদ কার? কোন পথে, কার অনুমতিতে, কোন রাজনৈতিক বাস্তবতায় এক ভূখণ্ডের সাংস্কৃতিক নিদর্শন অন্য ভূখণ্ডের সংগ্রহশালায় স্থান পেয়েছে? ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ঔপনিবেশিক অতীত বিবেচনায় প্রশ্নগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। উপনিবেশ থেকে সংগৃহীত বহু নিদর্শনের মালিকানা ও প্রত্যর্পণ নিয়ে আজও বিতর্ক রয়েছে। কোনো ঐতিহাসিক বস্তু যত্নে সংরক্ষণ করা জরুরি, কিন্তু তার উৎস, অধিকার ও সংগ্রহের ইতিহাসের প্রতিও দায়বদ্ধ থাকা প্রয়োজন। অতীতকে কেবল প্রদর্শন করাই যথেষ্ট নয়; অতীতের অন্যায় নিয়েও সৎ আলোচনা দরকার।
এই বিশাল সংগ্রহে দক্ষিণ এশিয়ার ভাষা, সাহিত্য, ধর্ম ও সংস্কৃতির বহু উপাদান রয়েছে। দূরদেশের একটি গ্রন্থাগারে উপমহাদেশের পরিচিত সাংস্কৃতিক চিহ্ন দেখে নিজের শেকড়ের কথা মনে পড়ল। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যও এই বৃহত্তর ইতিহাসের অংশ। আমাদের পুঁথি, পুরোনো সংবাদপত্র, সাহিত্যকর্ম ও সামাজিক দলিল শুধু আমাদের নিজস্ব সম্পদ নয়; মানবসভ্যতার ইতিহাস বোঝারও উপকরণ। অথচ দেশে ফিরে তাকালে দেখা যায়, বহু মূল্যবান পাণ্ডুলিপি ও ঐতিহাসিক দলিল এখনো যথাযথ সংরক্ষণের অপেক্ষায়। কোথাও পরিচর্যার অভাব, কোথাও অর্থের সংকট, কোথাও আবার প্রয়োজনীয় উদ্যোগের ঘাটতি। অন্যের সংগ্রহশালায় নিজের ঐতিহ্যের চিহ্ন দেখে গর্বিত হওয়া সহজ; নিজের ঘরের সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব নেওয়াই কঠিন।
ব্রিটিশ লাইব্রেরির প্রকৃত শক্তি শুধু তার সংগ্রহের বিশালতায় নয়, জ্ঞানচর্চার ব্যবস্থাতেও। নির্ধারিত নিয়মে রিডার পাস নিয়ে গবেষক, শিক্ষার্থী ও পাঠকেরা পাঠকক্ষে কাজ করতে পারেন। কেউ পুরোনো দলিল ঘেঁটে ইতিহাসের অজানা অধ্যায় খুঁজছেন, কেউ ভাষার বিবর্তন অনুসন্ধান করছেন, কেউ সংবাদপত্রের পাতায় খুঁজছেন কোনো ঘটনার হারিয়ে যাওয়া সূত্র। তাঁদের নীরব শ্রমে বোঝা যায়, জ্ঞান কোনো সাজানো প্রদর্শনী নয়; এটি নিরন্তর অনুসন্ধানের বিষয়। সংরক্ষিত তথ্য তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়।
এই পরিবেশে দাঁড়িয়ে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও পাঠাভ্যাসের কথাও মনে হলো। বাংলাদেশে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গ্রন্থাগার আছে, কিন্তু সবখানে তা শিক্ষার্থীদের জীবন্ত অভ্যাসের অংশ হয়ে উঠতে পারেনি। কোথাও বইয়ের ঘাটতি, কোথাও পাঠকক্ষের অনুপযুক্ত পরিবেশ, কোথাও আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও ডিজিটাল সংরক্ষণের অভাব। আমরা পরীক্ষার প্রস্তুতিতে যতটা সময় দিই, মুক্তভাবে পড়া ও জানার আনন্দে ততটা সময় দিই কি? যে শিক্ষার্থী শুধু নির্ধারিত পাঠের উত্তর মুখস্থ করে, তার সামনে পৃথিবীর বিস্তৃত প্রশ্নগুলো অনেক সময় অদেখাই থেকে যায়।
গ্রন্থাগার তাই কোনো প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত আয়োজন নয়; এটি একটি সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি। সড়ক মানুষের চলার পথ তৈরি করে, গ্রন্থাগার তৈরি করে চিন্তার পথ। হাসপাতাল যেমন শরীরের সুরক্ষায় প্রয়োজন, তেমনি পাঠাগার প্রয়োজন সমাজের মননশীলতা ও বিচারবোধের বিকাশে। উন্নয়নের হিসাব শুধু সেতু, ভবন কিংবা বড় প্রকল্প দিয়ে সম্পূর্ণ হয় না। সেই হিসাবের মধ্যে থাকতে হয় কত শিশু বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে, কত তরুণ গবেষণার সুযোগ পাচ্ছে, কত পুরোনো দলিল নিরাপদে সংরক্ষিত হচ্ছে—এসব প্রশ্নও।
ব্রিটিশ লাইব্রেরির সাধারণ প্রবেশ বিনা মূল্যে। স্থায়ী ট্রেজারিজ গ্যালারিও সাধারণত বিনা টিকিটে দেখা যায়; বিশেষ প্রদর্শনীর ক্ষেত্রে আলাদা টিকিট লাগতে পারে। এই উন্মুক্ততা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জ্ঞানচর্চার দরজা যত বেশি মানুষের জন্য খোলা থাকবে, সমাজে কৌতূহল ও অনুসন্ধানের পরিসরও তত বাড়বে। কোনো শিশু প্রথমবার কয়েক শ বছরের পুরোনো পাণ্ডুলিপি দেখে হয়তো ইতিহাসের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠবে। সেই ছোট্ট বিস্ময়ই একদিন বড় কোনো অনুসন্ধানের শুরু হতে পারে।
গ্রন্থাগার থেকে বেরিয়ে আবার ইউস্টন রোডের ব্যস্ততায় ফিরে এলাম। শহর তার নিজস্ব গতিতে ছুটছে। অথচ মনে হচ্ছিল, ভেতরে দেখা প্রতিটি নিদর্শন যেন একটি করে প্রশ্ন রেখে গেছে। আমাদের ইতিহাস কতটা নিরাপদ, আমাদের পাঠাগার কতটা প্রাণবন্ত, জ্ঞান ও গবেষণা রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারে কতটা জায়গা পাচ্ছে? ব্রিটিশ লাইব্রেরি দেখে বুঝলাম, একটি জাতির পরিচয় শুধু তার অতীতের গৌরবে নয়; সেই অতীতকে সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ ও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ববোধেও। সেদিন তাই শুধু একটি গ্রন্থাগার দেখে ফিরিনি; নিজের সমাজের দিকে নতুন করে তাকানোর প্রয়োজন অনুভব করেছি।
[লেখক: যুক্তরাজ্য প্রবাসী]

আপনার মতামত লিখুন